প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৬৪
বন্যা সিকদার
”আল্লাহ গো…
চিৎকারটা শোনা মাত্রই রুমের সবার হাসির শব্দ বাতাসের সাথে মিলিয়ে গেল। মুহূর্তে সবাই হুরমুড় করে রুম ছেড়ে সিড়ির দিকে দৌড়ে গেল। সিড়ির দোতলার কোণে এসে পৌঁছাতেই উজান একদম বরফ হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তার চোখের সামনে ঘোর অমানিশা নেমে এলো। নিচে মেঝেতে রক্তে ভেসে থাকা মেঝেতে লুটিয়ে পরে আছে মৌ।
একধারে মৌ’য়ের শরীর বেয়ে অঝোরে ব্লিডিং পড়ছে দেখে উজানে’র আত্ম শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। দুনিয়ার সমস্ত ভয় যেন এক মুহূর্তে এসে তার বুকটাকে চেপে ধরল। সে ঝড়ের গতিতে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মৌ’কে পরম আকুলতায় আঁকড়ে ধরল।
“পিচ্চি…!!
মৌ যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠল। সে বুকফাটা চিৎকার দিয়ে ডুকরে কাঁদতে লাগল। কিচেন রুম থেকে মৌসুমি চৌধুরী সহ পরিবারের সবাই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। মৌ’য়ের এই রক্তভেজা আশঙ্কাজনক অবস্থা দেখে এক মুহূর্তে সবার হাত-পা যেন বরফ হয়ে জমট বেঁধে গেল। মেহের চোখের পলকে এসে মৌ’য়ের পাশে হাঁটু মুড়ে বসে কেঁদে উঠল। উজান প্রচণ্ড ব্যাকুলতায় মৌ’কে বুক থেকে সরাতে চাইছিল না কিন্তু সামান্য ছোঁয়াতেই মৌ তীব্র যন্ত্রণায় কুকড়ে উঠছিল। সে শেষ শক্তি দিয়ে উজানে’র শার্টের কলার খামচে ধরে রুদ্ধকণ্ঠে কেঁদে উঠল।
”প্রফেসর সাহেব…আমার বাচ্চা?
“পিচ্চি। এই পিচ্চি কিভাবে পড়ে গেলে তুমি? তোমাকে তো বারবার বলেছিলাম সোফা থেকে এক পা-ও নড়বে না। কেন সরলে সেখান থেকে? আম্মু‚ তোমাকে বলেছিলাম না পিচ্চিকে দেখে রাখতে? এই পিচ্চি‚কথা বলো না। প্লিজ এমন করো না।
যখন উজানে’রা ওপর থেকে অনেকক্ষণ ধরে নিচে নামছিল না দেখে মৌ নিজেই সাবধানে উপরে যেতে চেয়েছিল কিন্তু সিঁড়ির মাঝপথেই ভারসাম্য হারিয়ে অসাবধানতাবশত হোঁচট খেয়ে নিচে পড়ে যায়। সে দু-হাত দিয়ে নিজের আট মাসের উঁচু পেটটা চেপে ধরে কাতরাচ্ছে। তার সেই মর্মন্তুদ চিৎকারে উজানে’র বুকের ভেতরটা প্রতিধ্বনি তুলে কেঁপে উঠছে।
“এই পিচ্চি একটু কথা বলো আমার সাথে। আমার যে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে‚ জান। ইফাত ফাস্ট গাড়ি বের কর। একটু ওয়েট করো জান‘ কিচ্ছু হতে দেব না তোমাকে। ইফাত‚ তাড়াতাড়ি কর না ভাই। আমার পিচ্চি যে যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছে।
“প্রফেসর সাহেব আমাদের বাচ্চা ঠিক আছে তো? ওর কষ্ট হচ্ছে‚ কিছু করুন প্লিজ। আমার বাচ্চাটাকে বাঁচান আপনি। ওর কিছু হলে আমি মা হয়ে কিভাবে সহ্য করবো।
“কিছু হবে না বেবির। সব ঠিক হয়ে যাবে৷ ভাইয়া তারাতাড়ি কর প্লিজ।
মেঝেতে ব্লিডিংয়ের পরিমাণ ক্রমেই বাড়তে লাগল। তা দেখে উজানে’র বুকের ভেতর জমানো ভয় আর প্যানিক শতগুণ বেড়ে গেল। এত সাবধানে আগলে রাখার পরও এই ভয়ংকর বিপদটা রোখা গেল না। ইফাত দৌড়ে গিয়ে গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করে এসে চিৎকার দিল। উজান এক মুহূর্ত কালক্ষেপণ না করে মৌ’কে সাবধানে পাঁজা কোলে তুলে দৌড়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল। যেতে যেতে মায়ের দিকে তাকিয়ে আকুল গলায় আওড়াল„
“আম্মু। আজ যদি আমার পিচ্চির কিচ্ছু একটা হয়ে যায়…তবে তোমরা তোমাদের এই ছেলেকেও চিরকালের জন্য হারাবে। গড ইট?
