শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২৫
আয়েশা শেখ
ঝিলমিল আজ অনেক সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। আসলে ওর ঘুমটা ভেঙে গিয়েছে। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে বেশ কিছুক্ষণ ধরে নিশ্চুপে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল সে। এতদিন সকালে হাজার চেষ্টা করলেও ঘুম ভাঙতে চাইত না, বারিশ জোর করে ওঠাত। অথচ আজ ভোর পাঁচটা বাজতেই চোখ দুটো আপনা-আপনি খুলে গেল। শেহরিয়ার বাড়িতে থাকলে এখন ওর এক ঘণ্টা টানা পড়াশোনা করে তারপর দুজনের জন্য সকালের নাস্তা তৈরিতে হাত লাগানো।
সে নিজেকে ঘুম পাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করল আরও কিছুক্ষণ। কিন্তু এপিট-ওপিট ঘুরেফিরে মাথাটা ভারী লাগতে শুরু করায় বিরক্ত হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে বসল ঝিলমিল। ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে দাঁত ব্রাশ করতে করতেই সে ধীর পায়ে এসে ব্যালকনিতে দাঁড়াল। ভোরের ঠান্ডা, স্নিগ্ধ বাতাস এসে গায়ে ছোঁয়া দেয় তার। আবহাওয়াটা দারুণ, কিন্তু অদ্ভুত এক অস্বস্তি ঝিলমিলের বুকের ভেতরের কোণটায় কোথাও যেন একটা প্রকাণ্ড শূন্যতা তৈরি করে রেখেছে। কেন এত ভারী লাগছে ভেতরটা, সেই হিসাব সে মেলাতে পারল না।
অজান্তেই চোখ দুটি ঘুরে গেল পাশের শেহরিয়ার বাড়ির বারিশের রুমের ব্যালকনিটার দিকে। পর্দাগুলো বাতাসে সামান্য উড়ছে। সেখানে মানুষ তো দূরের কথা, প্রাণের বিন্দুমাত্র কোনো অস্তিত্ব নজরে এল না। নির্জন খালি জায়গাটার দিকে তাকিয়ে থেকে শূন্যতা আরও আঁকড়ে ধরল ওকে।
বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই ব্যালকনির গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে রয় ঝিলমিল। শেহরিয়ার বাড়ির লোহার বড় গেটটা খুলে গেল তখনই। ভেতরে প্রবেশ করল একটা পরিচিত নেভি ব্লু মার্সিডিজ-বেঞ্জ এস ক্লাসের গাড়িটা। সোজা এসে পোর্চে পার্ক করে ড্রাইভ সিটের দরজা খুলে বের হয়ে এল বারিশ। পরনের শার্টটা কুঁচকানো, ইন খোলা, চুলগুলো ভীষণ এলোমেলো। সারা রাতের নির্ঘুম আর উথালপাথাল ঝড়ের স্পষ্ট ছাপ ওর চেহারায়।
বারিশ ধীর পায়ে ভেতরের দরজার দিকে হেঁটে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে কী ভেবে যেন মাঝপথেই থমকে দাঁড়াল সে। মুহূর্তের জন্য থামল ওর পদক্ষেপ। ধীর গতিতে মাথা তুলে এক পলক তাকাল ঝিলমিলের ব্যালকনির দিকে।
বারিশের চোখ জোড়া নিজের দিকে ঘোরার আগেই চমকে উঠে ঝিলমিল ঝটপট দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। বুকটা ধড়ফড় করে উঠল এক লহমায়। বারিশ আবারও ধীর পায়ে হেঁটে ভেতরে হারিয়ে গেল।
দেয়ালের আড়াল থেকে আস্তে করে মুখ বাড়িয়ে গাড়ির পার্কিং আর খালি রাস্তাটার দিকে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল ঝিলমিল। তারপর আনমনে নিজের বিড়বিড় করে উঠল,
— তাহলে সারারাত লোকটা কোথায় ছিল?
