পৌষপার্বণ পর্ব ৩৬ (২)
Irfa Mahnaj
সেদিনের পরে কেটে গেছে প্রায় ১৫ দিনের মতো। বারোমাসি নীড়ে আবারো খুশির ঢল। টানা বৃষ্টিপাতের পর মেঘের কোল ঘেঁষে সূর্যের কিরণ যেনো উঁকি দিচ্ছে। কিন্তু এসবের মধ্যেও পার্বণের মন ভালো নেই।
প্রথমত, সে তার বাচ্চাদের প্রথমে নিতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, তার দেওয়া এতো সুন্দর, কুট্টুস দুইটা নাম কেউ গ্রাহ্যই করলো না! পৌষ নামক মহিলাকে কতবার সে শুধিয়েছে,
— দেখ পৌষ আমি যখন বলেছি আমার বাচ্চার নাম কলা আর মুলা হবে তখন তাই হবে।
বিপরীতে শুনতে হয়েছে খেঁক ধ্বনি। পৌষ তীব্র নাকজের সুরে বলে,
— এইসব উজবুক মার্কা কথা নিয়ে দূর হ। খবরদার আমার ছেলে মেয়ের থেকে দূরে থাকবি।
— আশ্চর্য! আমি না দিলে তুই ছেলে মেয়ে পেতি কোথায়? টপকে পড়তো? বরংচ এগুলো আমার প্রডাক্ট তোর বাসায় ভাড়া দিয়েছিলাম।
ঝগড়ার এক পর্যায়ে ওয়েট টিসুর বক্সটা ধরে ফিক্কা মারে পৌষ। বেচারা পার্বণ বউয়ের থাবা খেয়ে নিজের জান হাতে নিয়ে পলায়ন করে।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে বিরক্তিকর কারণ হলো বিদ্যুৎ। এই বিদ্যুৎ সেই বিদ্যুৎ না। ভাদ্র যখন প্রথমে বিদ্যুৎ আসার কথা বলে তখন বসন্ত তাকে জিজ্ঞেস করেছিল,
— বিদ্যুৎ তো আছেই বাড়িতে। আবার বিদ্যুৎ আসবে মানে? এসব কি বলছো ভাদ্র ভাই?
— এই বিদ্যুৎ সেই বিদ্যুৎ নহে। এটা হচ্ছে মানব বিদ্যুৎ।
— মানুষ বিদ্যুৎ! বিদ্যুৎ আবার কবে থেকে মানুষ হয়ে গেলো। এখন থেকে কি অদৃশ্য বিদ্যুৎ এর বদলে মানুষের পাছা দিয়ে বিদ্যুৎ আদান প্রদান হবে?
বসন্তের কথায় আক্কেলগুড়ুম হবার জোগাড় ভাদ্রের। ওর মাথায় গাট্টা মেরে শুধায়,
— আহাম্মক! একটা মানুষের নাম বিদ্যুৎ।
— কেন? সে কি বিদ্যুৎ নিয়ে ঘোরে। তার বডিতে কি রক্তের বদলে বিদ্যুৎ থাকে? তার কি হার্ট থাকে না? নাকি ওগুলো তারের কুন্ডুলি। তার কিডনি, ফুসফুস বিদ্যুৎ প্রবাহ করে? সে কি হাগলেও বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়?
ভাদ্রের যথেষ্ট হয়েছে। সে ভুলেই গিয়েছিলো পার্বণের অভাব পূরণ করতে তার চেলা বসন্ত বলদটা আছে।
পরে অবশ্য এর রহস্য উদঘাটন হয়। সেই সাথে জানা যায় ভাদ্রের অকাজের খবরটি। খবরটি শুনেই তো বিনা ঠাডায় বজ্রপাত থুড়ি বিনা মেঘে বজ্রপাত ঘটে পার্বণের মাথায়।
তার অবচেতন হওয়ার সুযোগে তার সদ্য জন্মানো মেয়ের ঘটকালিও করে ফেলেছে ভাদ্র নামক আহাম্মক পুরুষটি। পার্বণ তো এক প্রকার হম্বি তম্বি করে বলেই বসে,
— আয় হায় রে! মেয়ে জন্মাতে পারলো না এর মধ্যে জামাই এসে হাজির। এই বিস্কুট চানাচুর আমার মেয়ের থেকে দূরে থাকো। আর ভাদ্র ভাই কাজটা কিন্তু ভালো করলে না।
আফসোস! আফসোস রে! দীর্ঘ শ্বাস বের হয়ে আসলো পার্বণের বুক চিঁড়ে। এতদিন লাফালেও এখন মেয়ে নিয়ে নো হেলাফেলা। শিয়াল বাবাজি দরজায় কড়া নাড়ছে। যেনো বলছে,
— আমি কি আপনার মেয়েকে নিয়ে ভেগে যাবো শশুর আব্বা?