উজানে’র এই রুদ্রমূর্তি আর শেষ কথা শুনে মৌসুমি চৌধুরীর বুকটা হাহাকার করে উঠল। তিনি যদি তখন কিচেনে না গিয়ে সোফার পাশে বসে থাকতেন‚ তবে হয়তো এই সর্বনাশ হতো না! বিষাদ আর অপরাধবোধে তিনি ধসে পড়লেন। উজান মৌ’কে কোলে নিয়ে পেছনের সিটে শুইয়ে দিল এবং গাড়ি স্টার্ট নেওয়া হলো। কিন্তু মূল মহাসড়কে পৌঁছাতেই সামনে দীর্ঘ ট্রাফিক জ্যামে আটকে গেল গাড়ি। এদিকে মৌয়ের অবস্থা মিনিটেই অতি আশঙ্কাজনক হয়ে উঠছে। ব্লিডিংয়ে পুরো সিট ভিজে একাকার। মৌ’য়ের এই রক্তশূন্য‚ নিস্তেজ অবস্থা দেখে উজানে’র শক্ত হাত-পা বরফের মতো শীতল হয়ে এলো। কী করবে‚ মাথা কিছু কাজ করছে না।
মৌ যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে উজানে’র শার্টের শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রেখেছিল। উজান হাত ছাড়িয়ে ড্রাইভিং পজিশনে যেতে চাইলেই মৌ আকুলতায় কেঁদে উঠছে।
”প্র প্র প্রফেসর সাহেব। যাবেন না আমাকে একা ফেলে…প্লিজ। আমার কাছেই থাকুন না আপনি।
“আমি কোথাও যাচ্ছি না জান।
উজান আকুল হয়ে কপালে চুমু খেয়ে বলল‚ “গাড়ি যে ট্রাফিক জ্যামে আটকে গেছে। এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে হিতে বিপরীত হবে। তুমি একটু রিল্যাক্স হও‚ আমি দেখছি কী করা যায়।
”ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আমার…বাঁচব না আমি প্রফেসর সাহেব।
“জান‚ একটু ওয়েট করো। তোমার প্রফেসর সাহেব আছে তো তোমার পাশে।
মৌ ছেড়ে দিতে না চাইলেও উজান নিজেকে কোনো ক্রমে ছাড়িয়ে ঝড়ের বেগে দরজার বাইরে বের হয়ে এলো।
“ইফাত। তুই পেছনে গিয়ে বস‚ আমি ড্রাইভিং করব।
ইফাত চোখ বড় বড় করে তাকাল‚ “হোয়াট? এই পরিস্থিতিতে তুই প্যানিক নিয়ে ড্রাইভ করবি?? রিল্যাক্স ইয়ার‚ আমি করছি তো। জ্যামটা একটু ছাড়লেই আমি ফুল স্পিডে টান দেবো।
“নো। এতক্ষণ আমার পিচ্চি এই কষ্ট সহ্য করতে পারবে না। “তুই সরবি নাকি আমি তোকে টেনে সরাব?
