ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৭৪
শানজানা আলম
ঐশির ব্যাগ আর খাবার চলে এসেছে, এবারে নিয়ে এসেছে আরেকটা মেয়ে। একই চেক জামা পরা। খাবার খুবই কম, দুইটা রুটি সেই সাথে ডালের মত ঘন কিছু একটা। মেয়েটা খাবারের ব্যাগ রেখে চলে গেল।
ঐশি ব্যাগ খুলে আঁতিপাঁতি করে চার্জার খুজল, কোথাও চার্জার নেই! এটা কিভাবে সম্ভব! চার্জার ছাড়া ঐশি বাসা থেকে বের হয় নি! ব্যাগ খোলা হয়েছিল, লক করা ছিল না। ব্যাগে রাখা সব জিনিস অক্ষত শুধু চার্জার নেই, তার মানে এটা বের করে নেওয়া হয়েছে, যেন ঐশি কারো সাথে যোগাযোগ করতে না পারে। মিসেস নওফেল তাকে এখানে বন্দী করে রেখেছে! এখান থেকে কিভাবে বের হবে ঐশি! কেউই তো জানে না ঐশি কোথায় আছে! নায়েব পাশাকে টেক্সট করে রেখেছিল, সেটা তো সেন্ড হয় নি! নায়েব নিশ্চয়ই তাকে অনেক ভর্ৎসনা করবে, কেন এখানে আসতে গেল! ঐশিকে মেরে পুঁতে ফেললেও কেউ কিছু জানতে পারবে না। ঐশিকে না পেয়ে থানায় ডায়েরি করলে ওর লাস্ট ট্রেস পাবে এই বাড়ির ড্রয়িংরুম অবধি, সেখানে নিশ্চয়ই পুলিশ আসবে না!
এই সময়ে মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে, নাসির যেমন শয়তান, মাও তেমন। যেমন মা, তেমনই তো ছা হয়!
প্রেগন্যান্ট অবস্থায় খাওয়া দাওয়া অনিয়ম করলে শরীর খারাপ হয়ে যায় দ্রুত, তবে ঐশির এখনো শরীর দুর্বল হয়ে যায় নি। ব্যাগে কিছু বাদাম চকলেট আছে, সেটা দিয়ে তাকে চলতে হবে। তাকে নিশ্চয়ই দীর্ঘ সময় আটকে রাখবে না। কোনো না কোনো প্ল্যান তো নিশ্চয়ই করবে! হয়ে মেরে ফেলবে বা ডাক্তারের কাছে নিয়ে এবর্ট করে ফেলবে, এরকম কিছু করবে, ঐশি একদমই ভয় পাবে না, কিন্তু খাবারে কিছু মেশালে? এত তাড়াতাড়ি কি তাকে মেরে ফেলবে?
ঐশির একটু একটু ভয় ভয় করতে লাগল, এত বড় বোকামি সে কীভাবে করে ফেলল! সবই তো প্ল্যান মাফিক এগুচ্ছিল! মাঝখান থেকে সে এখানে এসে ফেঁসে গেল।
খিদের কাছে ভয় ডর পরাজিত হয়ে যায়, ঐশি এই খাবারটা না খেয়ে চকলেট লেক্সাস বাদাম খেলো, কফি বানিয়ে খেয়ে শুয়ে পড়ল! মাকে মনে পড়ছে, অথৈকেও। সাজানো জীবনটা নিজের হাতে দুমড়ে মুচড়ে নষ্ট করে ফেলেছে ঐশি!
বিকেল অবধি আর কেউ এলো না। সন্ধ্যার দিকে আবার রানিয়া এলো খাবার নিয়ে।
এবারে ফ্রায়েড রাইস, চিকেন, সবজি, এসব দিয়েছে।
ঐশিকে বলল, আপনি সকালে খান নি?
