Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮১ (২)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮১ (২)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮১ (২)
অরাত্রিকা রহমান

অপারেশন থিয়েটারের লাল আলো জ্বলে উঠলো।রায়ান দেয়াল ঘেঁষে বসে পড়লো দরজার পাশে। মাথাটা দেয়ালে এলিয়ে দিয়ে দুচোখ বন্ধ করে নিল দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ছেলেটার চোখের কোণ বেয়ে নেমে এলো উষ্ণ অশ্রু কণা।
হসপিটালে করিডোর থেকে একঝাঁক মানুষের হাঁটার আওয়াজ ভেসে এলো। চিন্তায় সকলের কণ্ঠ জড়জড়িত।
-“এক্সকিউজ মি! অপারেশন থিয়েটার টা কোথায়?”
রায়হান চৌধুরী তার পাশে কাঁদতে থাকা রামিলা চৌধুরী কে রিমি শান্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে।
-“মামণি, কেঁদো না। দেখবে কিছু হয় নি রায়ান ভাইয়া আর মিরার। সব ঠিক আছে। শক্ত করো নিজেকে।”

রুদ্র রিসেপশনে কথা বলে সবাইকে নিয়ে অপারেশন থিয়েটারের সামনে পৌঁছাল। সাদা শার্ট রক্তে মাখা মাখি, শরীরের কেটে যাওয়া জায়গা গুলো যে শুকনো রক্ত চটচটে হয়ে আছে। কপালের কাটা জায়গা টা বেশ গভীর তাই সেখান থেকে এখনো রক্ত ঝড়ছে অনবরত। রামিলা চৌধুরী ছেলেকে এমন বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে আরো ভেঙে পড়লেন। তিনি দু’পা পিছিয়ে যেতেই রায়হান চৌধুরী তাকে ধরে ফেলেন। রামিলা চৌধুরী অশ্রু সিক্ত চোখে রায়হান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন-
“আমার ছেলেটা..এভাবে কেন বসে আছে? আমার মিরা মা কোথায়?”
রায়হান চৌধুরী ঠিক কি উত্তর দেবেন বুঝে পেলেন না। রিমি রুদ্রর হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরলে রুদ্র রিমির দিকে তাকায়। রিমির কপালে ভয়ের ভাঁজ। কম্পিত ওষ্ঠে বিড়বিড় করে সে রুদ্র কে জিজ্ঞেস করলো-

“মিরা.. ঠিক আছে তো..তাই না?”
রুদ্র রিমির হাতের উপর দৃঢ়তার সাথে নিজের হাত রেখে তাঁকে আশ্বস্ত করলো-
“আমার ভাইয়া বেঁচে আছে মানে মিরাও ঠিক আছে। আমি জানি, ভাইয়া বেঁচে থাকতে মিরার কোনো ক্ষতি হবে এটা সম্ভব না। এমন হলে ভাইয়া এতোক্ষণে পাগল হয়ে যেত।”
রিমি আশ্বস্ত হলো রুদ্রর কথায়। তবে মিরার অবস্থা কেমন তার গর্ভের বাচ্চা কেমন আছে সবকিছুর উত্তর এখন কেবল রায়ানই দিতে পারবে। তবে কারোরই রায়ানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস হচ্ছে না।
ঠিক তখনই অপারেশন থিয়েটারের থেকে তীব্র যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠা মিরার চিৎকার ভেসে এলো বাইরে।
শব্দটা করিডোরের নিস্তব্ধতা ভেদ করে এসে রায়ানের বুকের ঠিক মাঝখানে আঘাত করল। রায়ানের বুকটা যেন হঠাৎ থমকে গেল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, তার নিজের শরীরের ভেতর থেকে কেউ যেন সমস্ত শক্তি টেনে নিয়েছে। চোখ দুটো অজান্তেই বন্ধ হয়ে এলো।
কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আবারও ভেসে এলো সেই আর্তনাদ। তারপর আরও একবার। প্রতিটি চিৎকার যেন সরাসরি তার বুকের ভেতর এসে আন্দোলিত হচ্ছে।
রায়ানের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

