আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮০ (৩)
অরাত্রিকা রহমান
পনেরো মিনিট হয়ে গেছে। রায়ান কনফারেন্স রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বড় স্ক্রিনে একের পর এক স্লাইড পরিবর্তন করে নিজের প্রোজেক্টের প্রেজেন্টেশন দিয়ে যাচ্ছে। স্ক্রিনের ওপাশে আমেরিকার ম্যানেজিং বোর্ড, শেয়ারহোল্ডার এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মনোযোগ দিয়ে তার প্রতিটি কথা শুনছেন। রায়ানের আত্মবিশ্বাসী উপস্থাপনা, পরিসংখ্যানভিত্তিক পরিকল্পনা আর ভবিষ্যৎ প্রকল্পের রোডম্যাপ দেখে উপস্থিত সবাই স্পষ্টতই সন্তুষ্ট। কয়েকজন বোর্ড মেম্বার তার পরিকল্পনার প্রশংসাও করলেন। তবু আজ রায়ানের মন পুরোপুরি মিটিংয়ে বসছে না। প্রেজেন্টেশন দিতে দিতেও অকারণে তার দৃষ্টি বারবার টেবিলের ওপর রাখা ফোনটার দিকে চলে যাচ্ছে। মিরা ফোন ধরেনি—বিষয়টা খুব বড় কিছু নয়, তবুও তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্বস্তি কাজ করছে। নিজেকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছে, হয়তো রিং এর শব্দ শোনেনি, বা হয়তো প্রস্তুত হতে ব্যস্ত। নিজের কাজে ব্যক্তিগত সমস্যার কোনো প্রভাব রায়ান আজকের দিনে ক্রয় করতে পারবে না। তাই মন শক্ত করে নিজের নার্ভ ধরে রেখে কনফারেন্স টা চাইলিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে—
ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে হার্টবার্ড ম্যানশনের সামনে এসে দাঁড়ালেন। প্রথমবার বার কলিং বেল চাপলেন তিনি। কোনো সাড়া নেই। কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে আবার বেল দিলেন। তবুও ভেতর থেকে কোনো আওয়াজ এলো না। ব্যাপারটা অস্বাভাবিক লাগায় ড্রাইভার ভ্রু কুঁচকে পকেট থেকে ফোন বের করে রায়ানকে কল দিলেন তৎক্ষণাৎ। এই মূহুর্তে রায়ান কে কল দেওয়া ছাড়া তার আর কিছু করণীয় ও ছিল না যেহেতু মিরার নাম্বার তার কাছে নেই আর ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ আসছে না, তাই বাধ্য হয়েই রায়ান কে জানাতে হবে বিষয়টা তার।
—”Brilliant…”
—”That’s exactly what we were looking for. Perfectly designed Mr. Chowdhury..”
প্রশংসার শব্দগুলো ভেসে আসছিল অঝড়ে। অথচ সেগুলোর একটাও রায়ানের কর্ণদ্বার পাড় করতে সক্ষম হয় নি। ছেলেটার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক চাপা অস্বস্তি জমে উঠছে। কারণহীন। ব্যাখ্যাহীন। ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা ফোনটির নোটিফিকেশন লাইট একবার জ্বলে উঠল। সাইলেন্ট মোডে থাকায় কোনো শব্দ হলো না। স্লাইড পরিবর্তন করতে করতেই তার দৃষ্টি আচমকা ফোনের ওপর গিয়ে স্থির হলো। বুকের ভেতর যেন হঠাৎ করেই অকারণে ধাক্কা খেল সে। মনের ভেতর আশার ঝিলিক জ্বলে উঠল সহসাই। সে নিজের কথা থামিয়ে ল্যাপটপের অপর পাশে বোর্ড মেম্বারদের দিকে তাকাল। বিনয়ের সাথে হাসি মুখে অনুরোধ পূর্বক বললো-
“Thank you so much everyone.. I really appreciate your appreciation.. please Excuse me for a moment.”
