Home শুকনো পাতার নূপুর পায়ে শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২৬

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২৬

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২৬
আয়েশা শেখ

সাত দিন! গুনে গুনে সাতটা দিন পেরিয়ে গেছে ঝিলমিল শেহরিয়ার বাড়ি ছেড়ে চলে আসার। আর এই সাতটা দিন বারিশ নিজের রুমে একটা রাতের জন্যও টিকতে পারেনি। রুমে ঢুকতে গেলেই যেন চোখের সামনে ভেসে উঠত ঝিলমিলের লাফালাফি। দম বন্ধ হয়ে আসত ওর। মাঝেমধ্যেই বাসায় ঢুকত, আবার পরক্ষণেই অজানা যন্ত্রণা, অস্বস্তিতে ছটফট করে বেরিয়ে যেত।
শহরের কোলাহল ছাড়িয়ে নির্জন মহাসড়কে বেপরোয়া গতিতে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে একা একা ঘুরে বেড়াত সে। রাত গভীর হলে ক্লান্ত শরীরে গাড়ির ভেতরেই মাথা ঢেলে ঘুমিয়ে পড়ত। ক্ষুধা তীব্র রূপ নিলে পথের ধারের কোনো দোকান থেকে শুকনো কিছু মুখে পুরে নিত, ব্যস।
কিন্তু আজ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। সোজাসুজি কয়েক বোতল ম”দ গিলে তারপর এসেছে। এখনও একহাতে অর্ধেক খালি একটা বোতল ঝুলছে ওর। এসব খাওয়ার আগেও ভাবেনি এখানে আসবে। কিন্তু খাওয়ার পর নিজের বাসায় না ঢুকে এখানে চলে এসেছে।
আবারও গর্জে উঠল বারিশ,

— আলতাফ চৌধুরী! বের হ শালা!
কর্কশ শব্দে খুলে গেল সদর দরজাটা। হন্তদন্ত হয়ে বাইরে ছুটে এলো এক কিশোরী। কাছে এসেই দ্রুত বারিশের মুখটা দু’হাতে চেপে ধরে কাতর কণ্ঠে বলল,
— বারিশ চাচ্চু, দয়া করে থামুন! আব্বু টের পেলে কিন্তু আর আস্ত রাখবে না, ভীষণ রেগে যাবেন!
বারিশ মুহূর্তের মধ্যে নিথর হয়ে গেল। সমস্ত শরীরটা যেন বরফের মতো জমে স্থির হয়ে গেল ওর। র”ক্তাভ, নেশাতুর চোখে কেবল ঝিলমিলের উদ্বিগ্ন মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। তারপর অকস্মাৎ বুকচাপা আ”ক্রোশে মেয়েটাকে ধা”ক্কা মেরে সরিয়ে দিল। জড়িয়ে যাওয়া কণ্ঠে হুঙ্কার ছেড়ে বলল,
— আই’ম… আই’ম নট ইওর চাচ্চু! আই’ম…
অসমাপ্ত বাক্যের মাঝেই হাতের বোতলটা শূন্যে উঁচিয়ে ধরল বারিশ। লোকটার এমন হিং”স্র রূপ দেখে মনে হলো, এই বুঝি ভারি কাঁচের পাত্রটা ঝিলমিলের মাথায় আঘাত করবে! আ”শঙ্কায় শিউরে উঠে ঝিলমিল দুই হাতের তালুতে মাথা ঢেকে শক্ত করে বুজে ফেলে আঁখি দুটো।

কিন্তু পরক্ষণেই তপ্ত, বলিষ্ঠ বাহুবেষ্টনীতে নিজেকে আবিষ্কৃত করল কিশোরী। বারিশ দুই হাতে পরম ব্যাকুলতায় মেয়েটিকে নিজের বুকের ভেতর পিষে জড়িয়ে ধরেছে। মেয়েটার গ্রীবায় নিজের মুখটা গুঁজে দিয়ে দীর্ঘ এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে; ফুসফুস ভরে মেখে নিল অর্ধাঙ্গিনীর গায়ের চেনা, স্নিগ্ধ সুবাস।
ঝিলমিল শুরুতে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলেও আচমকা পুরুষটির আবেগাক্রান্ত কাঁপা স্বর কানে আসতেই ধড়ফড়ানি থামিয়ে নিশ্চুপ হয়ে গেল। বারিশ নে”শাগ্রস্ত কণ্ঠে বাচ্চার মতো বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
— ইউ সেলফিশ গার্ল, সিয়েনা! তুমি… তুমি জানতে, আমি তোমার হাতের বানানো খাবার ছাড়া খেতে পারি না! তবু কীভাবে আমাকে ফেলে চলে এলে, হু?”
ঝিলমিল বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বারিশ আরও কী কী সব উল্টাপাল্টা প্রলাপ বকে যাচ্ছে। এই কি সেই গম্ভীর, অহংকারী সেদ্ধ করলা? লোকটাকে আজ বড্ড অচেনা, বিষণ্ণ আর অসহায় দেখাচ্ছে। ঝিলমিলের নিজের অজান্তেই কম্পিত দুটো হাত উঠে এলো বারিশের পিঠে। অভিমানী স্বরে বিড়বিড় করল,

