ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৯৫
শানজানা আলম
বেশ কয়েক মাস পরে-
ঐশির কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নি। ভাইরাল ঐশির জন্য থানা পুলিশ বাদে মিডিয়ায় জানিয়ে খোঁজা খুজির চেষ্টা করে নি এহসান। কারন বিষয়টা জানাজানি হলে তার ইতিহাস নিয়েও কাদা ছোড়াছুড়ি হবে, অথৈ এর জন্য এই চাপ ভালো হবে না। তার নিজেরও চাকরি করেই খেতে হবে।
এক মেয়ে বিপথে হারিয়ে গেছে, আরেক মেয়ের জীবন অনিশ্চয়তায় ফেলতে তাহিরা বেগমও জোরাজোরি করেন নি। থানায় যোগাযোগ রেখেছেন, সময়ের সাথে সাথে মানুষ মানুষের অনুপস্থিতিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, তিনিও অভ্যস্ত হয়ে গেলেন ঐশির অন্তর্ধানে।
মৃত মানুষকে ভুলে যাওয়া সহজ কিন্তু হারিয়ে যাওয়া মানুষের জন্য অপেক্ষা শেষ হয় না। ঐশি মরে গেছে, জানলে হয়তো তাদের জন্য বিষয়টা সহজ হতো।
মেয়ের চিন্তায় অথৈ এর বাবার ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। তাই তাহিরা বেগম আর তিনি এলাকায় ফিরে যান নি। ওখানে মানুষের কথার চাপ নেওয়া যাবে না।
আত্মীয় স্বজন সবার ফোন রিসিভ করা বন্ধ করে দিয়েছেন। বাবা মা অথৈ এর সাথেই থেকে গেছেন।
এহসানের একটা প্রমোশন হলো, স্যালারি বেশ কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় এহসান বাসা পাল্টে বড় তিন বেডের এপার্টমেন্ট নিয়ে এলো । নতুন সদস্যের আগমনের জন্য নিজেরা তৈরি হলো ধীরে ধীরে।
নির্ধারিত দিনে অথৈ আর এহসানের ঘরে নতুন অতিথি এলো। একটা ছোট্ট মেয়ে, দীর্ঘদিন পরে পরিবারের সবার মুখে হাসি ফুটল।
বেবিকে কোলে নিয়ে এহসানের ভাবী জানতে চাইলেন, নাম রেখেছ এহসান?
নতুন বাবা এহসান লাজুক হাসি হেসে বলল, না, নাম ভাবি নি, দেখি সবাই মিলে ঠিক করে ফেলো।
সব কিছু ভালোভাবেই হলো, কমপ্লিকেশন ছাড়াই। বেবিকে নিয়ে বাসায় ফিরে এলো এহসান অথৈ।
ওরা বাসায় ফিরে আসার পরে গেট থেকে ফোন এলো। একটা পার্সেল এসেছে।
এহসান জিজ্ঞেস করল, অথৈ, কিছু অর্ডার করেছিলে?
অথৈ বলল, না তো! সব জিনিসপত্র তো কেনা হয়ে গেছে লিস্ট করে।
-আচ্ছা, তাহলে হয়তো গিফট পার্সেল হবে।
অথৈ বলল, কে আর গিফট পাঠাবে!
এহসান বলল, কলিগ টলিগ কেউ সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছে হয়তো।
পার্সেলটা রিসিভ করে আনবক্সিং করল এহসান।
কিছুটা অবাক হয়ে বলল, এখানে সব জিনিসপত্র বেশ এক্সপেন্সিভ, বাইরের মনে হচ্ছে। কে পাঠাতে পারে! ছোট্ট একটা জুয়েলারি বক্স দেখে অথৈ হাতে তুলে নিলো, একটা গোল্ডের চেইন, পেনডেন্টে লেখা “Aurora”
অথৈ চমকে উঠল, “অরোরা” নামটা তার চেনা।
এহসান একটু অবাক হয়ে বলল, অরোরা!
একটা নোট আছে, টু মাই এঞ্জেল অরোরা- তুমি নাম রেখেছ বাবুর? আমাকে তো বলো নি!
অথৈ শান্ত স্বরে বলল, না, আমি রাখি নি।
এহসান জানতে চাইল, তাহলে?