অনুমতি নিয়ে সে দ্রুত ফোনটা হাতে তুলে নিল। কিন্তু স্ক্রিনে ভেসে থাকা নামটা দেখতেই চোখের ক্ষণিকের প্রত্যাশা নিভে গেল। ড্রাইভারের কল দেখে সামান্য হতাশায় রায়ান ভ্রু কুঁচকে সঙ্গে সঙ্গেই তার কলটা রিসিভ করলো যদি তার থেকে অন্তত মিরার কোনো খবর পায় সেই আশায়।
— “হ্যালো! ড্রাইভার কাকা.. ম্যাডাম কে পিক করেছেন? ফোনটা একটু ওনার কাছে দিন তো।”
রায়ানের কথা শেষ হতেই ড্রাইভারের উদ্বিগ্ন কণ্ঠ ভেসে এলো অপর দিক থেকে—
“বড় বাবা… আমি ম্যাডামকে নিতে এসেছি অনেকক্ষণ হলো। অনেকবার বেল দিয়েছি। দরজায় নক করেছি। কিন্তু ম্যাডাম দরজা খুলছেন না। ভেতর থেকেও কোনো শব্দ পাচ্ছি না। এখন কি করবো বুঝতেও পারছি না। যদি একটু ওনাকে কল করে বের হতে বলতেন ভালো হতো।”
কথাগুলো যেন রায়ানের বুকের কোথাও নিঃশব্দে গভীর আঘাত করল। তার মুখের রক্ত মুহূর্তেই ফিকে হয়ে চোয়াল শক্ত হয়ে এল। কয়েক সেকেন্ড সে কোনো উত্তরই দিতে পারল না। মস্তিষ্ক যেন এক লহমায় শত সম্ভাবনার অন্ধকার গোলক ধাঁধায় ছুটে বেড়াতে লাগল।
গলাটা শুকিয়ে এলো রায়ানের অজানা শঙ্কাতে। কষ্ট সাধ্য হলেও নিজেকে দৃঢ়তার সাথে সামলে নিয়ে নিচু স্বরে বলল—
“এক মিনিট কাকা..আপনি ওখানেই থাকুন। আমি দেখছি। আর কলিং বেল বাজাতে থাকুক ক্রমাগত।”
নিজের দিক টুকু বলেই কল কেটে দিয়ে অবিলম্ব মিরার নম্বরে ফোন করল। তবে প্রতিবারই ফোনের ওপাশে শুধু নির্দয় রিংটোন বেজে চলেছে। কোনো উত্তর নেই। ফোনের প্রতিটি রিং টোন তার ধৈর্যের প্রাচীরে একেকটি ফাটল ধরিয়ে দিচ্ছে। এইবার বুকের ভেতরের অস্বস্তিটা আর অস্বস্তি রইল না; সেটা ধীরে ধীরে দমবন্ধ করা আশঙ্কায় রূপ নিল। তার আঙুলের ডগাগুলো ঠান্ডা হয়ে আসছে। হাতের তালু ঘামে ভিজে উঠেছে। মনের ভেতর বারবার একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
“কিছু হয় নিতো তার হৃদপাখির?”
নিজেকেই বহু পাঁয়তারা করে নিজে বোঝাতে চাইলো সব ঠিক আছে কিন্তু যুক্তির প্রতিটি বাক্যকে ছাপিয়ে অজানা এক ভয় ক্রমশ তার বুকে শেকড় গেড়ে বসছে। তবুও সে জানে—এই মুহূর্তে শত শত কোটি টাকার একটি আন্তর্জাতিক প্রজেক্টের দায়িত্ব তার কাঁধে। ব্যক্তিগত আতঙ্কের কাছে পেশাদারিত্বকে ভেঙে পড়তে দিলে চলবে না। একবার চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল রায়ান। মুঠোবদ্ধ হাত দুটো ধীরে ধীরে শিথিল করল।
মুখের অস্থিরতাকে জোর করে আড়াল করে আবার কনফারেন্স টেবিলের সামনে দাঁড়াল ল্যাপটপের দিকে মুখ করে। কিন্তু এবার তার কণ্ঠের দৃঢ়তার আড়ালে স্পষ্ট চাপা অস্থিরতা লুকিয়ে ছিল।
-“Here I am back. I’ll send the project plan to you all personally afterwards. As it’s late night in the USA it would be very unprofessional of me to continue for any longer. If you guys don’t have any query I would like to call the day off now.”
