অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৪২
রুপা
চারপাশে সবুজ জঙ্গলের মাঝে একটা আধুনিক দুই তলা বিশিষ্ট ডুপ্লেক্স বাড়ি। বাড়িটা যে মানুষটা নির্মাণ করেছে, সে বেশ রুচিশীল মানুষ বলতে হয়। পুরো বাড়ির কাজ করা হয়েছে কালো মার্বেল আর কালো থাই গ্লাস দিয়ে—অদ্ভুত সুন্দর! অবশ্য সবার চোখে সুন্দর নাও লাগতে পারে, অনেকে প্রথম দেখায় ভুতুড়ে বাড়িও বলে ফেলতে পারে।
আর্য যাওয়ার অনেকক্ষণ হয়ে গেছে, এখনো রুমে আসেনি। পুষ্প বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে—কখন আসবে সরকার সাহেব? রমণীর সময় যেন ফুরোচ্ছে না! অবশ্য আর্য যাওয়ার সময় নিজের ফোন, ল্যাপটপ সব পুষ্পকে দিয়ে গেছে, যেন পুষ্প ফোন নিয়ে সময় কাটাতে পারে। তবে সে সব দিয়ে রমণী কী করবে? সে তো ফোন-ল্যাপটপ চালাতে জানে না, কোনো দিন চালায়নি, জানবে কী করে? একেবারে জানে না বললেও ভুল হবে—সিমরান ফোন কীভাবে চালাতে হয় অনেক কিছুই শিখিয়েছে। পুষ্পর মাইন্ড শার্প হওয়ায় দ্বিতীয়বার শিখাতে হয়নি, একবারে শিখে গেছে! তবুও এই মুহূর্তে ফোন নিয়ে সময় কাটানোর মন নেই রমণীর।
রমণীর মন পড়ে আছে সরকার সাহেবের কাছে। রমণীর ছোট মস্তিষ্কে খেলা করে চলেছে হরেক রকমের প্রশ্ন—তারা কোথায় আছে? কার বাড়িতে আছে? আর সরকার সাহেব কেন তাকে এখানে একা নিয়ে এসেছে? তারা বাড়িতে কখন যাবে? আর সরকার সাহেবই বা তাকে একা রেখে কোথায় গেছে? সেই কখন গেছে, আসার নামগন্ধ নেই! এভাবে সে একা বন্দী হয়ে কীভাবে থাকবে? যদিও পুষ্প ছোটবেলা থেকেই একা থেকেছে—চাচার বাড়ির স্টোররুমের এককোণে তার জায়গা হয়েছিল; সারাদিন বাড়ির কাজ করে স্কুল থেকে এসে যেই সময়টুকু পেত, সেই সময়টুকু স্টোররুমে কাটাতে একা।
কিন্তু সরকার বাড়িতে আসার পর থেকে সেই একাকিত্ব কেটে গেছে অনেকটাই! কলেজে, সারা বাড়িতে সিমরান, শেহনাজ সরকার, জেনিফার সরকার—সারাক্ষণ কেউ না কেউ থাকে, পুষ্পর সাথে গল্প করে। তাই তো এখন আর্যর সাথে এই বাড়িতে এসে রমণীর নিজেকে একা লাগছে। কিছুক্ষণ আগে তাও আর্য থাকায় রমণীর ভালো লাগছিল, একা মনে হচ্ছিল না। আর্য চলে যাওয়ার পরে আবারও নিজেকে একা বন্দী মনে হচ্ছে! বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে—কখন আর্য আসবে, এই আশায়! রমণীর অবচেতন মন হয়তো বাড়িতে যাওয়ার থেকেও আর্যর কাছে না থাকায় বেশি ছটফট করছে, যেটা রমণী বুঝতে সক্ষম হচ্ছে না। না হলে কেন আর্য যাওয়ার পর থেকে আর্য কখন আসবে সেই প্রতিক্ষা করছে, যেখানে আর্য থাকাকালীন বাড়িতে ফুফুমণির কাছে যাওয়ার জন্য ছটফট করছিল!