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। পরক্ষণেই নিজের মাথায় একটা ঝাঁকুনি দিয়ে স্বগতোক্তি করে উঠল,
— ধ্যাত! আমি কেন এসব হাবিজাবি ভাবছি!
নিজেকে কাটিয়ে উঠতেই দ্রুত পায়ে ব্যালকনি ছেড়ে রুমে চলে এলো সে।
তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে ঝিলমিল সোজা নিচে নেমে এল। ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগোতেই দেখতে পেল কাজের খালা এক মনে সকালের আয়োজনে ব্যস্ত। ঝিলমিল পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে উৎসুক গলায় শুধাল,
— কী রান্না করছ?
খালা হঠাৎ ঝিলমিলকে দেখে একটু অবাকই হলেন। হাতের কাজ থামিয়ে বললেন,
— এত সকালে উঠে পড়েছ যে তুমি, ঝিলমিল?
— তাতে কী হয়েছে? দাও, আমিও তোমার সাথে নাস্তা বানাতে সাহায্য করি।
— পাগল নাকি! আমি একাই সব পারব। তুমি গিয়ে ঘুমাও।
ঝিলমিল শুনল না। জোর করেই কাজ গুছিয়ে নিতে লেগে গেল। খালার টুকটাক সাহায্যে অল্প সময়ের মধ্যেই সবার জন্য হালকা নাস্তার আয়োজন করে ফেলল সে। ট্রেতে খাবার গুছিয়ে নিয়ে এসে ডাইনিং টেবিলে এনে রাখতেই ওপর থেকে নেমে এলেন নূরজাহান চৌধুরী আর আলতাফ চৌধুরী। তাদের পেছন পেছন নাজমা বেগমও ছোট জিহানকে সাথে নিয়ে নিচে নেমে এলেন। দীঘি আর মেহরাজ এখনো যার যার রুমে ঘুমে কাদা। তাহসিনকেও দেখা গেল ধীর পায়ে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে ডাইনিংয়ের দিকে আসছে। সবাই টেবিলে আসনে বসতেই ঝিলমিল বেশ আগ্রহ নিয়ে খাবার পরিবেশন করতে করতে বলল,
— এই নাও, এগুলো কিন্তু আজ আমি বানিয়েছি!
আলতাফ সাহেব হাতঘড়ির দিকে একবার তাকাল, তারপর একটু গম্ভীর গলায় বললেন,
— একি! এত সকালে তুমি আবার রান্নাঘরে গিয়েছ কেন?
ঝিলমিল একটু ইতস্তত করে বলল,
— ঘুম ভেঙে গিয়েছে, ঘরে বসে ভালো লাগছিল না… তাই ভাবলাম একটু খাবার বানাই।
আলতাফ সাহেব থমথমে গলায় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন,
— ওখানেও কি সারাদিন এসবই করতে নাকি?
বাবার এমন তীক্ষ্ণ প্রশ্নে ঝিলমিল হঠাৎ থমকে গেল। মুখ নিচু করে রইল, কোনো উত্তর দিল না। পরিবেশটা হালকা করতে নূরজাহান চৌধুরী নাস্তায় এক কামড় দিয়ে বেশ খুশি মনে বলে উঠলেন,
— অনেক মজা হয়েছে তো! এগুলো শিখলে কবে তুমি, দাদুভাই?
— গুণ? কিসের গুণ? আমার মেয়েকে রান্না-বান্না করে এসব গুণ দেখাতে হবে না! সে পড়াশোনা করবে, শিক্ষিত হবে, উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনে যাবে! এসব কাজ করার জন্য ও বড় হয়নি।
আলতাফ সাহেবের কথায় নাজমা বেগম ওখানেই স্বামীর সঙ্গে কড়া মেজাজে তর্ক জুড়ে দিলেন। টেবিল জুড়ে শুরু হয়ে গেল শোরগোল। ঝিলমিলের বুকের ভেতরটা ছাৎ করে উঠল। কোথায় একটু শান্তিতে সবার সাথে বসে খাবে, সবাই ওর এত সকালের কষ্টটার একটু প্রশংসা করবে—তা না, উল্টো শুরু হলো মেজাজ খারাপ করা চিল্লাচিল্লি! নাস্তার প্লেটটা ওভাবেই ফেলে রেখে ঝিলমিল হনহন করে নিজের রুমে চলে এলো।
“চাঁদ উঠেছে, ফুল ফুটেছে
কদম তলায় কে…!!
