Home ফিরে গেছে কত আলো ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৬২

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৬২

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৬২
শানজানা আলম

অথৈ এর বাসায় এহসানের মা এসেছেন। এহসান সকালে নিয়ে এসে বাসায় মাকে রেখে অফিসে গেছে।
অথৈ ইতস্তত করছে, একটু দূরে দূরেই সরে থাকছে।
আন্টি কি লাগবে, বলে পানি, ফ্রেঞ্চ টোস্ট এগিয়ে দিলো। মসলা চা বানিয়ে এনে দিলো। আবার কিচেনে ঢুকে গেল।
এহসানের মা বললেন, অথৈ মা, এদিকে আসো, আমার কাছে বসো। কাজ পরে কইরো।
অথৈ কাছে এসে বসলো।
এহসানের মা বললেন, আমার ছেলে এতদিন আমাকে নিয়ে আসে নাই, কেন জানো, সে বুঝছে, মা আসলে যদি বউয়ের সাথে ভেজাল করে! ঠিক না?
অথৈ বলল, আন্টি, আমি বুঝছি আপনি রাগ করে আছেন। তাই আসছেন না৷

-রাগ নাইরে মা। রাগ করব কেন, একটা ভয় ছিল। ভয় দূরে সরিয়ে দিলাম। মানুষের কথা আর কয়দিন
আমার ছেলের খুশি সবার আগে। তোমাকে নিয়ে আসার পরে, আমার এহসান সব সময় ঝলমল করে। সেটা আমি দেখি না মনে করছ! আমার ছেলেকে এত খুশি দেখে আমি শুকরিয়া পড়ি মনে মনে। তুমি তার মনের মতন বউ।
অথৈ লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল।
এহসানের মা একজোড়া গোলাপ বালা অথৈ এর হাতে পরিয়ে দিলেন।
অথৈ হাত দেখে বলল, আন্টি, এত ভারী চুড়ি!
-শোনো, এইটা আমার শাশুড়ী দিছিলেন আমারে।
সনাতন সোনা, দুইটায় চারভরী আছে। বড় বউকে দিছি হারটা। এহসানের বউয়ের জন্য এই বালা জোড়া রাখছিলাম। কেন যেন দেওয়া হয় নাই। আসলে এইটা আল্লাহর ইশারা।
তোমার আব্বার সাথে কথা বলি, দেখি তাদের রাগ কমে কিনা- এহসানের মা বললেন।
অথৈ ইতস্তত করে বলল, আব্বা আম্মার রাগ কমে নি।
-না কমলেও তাদের তো জানতে হবে আমরা তোমাকে নিয়ে বাড়ি যাচ্ছি। আমি চাই সবাই জানুক, আসল পরিস্থিতি জানুক। ফিসফাস করার চাইতে জানিয়ে দেওয়া ভালো, তাই না?
অথৈ বলল, আচ্ছা করেন ফোন!
এহসানের মা সন্ধ্যার দিকে ফোন করলেন……

দুইবার ফোন করার পরে ফোন রিসিভ করা হলো।
হ্যালো- ভারী স্বরে বললেন ঐশির বাবা। ফোন রিসিভ করার ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু যতই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, বর্তমানে তার ছোট মেয়ের শাশুড়ি, কোনো জরুরি বিষয়ও হতে পারে। পারেন না চাইলেও এড়িয়ে যেতে।
-আসসালামু আলাইকুম ভাই, কেমন আছেন?- এহসানের মা জানতে চাইলেন।
-আছি আর কি, আল্লাহ তায়ালা যেমন রেখেছেন, – আপনি কেমন আছেন- অথৈ এর বাবা ভদ্রতা করে জানতে চাইলেন।

