Home শিউলি ফুল শিউলি ফুল পর্ব ২

শিউলি ফুল পর্ব ২

শিউলি ফুল পর্ব ২
তাজরীন ফাতিহা

হামিদ বাড়িতে ঢুকল হনহন করে। রাগে সারা শরীর জ্বলে যাচ্ছে তার। বাজারে হাসু মিয়ার সাথে তুমুল গণ্ডগোল বেঁধেছে আজ। দুইদিন পর পর তার দোকান থেকে বাকি নিয়ে আজ পুরো বাজারের সামনে গলা উঁচিয়ে বলেছে হামিদ নাকি বেশি বেশি টাকা চাচ্ছে তার কাছে। অথচ সে পাই টু পাই হিসেব করে রেখেছিল হিসেবের খাতায়। মিথ্যাবাদিটা চিল্লাচিল্লি করে মানুষ জড়ো করে হামিদকে অপমান করে ছেড়েছে। কাল ঐ প্যান্টের পকেটে কাগজ রেখেছিল সেটা নিতে ভুলেই গেছে। নাহলে এতটা অপমানিত তাকে হতে হতো না। মুখের উপর ঝামা ঘষে দেয়া যেতো। কতবড় সাহস বাকি নিতে নিতে কলিজা আড়াই হাত লম্বা হয়ে গেছে ইতরটার। তার সাথে বিটলামি? হাসু মিয়ার অবস্থা খারাপ করে ছাড়বে সে। গলা উঁচিয়ে বলে এসেছে, আগামীকাল ভরা বাজারে সকলের সামনে হাসু মিয়ার নাক কাটবে সে। হিসেবের খাতা তার কাছে আছে। কত টাকা খেয়েছে সব কালকেই পাই টু পাই দেখানো হবে পুরো বাজারের সামনে। রাগে শরীর চিরচির করছে হামিদের। তিক্ত মেজাজে শিউলিকে উচ্চস্বরে ডাকল,

“ঐ লুঙ্গি দিয়া যা।”
শিউলি কেঁপে উঠল হামিদের হুঙ্কারে। কচু কাটছিল বটিতে। আজকে কচুর শাক রান্না করবে। একটা ইলিশ মাছের মাথা ছিল সেটা দিয়ে। হামিদের বড্ড প্রিয় এই খাবারটা। গতকাল খেতে খেতে কচু বাটা খেতে আবদার করল তার শাশুড়িকে। শিউলির শাশুড়ি তাই সকালে বলেছিল বেশি করে রসুন দিয়ে কচু শিলনোড়ায় বেটে সরিষার তেলের ভেতর কালোজিরা ও শুকনো মরিচের ফোড়নে রাঁধতে। সেগুলোর জোগাড় যন্তই করছিল শিউলি। সকালের ঘটনায় এমনিতেই তটস্থ। আজ আবার হামিদ বাড়ি এসেছেও তাড়াতাড়ি। পাতিলে হাত ভিজিয়ে উঠতে নিলে শাশুড়ি মায়ের কণ্ঠ শুনতে পেলো। উঠোনে মেলা ছেলের লুঙ্গি আর গামছা এনে হাতে ধরিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করছেন,
“কিরে মেজাজ এত চড়া ক্যান?”
“হাসু হালারপো আমার লগে বিটলামি করে আম্মা। কত বড় কলিজা ওর, আমি খালি হেইডা ভাবি। আমার দোকানতে বাকি নিয়া জায়গার উপ্রে অস্বীকার যায়, ওয় বলে অত টেকার সদায় নেয় নাই। ওরে ছিইড়া হালামু কাইলকা। আইজকা তো ওর হিসেবের কাগজটা নিতে ভুইলা গেছিলাম নয়তো ওয় আইজকা আমার হাতে শেষ হইতো।”

