Home শিউলি ফুল শিউলি ফুল পর্ব ১

শিউলি ফুল পর্ব ১

শিউলি ফুল পর্ব ১
তাজরীন ফাতিহা

কলপাড়ে বাসন মাজছে শিউলি। কলপাড় ভর্তি বাসন কোসন। এ বাড়ির বউ সে। দেখতে শুনতে চিকনচাকন, হাতে ইমিটেশনের সরু একজোড়া চুড়ি। হাত গলিয়ে চুড়ি দুটো খসে পড়বে পড়বে ভাব কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য বেড়ির জন্য যেন সেটি আর শেষ পর্যন্ত পড়ছে না। চিকন হাতদুটোতে কালসিটে দাগ। পরনে কমদামি থ্রি পিস। ওড়না মাথায় পেঁচিয়ে একমনে কাজ করছে। হালকা পাতলা গড়নের হওয়ায় তাকে অল্পবয়সী মনে হলেও তার বয়স বিশ পেরিয়েছে। এই বাড়িতে বউ হয়ে এসেছে তিন বছরের বেশি। রান্না বসিয়ে আধোয়া বাসন, কড়াই ধুতে এসেছে। সেই মুহূর্তে লুঙ্গি উঁচিয়ে দম্ভের সহিত বাড়িতে প্রবেশ করল হামিদ। শিউলি ঘাড় ঘুরিয়ে কপাল কুঁচকে রাখা পুরুষটিকে এক পলক দেখল। হাতে সস্তায় কেনা বিড়ি বোধহয়। একটু পরপর টানছে আর ধোঁয়া ছাড়ছে। দাড়ি গোঁফের আড়ালের ঐ মুখটি দেখতে শিউলির বরাবরই ভয়ংকর লাগে।
শিউলি সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে কল চেপে দ্রুত বাসন ধুতে লাগল। যেন এখান থেকে চটপট পালাতে পারলেই বাঁচে সে। শেষ তিনটা পাতিলটি ধুয়ে আর উঠতে পারল না খ্যাক খ্যাক দরাজ কণ্ঠ কানে এসে লাগল।

“ঐ কল চাপ ভালা কইরা, গতর খাটাইতে ইচ্ছা করেনা না? বেলা কয়টা বাজে এহোনো রান্ধা হয়নাই? হারাদিন করস কী ফকিন্নী? পিঁপড়ার মতন কাম করতাছে। হারাদিন খাইট্টা আইছি ওর রং ডং দেখতে। ”
শিউলি পাতিল, বাসন নিয়ে সাইডে চেপে জায়গা দেয় স্বামীকে। ঘরের ভেতর থেকে শিউলির শাশুড়ি ছেলের কণ্ঠ শুনতে পেতেই শিউলির দুর্নাম করা শুরু করেছে ইতোমধ্যে। ছেলে বাড়ি ফেরার সাথে সাথে বউয়ের একহাত লম্বা অকর্মণ্যের ফিরিস্তি না শুনালেই নয় যেন। এতো বাঙালি শাশুড়িদের চিরায়ত রূপ ও ঐতিহ্য। শিউলি মাথা নিচু করে ঠাঁই বসে আছে। হামিদ নিজ থেকেই কল চেপে পা ধুয়ে শিউলিকে আদেশ দিল,
“ঐ আমার লুঙ্গি আইনা দে। গোসল কইরা খাইতে বমু। খাওন না পাইলে আইজকা তোরে খাইছি ফকিন্নী। ওঠ যা।”

