শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৭ (২)
আফীফা আফনান
শহরের এক পরিত্যক্ত, অন্ধকার গোডাউনের ভেতর থেকে থেকে থেকে ভেসে আসছে একাধিক তরুণের আকাশ-বাতাস কাঁপানো তীব্র আর্তনাদ আর আকুতি—
”আমাদের মাফ করে দেন ভাই! খোদার কসম, আর জীবনে কখনো কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকামু না! দয়া করে আমাদের ছেড়ে দেন ভাই!”
গোডাউনের ভ্যাপসা আলোয় লোকগুলোর করুণ দশা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। চার-পাঁচজন বখাটে ছেলে এখন ধুলোমাখা মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে হাউমাউ করে কাঁদছে। কারও শরীরে কোনো গেঞ্জি বা জামা নেই, পরনে শুধু ধুলোবালি মাখা প্যান্ট। মাথায় এক গাছি চুলও অবশিষ্ট নেই—একদম চাঁচা-নেড়া করে দেওয়া হয়েছে সবার মাথা! শরীরজুড়ে চাবুক আর বেতের কালশিটে দাগ, চোখ-মুখে তীব্র আতঙ্ক আর মৃত্যুর ভয় ফুটে উঠেছে।
আর তাদের ঠিক কয়েক হাত দূরে, নিজের আলিশান কালো রঙের চকচকে মার্সেডিস গাড়িটার গায়ে হেলান দিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে সালমান শাহ নেওয়াজ।
তার এক হাতে জ্বলন্ত সিগারেট, অন্য হাতটা পকেটে গোঁজা। পরনে কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। চোখের তারায় হিমশীতল নির্দয়তা ছাড়া আর কিচ্ছু নেই।
মেহুলের পেছনে নির্জন রাতে তাড়া করা প্রতিটা বখাটে মাতালকে সালমান নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি দিয়েছে। বখাটেদের একের পর এক আকুতি আর মাফ চাওয়ার কান্নাকাটি সালমানের কান স্পর্শ করলেও তার পাথুরে হৃদয়ে বিন্দুমাত্র সহানুভূতির আঁচ ফেলতে পারল না।
সালমান সিগারেটের শেষ টানটা দিয়ে ছাইটুকু মেঝের ওপর ফেলে জুতোর তলা দিয়ে পিষে দিল। তারপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ধ্রুব আর কবিরের দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় নির্দেশ দিল—
”ধ্রুব, কবির… এই শয়তানগুলোকে পেছনের মাইক্রোবাসে তোল। তোরা এদের পিছু পিছু থানায় নিয়ে আয়।”
ধ্রুব আর কবির চটজলদি মাথা নেড়ে বখাটেগুলোকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে অন্য গাড়িতে তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়তেই। সালমান এবার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রবির দিকে তাকিয়ে আলতো করে বলল, “রবি,প্যাসেঞ্জার সিটে বস।”
”আপনি কোথায় যাবেন ভাই? আপনাকে যেতে হবে না আমিই এদিকটা সামলে নেব!”
”উহু, আজ আমিও থানায় যাবো আমার কিছু কাজ আছে সেখানে।”
সালমান বলতেই রবি এক মুহূর্ত দেরি না করে বিনীত গলায় বলল, “ঠিক আছে ভাই চলুন।”
সালমান ও রবি দুজনে গিয়ে কালো মার্সেডিসে উঠে বসল। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রাজপথে নামিয়েই সালমান স্টিয়ারিং হুইলে নিজের দীর্ঘ আঙুলগুলোর চাপ বাড়াল। রবির সাথে সে আপাতত কোনো কথা বলল না, তার পুরো মন জুড়ে তখন এক উথাল-পাথাল চিন্তার ঝড়! কারন
কবিরের কাছ থেকে পাওয়া একটি জরুরি তথ্য বর্তমানে সালমানের মাথার ভেতরই ঘুরপাক খাচ্ছে। কবির—যাকে সালমান ছায়ার মতো মেহুলের নিরাপত্তা ও গতিবিধির ওপর নজর রাখার নির্দেশ দিয়ে রেখেছিল—সে ঘন্টাখানেক আগেই তাকে একটি খবর দিয়েছে।
বিকেলেই মেহুল তার বান্ধবী হুমাকে সাথে নিয়ে থানায় গিয়েছিল। ঢোকার সময় মেহুলের চেহারা একদম স্বাভাবিক ও শান্ত থাকলেও, প্রায় আধঘণ্টা পর যখন সে বের হয়ে এলো, তখন তার চোখ-মুখ ছিল ভীষণ ক্ষুব্ধ, রক্তিম ও অশান্ত!
