Home এমপি শেহরান মির্জা এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১৬

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১৬

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১৬
সেঁজুতি আক্তার

-শেহরান মাইরা উঠানে পা রাখতেই রফিক মিয়া দৌড়ে আসলেন। শেহরানের দিকে তাকিয়ে বললেন, একি বাবা তোমার এই অবস্থা কেন? মাইরার দিকে তাকিয়ে বলল, মাইরা তুই জামাইকে পুকুরে নিয়ে গেছিলি?
-মাইরা মামার দিকে তাকিয়ে হে হে করে হাসলো। মনে মনে বলল, এইরে এখনি মামার সামনে পড়তে হলো। রফিক মিয়া আবার কিছু বলতে নিলেই মাইরা উনাকে কথা শেষ করতে দিল না। তার আগেই বলল, আসলে মামা হয়েছে কি। উনি তো শহরে থাকেন। গ্রামে আসা হয় না। তাই পুকুর দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। রফিক মিয়ার পেছনে ইমন দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে। কারণ ও তো জানে তার মাইরা আপু কতটা দুষ্টু।

-শেহরান ভ্রু কুঁচকে মাইরার দিকে তাঁকালো। তাহলে এই মেয়ে ইচ্ছা করে এই কাজ করেছে। ভাবতেই চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। রাগী চোখে মাইরার দিকে তাকিয়ে হন হন করে ভিতরে চলে গেল।
-মাইরা মামার দিকে তাকিয়ে অপ্রস্তুত হাসলো। আসলে মামা হয়েছে কি। আমি যাই। হ্যাঁ, ওনার কি লাগে দেখি। বলেই মাইরা এক প্রকার পালিয়ে গেল।
-রফিক মিয়া বেশ বুঝতে পারলেন কাহিনী কি। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাইরে চলে গেলেন। ওইদিকে দোকান খোলা।
-শেহরান রুমে এসে জামা কাপড় চেঞ্জ করে ফোনটা নিয়ে বিছানায় বসলো। মাইরা তাড়াহুড়ো করে চেঞ্জ করে জামা কাপড় ধুয়ে রোদে মেলে দিয়ে আসলো।
-রুমের সামনে উঁকি মারতেই দেখলো শেহরান বিছানায় গম্ভীর মুখে বসে ফোন স্ক্রল করছে। মাইরা পিছনে ফিরে চলে যেতে নিলেই শেহরানের রাশভারি কণ্ঠ শুনে থমকে দাঁড়ালো। বাড়িতে ওয়াশরুম থাকা সত্ত্বেও তুমি আমাকে ইচ্ছা করে পুকুরে নিয়ে গেলে তাই তো?

-মাইরা আস্তে আস্তে পিছনে ফিরল। একটু হেসে কিছু বলতে নিলেই শেহরান এক ধমক দিল। চুপ। একটা কথাও বলবে না। খুব ভালো লাগে না আমাকে অপদস্থ করতে? ইডিয়েট। তোমার সাথে এখানে আসা আমার ভুল হয়েছে। একটু পরেই আমি বেরিয়ে যাবো। যেতে হলে গুছিয়ে নেবে। না হলে এখানে থেকে যাবে। আশা করি দ্বিতীয়বার আমাকে বলতে হবে না। শেহরান কথাটা বলেই আবার ফোনের দিকে দৃষ্টি রাখলো।
-মাইরা ছলছল চোখে শেহরানের দিকে তাকালো। তারপর শুকনো ঢোক গিলে বলল, আপনি নিজেকে কি মনে করেন?
-মাইরার কণ্ঠ শুনে শেহরানের হাত থেমে গেল। সাথে সাথে মুখ তুলে মাইরার দিকে তাঁকাল। মাইরার চোখে পানি।