টনক নড়লো পার্বণ নামক ব্যাক্তির। অনেক্ষন হয়েছে ছেলেমেয়েকে দেখছে না। একটু দেখে আসা যাক। যেই ভাবনা সেই কাজ। উঠে হাঁটা লাগায় নিজের রুমে।
বিছানার মধ্যে খানে শুয়ে আছে পার্বণের দুটো কলিজার টুকরো। নরম তুলতুলে লালচে দুটো তুলোর বল। না না দুটো কুট্টুসের গোল্লা।
পৌষ ভদ্র মহিলাকে অত্র মহল্লায় ও দেখা যাচ্ছে না। মুখ দিয়ে “চ” বর্গীয় আওয়াজ করে। ছেলে মেয়ে দুটোই ঘুমিয়ে গেছে।
পার্বণ এগিয়ে যায়। কি ছোট ছোট হাত পা। রক্ত জমে আছে যেনো। আহা বুকটার মধ্যে পিতার সেই কি সুখের হাওয়া বইছে। পার্বণ একটু ঝুঁকলো। তার হাত এখনও কাঁপে।
এখনও সে এই দুটো নরম গোল্লা কে কোলে নিতে ভয় পায়। এই বুঝি তার ছেলে মেয়ে দুটো ব্যথা পাবে। পার্বণ মাঝে মাঝে এটা ভেবেই কুল পায় না সে এই দুটো গোল্লা কে কি করবে? গোল্লা আর গোলার মাকে পারলে নিজের বুকের মাঝে ঢুকিয়ে রাখতো।
বাচ্চা দুটোই হাত মুঠো করে ঘুমিয়েছে। এই মুঠো করা নরম হাতের মধ্যে হাত দিতে বেশ ভালো লাগে। একদম আদর আদর পায়।
ঝুঁকে প্রথমে মেয়ের রক্তজবার মতো সেই তুলতুলে চামড়ার কপালে চুমু খেলো। বেবি লোশনের স্মেল নাকে এসে বাড়ি খাচ্ছে।
প্রাণ ভরে মেয়েকে আদর দিয়ে গেলো ছেলের পানে। ছেলের নরম গাল। লালচে সেই গালে হাল্কা করে ছুঁইয়ে আদর করলো। দুটো ছেলে মেয়েই ফর্সা, আলতার মতো লাল টুকটুকে।
পৌষ কিংবা পার্বণ দুজনেই শ্যাম বরণের তবে ছেলে মেয়ে পেয়েছে বসন্তের গায়ের রং। চাচার গায়ের রংটি পেয়েছে। চাচার বৈশিষ্ট না পেলেই হয়।
ছেলে মেয়ে দুটোর নরম গাল দুটো লালচে বর্ণ নিয়েছে। টোকা দিলেই বুঝি রক্ত পড়বে। ওদের দিকে তাকিয়ে পার্বণ শুধায়,
— আমার দুই কলিজা। আব্বাজান আর আম্মাজান। আপনারা আসতে যেই খেল দেখালেন। পুরো মা বাবা দুজনকেই হসপিটালে ভর্তি করিয়ে দিলেন।
পার্বণের মনে আছে প্রথম যেদিন সে কোলে নিবে। বার বার জিজ্ঞেস করেছিল,
— এই পৌষ ওরা তো এই টুকু একদম কুট্টুস সাইজের। ছুলেই যদি মূর্ছা যায়।
ভয় হচ্ছিলো একটু ছুঁলে বুঝি ওর ফুল দুটো নেতিয়ে যাবে? পৌষ তখন হেসে জবাব দেয়,
— ভয় পাচ্ছিস পার্বণ। ভয় পাস না। বাবার হাতের স্পর্শ একটা সন্তানের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আর ভরসাযোগ্য।
তবুও পার্বণ নিতে পারলো না। যদি তার নরম দলার গোল্লা দুটো ব্যথা পায়। সারারাত সেদিন শুধু তাকিয়েই নিজের চোখ জুড়িয়েছে। সাথে পৌষকে শুধু বলতো,