মানুষ কখনো কখনো প্রিয় মানুষটির কষ্ট নিজের শরীরে অনুভব করতে না পারার চেয়েও বেশি কষ্ট পায়—কারণ সে জানে, মানুষটা কষ্ট পাচ্ছে, অথচ সেই কষ্টটা নিজের ওপর নিয়ে তাকে একটু স্বস্তি দেওয়ার ক্ষমতাটুকুও তার নেই। রায়ানের ক্ষেত্রে ও ঠিক সেটাই হচ্ছে।
রায়ান দেওয়াল ঘেঁষে বসে ছিল। এতক্ষণ নিজেকে শক্ত রাখার যে শেষটুকু চেষ্টা করছিল, সেটুকুও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে লাগল। সে দুই হাতের মুঠো শক্ত করে ফেলল। দুহাতের আঙুলগুলো একে অপরের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এতটাই শক্ত করে যে আঙুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে উঠলো। বুকের ভেতর শ্বাস আটকে আসছে, অথচ ঠিকমতো শ্বাস নিতেও পারছে না।
রায়ান এবার মাথাটা সজোরে দেওয়ালে ঠেকিয়ে দিল।
চোখ বন্ধ, কপাল কুঁচকে আছে বিরক্ত ও নিজের অপারগতায়। ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে রেখেছে, যেন নিজের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে চাওয়া কোনো আর্তনাদকে জোর করে আটকে রেখেছে।
-“আআআআহহহ.. আল্লাহহহ..!”

রায়ানের অন্তর আত্মা কেঁপে উঠল। সে দুহাত দিয়ে কান চেপে ধরল নিজের। অর্ধাঙ্গিনীর এই অসহনীয় চিৎকার তার পক্ষে শোনা আর সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু লাভ হলো না। যে মানুষটাকে সে এত ভালোবাসে, সে এই মুহূর্তে যন্ত্রণায় কাঁদছে। আর রায়ান? সে শুধু একটা দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন অসহায় মানুষ।
চাইলেও দরজাটা খুলে ভেতরে যেতে পারছে না।
চাইলেও মিরার হাতটা ধরে বলতে পারছে না, “ভয় পেয়ো না, আমি আছি।” চাইলেও তার সমস্ত যন্ত্রণা নিজের মধ্যে টেনে নিতে পারছে না। এই অসহায়ত্বটাই যেন তাকে ভেতর থেকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে।

-“আআআআআআহহহ…রায়ানননন..!”
মিরার আরও একটা কণ্ঠ ভেসে আসতেই রায়ান হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। দুই পা এগিয়ে গেল অপারেশন থিয়েটারের দরজার দিকে। অশান্ত অধৈর্য স্বরে দরজার কড়া নেড়ে চিৎকার করতে লাগলো-
“দরজা খুলুন প্লিজ আমি ভেতরে যাবো। ডক্টর.. নার্স.. প্লিজ ওপেন দ্যা ডর। ওর আমাকে লাগবে..শি নিডস মি। প্লিজ খুলুন..আমি ভেতরে যাবো। ডক্টর…!”
তার মনের ভেতর আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল মিরার মুখটা—ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়া, যন্ত্রণায় কাঁপতে থাকা সেই মুখ। তার নামে চিৎকার করছে একটু ভরসার আশায়।
রায়ান মাথাটা ধীরে ধীরে দরজায় ঠেকিয়ে দিল অসহায় হয়ে। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। চোখের কোণে পানি জমে উঠেছে। যে মেয়েটা একটু আগে তার হাতটা শক্ত করে ধরে ছিল। যে হয়তো এখন যন্ত্রণায় তার হাতটাই খুঁজছে। রায়ানের চোখের কোণ বেয়ে এবার একটি অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল। সে ধীরে ধীরে হাতটা নামিয়ে ফেলল। মাথাটা দরজার দিকে নত করে দাঁড়িয়ে রইল। রুক্ষ শুকনো ঠোঁটের ফাঁক গলে মৃদু স্বরে বেরিয়ে এলো-