— আপনিই তো সর্বদা বলতেন আমি যেন চলে আসি! কথায় কথায় খোঁটা দিতেন… এখন আবার এসব কেন বলছেন?
বারিশ ঝিলমিলের কাঁধে আরও খানিকটা ভর রেখে নিচু স্বরে উচ্চারণ করল,
— ফিরে চলো… আমি একটু ঘুমাতে চাই।
ঝিলমিলের চোখ দুটো অপার বিস্ময়ে প্রসারিত হলো! বরফের মতো কঠিন মানুষটার মুখ থেকে এমন সরাসরি স্বীকারোক্তি! বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল ওর। অবিশ্বাস্য কণ্ঠে শুধাল,
— কেন? এখন বুঝি ঘুমান না?
ঝিলমিলের মনে হলো সে বোকার মতো প্রশ্ন করেছে। বারিশ কোনো ব্যাখ্যা দিল না। দেওয়ার মতো অবস্থাতেও সে নেই। আরও নিবিড়ভাবে নিজের মাথাটা ঝিলমিলের কাঁধে নুইয়ে দিয়ে শক্ত মুঠোয় আঁকড়ে ধরল তরুণীর সরু কোমর। অস্পষ্ট স্বরে কেবল বলল,

— জানি না…
ঝিলমিল নিজেকে সামলে নিয়ে কণ্ঠ কঠোর করার চেষ্টা করল,
— এতদিন তো খবর নিতে এলেন না! আর আজ এসে মাঝরাতে এসব মাতলামি করছেন? চলে যান এখান থেকে। কেউ দেখে ফেললে আপনাকে খারাপ ভাববে।
বারিশের জড়ানো উত্তর ভেসে এলো,
— আমি তো খারাপই…
ভেতর থেকে কারও ভারী জুতোর পদশব্দ এগিয়ে আসতে শোনা যেতেই, ঝিলমিলের বুকের ভেতর ভয়ের তড়িৎ খেলে গেল। সে আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে এক ধা”ক্কায় বারিশকে নিজের ওপর থেকে সরিয়ে দিয়ে পেছনের দিকে ঠেলে দিল।
আলতাফ চৌধুরী হনহনিয়ে বেরিয়ে এলেন। তাঁর পেছনে পেছনে আ”তঙ্কে ছুটে এলেন নাজমা বেগম, মেহরাজ, নূরজাহান চৌধুরী আর তাহসিন। ​সামনে এসে দাঁড়ানো পুরো দলটাকে দেখে বারিশের নেশাতুর চোখ দুটো চকচক করে উঠল। হাত উঁচিয়ে মাতালের মতো তাচ্ছিল্যভরে চি”ৎকার করে উঠল,

— ওই তো বুড়ো, শালা!
​সম্মাননীয় আলতাফ চৌধুরী চরম চটে গিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকালেন। রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
— একটি ভদ্রলোকের বাড়ির সামনে এসে অসভ্যের মতো মাতলামি করা হচ্ছে? আর বুড়ো কাকে বলছ তুমি? কোন দিক দিয়ে আমাকে তোমার বুড়ো মনে হয়, হ্যাঁ?
​বারিশ ঠোঁট উল্টে টলতে টলতে বলল,
— জোয়ান? আপনি জোয়ান?
​— তা নয়তো কী? তোমার চেয়ে আমার গায়ে শক্তি বেশি!
​বারিশ এবার টলমল পায়ে সোজা আলতাফ চৌধুরীর একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আচমকা ভারী হাতটা আলতাফ সাহেবের কাঁধে রেখে, অন্য হাতে থাকা অর্ধেক খালি ম”দের বোতলটা সোজা তাঁর মুখের সামনে ধরল। জড়িয়ে যাওয়া গলায় বলল,

— তাহলে আসুন, দুজন জোয়ান পুরুষ একসাথে মাল খাই! হা করুন, হা…
​তার কাণ্ড দেখে উপস্থিত সবাই একলহমায় বাকরুদ্ধ হয়ে গেল! আলতাফ সাহেব রাগে, ঘৃণায় নিজেকে ছাড়াতে প্রাণপণে চেষ্টা করছেন, আর বারিশ বোতলটা জোর করে তাঁর মুখে পুরে দেওয়ার জন্য জেদ ধরেছে।
​ঝিলমিল আর মেহরাজ একযোগে এগিয়ে এসে বারিশকে টেনে ধরে সরালো। ঝিলমিল বলল,
— আপনি কি পুরোপুরি পা”গল হয়ে গেছেন? প্লিজ শান্ত হোন!
​মেহরাজ বন্ধুর কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
— বারিশ! এটা এক ভদ্রলোকের বাড়ি! কী নোং”রামি শুরু করেছিস তুই?
​মেহরাজ খুব ভালো করেই জানে, অতিরিক্ত ম”দ্যপানের দরুন তার বন্ধু এখন পুরোপুরি আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। তাহসিন নিরব দর্শক। তবে এ যাত্রায় বেশ হাসি পেল তার। নিজের বোন সারাক্ষণ রাস্তাঘাটে মাতলামি করে বেড়ায়, আবার বলছে ভদ্রলোকের বাসা!
সবাইকে আরও বড় ধা”ক্কা দিয়ে বারিশ হঠাৎ চোখ ছোট ছোট করে মেহরাজের দিকে তাকাল। গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