হরেক রকম চিন্তাভাবনা করতে করতে ইতিমধ্যে পুরো রুমে দুই-তিনবার চক্কর দিয়েছে রমণী। দরজা খোলার চেষ্টা করেছে, কিন্তু দরজা লক করা—আর্য দরজা লক করে গিয়েছে বাইরে থেকে! রমণী হতাশ হয়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল, দেখল বারান্দার দরজা খোলা। রমণী দরজা খোলা দেখে খুশি হয়ে বারান্দায় একদম রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে চারপাশে দেখতে লাগল। হঠাৎ এক দমকা হাওয়া এসে ছুঁয়ে গেল রমণীর নরম কায়া; প্রকৃতির ঠান্ডা হিমেল বাতাস নিজের গায়ে মাখতে ব্যস্ত হলো রমণী। মৃদু বাতাসে রমণীর দীঘল কালো কেশরাশি উড়তে লাগল। অদ্ভুত! এতক্ষণ ছটপট করতে থাকা মন যেন প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে শান্ত হতে লাগল।
অদ্ভুত সুন্দর চারপাশে—যেদিকে দুচোখ যায়, সবুজ আর সবুজ! রমণীর মুগ্ধ দৃষ্টি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ দূরে চোখ যেতেই রমণীর চোখে-মুখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল! রমণীর মনে হলো, বড় গাছের ঝোপের আড়ালে কিছু নড়ছে অদ্ভুত দুটো চোখ যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে! ভয়ে রমণীর পুরো শরীর জুড়ে মৃদু কম্পন সৃষ্টি হলো, শরীরের পশম যেন কাটা দিয়ে উঠেছে! আর কিছু না ভেবে দৌড়ে রুমে ঢুকে স্লাইডিং ডোর বন্ধ করে দিয়ে দৌড়ে খাটের ওপর উঠে সাদা কমফোটার জড়িয়ে বসে পড়ল। মুখ ছাড়া মাথা সহ পুরো শরীর ঢেকে ফেলেছে কমফোটার দিয়ে! তারপর বিড়বিড় করে আয়াতুল কুরসি, সুরা ইখলাস পড়তে শুরু করল। ভয়ে রমণীর পুরো শরীর কমফোটারের ভেতরে এখনো কাঁপছে। রমণীর মনে হতে লাগল, এখনো ওই অদ্ভুত চোখ দুটো তার দিকে তাকিয়ে আছে! যেদিকে তাকাচ্ছে, মনে হচ্ছে কেউ আছে, তার দিকে তাকিয়ে আছে—সে তাকালেই সরে যাচ্ছে! পুষ্প এবার কোনোদিকে না তাকায় চোখ কিঁচে বন্ধ করে ফেলল।
হঠাৎ দরজা খুলে রুমে প্রবেশ করে আর্য। রুমে ঢুকেই চারপাশে চোখ বুলিয়ে খুঁজতে লাগল কাঙ্ক্ষিত মুখটা। পুষ্পকে না দেখে তার ভ্রু কুঁচকে গেল, কপালের মাঝখানে ভাঁজ পড়ল—কোথায় গেল তার ফ্লাওয়ার? হঠাৎ চোখ গেল খাটের ওপর গোল উঁচু কমফোটারের দিকে। বিছানার চাদর সাদা হওয়ায় প্রথমে আর্য খেয়াল করেনি; এখন খেয়াল করতেই সে এগিয়ে গেল খাটের নিকটে, দেখল সেটি মৃদু নড়ছে। আর্য একহাতে কমফোটার টান দিতেই পুষ্প চিৎকার করে উঠল—
– “আম্মু বাঁচাও! আমি এখন তোমার কাছে যেতে চাই না আমি সরকার সাহেবের সাথে থাকতে চাই!”