অতঃপর ইফাত’কে পেছনে পাঠিয়ে উজান নিজেই ড্রাইভিং সিটে বসল। আরিয়ান অনবরত হসপিটালে ফোন করে ইমার্জেন্সি ওটি রেডি রাখতে বলছে। কিন্তু রাস্তা পরিষ্কার হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই দেখে উজান এক মুহূর্তের জন্য মাথা ঠাণ্ডা না করে‚ গাড়ি এক ঝটকায় ব্যাক করে উল্টো লেনে ঘুরিয়ে নিল। যেদিক দিয়ে শত শত গাড়ি হর্ন বাজিয়ে উল্টো দিক থেকে আসছে‚ উজান চরম ঝুঁকি নিয়ে সেই বিপরীত লেনেই গাড়ি ছুটাল দ্রুত গতিতে। রাস্তায় সাধারণ মানুষ আর ট্রাফিক পুলিশ হাঁ করে চেয়ে রইল কিন্তু কারো তোয়াক্কা না করে ড্রাইভিং করে গাড়ির অ্যাক্সিলেটরে পুরো চাপ দিয়ে রেসিং কারের মতো চালিয়ে হসপিটালের ইমার্জেন্সিতে এসে পৌঁছাল। যেহেতু আরিয়ান আগেই ডিন ও সার্জনদের সাথে কন্টাক্ট করেছিল‚ তাই স্ট্র্যাচার আর স্পেশাল মেডিক্যাল টিম রেডিই ছিল।
মৌ’কে দ্রুত স্ট্র্যাচারে তুলে অপারেশন থিয়েটারের দিকে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হতে লাগল। কিন্তু নিস্তেজ হতে থাকা মৌ এক সেকেন্ডের জন্যও উজানে’র রক্তমাখা হাতটা ছাড়তে রাজি নয়। মৌ’য়ের এই মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়া করুণ অবস্থা দেখে উজান নিজেকে আর সামলাতে পারল না। শক্ত মনের মানুষটা সিবিসি ল্যাবের করিডোরেই সবার সামনেই হু হু করে বাচ্চাদের মতো কেঁদে উঠল। উজান’কে অঝোরে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখে হসপিটালের ডক্টর‚ নার্স আর বাড়ির সবাই হতবিহ্বল হয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
অর্ধচেতনের মৌ পর্যন্ত উজানে’র এই রূপ দেখে অবিশ্বাস্য চোখে তাকাল। মানুষটা আজ তার জন্য অবুঝ শিশুর মতো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। মৌ কাঁপা কণ্ঠে ডাকল…..
“প্রফেসর সাহেব…
“পিচ্চি…প্লিজ। প্লিজ আমার বুকে ফিরে এসো।
উজান স্ট্র্যাচারে ঝুঁকে মৌ’য়ের দুই গালে পাগলের মতো চুমু খেতে খেতে কেঁদে উঠল‚ “আমি সত্যি সত্যি বাঁচব না তোমাকে ছাড়া! এই উজান চৌধুরী জীবনে অনেক কষ্ট সহ্য করেছে কিন্তু তোমাকে হারানোর কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই। আমি আমার সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। প্লিজ আমাকে এভাবে নিঃস্ব করে যেও না।
ইফাত এসে দ্রুত উজানে’র কাঁধে হাত রেখে বোঝাতে চাইল কিন্তু সে বুঝতে নারাজ।
“উজান ছাড় ভাবিকে। ইমিডিয়েটলি ওটিতে নিতে হবে। নয়তো ট্র্যাজিক কিছু….
ইফাত বাক্য শেষ করার আগেই উজান ইফাতে’র শার্টের কলার দুই হাতে চেপে ধরে দেয়ালে লেপ্টে গর্জে উঠল।
“নয়তো মানে? নয়তো মানে কী বোঝাতে চাইছিস তুই? আমার পিচ্চি সুস্থ হয়ে ফিরে আসবে। আমার বুকে এসে হাসবে। তাকে ছাড়া উজান চৌধুরী এক সেকেন্ডের জন্যও বাঁচবে না বুঝতে পেরেছিস তুই?