হাতি নাচছে, ঘোড়া নাচছে…
সোনামনি বিয়ে…!!”
কোমর দুলিয়ে দারুণ ছন্দে পা মেলাচ্ছিল ঝিলমিল। পরনে অলিভ রঙের একটা শর্ট কুর্তি আর নীল প্লাজো। জামার নিখুঁত ছাঁচে ঝিলমিলের ছিপছিপে, পাতলা আর সুগঠিত শরীরের ভাঁজগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছিল প্রতিটা মুভমেন্টে। কোমর পেঁচিয়ে শক্ত করে বাঁধা নীল সুতি ওড়নাটা। তার সঙ্গে ছোট্ট জারিন। দুজন মিলে গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচছে। ছোট্ট জারিনকে ঘাড় ঘুরিয়ে, কোমর দুলিয়ে নাচের স্টেপ দেখাচ্ছে ঝিলমিল, আর জারিনও একমনে সেটা ফলো করার চেষ্টা করছে।
“তুমি আসেপাশে থাকলে…
কত খুশি খুশি থাকছি…!!
আর যাচ্ছি ভুলে আমি কে কোথায়…!!
তুমি অল্প সল্প চাইলে
আরও একটু বেশি থাকছি
আর খামখেয়ালি আঁকছি সারা গায়…!!”
ঝিলমিলকে হঠাৎ থেমে যেতে দেখে জারিনও থেমে গেল। দরজার দিকে তাকাতেই দেখা গেল বারিশ প্যান্টের পকেটে হাত গুজে, দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে অফ হোয়াইট শার্ট আর প্যান্ট। তার তীক্ষ্ণ নজর ঝিলমিলের সুগঠিত শরীরের ওপর স্থির। মুহূর্তেই আড়ষ্ট হয়ে গেল ঝিলমিল। দ্রুত কোমরের ওড়নাটা খুলে গলায় পেঁচিয়ে নিয়ে শরীরের চপলতা ঢেকে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা করল। তারপর বারিশের দিকে তাকিয়ে একটা নিষ্পাপ হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল সে।
ভ্রু নাচাল বারিশ। বলল,
— আপনি না অসুস্থ?
ঝিলমিল আমতা আমতা করে বলল,
— আসলে আপনি চলে যাওয়ার পরই ঠিক হয়ে গেছি।
বারিশ তাকিয়ে রইল। অসুস্থতা কমেনি বলে আজকেও কলেজে যায়নি। অথচ এখন এখানে রীতিমতো লাফাচ্ছে!
— ‘লাফাতে লাফাতে ঠিক হয়ে গেছেন?’
বারিশের গলায় প্রচ্ছন্ন কৌতুক আর মেজাজ।
জারিন সঙ্গে সঙ্গে মাঝখান থেকে বলে উঠল,
— এটাকে লাফানো বলে না চাচ্চু! মামুনি আমাকে নাচ শেখাচ্ছিল। কদিন পর আমাদের স্কুলে প্রোগ্রাম আছে তো, তাই।
ঝিলমিল নিজের অসন্তোষ চেপে রাখতে না পেরে বিরবির করে স্বগতোক্তি করল,
— সেদ্ধ করলা কী আর বুঝবে কোনটা নাচ আর কোনটা লাফানো!
জারিন ফিক করে হেসে দিল। নিষ্পাপ মুখে চাচ্চুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— চাচ্চু, সেদ্ধ করলা কী?