অথৈ বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, সেবারে আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে অরোরা দেখা গিয়েছিল, সেটা নিয়ে ফেসবুকে বেশ পোস্ট আসছিল, আপু তখন বলেছিল, ওর মেয়ে হলে নাম রাখবে অরোরা! রোমান পুরাণে “অরোরা” হলো ভোরের দেবী। আবার এই যে আকাশজুড়ে রঙিন আলোর খেলা, সেটাকেও অরোরা বলে। নামটা শুনলেই মনে হয়, অন্ধকারের পরে আলো আসবেই। নতুন একটা সকাল অপেক্ষা করছে।
অথৈ এর মনে পড়ল, সেদিন সন্ধ্যার পর থেকেই আকাশে টিপটিপ বৃষ্টি ছিল। ড্রয়িংরুমে বসে ঐশি আর অথৈ দুজনেই নিজেদের ফোনে চোখ গুঁজে আছে। বাইরে বৃষ্টি হলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় যেন অন্য এক পৃথিবী—সবখানে রঙের উৎসব।
একের পর এক ভিডিও ভেসে আসছে। আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আকাশজুড়ে সবুজ, বেগুনি, গোলাপি আর নীল আলোর ঢেউ। কেউ বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে, কেউ আবার পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে সেই আলো ভিডিও করছে। মনে হচ্ছে, রাতের আকাশে কেউ বিশাল এক ক্যানভাসে রঙ ছিটিয়ে দিয়েছে।
অথৈ মুগ্ধ হয়ে বলল,—দেখেছিস? কি সুন্দর!
ঐশি ভিডিওটা থামিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার চোখে আলো ঝলমল করছিল।
অথৈ আবার আরেকটা ভিডিও চালাল। সেখানে একজন বলছে, জীবনে প্রথমবার অরোরা দেখে সে কেঁদে ফেলেছে।
ঐশি হালকা হেসে বলল,
—কাঁদারই তো কথা। এমন সৌন্দর্য সামনে দেখলে মানুষ নিজের অজান্তেই আবেগপ্রবণ হয়ে যায়।
অথৈ মাথা নেড়ে বলল,—সত্যি। কিন্তু একটা কথা বল তো, এই “অরোরা” ওয়ার্ডটা কত সুইট, না আপু?
ঐশি ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে জানালার বাইরে তাকাল। বৃষ্টির শব্দ আরও ঘন হয়ে এসেছে। কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর খুব শান্ত গলায় বলল,
– আমার যদি কোনোদিন মেয়ে হয়, ওর নাম রাখব অরোরা।
অথৈ বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকাল।
—হঠাৎ এই নাম?
ঐশি মৃদু হেসে বলল,
—হঠাৎ না। এই নামটার মধ্যে একটা আলো আছে। রোমান পুরাণে অরোরা হলো ভোরের দেবী। আবার এই যে আকাশজুড়ে রঙিন আলোর খেলা, সেটাকেও অরোরা বলে। নামটা শুনলেই মনে হয়, অন্ধকারের পরে আলো আসবেই। নতুন একটা সকাল অপেক্ষা করছে।
অথৈ চুপচাপ শুনছিল।
ঐশি আবার বলল,
—আমি চাই, আমার মেয়েটা যদি কখনো পৃথিবীতে আসে, ও শুধু আমার সন্তান হবে না। ও যেন সবার জীবনে একটু আলো নিয়ে আসে। মানুষকে আশা দিতে শেখে। জীবনে যত অন্ধকারই আসুক, নিজের ভেতরের আলোটা যেন কখনো নিভে না যায়। তাই নামটা হবে অরোরা।
অথৈ হাসল।
—তুই নামও ঠিক করে ফেলেছিস?
ঐশি মুচকি হেসে উত্তর দিয়েছিল, আজ এই অরোরার ছবি দেখতে দেখতে মনে হলো, এই নামটাই আমার অনেকদিনের চেনা।
সেই রাতের পর থেকে যখনই কোথাও রঙিন আকাশের ছবি দেখত, অথৈ মুচকি হেসে ঐশিকে বলত, “দেখ, তোর অরোরা এসেছে।” আর ঐশির চোখে তখন একই রকম স্বপ্নের আলো ফুটে উঠত—একদিন হয়তো সত্যিই তার কোলে আসবে এক ছোট্ট মেয়ে, যার নাম হবে অরোরা; যে হবে নতুন ভোরের মতো উজ্জ্বল, কোমল আর আশায় ভরা।
ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৯৪
অরোরা ঐশির কাছ থেকে ফিরে গেলেও অথৈ এর কাছে এসেছে।
এহসান আর অথৈ, দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে কোনো কথা বলতে পারল না, তার বুঝে গেল, ঐশি বেঁচে আছে, যেখানেই থাকুক!