হেড গাইনোকোলজিস্ট ও সিনিয়র লেডি ডক্টর কড়া গলায় তাড়া দিতে লাগলেন।
“মিস্টার উজান‚ প্লিজ পেশেন্টকে ওটিতে নিতে দিন! টাইম ওয়েস্ট হচ্ছে।
কিন্তু উজান মৌ’কে একা কোনো ভাবেই ছাড়বে না। সে ওটির ভেতর ঢোকার জন্য চরম বিশৃঙ্খলা শুরু করল। হাত ছাড়াতে নারাজ সে। একজন ডক্টর অত্যন্ত কঠোর ও বিরক্ত গলায় বললেন‚
”সরি মিস্টার উজান চৌধুরী। পেশেন্টের সাথে এটেনডেন্ট হিসেবে আপনাকে কোনো ভাবেই ভেতরে যেতে দেওয়া সম্ভব নয়। আপনি বাইরেই এমন পাগলামি আর ভায়োলেন্স করছেন‚ ওটির ভেতর ঢুকলে কী করবেন?? আমরা এত বড় রিস্ক নিতে পারব না। রুলস অনুযায়ী ওটিতে কোনো রিলেটিভ এলাউড নয়।
ডক্টরের এই কড়া কথায় উজানে’র ভেতরের ক্ষোভ আর আতঙ্ক দ্বিগুণ বেড়ে গেল। সে আবার কিছু বলতে যাবে‚ ঠিক তখনই ভেতর থেকে একজন নার্স ভীতিজনক মুখে বেরিয়ে এসে বলল।
”ডক্টর পেশেন্টের অবস্থা অত্যন্ত ক্রিটিক্যাল। পালস ড্রপ করছে‚ উনার ঘন ঘন হেঁচকি উঠছে। মনে হচ্ছে পেশেন্টকে বাঁচানো পসিবল নয়।
’বাঁচানো পসিবল নয়’ এই বাক্যটি কানে আসা মাত্রই উজানে’র মাথার রগ যেন ফেটে গেল। সে নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে এক ঝটকায় ওই নার্সের গলা চেপে ধরে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল এবং হুংকার তুলল।
“বাঁচানো পসিবল নয় মানে কী? আজ যদি আমার পিচ্চির এক চুল পরিমাণ ক্ষতি হয়…তোদের এই পুরো হসপিটাল শুদ্ধ কবর দেব আমি। একদম পুড়িয়ে ছাই করে দেব সব।
ইফাত‚ আরিয়ান আর আরিফুল চৌধুরী মিলে অনেক কষ্টে উজান’কে টেনে নার্সের ওপর থেকে সরালেন। কিন্তু উজান’কে কোনো ভাবেই শান্ত করা যাচ্ছে না। উজানের এই অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণে হেড সার্জন চরম ক্ষিপ্ত ও রাগান্বিত হলেন। তিনি গম্ভীর ও মেজাজি গলায় বললেন‚
”দ্যাটস এনাফ‚ মিস্টার উজান চৌধুরী। অনেক হয়েছে, আর নয়। আমরা আপনার ওয়াইফের অপারেশন করব না। আপনি দয়া করে আপনার পেশেন্টকে অন্য কোথাও নিয়ে যান‚ উই আর নট টেকিং দিস কেস।
এই বলে ডক্টর ওটি রুমের দিকে পিঠ ফিরিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলেন। এবার উজান ছাড়া পরিবারের বাকি সবাই আরিয়ান‚ ইফাত‚ আরিফুল চৌধুরী উজানে’র ওপর চরম রেগে গেলেন। জীবনের এত বড় সংকটে কেন উজান এমন অবিবেচকের মতো পাগলামি করে সময় নষ্ট করছে? কিন্তু পরের মুহূর্তেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে উজান এক দৌড়ে গিয়ে ডক্টরের দুটো পা দুই হাতে আঁকড়ে ধরল।