কথাটা জানার পর থেকেই সালমানের মনের ভেতর এক অদৃশ্য অগ্নিশিখা জ্বলে উঠেছে। শান্ত, পরিশীলিত, মায়াবী মেহুল কেন হুট করে থানায় গেল? আর সেখানে এমন কী ঘটল যা তার সুন্দর মুখটায় একরাশ ক্ষোভ এনে দিল?
এই রহস্যের জট তাকে আজ রাতেই খুলতে হবে। কার সাধ্য হলো তার ভালোবাসার মানুষের মুখে বিরক্তির ছায়া ফেলার, সেটার চূড়ান্ত হিসাব তাকে নিতেই হবে। নাহলে আজ আর ঘুম হবে না।
তাইতো কালো মার্সেডিসের স্পিডোমিটারের কাঁটা হু-হু করে ওপরের দিকে উঠছে। আর পেছন পেছনে ধ্রুব আর কবিরের গাড়ি বখাটেগুলোকে নিয়ে অনুগামীর মতো আসতে লাগল। যেন রাতের অন্ধকার চিরে সালমানের গাড়িটি এক উন্মাদ ঝড়ের মতো থানার সীমানার দিকে ছুটে চলছে!
আলিশান কালো মার্সেডিস গাড়িটি যখন থানার চত্বরে এসে থামল, চারপাশের গম্ভীর রাত যেন আরও কয়েক গুণ ভারী হয়ে উঠেছে।
সালমান ধীরপায়ে গাড়ি থেকে নেমে ভেতরে পা রাখল।
বিকেলে মেহুল এসে থানার যে ঢিলেঢালা রূপ দেখেছিল, পরিবেশটা এখনো অনেকটাই তেমন—তবে দৃশ্যপট সামান্য ভিন্ন। রাতে ডিউটিতে থাকা কোনো নারী কনস্টেবল এখন সেখানে নেই। ডিউটি টেবিলটার ওপর কয়েকটি চায়ের কাপ ছড়ানো-ছিটানো, আর মাঝবয়সী কয়েকজন পুরুষ পুলিশ সদস্য ফাইলপত্রের তোয়াক্কা না করে গোল হয়ে বসে বেশ আয়েশ করে তাসের ঘুঁটি চালছে।
তবে হঠাৎই থমথমে মুখে সালমান শাহ নেওয়াজকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেখেই পুরো থানার চেনা রূপ যেন এক নিমেষে বদলে গেল! কনস্টেবলগুলোর হাতের তাস যেন বাতাসে হুট করে জমে গেল। এক সেকেন্ডের মধ্যে যে যার মতো লাফিয়ে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
ডিউটি চেয়ার থেকে ধড়ফড় করে উঠে এলেন সেই ভুঁড়িওয়ালা সেকেন্ড অফিসার। মুখে গদগদ তোষামোদি আর চাটুকারিতার হাসি ফুটিয়ে তিনি তড়িঘড়ি করে সালমানকে সালাম ঠুকলেন—
”আরে, ছোট সাহেব স্যার! আপনি এত রাতে এই গরিবের থানায়?! কোনো দরকার বা দরকারি কাজ থাকলে একটা ফোন দিলেই তো হতো স্যার, আমরা হুজুর হাজির হয়ে যেতাম! আপনি কেন কষ্ট করতে গেলেন?”
সালমান কোনো উত্তর দিল না। তার ফর্সা মুখটা তখনো পাথরের মতো শীতল, নির্ভাবনায় ঢাকা।
ঠিক তখনই রবির নির্দেশে ধ্রুব আর কবির বাইরে থেকে টানতে টানতে সেই নেড়া করা, শরীরজুড়ে কালশিটে দাগ পড়া বখাটেগুলোকে থানার ভেতরে এনে দাঁড় করাল। তাদের করুণ দশা দেখে থানার পুলিশদের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়!
