Home শিউলি ফুল শিউলি ফুল পর্ব ৩

শিউলি ফুল পর্ব ৩

শিউলি ফুল পর্ব ৩
তাজরীন ফাতিহা

শিউলির পেটটা হালকা বাড়ন্ত হচ্ছে। শরীরের ভেতর ঐ পেটটাই যা একটু বোঝা যায়। হালকা পাতলা গড়নের এই নারীটিকে দেখলে বোঝার উপায় নেই পেটে আরেকটা প্রাণ বেড়ে উঠছে। কল চেপে মাটির কলসি ভরছে শিউলি। রান্না করতে লাগবে। হামিদ দুই হাত ভর্তি বাজার নিয়ে বাড়িতে ঢুকল। শার্ট ঘেমে নেয়ে ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে তার। পুরো বাজার ঘুরে সদাইপাতি কিনেছে। সূর্য মামা বেশ উতপ্ত হয়ে আছে। মনে হচ্ছিল মাথার ঘিলু টগবগ করে ফুটছে। সপ্তাহে একবার এখানে হাটবাজার বসে। কাজেই ভিড় অন্যান্যদিনের তুলনায় আজ অনেক বেশি ছিল। টাটকা টাটকা মাছ, তরিতরকারি পাওয়া যায় এই দিনে। সবাই ভালো ভালো জিনিস কিনতে সেই সকলেই হাজির হয়ে যায়। হামিদও ব্যতিক্রম নয়। ভিড় ভাট্টা হটিয়ে, আবার কখনো লাইন ধরে বাজার করে এনেছে। পুরুষদের কাজগুলো এই সমাজ চোখে দেখেনা। এইযে কত কষ্ট করে ঘাম জড়ানো পরিশ্রম করে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেয়, পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিস হাজির করে অথচ কোথাও তাদেরকে নিয়ে কেউ বলেনা। উল্টো পুরুষের ছকে বেঁধে সব দোষ তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়।

শিউলিকে শক্ত টিউবওয়েল চাপতে দেখে ভারী বাজার পাকঘরের দাওয়ায় রেখে এগিয়ে আসল। হেলেনা পারভীনকে আশেপাশে দেখা যাচ্ছে না।
“সর, পিঁপড়ার লাহান ঘণ্টা লাগাইয়া কল চাপতেছে। আম্মায় গেছে কই?”
শিউলি সরে দাঁড়িয়ে জবাব দিল,
“কবিরাজের বাড়ি।”
হামিদ কল চেপে হাত- মুখ ধুতে লাগল। মুখ পুড়ে গেছে রৌদ্রের তীব্রতায়। মাটির কলসি ভরে নিজেই দুহাতে নিয়ে পাকঘরে রাখল। শিউলির লোকটাকে দেখে বড্ড মায়া লাগে। সেদিন তার অসাবধানতার কারণে পুরো গ্রামের সামনে হাসু মিয়া লোকটাকে অপমান করেছে। প্রমাণ ছাড়া একটা মানুষকে হেনস্তা করার জন্য গ্রামের মাতব্বর হামিদকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেছে। গ্রামের মানুষ পিঠ পিছনে শত্রুতা করতে এক বিন্দুও ভাবে না। কেউ কারো সফলতা দেখে হিংসায় জ্বলে পুড়ে যায়, কেউ সম্পত্তি দেখে আবার কেউ ভালো থাকা দেখে হিংসার বশবর্তী হয়।

গ্রামের অনেকেই হামিদের সাথে শত্রুতা করে হাসু মিয়ার সাথে হাত মিলিয়ে লোকটাকে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে। শিউলি সেদিন প্যান্টটা একটু দেখে নিলেই তার স্বামীর সম্মান ক্ষুণ্ন হতো না। ভরা গ্রামের মানুষের সামনে অপমানিত হতে হতো না। হাসু মিয়া নিজেও বোঝেনি হামিদ প্রমাণ দিতে পারবে না। গ্রামের মানুষের বিশ্বাস ছিল হামিদ আর যাইহোক মিথ্যা বলার মানুষ না। কিন্তু সেদিন তা ভুল প্রমাণিত হলো। শিউলির এ নিয়ে বেজায় মন খারাপ হয়ে যায়। স্বামীর অপমান, সম্মানহানি কোনো স্ত্রীই সহ্য করতে পারেনা। তার একটা বোকামির কারণে লোকটাকে বিনাদোষে কতটা অপদস্ত হতে হলো। বাকি টাকাও হারালো উল্টো অসম্মানিত হতে হলো। লোকটা যে তাকে খুন করে ফেলেনি সেটাই তো তাকে আশ্চর্যান্বিত করেছে। উল্টো পুরো গ্রামের সামনে অপমানিত হয়ে এসেও ঘরে শক্ত স্বাভাবিক থেকেছে।

