আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৪
সুরভী আক্তার
ইয়াশ ক্ষুব্ধ হয়ে পাশ ফিরলো । হাত আর কন্ঠের মালিকের দিকে তাকালো তড়াক করে । রৌদ্রের মুখশ্রী দেখা মাত্রই দপ করে ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠলো মস্তিষ্কে । পুরো শরীর জ্বলে উঠলো রি রি করে । সে নিয়ন্ত্রণ হারালো । এ যাত্রায় দমাতে পারলো না রাগ । এসেছে থেকেই নিয়ন্ত্রণে রেখেছে নিজেকে । আর পারা গেলো না । হঠাৎ কি হলো কে জানে । আকস্মিক আক্রমণ করে বসলো সে । শক্ত পোক্ত দাপুটে একটা আঘাত আছড়ে পড়লো রৌদ্রের চোয়ালে । অতর্কিত আক্রমণ সামলাতে পারলো না বেপরোয়া যুবক । ছিটকে পিছিয়ে গেলো বেশ কয়েক ধাপ । বারি খেলো ছাদের রেলিংয়ের সাথে । নিমিষেই শক্ত আঘাতের তোপে ওষ্ঠপূট কেঁটে রক্তের দেখা মিললো ফোঁটা কয়েক ।
প্রত্যাঘাতে তেঁতে উঠলো রৌদ্র……
” হোয়াট রাবিশ , ইয়াশ ! আর ইউ ম্যা….
আর কিছু উচ্চারণ করার আগেই ফের হামলা চালায় ইয়াশ । এলোপাথাড়ি হাত চালাতে শুরু করে । ঝড়ের বেগে একেকটা পাঞ্চ আছড়ে পড়ে রৌদ্রের চোয়ালে আর পেটে । যেনো রাগ ঝাড়ছে তপ্ত যুবক । মারছে দিকবিদিক জ্ঞান খুইয়ে । শক্ত তার প্রত্যেকটা আঘাত ।
রৌদ্র হিমসিম খেয়ে যায় । তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ করতে বেগ পায় । কুল পায় না কিছু করার । সামলাতে পারে না নিজেকে । আর না পারে ইয়াশকে আটকাতে । ব্যাথায় কুঁকড়ে যায় সে । খিচে আসে চোখ মুখ । ইয়াশ জমে রাখা সব রাগ নিংড়াতে ব্যস্ত । হিসহিস করছে হাত চালানোর সাথে সাথে । রাগে শরীরের শিরা উপশিরা ফুলে উঠেছে তার । রক্তিম হয়ে উঠছে চোখ সহ সর্বাঙ্গ ।
রৌদ্র কে মারতে মারতে ছাদের মেঝেতে লুটিয়ে ফেললো সে । রৌদ্র দম নিতে পারে না । এবারে রাগ চড়ে মাথায় । খিচে আসে চোয়াল । এতক্ষণ সহ্য করলেও আর করলো না । ইয়াশ একটু থেমেছে কি থামেনি , তেড়ে আসার আগেই ঝট করে উঠে দাঁড়ালো রৌদ্র । প্রতিরোধের ভঙ্গিতে সামনে হাত বাড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে উচ্চারণ করলো…..
” এনাফ ইজ এনাফ । ইয়াশ আমার কথাটা শোন । অনেক হয়েছে…..
শুনলো না তপ্ত যুবক । উত্তপ্ত অনলে জ্বলছে তার মস্তিষ্ক । আজ সুযোগ পেতেই ফেটে পড়েছে রাগে । সে গজগজিয়ে আরো একটা পাঞ্চ বসালো রৌদ্রের ডান চোয়ালে । আবারো ছিটকে পড়লো রৌদ্র । এবার সহ্য শক্তির বাঁধ ভাঙলো । চোয়াল শক্ত করে চেপে নিজেও উদ্যত হলো আঘাতের পাল্টা জবাবে । হাত ওঠাতে ওঠাতে থেমে গেলো কিছু একটা মনে পড়তেই । দম ফেলে ইয়াশের ঔদ্ধত্যা মোকাবিলা করলো । ওর টাটানো হাতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে কন্ঠ চিপে ধমকালো….
” স্টপিড ইয়াশ । আমি নিজেকে পরিবর্তন করেছি , তাই বলে ক্যারেক্টার ভুলিনি । কিছু করছি না বলে ভাবিস না আমার হাত নেই । হাত ওঠাতে বাধ্য করাস না আমায় । সেই পুরনো রুডভিক কাবির রৌদ্রকে জাগাস না । আমি তোর সাথে মারামারি করতে আসিনি এখানে । তোর বোনের কথায় এসেছি ।
বোনের কথা উঠতেই ইয়াশ রাগে গজগজ করে ঝাড়া মেরে সরালো ওকে । রাগ দমাতে মাথা চেপে ধরে গলা চিরে বিকট চিৎকার দিলো উপর পানে মাথা উঁচিয়ে । হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েছিলো ক্ষোভের বশে ।
এখন চোখ দুটি ভরে উঠলো তার । ঠিকরে বেরোলো শিরা উপশিরা । শ্বাস পড়লো ঘন ঘন । পিছিয়ে ধপ করে মেঝেতে হুমড়ি খেলো সে । চোখ মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলো বোধহয় । রৌদ্র অবাক হয় আকস্মিক ওর কান্নার আওয়াজে । ধক্ করে এগিয়ে যায় । হাঁটু মুড়ে বসে কাঁধে হাত রাখতেই দ্বিতীয় বার ঝাড়া মেরে ওকে দূরে সরায় ইয়াশ । আঙ্গুল তুলে চিৎকারযুক্ত কন্ঠে শাশায়…….