“কিয়ের হিসেবের কাগজ?”
“কাইলকা রাইতে যেডা আইনা পকেটে থুইছি হেইডা।” গায়ে ঝপঝপ করে পানি ঢেলে।
মাথায় বেশি করে পানি ঢালছে হামিদ। হামিদের মা ঢোক গিললেন। শিউলি আজকে শেষ। মনে মনে আওড়ালেন,
“কি করলি অলক্ষ্মী তুই?”
হামিদ লুঙ্গি পাল্টে কলপাড়ে লুঙ্গি রেখে শিউলির উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল,
“ঐ লুঙ্গিডা ধুইয়া দড়িতে মেল।”
গটগট করে হেঁটে দড়ি থেকে গেঞ্জি নিয়ে গায়ে জড়াল। এরপর শার্ট গায়ে চাপাতে চাপাতে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে আসল।
“ঘরে খাওনের মতো কিছু আছে? এহনও রান্ধা হয়নাই? ঘরের মইধ্যে হারাদিন করস কী?” কিড়মিড় কণ্ঠ।
শিউলির শাশুড়ি এগিয়ে এসে শুধালেন,

“হুন বাপ, হিসেবের কাগজ যে আনছিলি ওইডা কি আর নাই তোর কাছে?”
“আর থাকব কেমনে? হিসেবের খাতা থেকে পৃষ্ঠা ছিইড়াই তো আনলাম।”
“তোর বউ তো সাড়ে সর্বনাশ কইরা ফালাইছে।” বিলাপ করে।
“কী সর্বনাশ করছে?” কপাল মারাত্মকভাবে কুঁচকে।
শিউলির বুক অজানা কারণে খুব কাঁপছে। আজকে তাকে মার খাওয়ার হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। খুব করে চাচ্ছে শাশুড়ি মা যেন কিছু না বলে। মারকে বেশ ভয় পায় সে। সিরাজের বউয়ের হাতে সেদিন দেখেছিল কালসিটে দাগ পড়ে গেছে মার খেতে খেতে। অমানুষিকভাবে মারে সিরাজ ভাই। শিউলির অবস্থাও আজ রত্না ভাবির মতো হবে। হামিদের রাগ সিরাজ ভাইয়ের থেকে অনেক বেশি। কাকে থাপ্পড় দিয়ে নাকি সত্য সত্যই দাঁত ফেলে দিয়েছিল। আবার কাকে নাকি বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে আধমরা করে হাসপাতালে পাঠিয়েছে। সেসব মনে করে শিউলি শিউরে উঠে অনবরত কাঁপতে লাগল।

“তোর প্যান্ট ধুইতে যাইয়া ঐ ছেমরি কাগজ ভিজাইয়া ফালাইছে। একদম ভর্তা হইয়া গেছে হেই কাগজ।”
হামিদ অবিশ্বাস্য দৃষ্টি ফেলল মায়ের পানে। অদ্ভুতভাবে শীতল হয়ে পুনরায় জানতে চাইল,
“কী কইলেন আম্মা? আবার কন।”
“কাগজ ভর্তা বানায় ফেলছে ভিজাইয়া।”
হামিদ ঘুরে শিউলির পানে চাইল। শিউলি কেঁপে উঠল ভয়ে। হামিদের চক্ষু লাল হয়ে গেছে মুহূর্তের মাঝে। যেন হিংস্র কোনো পশু এখনই ঝাঁপিয়ে পড়বে তার শিকারের উপর। ঘুরে দ্রুত গিয়ে উঠোনে পড়ে থাকা লাকড়ি হাতে নিতে নিতে হুঙ্কার ছুড়লো,
“ফকিন্নীর বাচ্চা, তোরে আমার প্যান্টে হাত দিতে কেডা কইছে? তোর কইলজা আইজকা বাইর কইরা টুকরা টুকরা করমু বান্দির বাচ্চা।”
শিউলি ভয়ে দৌড় দিয়ে ঘরে দোর দেয়ার আগেই হামিদ দরজা ধাক্কিয়ে ভেতরে ঢুকল। পিছন পিছন শিউলির শাশুড়ি চিল্লাতে চিল্লাতে বলতে লাগল,

