মৌটুসী পর্ব ৩৫
ঋতস্বিনী মাহবিশ
— “স্ত্রীকে খুব ভালোবাসতেন, তাই না?”
আধো অন্ধকার ও আধো আলোকিত বারান্দাটায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে মৌটুসী ও বোরাক। দুজনের দৃষ্টিই সামনের ঝকমকে শহরের দিকে আবদ্ধ। মৌয়ের প্রশ্নে বোরাক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীর স্বরে বলল,
— “স্ত্রী তো ভালোবাসারই জিনিস। যতদিন সে স্ত্রী হয়ে থাকে, তাকে ভালোবাসতেই হয়।”
— “তাকে খুব বেশিই মিস করেন?”
— “নাহ্।” নির্লিপ্ত, তবে অকপটে জবাব বোরাকের।
মৌটুসী একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
— “না?”
— “প্রশ্নই আসে না।”
মৌয়ের ভ্রু কুঁচকে গেল। তীক্ষ দৃষ্টিতে চেয়ে সে বলল,
— “কেন? ভালোবাসা কি এতই ঠুনকো? স্ত্রী মারা যাওয়ার কয়েক বছরের মাথায় একজন স্বামী এত সহজেই বলে দিতে পারে যে, মৃত স্ত্রীকে তার মনে পড়ে করে না?”
বোরাক এবার ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে মৌয়ের দিকে ফিরল। কিছুটা বিষ্ময় নিয়ে বলল,
— “না। ভালোবাসা ঠুনকো নয়। আর আমার প্রাক্তন মৃত —এটা তোমাকে কে বলেছে?”
মৌটুসী আচমকা কথাটা বুঝতেই পারল না। একটু থেমে প্রশ্ন করল,
— “মারা যায়নি?”
বোরাক মাথা নাড়ল।
‘না।’
মৌয়ের চোখে বিস্ময় আরও গাঢ় হলো।
— “তাহলে বীর কেন বলে, ওর মাম্মা নেই?”
— “কারণ নেই। ওর জীবনে ওর জন্মদাত্রীর কোনো অস্তিত্ব নেই। তবে আমার প্রাক্তন পৃথিবীতে জীবিত। প্রতিনিয়ত সুখে, সতেজ নিশ্বাস নিচ্ছে।”
— “মানে… ইউ গট ডিভোর্সড?”
— “হুম।”
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে থাকল। তারপর মৌটুসীর কৌতূহল আবার জেগে উঠল।
— “আচ্ছা, বীরের তখন কত বয়স ছিল?”
— “চার মাস।”
— “চার মাস?”
— “হুম।”
— “তখন থেকেই সে আপনার কাছেই থাকে?”
— “হুম।”
মৌয়ের মাতৃমনটা কেমন করে উঠল। একজন মা কিভাবে তার চার মাসের বাচ্চা ছেড়ে থাকতে পারে? আর বাচ্চাটা! তার ভার্সিটির ক্লাসের সময়গুলোতে চড়ুই তো কয়েক ঘণ্টা মাকে কাছে না পেলে অস্থির হয়ে যেত। আর বীর কি-না টোটালি তার মা ছাড়াই এত বড় হয়েছে! তাও যখন সেই মহিলা জীবিত।এই ভাবনা থেকে সে অত গভীর চিন্তা না করেই সরল মনে বলে উঠল,
— “ইশ! ওইটুকুন দুধের সন্তানকে রেখে কীভাবে দূরে ছিলেন উনি? আর আপনিই কেন সন্তানকে তার মায়ের কাছ থেকে বঞ্চিত করলেন?”
— “পরিস্থিতি।”
মৌ এবার একটু তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
— “পরিস্থিতির দায় দিয়ে নিজেদের নির্দোষ দাবি করবেন না। পরিস্থিতি তো আপনারাই তৈরি করেছেন! মাঝখানে ওইটুকু বাচ্চাটা কষ্ট পেল, মায়ের আদর-স্নেহ থেকে বঞ্চিত হলো। একজন বাবা যতই চেষ্টা করুন, শিশু সন্তানের জীবনে সে একজন মায়ের ভালোবাসা দিতে সক্ষম নয়।”
পরিপ্রেক্ষিতে বোরাক প্রতিবাদমূলক কিছুই বলল না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ মৌটুসীর দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তোমাকে আমার অনেক কিছু বলার আছে। শুনবে, মৌটুসী পাখি?”