” আমার বোনকে যদি কোনদিন কষ্ট দিয়েছিস না , যদি আমার কানে কোনদিন এরকম কিছু আসে , তাহলে সেদিনই তোকে জানে মেরে ফেলবো আমি ।
” তোরা ভাই-বোন এক কেনো বলতো ? একটু আগে তোর বোন পাঠালো আমায় , বললো… যদি তোকে ভালোয় ভালোয় মানাতে না পারি , তাহলে সেও জানে মেরে দেবে আমায় । আরে আমি কি মরতে চাই নাকি ? আমি তো বাঁচতে চাই তোর বোনের সাথে ।
ইয়াশ প্রত্যুত্তরে চুপ হয়ে গেলো । হাত মুঠো করে হাঁটু জড়িয়ে নিয়ে দৃষ্টি নিচু করলো । শরীর কাঁপছে এখনো । দ্রুত ওঠানামা করছে বুক ।
রক্তিম ভারী চোখ জোড়া পাতলা হয়ে গাল ভিজেছে । রৌদ্র এই দূর্বল ইয়াশ টাকে পরখ করলো তীক্ষ্ণ চোখে । পরক্ষনে নাক , মুখে ব্যাথা অনুভব করলো । বেজায় মেরেছে এই ছেলে । পুরো দাগ বসে জখম হয়ে গেছে । ফুলে গেছে এখানে ওখানে । ঠোঁট কেটে রক্ত বেরোচ্ছে এখনো । রৌদ্র কিঞ্চিত ব্যাথায় মৃদু কুকিয়ে ওঠে । ঝাড়ি মেরে বলে……
” শালা ,, বোনের হাসবেন্ড’কে এভাবে কে মারে ? ব্যাথা লাগে না বুঝি ?
অগ্নি চক্ষু তাক করলো ইয়াশ ।
রৌদ্র হাসে ফ্যাল ফ্যাল করে । মনে মনে প্রসঙ্গ গুছিয়ে নেয় । পাশাপাশি ইয়াশকে অনুকরণ করে একই ভঙ্গিতে বসে । ক্ষণকাল বাদ গহীন শূন্যে দৃষ্টি তুলে জবান খোলে…..
” সরি ইয়াশ ।
ইয়াশের নড়চড় নেই । বাম চোখের কার্নিশ ঘেঁষে এক ফোঁটা পানি গড়ালো । বুকে ভার অনুভব করলো সে । বললো রৌদ্র…..
” তুই জানতিস আমি তোর বোনকে পছন্দ করে ফেলেছিলাম, তাই না ? কিভাবে বুঝেছিস বলতো ? তোর সাথে সখ্যতা গড়তে চেয়েছিলাম , তাতে বুঝেছিস ?
রৌদ্র ভাব জমাতে চাইছে । ইয়াশ নিরুদ্বেগ, নিরুত্তর ।
কাছ ঘেঁষলো রৌদ্র । ফের বললো….
” দেখ ইয়াশ, অবশেষে আমিও কাউকে ভালোবেসে ফেলেছি । সেই বেপরোয়া ছন্নছাড়া মনটাও গলে গেছে কারোর উপর । ভাবা যায় , আমিও ভালোবাসা বুঝেছি !
” বুঝেছিস যখন , তখন আমার ভালোবাসা’টা কেড়ে নিলি কেনো রুডি ?
ইয়াশের আহত, মর্মান্তিক কন্ঠ । রৌদ্র ভয় পেলো । শুল্ক ঢোক গিললো !
” আমার কথাটা আগে শোন তুই । তুই অনেক কিছুই জানিস না । না জেনে ভুলের মাঝে ডুবে আছিস এখনো । ইয়াশ, প্লিজ ভুল বুঝিস না আমায় ।
” ……
” তুই আর আরাফ খুব ভালো বন্ধু ছিলি ।
আমিও তোদের বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করেছি , যবে থেকে তোর বোনকে দেখেছি । তুই ক্ষমা না করলেও আরাফ ক্ষমা করেছিলো আমায় । আর এই থেকেই তোদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি শুরু ।
” ভুল বোঝাবুঝি তো তখন হলো , যখন তুই রিসার সাথে আরাফের বিয়ে দিলি ।
” ওরা একে অপরকে ভালোবাসতো ।
” মিথ্যে । বিশ্বাস করি না আমি । রিসাকে আমি ভালোবাসতাম । আরাফ জানতো এটা । ও আমার ভালোবাসাকে কেড়ে নিতে পারে না । তুই ওকে ডুবিয়েছিস এসবে ।
তাচ্ছিল্য হাসলো রৌদ্র ! বললো ইয়াশের দিকে চোখ তাক করে…..
” রিসাকে তুই ভালোবাসিস বা পছন্দ করিস , এটা তুই আরাফকে বলিস নি কখনো । মনে কর । আরাফের সাথে রিসার বিয়ে হওয়ার পর সিনক্রিয়েট করেছিস তুই ।
ইয়াশ উপর দিক থেকে চোখ নামায় । ভেজা ভাঙা গলায় বলে…..
” ও তো আমার বন্ধু ছিলো । সেই ছোট্ট কালের । তাহলে ও কেনো বুঝলো না আমার অনুভূতি ? আমি না হয় বলিনি , তাই বলে ওর বোঝা উচিত ছিলো না কি ?
