রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৭ (৩)
অধরা মিনহা
ইফরাদ ডান হাতে স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে নিজের বাম হাতটা আনতারার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
— হাতটা দাও।
আনতারা অবাক হয়ে মাথা তুলে তাকিয়ে বলে,
— হুম?
ইফরাদ আনতারার হাতের দিকে ইশারা করে আবার বলে,
— হাতটা।
আনতারা নিজের ডান হাতটা ইফরাদের হাতে রেখে জিজ্ঞেস করে,
— কেন?
ইফরাদ আনতারার হাতটা শক্ত করে ধরে মুচকি হেসে বলে,
— তোমার হাতটা আমার হাতে থাকলে কোনো সমস্যা আছে?
আনতারা নিঃশব্দে হেসে দুই দিকে মাথা নেড়ে না বুঝায়। ইফরাদও হেসে বলে,
— গুড। বাধ্য বউ।
প্রায় পঁচিশ মিনিটের মধ্যেই ইফরাদ গাড়ি থামায়।আনতারা সামনে তাকিয়ে দেখে চারপাশ ঝলমলে আলোয় ভরে আছে। অনেক মানুষের ভিড়। পরিবেশটা বেশ প্রাণবন্ত।
আনতারা ইফরাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— এটা কোথায়?
ইফরাদ সামনে তাকিয়ে বলে,
— এদিকে একটা ছোটখাটো মেলার মতো বসেছে।
আনতারা চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে বলে,
— এত জমকালো পরিবেশ আমার ভালো লাগে না।
ইফরাদ মুচকি হেসে প্রশ্ন করে,
— আমার সাথেও না?
ইফরাদের তাকানোর ভঙ্গি আর কথার সুরে আনতারা লজ্জা পেয়ে গেল। মাথা নিচু করে আস্তে বলে,
— কী বলেন!
ইফরাদ হেসে বলে,
— যাই বলি, তাই শুনবে। এখন এই জমকালো পরিবেশে মনোযোগ না দিয়ে আমার ওপর মনোযোগ দাও। ট্রাস্ট মি, আমি খুশি হবো।
কথাটা বলেই ইফরাদ পকেট থেকে একটা মাস্ক বের করে পরে নেয়। তা দেখে আনতারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— মাস্ক পরছেন কেন?
ইফরাদ হালকা হেসে উত্তর দেয়।
— খোলা মুখে আমি গেলে এক সপ্তাহ পর্যন্ত টাইমলাইনে থাকবে তুমি, মাই জানা।
আনতারা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেল বিষয়টা। যেহেতু ইফরাদ একজন সেলিব্রিটি, তাকে দেখলে স্বাভাবিকভাবেই সবাই ভিড় করে ঘিরে ধরবে। সেই ঝামেলা এড়াতেই ইফরাদ মাস্ক পরে নিয়েছে। মাস্ক পরা শেষ করে ইফরাদ প্রথমে নিজের সিটবেল্ট খুলে, তারপর আনতারার সিটবেল্টও খুলে দেয়। এরপর গাড়ির দরজা খুলে বাইরে নেমে গেল।
আনতারা গাড়ির দরজা খুলতে পারে না। তাই চুপচাপ বসেই রইল। ইফরাদ গাড়ির অন্য পাশে এসে দরজা খুলে দেয়। তারপর আগের মতোই আবার আনতারার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়, হাতটা ধরে আনতারা নামাবে তাই।
আনতারা কোনো দ্বিধা না করে ইফরাদের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ধরে। ইফরাদের হাতের ভরসায় গাড়ি থেকে নেমে এল। আনতারা নামতেই ইফরাদ গাড়ির দরজাটা আলতো করে বন্ধ করে দেয়। তারপর আনতারাকে বলে,
— চল?
আনতারা মাথা নেড়ে বলে,
— হুম।
ইফরাদ আনতারার হাত ধরে সামনে এগিয়ে গেল।চারপাশে ছোট ছোট অনেক স্টল বসেছে। কোথাও মেয়েদের সাজগোজের জিনিস, কোথাও ঘর সাজানোর নানা সামগ্রী, আবার কোথাও নানান ধরনের শোপিস। আনতারা কৌতূহলী চোখে একটার পর একটা স্টল দেখছে। ইফরাদ জিজ্ঞেস করে,
— কোন স্টলে যাবে?