যে উজান চৌধুরী কখনো কারো সামনে মাথা নোয়ায়নি‚ সেই উজান আজ মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসে একজন ডক্টরের পায়ে হাত দিয়ে শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠে আকুতি জানাল।
“সরি ডক্টর। আই অ্যাম রিয়েলি‚ রিয়েলি সো সরি। আমার অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে। প্লিজ‚ দোহাই আপনার‚ আমার পিচ্চিটাকে বাঁচান। আমি আর একটুও পাগলামি করব না। আমি ওই নার্সের পায়ে ধরে মাফ চাইব…তবুও আমার ওয়াইফকে বাঁচিয়ে দিন।
আমার কোনো সন্তানের দরকার নেই ডক্টর। আমার বেবিকে বাঁচাতে হবে না‚ লাগবে না আমার বেবি। আপনি শুধু আমার ওয়াইফ বাঁচিয়ে আমার বুকে ফিরিয়ে দিন। আমি কথা দিচ্ছি এক পাশে শান্ত হয়ে হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকব‚ বিন্দুমাত্র ডিস্টার্ব করব না। প্লিজ আমাকে শুধু সাথে যেতে দিন।
এতক্ষণ ডক্টর অত্যন্ত কঠিন থাকলেও একজন শক্ত সামর্থ্য পুরুষকে এভাবে হাত-পা ধরে শিশুর মতো অঝোর ধারায় কাঁদতে দেখে তাঁর মন এক নিমেষে গলে গেল। তা ছাড়া আরিয়ান চৌধুরী আর তার বাবা আরিফুল চৌধুরীও এসে ডক্টরের কাছে অনুনয়-বিনয় করলেন। ডক্টর এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে উজানে’র হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে নরম গলায় বললেন।
”মিস্টার চৌধুরী প্লিজ রিল্যাক্স হন। ওকে…আপনাকে স্পেশাল পারমিশন দেওয়া হচ্ছে ভেতরে যাওয়ার। কিন্তু আপনি যদি ভেতরে গিয়ে আবার হাইপার হয়ে যান।
“নো ডক্টর। আমি বিন্দুমাত্র রুড হব না। একদম প্রমিস। আপনি শুধু আমাকে ভেতরে যেতে দিন আর আমার পিচ্চিকে ভালোয় ভালোয় আমার বুকে ফিরিয়ে দিন…এছাড়া এই আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। এমনি আমার বেবিও লাগবে না। জাস্ট আমার ওয়াইফকে বাঁচান।
এরপর উজান’কে ওটিতে যেতে দেওয়া হলো। সে মৌ’য়ের কাছে যেতেই মৌ চমকে তাকাল। আজ পর্যন্ত সে কখনো দেখেনি বা শোনেনি যে সন্তান প্রসবের সময় স্বামীকে স্ত্রীর পাশে থাকতে দেওয়া হয়। উজান সোজা গিয়ে ঝুঁকে মৌ’য়ের সারামুখে অজস্র চুমু খেল। গাল‚মুখ‚ ঠোঁট কোথাও বাদ দিল না। সে শক্ত করে মৌ’য়ের হাত ধরে রেখে শান্ত গলায় বলল…
“আমি আছি‚ পিচ্চি।