পরিস্থিতি ঠান্ডা মাথায় সামাল দেওয়ার পরিপন্থী রায়ানের ভালো করেই জানা। সঠিক সময় সঠিক অযুহাত কাজে লাগানো তার একটি।
-“Yeah Yeah, sure Mr. Chowdhury..we are aware of how professional you are. No need to explain. we are totally invested into your project we would love to go a head with it. Please send us the final wordic.”
রায়ান স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
-“Ok then.. Have a good night everyone..see you soon..”
অতি দ্রুত বিদায় পর্বের শেষে রায়ান নিজের ফোনটা হাতের মুঠোয় পুরে দ্রুততার সাথে প্রায় ছুটে কনফারেন্স রুম থেকে বেরিয়ে গেল। করিডোরে গিয়ে তানভীর কে ডেকে তাড়াহুড়োয় বলল-
“তানভীর, সেন্ড দ্যা প্রজেক্ট প্লেন টু এভরি বোর্ড মেম্বার। আই ক্যান্ট আফর্ড টু লুজ দিস প্রজেক্ট।”
তানভীর রায়ানের কণ্ঠের অস্থিরতা দেখে হকচকিয়ে গেল-
“ইয়েস স্যার, আই উইল। কিন্তু আপনি এখন কোথায় যাচ্ছেন? এমন দেখাচ্ছে কেন আপনাকে? ইজ দেয়ার এনি থিং রং?”
-“আই হোপ নট..!”
রায়ান এর বেশি কিছু বলে সময় নষ্ট না করে নিজের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে গেল। লিফটের জন্যও অপেক্ষা করল না। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গাড়িতে উঠেই আবার কল দিল মিরার ফোনে। এখন আর কল রিং হচ্ছে না। বন্ধ দেখাচ্ছে নাম্বার। রায়ান বিরক্তিতে হাতের ফোনটা সজোরে ছুঁড়ে ফেলল গাড়ির পিছনের সিটে।
অপরাহ্ণের ব্যস্ত রাস্তায় রায়ানের গাড়ির ইঞ্জিনের গর্জন যেন তার বুকের ভেতরের তাণ্ডবকেও হার মানাচ্ছে।
অ্যাক্সিলারেটরের ওপর তার পা ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে। শহরের রাস্তা, সিগন্যাল, চারপাশের যানবাহন—সবকিছু ঝাপসা হয়ে ধরা দিচ্ছে তার নজরে। চোখ দুটো শুধু অশান্ত, স্টেয়ারিং আঁকড়ে ধরা হাত দুটো কাঁপছে। আঙুলের গিঁটগুলো এতটাই শক্ত হয়ে উঠেছে, যে রক্ত যেন সরে গিয়ে সাদা হয়ে এসেছে। গাড়িটা শহরের ব্যস্ত রাস্তা চিরে তীরের মতো ছুটে চলেছে। স্টেয়ারিংয়ে শক্ত হয়ে থাকা রায়ানের দু’হাতের শিরাগুলো স্পষ্ট ফুলে উঠেছে উদ্বিগ্নতায়। মাথার ভেতর একটাই চিন্তা অবিরাম ধাক্কা মেরে চলেছে- “তার হৃদপাখি ঠিক আছে তো!?”