— আস্তে ধর। ওরা ব্যথা পাবে তো।
পুষ্পছায়া ~
গন্ধরাজের কোষ্ঠকাঠিন্যর সমস্যা। ছোট বেলা থেকেই। তখন মা মাঝে মাঝে পানের বোটা দিয়ে হাগাতো। কিন্তু বয়স বেড়েছে এখন কি আর মা তার পাছার মধ্যে পানের বোঁটা ঢুকিয়ে হাগাতে পারে! পারেনা তো।
তাই এই সমস্যা সমাধানে বকুল তার ঔষধ বাবার দরবার থেকে মন্ত্রপুত জামাল গোটা নিয়ে আসে। সেটা খেয়েই হাগে।
সমস্যা সেটা না সমস্যা হলো আজ পূর্ণা নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে রেসিপি বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কালমেঘ এর জন্য।
বেচারা শুনেই মানা করে দিয়েছিলো। তার এতো দ্রুত মরার শখ নেই। কিন্তু মাদার বাংলাদেশের এক হুংকারে সব জারিজুড়ি শেষ।
তো যথারীতি পূর্ণা এক উদ্ভট রেসিপি নিয়ে হাজির। রেসিপিটির নাম “পেট নৃত্য নৃত্য শাক ফেক ফুঁক সুপ”। বাপ দাদা চোদ্দগুষ্টির জন্মেও এই নাম শোনে নি কালমেঘ। কালমেঘ তো নাম শুনেই যায় যায় অবস্থা খেলে না জানি কি হবে!
তবুও গলায়পাড়া মাইরা ধইরা গিলাছে সেই অখাদ্য। খেয়েছে। সাধের স ও লাগে নি। না ঝাল, না মিষ্টি, না মিষ্টি। কোনো পাদ ও না।
সেই তেলা পোকার গু নামক কুখাদ্য রেসিপি খেয়ে এখন কালমেঘের হাগা ছুটে গেছে। ছুটবেই না রেসিপির মেইন উপকরণ টাই তো ছিলো গন্ধরাজের সেই জামালগোটা!
কালমেঘ বর্তমানে একবার বাথরুমে যাচ্ছে তো একবার রুমে। শেষ কয়েক ট্রিপ রুমেও আসতে পারছে না। আর পূর্ণা ওর পিছে টিসু নিয়ে ছুটছে। গন্ধরাজ ট্যাংকি ভর্তির কাজে মানে পানি শেষ হচ্ছে সে মোটর ছাড়ছে।
মুখোমুখি আছে বিস্কুট ওরফে বিদ্যুৎ আর পার্বণ। বিদ্যুৎ বায়না ধরায় আসতেই হয়েছে। এসেই বিদ্যুৎ দখল নিয়েছে শ্রাবনকে।
হ্যা ছেলের নাম শরৎ আর মেয়ের নাম শ্রাবণ রাখা হয়েছে। কাল পরশুর মধ্যে আকিকা করে পার্মানেন্ট করা হবে। তবে পার্বণ তার গোল্লাদের কলা আর মুলাই ডাকবে বলে ঠিক করে।
সবাই বসে থাকায় পার্বণ কিছু বলতে পারছে না। সুপারগ্লুর মতো আটকে সে বসে আছে। কারণ বিদ্যুৎ আসার আগেই পৌষ হুশিয়ারি দিয়েছে,
— পার্বণ খবরদার বাচ্চাটা আসলে ওর সাথে কিছু করবি না।
— আমি বিস্কুট পছন্দ করিনা।
আহত পৌষ দেখে এই ভন্ডকে। একটা বাচ্চার সাথে কেমন করছে।
— ও একটা বাচ্চা পার্বণ। এমন কুত্তা বিলাই যুদ্ধ লাগিয়েছিস কেন তুই?