তখনি সালমান সেকেন্ড অফিসারের গদগদ চাহনির দিকে একনজর তাকিয়ে বরফশীতল কণ্ঠে আদেশ দিল—”এদের লকআপে ঢোকান। এরা ইভটিজার।”
সালমানের চোখের ইশারা বুঝে সেকেন্ড অফিসার তড়িঘড়ি করে নিজের দাপট দেখাতে চাইলেন। সালমানের সামনে নিজের ‘কাজের প্রতি দারুণ নিষ্ঠা’ প্রমাণ করতে তিনি সাথে সাথে জুনিয়রদের ওপর গর্জে উঠলেন—
”অ্যাই! তোরা এই শয়তানগুলোকে তাড়াতাড়ি জেলে ভরে দে, একটাকেও ছাড়িস না! কত বড় সাহস স্যারদের এলাকায় বদমাইশি করিস?”
কথাটা বলেই সেকেন্ড অফিসার নিজেই লাফিয়ে গিয়ে সেই বিধ্বস্ত বখাটেগুলোর গালে দপাদপ কয়েকা থাপ্পড় বসাতে লাগলেন। তারপর হ্যাঁচকা টানে লকআপের ভারী লোহার দরজা খুলে তাদের ভেতরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে বিকট শব্দে লক করে দিলেন।
হাতে হাত ঘষতে ঘষতে গদগদ মুখে আবার সালমানের সামনে এসে দাঁড়ালেন অফিসার, “স্যার! একদম সঠিক শিক্ষা হয়েছে এদের! আপনি একদম চিন্তা করবেন না, আজ রাতে এদের এমন ডলাই দেব যে সারা জীবন মনে রাখবে!”
সালমান তার প্রশংসার ফুলঝুরিকে সম্পূর্ণ মিথ্যে ও তুচ্ছ জ্ঞান করে তার দিকে চোখ মেলাল। গলার আওয়াজ এক ধাক্কায় বেশ কয়েক ধাপ নামিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর ও ধারালো গলায় প্রশ্ন করল—
”আজ বিকেলে দুটো মেয়ে এসেছিল এই থানায়। কেন এসেছিল তারা? আর কী হয়েছিল তাদের সাথে এখানে?”
প্রশ্নটা শুনতেই সেকেন্ড অফিসারের গদগদ হাসির রেখা নিমেষে উধাও হয়ে গেল! তার কপালে চিন্তার সূক্ষ্ম ভাঁজ ফুটল। সালমানের থমথমে চোখ-মুখে স্পষ্ট হয়ে উঠছে হিংস্র এক রাগ। বিপদ বুঝে তিনি তোতলাতে তোতলাতে আমতা আমতা করে বললেন—
”দুটো মেয়ে… ইয়ে স্যার, এসেছিল তো দুটো মেয়ে বিকেলে…”
সালমানের চোখের তারা দুটো আরও ছোট হয়ে এলো, “কেন এসেছিল? আর আপনারা কী করেছেন তাদের সাথে?”
সালমানের কথা শুনে অফিসার কপালে জমে ওঠা ঘাম মুছেতে মুছতে বলে উঠলো, “বিশ্বাস করুন স্যার, আমরা কিছুই করিনি! ওই দুটো মেয়ে কি যেন এক বাচ্চার মিসিং কেস নিয়ে এসেছিল। কিন্তু হঠাৎ চোটপাট করে কি হলো কে জানে, কেস লেখার আগেই রাগ করে এখান থেকে চলে যায়! আমরা তো তাদের কিচ্ছু বলিনি স্যার!”
অফিসারের এই সাফাই শুনে সালমানের মন একবিন্দু ভিজল না। এই ধুরন্ধর পুলিশের কথা তার মোটেও বিশ্বাস হলো না।
অতঃপর সালমান আর এক সেকেন্ডও তার সাথে কথা না বাড়িয়ে, ধীরপায়ে এগিয়ে গেল দরজার কোণে দাঁড়িয়ে থাকা এক কনিষ্ঠ কনস্টেবলদের দিকে। পরম স্নেহের ছলে কনস্টেবলটির কাঁধে হাত দিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে সালমান তাকে নিয়ে থানার বাইরের খোলা আঙিনার দিকে হাঁটতে শুরু করল।
কনস্টেবলটির বুকের ভেতর তখন দুরুদুরু কাঁপন! সালমান শাহ নেওয়াজ জিনিসটা কী, আর তার রাগের পরিণতি কতখানি মারাত্মক হতে পারে—তা ওই এলাকার প্রতিটি মানুষের ও পুলিশ সদস্যের হাড়ে হাড়ে জানা!