শিউলি মাথা নিচু করেই লুঙ্গি, সাবান এনে দিল। এসে দেখল আধোঁয়া ছাই মাঝা কড়াই তিনটা চকচক করছে। শিউলি এক পলক হামিদের দিকে চেয়ে কড়াই, বাসন তুলে নিতেই শুনল,
“কড়াই ধুইয়া দিছি দেইখা আকাশে উড়িস না, গোসল করতে সমস্যা হইতাছিল। ভাবছিলাম তোরে একটা লাত্থি মারতে কিন্তু মেজাজ ভালো দেইখা বাইচা গেলি।” বালতি থেকে গায়ে পর পর পানি ঢালতে ঢালতে বলল হামিদ।
শিউলি চুপচাপ প্রস্থান করল। আগে এতটা চুপচাপ ছিলনা সে। চঞ্চল এক কিশোরী ছিল যে পুরো গ্রাম দাপিয়ে বেড়াতো। বিয়ের পর থেকেই চুপচাপ থাকা শিখেছে সে। আলু, বেগুনের তরকারির ঝোল ফুটছে উনুনে। মিনি মাছ দিয়ে রান্না করেছে। আর করেছে টক পাতা দিয়ে পাঁচমিশালি ছোট মাছের চচ্চড়ি। পুকুরের মাছ। কয়েক বাড়ি মিলে মাছ চাষ করে। প্রত্যেক মাসেই মাছ পায় ভাগে হামিদরা। শিউলি উনুনে লাকড়ি ঠেলে দ্রুত তরকারি ফুটাল। শাশুড়ির হাঁক ডাকে চটপট গরম ভাতের মাড় গালতে গিয়ে হাত কেঁপে উঠে মাড় পায়ের উপর পড়ল। চিৎকার করতে না চাইলেও আর্তনাদ বেরিয়ে এল মুখ দিয়ে। পাশে পাতিল থেকে পানি নিয়ে পায়ে ঢাললো দ্রুত। জ্বালাপোড়া শুরু হয়ে গেল মুহূর্তের মাঝে।

ওদিকে হামিদের চেঁচামেচির আওয়াজ শুনতে পেয়েছে শিউলি। পায়ের চিন্তা বাদ দিয়ে মাড় গেলে চুলায় ভাত সেঁকে নিল কিছুক্ষণ। স্টিলের থালায় গরম ভাত বেড়ে তরকারি বেড়ে নিল। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কোনোরকম হেঁটে উঠোনের চৌকির উপর বসা হামিদকে থালা এগিয়ে দিল। হামিদ কটকট চোখে শিউলিকে একবার দেখে হাত ধুয়ে ভাত মাখাতে যেতেই ধোঁয়া ওঠা গরমে হাত একদম পুড়ে গেল যেন। হাত সরিয়ে ঝাড়া মারতে মারতে শিউলির দিকে একদম ঠান্ডা দৃষ্টি দিল। শিউলি মাথা নিচু করে ফেলল মুহূর্তের মাঝে। শিউলির শাশুড়ি ছেলের দিকে হাতপাখা চালাতে চালাতে মুখ খুললেন,

“এই ছেমড়িরে দিয়া কি করবি হামিদ? এই মাইয়া এহন পইযন্ত সোয়ামী কোনডা পছন্দ করে না করে হেডা বুজে না। কতবার কইছি হামিদরে এমন গরম ভাত দিবি না, ও পছন্দ করেনা এমন গরম ভাত। এই ছেমড়ি হুনে কোনো কতা?” আক্ষেপ ঝড়ে পড়ছে যেন কণ্ঠে।
শিউলিকে মাথা নিচু করে নিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হামিদ বলল,
“চোখের সামনে থেকে এহনো যাস না? লাত্থি খাওয়ার লাইগা দাঁড়ায় আছোস?” রাগ উপচে পড়ছে কণ্ঠে।
শিউলি প্রস্থান করতে করতে শুনল শাশুড়ি বলছে,
“এই বাজা মাইয়ারে আর কতকাল পালবি? এতো দরদ কিসের তোর? আরেকটা বিয়া কর কইতাছি, হুনোস না ক্যান?”