মৌটুসী একটু নড়েচড়ে দাঁড়াল। বোরাকের পানে পূর্ণ দৃষ্টি ফেলে বলল,
— “হুম। বলুন। শুনছি আমি।”
— “তাহলে আজকের রাতটা আমার নামে লিখে দিচ্ছ?”
— “না। আপনার না-বলা কথাগুলোর নামে।”
বোরাক ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— “ভারী স্বার্থপর মেয়ে তো তুমি! আমার কথা নেবে, অথচ আমায় নেবে না?”
এমন সিরিয়াস একটা সময়ে বোরাকের রসিকতা একদম ভালো লাগল না মৌয়ের।
— “অহ! আপনি বলবেন? না-কি আমি ঘুমাতে যাব?”
বিরক্তি ভরা কন্ঠে বলেই দরজার দিকে পা বাড়াতে উদ্যত হলো মৌ। অথচ ধাপ ফেলার আগেই ওর ফিনফিনে নরম কব্জি আকড়ে ধরল বোরাক।
— “তুমি ঘুমিয়ে গেলে আমার কথাগুলো শুনবে কে, মেয়ে? কত কথা জমে আছে বুকে, জানো? এতদিনে একটা মনমতো শ্রোতা পেয়েছি। আমার কথাগুলো তাকে গোগ্রাসে না গিলিয়ে ছাড়ছি না।”
“আমার বাবা ছিলেন খুব শৌখিন একটা মানুষ। বিশেষ করে ছেলে-মেয়েদের জীবন নিয়ে তাঁর নিজস্ব কিছু পরিকল্পনা ছিল। তিনি চাইতেন, আমরা খুব অল্প বয়সেই বিয়ে করে সংসারী হই। আমার ছোট বোন ভার্সিটিতে ওঠার পরপরই তার ভালোবাসার মানুষের হাতে বাবা তাকে তুলে দেয়। কন্যা সম্প্রদান-এর পর এবার তার ইচ্ছে হলো ঘরে পুত্রবধূ আনবার। তখন আমি ভার্সিটি লাস্ট ইয়ার, একদিন বাবা ডেকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, আমার কোনো পছন্দ কিংবা প্রেম আছে কিনা! আমি এক কথায় না করে দিলাম। জীবনে একটা প্রেম করেছিলাম আমি, সেটা ক্লাস সেভেনে। এইটে মেয়েটার বাবার ট্রান্সফার হয়ে গেল। ওরা অন্য শহরে চলে গেল। ব্যস, সেখানেই আমাদের প্রেমেরও সমাপ্তি। একেবারে কোনো ঝামেলা ছাড়াই ব্রেকআপ! এরপর এসবে আর নিজেকে জড়াইনি কখনো।
“যাই হোক, পরের দিনই বাবা ধুমসে নেমে পড়লেন পুত্রবধূ খোঁজার মিশনে। এক মাসের মধ্যে তার এক বিজনেস পার্টনারের মেয়েকে পছন্দও করে ফেললেন। পরের দিন আমরা মেয়ে দেখতে খুলনা গেলাম। আমার প্রাক্তন আবার দেখতে-শুনতে ভালো, এককথায় খুব রূপবতী। বুঝতেই পারছ, বয়সটাও তখন এমন—সবকিছু খুব সরলভাবে দেখতাম। সুন্দরী একটা মেয়েকে দেখে অন্য দশটা ছেলের মতো আমিও তার রূপে মুগ্ধ হয়ে বাবার মতে সম্মতি দিয়ে দিলাম।”।”
“সিদ্ধান্ত হলো, সেদিনই আকদ হবে। তবে তার আগে আমি মেয়েটার সঙ্গে আলাদা করে কথা বলেছিলাম। খুব জোর দিয়ে জানতে চেয়েছিলাম, সে এই বিয়েতে মন থেকে রাজি কি না। সে নিশ্চিত করেছিল, সে রাজি। নিজের ইচ্ছাতেই রাজি। আর কী? বর-কন্যা রাজি তো ডাকো কাজি! সেদিনই আমাদের আকদ হয়ে গেল।”
“বিয়ের প্রায় ছয় মাস পর আমার গ্র্যাজুয়েশন শেষ হলো। এরপর প্রাক্তনকে সঙ্গে নিয়ে আমেরিকায় চলে গেলাম। সেখানকার ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্সসহ আরও কয়েকটা ডিগ্রি নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। আমেরিকার বুকেই শুরু হয়েছিল আমাদের দাম্পত্য জীবন। সংসার খুব ভালোই চলছিল।”