এদিকে আঙিনায় গিয়ে সালমান হালকা কিন্তু তীক্ষ্ম গলায় বলল, “বিকেলে ঠিক কী কী হয়েছিল বল তো ছোট ভাই? একদম সত্যিটা বলবি।”
কনস্টেবলটি আর প্রাণ বাঁচানোর কোনো উপায় না পেয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বিকেলে যা যা ঘটেছিল—অফিসারের নাক ডেকে ঘুমানো, কনস্টেবলদের আড্ডা, মেহুলের বিষাদগ্রস্ত চেহারা, টেবিলে মেহুলের থাপ্পড় মারা, অফিসারের সাথে মেহুলের তর্কাতর্কি, আর শেষে অফিসারের বিশ্রীভাবে আচরণ—সবটা হুবহু বলে দিল!
পুরো ঘটনা শোনার পর সালমানের মেজাজ এক নিমেষে আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল! সে কনস্টেবলটির কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে তার পিঠ থাবড়ে ভেতরে ফিরে এলো।
ভেতরে ঢুকেই সালমান কোনো কথা না বলে সোজা গিয়ে দাঁড়াল সেই সেকেন্ড অফিসারের সামনে। আর মুহূর্তের মধ্যে সশব্দে একখানা বিষাক্ত চড় কষাল সেই অফিসারের গালে—
”ঠাস!”
আকস্মিক চড়ের তীব্রতায় সেকেন্ড অফিসার মাথা ঘুরে প্রায় ডিউটি টেবিলের ওপর ঢলে পড়ার উপক্রম হলেন! সেই সাথে পুরো থানার পরিবেশ এক নিমেষে যেন থমকে বরফ হয়ে গেল!
সালমান অফিসারের ইউনিফর্মের কলারটা শক্ত মুষ্টিতে চেপে ধরে গর্জে উঠল—”জনগণের সেবার নামে সরকারি চেয়ারে বসে নাক ডেকে ঘুমাস?! নিজের মনমর্জি মতো ডিউটি করিস?! সাধারণ মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার করিস?! তোকে আজ রাতের মধ্যেই সাসপেন্ড করার ব্যবস্থা করছি আমি! এই থানা তো দূরে থাক, কোনো সরকারি দফতরে যেন তোকে আর কোনোদিন না দেখা যায় সেই ব্যবস্থা করবো!”
অফিসার ততক্ষণে চরম ভয়ে ও আতঙ্কে সালমানের হাত জড়িয়ে ধরে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে কেঁদে ফেললেন—”স্যার! আমাকে ক্ষমা করে দিন স্যার! ভুল হয়ে গেছে স্যার, দয়া করে আমার চাকরিটা খাবেন না! পায়ে পড়ি স্যার, মাফ করে দিন!”
সালমান এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে ঘৃণাভরে অফিসারের দিকে তাকাল। তারপর হিমশীতল গলায় বলে উঠল—
”এই ক্ষমাটা আমার কাছে নয়, যাদের সাথে বিকেলে অন্যায় আর অপরাধ করেছিস—তাদের কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে চাইবি!”
কথাটা বলেই সালমান আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। লম্বা কদমে সে থানা ভবন থেকে বেরিয়ে এলো। সেই সাথে রবি, ধ্রুব আর কবিরও তড়িঘড়ি করে তার পিছু পিছু বাইরে বেরিয়ে এলো।
সবাই থানা থেকে বের হয়ে গাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। সালমান কিছুক্ষণ নিরব থেকে পকেটে হাত দিয়ে স্থির হয়ে রইল। তারপর চোখ তুলে কবিরের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে শুধাল, “কবির, আজ বিকেলে মেহুলের সাথে কি কোনো বাচ্চা ছিল?”