” এটা নিজেকে প্রশ্ন কর । তোর চোখের সামনে ওরা দুজন দুজনকে পছন্দ করতো, সম্পর্কে জড়িয়েছিলো । এটা তুই বুঝিস নি কেনো ? চোখে ঠুলি পড়ে ছিলি তখন ?
” মোহে অন্ধ ছিলাম ।
নীরবতা ক্ষণিকের । রৌদ্র নিশপিশ করে । গলা কাঁপছে ওর । কিছুতেই আরাফের ব্যপারে কথা তুলতে পারছে না । সে ঢোক গেলে বারংবার । বলে অযথা…..
” রিসার পরিবার কেমন, তুই জানিস । ওদের সম্পর্কের কথা জানাজানি হওয়ার পর রিসাকে এক দিনের ব্যবধানে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় । সেদিন রাতে ও সব ছেড়ে পালায় বাড়ি থেকে । আরাফের কাছে আসার পর, ওরা দুজনে তোর খোঁজ করেছে সবার আগে । ভেবেছে তোকে সাথে নিয়ে কিছু একটা করবে । কিন্তু তোকে পায় নি । হয়তো বাধ্য হয়ে আমায় ফোন করেছিলো সেদিন । আর সেদিনই ওদের বিয়েটা আমি দিয়েছিলাম ।
” আর পরের দিন আমায় একটা হার্ট ব্রেক করা সারপ্রাইজ দিলি তোরা । তাই তো ? যাকে ভালোবেসে এসেছি, নিজের বউ রুপে কল্পনা করে এসেছি, তাকে দেখলাম নিজের একমাত্র প্রাণ প্রিয় বন্ধুর বউ হিসেবে । কতটা কষ্ট হয়েছিলো জানিস ? রেগে গেছিলাম বোধহয় । উল্টো পাল্টা বলে দিয়েছি সেদিন , তাই না ? প্রথম হাত তুলেছি আরাফের গায়ে । তাতে কি , ওও তো মেরেছে আমায় !
থামলো । চোখ, গাল ভিজলো টপাটপ । বললো হেসে….
” ওর উপর এতোটা রাগ করিনি কখনো । যতটা সেদিন দেখিয়েছি । সেদিনের পর আর রাগ দেখাতে পারলাম না , আর না রাগ ভাঙাতে পারলাম । এতোটা রাগ ওর ? এভাবে ভুলে গেলো আমায় ? আমি না ওর বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলাম । এভাবে চলে যেতে পারলো আমায় একলা রেখে ? ভাবলো না,আমি কিভাবে থাকবো । ওরা দু’জন ছাড়া আমার তো আর কেউ ছিলো না । ওরা দুজন দুজনকে পেয়ে ভুলে গেলো আমায় ?
” অভিযোগ করছিস ?
” করছি ! ও জানে আমায় । আমি অপেক্ষায় ছিলাম ওর । ও যদি আমায় সবটা খুলে বলতো , তাহলে আমি বিনা বাক্যে মেনে নিতাম । ভুলে যেতাম নিজের অনুভুতি । ওকে কখনো জানতেও দিতাম না , যে আমিও রিসা কে ভালোবাসতাম । কিন্তু না , ও তো বলেনি আমায় । আমার চোখের সামনে ওরা প্রেম করে গেছে , অথচ আমি বুঝিই নি । ওরাও বলেনি । এই নাকি আমি ওদের বেস্ট ফ্রেন্ড ? কেবল কি নামেই ?
রিসা কে পেলাম না, এই নিয়ে আফসোস কম । কিন্তু ওকে হারালাম এই নিয়ে আফসোসের শেষ নেই আমার । ও কেমন বন্ধু ! যে আমার আর খোঁজ নিলো না ? বউ পেয়ে ভুলে গেলো আমায় ? বারো বছরের বন্ধুত্ব ছিলো ওদের সাথে । এখন ছয় বছরের বেশি সময় পেরিয়েছে । একবারও আমার কথা মনে পড়ে নি ওর ? খুব সুখে আছে বুঝি , যতটা সুখে থাকলে প্রিয় বন্ধুর কথাও মনে পড়ে না । আমার তো মনে পড়ে । ভুলতে পারি না এক মুহুর্তের জন্যও । ওদের ভোলার জন্য নেশা ধরেছি , তবুও শালা ভুলতেই পারি না । ওদিকে ওরা আমায় মনেই করে না ।
” এভাবে দোষারোপ করিস না ইয়াশ ,, মুছে ফেল সব অভিযোগ । মরা মানুষের উপর আক্ষেপ রাখতে নেই ।
বুলি ফুটিয়ে থামলো রৌদ্র । স্তম্ভিত হয়ে গেলো পুরো ছাদ । ইয়াশের হাসির শব্দ শোনা গেলো কথার পাছে । হয়তো অর্থ বোঝেনি প্রথমে । যখন বুঝলো , তখন পাথর বনে গেলো । ধীরে ঘাড় বাঁকিয়ে চাইলো রৌদ্রের দিকে । হাসলো আবার । বললো অস্ফুটে……
” হ্যাঁ ? কিছু বললি ? বুঝিনি !