বারিশের তীক্ষ্ণ র”ক্তচক্ষু সরাসরি ঝিলমিলের দিকে ঘুরে গেল। ঝিলমিল চট করে চোখ সরিয়ে নিয়ে জারিনের হাত ধরে তড়িঘড়ি করে বলল,
— চলো জারিন, আমরা অন্য রুমে গিয়ে প্র্যাকটিস করি।
কিন্তু বারিশ থামিয়ে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
— জারিন, তোর মামুনি তোকে পরে প্র্যাকটিস করাবে। এখন তার কাজ আছে। তুই গিয়ে তোর রুমে খেল।
জারিন মাথা নেড়ে চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে গেল। ঝিলমিলও চোরের মতো বারিশকে পাশ কাটিয়ে সরে পড়তে চাইল, কিন্তু বারিশ ওর সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়ায়।
সামনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকিয়ে থমকে গেল ঝিলমিল। বারিশ একটু নিচু হয়ে প্রশ্ন করল,
— আমি সেদ্ধ করলা?
ঝিলমিল এক মুহূর্তের জন্য বারিশের চোখে চোখ রেখে পরক্ষণেই নামিয়ে নিল।
— সেদ্ধ করলা খেয়েছ কখনো?
বারিশ আবারও বলল। ঝিলমিল শুকনো ঢোক গিলে ধীর গলায় বলল,
— একবার খেয়েছিলাম…
— টেস্ট কেমন?
— তেঁতো।
বারিশের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিপজ্জনক হাসি ফুটে উঠল। ও ঝিলমিলের আরেকটু কাছাকাছি ঘেঁষে এসে নিজের মুখটা ঝিলমিলের একদম কাছে ঝুঁকিয়ে আনল। ধীরেসুস্থে ফিসফিস করে বলল,
— টেইস্ট মি অ্যান্ড টেল মি….আমি তেঁতো নাকি মিষ্টি…
চমকে উঠে দ্রুত এক পা পিছিয়ে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
— ছিঃ! বাজে লোক!
বারিশ নিজের রুমের দরজায় দাড়িয়ে আছে। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ওর। সেদিনের দৃশ্য গুলো চোখে ভাসছিল। আর এক মুহূর্তও এখানে থাকতে ইচ্ছে করছে না। চাবিটা পকেটে পুরে আবারও বাসা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই সামনে এসে দাঁড়ালেন চঞ্চল সাহেব। ছেলের পথ আটকে গম্ভীর গলায় শুধালেন,
— রাতে ছিলে কোথায়?
পায়ের গতি থমকে গেল বারিশের। না তাকিয়েই নিরাসক্ত গলায় উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
— কেন?
— কেন আবার! সারারাত বাড়ির বাইরে থাকবে, আবার মুখে মুখে বলবে কেন? কোনো দায়দায়িত্ব নেই তোমার?
বারিশ মুখ তুলে চঞ্চল সাহেবের দিকে তাকাল। ওর বরফের মতো ঠান্ডা চোখে কোনো অপরাধবোধ নেই। খুব শান্ত কণ্ঠে বলল,
— আমি বাচ্চা নই, বাবা।
চঞ্চল সাহেব এক মুহূর্ত নীরব হয়ে রইলেন। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল তাঁর। মাত্র একটা রাতের ব্যবধানে চেনা বারিশের চেহারাটা কতটা নিস্তেজ, বিধ্বস্ত আর কঠিন হয়ে গেছে! নিজের রাগটা চেপে রেখে প্রসঙ্গ বদলে বললেন,
— জারিফকে এভাবে না মারলেও পারতে তুমি।
বারিশের ঠোঁটের কোণে বিষাক্ত হাসি ফুটে উঠল। চোয়াল শক্ত করে বলল,
— ও যা করেছে, তারপরও যে এখনও নিঃশ্বাস নিতে পারছে—এটাই ওর অনেক বড় ভাগ্য। সুযোগ পেলে আবারও মারব।