শিউলি দুপুরে ভাত খেতে পারেনি। শরীরটা ভালো যাচ্ছেনা কয়েকদিন ধরে। দুর্বল লাগে। তার উপর আজ পায়ের যন্ত্রণায় ঘুমাতে পারছে না। জ্বালাপোড়া করছে তবে শিউলি পাত্তা দিচ্ছে না। তার মাঝে মধ্যে মনে হয় অনুভূতি প্রকাশের সিস্টেম তার নষ্ট হয়ে গেছে। সারাদিন কাজ শেষে গোসল করেছে বিকেলের দিকে। ভেজা চুলগুলো বালিশের উপর মেলে শুয়ে আছে গালের নিচে এক হাত দিয়ে। জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে নিঃশব্দে। সাঁঝ নেমে এসেছে। হামিদ ঘরে ঢুকল ঐ মুহূর্তেই। শিউলিকে অবেলায় শুয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে আসল।
“এই সাঞ্জের বেলায় হুইয়া আছোস ক্যান? ঘরদোর আন্ধার কইরা কি শোক দিবস পালন করস?”
জবাব এল না কোনো। হামিদ লুঙ্গি ঠ্যাংয়ের ভাঁজে নিয়ে চৌকিতে আরাম করে বসল। শিউলিকে গালের নিচে এক হাত দিয়ে ঘুমাতে দেখে আর টুশব্দ করল না। আচমকা চোখ গেল পায়ের কালচে দাগে। কেমন কালো কালো হয়ে আছে। হামিদ জহুরী নজরে একপলক দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
পায়ে শীতল স্পর্শ পেতেই শিউলি চোখ মেলল। কেউ খুব মোলায়েমভাবে পায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তাকাতেই দেখল হামিদ। শিউলিকে চোখ মেলতে দেখে মুখ শক্ত করে বলল,

“পা এমনে পুড়ছে কেমনে?”
শিউলি ঝটপট পা সরিয়ে উঠে বসল। খোঁপা করতে করতে নিচে নামতে চাইলে হামিদ বাধা দিল।
“কই যাস এই পা লইয়া?”
এবারও উত্তর এল না। হামিদের ধৈর্যের বাঁধ যেন এবার ভাঙল। শিউলির চুল চেপে ধরতেই আর্তনাদ বেরিয়ে এল মুখ দিয়ে নারীটির।
“মুখে তালা লাগাইছস? কথা কস না ক্যান?”
“চুল ছাড়েন।” চোখ বন্ধ করে মাথার পেছনে হামিদের হাতের উপর হাত চেপে ধরে।
“কথা কবি?” চুলের গোছা আরও শক্ত করে ধরে।
শিউলি ঘাড় নাড়ল।

“মুখে ক।”
“কমু।”
“এবার ক পুড়ছে কেমনে?”
“ভাতের মাড় গালতে গিয়া।”
“এহনও ভাতের মাড় গালতে পারোস না? আকাইম্মা বেডি।” হামিদ বিস্মিত গলায় বলল।
“পারি। হাত কাপতেছিল।”
“শরীর খারাপ নাকি?”
“জানি না।”
“কাইলকা কবিরাজের কাছে নিমুনি।”
“লাগবে না।”
“ক্যান?” হামিদ ভ্রু উঁচিয়ে জানতে চায়।
“বাজা মাইয়ার পেছনে টেকা খরচ করতে হয়না।” অদ্ভুতভাবে হেসে।
“তোর আবারও লাত্থি খাওয়ার ভূত মাথায় চাপছে?”
“ঐটা তো সবসময়ই খাই। মাথায় চাপন লাগবে ক্যান?”
“কেডা লাইথায়?”
“নিজেরে জিগান। আমারে জিগান ক্যান?” হাতের চিকন চুড়ি দেখতে দেখতে।
“বহুত মুখ চলতাছে।”

“কার আমার? আমি তো চুপ কইরাই ছিলাম, চুল চাইপা ধইরা কথা আপনে কওয়াইছেন। এহন আবার মুখ চলতেছে কন? এত দ্রুত রঙ না বদলাইলেই পারেন।” শিউলি ঘাড় ঘুরিয়ে বাইরে চাইল।
“এইলিগাই তোগোরে প্রশ্রয় দিতে হয়না বান্দির ঘরের বান্দি। মাথায় উইঠা নাচা ফকিন্নি গো স্বভাব।”
“দিতে কইছে কে? চলেন নিজের মর্জি মতো। আমি এই ঘরের বান্দি মানুষ। দুইবেলা খাওন দিতেছেন হেইডা কম কিছু? যহন তহন গালাগালি করার লাইগা আপনে গো মতো পুরুষের একটা বান্দি দরকার আছে। নইলে হারাদিনের রাগডি মিটাইবেন কেমনে?”
“থাক তুই। তোরে জিগানোই আমার ভুল হইছে।” ফোস ফোস করতে করতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