— শোন পৌষ মেয়েকে প্রটেক্ট করা একজন বাবা হিসেবে আমার দায়িত্ব। আর তাছাড়া আমি একজন ছেলে হওয়ায় খুব ভালোই বুঝতে পারছি ওই বিস্কুট একটা বা*ল*পাকনা শেয়াল যে আমার মুরগির বাচ্চাটার পিছনে পড়েছে জন্ম নিতে না নিতেই।
স্মৃতি বিচরণ থেকে বেরিয়ে আসে পার্বণ। পৌষ নারীটির নিজের মেয়েকে নিয়ে চিন্তায় নেই। আর হাফ ফুটের শিয়ালকে দেখো জিহবা কুত্তার মতো এক হাত বের হয়ে গেছে।
মেয়ে আমার ব্যথা পাবে বলে কোলে নিতেও ভয় হয় সেখানে এই ব্যাটা কোলে নিয়ে ভর্তা বানাচ্ছে। এসব ভাবনার মাঝেই পৌষ, দ্যুতি চলে গেলে পার্বণ বিদ্যুতের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচায়।
এর মানে এই “এবার? কই যাবা বাছাধন?”।
সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলো যেনো পার্বণ। ওরা যেতেই চিলের মতো থাবা মারে।
— এই ছেলে আমার মেয়ের থেকে দূরে থাকো। ডিম থেকে মুরগির বাচ্চা ফুটতে পারলো না এর মধ্যে শিয়ালের হুঁক্কাহুয়া শুরু!
পার্বণ নিজের মেয়েকে বিদ্যুতের কোল থেকে এক প্রকার হুমকির সাথে নিজের কোলে নিয়ে নিলো। বিষয়টা বোধহয় বিদ্যুৎ নামের ছেলেটার পছন্দ হলো না। পার্বণকে ইচ্ছেমতে কিলিয়ে বলে উঠলো,
— অ্যাই পাছা (পঁচা ) আঙ্গুল(আংকেল ) তুমি আমার বুউয়ের থেকে দুলে থাকো।
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো পার্বণ সামনে কোমরে হাত দেওয়া দুই ফুটের দেরবান্দরটির দিকে। ” একে তো চুরি তার উপর সিনা জুড়ি!” এমন হয়ে গেলো না ব্যাপারটা?
শুধু এটুকু তেই থেমে থাকেনি। গড়াগড়ি খেয়ে কাঁদছে আর ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদো কাঁদো সুরে শুধু বলেই যাচ্ছে,
— আমাল বুউ। আমাল বুউ। আমি আজকেই আমাল বুউ নিয়ে চলে যাবো।
বিদ্যুতের পাগলা কান্না দেখে আক্কেলগুড়ুম অবস্থা পার্বণ ভন্ডের। সে অবাক হয়ে বিড়বিড় করে,
— এই ছেলে আমার জামাই হলে আমাকে লুঙ্গি খুলে দৌঁড়াতে হবে।
নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
— শিয়াল থেকে মুরগির বাচ্চাকে বাঁচাতে আপনারা মোরগ বাপ রেডি।
লাথি, উস্টা খেয়েও সিনিয়র পটাতে যখন লে হালুয়া টাইপ অবস্থা তখন বসন্ত নামক হেমন্তের বলদ ভাই সল্যুশন নিয়ে হাজির।
গজাল বাবার “শুরুতেই গলদ” নামক অফিসে এসেছে বসন্ত নিজের ভাইয়ের সেটআপ করাতে। হেমন্ত তো নাম দেখেই চোয়াল ঝুলে পড়েছে।
পৌষপার্বণ পর্ব ৩৬
তবে বসন্ত এই গজাল বাবার যেই লেবেলের প্রশংসা করেছে! নাম কি গ-জা-ল বাবা। নামেই তো জাল। উল্টা পাল্টা চিন্তা ভাবনা করার মাঝেই বসন্ত নাচতে নাচতে হেমন্তকে নিয়ে ভিতরে যায়।
ভিতরে গিয়ে হেমন্ত বোধহয় কলুর বলদ হয়ে গেলো। সিরিয়ালে দাড়িয়ে ১০০০ টাকা দিয়ে কুপন কালেক্ট করে এন্ট্রি করতে হবে। আর সিরিয়ালের লম্বা লাইন দেখে তো ও ভাষা হারিয়ে নির্বোধ হয়ে গেছে।