— এই, তুই প্যান্ট খোল!
​বলেই সে আচমকা মেহরাজের প্যান্টে হাত বসিয়ে টান মারল। ​এমন অপ্রত্যাশিত কথায় হকচকিয়ে গেল মেহরাজ! ব্যাকুল হয়ে ধস্তাধস্তি করে বলল,
— কী করছিস তুই, ছাড়! মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি?
​— প্যান্ট খোল বলছি তুই!
​— কিন্তু কেন?
— কেন আবার? আমি তোর বন্ধু, আমার জন্য একটু ন্যাংটো হতে পারবি না?
— শালা, আমি এখন তোর চাচা শ্বশুর! প্যান্ট ছাড়! মা ওকে ছাড়তে বলো।
নূরজাহান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে অসহায় কন্ঠে বলল মেহরাজ। কিন্তু তিনি কোনো কথা বললেন না, গাম্ভীর্য বজায় রেখে চুপচাপ সার্কাস দেখার মতো দৃশ্যটা দেখতে লাগলেন।
ঝিলমিল দ্রুত এগিয়ে এসে জোর জবরদস্তি করে বারিশকে টেনে মেহরাজের কাছ থেকে সরিয়ে আনল। তারপর ধপ করে পায়ের পাতা উঁচিয়ে, দু’হাতের তালু দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল লোকটার কপাটজোড়া মুখ।
​— এদিকে আমার দিকে তাকান!
ঝিলমিলের কণ্ঠে আদেশ। ​আচমকা স্পর্শ পেয়ে টলমল দৃষ্টিতে ঝিলমিলের মুখের দিকে তাকাল বারিশ। ​

— অনেক হয়েছে আপনার ছেলেমানুষি ও মাতলামি! এবার শান্ত হন। নিজের চেহারার যে হাল বানিয়েছেন, লজ্জা করে না একটুও?
— না।
নেশাতুর, আধো-বোজা চোখে কিশোরীর মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে বলল।
— রাতে খেয়েছেন?
বারিশ দু’পাশে না-বোধক মাথা নাড়ল। ঝিলমিল আবারও বলল,
— কেন?
— তুমি জানো সেটা…
— আগে কী খেতেন?
— তখন কেউ অভ্যাস ছিলে না।
— আমি আপনার অভ্যাস?
— না।
— তাহলে?
— তোমার বানানো খাবার।

ঝিলমিল নির্বাক হয়ে কেবল তাকিয়ে রইল। মুখের আর কোনো ভাষা ফুটল না। লোকটার ওপর বিরক্তি চেপে বসছে ঠিকই, কিন্তু একই সাথে বুকের বাঁ পাশে কেমন যেন এক অবাধ্য মায়াও জমে উঠছে।
নাজমা বেগম কিছুটা এগিয়ে এসে ডেকে বললেন,
— ওকে ভেতরে নিয়ে আয়, ঝিলমিল। বিয়ের পর আজই প্রথম এই বাড়িতে পা রাখল। আর দাঁড় করিয়ে রাখিস না।
​আলতাফ চৌধুরী তেঁতে উঠলেন। গলার রগ ফুলিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন,
— একদম না! মেহরাজ, তুই এখনই ওকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আয়। এই মাতাল যেন কোনো অবস্থাতেই এই ঘরের চৌকাঠ না পেরোয়!
​আওয়াজটা বারিশের কান অবধি পৌঁছাল। সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ঝিলমিলের হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
— চলো।
​মেয়ের হাত ধরা দেখে আলতাফ চৌধুরী ধেয়ে এলেন। বারিশের কবজি থেকে ঝিলমিলের হাত ছাড়ানোর জন্য প্রাণপণ টানাটানি শুরু করলেন,

— কোথাও যাবে না ও! হাত ছাড়ো বলছি!
​বহু কসরত আর ধস্তাধস্তির পর অবশেষে ঝিলমিলের হাতটা ছাড়াতে পারলেন তিনি। এরপর ক্রুদ্ধ চোখে ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে ধমকে উঠলেন,
— ভেতরে যা! যা বলছি এখান থেকে!
​বাবা তাকে সহজে ‘তুই’ করে বলেন না। হঠাৎ এই সম্বোধনে শিউরে উঠল ঝিলমিল।
— কিন্তু আব্বু…!
​— আমি তোকে ভেতরে যেতে বলেছি না?
​ঝিলমিল একনজর বারিশের চেহারার দিকে তাকাল, পরক্ষণেই বাবার অগ্নিমূর্তি দেখে পা বাড়িয়ে ভেতরে চলে গেল। আলতাফ চৌধুরী তৎক্ষণাৎ মেহরাজকে হুকুম দিলেন,
— ওকে বাড়িতে রেখে আয়!