খোলা আকাশের নিচে দুটো সটান মানব বসে পাশাপাশি । অন্ধকার ঘুচিয়ে দক্ষিণে বাঁশের খুঁটিতে আলো জ্বলছে একটা । ইয়াশ সেই আলোতে স্পষ্ট দেখতে পেলো , রৌদ্রের দুচোখ ছাপিয়ে অনবরত নোনা জলের ঝর্না ঝড়ছে । পুরুষদের কাঁদলে ভালো দেখায় না । রৌদ্র কেও কেমন অদ্ভুত অস্বাভাবিক দেখালো । চোখে ঘোর অনুভূত হলো ইয়াশের । অজান্তেই চোখ পরিষ্কার হলো পানি ঝড়ে । সে কথাটা পূণরায় শোনার জন্য ব্যাকুল হয়ে রৌদ্রকে ঝাঁকায়…..
” এইই রুডি , কি বললি তুই ? বল আবার !
” সহ্য করতে পারবি ?
” পুরুষদের সহ্য ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে আসিস না ।
” যদি বলি আরাফ আর নেই , বিশ্বাস করবি ? পারবি মানতে ?
ইয়াশের পেটানো শরীর খানা ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে । ঠান্ডায় শিউরে ওঠে সে । চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে । তাৎক্ষণিক বলে…..
” নেই মানে ? আমি জানি ও দেশে নেই !
” যদি বলি পৃথিবীর কোথাও নেই ।
আবার দুলে উঠলো অবল দেহ খানা । কাঁপল থরথরিয়ে । বুঝলো না মানে ! গলা শুকিয়ে আসলো শক্তি হীন যুবকের । মাথায় অসম্ভব যন্ত্রনা অনুভব করলো সে । ভঙ্গুর হৃদয় ফড়ফড় করে ছিন্নভিন্ন হলো ভারী যন্ত্রনায় । সেসবে তোয়াক্কা না করে কম্পিত হাতে রৌদ্রকে টেনে নিজের দিকে ঘোরালো…..
” মা….মানে ? কি বলতে চাইছিস তুই ?
ভেজা দুই মানবের আঁখি দ্বয় । যেনো ভাষা বিনিময় হলো চোখে চোখে । তবুও অর্থ বোঝাতে ব্যর্থ ।
ঢোক গিলে রুদ্ধতা ঠেলে মুখ খুললো রৌদ্র…..
” আ…আরাফ আর আমাদের মাঝে নেই ইয়াশ । চলে গেছে ও । অনেক দূর । যতদূরে গেলে আমরা ওকে দেখতে পারবো না , ছুঁতে পারবো না । ঠিক ততদূরে চলে গেছে । সাথে নিয়ে গেছে তোর দেওয়া সব অভিযোগ ।
হামাগুড়ি দিয়ে পেছালো ইয়াশ । হাসলো শব্দ করে ।
” মজা নিচ্ছিস রুডি ?
” নাহ্ ।
সহজ প্রত্যুত্তর । ইয়াশ চিবুক নামায় । বলে না কিচ্ছুটি । পুরো নিস্তব্ধ হয়ে যায় সে । চোখে আর পানি নেই । মুখের আহত ছাপ গায়েব । কি অদ্ভুত মর্মাহত ভাব ফুটলো , বোঝা গেলো না খালি চোখে । হয়তো ভেতর পুড়লো । দগ্ধ হলো । দিখন্ডিত হতে হতে চূর্ণ বিচূর্ণ হলো অন্তঃস্থল । দেখা গেলো না বাহির থেকে । বুক ফাটলো , ফুটলো না মুখ । হাঁটু জড়িয়ে নিলো সে । তীব্র যন্ত্রণায় মাথাটা চিরে গেলো , রক্তক্ষরণ হলো মস্তিষ্কের নিউরনে । তোলপাড় হলো অন্তরালে । বুঝতে দিলো না কাউকে । তাই বলে কি রৌদ্র বুঝলো না, না-কি !
বুঝেছে বেপরোয়া যুবক । এগিয়ে বললো ভাঙা গলায়…..
” ও আমাদের ছেড়ে চলে গেছে ।
আজ থেকে আরো সাড়ে পাঁচ বছর আগে । যেদিন তোর বোনকে বিয়ে করলাম, সেদিন । হঠাৎ কল আসলো রাতে, কোনো একদিন শুনেছিলাম রিসা প্রেগন্যান্ট । এক মুহুর্তেই ভাবলাম, খুশির খবর বোধহয় । হাসি মুখে রিসিভ করে আরাফের এক্সিডেন্টের খবর শুনলাম । রাত পেরোতে না পেরোতেই আরো শুনলাম , সে আর নেই ।
ইয়াশের ঝটকা খাওয়ার কথা । কিন্তু সে নড়লো না একটুও । তার অবস্থা বেশ বুঝতে পারছে রৌদ্র । হাত বাড়িয়ে ঝাঁকালো…..
” ইয়াশ ।
ছেলেটা দুলে উঠলো সর্ব শরীরে । চোখ তুলে তাকালো । খাদ যুক্ত স্থির চাহনি । বেজায় দুঃখ সেখানে । কষ্টে লোকে ভাষা হারায় । ইয়াশ হারালো নিজেকেই । ভুলতে বসলো আপন সত্তাকে । কষ্ট হলো কি ? কতটুকু হলো ? জবান বন্ধ হলো কেনো এই কষ্টে ? দলা পাকিয়ে গলায় জড়ো হচ্ছে কিছু একটা । সর্বাঙ্গ নিস্তেজ হয়ে আসছে । নাছোড়বান্দা মন মানতে নারাজ । কানকে অবিশ্বাস করছে এখনো । স্বপ্ন মনে হচ্ছে সবটা । ঘোরে আছে সে । কাটাতে চিমটি কাটলো হাতে । ব্যাথা পেলো । অর্থাৎ ঘোর নয় । কঠিন সত্য ।
সে হাত পা ছড়িয়ে দিলো । তবুও অবিশ্বাস নিয়ে থেমে থেমে শুধালো এক বাক্য ।
” আরাফ কোথায়, রুডি ?