“সমস্যাটা শুরু হলো প্রায় বছরখানেক পর। আমার মাস্টার্স শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এলো। দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিতে লাগলাম আমি। কিন্তু সে চাইল আমরা আমেরিকাতেই সেটেল হয়ে যাই। সেখানকার বিলাসবহুল উন্নত জীবনযাপন ছেড়ে দেশে ফেরার দরকার নেই। সেটা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমার বাবা দেশে, বোন দেশে। ব্যবসা, পরিবার—সবকিছু এখানেই। আমি কীভাবে সব ছেড়ে বিদেশে পড়ে থাকব? আমার কাছে বাবা অনেক কিছু ছিল। তাকে এখানে একা ছেড়ে চিরদিনের জন্য অন্য দেশে বসবাস করার কোনো পরিকল্পনাও ছিল না।এই নিয়েই আমাদের মধ্যে প্রথম ঝামেলাটা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত অনেক তর্ক-বিতর্কের পর আমরা দেশে ফিরে আসি। বলা বাহুল্য, দেশে ফিরে আসতে বাধ্য করি তাকে।”
“আমার প্রাক্তন জীবনের গতিতে একজন ওয়াইফ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সে ওয়াইফ-মেটেরিয়াল হয়ে উঠতে পেরেছিল না। সংসার, ঘরবাড়ি, পরিবারের মানুষজন—এসবের চেয়ে পার্লার, লাইফস্টাইল, শপিং, সোশ্যাল সার্কেল, নিজের সাজগোজ এসবেই ওর আগ্রহ ছিল বেশি। এতে আমার আপত্তি ছিল না। একজন মানুষের নিজের পছন্দ-অপছন্দ থাকতেই পারে। কিন্তু দিনদিন আমার ও আমার পরিবারের প্রতি ওর উদাসীনতা বাড়তেই লাগল। লোক দেখানো নিজের যান্ত্রিক জীবনযাপনটুকুই কাছে সবকিছু হয়ে উঠতে লাগল ওর কাছে। পরিবার-পরিজন ত্যাগ করে সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সার হয়ে উঠল।”
রাতের আধো অন্ধকার শহরের শূন্যে চেয়ে একচিলতে তাচ্ছিল্যের হাসল যুবক। এদিকে মৌটুসী এক দৃষ্টিতে তার পানে তাকিয়ে। তার চাউনি নির্বাক। চিত্তের নির্লিপ্ততা কাটিয়ে উঠবার আগেই বোরাক আবারও বলতে লাগল,
“আমার মা অনেক আগেই মারা গিয়েছিলেন। এত বড় একটা বাড়ি, কয়েকটা আপন মানুষ—সবকিছু দেখেশুনে রাখার মতো ঘরে কোনো নারী ছিল না তখন আমাদের বাড়িতে। আমার বাবা সবসময় এই আশা পুষে রেখেছিলেন, একদিন তাঁর পুত্রবধূ এসে সংসারটাকে নিজের মতো করে আগলে রাখবে। লক্ষ্মী একটা মেয়ে হবে। খুব বড় কোনো চাওয়া ছিল না তাঁর। কিন্তু তিনি বারবার নিরাশ হয়েছেন। তবুও বাবাকে কখনো ওর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে দেখিনি। বরং নিজের হতাশা ও মন খারাপটুকুও চেপে রাখতেন। তবুও অশান্তি চাননি।”
“আমার বোন আর বোনজামাই বেড়াতে এলে ওর নানা অজুহাত শুরু হয়ে যেত। তখন তুচ্ছ সব ব্যাপার নিয়েও ঝামেলা করত আমার সাথে। এরপর রাগ করে চলে যেত বাবার বাড়িতে। দিনের পর দিন এসব দেখতে দেখতে আমার আদরের বোনটাও একসময় আমাদের বাড়িতে আসা প্রায় বন্ধ করে দিল।”
“অথচ আমার বোন দুটোর মা ছিল না। ছোটবেলা থেকেই মায়ের শূন্যতা নিয়ে বড় হয়েছে ওরা। আমার প্রত্যাশা ছিল—বড় ভাবী হিসেবে ওদের প্রতি অন্তত মায়ের মতো একটা মায়া থাকবে। বড় ভাবিরা একজন মায়ের সবটুকু দায়িত্ব পালন করতে পারবে না, জানি। এই দায়িত্ব তাদের ঘাড়ে চেপে দেওয়াটাও উচিত নয়। কিন্তু একটু আপন করে নেওয়া তো সম্ভব ছিল!”
