পৌষপার্বণ পর্ব ৩৬
Irfa Mahnaj
স্তব্ধ, নিস্তব্ধ হসপিটালের এই করিডরটা। হাসি মজায় মজে থাকা “বারোমাসি নীড়” আজ শোকের ঘন ছায়াতলে। মেঘ করেছে তবে সে মেঘ দুঃখের। বৃষ্টির মতো কান্না গুলো ঝরে ঝরে পড়ছে একেকটা মানুষের হৃদয় নিংড়ে।
পার্বণের অপরিপক্ক মস্তিস্ক কথার ধার সহ্য করতে পারেনি। কাঁচা মাথা,বয়স কম। কিশোর পার্বণ তার প্রিয়তমার মৃত্যু সংবাদ মেনে নিতে পারেনি। আর তাইতো করে বসে স্ট্রোক। মিনি স্ট্রোক।
বর্তমানে বারোমাসি নীড় দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। এক দল নিয়ে গেছে পার্বণকে আরেকদল রয়েছে ব্যাস্ত জ্যৈষ্ঠকে নিয়ে। ছুটোছুটির এক পর্যায়ে ডাক্তাররা পুনরায় জানায় রক্তের জন্য।
ভাদ্র তড়িৎ আসে আবার এখানে। পাগলের মতো অবস্থা হয়েছে। একদিকে পৌষ ওটিতে। আদরের বোনটা তার জীবন নিয়ে লড়ছে। অন্যদিকে বন্ধুসমান আদরের ভাই আইসিউতে ভর্তি।
ভাদ্রের গায়ের আকাশি রঙের শার্টটা ঘামে ভিজে লেপ্টে আছে। চুল গুলো এলেমেলো। চোখের নিচের ঘাম আর ক্লান্তির স্পষ্টতা।ফ্যাকাসে চেহারা। রক্তের জন্য ভাদ্র যখন দিশেহারা তখনই আশার আলো হয়ে সেখানে উপস্থিত হন দ্যুতি আর চমক।
চমকের রক্ত মিলে যাওয়ায় সে রক্ত দেয়। সম্পূর্ণ অপরিচিত কিন্তু আজ তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় উপকারটাই করে। চমকের হাত দুটো ধরে কাঁপা কাঁপা স্বরে ভাদ্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
— ভাই কি বলে যে আপনাদের ধন্যবাদ দিবো। আপনাদের এই ঋণ কিভাবে শোধ করবো আমি জানি না।
— ছি ছি ভাই এভাবে বলবেন না। আর চিন্তা করবেন না। আল্লাহ দেখবেন কোনো না কোনো ভাবে ঠিক ঋণ শোধ করার উপায় বের করে দিবে।
ওদের কথার মাঝেই একটা ছোট নরম, লালচে হাতের মালিক দ্যুতির কনিষ্ঠ আঙ্গুল চেপে ধরে। ফুলো ফুলো লাল টকটকে ঠোঁট জোড়া নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করে,
— মা… মাম্মা কি ওয়েচে?
বছর পাঁচ কি চারের একটা বাচ্চা ছেলে। বেশ গুলুমুলু গাল। দেখলেই আদর আদর লাগে। বাচ্চাটার দিকে নজর যেতেই ভাদ্র শুধায়,
— কি আমার মামা নাকি?
চমক মাথা নাড়াতেই ভাদ্র নিজের হাত বাড়িয়ে দেয়। বাবা মায়ের দিকে একবার তাকিয়ে ভাদ্রের কোলে উঠে। ছোট খাটো একটা তুলোর বল নিয়েছে কোলে এমন মনে হলো ভাদ্রের।
ঠোঁট দাবিয়ে যেইনা চুমু খেলো ওই লাল লাল আদুরে গালে অমনি গাল দেবে একদম ঢুকে গেলো। ভাদ্রের শরীরের আলাদাই শিহরণ বয়ে গেলো। সে হালকা হেসে বলে,
— আমার বোন তোমার আন্টি তোমার জন্য একটা খেলার সাথী আনছে বাবা।
বাচ্চাটা কি বুঝলো কে জানে? সে সেই খুশি। যদিও ভাদ্র কথাটা নিতান্তই মজার ছলে বলেছে। তবে বাচ্চাটার মনে দাগ কাটে। “তার খেলার সাথী!”