​বারিশ তখনও একদৃষ্টে সেই পথের দিকে চেয়ে আছে, যে পথ ধরে ঝিলমিল ভেতরে হারিয়ে গেছে। চোয়াল অকারণেই শক্ত হয়ে উঠল। ​মেহরাজ এগিয়ে এসে বারিশের বাহু স্পর্শ করতেই সে হিংস্র এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নিল। তারপর হনহন করে বাইরের মূল ফটকের দিকে পা বাড়াল। মেহরাজও পেছনে পেছনে এল। ​বাইরে রাস্তার একপাশে বারিশের গাড়িটা থামানো ছিল। বারিশকে সোজা ড্রাইভিং সিটের দিকে যেতে দেখে মেহরাজ ব্যস্ত হয়ে বলল,
— গাড়িতে কেন উঠছিস? কোথায় যাবি এখন? আমাকে দে, আমি ড্রাইভ করছি!
​বারিশ কোনো কথার উত্তর দিল না। সোজা গিয়ে স্টিয়ারিংয়ের সামনে বসে পড়ল। মেহরাজ সামনের দরজার হাতল ধরে পাশের সিটে ওঠার আগেই বারিশ ইঞ্জিনে চাপ দিয়ে এক টানে গাড়িটা বের করে নিয়ে গেল। স্তম্ভিত হয়ে সেদিকে চেয়ে রইল মেহরাজ। তারপর হাত উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল,

— আরে, তুই তো ড্রাঙ্ক! এই অবস্থায় ড্রাইভ করবি কীভাবে?
​কিন্তু কে শোনে কার কথা? রাতের নিবিড় অন্ধকারে নিমেষেই মিলিয়ে গেল গাড়ির পেছনের লাল বাতি দুটো। ​মেহরাজ নিজের ধৈর্য হারিয়ে বিরক্তিতে বারিশের উদ্দেশ্যে অকথ্য গা”লিগালাজ করে উঠল। কেন যে নিজের ভাতিজির সাথে এই পি”শাচটার বিয়েটা হলো! এখন শুধু এদের সংসার নয়, তাদের বছরের পর বছরের বন্ধুত্বের সম্পর্কও দিনে দিনে ছারখার হয়ে যাবে!
বারিশ সামনে তাকিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। বুকের ভেতরটা ক্ষোভে ফুঁসছে। চোয়াল দুটো স্টিয়ারিংয়ের ওপর শক্ত হয়ে বসে আছে। গাড়ি ছুটছে ঝড়ের বেগে। কয়েক মুহূর্ত পর ড্যাশবোর্ডের দিকে তাকিয়ে নিজের সাথেই তেতো হেসে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
— নাইস অ্যাক্টিং! বাট ইট’স নট ওয়ার্কিং…

​নেশা-টেশা কিচ্ছু করেনি বারিশ। আর যতটুকু পান করেছে, তাতে আর যাই হোক বারিশের মতো মানুষের মাথায় নেশা চড়বে না। একটানা সাত দিনেও যখন ঝিলমিল নিজে থেকে ফিরে আসছিল না, তখন আর কোনো উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়েই তাকে আজ এই মাতালের নাটকটুকু করতে হয়েছে। ইগোর দেওয়াল টপকে সুস্থ মাথায় সজ্ঞানে তো আর হাত ধরে বলতে পারত না—’ফিরে চলো, তোমায় ছাড়া আমার একা লাগে।’ কারণ সেদিন সকলের সামনে বড় মুখ করে বলেছিল, ‘ কোনো বাবার বাধ্য মেয়েকে তার লাগবে না।’
​কিন্তু এত নাটক, এত তামাশা করে শেষ পর্যন্ত লাভ কী হলো?
​লাভ তো কিছুই হলো না, উল্টো নিজের সম্মানটুকুও চৌধুরী বাড়ির দোরগোড়ায় বিসর্জন দিয়ে খালি হাতেই ফিরতে হলো। গাড়িটা আরও জোরে গতির সীমা ছাড়াল। স্টিয়ারিং এ থাপ্পড় মে”রে বলল,