-ভালো আছি, খুব ভালো আছি। অথৈ মামনির মতন সোনা মেয়ে যার ঘর আলো করে আছে, ভালো না থেকে উপায় আছে। আলহামদুলিল্লাহ।
অথৈ এর বাবার একবার মনে হলো জানতে চান, মেয়ে কেমন আছেন, তবে তিনি জানতে চাইলেন না। তার মেয়ে যে অন্যায় করেছে, সেটা মেনে নেওয়া সহজ কাজ না।
-হুম- অল্প করে বললেন তিনি।
এহসানের মা ভণিতা না করে বললেন, ভাইসাহেব, বলছিলাম, আর কত মন খারাপ করে থাকবেন। ওরা সংসার করতেছে, দুজনে মাশআল্লাহ ভালো আছে, অথৈ নিজের সংসার সাজিয়ে নিয়েছে।
অথৈ এর বাবার বলতে মন চাইল, সংসার তো ঐশিই সাজিয়েছিল, সেটা দখল নিয়েছে পাঁজি মেয়েটা।
তিনি বললেন, সুখে আছে, ভালো কথা। কিন্তু এই সুখের জন্য আমার আরেকটা মেয়ে কষ্ট পাচ্ছে। তার সংসার ভাঙা হইছে, সেটা তো মেনে নেওয়া সহজ কাজ নয়।

-ভাই সাহেব, একটু ভুল বললেন, আপনার বড় মেয়ে কিন্তু আমার ছেলের সাথে থাকতে চায় নি, সে নিজের ইচ্ছায় চলে গেছে। আমার ছেলের জীবনটা একদম যা তা করে দিয়ে গেছে। অথৈ মা মণিও তো আপনারই মেয়ে, আপনি তো তাকে জানেন। সে যেভাবে আমার ছেলেকে গুছিয়ে নিয়েছে, আমি সারাজীবন আল্লাহর কাছে হাত তুলে দোয়া করব।
এখন আসল কথায় আসি, আমরা তো গ্রামে আসতেছি, এই ঘটনা কতদিন আর লুকিয়ে রাখা যাবে। সবাইকে সব জানিয়ে দেব একটা ছোট অনুষ্ঠান করে।
এখন আমার ইচ্ছা, আপনারাও আসবেন, ওদের দোয়া করে যাবেন।
– এটা হয় না আপা। আমার একটা মেয়েকে দুঃখী করে আরেকজনকে আমি সুখি হওয়ার দোয়া করতে পারব না।

-দেখেন ভাই, আপনাদের সাথে ঝগড়াঝাটি বা মন কালাকালি করার মতন আমার কোনো ইচ্ছা নাই। আপনি যেটা ভালো মনে করেন, করবেন। কিন্তু সবার জীবন সহজ হয় না। সংসারে অনেক বাঁকা ঘটনা ঘটে। আমার দুঃসম্পর্কের এক চাচার বিয়ে হইছিল, তার আপন নানীর চাচাতো সৎবোনের সাথে। তাছাড়া, এখানে তো কোনো ভুল হয় নাই। আপনার এক মেয়ে নিজের ইচ্ছায় চলে গেছে, আরেক মেয়ে নিজের ইচ্ছাতেই আসছে, কেউ ই তাদের জোর করে নাই। ধর্ম মতেও কোনো সমস্যা নাই, বাকি থাকল সমাজ, ওরা ভালো থাকলে আমাদের কি সমস্যা। আর শোনের, আপনার বড় মেয়েকে দেখে শুনে তার পছন্দ মত বিয়ে দেন, সব ঠিক হয়ে যাবে।

-দেখেন, এখানে আপনি যত যাই বলেন, আসল দোষ এহসানের৷ সে অথৈকে পছন্দ করত, সেটা আগে বলত, ঐশিকে বিয়ে করার কি দরকার ছিল!
-ভাই, এত কিছু আপনাকে বোঝানো যাবে না। সহজ করে বলি, আমি ওদের নিয়ে গ্রামে যাইতেছি। অনুষ্ঠান করতেছি। নন্দীপুরে আমার ভাইজানের বাসায়ও আসব। আমার অনুরোধ, আপনি ওদের দোয়া করে যাবেন। আর কখনো আপনাদের কাছে কিছুই চাইব না।
-দেখেন, এই মুহুর্তে আমার পক্ষে আসা সম্ভব না। কারন আমার বড় মেয়ে বাসায় আছে। আপনি যা ভালো মনে করছেন, করেন।