ব্যাস‚ এতটুকু ভরসাই মৌ’য়ের প্রয়োজন ছিল। সে আজ ভিষণ ভয় পাচ্ছে নিজের জন্য নয়‚ বেবিটার জন্য। পড়ে গিয়ে পেটে বেশ আঘাত পেয়েছে সে‚ বেবিটা ঠিক আছে কিনা জানা নেই। যদি তার কিছু হয়ে যায়‚ সে কীভাবে সইবে? সে মন থেকে চায়‚ নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও বাচ্চাটাকে বাঁচাতে। হঠাৎ মৌ উজানে’র মুখের দিকে তাকাল। মানুষটার দিকে যেন তাকানো যাচ্ছে না‚ পুরো মুখ মলিন হয়ে আছে। মৌ ঠিকই বুঝতে পারছে‚ লোকটা ভেতরে ভেতরে কতটা কষ্ট পাচ্ছে। মৌ’য়ের চোখে-মুখেও ব্যথার ছাপ স্পষ্ট। সে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে শুধাল।
”প্রফেসর সাহেব…
উজান মৌ’য়ের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। মেয়েটার যন্ত্রণা সে হাড়হাড় অনুভব করতে পারছে। সে যদি আগে জানত বাবা-মা হতে গেলে তার পিচ্চি’কে এতটা কষ্ট পেতে হবে‚ তবে সে কখনোই এমনটা হতে দিত না। মানুষ তো বাচ্চা ছাড়াও দিব্যি বেঁচে থাকে‚ তারাও বেঁচে যেত। একটা সন্তানের জন্য সে তার স্ত্রীর কোনো ক্ষতি চায় না। উপরওয়ালার কাছে তার একটাই আকুতি‚ তার বাচ্চা না হলেও চলবে‚ শুধু তার পিচ্চি সুস্থভাবে বেঁচে থাকলেই হলো।
“বলো…ওয়াইফি।
”আমি হারিয়ে গেলে ভুলে যাবেন আমায়?
মৌ’য়ের চোখ তখন অশ্রুতে ছলছল করছে। মেয়েটার মনের অবস্থা উজান ঠিকই বুঝতে পারছে কিন্তু এই যন্ত্রণা কমানোর কোনো ওষুধ তার জানা নেই। সে শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল।
“তুমি আমার অস্তিত্বে মুখস্থ থাকা সূরা ফাতিহা‚ যুগ কেটে গেলেও তোমাকে ভুলে যাওয়া অসম্ভব।
তার কথায় মৌ কিছুটা স্বস্তি পেল‚ তবুও মন সায় দিল না। সে আবারও বলল‚ “প্রফেসর সাহেব আজ যদি আমার কিছু হয়ে যায়…আপনি কখনো অন্য কারও হবেন না প্লিজ? আমি আপনাকে অন্য কারও সাথে ভাগ করতে পারব না। আপনি শুধুই আমার।
উজান রাগী দৃষ্টিতে তাকাল। মেয়েটার গালে ঠাস ঠাস করে দুটো চড় বসিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে তার। কিন্তু সে অসুস্থ বলে তা পারল না। মেয়েটা কীভাবে ভাবল উজান তাকে ভুলে অন্য কাউকে আপন করে নেবে? সে কি এতটাই মেয়ে লোভী‚ এতটাই খারাপ? উজান কঠোর গলায় বলল‚
“সুস্থ হয়ে বাসায় চলো‚ তারপর এই কথার পানিশমেন্ট দেব।
এরপর আর কিছু বলল না উজান। মৌ তার কথায় মৃদু হাসল। তবুও আরও কিছু বলতে ইচ্ছে হলো তার। উজান বারণ করলেও মৌ শুনল না।
“প্রফেসর সাহেব‚ আমাদের বাচ্চা ঠিক থাকবে তো? ওকে কি আমি বুকে জড়িয়ে নিতে পারব?