“অথচ একসময় সে মুখ ফুটে অভিযোগ করতে লাগল, আমার বয়স্ক বাবা আর পনেরো বছরের কিশোরী বোনটা নাকি আমাদের দাম্পত্য জীবনের প্রাইভেসি নষ্ট করছে! আমাদের আলাদা একটা একক সংসার গড়া দরকার।”
একটু থেমে নিঃশব্দে গভীর একটা শ্বাস টেনে নিল বোরাক। এরপর সরাসরি মৌকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“একজন পুরুষের মুখে তোমার জাতের অন্য এক নারীকে নিয়ে এসব কথা শুনতে তোমার খারাপ লাগছে জানি। মনে হতে পারে, আমি হয়তো নিজের দোষগুলো আড়াল করে আমার প্রাক্তনের দোষগুলো বাড়িয়ে বলছি। সমাজে যেমনটা প্রায়ই হয়ে থাকে—পুরুষ নিজের ভুলকে পাশ কাটিয়ে সব দায় নারীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়। কিন্তু না, দোষী আমিও ছিলাম। এক হাতে তো তালি বাজে না। তার কিছু কিছু আচরণ আমি মেনে নিতে পারতাম না। আমি কষ্ট পেয়েছি, রাগারাগি করেছি, ভাঙচুর-তর্ক করেছি, অনেক সময় খুব কঠিনও হয়ে গিয়েছি তার উপর। বিশেষ করে বাবা আর বোনদের নিয়ে কোনো কথা উঠলে আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম না। সে আমাকে বোঝেনি, হয়তো আমিও নিজেকে তার সামনে সঠিকভাবে উন্মোচন করতে পারিনি!”
দীর্ঘক্ষণ কথা বলা শেষে থামল যুবক। ব্যালকনির রেলিংয়ে দুই হাত ভর দিয়ে সামনে হালকা ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশেই অন্যমনস্কভাবে বুকে হাত গুঁজে একই রেলিংয়ে আলতো হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মৌ। সে কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে যেন, এমনকি ঠিক-ভুল বিবেচনা করবার চিন্তাশক্তিও। সেসবের দরকারও নেই এখন। সে শুধু শুনতে চায়, জানতে চায় মানুষটার অজানা জীবনকাহিনী। কিছুক্ষণের নীরবতার ছন্দপতন ঘটিয়ে এই পর্যায়ে নিজ থেকে একটা প্রশ্ন ছুড়তে চাইল রমণী। সেটাও ঠিকঠাক পেল না, অস্থিরতায় বাক্য গঠনে কেমন গড়মিল হয়ে গেল,
“এই কারণেই কি? মানে বলতে চাইছি, ডিভোর্সটা আপনার তরফ থেকেই…..”
“নাহ্। শুধু মাত্র পারিবারিক কারণে একটা সম্পর্ক ভাঙে না। আমার কথা শুনতে বিরক্ত হচ্ছ না তো?”
“না, হচ্ছি না। একদম না।”
“আচ্ছা, শোনো তাহলে, পারিবারিক বিষয়ের বাইরেও মেজর যে ব্যাপারটা ছিল, দিন দিন নিজের ব্যক্তি স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলছিলাম আমি। তার পছন্দ-অপছন্দ, মতামত আমার উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। আমার, তার সব কিছুই তার নিজমতো হওয়া চাই, নয়তো আবারও ঝামেলা, অশান্তি। আমাদের দাম্পত্য সম্পর্কে আমার অনুভূতি বিলীন হচ্ছিল। এই নিয়ে অভিযোগ করলে সে বলল, কো-অপারেট, এটা দাম্পত্য জীবনে জরুরি।”