তীব্র যন্ত্রণায় চোখের কোটর ফেটে কান্না আসে রৌদ্রের । কাঁদতে পারে না । ছেলেরা এই বিশেষ ক্ষমতাটা দাখিল করেছে । কাঁদা বারন । কষ্ট পেলে চোখে প্রকাশ করা বেমানান তাদের । তবুও কি চোখ মানতে চায় না-কি ?
সে বললো আধো স্বরে….
” মানতে কষ্ট হলেও এটাই সত্যি । সেই এক্সিডেন্টের পর ও বেঁচে ফেরেনি । আরাফ আর নেই ইয়াশ । মরে গেছে ও ।
” আগে বলিসনি কেনো আমায় ?
” বলা বারন ছিলো ।
” কার ?
” তোর বন্ধুর ! বন্ধু হোস তো ওর ! তোর কষ্ট সহ্য হতো না হয়তো । মরার আগে বলে গেছে , যেনো ওর মরার খবরটা তোর কানে পৌঁছাতে দেওয়া না হয় । হারিয়ে কষ্ট সহ্য কর । তবুও ফুরিয়ে যাওয়ার কষ্ট যেনো সহ্য করতে না হয় ।
” তাহলে আজ বললি কেনো ? কষ্ট হচ্ছে যে এখন । এবার ওকে বল , এসে শান্তনা দিয়ে যাক আমায় । আমি পারছি না সহ্য করতে । বল ওকে…..
রৌদ্র আহত চোখে তাকায় । ইয়াশের চোখ টই টুম্বুর । মুখখানা মর্মাহত । নিস্পৃহ সর্বাঙ্গ ।
” ইয়াশ । আ’ম সরি , আমি তোকে এসব বলতে চাই নি কখনো । কোনো দিন না । কিন্তু তুই ভুল ধারণায় ডুবে ছিলি । আরাফের উপর অভিমান করে ছিলি । এসব জানা প্রয়োজন ছিলো তোর । তোর আর ওর মাঝে ভুল বোঝাবুঝি হওয়ার পর ও তোকে মানাতে চেয়েছে । খোঁজ করেছে তোর । কিন্তু তুই সব পথ বন্ধ করে চলে গেছিলি । কন্টাক্ট রাখার রাস্তা রাখিস নি । আরাফ তোর উপর অভিযোগ করেনি কখনো । বরং ও তোর সেই বন্ধুটাই ছিলো । কিন্তু তুই মূল্য দিস নি । ছিন্ন করেছিস সব সম্পর্ক । কষ্ট দিয়েছিস ওকে । অপরদিকে দেখ, তুই কষ্ট পাবি বলে নিজের মৃত্যুর খবরটাও বেমালুম চেপে গেছে ও । মরার আগ অবধিও তোর চিন্তা করেছে । ভেবেছে , যাতে তোর কষ্ট না হয় ।
ইয়াশ নির্বাক । স্থির সে । অনুভূতি কষ্টের । আর সে সেই অনুভবে মূর্ত, পাথর । রৌদ্র থেমে আবার বলার চেষ্টা করলো……
” আরাফের মতো বন্ধু পাওয়া টা খুব ভাগ্যের ব্যাপার । আমি তো তোর দুশমন, আমার উপর রাগ থেকে ওকে ভুল বুঝলি তুই ? আর রিসা ,, ও তো এখনো……
ইয়াশ আর শুনলো না । ঠাস করে উঠে দাঁড়ালো । হাতের উল্টো পিঠে ভেজা ভেজা চোখ মুছলো । থামলো না এক মুহুর্ত । গটগটিয়ে ছাদের দরজা খুলে হাঁটা ধরলো নিচের দিকে ।
রৌদ্র ভড়কায় । ধড়ফড়িয়ে দাঁড়িয়ে পিছু নেয় ঝটপট । গলা বাড়িয়ে পিছু ডাকে ।
মেঘা হন্তদন্ত হয়ে করিডোরে পায়চারি করছে । রৌদ্র ছাদে উঠেছে অনেকক্ষণ হয় । প্রায় ঘন্টা খানেক তো হতেই চললো । পেরোলো কি না কে জানে ! এরমধ্যে মেঘা কতকিছু করলো । উপরে কি হচ্ছে জানা নেই ?
মেয়েটার এলোমেলো পায়চারির মাঝেই ধুপধাপ পা ফেলে ছাদের সিঁড়ি হতে করিডোরে পা রাখে ইয়াশ । মেঘা আঁতকে তাকায় । চমকে যায় ভাইয়ার ব্যাথাতুর ভয়াবহ চোখ মুখ দেখে । দ্রুত এগিয়ে যায়……
” ভাইয়া , কি হয়েছে ?
শুনলো না তপ্ত যুবক । থামলো এক মুহুর্ত । তাকালো বোনের দিকে । নিগুড় ভেজা চোখে চেয়ে থেকে আলগোছে ঠোঁট নামিয়ে বোনের কপালে স্নেহের সহিত চুমু আঁকলো । মাথায় হাত বুলিয়ে দ্রুত কদমে ঘরে ঢুকে ধাম করে লাগিয়ে দিলো দরজা ।
রৌদ্র পিছু পিছু নামে । কন্ঠে তার তড়তড়ে ভড়কানো ডাক । মেঘা আবার চকিতে তাকায় । নেমেই দরজা ধাক্কায় রৌদ্র….