“হৃদপাখি… একটু সহ্য করো।”
কণ্ঠটা ভেঙে যাচ্ছিল তার।
-“আমি এখানেই আছি। তোমার কিচ্ছু হবে না।”
সে জানত, মিরা হয়তো তার কথা শুনতেও পাচ্ছে না,
তবুও বলল।
ভালোবাসার মানুষটির কাছে পৌঁছাতে না পারলেও, তার জন্য অপেক্ষা করা যায়। তার কষ্ট থামাতে না পারলেও, তার কষ্টের প্রতিটি মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে থাকা যায়। রায়ান আবার ধীরে ধীরে দেওয়ালের পাশে বসে পড়ল। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল সে। কাঁধ ও পা জোড়া কেঁপে উঠল একবার। চোখ জোড়া ভর্তি অশ্রু
কিন্তু তা বিসর্জন দেওয়ার সাহস হচ্ছে না ছেলেটার‌।

কারণ সে জানে, এই মুহূর্তে তার ভেঙে পড়ার অধিকার নেই। মিরা যখন লড়াই করছে, তখন তাকে শক্ত হয়ে থাকতেই হবে। তবু প্রতিবার ভেতর থেকে মিরার কণ্ঠ ভেসে এলেই সেই শক্ত মানুষটার বুকের ভেতরটা যেন একটু একটু করে ভেঙে যাচ্ছে।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো—
রায়ান মিরার যন্ত্রণা নিজের শরীরে নিতে পারছিল না।
কিন্তু মিরার প্রতিটি কষ্ট তার নিজের কষ্টের চেয়েও বেশি হয়ে উঠেছিল। যা তার শরীরে সকল ক্ষতের ঊর্ধ্বে।
ভালোবাসা বোধহয় এমনই।

মিরার এমন বেদনাময় আওয়াজে রায়ানের এমন পাগল প্রায় অবস্থা দেখে বাড়ির সকলের অবস্থা কাহিল। রিমি আর রামিলা চৌধুরীর চোখের জল বাঁধ মানতে নারাজ। রুদ্র মা আর রিমিকে একটু বসিয়ে রেখে রায়ানের দিকে এগিয়ে গেল। রুদ্র রায়ানের কাঁধে হাত রাখলে রায়ান রুদ্রর দিকে তাকালো রক্তিম ফোলা চোখে। রুদ্র কে সামনাসামনি দেখে সে আর নিজের অনুভূতি চেপে রাখার চেষ্টা করল না। রায়ান তৎক্ষণাৎ রুদ্রর গলা জড়িয়ে ধরে অঝড়ে কেঁদে আহাজারি করতে লাগলো-
“রুদ্র প্লিজ তোর বোনকে বল চিৎকার না করতে। আমি মরে যাচ্ছি। ওকে বল এভাবে আমাকে কষ্ট না দিতে। আমি পারছি না আর সহ্য করতে। ওকে বল ও যেন কষ্ট না পায়। প্লিজ..দরজা টা খুলে দিতে বলনা একটু..ও আমাকে ডাকছে, আমি শুনেছি। আমি যাবো ওর কাছে। বল না দরজা খুলতে..আমি আমার হৃদপাখির কাছে যাবো। আমার কোনো বাচ্চা লাগবে না। আমি আমার মিরাকে ফেরত চাই। আমার বাচ্চা লাগবে না। ডক্টর দের বল আমাকে আমরা বউ ফিরিয়ে দিতে। প্লিজ…বল না.. ওর অনেক কষ্ট হচ্ছে তো।”

রুদ্র পাথড় হয়ে গেল। কি বলা উচিত তার? মাথাই কাজ করলো না সেই সময়। রামিলা চৌধুরী ছেলের অবস্থা দেখে আরো ভেঙে পড়লেন। তিনি রায়হান চৌধুরীর হাত ধরে মিনতির সুরে বললেন –
“ছেলের কাছে যান..ওর এখন আপনাকে দরকার.. সাহস দিন ওকে। মেয়েটা ভেতরে লড়াই করছে ও এভাবে ভাঙতে পারে না। ওকে বোঝান গিয়ে।”
রায়হান চৌধুরীর বুক কেঁপে উঠলো। ছেলেকে কি বলে স্বান্তনা দেবেন উনি? তবু এগিয়ে গেলেন। হাঁটু গেড়ে রায়ান সামনে বসে তার পিঠে হাত রাখতেই রায়ান বাবার দিকে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে চোখের জল মুছে জিজ্ঞেস করলো-
“আব্বু, আমার এতো অসহায় কেন লাগছে? আমি মিরার জন্য কেন কিছু করতে পারছি না…? আমি এতোটা অপারগ হাসবেন্ড কি করে হলাম?”
কথাটা বলতে গিয়েই তার গলা কেঁপে গেল। রায়হান চৌধুরী ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে কণ্ঠে দৃঢ়তা এনে রায়ানের পিঠ চাপড়ে বলল-