হঠাৎ চিৎকারে চমকে উঠল আর্য। রমণীর কথার মর্মার্থ সে বুঝতে পারল না—কে নিয়ে যাবে তার ফ্লাওয়ারকে? খেয়াল করে দেখল, রমণীর মুখে আতঙ্ক ছড়িয়ে আছে, ভয়ে চোখ টিপে বন্ধ করে রেখেছে। আর্য বুঝতে পারল না, হঠাৎ পুষ্প এত ভয় পাচ্ছে কেন? এদিকে কমফোটার টান দেওয়ার পরেও সবকিছু নিশ্চুপ দেখে রমণীর ভয় আরও দ্বিগুণ হলো। এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে, তারপর কাঁপা গলায় বলল—
– “দে.. দেখো, আমি তো তোমার কাছে যাইনি, কোনো ক্ষতিও করিনি! তাহলে তুমি আমার কাছে আসছ কেন? একদম আমার কাছে আসবে না!”
এদিকে রমণীর কথার কোনো মানে বুঝতে পারছে না আর্য। তার ফ্লাওয়ার কাকে আসতে বারণ করছে? আর এত ভয়ই বা পাচ্ছে কেন? আর্য পুষ্পকে ডেকে উঠল—
– “ফ্লাওয়ার?”
পরিচিত ডাক শুনেও পুষ্পর মধ্যে কোনো হেলদোল দেখা গেল না। পুষ্পর মনে এই মুহূর্তে ভয় বাসা বেঁধেছে; সে গ্রামে শুনেছে, এরকম শুনশান গভীর জঙ্গলের বাড়িতে ভূত-জিনের বসবাস থাকে আর ভূত-জিনরা যে কারো রূপ ধরতে পারে, যে কারো কণ্ঠ নকল করে ডাকতে পারে! সেই ভয় থেকেই চোখ বন্ধ রেখেই কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে লাগল—
– “একদম আমার কাছে আসবে না! তুমি আমার সরকার সাহেব নও!”
রমণীর কথা আর্যর মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে—সে তার ফ্লাওয়ারের সরকার সাহেব নয়, মানে কী! আর্য পুষ্পর ভীতু মুখটা দেখে আর কিছু না বলে হুট করে তাকে জড়িয়ে ধরল। আর্যর স্পর্শে পুষ্প ছটপট করতে গিয়েও থেমে গেল। সত্যি, এটা তার সরকার সাহেব! এতক্ষণ ভয়ে বুঝতে না পারলেও এখন বুঝতে পারছে, তার সরকার সাহেবের ঘ্রাণ তার নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করছে! সত্যি সরকার সাহেব এসেছে—এবার রমণী নিজেও দুই হাতে জড়িয়ে ধরল আর্যকে। শত ভয়ের মাঝে যেন সে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে, তাকে আগলে রাখার মতো কেউ আছে! রমণীর মন খুব করে বলছে, এই বুকে আশ্রয় নিলে কেউ তাকে ছুঁতে পারবে না।
আর্য অনেকক্ষণ পুষ্পকে জড়িয়ে ধরে নিজের শরীরের উষ্ণতায় তাকে স্বাভাবিক করতে চাইল। রমণী পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলেও কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পরে আর্য জিজ্ঞেস করল—
– “ফ্লাওয়ার, শান্ত হও। তোমাকে আমার কাছ থেকে কেউ নিয়ে যাবে না, আমি নিয়ে যেতে দেবো না। তুমি আমার, আজীবন আমার কাছেই থাকবে। এখন বলো তো, কী হয়েছে? কেন এত ভয় পেয়েছ?”