-জান, আপনি চলে যান। আপনাকে থাকতে হবে না এখানে। আমি আর আপনার সাথে যাবো না। কি মনে করেন নিজেকে? আমি কাঠের পুতুল? আমার কোনো অনুভূতি নেই?
-শেহরান বেশ অবাক হলো। এ যেন নতুন এক মাইরাকে দেখছে। এমন ভাবে কথা বলতে কখনো দেখেনি।
-মাইরা আবার বলা শুরু করল। আমি বয়সে ছোট হতে পারি। কিন্তু আমি সব বুঝি। মাইরা ঢোক গিলে নিল। কান্না আটকানোর চেষ্টা করে বলল, আপনাকে বিয়ে করতে কে বলেছে? আপনার মতো মানুষের বিয়ে করা উচিত না। যে নিজের বউকে অধিকার দিতে পারে না, সেই মানুষের সারাজীবন একা থাকাই ভালো।
-শেহরানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। গলায় ঝাঁজ নিয়ে বলল, খবরদার। একদম বাজে বকবে না। কিসের অধিকার? নিজেকে দেখেছো? ছোট একটা মেয়ে তুমি। এত বড় বড় কথা পাও কোথা থেকে?

-মাইরা কেমন করে যেন হেসে ফেলল। ছোট! তো ছোট মেয়েকে বিয়ে করেছেন কেন? আমার তো কেউ নেই। না চাইতেও বিয়ে করতে হয়েছে। আপনি কেন করেছেন? আপনার তো কোনো ঠেকা পড়েনি।
-শেহরান হেসে ফেলল। তারপর তীক্ষ্ণ চোখে মাইরার দিকে তাকিয়ে বলল, স্টপ। আর একদম বাজে বকবে না।
-আজ তো আমাকে বলতেই হবে। আপনি আমাকে ছোট ভাবতে পারেন। আমি বয়সে ছোট হলেও মন-মস্তিষ্ক আপনার মতো না। যার বউ থাকা সত্ত্বেও অন্য মেয়ে! মাইরা ঢোক গিলল বউ মানেন না। ঠিক আছে। আপনি বিয়েটাও মানেন না, এটাও আমি বুঝি। কিন্তু বউ থাকা সত্ত্বেও আপনি একটা অন্য মেয়ের ছবি নিজের আলমারিতে রেখে দিয়েছেন। সে বিষয়ে আমি কথা বলতেও চাই না।

-মাইরা ফুঁপিয়ে উঠলো। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। গলা আটকে আসছে। তারপর আবার বলা শুরু করলো, হয়তো আপনার অতীত হতে পারে। কিন্তু তাও আমি বলবো। আপনার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে। আমি এতগুলো দিন সহ্য করেছি। কিন্তু আর না। আমি আর পারছি না। হাঁপিয়ে গেছি। এরপর যদি আপনি আমাকে রাখতে চান তো রাখুন। না হলে ছেড়ে দিন। মুক্তি দিন আমাকে এই সম্পর্ক থেকে।
-শেহরান এবার একটা অবাক করা কাণ্ড করে ফেলল। বিছানা থেকে নেমে একপ্রকার ছুটে এসে মাইরার চোয়াল চেপে ধরল। হিসহিসিয়ে বলল, এই তুই কি বলছিস ভেবে দেখেছিস? মুক্তি চাস তুই? মুক্তি চাস? এই কথা বলছিস না কেনো? কথা বল।
-মাইরার ব্যথায় মুখটা টনটন করে উঠলো। মুখের অসহ্য যন্ত্রণায় গোঙাতে লাগলো। শেহরান মুখটা ছেড়ে দিয়ে দু কদম পিছিয়ে গেল।
-মাইরা চোখের পানি মুছে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। শেহরান মাইরার যাওয়ার দিকে অগ্নিঝরা চোখে তাকিয়ে রইল। এই মেয়ের সাহস কি করে হয়। মুক্তি দেওয়ার কথা বলে কিভাবে? কথা খানি ভাবতেই মাথার মধ্যে রক্ত টগবগ করে উঠছে। কথায় আছে, কাউকে বেশি মাথায় তুলতে নেই। এর হয়েছে সেই অবস্থা।