—”আল্লাহ…আমার স্ত্রী ও সন্তানকে আপনার হেফাজতে রাখুন। আমি আর কিছু চাই না… শুধু ওদের কিছু যেন না হয়। প্লিজ খোদা…”
প্রার্থনার শেষ শব্দগুলো কাঁপছিল। বুকের ভেতরটা এমনভাবে ধুকপুক করছিল যেন পাঁজর ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসবে। গাড়ির স্পিডোমিটারের কাঁটা ক্রমশ ওপরে উঠছে, অথচ রায়ানের কাছে প্রতিটি সেকেন্ড অসহনীয় দীর্ঘ মনে হচ্ছে। অবশেষে হার্টবার্ড ম্যানশনের সামনে গাড়িটা প্রচণ্ড শব্দে ব্রেক কষে থামল। এইটুকু সময়ে এতো রকমের শঙ্কার উৎপত্তি হয়েছে যে ছেলেটার মাথা ক্লান্তিতে হালকা নত হয়ে এলো স্টেয়ারিং এর সামনে। শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট নড়ল নিঃশব্দ-
“আই জাস্ট হোপ টু সি ইউ অল ফাইন হার্টবার্ড।”
গাড়ির দরজা খুলে রায়ান পাগলের ন্যায় ছুটতে ছুটতে মূল দরজার ফটকের সামনে গেল সেখানে ড্রাইভার ও অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে। রায়ান তার দিকে মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলো না। নিজের কাছে থাকা স্পেয়ার কি বের করে কাঁপতে থাকা আঙুলে ডোর লকের ভেতর প্রবেশ করালো রায়ান। এতটাই অস্থির ছিল তার হাত যে, প্রথমবার চাবিটা ঠিকমতো বসলোই না। দ্বিতীয়বার চেষ্টা করতেই লক খুলে গেল, আর দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই তার বুকের ভেতর জমে থাকা উৎকণ্ঠা যেন কণ্ঠ ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো।
— “হৃদপাখিইইইই…মিরাআআআ…!”
তার ডাকের তীব্রতা নিস্তব্ধ বাড়িটার প্রতিটি দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে আবার ফিরে এলো তার কাছেই। অথচ যার জন্য সেই আকুল ডাক—তার কোনো সাড়া মিলল না। রায়ান থমকে গেল এক জায়গায়। বুকটা অস্বাভাবিক দ্রুততায় ওঠানামা করছে, শ্বাস যেন ফুসফুসের গভীরে পৌঁছাতেই চাইছে না। একবার ডান দিকে, একবার বাঁ দিকে চোখ বুলিয়ে নিল সে। বসার ঘর, পাশের করিডর, পরিচিত আসবাবপত্র—সবকিছুই যথাস্থানে। কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। অথচ এই স্বাভাবিকতার মাঝেই মিরার অনুপস্থিতিটাই যেন সবচেয়ে ভয়ংকর অস্বাভাবিকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
—”মি..মিরা..!”
এবার ডাকটা আগের চেয়ে নিচু, কিন্তু তাতে আতঙ্ক আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা দিচ্ছে। রায়ানের বুকের ভেতর কেমন একটা অশুভ শীতলতা নেমে এলো। অজানা আশঙ্কা কখন যে তার সমস্ত সত্তাকে গ্রাস করে ফেলেছে, সে নিজেও বুঝতে পারল না। নিজের চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে চোখ বন্ধ করল সে। মাথার ভেতর যেন হাজারটা আশঙ্কা একসঙ্গে ছুটে বেড়াচ্ছে। ঠিক তখনই আচমকা রায়ান চোখ মেলে তাকাল। তার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো সিঁড়ির ওপর। তারপর আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস হলো না তার। সে ছুটে গেল সিঁড়ির দিকে। একেকটা ধাপ যেন তার কাছে অসীম দীর্ঘ হয়ে উঠেছে। রায়ান অস্বাভাবিক