আর্যর নরম কণ্ঠে পুষ্প শুরু থেকে সবকিছু খুলে বলল। সবকিছু শুনে আর্যর বুঝতে অসুবিধা হলো না—বউ তার ভয় পেয়েছে, হয়তো গাছে পাখি বা বানর জাতীয় কিছু ছিল, তা দেখেই ভয়ে এমন করছে। আর্য অনেক করে বোঝানোর চেষ্টা করল পুষ্পকে, কিন্তু পুষ্পর মন থেকে ভয় সরছে না। পুষ্প বারবার বলছে, এখানে ভূত আছে, সে এখানে থাকবে না! আর্য অনেক বোঝাল যে ভূত বলতে কিছু হয় না, কিন্তু রমণীর মন থেকে ভয় যেন সরছেই না। আর্য তখন পুষ্পকে কোলে করে আবার বারান্দায় নিয়ে গেল এবং চারপাশটা ভালো করে দেখাল। কোথায় সে চোখ দেখেছে, সেদিকে তাকাতে বলল; কিন্তু এবার সত্যি সত্যি সেখানে কিছু নেই, শুধু সবুজ ডালপালা দুলছে!
আর্য অনেক করে বোঝাল যে হয়তো পাখি কিংবা বানর ছিল। পুষ্প আর্যর কথা শুনে আর কিছু বলল না, ভয় কিছুটা কমলেও পুরোপুরি কাটেনি। আর্য পুষ্পকে নিয়ে আবার রুমে এসে খাটের ওপর বসিয়ে দিল। নিজে বারান্দা থেকে পুষ্পর ধুয়ে দেওয়া কাপড়গুলো এনে দেখল, বাতাসে সেগুলো ইতিমধ্যে শুকিয়ে গেছে। রমণীর কাপড়গুলো এনে দিয়ে আর্য পুষ্পকে কাপড় পাল্টে নিতে বলল। পুষ্প বাধ্য মেয়ের মতো কাপড় পাল্টে এল, তারপর আর্য পুষ্পকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল শপিংমলের উদ্দেশ্যে।
যাওয়ার আগে অবশ্যই নিজের লোকদের মেসেজ করে বলে দিয়েছে—সে আসার আগে যেন বেসমেন্ট থেকে আকরামকে সরিয়ে ফেলে। সে কোনোভাবেই চায় না তার ফ্লাওয়ারের চোখে এসব পড়ুক।
– “আমজাদ, তুমি বুঝতে কেন চাইছ না? আজকে যদি ড্রাইভার সময়মতো নিশিকে হাসপাতালে না নিয়ে যেত, কী হতে পারত—ভেবে দেখেছ? তোমার ছেলের নামে মার্ডার কেস হতো! এখনো যে হবে না, সেই বিশ্বাস নেই। নিশি যদি জ্ঞান ফেরার পরে সবাইকে বলে দেয় তার এক্সিডেন্ট আর্য করেছে, তাহলে কী হবে—ভেবে দেখেছ?”
শেহনাজ সরকারের কথার কোনো জবাব দিলেন না আমজাদ সরকার। দুজনে কিছুক্ষণ আগে হাসপাতাল থেকে এসেছেন। নিশির এখনো জ্ঞান ফেরেনি, তাই রেশমা, ওনার স্বামী আর স্নিগ্ধ হাসপাতালে আছেন। শেহনাজ সরকারও থাকতে চেয়েছিলেন, কিন্তু স্নিগ্ধ বারণ করে দিয়েছে—হাসপাতালে এতজন থাকার প্রয়োজন নেই বলে। তাই তো স্ত্রীকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে এসেছেন। কিন্তু আসার সময় থেকেই খেয়াল করেছেন, ওনার স্ত্রী কোনো কারণে প্রচণ্ড ক্ষেপে আছেন। ওনার ভাবনা সত্যি প্রমাণ করে রুমে আসতেই ফেটে পড়েছেন ওনার ওপর—আর্য নিশির এক্সিডেন্ট করেছে, সেটা শেহনাজ সরকার জেনে গেছেন। উনি কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। এখন ছেলের পক্ষ নিয়ে একটা কথা বললেই ওনার ওপর ঝড় বয়ে যাবে, তার চেয়ে নীরবতা শ্রেয়। এদিকে ছেলে নিশিকে প্রাণে মারতে চেয়েছে—কথাটা শুনেও আমজাদ সরকারকে চুপ করে থাকতে দেখে শেহনাজ সরকারের রাগ যেন আরও বাড়তে লাগল। উনি আবারও ধমকে উঠলেন—
– “কী হয়েছে? এভাবে চুপ করে আছো কেন? শুনতে পাচ্ছ না, তোমার ছেলে একজনকে প্রাণে মারতে চেয়েছে!”
