Home এমপির অবাধ্য বউ এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৫২

এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৫২

এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৫২
সুহাসিনী

প্রেমের গাড়ি এসে থামলো তাঁদের বাড়ির সামনে। এর মধ্যেই ধরণীতে নেমে এসেছে তুমুল বর্ষণ। এর মধ্যেই প্রেম সাঈদ এর নাম্বার এ অনেকবার চেষ্টা করেছে,কিন্তু মোবাইল বন্ধ বলছে। সবাই গাড়ি থেকে নেমে কোনমতে বাড়িতে ঢুকলো। আয়েশা শান্তর সাথে আগেই চলে এসেছে। তাঁদের প্যাকিং করতে হবে। কাল আয়েশা আর শান্তর ফ্লাইট আছে। আয়েশার থেরাপির সময় হয়ে গেছে। এটায় বোধহয় লাস্ট থেরাপি। এটাতে আয়েশা ঠিক না হলে আর কোনদিন ঠিক হতে পারবেনা।
প্রেম,রাহি,বৃষ্টি একসাথে বাড়িতে ঢুকলে সবাই চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে। যেন সবাই ভুত দেখার মত চমকে গেছে। আফরোজা খান এগিয়ে এলো।বলল,

“আমাদের রাহি কোনটা?”
রাহি আর বৃষ্টি দুজনের দিকে দুজন তাকালো।
হঠাৎ রাহি কাউকে কিছু না বলে নিজের রুমে চলে গেলো গম্ভীর মুখে।প্রেম ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রাহির চলে যাওয়ার দিকে।
আমজাদ খান বৃষ্টিকে বললো,
“আচ্ছা মা,তুমি কি সত্যিই সাঈদের বউ?”
বৃষ্টি মিনমিনে স্বরে বলল,
“জ্বী আঙ্কেল।”
প্রেম কথা না বাড়িয়ে বৃষ্টিকে রুম ঠিক করে দিতে বলে নিজের ঘরে চলে গেলো।
বৃষ্টিকে রুমের ব্যবস্থা করে দিলে সে ড্রেস চেঞ্জ করে নেয়।আফরোজা খান তাকে রাহির একটা চুড়িদার দিয়ে গিয়েছিল। সেটায় পড়েছে সে।যদিও একটু টাইট এবং একটু খাটো হয়েছে তবুও সে মানিয়ে নিয়েছে।
এতো ভারী বর্ষণে চৌধুরী বাড়ি থেকেও কেউ নিতে আসতে পারছে না তাকে।আজকের রাত টা এখানেই থাকতে বলে দিয়েছেন তার শাশুড়ি।

প্রেম রুমে গিয়ে দেখলো রাহি বিছানা হাঁটুতে মুখ গুঁজে নিঃশ্চুপ বসে কি যেনো ভাবছে।
প্রেম হঠাৎ গম্ভীর স্বরে বলল,
“কি ভাবছো? তোমার কোনো বোন ছিল কিনা এটায় ভাবছো?”
রাহি তড়িৎ গতিতে মাথা তুলে তাকালো।বলল,
“ন..না তা ভাবতে যাবো কেনো, এমনিই বসে আছি।”
“তাহলে ড্রেসটা চেঞ্জ করে এসে বসো।নাকি তুমি চাইছো আমি চেঞ্জ করিয়ে দেয়।”
শেষের কথাটা অন্য সুরে বলল প্রেম।রাহি উঠে নিজের ড্রেস নিয়ে ওয়াশরুমে যেতে যেতে বিড়বিড়লো,
“অসভ্য লোক একটা।”
প্রায় দশ মিনিট পর রাহি ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে সোজা বৃষ্টির রুমে ঢুকলো। দরজা বন্ধ করে বৃষ্টির পাশে গিয়ে বসলো সে বৃষ্টির বিছানায় বসা ছিলো। এর পর রাহি বৃষ্টির পরিচয় জানতে চাইলে বৃষ্টি সব বললো। সব শুনার পর রাহি প্রশ্ন করলো,