“আমার বেবি চাই না। সে যদি আমাদের বুকে নাও আসে‚ তবুও আমার কোনো আক্ষেপ থাকবে না। আমার শুধু আমার এই প্রিয় ওয়াইফিকে চাই‚ আর কিচ্ছু না।
মৌ আর কিছু বলার সাহস বা শক্তি পেল না। মানুষটা তাকে এত ভালোবাসে‚ তা জানা ছিল না। এই জন্যই হয়তো বলা হয়…পুরুষের ভালোবাসার ক্ষমতা ভিন্ন। সে তার নারীর জন্য কেবল জীবন নয়‚ যেকোনো কিছু করতে পারে।
দীর্ঘক্ষণ পর অপারেশন শেষ হলো। উজানে’র ঘর আলো করে এলো এক ছোট্ট কন্যাসন্তান। কিন্তু উজান খুশি নয়‚ কারণ মৌ এখনো অজ্ঞান হয়ে আছে। সেটা নিয়ে তার ভয়ের শেষ নেই। এদিকে উজান’কে অনেকবার বেবিটিকে কোলে নিতে বলা হলেও সে নেয়নি‚ এমনকি একনজরের জন্যও দেখেনি। এরপর মৌ’কে কেবিনে শিফট করা হলো। তার ঘণ্টানেক পর মৌ’য়ের জ্ঞান ফিরল। চোখ খুলেই প্রথমে উজান’কে দেখতে পেল সে। সাথে সাথে উজান মৌ’কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। মেয়েটাকে নিয়ে বড় ভয়ে ছিল সে‚ অবশেষে তার পিচ্চি সুস্থ আছে। মৌ অনেক কষ্টে হাত বাড়িয়ে উজানে’র মাথায় রাখল। উজান সেই হাত চেপে ধরে শত চুমু খেল। এরই মাঝে বেবিকে কোলে নিয়ে মেহের কেবিনে ঢুকল। এসেই অভিযোগের সুরে বলল….
“মৌ‚ জানিস? ভাইয়া আমাদের বুড়িকে কোলেই নেয়নি। কোলে নেওয়া তো দূরের কথা‚ একপলক দেখেওনি। তুই বল‚ এটা কি ভাইয়া ঠিক করেছে?
মৌ উজানে’র দিকে কটমট করে তাকাল। শক্ত গলায় বলে‚ “আপনি আমার মেয়েকে কোলে নেননি? তার মানে আপনি চাননি আমার মেয়ে হোক? সরুন এখান থেকে‚ আপনাকে দেখতে চাই না আমি।
মৌ অভিমানী স্বরে বলল। তার কথায় উজান হেসে ফেলল। নিচু হয়ে সবার সামনেই আবার মৌ’য়ের ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ায়। তারপর মেহেরে’র কোলে থাকা অবস্থায় বেবিটির গলায় পকেট থেকে বের করে সেই রোহানে’র লকেটটি পরিয়ে দিল। এবার সে নিজের মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে আওড়াল‚
“আমার নয়‚ বলো আমাদের। আমাদের ঘরে নতুন ফুলের জন্ম হয়েছে।
এই বলে উজান মেয়ের কপালে চুমু খেল। মেয়েটি বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে। উজানে’র মুখে ‘ফুল’ শব্দটা শুনে মৌ’য়ের বুকটা কেপে উঠল। তার কোলে কন্যাসন্তান এসেছে শুনলে রোহান নিশ্চয়ই অনেক খুশি হতো। কিন্তু মানুষটা আজ আর নেই…ঠিক তখনই উজানে’র তৃপ্তির হাসি মুখে ফুটে উঠল। সে বেবির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে আওরায়—
“আম্মা গো ও আম্মা তোমাকে পাওয়ার জন্য অনেক কষ্ট করেছে তোমার মাম্মাহ্। দেখো তার চোখে মুখে আজ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ হাসি বিচরণ করছে। এই মাম্মাহ্ কে কখনো হার্ড করো না। নয়তো তোমার পাপ্পা সহ্য করতে পারবে না।