“ডাকতাছি কতক্ষণ ধইরা, কই হারায় গেছস?” খ্যাটখ্যাটে গলা।
হামিদের কণ্ঠ কানে যেতেই শিউলির ভাবনার বিচ্যুতি ঘটল। শিউলি আচমকা বসে পড়ল কলপাড়ে। বুকটা হুট করে হাপরের মতো ওঠানামা করছে। হামিদ এসে ধরল।
“কী হইছে তোর? খারাপ লাগতাছে?” কপালে চিন্তার ভাঁজ।
শিউলি স্বামীর বুকে ভর ছেড়ে দিয়ে লোকটার শক্তপোক্ত খরখরে হাতদুটো চেপে ধরল মুঠো পাকিয়ে। বেশি চিন্তা করলেই ইদানীং বুকে ব্যথা হয় তার। শিউলির ওড়না সরিয়ে হামিদ বালতি থেকে পানি নিয়ে মাথার তালুতে দিতে লাগল। শিউলি কোনরকম ধিমি গলায় আওয়াজ করল,
“বুকে ব্যথা।”
হামিদ শিউলিকে কোলে তুলে ঘরে নিয়ে শুইয়ে দিল। বুক ডলে দিতে দিতে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে শুধাল,

“বেশি খারাপ লাগলে ক, হাসপাতাল নিয়া যামু।”
“না এহন ঠিক আছি।” শোয়া থেকে ওঠার চেষ্টা করে।
“উডিস না। হুইয়া থাক। না খাইতে খাইতে শরীরে হাড্ডি বাইর হইয়া গেছে। বাচ্চা পেডে আইছে এহনও ঠিক কইরা খায়না।”
“আপনের বাচ্চা খাইতে দিলে তো খামু।” শিউলি চোখ বুজে বলল।
“ওয় তোরে নিষেধ করছে খাইতে? চুন্নী একটা। তুই আইজকার খাওন চুন্নী?”
“বমি আইয়ে।”
“খাড়া তেঁতুল লইয়া আসি।”
হামিদ তেঁতুল নিয়ে এসে শিউলিকে দিতেই শিউলি কাঁচা তেঁতুল বেশ আয়েশ করে খেল। ইদানীং মাছ, গোশত খেতে পারেনা সে তাই আম ডাল রান্না করে নিজের জন্য। ডালটা দিয়ে অন্তত দুই মুঠ ভাত পেটে চালান করতে পারে। আবার লেবু দিয়েও ভাত কচলে কচলে খেতে পারে। শিউলি তেঁতুল খাওয়া শেষ করে উঠে বসে ওড়না মাথায় তুলল।

“আবার উডোস ক্যান?” হামিদের কিড়মিড় কণ্ঠ।
“না উডলে আপনে, আম্মা কী খাইবেন? বেলা অনেক গড়াইছে। রান্না চাপাইতে হইব। আম্মা আইসা খাইব।”
“আইচ্ছা চল তোরে কুটাকাটি কইরা দিমুনি। এই শরীরে একলা পারবি না।” শিউলিকে ধরে উঠাল।
শিউলি অবাক হয় লোকটার এত পরিবর্তনে। অসুস্থ দেখে বোধহয় তার প্রতি মায়া কাজ করে। শিউলি পিঁড়িতে বসে বাজার বের করল। মাছ দেখেই বমি এসে গেল। নাকে ওড়না চেপে সব সদাই গুছিয়ে রাখল একে একে। মাছ কুটতে নিতেই বিপত্তি ঘটল। মাথ, পেট গুলিয়ে উঠল। উঠে খুঁটি ধরে ভরভর করে বমি করে ভাসিয়ে ফেলল। তা দেখে হামিদ নিজেই মাছ কুটতে বসল। বেচারা জীবনেও মাছ কাটেনি। বটি বারবার পিছলে যাচ্ছে। শিউলির কেন যেন হাসি পেল লোকটাকে নাস্তানাবুদ হতে দেখে। সে বলে বলে দিচ্ছে কীভাবে মাছ কাটতে হয়।