“কয়েক ঘা দে মুখপুরীরে। অলক্ষ্মী একটা, ঘরে যেদিন তে পা দিছে ওইদিনতে অপয়া ছায়া পড়ছে আমার বাড়ির উপ্রে। তোর অন্ন ধ্বংস করা ছাড়া অলক্ষ্মীডা আর পারে কী?”
হামিদের রাগে যেন আরও আগুন ঢেলে দিয়েছে। শিউলির চোয়াল চেপে ধরে ধাক্কা মারল। বিছানায় উল্টে পড়ল শিউলি। হামিদ শক্ত লাকড়ি দিয়ে যেই মুহূর্তে মারতে যাবে অমনি শিউলি উঠে হরহর করে বমি করে হামিদের গা ভাসিয়ে দিল। হামিদ থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে অপরিষ্কার বমিতে ভেসে দাঁড়িয়ে রইল। সদ্য গোসল করা তার মাঠে মারা গেল। শিউলি মুখ চেপে হুহু করে কেঁদে উঠতেই হামিদ হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। উঠোনে লাকড়ি ফেলে চিল্লিয়ে উঠল,
“বান্দির ঘরের বান্দি আমার এতগুলা টেকা তুই তোর বাপের বাড়িত্তে আইনা দিবি। নইলে তোরে কোরবানি দিমু।”

পুনরায় গোসল করতে করতে শিউলির গুষ্ঠি উদ্ধার করতে লাগল। পুরা শরীর বমির গন্ধে ভরে গেছে। হামিদের সেসবে নিজেরই বমি এসে গেল। এমন রাগ মাথায় চড়ে আছে এই মুহূর্তে যে কাউকে খুন করে ফেলতে পারে হামিদ। রীতিমত খুন চেপে বসেছে। বান্দির বাচ্চাটা মেজাজ পুরো খারাপ করে দিছে। কয়েক ঘণ্টা পিটালে রাগ কমতো। রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে শরীর শান্ত হচ্ছেনা তার। মুহূর্তের মাঝে কলপাড়ে রাখা প্লাস্টিকের বালতি আছাড় মেরে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলল। কয়েকটা পাতিল ছিল সেগুলোও আছড়ে বাঁকা বানিয়ে ফেলল। শিউলির শাশুড়ি পান খেতে খেতে বললেন,

“ঘরের জিনিস না ভাইঙ্গা তোর বউরে যাইয়া কয়েক ঘা লাগা, বাজা অলক্ষ্মী কোনহানকার! দরদ তো উতলায় ওডে তোর। না মারতে মারতে বেশি বাড়ছে হারামজাদি। ”
হামিদ লুঙ্গি পরে খালি গায়ে ত্যাক্ত মেজাজে ঘরে ঢুকতেই দেখল শিউলি নিচে পড়ে আছে। বমি আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সে কপাল ভাঁজ করে সেদিকে চাইল। কেন যেন মেজাজ আরও গরম হয়ে গেল। শিউলিকে আজ যত দেখবে ততই মেজাজ খারাপ হবে তার। বমির গন্ধে আবারও পেট মুচড়ে উঠল। মাথা টগবগ করে ফুটছে তার।

“মাইর খাইতে না চাইলে আমার চক্ষের সামনেত্তে যা ফকিন্নী। বমি পরিষ্কার কইরা ঘর তাত্তারি পবিত্র বানা। নইলে তোরে আইজকা খাইছি। রং ডং অন্য জায়গায় কর।” চিৎকার করে।
কোনো জবাব এল না। এমনকি কোনো নড়ন চড়নও নেই। হামিদের একটু খটকা লাগল। এগিয়ে এসে বমি ডিঙিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। কয়েকবার ধাক্কা দিল, কোনো সাড়াশব্দ নেই। হামিদ শিউলিকে ঘুরিয়ে গালে আলতো চাপড় মেরে ডাকল। বুক কেঁপে উঠল কেন যেন অজানা আশঙ্কায়। নাকের কাছে হাত নিতেই দেখল শ্বাস চলছে। কোলে তুলে দ্রুত বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। শিউলির শাশুড়ি জিজ্ঞেস করতে লাগল,
“কী হইছে, ওরে লইয়া এমন খালি গায়ে কই যাস?”
হামিদ জবাব দিল না ততক্ষণে সে বাড়ির বাইরে চলে গেছে।