” ইয়াশ , প্লিজ দরজাটা খোল । আমার সব কথা শোন তুই । প্লিজ পাগলামো করিস না । শোন আমার কথা । ওপেন দ্যা ডোর, ইয়াশ ।
তার উচ্চ বাক্যের সাথে সাথে ধুপধাপ করাঘাতে বাড়ির সকলে জড়ো হলো মুহুর্তেই । তৌসিফ কাবির এসেই শুধালেন……
” কি হয়েছে রৌদ্র ?
রৌদ্রের উত্তর নেই । সে দরজা ধাক্কাতে ব্যাস্ত । মেঘা কিছুমিছু ঠাহর করলো । রৌদ্র কে টেনে ফেরালো……
চেহারা দেখে আঁতকে উঠলো । পুরো মুখশ্রী জুড়ে মারের ফুলে ওঠা ক্ষত । মেঘা ছ্যাঁত করে ওঠে । হাত বাড়িয়ে চোয়াল ছুঁইয়ে দেয়…..
” রৌদ্র, কি হয়েছে ? আপনার মুখে এসব কিসের দাগ । আপনি কি করেছেন আবার ? ভাইয়া দরজা আটকালো কেনো ? কি হয়েছে বলুন না ?
কাতর হয়ে আসলো রৌদ্রের চাহনি । মেঘার হাত নিজের কম্পিত হাতের মুঠোয় পুরে চুমু খেলো সে । বললো গলা ভিজিয়ে…..
” কিছু হয় নি সুইটহার্ট । তোমার ভাইয়া কে ডাকো আগে…..
রৌদ্র হাঁক ছেড়ে ডাকে । যোগ দেয় মেঘাও । বাড়ির সবাই আহম্মক । রৌদ্রের সম্বোধনে বিশেষত । ইয়াশ কে তুই করে বলছে এই ছেলে । অবশ্য তুমি বলে সম্মান দেয় বা কত জনকে ?
” ভাইয়া , দরজা আটকালে কেনো তুমি ? প্লিজ বেরিয়ে এসো । আবার কি করেছে এই রাইনো মুখো ? ভুলভাল কিছু বলেছে তাইনা ? তাই রেগে গেছো ? ওনার হয়ে আমি সরি বলছি । প্লিজ ক্ষমা করে দাও ।
রাইনো মুখো কানে ধরবে , আর এমন করবে না । তাই না রাইনো মুখো ? আপনি কানে ধরে বলুন, ভাইয়াকে জ্বালাবেন না আর । বলুন না….
রৌদ্র তাল মেলায়…..
” ইয়াশ,, সত্যি কানে ধরছি আমি । ভুলভাল কিছু করিস না, প্লিজ । নয়তো আরাফ ক্ষমা করবে না আমায় । প্লিজ ইয়াশ, আমার কথা শোন ।
ভেতর থেকে সাঁড়া এলো স্বল্প আওয়াজে…..
” আমাকে একা থাকতে দে প্লিজ । আমি একা থাকতে চাই ।
আরাফের প্রসঙ্গটা ঠিক বুঝলো না মেঘা । প্রশ্ন সূচক নয়নে তাকালো রৌদ্রের দিকে । রৌদ্র বুকে হাত রেখে হাঁফ ছাড়ে । ইয়াশ খারাপ কিছু করবে না , এটা নিশ্চিত ।
পরিস্থিতি ঘুরিয়ে মেঘা ওকে টেনে নিয়ে আসে ঘরে । শুধোয়……
” ভাইয়া দরজা আটকালো কেনো ? কি বলেছেন আপনি ?
হাসার চেষ্টা চালায় যুবক,,,আওড়ায়…..
” কিছু না । সব মিটে গেছে ।
” আরাফ ভাইয়া , হঠাৎ আরাফ ভাইয়ার কথা বললেন কেনো ?
” এমনি । তুমি নিশ্চিন্তে থাকো সানি । ইয়াশ সব বুঝেছে । ও আর রেগে নেই । না তোমার উপর , না আমার উপর , আর না অন্য কারোর উপর ।
মেঘা অবাক লোচনে তাকিয়ে রয়….
” এভাবে মুখে ব্যাথা পেলেন কি করে ?
” মেরেছে তোমার ভাইয়া !
” মারলো কেনো ?
” রাগ মেটালো ।
” ইশশ্ , লেগেছে না ?
” ভীষণ । শক্ত হাত তোমার ভাইয়ের ।
” ঠিক হয়ে যাবে ।
” এমনি এমনি নয় ।
” ঔষধ লাগিয়ে দেবো ।
” উঁহু,,, আদর লাগবে ।
” হবে তাহলে ?
” দৌড়াবে !
বলেই হাসলো ঠোঁট টিপে । মেঘাও লাজে চোখ নামায় । পরক্ষনে হাত বাড়িয়ে লোকটার এলোমেলো চুল গুছিয়ে দিতে দিতে বলে…..
” ভাইয়া কাল চলে যাবে । অভিমান করে বলেছে আর আসবে না । আমার একটা কথা ছিলো !
” বলো, জান !
” সারা ভাইয়াকে ভালোবাসে ।
” জানি !