কবির চটজলদি জবাব দিল, “হ্যাঁ ভাই! ভাবির সাথে যে বান্ধবীটি ছিল—ওই যে হুমা ম্যাডাম, বাচ্চাটা মনে হয় ওনারই! থানায় ঢোকার সময় বাচ্চাটি প্রথমে হুমা ম্যাডামের কোলেই ছিল। কিন্তু বের হওয়ার সময় ভাবি তাকে কোলে চেপে ধরে রেখেছিল, আর হুমা ম্যাডামকে ধরে টান দিয়ে থানা থেকে বের হয়ে আসছিল।”
কবিরের বলা এই সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় সালমানের পাশাপাশি বাকিদের মনেও স্বাভাবিকভাবে ধারণার জন্ম হলো—বাচ্চাটা হয়তো সত্যিই হুমারই, যা নিয়ে কোনো ঝামেলা হওয়ায় তারা থানায় গিয়েছিল। তবে এত কিছুর পরেও সালমানের মনের ভেতর কেমন যেন একটা সূক্ষ্ম খচখচানি রয়েই গেল। যদিও সে মুখে বা চাহনিতে তা কারো সামনে প্রকাশ করল না।
বেশ কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকার পরে একসময় রবি এগিয়ে এসে বিনীত গলায় বলল, “ভাই, চলুন এবার বাড়ির দিকে যাই। রাত তো অনেক হলো।”
সালমান গাড়ির ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে হাত রেখে সবার দিকে তাকাল। শান্ত কিন্তু অমলিন কণ্ঠে বলল, “তোরা সবাই বাড়ি ফিরে যা। আমার কিছু কাজ আছে! আমি পরে আসবো। ”
রবি একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি এত রাতে কোথায় যাবেন ভাই? আমিও সাথে চলি, রাত তো অনেক হলো একা যাবেন না।”
সালমান হাত তুলে থামিয়ে দিল রবিকে। শক্ত গলায় বারন করে দিয়ে বলল, “না, তোদের কাউকে আসতে হবে না। তোরা বাড়ি যা, আমি নিজেই ড্রাইভ করে চলে যেতে পারব।”
সালমানের সেই অমান্য করার উপায়হীন সিদ্ধান্ত শুনে রবি আর কথা বাড়াল না। সালমান একাই কালো মার্সেডিসের স্টিয়ারিংয়ে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল এবং নিস্তব্ধ রাতের সড়ক চিরে একা সোজা হুমার অ্যাপার্টমেন্টের উদ্দেশ্যে গাড়ি ছুটিয়ে দিল।
এক সুবিশাল, ধোঁয়াশাচ্ছন্ন ও হাসপাতালের সুদীর্ঘ নির্জন করিডোরে। হাসপাতালের বিজলি বাতিগুলো মিটমিট করে জ্বলছে-নিভছে, চারপাশের বাতাস জুড়ে এক অশুভ নীরবতা।
মেহুলের কোল চেপে ধরে রাখা একরত্তি শিশুটি! গায়ের কাপড়ে বরফশীতল পানি চুপচুপে হয়ে ভেজা, আর শিশুটি নিস্তেজ ও অচেতন হয়ে ধোঁয়াটে বাতাসের মাঝে নিশ্বাস নেওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ছটফট করছে। মেহুল পাগলের মতো ভেজা পোশাকে করিডোরজুড়ে দৌড়াতে শুরু করল।
”ডাক্তার! কে আছেন… কোনো ডাক্তার আছেন?! দয়া করে কেউ আসুন! আমার বাচ্চাটাকে একটু দেখুন… ও নিশ্বাস নিতে পারছে না!”