পিটপিট করে চোখ খুলতেই অচেনা জায়গা নজরে এল শিউলির। মাথা অতিরিক্ত ঘুরছে। হুট করে মাথা ঘুরিয়ে চারপাশ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল এরপর আর কিছু মনে নেই তার। হামিদকে তার মাথার পাশে খালি গায়ে বসে থাকতে দেখে শিউলি ভয়ে শিউরে উঠল। মিইয়ে যাওয়া কণ্ঠে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল,
“আমি ইচ্ছা কইরা আপনের কাগজ নষ্ট করি নাই। কাগজের কথা আমি ভুইলা গেছিলাম। আমারে মাইরেন না।” গুটিয়ে গিয়ে।
হামিদ শিউলির দিকে চাইল। ঐ দৃষ্টিতে কোনো রাগ নেই। শীতল এক দৃষ্টি। শিউলি চোখ সরিয়ে বলতে লাগল,

“আমি আপনের লোকশান করছি না? আমার হাতের এই দুইডা চুড়ি বেইচা যত টেকা পান নিয়া নিয়েন। আমার এতে কোনো দাবি নাই।” স্বর্ণের চুড়ি দুটো খুলে হামিদের হাতে দিল।
হামিদ চুপচাপ শিউলির কাজকর্ম দেখছে। শিউলি মুখ ফিরিয়ে বলতে থাকল,
“আমার বাপের কাছে কিছু কইয়েন না। গরীব মানুষ এত টেকা কই পাইব? বিয়ার সময় এই দুইডা চুড়ি খুব কষ্টে গড়াইয়া দিছে। এহন অসুখ বিসুখে বিছনায় পইড়া গেছে। যাইয়া তো দেখতে পারিনা এহন আবার এসব হুনলে আমার আব্বা মইরা যাইব।” চোখ গলিয়ে অশ্রু টপটপ করে পড়ছে।
“এই দুইডা চুড়িতে পোষাইব না। মেলা টেকার হিসাব।” হামিদের কণ্ঠ।
“আমার কাছে চুড়ি দুইডা ছাড়া আর কিছু নাই।”
“মাডির ব্যাংকে যে প্রতি মাসে আমার পকেট কাইট্টা টেকা জমাস হেইগুলা কী?”

“দোহাই আল্লাহর ঐ টেকার দিকে নজর দিয়েন না, ওইগুলা আমি আমার ছোডো ভাইডার লাইগা জমাইছি। কতদিন আমার কাছে সাইকেলের আবদার করছে, আমি বড় বোন হইয়া কোনোদিন কিচ্ছু দিতে পারি নাই। আপনেরে না কইয়া পাঁচ, দশ টেকা নিছি শুধু। হেইডার লাইগা শাস্তি দিতে পারেন কিন্তু টেকা গুলা নিয়েন না।” মিনতি করে।
“আমার অনুপস্থিতিতে তাইলে ছোডো ভাইয়ের লগে কথা হয়, বাড়ির খোঁজ খবর রাখা হয়। ভালোই তো। আর আমার সামনে অসহায়ের মতো মুখ কইরা রাহোস যেন ভাঁজা মাছ উল্ডাইয়া খাইতে জানোস না।”
শিউলি চোখের পানি ফেলতে লাগল নিঃশব্দে। ঘরে সেই মুহূর্তে একজন মহিলা ঢুকল। পরনে শাড়ি তার উপরে অ্যাপ্রন জড়ানো। খুব সুন্দর পরিপাটি চেহারা। শিউলির মনে হলো, নারীটির সৌন্দর্যের কাছে তাকে অসম্ভব ময়লা লাগছে। ঐ সৌন্দর্য আশপাশ ঝলসে দিচ্ছে। মহিলাটি ঢুকেই হামিদের দিকে হেসে চাইল।