অতঃপর এখানেই রয়ে গেলো। সে নাকি তার খেলার সাথীকে দেখে তবেই যাবে। চমক যেহেতু রক্ত দেওয়ার জন্য বিশ্রাম নিচ্ছিলো তাই থাকাই যায়। ছেলেটাও বায়না ধরে।
চমকদের বলেই পার্বণের কাছে যায় ভাদ্র। সঙ্গী তার বাচ্চা ছেলেটা। ভাদ্রও হাসি মুখে তাকে কোলে তুলে রওনা দেয়। এই দেখে দ্যুতি শুধায়,
— দেখেছো ছেলেটার কান্ড আপনাকে শুধু শুধু কষ্ট দিচ্ছে।
— আরে না না সমস্যা নেই।
পার্বণের কাছে যেতে যেতে ভাদ্র ছেলেটাকে নাম জিজ্ঞেস করলো,
— তা বাবা তোমার নাম কি?
— বিস্কুট আমাল নাম।
— এ্যা?
গোল গোল চোখ করে তাকিয়ে রয় ভাদ্র। বিস্কুট আবার কারো নাম হয় নাকি! কি আজিব নাম রে বাবা!
সময় আর নদীর প্রবাহ কখনও থেমে থাকে না তারা নিজস্ব গতিতে চলে। সময় তখন সন্ধ্যা ৭. ৩০ মিনিট।
ডাক্তারের অক্লান্ত পরিশ্রম, আপনজনের বিশ্বাস আর সৃষ্টিকর্তাকে মন প্রাণ দিয়ে ডাকার ফলে পৌষ দুটো সুস্থ বাচ্চার জন্ম দেয়। বর্তমানে সেন্সলেস পৌষ। একদিকে যেমন ডাক্তারের টুইন বেবি হয়েছে কথাটায় সবাই শুকরিয়া করে আরেকদিকে আফসোস করে।
এই বাচ্চা নিয়ে যদি সবচেয়ে বেশি কেউ উল্লাস আর উত্তেজনায় থাকে তবে সেটা বাচ্চাদের ভন্ড বাপ পার্বণ। যে এখন ওষুধের প্রভাবে নিশ্চল।
আশ্চর্য জনক ভাবে বাচ্চাদের ক্রন্দন ধ্বনি পার্বণের অবস্থা উন্নতি করে। মানে নিজের অবচেতন মনেও পার্বণ শুধু তার অস্তিত্বের কথাই চিন্তা করে। অনুভব করে।
ওটি রুম থেকে যখন বাচ্চার কান্নার আওয়াজ আসছিলো তখন অতী উৎসাহের সাথে সেই বাচ্চা ছেলেটা বলে,
— আমাল খেলার চাথি কি চলে এসেচু? (আমার খেলার সাথী কি চলে এসেছে?)
ভাদ্র মাথা নাড়িয়ে হ্যা বোঝায়। পরক্ষনেই দ্বিতীয় বারের ন্যায় একই রকম ভাবে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ পেতে চোখ দুটো চক চক করে ওঠে ছেলেটার। হাত তালি দিয়ে বলে,
— ইয়ে! আমাল দুটো খেলার চাতি!
ওটির রুমের দরজা খুলে নার্স তার দুই হাতে দুইটা ছোট প্রাণ নিয়ে বের হয়। হেসে জানায়,
— কংগ্রাচুলেশন! আপনাদের টুইন হয়েছে।
— আমি নিবো। আমালকে দেউ।
নার্সের উদ্দেশ্য বলে। দ্যুতি রাগ হয় ছেলেকে।
— এই একদম না বাবা। বাবু অনেক ছোট ব্যথা পাবে।
মুখ কালো করতেই বৈশাখ হেসে বলে উঠলো,
— আরে সমস্যা নেই। নিক। ভাদ্র সাপোর্ট করবে। বাচ্চাটার আনন্দ মাটি করো না।
এই বলেই ভাদ্রকে ইশারায় কিছু বলে। আর বাচ্চাটার মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কাকে নিতে চাও?