দ্রুততায় সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠলো। তার পায়ের ভারী শব্দে বাড়ির নিস্তব্ধতা কেঁপে উঠছে। অবশেষে নিজেদের বেডরুমের দরজার সামনে এসে দরজাটা সজোরে ঠেলে খুলে ভেতরে ঢুকতেই থেমে গেল রায়ান। ঘরটা অদ্ভুত রকমের শান্ত, সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ। রায়ান দমকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিন্তু তার বুকের ভার কমছে না। তার চোখ দ্রুত ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াতে লাগল মিরার উদ্দেশ্যে কিন্তু কেউ নিই আশেপাশে।
ক্ষণমাত্রই—
তার দৃষ্টি থেমে গেল সাদা ধবধবে মেঝের ওপর।বিছানার অপর পাশ থেকে একজোড়া পা দেখা যাচ্ছে যা রক্তে মাখামাখি। রায়ানের শরীরের সমস্ত স্নায়ু যেন একসঙ্গে অবশ হয়ে গেল। তার চোখের সামনে মেঝের সাদা রঙের ওপর ছড়িয়ে থাকা লম্বা রক্ত ধারা ধীরে ধীরে নিজের পথ তৈরি করে বয়ে যাচ্ছে।
রায়ানের মনে হলো, পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ আচমকা তার পায়ের নিচ থেকে সরে গেছে। কয়েক মুহূর্ত সে কিছুই বুঝতে পারল না। চোখের সামনে যা দেখছে, মস্তিষ্ক যেন সেটাকে সত্যি বলে মেনে নিতেই অস্বীকার করছে।
রায়ান কাঁপনের ভারে নুয়ে পড়া পদক্ষেপে বিছানার অপর পাশে এগিয়ে গেল। মেঝেতে নিথর হয়ে পড়ে আছে মিরার শরীর টা। তার এক হাত নিজের পেটের পাশে জড়িয়ে ধরা। চোখ বন্ধ। মুখের স্বাভাবিক প্রাণচাঞ্চল্যের লেশমাত্র নেই। যে মুখটায় হাসি দেখলে রায়ানের সমস্ত ক্লান্তি মিলিয়ে যেত, সেই মুখটাই আজ এত অসহায়, এত নিস্তব্ধ যে তাকিয়ে থাকাটাও যেন অসম্ভব হয়ে উঠল রায়ানের জন্য। তার পা দুটো নিজের অজান্তেই পিছিয়ে গেল দুকদম। হঠাৎ তার হাঁটু ভেঙে এলো। শরীরের সমস্ত শক্তি যেন মুহূর্তেই নিঃশেষ হয়ে গেছে। সুঠাম ভারী শরীরটা অসহায়ভাবে মেঝেতে বসে পড়লো। তবুও তার চোখ এক মুহূর্তের জন্যও মিরার ওপর থেকে সরলো না। তার কণ্ঠে আর কোনো দৃঢ়তা নেই। নেই সেই মানুষটার স্বাভাবিক কর্তৃত্ব। আছে কেবল ভয় আর সাথে অবিশ্বাস। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। কম্পিত হাতে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সে।
মিরাকে ছুঁতে চাইল। কিন্তু হাতটা মিরার পায়ের কাছে পৌঁছানোর আগেই তার দৃষ্টি আবার মেঝের দিকে আটকে গেল। মেয়েটার শরীর থেকে অপ্রত্যাশিত রক্তক্ষরণে সেই দৃশ্য তাকে পাগল প্রায় করে দিচ্ছে। রায়ানের বুকের ভেতরটা যেন কেউ মুঠো করে চেপে ধরল। ছেলেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না তার করণীয় কি? কাকে ডাকবে? কার কাছে যাবে? কীভাবে এই মুহূর্তটাকে থামাবে? রায়ান হঠাৎ মাথা নাড়তে শুরু করল। যেন নিজের চোখকেই অস্বীকার করছে।
— “না… না…এটা সত্যি না। কোনো ভাবেই না।”
রায়ান নিজের দুর্বল শরীরটাকে টেনে টেনে মেঝে বেয়ে এগিয়ে গেল মিরার দিকে। মিরার মাথা নিজের কোলে নিয়ে মেয়েটার অসার মুখটা নিজের আচলায় পুরে অসহায় কণ্ঠে বলল—
“মিরা, ওঠো। দেখ আমি কি বাজে স্বপ্ন দেখছি। আমাকে জাগাও। আমি পারছি না সহ্য করতে। মিরা..!”