“আর এই কো-অপারেট শব্দটার মাঝে আমার অস্তিত্বই হারিয়ে যাচ্ছিল। ভালোবেসে তার জন্য আমি কোনো একটা উপহার আনতাম, তা তার পছন্দ না হলে দোকানে ফেরত দিয়ে তার পছন্দ অনুযায়ী অন্যটা নিয়ে আসতে হতো। কোথাও ঘুরতে গেলে সবসময়ই তার সিলেক্ট করা জায়গা, খেতে গেলে বারবার তার পছন্দের রেস্টুরেন্ট। এমনকি আমার পরনের পোশাকটাও তার মেয়েলি পছন্দের হতে হবে। উল্টো দিকে আমি তার ব্যাপারে কোনো মতামত দিলে তা হয়ে যেত তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। বারবার আমাকেই আমার সত্তার সঙ্গে আপস করে চলতে হয়েছে।”।”
“দুজন মানুষের পছন্দে ভিন্নতা থাকাটা স্বাভাবিক। তাই সেখানে প্রয়োজন হয় সমঝোতা, একে অপরের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেওয়া। আর এসবের জন্য একটা পার্টনারশিপে ভালোবাসার থেকেও যেটা বেশি প্রয়োজন, তা হলো প্রেম। প্রেম একান্ত জরুরি। আর আমরা সম্পর্কের জেরে একে-অপরকে ভালোবাসলেও, আমাদের মাঝে প্রেমটা হয়ে ওঠেনি। তাই হয়তো আপস করতে করতে আমিও একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ি।”
“কিন্তু ভালোবাসা আর প্রেমের মধ্যে পার্থক্য কি?” বোরাকের কথার মাঝেই অস্থির মৌ বিমূঢ়তা কাটিয়ে দ্বিধান্বিত মস্তিষ্কে প্রশ্নটা করে বসল। তার একনিষ্ঠ দৃষ্টি কিছুটা অন্যমনস্ক বোরাকের দিকেই আবদ্ধ। মুহূর্তের জন্যও সেখান থেকে সরছে না।”
মৌটুসীর সরল প্রশ্ন শুনে বোরাক মৃদু হেসে বলল, “হিউজ ডিফারেন্স।”
এরপর একটু থেমে ধীর, ভারী কণ্ঠে বলতে লাগল, “প্রেম আর ভালোবাসা একই সুতোয় গাঁথা ভিন্ন দুটো পুঁতি। পৃথিবীর সকল বৈবাহিক সম্পর্কে ভালোবাসা থাকলেও, সকল সম্পর্কের মাঝে প্রেম থাকে না। আর যেখানে প্রেম নেই, একটু গভীরে গিয়ে দেখবে—সেখানে সম্পর্কটা কোনো না কোনোভাবে মানিয়ে নেওয়ার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো একজন মানিয়ে নিচ্ছে, কিংবা দুজনেই ভাগাভাগি করে।”
“ভালোবাসতে কারণ লাগে, মৌ। সম্পর্ক, টান, মায়া, অভ্যাস কিংবা দায়িত্ব লাগে। কিন্তু প্রেমের কোনো কারণ হয় না। ভালোবাসা সহজেই যে কারোর সাথে হলেও; প্রেমটা সহজে হয় না, সবার সাথে হয় না। ভালোবাসা মন্থর একটা প্রক্রিয়া। আর প্রেম খুবই দুর্লভ অনুভব, তবে একেবারে হঠাৎ অনির্দিষ্ট, অনিয়ন্ত্রিতভাবে ধরা দেওয়ার মতো সক্ষমতা আছে তার। এমন অনেক অনেক পার্থক্য আছে, এক রাতে বলে শেষ করা সম্ভব নয়।”
“বিভিন্ন কারণে ভালোবাসার বিচ্ছেদ ঘটলেও, প্রেমের বিচ্ছেদ ঘটে না সহজে। হয়তো আমারও আমার প্রাক্তনের সঙ্গে প্রেম হয়ে ওঠেনি। তাই একসময় বিচ্ছেদ নামক পরিণতি ঘিরে ধরে আমাদের।”
নীরবতা…… উভয়ই নীরব। মৌটুসী তো একেবারেই নির্বাক। মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই তাত্ত্বিক বিষয়গুলো নিয়ে সে কখনো এত গভীরভাবে ভাবেনি। এই প্রথমবার সে ভাবছে, ভাবতে শিখিয়েছে সামনের মানুষটা। অনুভূতির যদি স্তর থাকে, তবে তার অনুভূতিগুলো কোন স্তরের বাসিন্দা?
বোরাক ধীর গতিতে একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল। এরপর একই অবস্থানে থেকেই বলল, — “ঘুম পাচ্ছে তোমার?”
“নাহ্।” অল্প ফাঁক হয়ে থাকা ঠোঁট দুটো আলগা করে অকপটে বলল রমণী।
“তাহলে আরেকটা ঘটনা বলি, শুনবে?”