আমজাদ সরকার এবার বিপাকে পড়লেন। এখন কিছু বললেও ওনাকে স্ত্রীর কথা শুনতে হবে, না বললেও শুনতে হবে—কারণ শেহনাজ সরকার এই মুহূর্তে ভীষণ রেগে আছেন। উনি একজন ক্রিমিনাল লয়ার হয়ে কীভাবে ক্রাইমকে সাপোর্ট করবেন? সেটা যতই ওনার ছেলে হোক না কেন! আমজাদ সরকার স্ত্রীর রাগত চেহারার দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে শান্ত কণ্ঠে বললেন—
– “বলছিলাম কি শেহনাজ, হতেও তো পারে নিশি দোষ করেছে, তাই আর্য ওকে মারতে চেয়েছে!”
স্বামীর কথা শুনে শেহনাজ সরকার কী বলবেন বুঝতে পারলেন না। তিনি এবার আরও চটে গেলেন। আমজাদ সরকারের দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন—
– “আমজাদ, তুমি কি তোমার ছেলের ক্রাইমকে জাস্টিফাই করতে চাইছ?”
আমজাদ সরকার চুপ করে গেলেন। স্ত্রীকে কীভাবে বলবেন যে সে নিজেও জানে, ছেলে নিশিকে মারতে চেয়েছে? নিশি যখন হঠাৎ ফোনের মেসেজ দেখে চোখে-মুখে আতঙ্ক নিয়ে খাবার টেবিল ছেড়েছিল, সেটা যেমন শেহনাজ সরকারের চোখে পড়েছিল, তেমনই ওনার চোখেও পড়েছিল। তাই তো শেহনাজ সরকার যখন ওনার বিশ্বস্ত ড্রাইভারকে নিশির পিছু নিতে বলেন, তিনি নিজেও ওনার অ্যাসিস্ট্যান্টকে কল করে তাদের পিছু নিতে বলেছিলেন। আর্য কীভাবে নিশিকে গাড়ি চাপা দিয়েছে, তারপর আবার ফেরত এসে নিশিকে হুমকি দিয়েছে—সব ওনাকে ওনার অ্যাসিস্ট্যান্ট ভিডিও কলে দেখিয়েছেন। তাই তো ড্রাইভার যখন নিশিকে নিয়ে হাসপাতালে চলে যায়, উনি নিজেই তো অ্যাসিস্ট্যান্টকে দিয়ে রাস্তায় লেগে থাকা রক্ত, আর্যর পায়ের ছাপ—সব পানি দিয়ে ধুইয়ে দিয়েছেন। এককথায় বলতে গেলে, অবশিষ্ট প্রমাণ লোপাট করেছেন!
কারণ ওনার একমাত্র ছেলেকে অনেক ভালোবাসেন তিনি। আর আর্য সেদিন সবার সামনেই তো বলেছিল—যদি পুষ্পর কিডন্যাপের সাথে নিশির কোনো যোগাযোগ পায়, তাহলে নিশিকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ঘুরিয়ে আনবে। ছেলে তো সেটাই করেছে! তার মানে পুষ্পর কিডন্যাপে নিশির হাত ছিল। ওনার ভাবনার মাঝেই শোনা গেল শেহনাজ সরকারের তীক্ষ্ণ কণ্ঠ—
– “তোমার ছেলের এই পাগলামি, পুষ্পকে ঘিরে যে উন্মাদনা—সেটা যদি না থামে, আমি পুষ্পকে আর্যর হাতে তুলে দেব না, আমজাদ।”
– “শেহনাজ, তোমার মনে হয় তোমার চাওয়া-না চাওয়ায় আর কিছু হবে?”