রাত বারোটা বাজে। এহনো হামিদ বাসায় ফেরেনি। শিউলি উৎকণ্ঠা নিয়ে বসে আছে ঘরে। লোকটা রাগ করে গেল কই? শাশুড়ি তাকে বারবার জিজ্ঞেস করছিল কই গেছে হামিদ? উত্তর দিতে পারেনি শিউলি। উত্তর দেবে কোথা থেকে সে নিজেই তো জানেনা। একলা ঘরে এত ভয় লাগছিল তার। লোকটা যতই হম্বিতম্বি করুক পাশে থাকলে ভয়টা লাগেনা। শিউলি অজানা আশঙ্কায় মুখ চেপে কাঁদছিল আর আল্লাহর কাছে দোয়া করছিল কোনো অঘটন যেন না ঘটে। রাগের মাথায় আবার কিছু করে ফেলল নাকি? খট করে দরজায় আওয়াজ হতেই শিউলি হন্তদন্ত হয়ে উঠে জিজ্ঞেস করল,
“কে?”
“দরজা খুল।”
“কে?” শিউলি আবার জিজ্ঞেস করল।
“আমি হামিদ, গলা চিনোস না?” কণ্ঠে রাগ।
“কে?”
“দরজা খুল, ভিত্রে ঢুইকা তোরে বুজাইতাছি কে? লাত্থি দিয়া ঘর থেইকা বাইর করমু।” দরজায় জোরে চাপড় মেরে।
শিউলি তিনবার জিজ্ঞেস করে তারপর দরজা খুলল। এত রাতে জীন ভূত মানুষের সুরতে আসে শিউলি শুনেছে তাই তার দাদির শিখিয়ে দেয়া পদ্ধতি অনুসরণ করল। ভয়ে ভয়ে দরজা খুলে সরে দাঁড়াতেই হামিদ ভিতরে ঢুকে পরনের শার্ট খুলল। গামছা নিয়ে ঘর থেকে বের হতে নিতেই শিউলি পিছু ডাকল।

“কই যান?”
“মরতে, যাবি?”
“এত রাইতে গোসল কইরেন না আবার।”
“তোরে জিগাইছি? নিজের চরকায় তেল দে।” গটগট পায়ে বেরিয়ে গেল।
শিউলি বলতে পারল না এই গভীর রাতে বাইরে থাকা কিংবা যাওয়া ঠিক না। তেনারা আসে শিউলির দাদি বলতো। কুপি বাতি ধরিয়ে লোকটার পেছন পেছন গেল। উঠোনে একটা কম পাওয়ারি বাতি জ্বলছে। লোকটা বালতি থেকে ঝপ ঝপ করে পানি গায়ে ঢালছে। একবিন্দু ভয় ডর নেই লোকটার। সে তো জীবনেও এই রাতেরবেলা বের হতো না যদি না লোকটা এখন গোসল করতো। কি সাহস! রসুই ঘরে গিয়ে ভাত, তরকারি বেড়ে নিল। লোকটা গোসল করে কখন আবার হাঁক দিয়ে বলে, ভাত দে। তাই আগেই সব গুছিয়ে নিল। মুহূর্তের মাঝে কারেন্ট চলে গেল। যাওয়ার আর সময় পেল না, হুটহাট কারেন্ট চলে যাওয়া যেন নিত্যদিনের ঘটনা। ভাগ্যিস কুপি জ্বালিয়েছিল। হামিদের সাথে সবসময় একটা ছোট টর্চ লাইট থাকে, লুঙ্গির ভাঁজে গিট্টু দিয়ে রাখে। তাই আর লাইট দেয়ার জন্য ব্যস্ত হতে হলো না। শিউলি কুপির টিমটিমে আলোতে গ্লাসে পানি ঢালতেই হুট করে পেছন থেকে খুটখাট শব্দ ভেসে এল। শিউলি ভাবল হামিদের গোসল শেষ। মিহি গলায় ডাকল,
“শুনছেন, গোসল শেষ? লাইট আছে আপনার? নাকি কুপি নিয়ে আসব?”