মেহুলের আকুল কান্না আর বুকফাটা চিৎকারে হাসপাতালের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলল, কিন্তু কোনো বন্ধ দরজার ওপার থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলো না। সে স্ট্রেচার আর ট্রলিগুলোর পাশ দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে চিৎকার করতে লাগল, কিন্তু ফাঁকা করিডোরে শুধু তার নিজের নিঃশ্বাসের হাঁসফাঁস শব্দই যেন ঘুরে মরতে লাগল।
ঠিক তখনই করিডোরের শেষ প্রান্তের গভীর অন্ধকার চিরে বেশ কয়েকজন অবয়বহীন, বিকট চেহারার বয়স্ক মহিলা বেরিয়ে এলেন।
তাদের রক্তচক্ষুর বিষাক্ত দৃষ্টি মেহুলের দিকে স্থির হলো। মেহুলকে দেখে তারা নিজেদের শুকনা, অশুভ আঙুল তুলে বিষাক্ত দাঁত বের করে মেহুলের দিকে চিৎকার করে বলতে লাগলেন—
”তুই বন্ধ্যা! তোকে না কতবার বলেছি তোর অমঙ্গল ছোঁয়াতে কেবল অনিষ্টই হয়! তোকে ছোঁয়া বারণ! তোর ওই বন্ধ্যা আর অলক্ষুণে ছোঁয়াতেই আজ বাচ্চাটার এই অবচেতনের দশা! তোর মতো কুলক্ষণা নারীর জন্যই আজ নিষ্পাপ বাচ্চাটা মরতে বসেছে! তুই বাচ্চাটার খুনি!”
”না… না! আমি কিছু করিনি! সত্যি আমি কিছু করিনি! আমি আর ছুব না… আমি আর কখনো ছুব না!”—স্বপ্নের ঘোরেই তোতলাতে তোতলাতে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বিছানায় মাথা নাড়তে লাগল মেহুল।
মেহুলের বিছানায় এমন উসখুস করা আর ভয়ার্ত প্রলাপ শুনে পাশে শুয়ে থাকা হুমার কাঁচা ঘুমটা নিমেষে ভেঙে গেল। সে চটজলদি উঠে বসে মেহুলকে এমন করতে দেখে মেহুলের কাঁধ ধরে দ্রুত ঝাঁকাতে শুরু করল—”মেহু! অ্যাই মেহু, উঠ! কী হয়েছে তোর?! এই মেহু!”
হটাৎ হুমার ধাক্কায় এক ঝটকায় চোখ খুলে সোজা হয়ে বসে পড়ল মেহুল!
উঠে বসার পরও তার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত নিদারুণ যন্ত্রণা, কান্না আর চরম আতঙ্ক ফুটে উঠেছে। মাথার ওপর ফ্যানটা পূর্ণ গতিতে ঘুরছে, অথচ তার শরীর বেয়ে ঘামের ধারা চুইয়ে পড়ছে। অতঃপর নিজের শুকনো ঠোঁট দুটো মেহুল জিভ দিয়ে একটু ভিজিয়ে নিয়ে উন্মাদের মতো হুমার দিকে তাকাল।
অতঃপর মেহুল চারপাশে তাকাতেই নিজেকে আবিষ্কার করল বিছানাতে। বুঝলো সে হুমার অ্যাপার্টমেন্টের হুমার নিরিবিলি রুমে এতোক্ষন ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলো। জানালার পর্দার ফাঁকে এখনও বাইরে রাতের নিস্তব্ধতা ছেয়ে আছে, তার মানে সে এতোক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলো। এ যেন এক বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্ন!
অতঃপর মেহুল হন্তদন্ত হয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় আকুল হয়ে শুধাল, “হুমা… বাচ্চাটা ঠিক আছে তো ? কিছু হয়নি তো!”
হুমা মেহুলের এই করুণ চাহনি দেখে নিজের দৃষ্টি সরাল। সে ঘরের এক কোণে রাখা ছোট্ট লোহার সুন্দর দোলনাটার দিকে তাকাল। আজই সন্ধ্যায় সে স্টোররুম থেকে তাদের নিজের পুরোনো, শক্ত লোহার দোলনাটা বের করে ভালো করে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে এই একরত্তি বাচ্চার জন্য এনে রেখেছিল।
দোলনার দিকে তাকিয়ে হুমা এক গাল হেসে নরম গলায় বলল, “পুঁচকু তো একদম পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে মেহু! কেন রে, তুই কি কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখেছিস?”