মেঘা চমকে উঠলো…..
” কি করে জানেন ?
” সারা বলেছিলো ।
” তাহলে ওদের মধ্যে কিছু একটা করিয়ে দিন । ভাইয়া চলে গেলে সম্ভব হবে না ।
” চলে যাক । যদি সারার নসিবে সে থেকে থাকে , তাহলে ফিরে আসবে । বার বার ফিরে আসবে । আসবে ফিরে আবারো । যেভাবে আমি এসেছি । তোমার টানে….
মেঘা মুচকি হাসে । রৌদ্রের ঠোঁটের কোণের একটা আঘাতের উপর ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে সন্দিহান….
” ভাইয়া সত্যিই মেনে নিয়েছে তো ?
” হু, হান্ড্রেড পার্সেন্ট । এমন ভাবে মানিয়েছি , এখন সব ভুলে মামা হতে চাইছে ।
রৌদ্রের মিটিমিটি স্বর । মেঘা কিঞ্চিত লাজে রাঙা হয়ে উঠলো । চিবুক নামিয়ে স্মিথ হাসলো । রৌদ্র ঝুঁকে তর্জনী দিয়ে ওর চিবুক উঁচিয়ে ধরে । আঁখি লতার ধারে পরশ বুলিয়ে বলে আদুরে আবদারি গলায়…..
” সে মামা হোক , তুমি মা হও আর আমি বাবা হই , এটাই চাই আপাতত । দেবে ?
ঠোঁট কামড়ে চোখ সরালো মেঘা । পলকে পলকে তাকালো এপাশ ওপাশ । চোরালো চোখ ।
” কি হলো MP ? আই ওয়ান্ট অ্যা লিটিল ভার্সন অফ আস….
তার ঠান্ডা আবদারে রমনীর গায়ে কাঁটা দেয় । শিরশির করে ওঠে কোমলাঙ্গ । লজ্জা লুকাতে লোকটার বুকের আবডালে হারায় সে । রৌদ্র আর কিছু বললো না ।
মেঘা কে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে নিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেললো । যা হোক বলে সামলানো গেছে এই মেয়েকে । এতেই স্বস্তি । এখন ইয়াশ কে সামলাতে হবে । বোঝাতে হবে । কিছু কথা বলা বাকি এখনো । শোনা উচিত ওর ।
সময় পার হয়েছে অনেকটা ।
ইয়াশ সেই যে দরজা বন্ধ করলো । এ অবধি আর খোলেনি । ডাকাডাকি হয়েছে আবার । ইয়াশের কানে সব পৌঁছেছে । সাড়াও দিয়েছে ক্ষিণ বাক্যে । তবে বেরোয়নি ।
মেঘা ডেকে ডেকে হয়রান । দুপুরের পর থেকে খায়নি কিছু । রাতের খাবারের সময় ও ধরা দিলো না ।
অনেক চিন্তাভাবনা কাটিয়ে বারোটার দিকে ঘুমিয়েছে মেঘা । মাথা যন্ত্রণায় ছটফট করছিলো ঘুমানোর আগে । রৌদ্র ওকে বুকে নিয়ে আরামে হেড ম্যাসাজ করে দিয়েছে । তবেই ঘুমিয়েছে একটু । মেঘার ঘুমের গভীরতা ঠাহর করে রৌদ্র বেরোলো ঘর থেকে । ইয়াশের ঘরের সামনে গিয়ে শান্ত হয়ে করাঘাত করলো । সাঁড়া পাওয়া গেলো না । রাত হয়েছে অনেকটা । হয়তো ঘুমিয়েছে । রৌদ্র ডাকলো না আর । চলে আসলো ।
এদিকে ইয়াশের ঘরে আলো নেই । সে পড়ে আছে অন্ধকার ঘরের ঠান্ডা মেঝেতে । আলো জ্বালায় নি । অন্ধকার ভালো লাগছে আজ । দেখছে না কেউ ওকে । ওর কান্না, চোখের অজস্র অশ্রু বিন্দু, মাত্রাধিক কষ্ট দেখছে না কেউ । সে ঘন্টার পর ঘন্টা পড়ে আছে অবলিলায় । ভারে চোখ বুজে আসছে আপনা আপনি । যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে একা একা ।
সেভাবেই কাটলো আরো কিছুক্ষণ । এখন রাত্রি তৃতীয় প্রহর চলছে । আঁধারেই ধীরে ধীরে উঠে বসলো সে । মাথা চেপে ধরলো দুহাতে । চোখ বুজে বড় বড় দম ফেললো । উঠে দাঁড়িয়ে নিস্তেজ হাতে খুললো ঘরের দরজা । করিডোরে আলো জ্বলছে । আলোর ঝলকানিতে চোখ কুঁচকে এলো তার । কপালের দুপাশ চিনচিনে ব্যাথায় ছিড়ে পড়লো ।
ঘর ছাড়লো সে । করিডোর পেরিয়ে পা বাড়ালো নিচের দিকে । সিঁড়ির পথে দেখা মেলে মানবীর । শাফাহ্ উঠেছিলো । ঘরে পানি নেই । নিচে নেমেছে পানি নিতে । হাই তুলতে তুলতে উপরে উঠছে এখন । ইয়াশ নিভে আসা ক্লান্ত চোখে অবলোকন করলো ওকে । থামলো সেখানেই । শাফাহ্ চোখ তুলে তাকানো মাত্রই আবছা আলোয় ইয়াশ কে দেখে ধক্ করে ওঠে । পরক্ষনে সামলায় । বুকে হাত রেখে ঢোক গেলে । পানির বোতলটা চেপে ধরে ধীরে কদম এগোয় । আড়চোখে দেখে লোকটাকে । মুখটা বোঝা যাচ্ছে না খুব একটা ।
সে ভয়ে তড়তড়িয়ে সিঁড়ি উঠতে লাগলো । তৎক্ষণাৎ ডাক পড়লো কানে……
একটা বিষন্ন ক্ষিণ কন্ঠ…..