— হোয়াট দ্য হেল ডিড ইউ জাস্ট ডু, বারিশ? একটা পিচ্চি মেয়ের জন্য নিজেকে শেষমেশ জোকার বানিয়ে ফেললি? ওহ, গড! ফালতু… একদম ফালতু চেষ্টা ছিল এটা। দিস ডাজন্ট স্যুট ইয়োর পারসোনালিটি এট অল। ইয়োর পারসোনালিটি ওয়ান্ট একসেপ্ট দিস। ইয়োর পারসোনালিটি উড নেভার টলারেট দিস!
হঠাৎ তীব্র শব্দে ব্রেক কষল বারিশ। মাঝরাস্তার একপাশে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর নিস্তব্ধতাকে চিরে গাড়িটা থমকে দাঁড়াল। ​ইঞ্জিনের গর্জন বন্ধ হতেই পুরো গাড়ির ভেতর নেমে এল এক থমথমে নীরবতা। বারিশ স্টিয়ারিংয়ের ওপর দু’হাত রেখে মাথাটা সেখানে সঁপে দিল। বুকের ভেতর ভারী নিঃশ্বাসগুলো ওঠানামা করছে প্রচণ্ড বেগে। মাথাটা কেমন যেন ফাঁকা লাগছে, আবার একই সাথে শত শত এলোমেলো ভাবনায় পুরো মগজটা ফেটে যাওয়ার উপক্রম।
নাসারন্ধ্রে এসে ধা”ক্কা দিল নিজের শরীর থেকে আসা ‘ক্যান্ডি পিঙ্ক’
পারফিউমের মিষ্টতা। ঝিলমিলের গায়ের সুবাসটুকু লেপ্টে গিয়েছে বারিশের জামায়।
শার্টের কলারটা নাকের কাছে টেনে ধরে জোরে একটা শ্বাস নিল সে। আর সাথে সাথে এক অদ্ভুত ছটফটানি শুরু হলো বারিশের র”ক্তে! সে স্টিয়ারিং ছেড়ে দিয়ে নিজের চুলগুলো শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল। বুকের মধ্যে কেমন যেন দম আটকে আসছে! জামার উপরের দুটো বোতাম এক হ্যাঁচকায় ছিঁড়ে ফেলল একটুখানি স্বস্তির তাগিদে। সিটে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বুজে ফেলল, কিন্তু কোনো লাভ হলো না। মেয়েটা নিশ্চিত ওকে শ্বাসরোধ করে মারার আয়োজন করছে!
​ড্যাশবোর্ডের মিউজিক প্লেয়ারটা অন করে দিল। থমথমে নীরবতা চিরে গাড়ির স্পিকারে ভেসে উঠল,
—​— কঠিন… তোমাকে ছাড়া একদিন…
কাটানো এক রাত, বাড়াও দু’হাত…——

ঝিলমিল নিজের জামার গলার কাপড়টা নাকের কাছে টেনে এনে বারবার লম্বা লম্বা শ্বাস নিচ্ছে। বারিশের গায়ের সেই পরিচিত, টম ফোর্ড এর উগ্র সুবাসটা যেন ফুসফুসের একদম গহীনে শুষে নিতে চাইছে। কয়েক মুহূর্ত ধরে এভাবেই কাটছে।
​— ঘুমাও জাহান।
​নিস্তব্ধ নিঝুম রাতে পাশে থেকে দাদীমার শান্ত কণ্ঠ শুনে চমকে উঠল ঝিলমিল। দ্রুত পাশে ফিরে তাকাল,
​— হ্যাঁ… দাদীমা? কিছু বললে?
​ঘরের জিরো ওয়াটের ডিম লাইটের আবছা আলোতেও নূরজাহান চৌধুরী স্পষ্ট বুঝলেন নাতনির মলিন মুখটা। আলতো করে তার গালে হাত রেখে আদর করে বললেন,
​— বললাম, এবার ঘুমাও।
​ঝিলমিল নিজের আমতা আমতা করে বলল,
​— আমি… আমি তো ঘুমাচ্ছিলামই, দাদীমা।
​নূরজাহান চৌধুরী হালকা একটু হেসে নাতনির কপালে জমে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে বললেন,
​— তুমি ঘুমালে কি আর এত শান্ত হয়ে শুয়ে থাকতে? তোমার একটা হাত আর একটা পা নিশ্চিত আমার ওপর চড়ে থাকত!
​ঝিলমিল এবার সত্যি সত্যিই ধরা পড়ে গেল। দাদীমাকে জড়িয়ে ধরে বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ছোট করে বিড়বিড় করে উঠল,

— ঘুম তো আসছে না দাদীমা… বুকটার ভেতর কেমন যেন খালি খালি লাগছে, একদম কিচ্ছু ভালো লাগছে না!
নূরজাহান চৌধুরী কিছু বললেন না। হাসলেন শুধু।
———
—— নিজেকে মনে হয় বলে দি এ সবই ভুল,
ঝরে যাক, পড়ে যাক, আদরে ফোটানো ফুল,
চিন্তাতে তোর, কাটছে প্রহর,
শান্তি নেই….এ যন্ত্রনায়…
মন মাঝি রে…বলনা কোথায়?——
টুপ টুপ করে দুই ফোঁটা নোনা জল চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে মিশে গেল কানের পেছনের বালিশে। চিত হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে তাহসিন। দৃষ্টি নিবদ্ধ সিলিংয়ের ওপর। ঘরের গুমোট নিস্তব্ধতায় কেবল তার নিজেরই ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ। বাহিরের তামাশা দেখে ​রুমে আসার পর থেকে এভাবেই নিথর হয়ে শুয়ে আছে সে, একফোঁটাও ঘুমায়নি।

​ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে পাশ থেকে ফোনটা হাতে নিল সে। বাজতে থাকা গানটা বন্ধ করে সোজাসুজি চলে গেল ফোনের গ্যালারিতে। হাতে গোনা কয়েকটা ছবি সেখানে। প্রথমেই ক্লিক করল কমলা রঙের কামিজ পরা এক তরুণীর শান্ত মুখের মিষ্টি হাসির একটা ছবি। নিষ্পাপ সেই হাসির দিকে তাকাতেই তাহসিনের চোখের বাঁধ ভেঙে গেল, অবাধ্য জল এবার অঝোর ধারায় চোখের কোণ বেয়ে নামতে লাগল। একটা চুমু খেল সেই ছবিতে।
​কাঁপাকাঁপা আঙুলে ছবিটা সরিয়ে অন্য একটা ছবি সামনে আনল সে। তানসিনের বুকে ঘুমিয়ে থাকা ছোট্ট একটা বাচ্চা… তুলতুলে ফোলা দুটি গাল, আধখোলা নরম দুটি গোলাপি ঠোঁট। পুতুলের মতো নিষ্পাপ সেই ঘুমন্ত মুখটা দেখে বোঝার উপায় নেই দুনিয়ার কোনো জটিলতা। এই শিশুটির রগে রগে বইছে তাহসিনের নিজের র”ক্ত। তার নিজের বাচ্চা… নিজের অংশ…নিজের অস্তিত্ব!
ছবিটার ওপর থরথর করে কাঁপা আঙুলটা ছুঁইয়ে দিতেই বুক ঠেলে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। ​চোখ দুটো শক্ত করে বুজে সে ফোনটা শক্ত করে চেপে ধরল নিজের বুকের ওপর।

বরাবরের মতো আজও ভোরে ঘুম থেকে উঠে চটজলদি ব্যালকনিতে গিয়ে উঁকিঝুঁকি মারছিল ঝিলমিল। কিন্তু ওপাশের ব্যালকনিটা বরাবরের মতোই খালি, খাঁ খাঁ করছে। বারিশের দেখা মিলল না।
মনটা এমনিতেই বিষণ্ণ ছিল, তার ওপর সকাল সকাল কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় মা এসে জানাল—আজ নাকি দীঘিকে দেখতে পাত্রপক্ষ আসবে! খবরটা শুনে ঝিলমিলের নিজেরই আর কলেজে যাওয়ার কোনো ইচ্ছে রইল না। সোজা দীঘির রুমে গিয়ে হাজির হলো সে। দরজায় দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে বলল,
— ফুপি! তোমাকে দেখতে আসছে আর তুমি এখনো বাসায় কী করছো?
বিছানায় বসে খুব ধীরেসুঝে নিজের নখে নেইল পালিশ লাগাচ্ছে দীঘি। নখ থেকে চোখ না তুলেই শান্ত গলায় বলল
— তো কী করব?
— পালাচ্ছো না কেন?
— পালাব কেন?
— কেন মানে? তুমি ওদের সামনে যাবে নাকি?
— অবশ্যই যাব! ইভেন আমিই মাকে বলেছি আমার জন্য পাত্র দেখতে।
কথাটা শুনে ঝিলমিলের চোখজোড়া ছানাবড়া হয়ে গেল। কিছুটা তাচ্ছিল্য আর বিস্ময় মিশিয়ে বলে উঠল,
— অ্যাহ! তাহলে তাহসিন আঙ্কেল?
তাহসিনের নামটা শুনতেই দীঘির হাতটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। নেইল পালিশের বোতলটা পাশে রেখে কড়া চোখে তাকিয়ে বলল,

— আমার সামনে ওর নাম নিবি না একদম! যা এখান থেকে।
আজ অফিস ছুটি, তাই নূরজাহান চৌধুরী আজই পাত্রপক্ষকে নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। পাত্রের পরিবারের বিশাল ব্যবসা। নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে পাত্র নিজে ছাড়াও তার বাবা-মা এবং চাচা এসেছেন। এই মুহূর্তে ড্রয়িংরুমে বসে আলতাফ চৌধুরী আর মেহরাজ চৌধুরীর সাথে তাঁদের বেশ জমজমাট আলোচনা চলছে। ​নূরজাহান চৌধুরী একটি জরুরি কাজে বাইরে গিয়েছিলেন, তাহসিনকে সাথে নিয়ে মাত্রই বাড়ি ফিরলেন। তাহসিন নিজের রুমে চলে যাচ্ছিল, কিন্তু নূরজাহান চৌধুরী তাকে প্রায় জোর করেই এনে বসার ঘরে বসালেন।
​তাহসিন প্রথমে কৌতূহল নিয়ে পাত্রর দিকে তাকাল। গায়ের রং তাহসিনের মতোই, তবে বেশ হালকা-পাতলা গড়ন। মাথার চুলগুলো জেল দিয়ে উপরের দিকে খাঁড়া করে রাখা। গলায় চকচকে রুপোর চেইন আর ডান হাতে ব্রেসলেট। ওর বসার ভঙ্গি আর হাত-পায়ের অস্থির নাড়াচাড়া দেখেই অভিজ্ঞ তাহসিন বুঝে নিল, ছেলেটা বেশ চঞ্চল ধাঁচের।
​ছেলেটার পাশে বসে আছেন এক বয়স্ক মহিলা। পুরো শরীর বোরকায় আবৃত, হাত-পায়ে মোজা পরা, চোখ দুটো ছাড়া আর কিছু দেখার কোনো উপায় নেই। তাঁর অন্য পাশে বসে আছেন বাকি দুজন গম্ভীর চেহারার ভদ্রলোক।