-মাইরা দৌড়ে এসে বাড়ির পেছনের বাগানে দাঁড়িয়ে রইলো। কিছু ভালো লাগছে না।
-আফিয়া বেগম হাতে দুধের হাঁড়ি নিয়ে বাড়িতে ঢুকলেন। বাড়ির থেকে দুই তিনটা বাড়ি পরেই এক প্রতিবেশী। গরুর খাঁটি দুধ বিক্রি করেন। তাই উনি নিতে গিয়েছিলেন।
-ইমন মাঠের মধ্যে কিছু ছেলের সাথে খেলা করছিলো। হঠাৎ মনে পড়লো আজ তো মাইরা আপুর জন্মদিন। তাই খেলা রেখেই দৌড়ে বাড়ির দিকে ছুট লাগালো।

-বিকাল হয়ে গেছে। আরেকটু পরেই সন্ধ্যা নেমে যাবে। শেহরান খাওয়া দাওয়ার পরে একটু ঘুমিয়ে ছিলো। মাইরার সাথে সেই খাওয়ার সময় দেখা হয়েছে। আর হয়নি।
-মাইরা গোসলখানা থেকে হাতমুখ ধুয়ে রুমে এসে দেখলো, শেহরান শুয়ে শুয়ে ফোন দেখছে। মাইরা ড্রেসিন টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে একটা বোরকা পরে হিজাব বেঁধে নিলো।
-শেহরান আড়চোখে মাইরার কার্যক্রম দেখছে। তখন একটু বেশি রুড ব্যবহার হয়ে গেছে। কিন্তু এখন ইগোর জন্য কথা বলতে পারছে না। মনে মনে ভাবলো, এই মেয়ে এই ভর সন্ধ্যায় কোথায় যাচ্ছে?
-মাইরা শেহরানের দিকে ঘুরেও দেখলো না। রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
-শেহরান ভ্রু কুঁচকে মাইরার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। এই পিচ্চি মেয়ে কি ওকে ভাব দেখালো।

-মাইরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা ভ্যানে উঠে পড়লো।
-ইমন দৌড়ে বাড়িতে এসে আপু আপু করে ডাকতে লাগলো। কিন্তু মাইরার কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে মাইরার রুমের দিকে এগিয়ে গেল। রুমের সামনে দাঁড়াতেই দেখলো, শেহরান বসে বসে ফোন দেখছে। ইমন সামনে দাঁড়িয়ে বলল, আসবো ভাইয়া?
-শেহরান ইমনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, হুম এসো।
-ইমন রুমের চারিদিকে তাকিয়ে বলল, ভাইয়া আপু কোথায়?
-শেহরান ভ্রু কুঁচকে বলল, তুমি জানো না তোমার আপু কোথায়?
-না তো ভাইয়া। আমি কেবল বাসায় আসলাম। দেখলাম আপু কোথাও নেই। আজ তো আপুর জন্মদিন।

-শেহরান ইমনের কথা শুনে একটু অবাক হলো। জন্মদিন? কত বছর পড়বে তোমার আপুর?
-ইমন হা হা করে হেসে ফেলল। আপনি জানেন না আপুর জন্মদিন? আপনার বউ, আপনি জানেন না কত বছর পড়বে? ইমন হাতের আঙুলের দিকে তাকিয়ে আঙুল গুনে বলল, আপুর গুনে গুনে ১৭ বছর পড়বে।
-শেহরান বিড়বিড় করে বলল, ১৭। তারমানে আর এক বছর। ভাবতে ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি চলে আসলো। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলো, আচ্ছা ওই মেয়ে কোথায় গেছে। তখন ইমনের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি তো জানি না তোমার আপু কোথায় গেছে।

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১৫ (২)

-সে কি কথা ভাইয়া, আপনি জানেন না?
-না তো। চলো তো গিয়ে দেখি কোথায় যেতে পারে। বলেই ইমনের সাথে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ আগে আজান দিলো। শেহরান ইমনের সাথে মিলে এলাকার মধ্যেই খুঁজলো। কিন্তু মাইরাকে কোথাও পেল না। এবার শেহরানের একটু টেনশন হতে লাগলো। কোথায় যেতে পারে মেয়েটা। বুকের মধ্যে কেমন করতে লাগলো। কোনো বিপদ হলো না তো?

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১৭