“তোমার কি ছোট বেলার কথা মনে আছে? এই ধরো ক্লাস প্লে নার্সারির কথা?”
বৃষ্টি কিছুটা ভাবুক হয়ে বলল,
“না তেমন কিছু তো মনে পড়ে না। আসলে বাবা বলেছে ছোটবেলায় নাকি আমার নিমোনিয়া হয়েছিল তাই আগের কথা ভালোভাবে মনে নেই।”
রাহি হঠাৎ বৃষ্টিকে জড়িয়ে ধরল সর্বশক্তি দিয়ে। বৃষ্টি খানিকটা অবাক হলো বটে তবে রাহিকে সরিয়ে দিল না। সেও রাহিকে আগলে নিল নিজের মাঝে।তার কেমন একটা শান্তি শান্তি লাগছে।রাহিকে বড্ড নিজের মনে হচ্ছে।রাহি বৃষ্টির আড়ালে চোখের পানি মুছে বললো,
“আমার শশুরকে কি তুমি আগে কখনো কোথাও দেখেছিলে বা তোমার তাকে চেনা চেনা মনে হয়েছে এমন?”
“নাহ্,কেনো?”
“এমনি”
কিছুক্ষণ নিঃশ্চুপ থেকে বৃষ্টি বললো,
“তোমার স্বামী তোমাকে অনেক ভালোবাসে তাই না?”
রাহির চোখ মুখ হঠাৎ শক্ত হয়ে গেল। পর মুহূর্তেই রহস্যময় হেসে বলল,

“হয়তো বাসে।তুমি বুঝলে কি করে?”
“তোমার প্রতি সে অনেক কেয়ারিং এটুকু এখানে আসতে আসতেই বুঝে গেছি।”
রাহি মুচকি হাসলো। শান্ত কণ্ঠে বললো,
“আমার উনি উনার মতোই, গায়ের রঙ আমার থেকেও ফর্সা, যার জন্য আমার হিংসে হয়।যদি অন্য কেউ নজর দেই এই ভয়ে। চুলগুলো বেশ পরিপাটি। চোখজোড়ায় অসম্ভব মায়া, ঠোঁট জোড়া হালকা গোলাপী,কণ্ঠ শুনলেই আমার হৃদয়ে শীতল হাওয়া বয়ে যায়। আর অসম্ভব রাগী,সব মিলিয়ে আমাকে অনেক ভালোবাসে।”
বৃষ্টির অপলক তাকিয়ে রাহির মুখ থেকে তার ভালোবাসার মানুষের বর্ণনা শুনছে। ভালোবাসলেই বোধহয় একজনের এতো সুন্দর করে বর্ণনা করা যায়। রাহি বললো,
“এটায় আমার এমপি সাহেব।এবার বলতো তুমি কি করে ওই কাইল্লা পাডার পাল্লায় পড়লে?”
বৃষ্টি ভ্রু কুঁচকে বলল,

“কাইল্লা পাডা মানে?”
“মানে তোমার জামাই,এখন বলো উনি তোমায় ভালোবাসে না?”
বৃষ্টি একটা হতাশার নিঃশ্বাস ফেললো।সে রাহিকে তাদের বিয়ের সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। এরপর রাহির দিকে তাকিয়ে মলিন হেঁসে বললো,
“উনি হয়তো ওইদিন আমাকে তুমি ভেবেই আমাদের বাড়িতে গিয়েছিল।কিন্তু ভাগ্য আমাদের অন্য দিকে নিয়ে গেলো। যায় বলো,তুমি কিন্তু খুব লাকী।”
রাহি বুঝলো বৃষ্টি সুখী নয়।মুহূর্তেই তার চোখ মুখে কেমন পরিবর্তন লক্ষ করা গেলো। হঠাৎ উঠে কিছু না বলেই চলে যেতে নিলে বৃষ্টি বললো,
“হঠাৎ কোথায় যাচ্ছ?”
গম্ভীর কন্ঠে উত্তর করলো রাহি,
“কারো সুখ কেড়ে নেওয়ার শাস্তি দিতে।”
বৃষ্টি কিছুই বুঝলো না রাহির কথা।রাহি চলে গেলো।