কণ্ঠস্বর ভেঙে এলো ছেলেটার। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু আর আটকে রাখা গেল না। একফোঁটা, দু’ফোঁটা করে গড়িয়ে পড়ল তার গাল বেয়ে। রায়ানের বুকের ভেতর থেকে এক অদ্ভুত শব্দ বেরিয়ে এলো—আর্তনাদ নয়, কান্নাও নয়; যেন কোনো মানুষ নিজের পৃথিবীটাকে চোখের সামনে ভেঙে যেতে দেখে যে শব্দ করে, ঠিক তেমন। সে মাথা নিচু করে ফিসফিসিয়ে বলল—
“মিরা… আমার দিকে তাকাও…”
কোনো উত্তর নেই। রায়ান আরও কাছে ঝুঁকে এল।
তার কণ্ঠ এবার প্রার্থনার মতো কাঁপছে।
— “এই শোনো না… আমি এসেছি। তুমি শুনতে পাচ্ছো না? আমি এখানে…চোখ খোলো।”
আর সেই মুহূর্তে তার মনে হলো—এই মানুষকে হারানোর ভয় আসলে মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর। কারণ মৃত্যু তখনও আসেনি, অথচ তার ছায়া ইতোমধ্যেই বুকের ওপর বসে সমস্ত আলো গ্রাস করতে শুরু করেছে। রায়ান মিরার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে তখন একসঙ্গে জমে আছে আতঙ্ক, অসহায়ত্ব, অপরাধবোধ আর এমন এক ভালোবাসা—যার সামনে একজন মানুষ নিজের জীবনটাকেও তুচ্ছ মনে করতে পারে। কাঁপতে কাঁপতে সে শুধু একটাই কথা বলল—
“খোদার দোহাই… মিরা, চোখ খোলো…”
আর সেই নীরবতার ভেতরেই রায়ানের মনে হলো, তার সমস্ত পৃথিবী যেন নিঃশব্দে মৃত্যুর কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। রায়ানের চক্ষু জোড়া হতে গড়িয়ে পড়া অশ্রু কণা মিরার চোখের উপর পড়তেই মেয়েটার চোখের পাতা কেঁপে উঠলো। রায়ান মিরার পেটের উপর রাখা হাতের উপর হাত রাখতেই মিরার হাতের আঙ্গুল গুলো কেঁপে উঠলো। রায়ান আচমকা তা খেয়াল করে মিরাকে ব্যস্ত হয়ে ডাকতে থাকলো-
“কাম অন। মিরা.. ওপেন ইউর আইস। তাকাও।”
রায়ান পাশের সাইড টেবিলের ওপর রাখা পানির গ্লাস থেকে হাতের তালুতে খানিকটা পানি তুলে নিল। কাঁপতে থাকা আঙুলের ফাঁক গলে কয়েক ফোঁটা পানি মিরার মুখে ছিটিয়ে দিল সে।
— “মিরা… মিরা, চোখ খোলো।”
কণ্ঠটা যেন নিজেরই অচেনা লাগছিল রায়ানের কাছে। এতটা অসহায়, এতটা ভাঙা স্বর তার গলায় এর আগে কখনো শোনা যায়নি। আরেকবার মিরার মুখে পানি ছিটিয়ে দিতেই তার কাঁপতে থাকা চোখের পাতাগুলো ধীরে ধীরে নড়ে উঠল। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না মিরা। চারপাশটা যেন ঘন কুয়াশায় ঢাকা। মাথার ভেতর ভারী একটা চাপ, শরীরের প্রতিটি অস্থিসন্ধিতে ছড়িয়ে থাকা যন্ত্রণা। সামান্য নড়তে গিয়েই বুকের ভেতর থেকে চাপা একটা গোঙানি বেরিয়ে এলো। মনে হলো, নিজের শরীরটাই যেন আর নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। ধীরে ধীরে চোখ দুটো মেলে তাকাতেই অস্পষ্ট একটা অবয়াম তার দৃষ্টির সামনে ফুটে উঠল।
কিছুক্ষণ আগের দৃশ্যটা হঠাৎ করেই মিরার মনের পর্দায় ভেসে উঠল। পা পিছলে যাওয়ার সেই মুহূর্তে সবকিছু এত দ্রুত ঘটেছিল যে ভাবার সময়ই ছিল না। মুহূর্তের ভেতরেই তার শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু পড়ে যাওয়ার আগের সেই ক্ষুদ্র সময়টুকুতেও মিরার মাথায় একটাই চিন্তা এসেছিল—তাদের সন্তান..!
