পৌষপার্বণ পর্ব ৩৩
Irfa Mahnaj
এতদিন মেয়েদের উঠিয়ে নিয়ে কিংবা কিডন্যাপ করে বিয়ে করা দেখেছে। এই প্রথম দেখলো ছেলেকে উঠিয়ে নিয়ে এসে বিয়ে করতে। কাজীর থম মেরে থাকা দেখে কপালে ভাঁজ পড়ে পূর্ণার।
— ওমা কাজী সাহেব? আপনি বিয়ের কাজ কারবার শুরু কেনো করছেন না?
পূর্ণার কথা শুনে ভাবনা থেকে বেরিয়ে থতমত গলায় বলে,
— ইয়ে না মানে উল্টো জিনিস এক্সপেরিয়েন্স করছি তো তাই আরকি।
— এখানে আমরা কেউ উল্টো দাড়িয়ে আছি?
— না।
— তো আপনি উল্টো জিনিস কোথায় পেলেন?
— এই যে…
— হইছে থামেন। এই চেয়ারে বাঁধা ছোকরাকে দেখছেন না? এটা আমার জীবনের কুফা। নামের মতোই আমার লাইফে অলওয়েজ কালো মেঘ ঘোরা ফেরা করে। ওটার জ্ঞান আসার আগে সব লিখুন।
কালমেঘকে কিডন্যাপ করে চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা। আর এই মহান কাজটি পূর্ণা করেছে শুধুমাত্র বিয়ে করবে বলে।
এদিকে জ্ঞান ফিরছে কালমেঘের। পিট পিট করে চোখ মেলছে সে। হাত পা নাড়াতে গিয়েই বুঝে তার পৌরুষ ভারি শরীর বাঁধা। মাথা ব্ল্যাঙ্ক হয়ে যায় তার। এসবের মধ্যেই শুনতে পায় পরিচিত কণ্ঠস্বর।
চোখ মেলে তাকাতেই চোখ দুটো বিস্ময়ে ছানা বড়া। মুখ দিয়ে অস্ফুটে বের হয়ে আসে একটি নাম।
— পূর্ণা!
নিজের নাম কর্ণধার হতেই কালমেঘের দিকে ফিরে পূর্ণা। এক গাল হেসে বলে উঠে,
— উঠে গেছো মেঘ ভাই। বাহ বেশ ভালোই হলো।
— তুই আগে এটা বল আমরা আছি কোথায়? আর আমি এভাবে বেঁধে কেনো?
— কারণ আমি বেঁধেছি। আর আমরা আছি দুদু মিয়ার গরুর ফার্মে। ভয় নেই এটা পুরোনো টা।
কি অবলীলায় কথা গুলো বলছে সে। এদিকে কালমেঘ যেনো পৃথিবী ছেড়ে মঙ্গলে পাড়ি জমিয়েছে। চোখ দুটো কোটর দিয়ে বের হয়ে এসে মাটিতে গড়াগড়ি খাবে।
— এইইইই পূর্ণার বাচ্চাআআআ আমাকে খোল বলছি।
— বিয়ে তো করে নি। এমনিতেই তোমাকে বাধঁতে আমার বহুত কসরত করা লাগছে। আর আমাকে যে বনচাঁপা সাহায্য করেছে সেটাও বলিনি বলছি বলো?
এবারে কালমেঘের চোখ দুটো ছোট ছোট হয়ে আসে। কপালে পড়ে ভাঁজ। আধুনিক ঘষেটি বেগম যে তার বোন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ব্রিটিশ আমলে সিরাজউদদৌলার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এই আমলে কালমেঘের সাথে ওর বোন।
— বনচাঁপা কোথায় আজ বাসায় ফিরি ওর ছাল তুলে মায়ের চামড়ার ব্যাগ সিলাই করবো।
আঁতকে উঠলো পূর্ণা। হড়বড় করে বলল,
— আল্লাহ! কি বলো তুমি কেমনে জানলা আমাকে সাহায্য চাঁপা করেছে! ও যদি জানে আমার চাপা ভেঙ্গে দিবে।
— ওর তোর মুখের চাকা ভেঙ্গে দেওয়ার আগে আমি তোরে উল্টো লটকাবো ফ্যানের সাথে।
বেচারি পূর্ণা নিজের চাপা ধরে বসে রয়। অন্যদিকে কালমেঘ হাত পা ছোড়াছুঁড়ি শুরু করে। কাজী ছিলো কালমেঘের পায়ের কাছেই বসা।
পা*ছায় এক লাথি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। লুঙ্গি পা*ছার উপর দিয়ে মাথায় উঠে যায়। সম্মুখে প্রদর্শন হয় সবুজ ও লালের মিশেলের বাংলাদেশের পতাকার জা*ই*ঙ্গা।
— এই পূর্ণা চোখ ধররররর! শালা আবাল এর গুষ্টি আবাল। তলের কাপড় মাথায় উঠে যায় এমন কাপড় পড়ে আসতে হবে কেনো কাজীর ঘরের পাজি!