তাহসিনকে টানা তাকিয়ে থাকতে দেখে ছেলেটা হাসিমুখে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
​— হ্যালো, আই অ্যাম রেহান আহমেদ।
​তাহসিন হাত মিলিয়ে ধীরকণ্ঠে বলল,
​— আমি তাহসিন। তাহসিন খান সীমান্ত।
​দুজনেই নিঃশব্দে কিছুক্ষণ একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। আবহাওয়ার সেই নীরবতা ভাঙলেন পাত্রের মা। নূরজাহান চৌধুরীর দিকে ঘুরে বললেন
​— কোথায় দীঘি? তাকে নিয়ে আসুন, আমরা একটু দেখি।
​নূরজাহান চৌধুরী চোখের ইশারায় কাজের লোককে পাঠালেন। বসার ঘরের জমে থাকা আলোচনার গুঞ্জনের মাঝেই কয়েক মিনিটের মাথায় ভেসে এলো এক উচ্চকিত কণ্ঠ,
​— হোয়াটস আপ এভরিওয়ান!

​শব্দটা কানে যেতেই ড্রয়িংরুমের প্রত্যেকে একযোগে ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিকে তাকাল। আর তাকানোমাত্রই দৃশ্যটা দেখে পাত্রপক্ষের কারও চোখ কপালে উঠল, তো কেউ যেন আকাশ থেকে পড়ল! চৌধুরী বাড়ির বড়দের মুখ নিমেষে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কেবল তাহসিনের চেহারায় কোনো ভাঙাগড়ার দাগ দেখা গেল না; সে নির্লিপ্ত, স্থির।
​দীঘি দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে একটা উরু-অবধি ছেঁড়া রিঙ্কেলড্‌ প্যান্ট আর আঁটসাঁট স্লিভলেস শোল্ডার-কাট ক্রপ টপ! তবে বরাবরের মতোই পেট ঢাকা তার। সে যেমন পোশাকই পড়ুক পেট তার সব সময়ই ঢাকা থাকে। কলারবোনের ওপর একপাশে আঁকা সাময়িক একটা ট্যাটু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, আর পায়ে উঁচুতলার হাই হিল।
​তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ঝিলমিল। ঝিলমিলের মুখটা ভয়ে আর চিন্তায় শুকিয়ে এতটুকু হয়ে আছে। না জানি এখন কী তুলকালাম ঘটে! দীঘির রুমে গিয়ে কতবার মানা করেছিল এই পোশাকটা না পরতে, কিন্তু বেপরোয়া ফুপি কি কারও কথা শোনে!

নূরজাহান চৌধুরী রাগে-ক্ষোভে দাঁতে দাঁত চেপে বসে আছেন, চৌধুরী বাড়ির কারও মুখ দিয়ে একটি শব্দও ফুটছে না। সবাই যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। তাহসিন আড়চোখে একবার রেহানের দিকে তাকাল। ছেলেটার দৃষ্টিতে স্পষ্ট মুগ্ধতা; দীঘিকে যেন সে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে! তাহসিন শুকনো ঢোক গিলে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে মেঝেতে নিবদ্ধ করল।
​ওদিকে বোরকা পরা রেহানের মা মনে মনে আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ে নানা দোয়া-দরুদ পড়তে শুরু করেছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে রেহান নিজেই বেশ উৎসাহ নিয়ে সোফা থেকে সামান্য সরে দাঁড়িয়ে দীঘিকে বসার জায়গা করে দিয়ে বলল,