অজান্তেই দুহাত দিয়ে নিজের পেট আগলে নিয়েছিল সে। তারপর শরীরটাকে যতটা সম্ভব ঘুরিয়ে নিয়েছিল, যাতে সরাসরি আঘাতটা সেখানে না লাগে। মেঝেতে পড়ার মুহূর্তে তীব্র একটা ধাক্কা অনুভূত হয়েছিল। ব্যথায় তার চোখ-মুখ কুঁচকে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ সে বুঝতেই পারেনি কী হয়েছে। শুধু বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছিল অস্ফুট গোঙানি। কাঁপতে কাঁপতে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করেছিল মিরা। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর পরিস্থিতির ভয়াবহতায় ফ্লোরে অজস্র রক্তধারা বয়ে যেতে দেখে তার শরীরের সমস্ত শক্তি যেন নিঃশেষ হয়ে গেল। চোখের সামনে সবকি ঝাপসা হয়ে এলো। অসহায় আতঙ্কে চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে পড়তেই মেঝেতেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল সে তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে।
মিরার শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট কাঁপল ভীত মনে— “রা…য়ান…!”
শব্দটা এত ক্ষীণ ছিল যে প্রায় শোনাই গেল না।
কিন্তু রায়ান শুনল। মিরাকে সজ্ঞানে দেখে তার নিজের শ্বাস ফিরে এসেছে। রায়ান মিরার চক্ষু জল মুছে ভয়ে জড়জড়িত গলায় বলল-
“আমি আছি। তোমার কাছেই আছি। কিচ্ছু হবে না তোমার। আমি এখুনি তোমাকে হসপিটালে নিয়ে যাবো। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। চলো।”
এই একটা বাক্যই যেন মিরার ভেতরে এতক্ষণ ধরে জমে থাকা বাঁধটাকে ভেঙে দিল। হঠাৎ সমস্ত শক্তি একত্র করে মিরা দুহাত বাড়িয়ে রায়ানের গলা আঁকড়ে ধরল।
এমনভাবে জড়িয়ে ধরল, যেন তাকে ছেড়ে দিলেই আবার কোনো অন্ধকার গহ্বরে তলিয়ে যাবে। তারপরই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, কেবল কাঁপছে মেয়েটার শরীর। তারপর সেই কাঁপুনি ভেঙে বুকফাটা কান্নায় পরিণত হলো। রায়ান এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। তারপর সেও মিরাকে নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরল। এক হাত মিরার মাথার পেছনে, অন্য হাত তার পিঠে। দুজনের কেউই কাউকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই।
-“রায়ান, আমার ভীষণ ভয় করছে। আমাদের বাচ্চা..!”
মিরার কথা রায়ানের বুকে বিধলো। সে মিরাকে আর শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল-
“কিচ্ছু হবে না। ভয় কিসের? আমি আছি তো। আমি তোমাদের কিচ্ছু হতে দেব না। শুধু সাহস রাখো মনে।”
রায়ান মিরার কপালে একটা ছোট্ট চুমু এঁকে দিয়ে তাকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল। মিরার প্রসব যন্ত্রণার শুরু হলো আলো তীব্র ভাবে। সে রায়ানের গলা কামড়ে ধরলো সেই হাড় কাঁপানো ব্যাথা নিবারণের জন্য। রায়ানের তাতে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। সে মিরাকে নিয়ে দ্রুত নিচে নেমে গাড়িতে বসালো। মিরার চিৎকার আর আযাহারিতে রায়ানের অন্তত যেন ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। রায়ান দ্রুত গাড়ি কোনোদিকে না ভাবে দ্রুততার সাথে গাড়ি ছুটালো। তার এক হাত স্টেয়ারিং এ আর অন্য হাত কখনো মিরার মাথায় তো কখনো তার পেটে।
-“আর পারছি না.. আর না..মেরে ফেলুন আমায়। আমি এই যন্ত্রণা নিয়ে পারছি না। আআআহহহ..মাআআ..!”