-ঠিক আছে, আপনি আরেকটু চিন্তা করেন। ভাবনা চিন্তা করে আমাকে ফোন দিয়েন। আপনার ফোনের অপেক্ষায় থাকব। একটা ঘটনা ঘটে গেছে, সেটা মানিয়ে নেওয়া বড়দের দায়িত্ব। এই ছেলে মেয়েই বুড়ো বয়সের লাঠি, তাদের সাথে এত ভাব দেখিয়ে তো লাভ নাই। আর একটা কথা, আপনি আপনার মেয়েদের চেনেন নাই, আপনার বড় মেয়েকেও চেনেন নাই। তবে ওর জন্য আমার কোনো অখুশি নাই, দোয়া করি, তারি ভালো বিয়ে শাদি হোক।
এহসানের মা ফোন রাখলেন। অথৈ উৎসাহী চোখে তাকালো। এহসানের মা বললেন, তোমার বাবা মা যদি না মানে, আমিই তোমার বাবা মা। মনে করো, তোমার সব আবদার আমার কাছে করবা। মনে থাকবে? মন শক্ত করো। তাদের হয়তো আরো সময় লাগবে।
অথৈ মাথা নিচু করে রইল, নিশঃব্দে তার চোখ থেকে পানি পড়ছিল।
এহসান এসে দেখল, অথৈ কে নিয়ে মা বসে আছেন।
অথৈ এর মুখ অন্ধকার দেখে এহসান জিজ্ঞেস করল কি
হয়েছল। মায়ের কাছে পুরোটা শুনে বলল, বলার দরকার ছিল, বলেছ, আর কিছু বলার দরকার নেই। কাল রওনা হবো, আল্লাহ ভরসা।

এহসানের মা উঠতে উঠতে বললেন, ওর মন খারাপ। দেখ ঠিক হয় কিনা। মা ঘরে ঢুকে যেতেই এহসান অথৈ এর পাশে বসে গালে আলতো করে হাত বুলিয়ে বলল, মন বেশি খারাপ?
অথৈ কাঁদছিল। এহসান আলতো করে অথৈ এর ঠোঁটে চুমু খেল। অথৈ থামল না৷ চোখ মুছতে লাগল।
এহসান অথৈ এর মাথাটা নিজের কাঁধে টেনে নিয়ে বলল, এই সময় থাকবে না অথৈ, সব ঠিক হয়ে যাবে।
অথৈ ফোপাঁতে ফোঁপাতে বলল, কিছু ঠিক হবে না। আমি কি খুব ভুল করেছি, যে বাবা মেনে নিতে পারছে না?
এহসান বলল, না, তবে স্বাভাবিক বিষয় তো নয়। চলো হেঁটে আসি।
নাহ! ভালো লাগছে না।

এহসান বলল, তাহলে রুমে চলো, যাবে।
অথৈ ঘাড় নাড়লো৷ যাবে না।
এহসান কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, এখন তো মা আছে! ভুলে গেছ!
অথৈ মাথা নিচু করে বসে রইল।
এহসান অথৈ এর হাত ধরে বলল, চলো, মন ভালো করে দিচ্ছি!

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৬১

অথৈ বলল, আমার মন ভালো করবে না ছাই, নিজে কি চাইছ সেটা বলো!
এহসান বলল, এখন আমার দোষ হয়ে গেল, এজন্য কারো ভালো চাইতে নেই।
অথৈ উঠে বেডরুমে গিয়ে দরজা চাপিয়ে দিলো। এহসান হেসে পিছু পিছু ঢুকে ডোর লক করে দিলো।
তবে ঐশির বাবা ফোন করলেন রাতেই। ঐশি তাদের ফোন করালো।

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৬৩