​— প্লিজ, বসুন।
​দীঘি ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে ঠিক রেহানের মুখোমুখি সোফাটায় গিয়ে বসল। রেহান হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে বলল,
​— বাই দ্য ওয়ে, আমি রেহান।
​দীঘি পা ওপর পা তুলে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় জবাব দিল,
​— আমি এখনো জিজ্ঞেস করিনি।
​রেহান একটু অপ্রতিভ হয়েও সামলে নিয়ে বলল,
​— আপনার নামটা…
​— নাম না জেনেই হুট করে চলে এসেছেন নাকি?
​— না, মানে… জানি, তাও আপনার মুখ থেকে শুনতে চাইছিলাম।
​বোরকা পরা মহিলাটি তখনও টু শব্দটুকুই করলেন না। পরিবেশ কিছুটা স্বাভাবিক করতে পাত্রের চাচা খোশগল্পের সুরে বলে উঠলেন
​— তা মা, কোন ক্লাসে পড়ো তুমি?
​— অনার্স সেকেন্ড ইয়ার।
​— বাহ্‌, বেশ! তা রান্না-বান্না পারো তো?
​দীঘির কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। সে হাত উঁচিয়ে কাজের মেয়েটিকে দেখিয়ে সোজা বলে উঠল,
​— রাঁধুনি লাগবে আপনার? আরে, আগে বলবেন তো! এই যে আমাদের ফুলি, ও কিন্তু দারুণ রান্না করে। একেই নিয়ে যান!
​পাত্রের বাবা আলতো হেসে নিজের ভাইকে থামিয়ে দিলেন। এমন পরিবারের মেয়ে রান্না পারবে কি না—এই প্রশ্ন করাটাই তো বোকামি। সে পরম স্নেহে জিজ্ঞেস করলেন,
​— আহা, ওর কথা ছাড়ো। তোমার পছন্দের খাবার কী, আম্মু?
দীঘি সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— ‘বেনসন অ্যান্ড হেজেস’ আরও কয়েকটা নেশাদ্রব্যের নাম ​ অনায়াসে যোগ করল।
​— ক্ল্যাসিক মার্টিনি, হুইস্কি সোর আর রেড ওয়াইন।
​পুরো ঘরে যেন এক অদৃশ্য বাজ পড়ল! উপস্থিত সকলেই হাঁ করে স্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে রেহান উজ্জ্বল মুখে বলে উঠল,
​— সিরিয়াসলি? দ্যাটস অসাম! আমারও তো এই ব্র্যান্ডগুলো…
​কথা শেষ হওয়ার আগেই পাত্রের বাবা কড়া চোখে পাশে ফিরে রেহানের পিঠে একটা প্রকাণ্ড থা”প্পড় কষালেন। রেহান ব্যথায় ওড়াওড়া মুখ করে নিমেষে চুপ মেরে গেল।
​আলতাফ চৌধুরী কপালে হাত দিয়ে নিচু মুখে বসে রইলেন। আর তাহসিন তখনও একইভাবে মেঝের দিকে তাকিয়ে নির্জীবের মতো বসে। এই মুহূর্তে সে যদি মাথা তুলে সোজাসুজি কারও দিকে তাকাত, তবে হয়তো সবাই তার চোখের ভেতরের র”ক্তিম লাল আভার দাবানলটা দেখতে পেত!
​নানারকম নাটকীয়তার পর কোনোমতে পাত্রপক্ষকে খাইয়ে-দাইয়ে বিদায় জানানো হলো। ড্রাইংরুমের দরজা বন্ধ হতেই নূরজাহান চৌধুরী রাগের মাথায় দীঘির চুলের মুঠি ধরতে যাবেন, ঠিক তখনই বাইরে থেকে কয়েক জোড়া কড়া জুতো পায়ে হেঁটে আসার শব্দ পাওয়া গেল। দরজার কাছে এসে হাজির হলেন কয়েকজন অপরিচিত, প্রটোকলধারী লোক। মেহরাজ এগিয়ে গিয়ে বেশ বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

​— আপনারা…?
​সামনে থাকা লোকটা পকেট থেকে আইডি কার্ড বের করে অত্যন্ত পেশাদার ভঙ্গিতে বললেন,
​— আমরা স্টেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড সিআইডি থেকে আসছি। গত সপ্তাহে শেহরিয়ার হাউজে যে হ”ত্যাকাণ্ডটা ঘটেছে, আমরা সেটারই অফিসিয়াল ইনভেস্টিগেশনে এসেছি। ওই রাতের পার্টিতে উপস্থিত থাকা প্রায় প্রতিটি পরিবারের সাথেই আমাদের কথা বলা শেষ হয়েছে, শুধু আপনাদের ফ্যামিলিটুকুই বাকি ছিল। আপনারা কি পরিবারের সবাই এখানে প্রেজেন্ট আছেন?
​আলতাফ চৌধুরী বিষণ্ণ মুখে মাথা নাড়লেন,
​— জি, আমরা সবাই আছি। বলুন, কী জানতে চান?
​তাহসিন নিঃশব্দে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল। পিছন থেকে এক সিআইডি অফিসার কড়া গলায় ডেকে উঠলেন,

​— এক্সকিউজ মি! আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
​তাহসিন না ফিরেই শান্ত কণ্ঠে জবাব দিল,
​— আমি এই পরিবারের কেউ নই, তাই আমার এখানে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।
​অফিসার ভ্রূ জোড়া কুঁচকে প্রশ্ন করলেন,

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২৫

​— তাহলে আপনি কে?
​নূরজাহান চৌধুরী তড়িঘড়ি করে নিজে সামনে এসে বললেন,
​— ও আমার পার্সোনাল অ্যাসিস্টেন্ট। তাছাড়া ওই রাতের পার্টিতেও ও উপস্থিত ছিল না।
বড় করে দিয়েছি। সকলে রেসপন্স করবেন।

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২৭