আজ সকাল সকাল হাসপাতালে গিয়ে জারিফকে নতুন করে একদফা পিটিয়ে এসেছে বারিশ। ঝর্ণা শেহরিয়ার আর ফরহাদ সাহেব সময়মতো মাঝখানে এসে না পড়লে আজ হয়তো ছেলেটার প্রাণবায়ুই বের হয়ে যেত! কালকের ঘটনার পর চিকিৎসায় যতটুকু সুস্থ হয়ে উঠেছিল, আজ বারিশের প”শুর মতো প্রহারে একদম আধমরা হয়ে এখন আইসিইউর বেডে কাতরাচ্ছে সে। কারণ বারিশ জানে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েও লাভ হবে না। তার মা ঝর্ণা শেহরিয়ার সেদিনই টাকা খাইয়ে নাতীকে ছাড়িয়ে আনবে। এবং পরবর্তীতে হয়েছেও সেটাই। জারিফ কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর যখন আলতাফ চৌধুরী আর মেহরাজ জারিফকে পুলিশের হাতে তুলে দিলে, ঝর্ণা বেগম একদিনের মধ্যেই নাতিকে ছাড়িয়ে আনে।
— তোর সেখান থেকে আসার আগে অন্তত একবার ভাবা উচিত ছিল।
চিপসের প্যাকেটটা মুচমুচ শব্দে খুলতে খুলতে বলল ইরান। ঝিলমিল জানালায় মুখ রেখে একটু দূরে তাকাল। ওর গলায় রাজ্যের বিরক্তি,
— কী ভাবতাম? তুই তো জানিস আমি এই বিয়েটা কেন করেছিলাম! এখন কেবল আফসোস হচ্ছে, কেন যে এই বোকার মতো কাজটা করতে গেলাম!
— স্যারকে কিন্তু আজকাল কলেজেও দেখি না।
একটা চিপস মুখে নিয়ে ঝিলমিলের মুখে তুলে দিল আরেকটা। ঝিলমিল বলল,
— তাতে আমার কী?
— তোর কি একটুও মনে পড়ে না, ঝিলমিল?
ঝিলমিল চুপচাপ তাকিয়ে রইল। মনে পড়ে? নাহ্, একটুও মনে পড়ে না। মনে পড়বে কীভাবে? ঝিলমিল তো এই গত সাত দিনে লোকটাকে এক সেকেন্ডের জন্য ভুলতেই পারেনি! ভুললে না হয় মনে পড়ার প্রশ্ন উঠত। না চাইতেও মাথার ভেতর সারাক্ষণ ওই একটা মানুষই ঘুরঘুর করে। অজান্তেই মনে অযাচিত আশা জেগে থাকে–হয়তো লোকটা এসে ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। এই বাড়তি, অদ্ভুত অনুভূতির জন্য ঝিলমিল নিজের ওপরই চরম বিরক্ত। ও তো পছন্দই করে না ওই মেন্টাল এলিয়েনকে! তবে কেন সারাক্ষণ তার ভাবনায় মজে থাকা?
নিজেকে সামলে নিয়ে গলার স্বর স্বাভাবিক করল ঝিলমিল
— কাল থেকে আমি কলেজে যাব। আব্বু ফাহিম স্যারকে বলেছে আইসিটি প্রাইভেট পড়াতে। হয়তো আমি কলেজে যাওয়া শুরু করলেই পড়াতে আসবে সে।
ইরান মাথা নাড়ল,
— কালই যাওয়ার দরকার নেই। আরেকটু সুস্থ হ, তারপর যাস।
আরও কিছুক্ষণ টুকটাক গল্পের পর সন্ধ্যা নামতেই উঠে দাঁড়াল ইরান। বিদায় নিয়ে ধীরপায়ে নিচে নেমে এল সে। কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে নেমে তড়িঘড়ি করে সদর দরজা পার হতে যাবে, ঠিক তখনই তাহসিন আর দীঘি সামনে এসে পড়ল।
দীঘি বরাবরের মতোই মাতাল। হাবিজাবি কী যেন বিড়বিড় করছে। ওকে সামলে শক্ত হাতে ধরে রেখেছে তাহসিন। তাহসিনের ধবধবে শার্টের ওপর বমির নোংরা দাগ ছড়ানো। কাজের জন্য অফিস থেকে বের হতেই পথে রাস্তায় দীঘিকে এমন মাতাল অবস্থায় দেখতে পেয়ে বাধ্য হয়েই তাকে বাসায় তুলে এনেছে সে।