“বাবা মা হওয়া পৃথিবীর অন্যতম কঠিন একটা কাজ। মিরা ভেতরে নিজের সর্বস্ব দিয়ে লড়ছে। একবার ওর কথা চিন্তা কর। ও কি তোকে এভাবে দূর্বল হতে দেখতে চাইবে? তোর নাম নিয়ে ওর চিৎকার করার মনে বুঝিস? তোর মধ্য দিয়ে মেয়েটা নিজের সাহস যোগাচ্ছে । এই সময়টা, একটা ছেলেকে তার স্ত্রী আর সন্তানের পিলার হয়ে দাঁড়াতে হয়। দূর্বল পিলার কখন একটা স্থাপত্য দাঁড়া করাতে পারে না রায়ান। শক্ত কর নিজেকে মিরা আর তোদের বাচ্চার এখন তোকে দরকার।”
রায়ান বাবার কথা শুনে হয়তো কিছু টা মনোবল ফিরে পেলো। কান্না থামিয়ে নিজের মুখ দুহাতের তালুর সাহায্য মুছে নিল, যেন লোক দেখানো কঠোর একটা আবরণ তৈরি করছে নিজের উপর। রায়হান চৌধুরী রায়ান মুখ আগলে নিয়ে ঝাঁকিয়ে বললেন-
“দ্যাটস মাই বয়। কাম অন স্ট্যান্ড আপ.. নিজের শরীরের তো অবস্থা নেই। এইসব পরিষ্কার করতে হবে তো নাকি। ওঠ ওঠ। তোর মা কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি এবার শেষ করে ফেলবে মনে হয়। আমি যাই।”
রায়ান একনজর রামিলা চৌধুরীর দিকে তাকালো। মায়ের চোখ এড়িয়ে গেল সে। হঠাৎ তখনি অপারেশন থিয়েটারের ভেতর থেকে একজন নার্স বেরিয়ে এসে ব্যস্ত কণ্ঠে বললেন-
“প্যাশেন্টের হাসবেন্ড- মিস্টার রায়ান চৌধুরী..আছেন?”
রায়ান অবিলম্বে উত্তর দিল-“জি, আমি..আমি ওনার হাসবেন্ড? কি হয়েছে? আমার ওয়াইফ ঠিক আছে তো?”

-“আপনাকে ডক্টর ভেতরে ডাকছেন। প্লিজ আমার সাথে ভেতরে চলুন।”
রায়ান আর এক মূহুর্তের জন্য ও বাইরে দাঁড়ালো না। একবার ও পিছু না ফিরে অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে চলে গেল নার্সের আগেই। রামিলা চৌধুরী আর রিমি ছুটে দরজার কাছে এলেন।
-“কি হয়ে মিরার..? সব ঠিক আছে তো? বাচ্চা টা..ও ঠিক আছে? কান্নার আওয়াজ তো হলো না।”
রামিলা চৌধুরী ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। রিমি রুদ্রর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো –
“কি হয়েছে ভেতরে? ভাইয়াকে ভেতরে ডাকলো কেন? মিরার কি কিছু?”
-“আরে কি অদ্ভুত..! কি হবে মিরার? কিছু হয়নি। ভাইয়াকে হয়তো কথা বলতে ডেকেছে। তোমরা শান্ত হও চুপ করো। চলে বসবে চলো।”
রুদ্র উত্তরে তাদের থামিয়ে দিয়ে আবার বসার জায়গায় নিয়ে গেল। রিমি চুপ করে বসে গেল। রুদ্র একটু নড়তে চাইলে সে তার হাত শক্ত করে ধরে রাখলো নিজের হাতে। রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিমির পাশে বসে ওকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