প্রেম মনোযোগ দিয়ে টেবিলে বসে কি যেনো লিখছে।হঠাৎ হন্তদন্ত পায়ে রাহি ঢুকলো রুমে।রাহিকে দেখে প্রেম ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে লেখা থামিয়ে উঠে গেলো টেবিল থেকে।
রাহি বিছানায় বসতে যাবে অমনি প্রেম রাহিকে টেনে নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে গমগমে স্বরে বলল,
“এতদিন তো অসুস্থতার জন্য বেঁচে গেছো। আজ তো এতো তাড়াতাড়ি বিছানায় গেলে চলবে না।বিছানায় আমাকে সাথে নিয়ে যেতে হবে বেগমজান।”
প্রেমের এরূপ কথায় রাহির গাল দুটো লাল হয়ে গেলো।কথা ঘোরাতে কোনো টপিক না পেয়ে বললো,
“আ.. আমি তো খাটো,তাহলে আপনি আমাকে মেনে নিলেন কেনো?”
“মেনে নেয় নি তো।”
রাহি খানিক ভ্রু কুচকাল।প্রেম বললো,
“তবে আমার মতে বউ হিসাবে খাটো মেয়েরাই পারফেক্ট।”
“কেনো?”
“বিকজ বিপদ যত ছোট হবে ততই মঙ্গল।”
রাহি প্রেমের কথার মানে বুঝতে পেরে এবার ক্ষেপে গেলো।
“আমি বিপদ?আপনি আস্ত একটা পাঠা। আপনি খাটাশ,আপনি…
আর কিছু বলতে পারল না রাহি।তার আগেই প্রেম তাকে টেনে তার ঠোঁট জোড়া দখলে নিয়ে নিয়েছে। রাহি নিজেকে সামলাতে প্রেমের কাধ খামচে ধরলো।

সাঈদ গাড়িতে বসেই রফিক সাহেবের দেওয়া চিঠি পড়তে শুরু করলো, রফিক সাহেব চিঠিতে লিখেছেন,
–‘ আমি জানি বাবা তোমার মনে অনেক প্রশ্ন।সবার প্রথম তোমাকে একটা সত্যি কথা বলি। বৃষ্টি আমার নিজের মেয়ে না।ওকে আমি জঙ্গলের একটা পোড়া বাড়িতে কুড়িয়ে পেয়েছি। ওর তখন হয়তো বয়স সাত কি আট হবে।একটা লোক সন্ধ্যা বেলা ওই জঙ্গলের মধ্য ওর সাথে খারাপ কিছু করতে চাইছিল কিন্তু আমি পৌঁছে যাওয়ায় লোকটা পালিয়ে যায়।ভয়ে মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। আমি সেখানে আমার স্কুলের একটা ট্রেনিংয়ে গিয়েছিলাম। সন্ধ্যায় ঘুরতে বের হয়ে আমি এই ঘটনার সম্মুখীন হই।তারপর ওকে আমি আমার সাথে করে বাড়িতে নিয়ে আসি। ওর গলায় একটা লকেট ছিল।

ওই লকেট দুটো মেয়ের ছবি ছিল। দুটো মেয়ে দেখতে প্রায় একই রকম ছিল। একটা মেয়ে বয়সে হয়তো একটু বড় ছিল আর একটা মেয়ে বয়সে ছোট ছিল। যে মেয়েটা বড়ো ছিল সেই ছবির নিচে নাম লেখা ছিল বৃষ্টি আর যে মেয়েটা ছোট ছিল সেই ছবি নিচে নাম লেখা ছিল রাহি। তাই আমি ওর নাম রাখি বৃষ্টি। ওর সম্পর্কে আমি আর কিছুই জানি না। ও এসব সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত কিছুই জানেনা। আগের কোন কথা ওর মনে নেই। আগের কোন কিছু মনে করতে গেলে ওর মাথায় প্রচন্ড যন্ত্রণা হয়।

এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৫১

তাই ওকে কোনো প্রেশার দেওয়া হয় না।তোমার কাছে আমার শেষ অনুরোধ, তুমি আমার মেয়েটাকে দেখে রেখো বাবা। ও এখনও এই কুলষিত দুনিয়া সম্পর্কে অবগত না।এই পর্যন্ত আমার সহজ সরল মেয়েটা অনেক কষ্ট সহ্য করেছে। ওকে তুমি আর কষ্ট দিও না।তোমাকে বিশ্বাস করে তোমার হাতে আমার অমূল্য সম্পদ তুলে দিলাম।’

এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৫৩