ঐশি বলল, না।
কেন? না খেলে ম্যাডাম রেগে যাবেন।
শোনো, তোমার ম্যাডামকে বলবে, আমাকে বন্দী করে রাখলে বা চার্জার নিয়ে নিলে কিন্তু বিষয়টা এতটাও সহজ হবে না। আমি বাঘের খাঁচায় খালি হাতে আসিনি। বাইরে আমার বন্ধুরা আছে, আমাকে না পেলে পুলিশে রিপোর্ট করা হবে, সেখান থেকে আমার ফোনের লাস্ট ট্রেস পাবে তোমার ম্যাডামের প্লেস। আমি মরে গেলেও তারা কেউ বাঁচতে পারবে না।
রানিয়া শান্ত স্বরে বলল, আপনি নিশ্চিন্তে খান, কোনো খাবারে বিষ নেই।
ঐশি বলল, তুমি রাইসটা দুই চামচ খাও, চিকেন আর ভেজিটেবলটাও এক চামচ করে খাও।
খেয়ে পানি খেয়ে দেখাও।
রানিয়া অবাক হলো, এই মেয়ে তো শান্ত অবলা নারী নয়। তবে সে খাবারটা খেয়ে ঐশিকে প্রমান দিলো এতে কিছু নেই।
ঐশি বলল, এখানে একেকজন যেন না আসে, আসবে শুধু তুমি। আমি মরে গেলে এই বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ ফাঁসবে। সে ব্যবস্থা আমি করে রেখে এসেছি।
রানিয় চলে গেল, ঐশি তারপরে খেলো।
মিসেস নওফেল পুরোটা শুনলেন, বিষয়টা মেয়েটা খুব একটা মন্দ বলে নি, মাথা থেকে সরে গেছে ফোন ট্র্যাকিংয়ের বিষয়টা। আর এটাও সত্য, এখানে তো ও নিশ্চয়ই কোনো প্ল্যান সাজিয়ে এসেছে, এখন বন্দী করে রাখবে নাকি ছেড়ে দিবে! সেটাই ভেবে দেখতে হবে। পুলিশ হয়তো সাহস পাবে না, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরালের জমানা, একটু অসাবধানে সব কিছু ভেঙেচুরে যেতে পারে।
মিসেস নওফেল বললেন, রানিয়া, ওর ঘরে শুধু তুমি যাবে। খাবারটা টাইমলি দিও, আর খেয়াল রেখো সারাক্ষণ, চোখে চোখে রাখবে।
বিকেল হয়ে গেলেও তাহিরা বেগম ফোনে ঐশিকে পেলেন না৷ তিনি ঐশির বাবাকে জানালেন। ঐশির বাবা বললেন, অথৈকে জিজ্ঞেস করো তো, ওর সাথে যোগাযোগ করেছে কিনা?
তাহিরা বেগম অথৈ কে ফোন করলেন। অথৈ ডাক্তারের চেম্বারে বসে আছে, অপেক্ষা করছে সিরিয়ালের জন্য। এহসান নিয়ে এসেছে।
ফোন বাজছে দেখে, এহসান বলল, সাইলেন্ট করো। পরে কথা বইলো
অথৈ বলল, মা ফোন করছে!
-পরে কথা বলো, এহসান আবারও বলল।
অথৈ বলল, একবার পিক করি।
এহসান কিছু বলল না আর।
তাহিরা বেগম কোনো ভূমিকা না করে বলল, অথৈ, ঐশির সাথে কথা হয়েছে?
অথৈ বলল, না তো, কেন মা? আপু কি চলে এসেছে?
হ্যা, গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকায় গিয়েছে, এখনো কোনো ফোন করেনি, ফোনে পাচ্ছিও না।
অথৈ বলল, আচ্ছা, আমি দেখছি।
ফোন রেখে অথৈ এহসানকে বলল, আপু নাকি কাল সন্ধ্যায় ঢাকা এসেছে, তারপর আর যোগাযোগ করে নি, ফোন বন্ধ বলসে!
এহসান তাচ্ছিল্য করে বলল, দেখো, কোথায় কোন অভিসারে আছে!
অথৈ একটু কষ্ট পেয়ে বলল, জানো তো ওর শরীরটাও ভালো না। তোমাকেই তো ডেকে বলল, এভাবে কেন বলছ?
ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৭৩
এহসান বলল, তোমার মা এমনি তো তোমাকে ফোন
দেয় না, আজকে ফোন দিয়ে কেমন আছ সেটা জিজ্ঞেস করলেন না, তার মেয়েকে পাচ্ছে না, এজন্য তোমাকে ফোন করেছে! আমি আর কিছু বলতে চাই না। আমার স্পষ্ট কথা হচ্ছে, এসব কোনো বিষয়ে তুমি ঢুকবে না। এটা মনে রাখবে। আমি তোমাকে কখনো কোনো প্রেশার দিইনি, এই বিষয়টা মাথায় রেখো।
অথৈ খুবই আহত হলো এহসানের ব্যবহারে।