“টেনশন হচ্ছে?”
-“হুম..!”
রিমির সরল উত্তরে রুদ্র রিমির হাতটা আরো শক্ত করে ধরে অনুতপ্ত কণ্ঠে ছোট্ট করে বলল-
“আই অ্যাম সরি..!”
-“সরি কেন?”
রিমি অবাক হয়ে রুদ্রর চোখে দেখলো।
-“আমার চাওয়া, আমার ইচ্ছের জন্য তোমাকেও এমন কিছুর মধ্যে দিয়ে যেতে হতে পারে তাই।”
রিমি রুদ্রর কথায় সামান্য অবাক হলো। সে তো মিরার কথা ভাবছিল নিজের কথা তো মাথায় আনে নি তবে রুদ্র তার ভবিষ্যতের দুর্ভোগ নিয়ে ভাবছে জেনে সে আপ্লুত। রিমি হালকা হেঁসে বলল-
“আপনার একার ইচ্ছে ছিল নাকি? আমি কি চাই নি? আর এতো কিছু ভাববেন না তো। আমি সব সহ্য করে নিতে পারবো। শুধু এভাবেই আমার হাতটা ধরে আমার পাশে থাকবেন। ঠিক আছে?”
রুদ্র অসম্মতি দিয়ে বলল-“না না , ঠিক নেই। এভাবে বাচ্চা জন্ম দিতে দিবো না আমি তোমাকে। আমাদের বেবি সিজারিয়ান বেবি হবে। এটাই ফাইনাল। আমার এতো সাহস নেই ভাইয়ার মতো।”
রিমি অজান্তেই হেঁসে উঠলো রুদ্রর কথা শুনে। অতঃপর পরম নির্ভরতায় রুদ্রর বাহু আঁকড়ে ধরে মাথা এলিয়ে দিল।

দরজর অপরদিকে প্রবেশের ক্ষণমাত্রই রায়ানের তার পা যেন মেঝের সঙ্গে আটকে গেল, হৃদস্পন্দন শূণ্যে নেমে গেল। জটিল সব যন্ত্রে ভরা ঘরটা অস্বাভাবিক ব্যস্ত। মনিটরের একটানা শব্দ, নার্সদের দ্রুত চলাফেরা, ডাক্তারের নির্দেশ—সবকিছুর মাঝেও রায়ানের চোখ মিরার উপর গিয়ে স্থির হলো। বেডের ওপর নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে সে। চুলগুলো ঘামে কপালের সঙ্গে লেপ্টে আছে। মুখের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। প্রতিবার শ্বাস নেওয়ার সময় বুকটা ধীরে ধীরে উঠছে-নামছে, কিন্তু সেই শ্বাসেও যেন ক্লান্তির ভার।
মিরার চোখ দুটো আধবোজা। মনে হচ্ছে, আর একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়বে সে। কিন্তু এই মুহূর্তে ঘুমিয়ে যাওয়াটাও যেন ভীষণ ভয়ের। রায়ান এক মুহূর্তও দেরি করল না। দ্রুত বেডের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই মিরার হাতটা হঠাৎ পাশ থেকে নিস্তেজ হয়ে নিচের দিকে পড়ে যেতে থাকলে রায়ান তড়িৎ গতিতে তা আগলে নিলে নিজের হাতের মুঠোয়। কয়েক সেকেন্ড শুধু সেই হাতটার দিকে তাকিয়ে রইল সে। তারপর নিজের দুহাতের মধ্যে মিরার হাতটা নিয়ে এমনভাবে আঁকড়ে ধরল, যেন হাতটা ছেড়ে দিলেই মিরাকেও হারিয়ে ফেলবে। ডাক্তার তখন মিরাকে নিয়ে ব্যস্ত। কয়েক মুহূর্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তিনি রায়ানের দিকে তাকালেন।

-“মিস্টার চৌধুরী, বাচ্চার মাথা অনেকটাই বাইরে এসেছে। কিন্তু মিসেস চৌধুরী প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।”
রায়ানের চোখ সঙ্গে সঙ্গে মিরার মুখের দিকে চলে গেল।
ডাক্তার আবার বললেন-
“ওনাকে সাহস দিন। আপনার কথা এখন ওনার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমার কথায় আর কাজ হচ্ছে না।”
রায়ান চিন্তায় পড়ে গেল। তবে স্থির রইল না। সে মাথা নেড়ে মিরার দিকে ঝুঁকে গেল-
“হৃদপাখি…? শুনছো? তোমার এসেছি। তাকাও‌ আমার দিকে।”
মিরার চোখের পাতায় সামান্য নড়াচড়া হলো। রায়ান তার মুখের কাছে ঝুঁকে এল।
-“কষ্ট হচ্ছে খুব তাই না? দেখ এখন আমি আছি। আর কষ্ট হবে না।”
কম্পিত গলায় মাত্র দুটো লাইন আওড়ালো ছেলেটা কিন্তু সেখানে তার অন্তরের আতঙ্ক স্পষ্ট। মিরা চোখ মেলে তাকানোর চেষ্টা করল। মেয়েটার দৃষ্টিতে সম্মুখের দৃশ্য সম্পূর্ণ ঝাপসা। তবু সেই ঝাপসা চোখেও রায়ানকে চিনতে তার কোনো অসুবিধে হলো বলে ঠাওর করা গেল না।