ওদের এই অবস্থা দেখে ইরানের এতক্ষণের হাসিখুশি মুখটা মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাহসিনের চেহারার দিকে তাকিয়ে থেকে কোনো কথা না বলে ওদের পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল সে।
তাহসিন একবার পেছন ফিরে ইরানের চলে যাওয়া দেখল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দীঘিকে নিয়ে ওপরে ওর রুমের দিকে হাঁটা দিল। দীঘি অবিরত তাহসিনের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ধস্তাধস্তি করছে, বারবার ধাক্কা মারছে। রুমে পৌঁছাতেই দীঘি সামলাতে না পেরে আাবরও বমি করে দিল। তাহসিন তড়িঘড়ি করে ওকে ওয়াশরুমে নিয়ে যায়।
আজকাল সে তাহসিনের ধারেকাছে ঘেঁষে না ঠিকই, কিন্তু নিজের ক্ষতি করতে একচুলও ছাড় দেয় না। দুদিন আগেও বেপরোয়াভাবে বাইক চালিয়ে হাত-পা ছিলে র”ক্তার”ক্তি করে এসেছে।
তাহসিন ঠান্ডা পানি এনে দীঘির চোখে-মুখে ছিটিয়ে দিতেই দীঘি হাত ছিটকে চি”ৎকার করে উঠল,
— ছাড়ো আমাকে!
— “ছাড়তেই পারি, তবে আমি ধরে আছি বলেই কিন্তু আপনি মেঝেতে ঠাস করে আছাড় খাচ্ছেন না,” খুব শান্ত গলায় বলল তাহসিন।
— পড়লে পড়ব! তোমার তাতে কী আসে-যায়?
— আমি না থাকলে পড়ে গেলে সমস্যা হতো না। কিন্তু এখন পড়ে গেলে সবাই ভাববে আমি ইচ্ছা করে ফেলে দিয়েছি।
দীঘি র”ক্তচক্ষু তুলে তাকাল,
— খুব দরদ দেখাচ্ছ, তাই না?
— সেই মন আমার অনেক আগেই মরে গেছে, ম্যাম।
দীঘি ঝাপসা চোখে তাহসিনের মুখের দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
— আই হেইট ইউ, তাহসিন!
তাহসিন কোনো জবাব দিল না। দীঘির সারা গায়ে বমি লেগে বিচ্ছিরি অবস্থা, জামাকাপড় নোংরা হয়ে আছে। পুরো ড্রেসটা না পাল্টালেই নয়। কিন্তু দীঘির শরীর এতটাই টলছে যে একটু অসাবধান হলেই পড়ে আঘাত পাবে। তাহসিন দীঘির দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
— আপনি আজ পর্যন্ত আমার ছেলেকে একটা বারের জন্যও দেখতে চাইলেন না, ম্যাম।
— কখনো দেখতে চাইবও না! অন্য নারীর সন্তানকে আমি কেন দেখতে যাব? খবরদার, তুমি কখনো সেই বাচ্চাকে আমার সামনে আনবে না! মে”রে ফেলব!
তাহসিনের শান্ত চোয়ালটা মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে উঠল। বদলে গেল চোখের রঙ। গভীর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
— কাকে? কাকে মা”রবেন?
— তোমাকে!
তাহসিন আবার আগের মতো থমথমে, নিস্পৃহ হয়ে গেল। একদম আগের মতোই শান্ত।
ওয়াশরুমের ভেতর থেকে কাউকে ডেকে পাওয়াও মুশকিল। তাছাড়া এই মুহূর্তে বাসায় ঝিলমিল আর নাজমা বেগম ছাড়া কেউ নেই। এই অবস্থায় কী করা উচিত ভেবে পাচ্ছে না সে। কিছুক্ষণ দ্বিধাদ্বন্দ্বে থেকে তাহসিন চোখ দুটো অন্য দিকে ফিরিয়ে দীঘির ভেজা জামার বোতামে হাত দিল। ঠিক তখনই বেডরুম থেকে ঝিলমিলের পরিচিত গলা ভেসে এলো
— ফুপি? তুমি কি ফিরেছ?