মৌটুসী এবারে একটু নড়েচড়ে দাঁড়াল। কেমন যেন হাঁসফাঁস লাগছে তার। বুকের ভেতর অস্থিরতা ক্রমশ বাড়ছে। সামনের মানুষটার জীবনকে বিচার করার কোনো ক্ষমতা তার নেই। তার কষ্টের গভীরতা মাপারও কোনো উপায় নেই। এমনকি সেই কষ্ট একটুও কমিয়ে দেওয়ার সামর্থ্যও হয়তো তার নেই। তবুও সে আজ মানুষটার সবটুকু হাহাকার শুনতে চায়। তাকে একটু জানার জন্য এই একটু চেষ্টা করতে চায়।
সেই লক্ষ্যে বোরাকের দিকে তাকিয়ে ঘনঘন উপর-নিচ মাথা নাড়াল মৌটুসী। দৃঢ় অথচ অস্থির কণ্ঠে বলল, “অবশ্যই শুনব। আজ আমি আপনার সব কথা শুনব। আপনি নির্দ্বিধায় মন খুলে বলুন, বোরাক। আমি আছি, শুনছি আপনাকে।”
বোরাক কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর দৃষ্টি সামান্য তুলে সামনের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল,
— “তখন ব্যবসায় নতুন আমি, সবে বসেছি অফিসের চেয়ারে। বাবার সঙ্গে টুকটাক কাজ বুঝতে শুরু করেছি। সেদিন ঢাকায় যেতে হয়েছিল আমাদের। বাড়িতে ফিরতেও বেশ রাত হয়েছিল….. এসে দেখি আমার প্রাক্তন সুন্দর করে সেজেগুজে অপেক্ষা করছে। না, কোনো বিশেষ দিন ছিল না। তবুও ক্লান্ত শরীরে ফিরে স্ত্রীকে এভাবে দেখে ভালোই লেগেছিল। অর্ধাঙ্গিনীর রূপে মুগ্ধ হয়ে কাছে টেনে প্রশংসা করলাম। সৌন্দর্যের প্রশংসা করতে আমি আবার বেশ ভালোই জানি।
কথাটা বলার সময় বোরাক অন্যমনস্কভাবেই বাঁয়ে সামান্য ঘাড় ঘুরিয়ে মৌয়ের মুখের দিকে তাকাল। তবে তাকিয়েই থাকল না, বাক্যটি শেষ হতেই আবারও সামনে দৃষ্টি ঘুরাল।
“তারপর ফ্রেশ হয়ে স্বাভাবিকভাবেই দুজন একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করলাম। এরপর একজন স্বামীর মতোই তার কাছে কিছু একান্ত সময় চাইলাম। কিন্তু সে রাজি না। এখনো নাকি তার ফটোসেশন করা বাকি। এত সুন্দর করে সেজেছে, ঘর সাজিয়েছে—এগুলো কি এমনি এমনি? ফ্রেমবন্দি করে মানুষকে দেখাতে হবে না? এখন তার দাবি, ওই মাঝরাতে, আমাকে তার ব্যক্তিগত ফটোগ্রাফার হতে হবে। আমি তাও মানলাম। দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে কয়েকটা ক্লিপ নিলাম। সেগুলো আবার তার পছন্দ হলো না। কপট রাগ দেখিয়ে আবারও প্রথম থেকে শুরু করার তাগিদ দিল। এবার আমিও মেজাজ হারিয়ে ফেললাম। আমার শরীর ক্লান্ত। সারাদিনের ধকল, তারপর ঘরে ফিরে স্ত্রীর সহমর্মিতার বদলে কপট আচরণে ধৈর্য হারিয়ে ফেলি। আমি ওর না-চাওয়াকে সম্মান করিনি। রাগের মাথায় জোর করে ওকে কাছে টেনে নিয়েছিলাম।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তাকে আর পাইনি। বাবার বাড়িতে গিয়ে আমার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ দায়ের করেছিল। কী অভিযোগ জানো?”