চোখে হাত দিলেও ফাঁক ফোকড় দিয়ে এক আঙ্গুল সরিয়ে উঁকি মারে পূর্ণা। বিড়বিড় করে বলে ওঠে,
— আইশ! উপর দিয়ে ফিটফাট তল দিয়ে সদর ঘাট!
মুখোমুখি দাড়িয়ে ডাক্তার মস্তক আর পার্বণ। ডাক্তারের নাম মূলত মোস্তাক কিন্তু এনআইডিতে আসছে মস্তক। এই নিয়ে সে কি দুঃখ ডাক্তারের। পার্বণ অবশ্য মনে মনে এনআইডি বানানো লোকদের ধন্যবাদ জানায়। ব্যাটার নাম মস্তক হলেও মস্তক নেই কোনো।
ডাক্তার মস্তকের দিকে খেয়ে ফেলা লুকে তাকিয়ে আছে পার্বণ। সে ভীষণ বিরক্ত। এই বালডারে কে ডাক্তার বানাইলো!
এদিকে ডাক্তার মস্তকও কেমন অদ্ভুদ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পার্বণের দিকে। একবার পার্বণের দিকে চায় তো একবার পার্বণের পিছে থাকা জ্যৈষ্ঠর দিকে চায়।
এই তো কিছুক্ষন হবে জ্যৈষ্ঠ আর মহিলা পার্টি এসে এখানে উপস্থিত হয়। ডাক্তার মস্তক জ্যৈষ্ঠর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— বুঝলাম না তোমরা এতো ছোট বাচ্চাদের ধরে ধরে বিয়ে দেও? তাও মানলাম দিয়েছো তাই বলে এতো টুকু বয়সেই নানা নানী হওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেলে?
জ্যৈষ্ঠর এখন ইচ্ছে করছে মাটি ফাঁক হয়ে যাক ও পাতাল দুনিয়ায় হারিয়ে যাক। এই ছেলে ভাতিজা হিসেবে ডেঞ্জারাস আর জামাই হিসেবে তো আল্ট্রা প্রো। যার তুলনাই নেই।
এখন জ্যৈষ্ঠ কিভাবে বলবে তারা নানা নানী হতে উত্তেজিত হয়নি বরং এই ছেলেই উত্তেজিত হয়ে এই ১৭ তেই বাপ হয়ে বসে আছে। ওর বয়সে তো বিয়েই হলো না আমার। আমার বয়সে আসলে দেখা যাবে নাতির ঘরের পুতিও হয়ে গেছে।
মানুষ বাচ্চার জন্য কথা শুনায় এ কথা শুনানোর পথ বন্ধ করে তো দিয়েছে সেই সাথে ইজ্জতের লাচ্ছি বানিয়ে দিয়েছে।
সেদিন জানলো একজন আজ জানলো ডাক্তার মস্তক। এমনিতেই ওইদিন জ্যৈষ্ঠ আর বৈশাখ যখন বাজারে যায় তখন দুজনের নাস্তানাবুদ অবস্থা। বাজারের বুইড়া গুলোয় ওদের লুঙ্গি হাতে তুলে দৌড়ানোর মতো অবস্থা করে ছেড়েছে।
তারা নাকি অতি মাত্রায় উত্তেজিত হয়ে গেছি দাদা – নানা হওয়ার জন্য যে দুধের দাঁত পড়ার আগেই ছেলেকে বাবা হতে বাধ্য করি।
এখন ওদের তো আর বলা যায়না ছেলে জাউড়ার হাফেজ,ভন্ড। মাঠে ঘাটে খেলার বয়সে খাটে খেলে বাচ্চা পয়দা করে বসে আছে।
শেষ কথা খেয়ালে আসতেই আঁতকে উঠে জ্যৈষ্ঠ। দেখছো তামশাডা! ভন্ড জামাইয়ের সাথে থাকতে থাকতে সে এখন লাগামছাড়া শশুর হয়ে গেলো।
— হেম তুমি যদি আর একবার আমার পিছন পিছন আসো তো তবে তোমার গাল আর গালের জায়গায় থাকবে না।
— কোথায় থাকবে তবে?
হেমন্তের হেয়ালি কথায় রাগে বোম হয় বনচাঁপা। পৌষ তো কলেজে আসে না। আর পূর্ণা গেছে আকাম মারাইতে। সে পড়ছে মাইনকা চিপায়।
— পিছু পিছু আসবে না।
— তো কি সামনে সামনে আসবো?