ছেলেটাও টুকুস টুকুস করে হেঁটে যায় সামনে। হাত দিয়ে দেখিয়ে বলে,
— এই ছাদা বলটাকে।
একদম নরম লালচে সাদা ছোট নাজুক একটা প্রাণ। ভাদ্রের সহায়তায় ওর ছোট ছোট দুই হাতে দেওয়া হয় সদ্য জন্ম নেওয়া কন্যা সন্তানটি।
— বিদ্যুৎ বাবা আস্তে ধরো।
মায়ের সাবধানী বাণী শুনেই তার দিকে তাকিয়ে হেসে দিলো বিদ্যুৎ। সামনের ছোট ছোট দাঁত গুলো ঝিলিক দিয়ে উঠলো মুক্তার দানার মতো। বিদ্যুৎ তাকিয়ে রয় একধ্যানে সদ্য জন্মানো সেই বাচ্চা মেয়েটার দিকে।
বৈশাখ ও দেরি না করে ছেলে বাবুটাকে কোলে নেয়। কোথাও না কোথাও সুক্ষ ব্যথা অনুভব করছে। ছেলের মুখটা মনে পড়ছে। ছেলেটা তার কতটা খুশি হতো।
আল্লাহ যে কেন এমন করলো! এক বাবা তার সন্তানদের প্রথম কোলে নেওয়া থেকে বঞ্চিত হলো। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে খুশিতে চোখ জোড়া চিকচিক করে উঠলো বৈশাখের।
— দেখ ফাল্গুন এ যে আমাদের ছোট পার্বণরে!
ফাল্গুন, মাঘ তারাও নিজের খুশি অশ্রু নিয়ে এগিয়ে আসেন। মেয়েটাকে কোলে নেয় আষাঢ়। ভাদ্র, চৈত্র ও তার সাথেই রয়। আজান দেওয়া হয় বাচ্চা দুটোর কানে। বসন্ত আর হেমন্ত ছবি তুলে পোস্ট করে সঙ্গে।
শোকের ঘনঘটা কেটে সূর্যের কিরণ উঁকি দেয়। ঝলমল করে পরিবেশ। নতুন প্রাণের সূচনা। প্রকৃতিও আজ মজেছে।
বিদ্যুৎ বার বার কাঁদছে সে কিছুতেই মেয়ে বাবু টাকে ছেড়ে যাবে না। ওকে সঙ্গে করেই নিয়ে যাবে। দ্যুতি আর চমক পারছে না লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে।
কেঁদে কুটে এক করে ফেলে। অবশেষে হার মানে চমক ছেলের কাছে। বলে,
— মুখ তো লাল হয়ে গেছে। আমরা আবার কাল আসবো আব্বা।
— কেনু! আমাল চাতে যাবে। আমি নিবু।
— দেখো বাবু তো তখন খুব ছোট ও বড় হোক দরকার হয় তোমার সাথে বিয়ে দিয়ে ওকে তোমার সাথে পাঠিয়ে দিবো। কেমন?
ভাদ্রের কথা শুনে ওর দিকে বড় বড় চোখে তাকায়। তারপর হেসে উঠে।
— ছত্যি?
পৌষপার্বণ পর্ব ৩৫
— হ্যা শুধু তোমার বিয়ের ভিলেন বাবুর বাবা। সে যদি জানে তার অবর্তমানে আমি তার সদ্য জন্ম নেওয়া মেয়ের বিয়ে দিচ্ছি আমাকে কি যে করবে! সেই সাথে তোমার পাছা ফাটিয়ে লাল করে দিবে।
মনে মনে বলে ভাদ্র। ওকে এভাবে দাড়িয়ে থাকতে দেখে ওর শার্টয়ের কোনা চেপে ধরে বিদ্যুৎ। জানতে চায়,
— কি হইচে?
— কিছুনা। এখন যাও। নাহয় বাবুর বাবা তোমার পাছা লাল করে দিবে।