“আপনি এখনো খালি গায়ে মিস্টার হামিদ? বললাম আমাদের এখান থেকে একটা শার্ট পরে নিন। সবাই তাকিয়ে দেখছে আপনাকে।”
“দেহুক।” হামিদের সোজাসাপটা উত্তর।
শিউলি কপাল কুঁচকে চাইল। শরীর দেখাচ্ছে লোকটা? দেখাবেই তো ঘরের বউ রূপবতী না এখন বাইরের রূপবতীদের শরীর দেখিয়ে ঘায়েল করতে হবে না? শিউলি তো বাজা অলক্ষ্মী নারী। একটা ভালো নারীকে বিয়ে করার জন্য পটাতে হবে না? বেলাজ, বেশরম লোক। থমথমে চেহায়ার মুখ ঘুরিয়ে নিল শিউলি। অ্যাপ্রন পরা নারীটি তার প্রেশার মেপে আরেকবার চেকাপ করে বলল,
“বাসায় নিয়ে বিশ্রাম নিন। এই সময় নিজের খেয়াল রাখবেন বেশি বেশি।”
শিউলি মাথা নাড়ল। হামিদ জিজ্ঞেস করল,
“এইহানে আর কোনো কাম আছে ম্যাডাম?”
“না। মিষ্টি খাওয়াতে ভুলবেন না। আর আপনার স্ত্রীর যত্ন নেবেন। শরীরে হাড্ডি ছাড়া কিছুই তো খুঁজে পাওয়া যাবে না, খাওয়া দাওয়া ঠিকমতো করে না নাকি?”

“কবুতরের বাচ্চাও ওর চেয়ে বেশি খায়।” হামিদের গম্ভীর কণ্ঠ।
“না না এমন করা যাবেনা এই সময়ে। ভালো ভালো টাটকা টাটকা পুষ্টিকর খাবার দেবেন। আপনার স্ত্রীর যে একুশ বছর মনেই হয়না।”
শিউলি বুঝতে পারছে না কিছুই। ডাক্তার মানুষের কাজ খালি জ্ঞান দেয়া শিউলি আর ভাবল না কিছুই। ডাক্তার বেরিয়ে যাওয়ার আগে হামিদকে আরেকবার তার চেম্বারে আসতে বলে চলে গেলেন। হামিদ পিছু পিছু গেল। শিউলি সেদিকে চেয়ে দুর্বল শরীরটা নিয়ে চোখ বুজল। এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে এটা একটা হাসপাতাল। লোকটা তার জন্য আলাদা কেবিন নিয়েছে নাকি চেকাপ রুম এটা? লোকটা তার পেছনে এত টাকা কেন খরচ করবে? অসুখ বিসুখ হলে তো কবিরাজের কাছেই নিতো আর আজ একেবারে হাসপাতালে? কিছু তো গণ্ডগোল আছে। তার উপর উদোম গায়ে এসেছে। উদোম শরীর দেখিয়ে আরেকটা বিয়ে করার জন্য মেয়ে পটাতে চাইলে পটাক। ঐ মেয়ে এসে এই পুরুষের মার খেয়ে আবার ভাগবে। শিউলির মতো বলদ তো আর কেউ না। ডাক্তারের সাথে আরও কিছু টুকটাক আলাপ করে হামিদ রুমে এল। এরপর শিউলিকে কোলে নিতেই শুনল,

“আরে কোলে নেয়া লাগবে ক্যান? আমার পা খোড়া নাকি? নামান আমারে।” ছটফট করে।
হামিদ কথার জবাব না দিয়ে বাইরে দাড় করিয়ে রাখা ভ্যানে উঠল। ভ্যান চলতেই শিউলি জিজ্ঞেস করল,
“এত টেকা খরচ কইরা হাসপাতালে আনছেন ক্যান? কবিরাজের কাছে নিয়া গেলেই তো হইতো। এহন কিন্তুক এইডার টেকা চাইতে পারবেন না। আমি আপনেরে কই নাই আমারে হাসপাতালে আনেন।” মুখ ঘুরিয়ে রেখে।
“চুপচাপ থাক, নয়তো ধাক্কা দিয়া ভ্যানেত্তে হালামু। বেশি বোঝা বেডি জাত।”