তাহসিন যেন হঠাৎ ধাতস্থ হলো, স্বস্তির একটা নিশ্বাস ফেলল। দ্রুত গলা উঁচিয়ে ডাকল,
— ঝিলমিল, ওয়াশরুমের দিকে একটু এসো তো!
হঠাৎ ঘরে কোনো পুরুষালি কণ্ঠ শুনে ঝিলমিলের কপাল কুঁচকে গেল। তড়িঘড়ি করে ওয়াশরুমের সামনে এসে দাঁড়িয়ে অবাক গলায় বলল,
— আপনি এখানে, আঙ্কেল? ফুপির কী হয়েছে?
তাহসিন সংক্ষেপে বুঝিয়ে বলল সবটা। তারপর দীঘিকে দেখিয়ে বলল,
— ওকে একটু গোসল করিয়ে ড্রেসটা চেঞ্জ করিয়ে দাও, প্লিজ।
ঝিলমিলের কাছে সাবধানে দীঘিকে বুঝিয়ে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এল তাহসিন। ওর নিজের শার্টেও দাগ লেগে বাজে অবস্থা। এবার নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হওয়া দরকার।
রাত তখন গভীর, চারপাশ নিঝুম অন্ধকারে ঢাকা। নূরজাহান বেগমের পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিল ঝিলমিল। আচমকা বাইরের দিক থেকে ভেসে আসা এক অসংলগ্ন শব্দে ওর ঘুমটা ভেঙে গেল। প্রথমটায় ভেবেছিল হয়তো ঘুমের ভুল, কিন্তু শব্দটা আবার ভেসে এল একটা ভারী, অস্পষ্ট গোঙানির মতো চি”ৎকার।
ঝিলমিল বিছানায় সোজা হয়ে উঠে বসল। কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করল কোথা থেকে আসছে শব্দটা। নিস্তব্ধ রাতের বুক চিরে আসা সেই অদ্ভুত আওয়াজটা যেন শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ভয়ের শীতল স্রোত বইয়ে দিল। সে বিছানা ছেড়ে ধীর পায়ে ব্যালকনির দিকে এগিয়ে গেল। পর্দাটা একটু সরিয়ে বাইরে তাকাতেই ঝিলমিলের হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। নিচে বাগানের ঝাপসা আলোয় দাঁড়িয়ে আছে বারিশ। টলমল করছে ওর শরীরটা, প্রতিটি পদক্ষেপেই মনে হচ্ছে সে বুঝি এখন পড়ে যাবে। নিশ্চিত মাতাল সে। তার এলোমেলো চুলে রাতের শিশির, চোখেমুখে এক অদ্ভুত হিং”স্রতা। মদের নেশায় চুর হয়ে সে গলা ফাটিয়ে চি”ৎকার করছে,
— আলতাফ চৌধুরী! কোথায় আপনি! সাহস থাকে তো বাইরে আসুন! আমার বউকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজের বউ নিয়ে আরামে ঘুমানো বের করব আপনার! শালা তুই আমাকে ছোটবেলা থেকে দগ্ধ করে এসেছিস, এখনো শখ মেটেনি? বের হ… সামনে আয় তুই! নাহলে গেট ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব আমি!
শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২৪
ঝিলমিলের চোখ দুটো ভয়ে বড় বড় হয়ে উঠল। লোকটার এই বেয়াদবি আর তুই-তোকারির ভাষা যদি এখন আলতাফ চৌধুরীর কানে পৌঁছায়, তবে এ বাড়িতে ঘূর্ণিঝড় বয়ে যেতে আর বাকি থাকবে না। বারিশের এই মাতলামি আর বাবার মেজাজের কথা ভেবে ওর শরীরের র”ক্ত হিম হয়ে এল। এক দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির দিকে ছুটল। পায়ের শব্দ যেন ওর নিজের হৃদস্পন্দনের আওয়াজ ছাপিয়ে যাচ্ছিল। সে যেকোনো মূল্যে বারিশের মুখটা বন্ধ করতে হবে।