আমজাদ সরকারের কথায় শেহনাজ সরকার চুপ করে রইলেন। স্বামী কী বোঝাতে চাচ্ছেন, বুঝতে অসুবিধা হলো না ওনার। শেষমেশ ওনার ভয় সত্যি হচ্ছে! ছেলে যে পুষ্পর জন্য কাউকে খুন করতেও দুবার ভাবছে না, এটা মা হয়ে কীভাবে মেনে নেবেন? নিশি অন্যায় করেছে, তার জন্য আইন আছে; আর্য কেন আইন নিজের হাতে তুলে নেবে? কীভাবে আটকাবেন ছেলের এই পাগলামি? শেহনাজ সরকারকে চুপ করে থাকতে দেখে আমজাদ সরকার কিছুটা স্ত্রীর নিকট এগিয়ে এসে সাইড থেকে জড়িয়ে ধরে খাটের ওপর বসালেন এবং নিজেও পাশে বসে নরম গলায় বললেন—
– “দেখো, তুমি তো চেয়েছিলে আমাদের ছেলে যেন পুষ্পকে বউ হিসেবে মেনে নিয়ে সংসার করে, পুষ্পকে যেন ভালোবাসে। এখন আমি ১০০% গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, আর্য পুষ্পকে ভালোবাসে—বলতে গেলে একটু বেশিই ভালোবাসে! তাহলে সমস্যা কোথায়? দুজন সংসার করুক, মাঝখানে তুমি কেন পুষ্পর কাছ থেকে আর্যকে আলাদা করতে চাইছ?”
– “আমজাদ, তুমি বুঝতে পারছ না! আমি আর্যর মধ্যে পুষ্পর প্রতি যেটা দেখছি, সেটা নরমাল ভালোবাসার কাতারেই পড়ে না। সেটা ভালোবাসার চেয়ে বেশি, বলতে গেলে অন্ধ আসক্তি! আর্য পুষ্পর প্রতি পুরোপুরি অবসেসড হয়ে গেছে।”
– “তাহলে এতে ক্ষতি কী? যেটাই থাকুক, ছেলে-মেয়ে দুজন ভালো থাকলেই তো হলো! আর্য পুষ্পকে আগলে রাখলেই তো হলো, যেরকম তুমি চেয়ে এসেছ।”
– “হ্যাঁ, আমি শুরু থেকেই চেয়েছি আর্য যেন পুষ্পর খেয়াল রাখে, ওকে যেন ভালোবেসে আগলে রাখে; কিন্তু সেটা কারও প্রাণের বিনিময়ে নয়! তোমার ছেলে আর কয় দিন পরে দেখবে, পুষ্পর দিকে যদি কেউ চোখ তুলে তাকায়, সে চোখ তুলে নিতেও দুবার ভাববে না! তখন তো আমার ছেলে ক্রিমিনাল হবে, ক্রিমিনাল লিস্টে নাম উঠবে তার! আমি মা হয়ে কীভাবে চেয়ে চেয়ে দেখব আমার ছেলে ক্রাইম করবে? আমার কাছে রোজ এ রকম অনেক কেস এসেছে—ছেলে মেয়ের প্রতি অতিরিক্ত অন্ধ আসক্ত, মেয়েটার দিকে কেউ চোখ তুলে তাকিয়েছে, তাই সেই অপরাধী লোকটাকে খুন করেছে—এ রকম কেস আমার কাছে অনেক এসেছে। আর আমি কোনোভাবেই চাই না আমার ছেলের সেই পরিণতি হোক!”