শিউলির বাচ্চা হবে শুনেই তার শাশুড়ির ভোল পাল্টে গেল যেন। শিউলির কদর করছে। একটু পর পর ফল ধুয়ে দিচ্ছে। রান্নাটাও এই সন্ধ্যার সময় তিনি করেছেন। শিউলি আসার আগ পর্যন্ত রান্না ধরেও দেখেননি তিনি, শিউলি এসে রাঁধবে বলে। এখন বউ পোয়াতি শুনি নিজ থেকেই কাজ করছেন। হামিদ গেছে দোকানে। শিউলির মাথায় তেল দিয়ে শাশুড়ি বলতে লাগল,
“বংশের প্রদীপ আইব, ঠিকমতো চলবি কইলাম বউ। তোগো বিয়ার চার বছর পরে এই বাচ্চা আইছে এট্টুও অবহেলা করবি না কইলাম। সন্ধ্যার পর বাইরে যাবি না। জ্বিনের আছর লাইগা ঐ বাড়ির জামশেদের বউয়ের বাচ্চা নষ্ট হইয়া গেল। তুই কিন্তুক ঐ ভুল করবি না।”
এমন আরও নানা উপদেশ দিল শাশুড়ি। শিউলি বিয়ের এত বছর পরে শাশুড়ির এমন মায়ের মতো যত্নে কেঁদেই ফেলল। আচ্ছা, মেয়েদের জীবনটা এমন অদ্ভুত কেন? বাচ্চা না হলে সেই মেয়ের জীবন বিষের মতো হয়ে যায়। তার বাস্তব প্রমাণ শিউলি নিজে। আল্লাহ রহম করেছে শিউলির উপর নয়তো সারাজীবন সমাজে বাজা মেয়ের গ্লানি তাকে বয়ে বেড়াতে হতো। শিউলি আজ জায়নামাজে অনেক্ষণ কাঁদবে। যে আল্লাহ তার এতদিনের কান্নাভেজা ফরিয়াদ শুনেছে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাবে না সে?
হামিদ বাড়ি ফিরতেই হেলেনা পারভীন ভাত বাড়লেন ছেলের জন্য। হামিদ আজ একটু তাড়াতাড়িই ফিরেছে। চৌকিতে বসে হাত ধুতে ধুতে শুধাল,

“শিউলি খাইছে আম্মা?”
“আর খাওয়া, অল্প কয়ডা ভাত লইছে হেইডাও বমি কইরা ফালায় দিছে। হেরপর গাছ থেইকা তেঁতুল পাইরা হেইগুলা বইসা বইসা খাইছে।” ছেলের পাতে তরকারি দিতে দিতে।
হামিদ গোগ্রাসে গিলতে গিলতে মায়ের সঙ্গে টুকটাক বিষয়ে আলাপ সারতে লাগল। হেলেনা পারভীনকে ঘুমাতে পাঠিয়ে হামিদ কতক্ষণ উঠোনে হাঁটল। বুড়ো মানুষ বাতের ব্যথা, বুকের ব্যথা নিয়েও ছেলের জন্য এতরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে। এতদিন তো শিউলিই দেখত সব। চাঁদের আলোতে পুরো উঠোন আলোকিত হয়ে আছে। আজকের দিনটা অন্যরকম সুন্দর। হামিদ রসুই ঘরে গিয়ে ভাত, তরকারি বেড়ে ঘরে প্রবেশ করতে নিতেই দেখল শিউলি পেটের উপরে হাত বুলাতে বুলাতে কি যেন বলছে। কান খাড়া করতেই একটা কথা শুনে থমকে দাঁড়াল,

শিউলি ফুল পর্ব ১

“আইজকা তুই আমারে বাঁচায় দিছস। তোর কারণে তোর বাপে আমারে মারতে পারে নাই। ঐ সময় বমি না করলে আইজকা তোর মা মাইর খাইয়া মইরা যাইতো। পেটের ভিত্রে থাইকাই মায়রে রক্ষা করতাছস? আমার যাদু কবে মায়ের কোলে আইবি তুই? মা তোর লাইগা একটা ছোট্ট কাঁথা সেলাই করতেছে। তাত্তারি আইয়া পর আমার মানিক।” পেটের উপর পরম মমতায় হাত বুলিয়ে।
হামিদ লক্ষ্য করল তার চোখ ভিজে উঠছে।

শিউলি ফুল পর্ব ৩