উজান কথাটা শেষ করতেই মেয়েটা খিলখিল করে হেসে উঠল। তা দেখে উজানে’র মনটাও তৃপ্তিতে ভরে গেল। কাল পর্যন্ত যে ছিল শুধু এক মায়ের দায়িত্ববান ছেলে‚ স্ত্রীর দায়িত্ববান স্বামী আর বড় ভাইয়ের আদরের ভাই আজ সে একজন বাবা। মৌ দূর থেকে বাবা-মেয়ের এই ভালোবাসার দৃশ্য দেখছিল। যে কষ্ট গুলো কয়েক ঘণ্টা আগেও চরম যন্ত্রণাদায়ক ছিল‚ তা এখন পরম ভালোবাসায় রূপ নিচ্ছে। উজান এগিয়ে এসে মৌ’য়ের কোলে মেয়েকে দিল। মৌ তাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে মন ভরে আদর করল।
হঠাৎ উজান লক্ষ্য করল কেবিনের বাইরে তুবা দাঁড়িয়ে আছে। সে ভেতরে আসার সাহস পাচ্ছে না। উজান নিজেই এগিয়ে গিয়ে তুবা’কে ভেতরে নিয়ে এলো। তুবা’কে দেখে মৌ মৃদু হাসল এবং তাকে কাছে ডাকল। তুবাও এগিয়ে এলো। মৌ নিজে উঠে মেয়েকে তুবা’র কোলে তুলে দিতে পারছে না দেখে সে উজান’কে বলল তুবা’র কোলে দিতে। তুবা পুঁচকে বাচ্চাটিকে কোলে নিতে কিছুটা ইতস্তত বোধ করছিল‚ তবুও উজান তার কোলে মেয়েকে তুলে দিয়ে হালকা হেসে বলল।
“শোনো ভাবি‚ তুমি তো তোমার মেয়েকে পেয়ে গেছো আর আমি পেয়েছি আমার বউকে। এবার খুশি তো? জাস্ট কয়েকটা দিন আম্মা তার মাম্মাহ্-র সাথে থাকবে‘ তারপর যাদের মেয়ে তাদের কাছে বুঝিয়ে দেব। এরপর আমি আমার বউকে নিয়ে রোমান্স করব।
”প্রফেসর সাহেব…!! মৌ চোখ রাঙাল।
“বউ‚ রাগ করছো কেন? যা সত্যি‚ সেটাই তো বললাম। আমার এই আম্মা’টার জন্য তো অনেক সহ্য করেছি‚ এবার তো কিছু বলতে দেবে।
”বেহায়া লোক‚ চুপ করুন আপনি।
“ওকে ফাইন‚ চুপ করে গেলাম।
মেহের খুশিতে গদগদ হয়ে এগিয়ে এলো। তুবা’র পাশে দাঁড়িয়ে হঠাৎ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল। “ভাইয়া‚ আমাদের বুড়ির কী নাম রাখা হবে? মৌ‚ তুই কি কোনো নাম ঠিক করেছিস?
মৌ মাথা নেড়ে ‘না’ সূচক সায় দিল। এরই মাঝে আরিফুল চৌধুরী‚ আকবর চৌধুরী‚ মৌসুমি চৌধুরী এবং ইমরোজা চৌধুরী কেবিনে এসে হাজির হলেন। তারা তাদের আদরের নাতনিকে কোলে নেওয়ার জন্য মেতে উঠলেন। সেই আনন্দের মাঝেই সবার উদ্দেশ্যে উজান উচ্চারণ করল।
“উজান চৌধুরীর মেয়ের নাম হবে ‘রিহা চৌধুরী’। আমার কলিজার টুকরো।
’রিহা চৌধুরী’ নামটা শুনে মৌ চমকে তাকাল। কারণ‚ এই নামটা ছিল রোহানে’র ভীষণ পছন্দের। সে তার হবু মেয়ের নাম ‘রিহা’ রাখতে চেয়েছিল। আর উজান আজ তার সেই বন্ধুর পছন্দের নামটাই নিজের মেয়ের জন্য রেখে দিল। মৌ’য়ের ভাবনার ছেদ ঘটাল কানের কাছে ভেসে আসা একটি শীতল কণ্ঠস্বর।
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৬৩
“আমি চাই না রোহান তালুকদারের নামটি আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাক কিংবা ওর পছন্দ গুলো আমরা ভুলে যাই। আমার পিচ্চিকে সে পায়নি ঠিকই‚ তবে তার বাকি সব ইচ্ছে আর স্বপ্ন আমি পূরণ করব‚ ইনশাআল্লাহ!
মৌ মুচকি হাসল। মানুষটা যে কোন ধাতুতে গড়া‚ তা সে বুঝতে পারে না। তবে এই মানুষটাকে নিজের জীবনে পেয়ে সে সত্যি ভীষণ ভাগ্যবতী।