“এমনে কাডেন। কই এইহানে বডি ধরতে উনি কই ধরে। মাছ ভুলভাল ধইরেন না হাত কাইট্টা যাইব।”
“বেশি বুজোস তুই? তোর চেয়ে ভালা পারি মাছ কাটতে। হামিদ পারে না এমন কিছু নাই।” গর্বের সহিত।
“হইছে, দেখতেই তো পারতাছি। মাছের পেডে এহনো মেলা ময়লা। ঠিক কইরা সাফ হয়নাই।” শিউলি শাক বাছতে বাছতে বলল।
“আরেকবার কতা কইলে ঘেডি ধইরা মাছ কুডামু। মাছে একটু আকটু ময়লা থাহেই। বেশি বুজা বেডি জাত।”

কথা বলতে বলতে মাছের পেটি কাটতে গিয়ে হাত পিছলে বুড়ো আঙুল বটিতে লাগল। গলগল করে রক্ত বেরোতেই শিউলি আঁতকে উঠে শাক ফেলে এগিয়ে এসে আঙুল চেপে ধরল। হামিদ ব্যথা পেলেও শব্দ করল না। শিউলি পুরোনো একটুকরো কাপড় ছিঁড়ে এনে হাতের আঙুলে পেঁচিয়ে দিয়ে বটি টেনে নিতে চাইলে হামিদ বাধা দিল,
“বেশি মাতব্বরি করবি না, আমার অত লাগে নাই। তুই শাক বাছতেছস ওইডাই বাছ।” কড়া কণ্ঠ।
বলেই বেশ খানিকক্ষণ মাছ ও বটির সাথে ধস্তাধস্তি শেষে হামিদ কোনোরকম মাছ কাটা সমাপ্ত করল। এরপর কলপাড়ে গিয়ে বেশ কয়েকবার পানিতে ভালোভাবে মাছ ধুলো। মাছ থেকে আঁশটে গন্ধ যাচ্ছেনা তবুও। শিউলি লবণ দিয়ে কয়েকবার ধুতে বলল। হামিদ ধুলো, মাছের দুই তিনটা পিসে আঁশ লেগে ছিল সেগুলো শত ধুলেও উঠল না।
শিউলি এদিকে সবজি কেটে রান্না বসাল। লোকটা ভাতের চাল ধুয়ে দিয়ে গেছে। হেলেনা পারভীন কবিরাজের কাছ থেকে তাবিজ নিয়ে এসেছেন। তার মতে এই সময়টা বাচ্চা নষ্ট করে ফেলে জীন নজর দিয়ে। শিউলিকে তাবিজ হাতে বেঁধে দিয়ে এসে গোসলে গেলেন তিনি। হাঁপিয়ে গেছেন এত দূর হেঁটে তাবিজ আনতে গিয়ে।

হামিদদের ঘরটা মাটির তৈরি, দোচালা। তার বাবার আমলের ঘর এটা। হামিদ জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করে পিতার ঘরেই থাকে। ঘরের রোয়াকে একখানা চৌকি পাতা। এখানে মাঝেমধ্যে খাবার খাওয়া হয় তাদের। বেশিরভাগ সময় ঘরের রোয়াকে পাটি বিছিয়ে খায় তারা। আজও খাচ্ছে। স্টিলের জগ, মগ, থালা পাতা পাটিতে। শিউলি শাশুড়ি, স্বামীকে ভাত, তরকারি বেড়ে দিল।
“আইজকা মাছ এমনে কাটছো কেন? মাছ কাডার এ কোন ছিড়ি? পোয়াতি তুমি একলা হইছ? আমরা পোয়াতি থাইকা কত মাছ কুটছি, ধান সিদ্ধ করছি। আর তোমরা শুক্কুরে শুক্কুরে আষ্টদিনও হয়নাই পোয়াতি হওয়ার এর মইধ্যেই মাছ কাডার এই ছিড়ি। নাকি নিজে এহন খাইতে পারো না দেইখা এমনে কাটছ?” হেলেনা পারভীন ভাতের লোকমা মুখে পুড়ে বললেন।
হামিদ মায়ের কথা শুনে বিষম খেল। শিউলি মুখে কুলুপ এঁটে ভাত খাচ্ছে অল্প অল্প করে। মাছ ছুঁয়েও দেখেনি। ডাল দিয়ে কটা ভাত খায় বেচারি। কি যে কষ্ট ! পেট গুলিয়ে ওঠে ভাত, মাছের গন্ধে।