বলেই বনচাঁপার সামনে সামনে হাটছে আর ঘাড় পিছে ঘুরিয়ে বক বক করছে। ওর অবস্থা দেখে বিরক্ত বোধ করে বনচাঁপা। এরই মাঝে ঘটে অঘটন।
ঘাড় ঘুরিয়ে হাঁটার ফলে সামনের খাম্বা দেখতে পায়নি হেমন্ত। ব্যাস মাথা ঠুকে পড়ে যায়। ওর মাথা ঠুকতেই গগন কাঁপিয়ে হেসে উঠে বনচাঁপা। তবে সেটাও ক্ষণস্থায়ী।
হেমন্তের দিকে আঙ্গুল তাক করে হাসতে হাসতে সেও নিজের সামনের খাম্বা খেয়াল করে না। একি ভাবে মাথায় বাড়ি খেয়ে উল্টে পড়ে।
বনচাঁপাকে পড়তে দেখে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খায় হেমন্ত। ওর হাসি দেখে গা জ্বলে বনচাঁপার। পায়ের স্যান্ডেল খুলে ছুড়ে মারে যা সোজা গিয়ে পড়ে হেমন্তের মুখের উপর। জুতার বাড়ি খেয়েও ভেটকায় হেমন্ত।
ডাক্তার বুইড়া যদি ডাক্তার না হতো না তবে বোধহয় পার্বণ ওটার মাথা ফাটিয়ে দিতো। আল্ট্রা করাতে ঢুকতে দিবে না। পার্বণ ছোট বলে। কিন্তু ডাক্তার তো আর জানে না এটা পার্বণ। বাবার পাওয়ার খাটিয়ে ঢুকেছে।
আপাতত শান্ত হতে হবে। চোখ বুজে লম্বা শ্বাস টানে। নিজেকে নিজেই শুধায়,
— রিলাক্স ব্রো।
সামনে তাকাতেই এমনি এমনি শান্ত হয়ে যায়। বুকে এক পশলা সুখ সুখ অনুভব হয়। পৌষের পেটে জেল মাখিয়ে তার উপর আল্ট্রাসোনোর পাইপ সেট করা হয়েছে।
পার্বণ এক পা এক পা করে এগোয়। পৌষ নিজের পাশে কারো উপস্থিতি টের পেতেই ঐদিকে তাকায়। পার্বণের সাথে চোখাচোখি হয়। পৌষ চোখ জোড়া একসাথে একবার ব্লিঙ্ক করে ওকে বুঝায় অনুভূতি।
পার্বণও মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়। স্টিলের টুলটা পাশে নিয়ে বসে। পৌষের এক হাত মুঠোয় চেপে ধরে। ঠান্ডা হাতটা নিজের পৌরুষ রুক্ষ হাত দিয়ে উষ্ণতা দেয়।
— এই বাবু স্ক্রিনে তাকাও।
এতো এতো আবেগের মধ্যে একদম হেগে দিয়েছে এই ডাক্তার আ*বাল। ভোঁতা মুখে কটমট করে ডাক্তারের দিকে তাকায় পার্বণ। শুধায়,
— ব্যাটা এখনো বাবু বাবু করছে বুঝায় ওর পেট থেকে বের হয়েছি আমি।
পার্বণের কথা ডাক্তার না শুনলেও পৌষ ঠিকই শুনে। ওর মুখ চেপে হাসে। ওর হাসি দেখে দাঁত কিড়মিড় করে উঠে পার্বণ। বলে,
— তুই হাসছিস? আমি তোর স্বামী। তোর বাচ্চার বাবা কোথায় তুই আমার সাইড নিবি না হাসছিস। এই দাঁত ভিতরে নে বেয়াদব মহিলা।
পৌষপার্বণ পর্ব ৩২
— এই বাবুউউউউ!
— কিইইইই বাপ আমার?
— স্ক্রিনে দেখো দুইটা বেবি! টুইন বেবি দেখি!
ডাক্তারের মাথা চক্কর দিলো। সে একবার স্ক্রিনে তাকায় তো একবার পার্বণের দিকে। হ্যাংলা পাতলা শ্যামবরণের কলেজ পড়ুয়া ১৭ এর এই ছোকরা কিনা টুইন বাচ্চার বাপ! ডাক্তার অজ্ঞান। এদিকে পার্বণ চেঁচিয়ে উঠে,
— আরে স্ক্রিনে তো দুইটা আন্ডা দেখা যাচ্ছে। বাচ্চা কই আমার? আমার শুক্রাণু কি বাচ্চা হওয়ার বদলে আন্ডা হয়ে গেলো!