আনতারা নিচু স্বরে বলে,
— স্টলে গিয়ে কী করব?
ইফরাদ চোখ ছোট করে আনতারার দিকে তাকিয়ে বলে,
— মেলায় এসে স্টলে মানুষ কী করে?
আনতারা শান্ত গলায় বলে,
— আমি জানি না।
ইফরাদ এবার শ্বাস ফেলে বলে,
— এমন কেন করছো, আনতারা? যেন প্রথমবার মেলায় এসেছো!
আনতারা শান্তভাবেই উত্তর দেয়,
— আমি তো প্রথমবারই এসেছি।
ইফরাদ বিস্মিত হয়ে বলে,
— সিরিয়াসলি? আগে কখনো মেলায় আসোনি?
আনতারা মাথা নেড়ে বলে,
— না। আমাকে কে নিয়ে আসবে? তাছাড়া আমার এমন জমকালো পরিবেশ ভালো লাগে না।
ইফরাদ কপালে ভাজ ফেলে জিজ্ঞেস করে,
— এখন ভালো লাগছে না? আনকমফোর্টেবল লাগছে?
আনতারা তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বলে,
— না না। ভালো লাগছে।
ইফরাদ আবারো নিশ্চিত হতে জিজ্ঞেস করে,
— সত্যি তো? কোনো সমস্যা হলে আমাকে বলবে?
আনতারা এবার হালকা হেসে বলে,
— না, সত্যিই ভালো লাগছে।
ইফরাদ আশ্বস্ত হয়ে বলে,
— আচ্ছা, তাহলে চলো। পুরো মেলাটা সুন্দর করে ঘুরে দেখাই। যদিও ছোট্ট একটা মেলা।
এরপর ইফরাদ আনতারাকে নিয়ে একটা স্টলের সামনে এসে দাঁড়ায়। স্টলে এসে বলে,
— যা ভালো লাগে, দেখো। পছন্দ হলে নাও।
আনতারা মুচকি হেসে চুড়ি দেখতে দেখতে বলে,
— পুরো স্টলটাই তো পছন্দ হয়েছে।
ইফরাদ সঙ্গে সঙ্গে বলে,
—তাহলে পুরো স্টলটাই নিয়ে নেব।
বলেই ইফরাদ স্টলের স্টাফকে ডেকে বলে,
— ভাই, পুরো স্টলটা প্যাক করে দেন।
ইফরাদের কথা শুনে আনতারা চমকে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে ইফরাদের বাহু চেপে ধরে আস্তে করে বলে,
— কী করছেন?
ইফরাদ হাসি দিয়ে আনতারার দিকে তাকিয়ে বলে,
— মাত্রই না বললে, স্টলটা পছন্দ হয়েছে। তাই পুরো স্টলটাই নিয়ে নিচ্ছি।
আনতারার হাসি পায়। বহু কষ্টে হাসিটা আটকে চোখ ছোট ছোট করে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে শাসানোর ভঙ্গিতে বলে,
— শয়তান লোক! জ্বালাচ্ছেন কিন্তু!
ইফরাদ হেসে উঠে। এদিকে স্টাফটা কিছু বুঝতে না পেরে বোকার মতো ইফরাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। ইফরাদের চোখ লোকটার ওপর পড়তেই ইফরাদ হেসে বলে,
— কিছু না ভাই, বউয়ের সাথে মজা করছিলাম।
স্টাফ মাথা নেড়ে বলে,
— আচ্ছা।
বলেই সে চলে গেল। স্টাফকে চলে যেতে দেখে আনতারা এবার ইফরাদকে খোঁচা দিয়ে বলে,
— পুরো স্টল নিয়ে কী নিজের বাসার সামনে ব্যবসা করে বসতেন?