“কী?” যান্ত্রিক কণ্ঠে ফিরতি প্রশ্ন করল মৌ।
“আই এম আ রেপিস্ট। শি হ্যাজ বিন ম্যারিটাল রেপড বাই মি।” সরাসরি মৌয়ের দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখে জবাব করল যুবক।
অতী অপ্রত্যাশিত একটা বাক্য শুনে মৌটুসীর অল্প ফাঁক হয়ে থাকা ঠোঁট দুটো আরও একটু ফাঁকা হয়ে গেল। কিন্তু বিস্মিত ওই মুখ থেকে বেরোল না কিছু। এমনকি এমন সংকোচপূর্ণ কথাটি শুনেও সে চোখ সরিয়ে নিতে পারল না বোরাকের দৃষ্টি থেকে।
বরং বোরাক নিজেই ঘাড় ঘুরিয়ে সামনে তাকায়। “আমার পৌরুষচিত্তে আঘাত করে বিষয়টা। বিশ্বাস করো, অসহ্য হয়ে উঠেছিল সবকিছু। মুক্তি চেয়েছিলাম সেই যন্ত্রণাময় সম্পর্ক থেকে। এতদিন যেটা শুধু মনে মনে ভাবতাম, এবার সেটা বাস্তবায়ন করার জন্য আইনজীবীর সঙ্গে কথা বললাম। ডিভোর্স পেপারও রেডি। কিন্তু আল্লাহ হয়তো সেদিন সেটা চাননি। কারণ তখনই জানতে পারলাম, সে আমাদের সন্তানের মা হতে চলেছে।”
আধো অন্ধকারে মৌ লক্ষ করল বোরাকের চোখে প্রথমবারের মতো এক টুকরো কোমলতা ফুটে উঠেছে।
— “সেই খবর শুনে আমি সব ভুলে গেলাম। রাগ, অভিমান, অপমান—সবকিছু। আমার নিজের একটা সন্তান আসছে, আমার অংশ আসছে—এই আনন্দ আমাকে গ্রাস করল। ভাবলাম, ক্ষুদ্র এই জীবন তো সবার মনমতো হয় না। আমিও না হয় নিজের পছন্দগুলোকে বিসর্জন দিয়ে একটু কো-অপারেট করেই একটা জীবন কাটিয়ে দিলাম! সন্তানের জন্য এটুকু করাই যায়। দেখা গেল, হয়তো সন্তান আসার পর সেও তার সন্তানের বাবাকে একটু বুঝতে শিখবে। মানসিক পরিপক্বতা বৃদ্ধি পাবে!
এই আশা নিয়ে নতুন করে তাকে আবার আমার জীবনে বরণ করলাম। এরপর কয়েকটা মাস তুলনামূলক ভালোই কাটল আমাদের। কিন্তু খারাপ সময় যেমন স্থায়ী হয়, ভালো সময়ও নয়। মাঝে কিছু খারাপ আমাদের জীবনে উঁকি দিতেই পারে।
সন্তান পৃথিবীতে আসার মাসখানেক আগে বাবাকে হারালাম। একেবারে হঠাৎ একদিন স্ট্রোকে বাবা পৃথিবী ত্যাগ করলেন। বাবা আমার কাছে শুধুই আমার বাবা ছিলেন না। তিনি ছিলেন এই পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে বড় আশ্রয়, আমার ঢাল, আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। তার আকস্মিক চলে যাওয়াটা আমি মেনে নিতে পারিনি। অন্যদিকে বাবার অনুপস্থিতি হুট করেই পাহাড়সম দায়িত্ব এসে পড়ল আমার ঘাড়ে। বাবা হারিয়ে আমি বাবা হলাম, আরও একটা সুখময় দায়িত্ব। সবকিছু সামলাতে আমি ক্লান্ত-অবিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তখন শুধু সন্তানের মুখটা ছাড়া আর কোনো কিছু ভালো লাগত না, দুনিয়ার কোনো সৌন্দর্য চোখে ধরত না। স্ত্রীকে সাজতে দেখলেও আগের মতো প্রশংসা আসত না। অথচ সে আমার অর্ধাঙ্গিনী হয়েও আমাকে বুঝতে পারল না। আমার শোকের মৌনতাকে তার প্রতি বিতৃষ্ণা ভেবে বসল। ভাবল, তার প্রতি আমার ভালোবাসা ফুরিয়ে গেছে। তাই সে অন্যত্র ভালোবাসা খুঁজে নিল। যেসময়টা আমার তার সঙ্গ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, সে সময়ই সে আমার হাত ছেড়ে দিল, পক্ষান্তরে নতুন উদ্যমে ভালোবাসায় আঁকড়ে ধরল তার পুরোনো কাজিন প্রেমিকের হাত।”
“ওই দুধের বাচ্চাটাকে রেখেই চলে গেল?” মৌটুসীর কণ্ঠটা এই পর্যায়ে খানিকটা কেঁপে উঠল। চোখের কোণদুটোও অজান্তেই ভিজে উঠেছে।
বোরাক খুব ধীরে দুদিকে মাথা নাড়ল।
“না, ঠিক তা না। বাচ্চাকে নিয়েই যেতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি তা হতে দিইনি। নাহলে যে আমি মরে যেতাম!”