রায়ানের বুকের ভেতর চলতে থাকা ঝড়ের তীব্রতা মিরার এমন অসহনীয় কষ্ট দেখে তরতর করে বেড়েই যাচ্ছে। রায়ান মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে কেবল তাকে সাহস দিতে থাকলো-
“পারবে..আরেকটু সহ্য করো। তুমি আমার স্ট্রং বউ না? আমাদের বেবি ও তোমরা মতো স্ট্রং হবে দেখো। ওর জন্য নিজেকে সামলাতে হবে তোমার। আরেকটু ব্যাস.. আরেকটু।”
মিরা কষ্ট লাঘবের জন্য রায়ানের হাতে কখনো কামড় কখনো না বিঁধিয়ে দিচ্ছে। রায়ানের বড্ড ইচ্ছে করলো মিরার কষ্টের ভাগ নিতে। এভাবে সহধর্মিণীকে কষ্টে ছটফট করতে দেখা কোনো জুলুমের চেয়ে কম কিছু নয়। দুপুরে রাস্তায় যানজট বরাবরের মতোই বেশি। বাধ্য হয়ে সিগনালের গাড়ি থামাতে হলো। ভেতরের দমবন্ধ পরিবেশ ঠিক করতে রায়ান জানালার কাঁচ নামিয়ে দিল।
ভাগ্যের পরিহাস এমনি যে রায়ানের গাড়ির ঠিক পাশেই ছিল কিবরিয়া সরকারের (জ্যাকের বাবার) গাড়ি। যার ছেলেকে রায়ানের হাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হয়েছে। মিরার গলা চিড়ে বেরিয়ে আসা চিৎকার কানে যেতেই কিবরিয়া সরকারের নজরে পড়লো রায়ানের গাড়িটা। ছেলের মৃত্যুর প্রতিশোধে দগ্ধ পিতৃ হৃদয় হিংস্র হয়ে উঠলো। রায়ানের অবয়ব চোখে ভাসতেই তার রক্ত টগবগ করে ফুটতে শুরু করলো।
-“রা..য়ান, আআআ..! যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছি। আআহহহ্..! প্লিজ কিছু করুন।”
মিরার চিৎকারে রায়ানের বুক কাঁপছে।
-“চোখ খোলা রাখো..মিরাআআ.. কিপ ইউর আইস ওপেন..চোখ বন্ধ করবে না।”
-“আআআআহহ..আমি চেষ্টা করছি কিন্তু পারছি না আর। আমার ভয় করছে খুব।”
মিরা রায়ানের হাত আঁকড়ে ধরে মিনতির সুরে নিজের কথা বলে যেতে থাকলো।
-প্লিজ ভয় পেও না। আমি আছি তো। কিচ্ছু হবে না তোমার। শক্ত করে ধরে থাকো আমাকে।”
জ্যাম ছুটলে রায়ান আবারো দ্রুততার সাথে গাড়ি ছুটালো। কিবরিয়া সরকার ও তার ড্রাইভার কে নির্দেশনা দিলেন-
“ওই গাড়ির পিছু নাও।”
কিছু দূর যেতেই মিরার আওয়াজ কমে এলো। তার চোখৈর পাতা ক্লান্তিতে বন্ধ হয়ে আসছে। রায়ান মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ভাঙা গলায় বলল-
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮০ (২)
“আর একটু সোনা। আর একটু ধৈর্য ধরে নাও। সামনেই হসপিটাল। সব ঠিক হয়ে যাবে এখন। আমাদের হার মানলে চলবে না।”
রায়ান স্টেয়ারিং শক্ত করে ধরলো। হঠাৎ করেই একটা গাড়ি তাদের পিছু করছে মনে হলো রায়ানের তবে সেই দিকে মনোযোগ দেওয়ার সময় নেই এখন। গাড়ি দুটো ফ্লাই ওভারের উপরে উঠতেই কিবরিয়া সরকার তার ড্রাইভারকে আদেশের সুরে বললেন-
“সামনের কালো গাড়িটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দাও।”