ইফরাদ একটুও না ভেবে বলে,
— আইডিয়া খারাপ না। এক্টিংয়ের পাশাপাশি এটাও করা যাবে। পার্টটাইম জব হিসেবে। কিছু আর্নিংও হবে।
আনতারা মুচকি হেসে বলে,
— ব্যবসায় নামার আগে আপনার মার্কেটিং স্কিলটা দেখি?
ইফরাদ বাঁকা হেসে বলে,
— ওকে।
বলেই স্টলের মধ্যে সাজিয়ে রাখা চুড়িগুলোর সারি থেকে একমুঠো চুড়ি হাতে তুলে নেয় ইফরাদ। তারপর আনতারার দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে গভীর গলায় বলে,
— ম্যাডাম সুন্দরী? আপনার হাতটা দেওয়া যাবে?
আনতারা উপর নিচ মাথা নেড়ে হ্যাঁ বুঝায়। ইফরাদ মিষ্টি করে হেসে বলে,
— থ্যাংকস, ম্যাডাম।
তারপর আনতারার হাতটা নিজের হাতে নিতেই চোখ বড় বড় করে ফেলে। তারপর আনতারার হাতে আলতো করে চাপ দিতে দিতে বিস্ময়ের ভান করে বলে,
— একদম মাখন মাখন হাত। মেডাম কি মাখন খান বেশি?
আনতারা ঠোঁট চেপে হেসে মাথা নেড়ে না বোঝায়। ইফরাদ মজা করে আফসোসের সুরে বলে,
— ইশশ, এমন মাখন হাতের মেয়ে যদি আমার বউ হতো!
— এভাবে প্রেম চলবে। ব্যবসা না।
ইফরাদ আনতারার হাতটা নিজের হাতে ধরে রেখেই বলে,
— নরম হাতে পিষে মন গলিয়ে দিয়েছেন, এখন ব্যবসা উড়ে গেলেও মনের উতলা থামবে না।
আনতারা এবার হাসতে হাসতে বলে,
— এসব প্রেমের লাইনের জন্য এতক্ষণ কেউ অপেক্ষা করবে না। অন্য স্টলে চলে যাবে।
ইফরাদ একটু আনতারার দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে,
— কে থাকলো কে গেলো তা দেখার সময় নেই। তুমি আছো তাতেই হলো।
আনতারা আর কিছু বলে না। শুধু নিকাবের নিচে ঠোঁট চেপে হাসে। মুহূর্তটা সে বেশ উপভোগ করছে। ইফরাদ তার হাতে চুড়ির মুঠোটা আনতারার হাতে পরিয়ে দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠে,
— মারহাবা, মারহাবা! এই চুড়ি বানানোই হয়েছে আপনার জন্য। এই চুড়ির ইজ্জত কমে যাবে, এই হাত ছাড়া অন্য কোনো হাতে গেলে!
কথাটা শুনে আনতারা নিকাবের নিচে হাসতে থাকক। শেষ পর্যন্ত আর হাসি থামাতে না পেরে ইফরাদকে জড়িয়ে ধরে। তারপর ইফরাদের বুকে মুখ লুকিয়ে অনবরত হাসতে লাগল। হাসি কিছুতেই থামছে না।
আনতারা হাসতে হাসতেই বলে,
রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৭ (২)
— থামুন, রাদ। আমি আর পারছি না হাসতে। পেট ব্যথা করছে।
আনতারার কথা শুনে ইফরাদও এবার মজা থামিয়ে দেয়। তারপর আনতারাকে বুকে জড়িয়ে হাসতে থাকে। এদিকে তাদের এমন হাসি-ঠাট্টা দেখে স্টলে থাকা অন্য কাস্টমাররাও মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। স্বামী-স্ত্রীর এমন প্রেম আর খুনসুটি দেখে বেশ কিছুক্ষণ তারা বিষয়টা নিয়ে হাসাহাসি করল। কিছুক্ষণ পর আনতারা আশপাশে তাকিয়ে দেখে, সবাই তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে একটু লজ্জা পেয়ে ইফরাদের কাছ থেকে সরে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