মৌটুসীর বুকের ভেতরটা ক্রমশ ভার হয়ে আসছে। তাদের পরিচয়ের দুই মাসের মাঝে আজকেই সে মানুষটার অনেক অজানা কথা জানতে পারল। তবুও এই প্রথম তার মনে হলো—মানুষটাকে সে আসলে কতটুকু চেনে! আরও অনেক কিছু জানার বাকি আছে তার। মানুষটা আর কিছু বলছে না কেন? চুপ করে আছে কেন?
চোখ দুটো জ্বালা করে উঠল মৌয়ের। কাঁদতে ইচ্ছে করল। অদ্ভুতভাবে কাঁদতে ইচ্ছে করল। বোরাকের জন্য? নাকি তার নিজেরই কোনো কষ্টের জন্য—মৌ বুঝতে পারল না। অদ্ভুতভাবে তাদের অতীতের যাত্রাটা অনেকটা একই পথ নির্দেশ করছে। ভীষণ আঁকাবাঁকা, ভাঙা পথ। চলতি পথে প্রিয়জন হাত ছেড়ে দিল, একটা ছোট্ট প্রাণকে বুকে আগলে চলতে গিয়ে কতবার হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়া, আবার শক্তি সঞ্চয় করে উঠে দাঁড়ানো।
মৌয়ের খুব ইচ্ছে হলো, কিছু একটা বলতে।
‘আপনার খুব কষ্ট হয়েছিল বোরাক, সেই কষ্টের সাথে আমিও পরিচিত, তাই জানি এই কষ্ট ভীষণ কষ্টদায়ক’— কিন্তু ঠোঁট খুলেও কথাটা বের হলো না। মৌ ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিল। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুটুকু আর ধরে রাখতে পারল না। টুপটুপ করে গড়িয়ে পড়ল। লোকটার অবশ্য এদিকে খেয়াল নেই। সে দেখল না।
“একটা কথা কি জানো, মৌটুসী পাখি? তোমরা মেয়েরা পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর জাতি। তোমরা এক সিংহপুরুষের জীবনে যেমন স্বর্গীয় সুখ বইয়ে আনতে পারো। তেমনই তার জীবনে নরকযন্ত্রণায় ভরিয়ে দিতে পারো এক ইচ্ছেতেই। কোনো ব্যাপারই না তোমাদের কাছে। একজন পুরুষকে ভাঙতে সবসময় একশোটা শারীরিক আঘাতের প্রয়োজন হয় না। দুই-একটা মানসিক আঘাতই যথেষ্ট।”
“মেয়েরা কেবল ক্ষমতাবানই নয়, বোরাক। নারীরা ভীষণ বোকাও। বোকা না হলে কী একজন দুর্ভাগিনী মাঝপথে এসেও আপনার মতন একজন অসাধারণ সহচরীর সঙ্গ ত্যাগ করে? আহ বোকা মানবী! এই নিঠুরতা কেন দেখালে তুমি?”
বোরাকের বিপরীতে মৌয়ের মন নিজে নিজেই প্রতিত্তোর করল।
বোরাক তখনও রেলিংয়ে ভর দিয়ে সামনে ঝুঁকে আছে। এবার দৃষ্টি একেবারে নিচের দিকে। কে জানে পাঁচ তলার এই উপর থেকে নিচের দিকে কী দেখছে এত নিবিড়ভাবে! ব্যালকনির অল্প আলোতে তার মুখের একপাশ ভালোই দেখতে পারছে মৌ। তবে অভিব্যক্তি বোঝা দায়। কতই না সাবলীলভাবে নিজের অব্যক্ত ব্যথাগুলো উগড়ে দিল। এখনো কত স্বাভাবিক। অথচ মৌয়ের বুকে ঠিকই তোলপাড় চলছে।
মৌটুসী পর্ব ৩৪
ভীষণ মায়া হলো তার মানুষটার জন্য, ভীষন। কী করা উচিত, মৌ জানে না। কী বলা উচিত, সেটাও না। শুধু মনে হলো, সঙ্গ না হোক, তবুও তাকে একটু আশ্বাস দেওয়া দরকার। স্নেহের আশ্বাস।
মৌ অবশভাবে ধীরে ধীরে হাত বাড়াল। কাঁপা আঙুলগুলো বোরাকের কপালের দিকে ঝুঁকে থাকা চুলগুলোর কাছে গিয়ে থেমে গেল এক মুহূর্ত। পরমুহূর্তেই সকল দ্বিধা ঝেড়ে খুব আলতো করে চুলগুলো ছুঁয়ে দিল।