আমজাদ সরকার চুপ করে রইলেন স্ত্রীর কথায়। হ্যাঁ, এটা সত্যি, ছেলের মধ্যে যেটা তিনি দেখতে পাচ্ছেন, সেটা উনাকেও ছাড়িয়ে যাবে! উনি কি কম কিছু করেছিলেন এই শেহনাজ সরকারকে নিজের করে পেতে? যাক, অতীত কোনো দিন শেহনাজ জানতে পারেনি এবং শেহনাজকে কোনো দিন জানতে দেবেনও না তিনি, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত! এবার ওনার ছেলেও যদি সেই পথে হাটে, তবে শত বাধা দিয়েও আটকাতে পারবেন না—তারা ওনাকেও তো অতীতে আটকাতে পারেনি! অতীত যেমন উনি ধামাচাপা দিয়েছেন, বর্তমানে ছেলের কাণ্ডকারখানাও তিনি ধামাচাপা দেবেন!
পুষ্পকে নিয়ে একটা বড় শপিং মলে এসেছে আর্য। পুষ্পকে জিজ্ঞেস করছে, কী কী লাগবে? কিন্তু পুষ্প চুপ করে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখছে বিভিন্ন ডিজাইনের পোশাক, ব্যস্ত মানুষ আর শপিং মলে লোকজনের ভিড়। আর্য এমনিতেই নিজের পুরুষালি শক্ত হাত দিয়ে পুষ্পর নরম হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছে—যেন এই ভিড়ের মাঝে তার ফ্লাওয়ারের হাত ছুটে না যায়! বেশি মানুষের ভিড় দেখে রমণী নিজের ডান হাত দিয়ে আর্যর বাহু জড়িয়ে ধরে। আর্যর বেশ ভালোই লাগছে তার ফ্লাওয়ারের এই সান্নিধ্য।
পুষ্পকে জিজ্ঞেস করার পরেও কিছু বলতে না দেখে আর্য নিজেই পুষ্পর যাবতীয় শপিং করতে লাগল। পুষ্প শুধু চোখ ঘুরিয়ে সব দেখছে, কিছুই বলছে না। আর্য একেকটা শপ ঘুরে ঘুরে পুষ্পর জন্য থ্রি-পিস, টপস, রাতে পড়ার জন্য কিটি প্রিন্ট করা আরামদায়ক নাইট ড্রেস, টি-শার্ট, প্লাজো, হিজাব—মেয়েদের সব কালেকশন প্যাকিং করতে বলল! সেটা শুনে এবার পুষ্প বলল—
– “সরকার সাহেব, কী করছেন? আমি এত জামা দিয়ে কী করব?”
– “কেন, ফ্লাওয়ার, পরবে!”
– “পরার জন্য এত জামা কেন নিতে হবে? একদিনে একটা একটা পরে ও তো শেষ করা যাবে না!”
– “তো তোমাকে কে বলল একদিনে একটা জামা পরতে হবে? সকাল, বিকাল, রাত—তিন টাইমে তিনটে জামা পরবে, দেখবে অনায়াসেই শেষ হয়ে যাবে! অবশ্যই, তুমি চাইলে এক ঘণ্টা পর পর জামা চেঞ্জ করেও শেষ করতে পারো, আই ডোন্ট মাইন্ড।”
আর্যর কথা শুনে পুষ্প কী বলবে বুঝতে পারল না, সে শুধু মিনমিন করে বলল—
– “শুধু শুধু এত টাকা খরচ করছেন কেন?”
রমণীর কথা শুনে আর্য ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল, তারপর রমণীর কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল—
অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৪১
– “এই তো বউয়ের মতো ট্রিট করছ, স্বামীর টাকা বাঁচাতে চাইছ—আই লাইক ইট! কিন্তু এর প্রয়োজন নেই, ফ্লাওয়ার। তোমার স্বামীর যা আছে, তা দুই হাতে খরচ করেও অনায়াসে এক জীবন কাটিয়ে দেওয়া যাবে। তাই তুমি কীভাবে খরচ করা যায়, সেটা ভাববে; টাকা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন নেই—তত দিন তো নয়ই, যত দিন তোমার সরকার সাহেব আছে।”