কান খাড়া রেখেও যখন হামিদের প্রত্যুত্তর পাওয়া গেল না শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল যেন। দুরুদুরু বুকে হামিদকে ডেকে চলল। শুকনো ঢোক গিলে কুপি ধরে রসুইঘরের দরজা বরাবর এল। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ভয়ে বুক খামচে উঠছে। এতো রাতে সে জীবনেও বাইরে বের হয়না। সারাদিন এমনকি রাত এগারোটা পর্যন্ত নির্বিঘ্নে কাউকে ছাড়াই চলাচল করতে পারে সে কিন্তু দাদির বলা রাত বারোটার পর তেনারা আসে কথাটা যখনই মনে পড়ে ভয়ে হৃদপিণ্ড বন্ধ হয়ে যায় যেন। লোকটা কথার জবাব দিচ্ছে না কেন? ভেবেছিল উঠোন পেরিয়ে লোকটার সাথেই ঘরে ঢুকবে, যে অন্ধকার কুপির অল্প আলো ছাড়া নিজেকেও দেখা যায়না।
“এই, শুনছেন?” কাঁপা কাঁপা কণ্ঠ।
ফিরতি উত্তর এল না। উল্টো বাইরে থেকে ফোস ফোস আওয়াজ এল। শিউলির কেমন লাগল বোঝা গেল না। ইদানিং ভয়টা শিউলি বেশিই পাচ্ছে বোধহয়। ফিসফিস করে কে যেন ডাকল,
“শিউলি..”

হাড়হীম কণ্ঠ। অন্ধকার থেকে এই বুঝি কিছু একটা শিউলির মুখের সামনে এসে দাঁড়াবে। শিউলির মনে হলো কেউ এগিয়ে আসছে। এতক্ষণ নিজেকে শক্ত রাখলেও এবার আর পারল না চিৎকার করে উঠল কোনো অবয়বের উপস্থিতি বুঝে। কুপিটা হাত থেকে পড়ে নিভে গেল। শিউলি কাঁপতে কাঁপতে নিচে বসে কানে দুইহাত চেপে চিৎকার করে গেল। হুট করে অন্ধকারে কেউ আঁকড়ে ধরায় শিউলি আরও শিউরে উঠল। ভয়ে চিৎকার করতে চাইল তার আগেই একটি শক্তপোক্ত হাত তার মুখ চেপে ধরল। শিউলি দেখল জ্বলন্ত লাল দুটো চক্ষু তার দিকে চেয়ে আছে। আর ভারসাম্য রাখতে পারল না শিউলি। মুহূর্তেই ঢলে পড়ল।
চোখ পিটপিট করে চাইতেই মুখের উপর কারো অস্তিত্ব টের পেল। ধীরে ধীরে চোখ মেলতেই দেখল হামিদ এক হাঁটু উঁচু করে তাতে হাত মেলে দিয়ে তার দিকে চেয়ে আছে।
“তোরে কি জিনে আছর করছে? হুট কইরা অজ্ঞান হইলি ক্যা?”
শিউলি জবাব দিল না। মুখ ঘুরিয়ে থমথমে চেহারায় পাশ ফিরে শুলো। হামিদ কুপি নিভিয়ে শুতে নিলে শিউলি বলল,

“কুপি জ্বালানো থাক।”
“মাগো, তেলের টেকা তুই দিবি? হুদাহুদি কেরোসিন খরচ কইরা ফিতা নষ্ট করুম ক্যান?”
“ডর লাগে।”
“কিয়ের ডর? পাশে জোয়ান তাগড়া বেডা থাকতে তোর কিয়ের ডর?” বলেই ফট করে কুপি নিভিয়ে দিল।
পুরো ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকারে ছেয়ে গেল। শিউলির আবারও ভয়টা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল। চোখ মেললেই মনে হচ্ছে সেই অবয়বটা দেখতে পাবে সে।
“ভাত খাইছেন?” শিউলি ভয়টা কাটাতে ধীরে ধীরে জানতে চাইল।
“হ।”
আর কথা খুঁজে পেল না শিউলি। একটু পরে আবার ডাকল,
“শুনছেন?”