”খুব… খুব খারাপ একটা স্বপ্ন!”—মেহুল দুই হাতে মুখ ঢেকে নিজের ব্যাকুল শ্বাস প্রশ্বাস সামলানোর চেষ্টা করল।
হুমা খাট ঘেঁষে রাখা সাইড টেবিল থেকে পানির বোতল আর গ্লাসটা তুলে নিয়ে মেহুলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “কী এমন স্বপ্ন দেখলি যে ভয়ে পুরো ঘেমে একাকার হয়ে গেলি?! এই নে, একটু পানি খা। তারপর বাথরুমে গিয়ে মুখে একটু ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিয়ে আয়, ভালো লাগবে।”
মেহুল আর কিছু না বলে গ্লাসের পানিটা এক নিঃশ্বাসে গিলে বিছানা থেকে উঠে সোজা বাথরুমে ঢুকে গেল। বেসিনের ট্যাপ ছেড়ে হাত ভরে ঠান্ডা পানি এনে নিজের মুখে বারবার ঝাপটা দিতে লাগল। তারপর তোয়ালে দিয়ে মুখটা ভালো করে মুছে ধীরপায়ে ঘরের বাইরে এসে বারান্দার দিকে হাঁটতে শুরু করল।
এত রাতে তাকে বারান্দার দিকে যেতে দেখে হুমা বিছানা থেকেই জিজ্ঞেস করল, “অ্যাই মেহু, এত রাতে ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস ?”
মেহুল ঘুরে না তাকিয়েই শান্ত গলায় জবাব দিল, “ভেতরে কেমন যেন দম বন্ধ লাগছে হুমা… একটু বারান্দায় দাঁড়াই।”
বলেই এগিয়ে গেলো, অতঃপর বারান্দার গ্রিলে দুই হাত রেখে বাইরে তাকাল মেহুল। কিন্তু তার মাথার ভেতর তখনো স্বপ্নের সেই বিষাক্ত বিষবাষ্প আর অন্ধ অপবাদের শব্দগুলোই ঘুরে মরছিল। যেন এক অদ্ভুত অস্থিরতা আর অশান্তি তাকে ঘিরে ধরেছে তাকে।
এদিকে একটু আগেই হুমার অ্যাপার্টমেন্টের রাস্তার ঠিক বিপরীত পাশে এসে থেমেছে সেই আলিশান কালো মার্সেডিস! গাড়ির স্টিয়ারিং থেকে হাত সরিয়ে নেমে এলো সালমান। সে বাইরে এসেই গাড়ির বোনেটে হেলান দিয়ে শান্তভাবে দাঁড়াল। তার ধারালো দৃষ্টি সোজা হুমার ফ্ল্যাটের আট তলার অন্ধকার বারান্দাটার দিকে। রাত তিনটা বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট পার হতে চলল, চারপাশ একদম নিঝুম ও নিস্তব্ধ। সে জানে সবাই ঘুমাচ্ছে তবুও কেন যে এখানে এলো বুঝতে পারছেনা। বুকের ভেতরে কেমন যেন এক আনচান ভাব ঘুরপাক খাচ্ছে। অতঃপর একা একাই গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে গভীর শ্বাস ফেলে যখন সে চলে যাওয়ার কথা ভাবছিল—ঠিক তখনই তার চোখ আটকে গেল!
আট তলার সেই অন্ধকার শূন্য বারান্দাটার দরজা ভেদ করে ছায়ার মতো এক নারীমূর্তি এসে দাঁড়িয়েছে সেখানে!
বারান্দায় কোনো আলো জ্বলছে না, কিন্তু সালমানের তীক্ষ্ম নজর আর হৃদস্পন্দন এক নিমেষে যেন টের পেয়ে গেল—অন্ধকারের চাদর মুড়ি দিয়ে অন্য কেউ নয়, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার হৃদয়ের একমাত্র স্পন্দন, তার অপ্সরা!