-“এসেছে…নন!”
রায়ান কোনো উত্তর দিল না। শুধু তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল। তারপর মিরার কপাল থেকে ভেজা চুলগুলো সরিয়ে দিল খুব সাবধানে। কপালে স্নেহ মাখা আদর দিল। এই সামান্য স্পর্শটুকুতেও তার হাত কেঁপে উঠছিল। তারপর মিরার হাতটা নিজের বুকের কাছে এনে রাখল।
সে জানত, এই মুহূর্তে অনেক কথা বলার দরকার নেই। মিরার শক্তি নেই সেসব শোনারও। তাই শুধু ধীরে ধীরে বলল-
“আর একটু সাহস করো পাখি। আমাদের দুজনের ভালোবাসা আমাদের মাঝে একটা ছোট্ট প্রাণ নিয়ে আসবে.. তার জন্য আরেকটু ধৈর্য্য ধরো প্লিজ।”
মিরার চোখের কোণে পানি জমে উঠল। এতক্ষণ যাবত চিৎকার করে ভেঙে ফেলা কণ্ঠে বিড়বিড় করলো- “পারছি না…আমি।”
শব্দটা এত ক্ষীণ ছিল যে রায়ান প্রায় শুনতেই পেল না।
তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল মিরার কণ্ঠ শুনে। সে মিরার হাতের পিঠে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল-

“পারবে। আমি জানি আমার হৃদপাখি ঠিক পারবে। আর অল্প একটু সময়। চোখ খোলা রাখো।”
তারপর একটু থেমে খুব নিচু স্বরে যোগ করল,
“খোদার উপর ওপর ভরসা রাখো।”
মিরা চোখ বন্ধ করে ফেলল। রায়ান সঙ্গে সঙ্গে তার হাতটা চেপে ধরল- “চোখ খুলো মিরা।”
মিরা ধীরে ধীরে চোখ খুলল পুনরায়। দুজনের চোখ এক হলো। চারপাশে তখন প্রচণ্ড ব্যস্ততা। কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডে যেন তাদের জন্য পৃথিবীতে আর কিছুই ছিল না। রায়ানের চোখে আতঙ্ক স্পষ্ট আর মিরার চোখে ক্লান্তি। তবু সেই ক্লান্তির মধ্যেও রায়ানকে দেখে মিরার দৃষ্টিতে একটুখানি নিশ্চিন্ততা ফিরে এলো। সে খুব আস্তে তার হাতটা চেপে ধরল। সে মৃদু করে মাথা নাড়ল-
“আমি ছাড়ছি না এই হাত। আর কখনো না।”
মিরার চোখের কোণ বেয়ে একফোঁটা পানি গড়িয়ে কানের পাশে হারিয়ে গেল। তারপর আবার ব্যথার ঢেউ এলো। মিরার আঙুলগুলো হঠাৎ রায়ানের হাতের ওপর শক্ত হয়ে গেল, বিঁধে গেল ধাড়াল নখ। রায়ান মুখ কুঁচকে গেলেও হাত সরাল না। বরং আরও কাছে ঝুঁকে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল-

“যতটা পার শক্ত করে ধরো।”
মিরা এবার সত্যিই সমস্ত শক্তি দিয়ে তার হাত আঁকড়ে ধরল। রায়ান চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত নিঃশ্বাস নিল।
ব্যথাটা সে নিতে পারছে না। মিরার কষ্টটা নিজের শরীরে অনুভব করতে না পারাটাই যেন তার কাছে সবচেয়ে অসহায় ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর কখনো কখনো ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রকাশ হয়তো এটাই।
কথা নয়, শুধু পাশে থাকা। মিরার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছিল। ডাক্তার ও নার্সরা নিজেদের কাজে আরও মনোযোগী হয়ে উঠলেন।
রায়ান একবার মিরার মুখের দিকে তাকাল-“মিরা।”
মিরা কষ্ট করে চোখ খুলল-“হুম?”
রায়ানের ঠোঁটে খুব ক্ষীণ একটা হাসি ফুটল- “আমাদের প্রিন্সেস আসছে।”