” খাবার নেই আর ? খিদে পেয়েছে ! খেতে দেবে কিছু ?
থামলো রমনীর চঞ্চলা পদ যুগল । লোকটার কেমন কন্ঠ । অদ্ভুত লাগলো । আলগোছে পিছু ফিরলো সে । সন্ধ্যার পর থেকে লোকটার দেখা মেলে নি । সবকিছুই জানা ।ক্ষিণ আওয়াজ তুললো মেয়েটা……
” আমি আম্মুকে ডেকে দিচ্ছি ।
” ডিস্টার্ব করবে এতো রাতে ? তুমি দাও । দেখো কিছু আছে কিনা !
আর দ্বিমত করতে পারলো না । অন্যসময় হলে রেগে যেতো । এখন রাগ আসলো না । বরং খারাপ লাগলো । নিচে নেমে লাইট অন করলো । ফ্রিজে খাবার আছে । কিন্তু ঠান্ডা । এই মাঝরাতে লোকটা ঠান্ডা খাবার খাবে ? কিন্তু গরম করবে কে ? সে তো কিচেনে পা রাখেনি কখনো । আদুরে মেয়ে , চুলা জ্বালানো তো অনেক দূর । খাবারের বাটি সমেত বাইরে বেরিয়ে দেখলো টেবিলের বসেছে ইয়াশ । ভীষণ খিদে পেয়েছে হয়তো । মেয়েটা নীরবে পাশে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বলে…….
” খাবার তো ঠান্ডা ।
” এতেই চলবে ।
কোনো রকমে উচ্চারণ করে বাটি টেনে গপাগপ খেতে শুরু করলো ইয়াশ । শাফাহ্ আহম্মক হয়ে যায় । হা বনে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রয় লোকটার খাওয়ার পানে ।
,,,,,,,
পরদিন সকাল ।
সাড়ে আটটায় ব্রেকফাস্টে বসেছেন সকলে । মেঘা উঠলো তখন । রৌদ্র ওকে উঠতে মানা করেছিলো । রাতে কাতরেছে মাথা যন্ত্রণায় ।
কিন্তু একবিংশী শুনলো না । ভাইয়ার চিন্তায় নাজেহাল সে । নিচে নেমে সবাইকে দেখলো এক পলক করে । অতঃপর ছুটলো উপরে । নয়টায় ইয়াশের ফ্লাইট আছে । সে কি চলে যাবে ? দেরি হয়ে গেছে তো । এখনো নিচে নামে নি ? ঘুমোচ্ছে কি ?
মনে হাজারো ছটফটানি নিয়ে ঘরের সামনে দাঁড়ায় মেঘা । কড়া নাড়ে,, ডাকে । জোরে করাঘাত পড়তেই হাট করে খুলে গেলো দরজাটা ।
বাইরে থেকেই ঘরের ভেতরটা ফাঁকা দেখে আঁতকে ওঠে মেয়েটা । ধক্ করে ছুটে ভেতরে ঢোকে । উন্মাদের মতো এপাশ ওপাশ তাকায় । ফাঁকা পুরো ঘর,কেউ নেই । চলে গেছে ইয়াশ ? মেঘা কে না বলেই ?
একবিংশীর চোখ ভরে আসে । পানি জমে আঁখি কোটরে । ছুটে নিচে নামে সে ।
” মা ,, ভাইয়া কোথায় ? দেখেছো তুমি ? নিচে নেমেছিলো ? ঘরে নেই ভাইয়া !
রুবিনা কাবির চোখ সরু করলেন । রৌদ্র প্রতিক্রিয়া দেখালো না খুব একটা । বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেললো । মেঘার হাত টেনে পাশের চেয়ারে বসালো ।
” নয়টায় ওর ফ্লাইট । এখন বাজে সাড়ে আটটা । ভাবছো কি করে ও এখনো বাড়িতে থাকবে ।
মেঘা ঠোঁট উল্টে আহত চোখে চাইলো । ভেজা কান্নায় ভেঙে পড়লো । এটাই তো হওয়ার ছিলো । বিড়বিড়ালো রমনী……
” আমাকে একবারও বলে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করলো না ভাইয়া । যাওয়ার আগে আমাকে দেখতে ইচ্ছে করলো না ?
আদ্র বলে পাশ থেকে……
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৩
” ইয়াশ কে যতদূর চিনেছি , ও ছন্নছাড়া অনেকটা । ডোন্ট ওয়ারি মেঘ বুড়ি , ফোন করে দেখ আগে ।
কথা শেষ করে তড়িঘড়ি করে খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়ায় সে । হাঁক ছাড়ে……
” টুকটুকি নিচে নামেনি কেনো এখনো ? ও ভার্সিটি যাবে না ? সাড়ে আটটা পার হয়ে গেছে । দেরি হয়ে যাচ্ছে । আর ঐ টুকটুকির বাচ্চা ঘুমোচ্ছে এখনো ?