গাড়ির বোনেটে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আট তলার বারান্দায় দাঁড়ানো অবয়বটিকে দেখামাত্রই সালমানের বুকের ভেতর একটা সূক্ষ্ম তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। কুচকুচে কালো শার্ট আর প্যান্টে ঢাকা তার সুঠাম দেহটি রাতের আবছা আলোয় কোনো অদৃশ্য রক্ষকের মতো স্থির হয়ে রইল। তার চোখ দুটি একমুহূর্তের জন্যও সরছিল না আট তলার ওই নির্দিষ্ট দিকটি থেকে।
এদিকে আট তলার বারান্দার গ্রিলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেহুল তখন এক গভীর, বিষাদগ্রস্ত অবসাদে ডুব দিচ্ছে। রাতের হিমশীতল হাওয়া তার গা ছুঁয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ভেতরের জমে থাকা কষ্টগুলোকে কোনোভাবেই হালকা করতে পারছে না। মাথার ভেতর স্বপ্নের সেই অপবাদের শব্দগুলো প্রতিধ্বনি হয়ে বাজছে—’তুই বন্ধ্যা! তুই অপয়া!’ সত্যিকার জীবনেও তো এমন অপবাদ সে কম শুনেনি। আর এখন স্বপ্নেও তাকে যেন এসব তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
অতঃপর মেহুল তার ভেজা ও ক্লান্ত চোখ দুটো তুলে অসীম শূন্য আকাশের দিকে তাকাল। তার চোখের কোণ বেয়ে অজান্তেই দুই ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। বুক চিড়ে বেরিয়ে এলো এক সুগভীর হাহাকার! সে আকাশের দিকে চেয়ে ভাঙা, অতি নিঃস্ব কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলে উঠল—
”কী এক অদ্ভুত অপূর্ণতায় মুড়ে দিলে আমায়, খোদা? নিঃশ্বাসটুকু নিতে গেলেও মনে হয় যেন গলার কাছে দম আটকে আসছে! শত কোটি মানুষের এই সুবিশাল পৃথিবীতে কি আর কাউকে খুঁজে পাওনি! কেবল আমাকেই কি বেছে নিলে জীবনের সবটুকু কষ্ট আর ব্যর্থতা সপে দেওয়ার জন্য…?”
তার কণ্ঠে ফুটে উঠছিল জমানো হাহাকার, অপমান আর নিদারুণ এক দীর্ঘশ্বাস। মেহুল হয়তো বহুক্ষণ ধরে এভাবে শূন্যে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত, কিন্তু একসময় রাতের ঠান্ডা বাতাসের তীব্রতা বাড়তে শুরু করায় সে ঘরে ফিরে যাওয়ার জন্য শরীরটা একটু ঘুরাল।
ঠিক তখনই মেহুলের চোখ দুটো আটকে গেল রাস্তার একদম বিপরীত পাশে! রাস্তার পারের ঘুটঘুটে অন্ধকার আর ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোর ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক অবয়ব! সম্পূর্ণ কালো পোশাকে আবৃত এক দীর্ঘদেহী পুরুষ, যার শরীর ও আকৃতি যেন রাতের অন্ধকারের সাথেই মিশে আছে!
মেহুল স্তম্ভিত হয়ে একদৃষ্টিতে সেদিকে চেয়ে রইল। এতদূর—আট তলার উচ্চতা থেকে সেই লোকটার মুখমণ্ডল স্পষ্ট বোঝা সম্ভব নয়। কিন্তু লোকটাকে এভাবে অন্ধকারের ভেতর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেহুলের মনের গহীনে হুট করে এক তীব্র বিদ্যুৎ চমকে উঠল!
এমন একটা দৃশ্য… এমন একটা মুহূর্ত সে তো এর আগেও দেখেছে! স্থানটা শুধু ভিন্ন ছিল!
শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৭
স্মৃতির পাতাগুলো এক ঝটকায় এক সপ্তাহ পেছনে উল্টে গেল। চট্টগ্রামের সেই বিষণ্ন রাতটায়—ঠিক একইভাবে কালো পোশাকে ঢাকা এক দীর্ঘদেহী পুরুষ রাস্তার ওপারে নিঃশব্দে দাঁড়িয়েছিল তার দিকে অপলক চেয়েছিল! আজ আবার সেই একই প্রতিচ্ছবি, কেবল এই অচেনা শহরের রাস্তায়!
সেদিন অবশ্য সেই লোকটিকে মেহুল পাগল ভেবে উড়িয়ে দিয়েছিল, কিন্তু আজ গভীর রাতে হুবহু সেই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি দেখে তার বুকের ভেতর এক অজানা খটকা লাগে! ভয় আর কৌতূহল একযোগে থাবা বসায় তার মনে। লোকটাকে দেখে দূর থেকেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, লোকটার উত্তপ্ত ও তীব্র নজর সোজা তার দিকেই নিবন্ধিত হয়ে আছে!
হঠাৎ মেহুলের মস্তিষ্ক সজাগ হলো, তার মস্তিষ্ক তাকে জোড়ালো ভাবে জানান দিচ্ছে,”কেউ কি তবে আমাকে ফলো করছে?”