সবকিছু গুছিয়ে এসে খাটে মাথা রাখল। লোকটা কি যেন হিসেবের খাতায় লিখে রাখছে। শিউলি আর না ঘেঁটে ইমিটেশনের চুড়ি দুটো খুলে স্বর্ণের দুটো পড়ল। থালাবাসন, রান্নাবান্না করার সময় ইমিটেশনের চুড়ি পরে। তার শাশুড়ি তাকে স্বর্ণের চুড়ি খুলে কাজ করতে বলে সবসময়। এতে স্বর্ণ নাকি পুরোনো হয়না, সবসময় চকচক করে। এমনিতেই তার বাবার বাড়ি থেকে এই চিকন দুটো চুড়ি ছাড়া কিছুই দেয়া হয়নি এটাও যদি কাজ করতে করতে ক্ষয় হয়ে যায় এই ভেবে শিউলিও শাশুড়ির কথা মান্য করে চলে। বালিশে মাথা রাখতেই আবার পেট গুলিয়ে উঠল। ভাত কটা পেটে গেলেই শুরু হয় এই যন্ত্রণা। হামিদের দিকে পিঠ করে শুলো। পেটের উপর হাত রেখে বিড়বিড় করে বলল,
“মারে এত জ্বালাস ক্যান? কয়দিন হইছে পেডে আইছস আর আমার কইলজা ভুনা ভুনা কইরা ফালাইছস। আমার কষ্ট হইলেও তুই যেন কষ্ট না পাস আমার মানিক। আমার যন্ত্রণায় তোর বাপেও ঘুমাইতে পারে না। কবে আইবি তুই? মায় তোরে কবে পরাণ ভইরা দেখমু?”
আরও কতশত কথা চলল অনাগত সন্তানের সাথে। ঘুমাতে না পেরে বারবার এপাশ ওপাশ ফিরল। এরপর উঠে বসে কাঁথা নিয়ে বসল। অর্ধেক সেলাই করেছে ছোট্ট কাঁথাটার। হামিদ হিসেবের খাতা বন্ধ করে বলল,

“এহন আবার এডি লইয়া বইছস ক্যান? রাত মেলা হইছে ঘুমাইতে আয়।”
“ঘুম আইয়ে না। আপনে ঘুমান, আমি কুপি জ্বালাইয়া কাম করমুনি।”
“রাখতে কইছি না? হারাদিন এক ফোডাও ঘুমাইছস? এই রাইতের বেলা এইসব করন লাগবো না। এইগুলা থো।”

শিউলি স্বামীর বাধ্যগত বউ। চুপচাপ সেসব রেখে আবার এসে শুলো। হামিদ পাশে লম্বা হয়ে খালি গায়ে শুয়ে পড়ল। যে গরম পড়েছে। গায়ে একটা পাতলা গেঞ্জিও রাখা যায়না। দুরত্ব রেখে বালিশে এক হাত রেখে শিউলির মাথা হাতিয়ে দিতে দিতে চোখ বন্ধ করল। আরাম পেয়ে শিউলি ধীরে ধীরে আঁখি পল্লব বন্ধ করল। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতেই হামিদের তন্দ্রা এসে গিয়েছিল। গরমের তীব্রতায় আবার চোখ মেলল। থেমে যাওয়া হাতটা মাথায় চালাতে চালাতে শিউলির পানে ঘাড় ঘুরিয়ে চাইল। দেখল শিউলি গালের নিচে একহাত রেখে গভীর নিদ্রায় বিভোর। ঘেমে উঠেছে ঘাড়, গলা। ওড়না খুলে মাথার পাশে রেখেছে। হামিদ উঠে বসে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে লাগল। বেচারি সারাদিন বমির উপরেই থাকে ইদানিং। কিছুই মুখে তুলতে পারেনা। রাতে ঘুমাতে পারেনা, উশখুশ করে। ঘুমালেও অল্প সময় পরে আবার জেগে উঠে। আজকে একটু ঘুমিয়েছে কিছুতেই ঘুম ভাঙানো যাবেনা। পেটের উপর হাত বুলিয়ে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করল,

শিউলি ফুল পর্ব ২

“মায় না খাইলে, না ঘুমাইলে তুই সুস্থ থাকবি? এহনই এত কষ্ট দিতাছস? মায়রে একটু কম কম জ্বালা। এত তিরিং বিরিং ভালা না। মায়ের মতো ঠান্ডা হ।”
রাতের নিস্তব্ধতা ছাপিয়ে পিতা ও অনাগত সন্তানের কথপোকথন চলল অনেকক্ষণ। বাইরে ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে।

শিউলি ফুল পর্ব ৪