জবাব এল না। নাক ডাকার শব্দ শোনা গেল। শিউলি স্বামীর গা ঘেঁষে এগিয়ে শুলো। লোকটার জন্য জেগে থেকে কি ভোগান্তিটাই না আজ হচ্ছে। অন্যান্যদিন এই সময়টা সে থাকে গভীর নিদ্রায় আর আজ? লোকটা তো দিব্যি ঘুমিয়ে পড়তে পারে সে তো পারছে না। ভয়ে চোখ বেয়ে পানি গড়াতেই শুনল,
“দূরে সর। এমন গরমের ভিত্রে কাছে ঘেষস ক্যান?” বিরক্তি নিয়ে ওপাশ ফিরতে ফিরতে।
হামিদের শরীর দূরে সরে যেতেই শিউলি মুখ চেপে ফুঁপিয়ে উঠল। এরপর চোখ মুছে অক্ষিপট বুজল। তন্দ্রা এসে যেতেই কেউ পেছন থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল।
“বুকে আয়।”
“দিনে লাত্থি দিয়া রাইতে আসেন বুকে নিতে। বেডা জাত কত বহুরূপী!” নিভু নিভু কণ্ঠ।
“লাত্থি খাইতে না চাইলে ঘুমা, পটর পটর করিস না।” মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে।
শিউলির ভয় যেন মুহূর্তেই কেটে গেল স্বামীর আলিঙ্গনে। এইতো এখন শিউলি ঘুমাতে পারছে নিশ্চিন্তে।

শিউলি প্যান্ট ধুতে গিয়ে হামিদের দোকানের হিসেবের খাতার পৃষ্ঠা ভিজিয়ে ফেলেছে। সেগুলো ছিঁড়ে ভর্তা হয়ে গেছে। খেয়াল করেনি প্যান্টের পকেটে কিছু ছিল কিনা। ভয়ে বুক কাঁপছে তার। লোকটা কাল রাতে বলছিল গুরুত্বপূর্ণ কাগজ, কে কত জিনিস বাকি নিয়েছে সেসবের হিসেব। শিউলির শাশুড়ি ওদিকে চিল্লাচ্ছে রান্না বসানোর জন্য। শিউলির সেসব কানে ঢুকছে না। সে ভয়ে রীতিমত স্তব্ধ হয়ে গেছে। শিউলির শাশুড়ি এগিয়ে এসে বলল,
“অহনো বইসা আছোস? পোলাডা কাম শেষ কইরা আইয়া খানা না পাইলে চেঁচামেচি করব নে। ওড তাত্তারি।”

শিউলি ভয়ে ভয়ে শাশুড়ির দিকে চাইতেই তিনি চোখ কপালে তুলে চাইল,
“ঐ তুই কাগজ ভিজাইয়া ফালাইছস? হায় হায়, পোলাডার অন্ন ধ্বংস করা ছাড়া এই বিনাশিনি আর পারে কী? কত গুত্বপূণ্য একটা কাগজ। পোলাডা কাইল রাইতে কইলো তোর খেয়াল কই আছিলো হারামজাদি?” দাঁত কিড়মিড় করতে করতে।
শিউলি নেতিয়ে বসে রইল চুপচাপ। শিউলির শাশুড়ি ঘরে যেতে যেতে বলল,
“আইজকা আসুক। তোর কপালে শনি নাচেতেছে কয়দিন ধইরা। তোরে আইয়া ছেঁচবো নে, বজ্জাত ছেড়ি।”

শিউলি ফুল পর্ব ২