মিরার চোখে অদ্ভুত এক আলো জ্বলে উঠল। ক্লান্তি, ভয়, কষ্ট—সবকিছুর মাঝেও সেই এক মুহূর্তে মায়ের মুখটা যেন বদলে গেল। সে খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল- “আই লাভ ইউ…”
রায়ান মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে উত্তর করলো- “আমাকে ভয় দেখিয়েও না প্লিজ। আই লাভ ইউ মোর দ্যান এনি থিং ইন দিস ওয়ার্ল্ড।”
তারপর আর কোনো কথা হলো না। হওয়ার মতো পরিস্থিতিও ছিল না। শুধু রায়ানের হাতের মুঠোয় মিরার হাত। মিরার কাঁপতে থাকা আঙুল। আর তাদের মাঝখানে অপেক্ষা করে থাকা নতুন একটা জীবন।
কয়েক মুহূর্ত পর ঘরের ব্যস্ততা হঠাৎ আরও বেড়ে গেল।
ডাক্তার দ্রুত নির্দেশ দিতে শুরু করলেন। তারপর শেষবারের মতো সে রায়ানের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।

-“আআআআআ… আআআআহহ!”
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই— ঘরজুড়ে ভেসে উঠল এক নবজাতকের কান্না। রায়ান স্থির হয়ে গেল। সময় যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল তার কাছে। তার চোখ ধীরে ধীরে ভিজে উঠল। একটা ছোট্ট একটা আত্মার সেই কি চিৎকার..! সেই শব্দের মধ্যে যেন তাদের পুরো পৃথিবী বদলে গেল। রায়ান অন্য কোথাও না তাকিয়ে কেবল মিরার দিকে তাকাল।
-“মিরা…হৃদপাখি? ওই চোখ খোলো। ডক্টর..ডক্টর প্লিজ। ওকে থেকে করুন। কি হলো ওর?”
কোনো উত্তর নেই। মিরার মুখটা অস্বাভাবিক শান্ত।
চোখ বন্ধ। রায়ানের বুকের ভেতর হঠাৎ একটা অজানা শীতলতা নেমে গেল। ডাক্তার দ্রুত তার দিকে এগিয়ে গেলেন।
“আমাকে দেখতে দিন।”

রায়ান সরে দাঁড়াল, কিন্তু মিরার হাত ছাড়ল না।
তারপর শিশুটিকে সামলাতে থাকা নার্স রায়ানের দিকে বাচ্চা টাকে নিয়ে এলো।
রায়ানের চোখে এবার সত্যিকারের আতঙ্ক ফুটে উঠল-
“ও ঠিক আছে তো?”
ডাক্তার কোনো উত্তর না দিয়ে দ্রুত মিরাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। রায়ানের শ্বাস ভারী হয়ে এল।
এতক্ষণ যে শরীরটাকে জোর করে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল, সেটাও যেন এবার তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে শুরু করেছে। মাথার ভেতরটা ঘুরে উঠল।
চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা। নার্স শিশুটিকে তার দিকে এগিয়ে আনছিলেন।

-“মিস্টার চৌধুরী…ইট’স আ বেবি গার্ল।”
রায়ান শুনল। কিন্তু যেন অনেক দূর থেকে।
সে একবার খুব আস্তে বলল,
“আমার আম্মু জান…!”

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮১

পরের মুহূর্তেই তার হাঁটু কেঁপে উঠল। বেড পাড়ের হ্যান্ডেল টা ধরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও পারল না।
চারপাশের শব্দগুলো ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল।
রায়ানের চোখও বন্ধ হয়ে এলো। ছেলেটার সুঠাম দেহ লুটিয়ে পড়লো মেঝের উপর। একদিকে মিরা নিস্তেজ।
অন্যদিকে রায়ান মেঝেতে অচেতন।

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮১ (৪)