Home যেই তুমি এলে যেই তুমি এলে পর্ব ১১

যেই তুমি এলে পর্ব ১১

যেই তুমি এলে পর্ব ১১
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

দুপুরের সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিমে হেলে পড়ছে। আহমেদ নিবাসের সামনের বিশাল প্যান্ডেল সকাল থেকেই অতিথিদের পদচারণায় মুখর। একের পর এক গাড়ি এসে থামছে মূল ফটকের সামনে। আত্মীয়-স্বজন, পরিচিতজন, শুভাকাঙ্ক্ষী—সবাই রোহানের খৎনার দাওয়াতে যোগ দিতে এসেছেন।
প্যান্ডেলের ভেতর সারি সারি টেবিল-চেয়ার সাজানো। পরিবেশনকারীরা ব্যস্ত অতিথিদের আপ্যায়নে। রান্নাঘরের দিক থেকে ভেসে আসছে বিভিন্ন প্রকার খাবারের মনকাড়া ঘ্রাণ। বাড়ির পুরুষেরা অতিথিদের অভ্যর্থনায় ব্যস্ত, আর নারীরা ভেতরের অংশে গল্প-আড্ডায় মেতে উঠেছেন। চারদিকে এক ধরনের প্রাণচঞ্চল উৎসবমুখর পরিবেশ।
এই কোলাহল থেকে খানিকটা দূরে দ্বিতীয় তলায়, নিজের কক্ষে তৈরি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল কাইফা। আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত নীরবে পোশাকগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল সে।

গতকাল অর্শীর দিয়ে যাওয়া সবগুলো ড্রেসই পরিপাটি করে ঝুলিয়ে রাখা ছিল ভেতরে। একটির পর একটি পোশাকের ওপর দৃষ্টি বুলিয়ে শেষ পর্যন্ত আলতো করে বের করল হালকা শ্যাম্পেইন-গোল্ডেন রঙের ড্রেসটি।
কেন জানি, আজ এই পোশাকটিই তার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগল।
সম্পূর্ণ ফ্লোর-লেংথ ড্রেসটিতে ছিল রাজকীয় এক আভিজাত্য। ঢেউ খেলানো প্রশস্ত ঘের, পুরো পোশাকজুড়ে সূক্ষ্ম সোনালি জরি, হাতে করা কারুকাজ আর ছোট ছোট স্টোনের নিখুঁত কাজ—সব মিলিয়ে যেন চোখ জুড়িয়ে যায়। জানালার ফাঁক গলে আসা রোদের আলো পড়তেই সূক্ষ্ম অলংকরণগুলো মৃদু ঝিলমিল করে উঠল। জমকালো হলেও কোথাও বাড়াবাড়ি নেই; বরং সংযত সৌন্দর্যই পোশাকটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
এর সঙ্গে ছিল একই রঙের লম্বা, প্রশস্ত একটি ওড়না। চারপাশজুড়ে সূক্ষ্ম স্টোনের বর্ডার, যা মাথায় নিলে পুরো সাজটাকে আরও মার্জিত ও শালীন করে তুলবে।

কিছুক্ষণ পর পোশাক বদলে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল কাইফা।
একটু আগেই গোসল করেছে সে। তাই কোমর ছোঁয়া ঘন কালো চুলগুলো এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। ভেজা চুলের ডগা থেকে তখনো দু-এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে পিঠ বেয়ে। সেই কারণেই হিজাবটা এখন পুরোপুরি না বেঁধে শুধু মাথায় আলতো করে ঘুমটা জড়িয়ে রেখেছে। চুলগুলো একটু শুকিয়ে নিলেই হিজাব পরে নেবে।
সাজ বলতে তেমন কিছুই করেনি।
বরাবরের মতোই এক হাতে বাবার কিনে দেওয়া সরু সোনার ব্রেসলেট, গলায় ছোট্ট একটি সোনার চেইন আর কানে ছোট্ট একজোড়া দুল। চোখে শুধু হালকা সুরমার ছোঁয়া। এর বাইরে কোনো প্রসাধনের প্রয়োজনই যেন অনুভব করেনি সে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুলগুলো আঙুল দিয়ে আলতো করে গুছিয়ে নিচ্ছিল কাইফা।
ঠিক তখনই–

খট…
দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল অর্শী।
তার ঠিক পেছনেই ছিল রোশনী।
ঘরে প্রবেশ করেই দু’জনের পা যেন মেঝেতেই আটকে গেল। কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলতে পারল না। খোলা, ভেজা কালো চুলগুলো পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে আছে। শ্যাম্পেইন-গোল্ডেন পোশাকের সঙ্গে গলায় আলতো করে জড়িয়ে থাকা ওড়না, মুখে বিন্দুমাত্র ভারী সাজ নেই—তবু সামনের রমণীটিকে দেখে মনে হচ্ছিল, সৃষ্টিকর্তা যেন নিঃশব্দে সমস্ত সৌন্দর্যটুকু তার স্নিগ্ধতার ভাঁজেই লুকিয়ে রেখেছেন।
“ আরে ইয়ার! কী মাস্ত লাগছে তোমায়, আপি! ”
অর্শীর বিস্ময় মিশ্রিত কণ্ঠে ঘোর কাটল কাইফার।
মেয়েটা মৃদু হেসে বলল,

“ এত বাড়িয়ে বলছো কেন? ”
“ আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না। সত্যিই তোমাকে মারাত্মক লাগছে। ”
বলতে বলতেই অর্শী দ্রুত এগিয়ে এসে কাইফার সামনে দাঁড়াল। মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার ভালো করে দেখে নিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“ হায় আল্লাহ তোমার চুলগুলো! আমিতো পুরো ক্রাশ আপি! ”
“ উফ, চুপ করো তো তুমি! ”
রোশনী এতক্ষণ নিশ্চুপ ছিল। এবার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,
“ তোমাকে এভাবে আসলেই অনেক অন্যরকম সুন্দর লাগছে। ”
অর্শী সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ীর হাসি হাসল।
“ দেখেছো? রোশনী আপুও আমার সঙ্গে একমত। ”
কাইফা অপ্রস্তুত হালকা হাসল।আর কিছু বলল না। ঠিক তখনই রোশনী হাতে ধরা ছোট্ট মেহেদির কোনটা সামনে ধরে বলল,

“ আচ্ছা, এবার বসো। নিচে যাওয়ার আগে তোমার হাতে মেহেদিটা দিয়ে দিই। ”
রমণী অবাক হয়ে তাকাল। ওভাবেই প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“ এখন? ”
“ হ্যাঁ, এখনই। খুব ভারী কিছু না। ছোট্ট একটা ডিজাইন। শুকাতেও বেশি সময় লাগবে না। ”
পৃষ্ঠে মেয়েটা কিছু বলার আগেই অর্শী তার হাত ধরে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসিয়ে দিল। কাইফার খালি হাত দেখে সে- ই রোশনীকে ডেকে এনেছে।
“ চলো মাই বিউটি আপি, আপাতত কোনো অজুহাত চলবে না। ”
“ কিন্তু আমারতো এখনো হিজাব বাঁধা হয়নি। মেহেদি দিলে পরে বাঁধব কীভাবে? ”
“ আমি থাকতে এসবের চিন্তা তোমায় করতে হবে না। দাঁড়াও আমি এক্ষুণি হিজাব বেঁধে দিচ্ছি। ”
মৃদু হেসে বসে পড়ল কাইফা। কিশোরী গিয়ে বসল ওর পিছনটায়। রোশনী ধীরে ধীরে কাইফার বাঁ হাতটা নিজের দিকে টেনে নিল। কয়েক সেকেন্ড হাতটার দিকে তাকিয়ে যত্ন করে মেহেদির নকশা আঁকতে শুরু করল। কবজি থেকে শুরু করে তালুর মাঝ বরাবর ফুল-লতার সূক্ষ্ম নকশা ফুটে উঠতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর মেহেদির ফাঁকে ছোট্ট খালি জায়গাটা দেখিয়ে রোশনী জিজ্ঞেস করল,

“ এখানে কার নাম লিখব? ডু ইউ হ্যাভ সামওয়ান স্পেশাল? ”
কাইফা বিস্মিত হয়ে তাকাল।
“ উহু! ”
অর্শী দুষ্টু হেসে বলল,
“ আমরা কাউকে বলব না। সত্যিটা বলে দাও আপি। ”
“ আরে বাবা, সত্যিই বলছি। ”
“ তো এখন কি করার? তোমার নামটাই লিখে দিই তাহলে?
রোশনীর কথায় কাইফা মাথা নেড়ে মৃদু স্বরে বলল,
“ হুম লিখে দাও।”
রোশনী আর কিছু না বলে মেহেদির সূক্ষ্ম রেখায় তালুর ভেতরের দিকে ছোট্ট করে লিখে দিল–
“ কাইফা ”
নামটা এমন নিপুণভাবে নকশার ভেতর মিশে গেল যে খেয়াল না করলে সহজে চোখেই পড়বে না।
এইদিকে অর্শী ততক্ষণে খুব যত্ন করে কাইফার ভেজা চুলগুলো গুছিয়ে পেছনে নিয়ে সুন্দর করে বেঁধে দিয়েছে। পরপর হিজাব বেঁধে দিয়ে একই রঙের ওড়নাটা এমনভাবে সেট করল, যাতে পুরো অবয়বটা আরও মার্জিত আর স্নিগ্ধ দেখায়।
শেষে এক পা পিছিয়ে দাঁড়িয়ে নিজের কাজটা দেখে দু’হাত কোমরে রেখে বলল,

“ ব্যস! এখন তো একদম রাজকুমারী লাগছে! ”
রোশনীও সম্মতির হাসি হাসল।
“ সত্যিই… ”
কাইফা শুধু মৃদু হেসে মাথা নিচু করল। প্রশংসাগুলো শুনতে তার এখনো অদ্ভুত রকম অস্বস্তি লাগে। ঠিক তখনই বাইরে থেকে ভেসে এলো পরিচিত এক কিশোর কণ্ঠ—
“ অর্শী আপি, রোশনী আপি আম্মু তোমাদের ডাকছে! ”
তিনজনই একসঙ্গে দরজার দিকে তাকাল। অর্শী বিরক্ত মুখে বলল,
“ কেন ডাকছে? ”
“ জানিনা আমি। আমাকে শুধু বলেছে তোমাদের জলদি নিচে পাঠাতে। ”
রোশনী উঠে দাঁড়াল।

“ চলো তাহলে। ”
দরজার কাছে গিয়ে অর্শী আবার ফিরে তাকাল।
“ আপি, তুমি কিন্তু কোথাও যেও না। আমরা পাঁচ মিনিটেই আসছি। ”
কাইফা মাথা নাড়ল।
“ আচ্ছা। ”
দু’জন বেরিয়ে যেতেই রুমটা আবার শান্ত হয়ে গেল।
কিন্তু রোহান বের হলো না।
বরং স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার গোল গোল চোখদুটো কাইফার দিকেই নিবদ্ধ।
কাইফা অবাক হয়ে বলল,

“ কি হলো? ”
রোহান যেন এখনো ঘোরের মধ্যেই আছে।
ধীরে গলায় বলল,
“ আপি…”
“ হুম?”
“ তোমাকে আজকে একদম… প্রিন্সেস লাগছে।”
কাইফা হেসে ফেলল।
“ সত্যি? ”
“ হুম..”
জোর গলায় জবাব দিলো শিশুটি। পরক্ষণেই নিজের হাতে থাকা ক্যামেরাটা তুলে ধরল।
“ চলো, তোমার ছবি তুলব। ”
“ না না! ”
কাইফা তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল।
“ এখন ছবি তুলব না। ”
“ প্লিজ! ”
“ না আপি, পরে তুলব নে। অর্শীরা আসুক। ”
“ প্লিজ আপি! শুধু কয়েকটা ছবি।”
শিশুটার এমন আকুতি দেখে শেষ পর্যন্ত না করতে পারল না কাইফা।
মৃদু হেসে বলল,

“ আচ্ছা তোলো। ”
“ ইয়েস! ”
আনন্দে ছোট্ট একটা লাফ দিল রোহান।
তারপর কাইফার সামনে এসে বলল,
“ চলো। বাড়ির পেছনে। ওখানে অনেক সুন্দর ফুল ফুটেছে। ”
“ ওখানে তো মানুষ থাকবে! ”
“ না না! ওদিকটা একদম নিরিবিলি তুমি এসো। ”
বলেই কাইফার হাত ধরে হাঁটা দিল সে।

বাড়ির পেছনের অংশটা ছিল সামনের কোলাহলের সম্পূর্ণ বিপরীত।
চারদিকে নীরবতা। সযত্নে ছাঁটা সবুজ ঘাস, সারি সারি রঙিন ফুল, মাঝখানে পাথরের সরু হাঁটার পথ আর এক পাশে ছোট্ট একটি ফোয়ারা।
দূরের অতিথিদের কোলাহল এখানে এসে কেবল অস্পষ্ট গুঞ্জনের মতো শোনা যায়।
রোহান একের পর এক ছবি তুলেই চলেছে।
“ আপি, এবার এদিকে তাকাও। ”
ক্লিক।
“ এবার ফুলটার পাশে দাঁড়াও। ”
ফের ক্লিক।
“ এবার একটু হাসো।”
কাইফা মৃদু হাসল। এভাবে ছবি তোলার মাঝেই শিশুটি হঠাৎ থেমে গেল। পরপরই নিজের কপালে চাপড়ে বলল,
“ ইশ! ”
কাইফা প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুধাল,
“ কি হয়েছে? ”
“ একটা জিনিস আনতে ভুলে গিয়েছি! ”
“ কি? ”
“ তুমি দাঁড়াও আমি এক্ষুণি আসছি! ”
কথা শেষ করেই ক্যামেরা হাতে ভো দৌড় দিল সে।
“ এই! ধীরে যাও! ”
কাইফাও দ্রুত তার পেছনে ছুটল।
মেহেদি যেন নষ্ট না হয়, তাই এক হাতে জামা সামলে অন্য হাত সামনের দিকে তুলে সাবধানে দৌড়াচ্ছিল সে।
ঠিক তখনই—

বাড়ির ভেতরের কোলাহল এড়িয়ে ফোন কানে নিয়ে ধীর পায়ে সেদিকেই এগোচ্ছিল রিক্ত। গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যবসায়িক আলোচনায় ব্যস্ত সে। ফোনের ওপাশে থাকা ব্যক্তির কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে শুনতেই সামনের বাঁক ঘুরে এদিকটায় এলো।
ওমনিই কেউ কাউকে খেয়াল করার আগেই—
ধপ!
হঠাৎ করেই নরম এক দেহ এসে ধাক্কা খেল তার বুকের সঙ্গে।
অপ্রস্তুত হয়ে এক পা পিছিয়ে গেল রিক্ত। ফোনটা হাত থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলেও শেষ মুহূর্তে শক্ত করে ধরে ফেলল। ভ্রু কুঁচকে সামনে তাকাতেই দেখল, একটি ভীতসন্ত্রস্ত মুখশ্রী। যার পেলব হস্ত যুগল স্থান পেয়েছে তার বুকের উপর। হঠাৎ ধাক্কায় কাইফা বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। পড়ে যাওয়ার আতঙ্কে কখন যে নিজের দু’হাত রিক্তর বুকের ওপর রেখে শক্ত করে চেপে ধরেছে, তা সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
দু’জনেই কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ।
কাইফার খিচে রাখা চোখ, মুখ আর আতঙ্কে কেঁপে ওঠা দীর্ঘ পাপড়ি আর দ্রুত ওঠানামা করা নিঃশ্বাস—অদ্ভুতভাবে রিক্তকে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিল। কেন যেন বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল তার। কিন্তু পরের মুহূর্তেই নিজের ভাবনাকে কঠোরভাবে সামলে নিল মানব। ফোনের ওপাশের মানুষটি বারবার তার নাম ধরে ডাকছে—সেটা বুঝতেই সে দ্রুত বাস্তবে ফিরে এল।
ততক্ষণে কাইফা দ্রুত নিজের হাত সরিয়ে নিল। পরপরই চোখ পড়ল সাদা শার্টটার দিকে।
তার বুকের ঠিক বাম পাশে স্পষ্ট মেহেদির ছাপ।
আর সেই ছাপের মাঝখানে পরিষ্কার ভেসে উঠেছে—

“ কাইফা ”
কাইফার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। তৎক্ষণাৎ মেহেদি টা মুছার বৃথা চেষ্টা করে, সে অপরাধী কণ্ঠে বলে উঠল,
“ আমি… আমি খুব দুঃখিত…”
রিক্ত চোখ নামিয়ে এবার শার্টের দিকে দেখল।
সেখানে মেহেদির গাঢ় রঙ দেখতেই চোয়াল শক্ত করে বলল,
“ চলাফেরার সময় দৃষ্টি কোথায় থাকে তোমার? ”
“ আসলে… আমি খেয়াল করিনি। আ’ম স্যরি!”
মানুষটা কিয়ৎক্ষণ শান্ত দৃষ্টিতে ওকে নিরীক্ষণ করল। পৃষ্ঠে কিছু না বলে সোজা বাড়ির ভেতরের দিকে হাঁটা দিল। কাইফা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। লজ্জায় যেন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে তার।
অন্যদিকে রিক্ত মনে মনে ঠিক করল, আগে রুমে গিয়ে শার্টটা বদলে নেবে।
কিন্তু ঠিক তখনই প্যান্ডেলের দিক থেকে তড়িঘড়ি একজন কর্মচারী ছুটে এসে বলল,
“ স্যার! সবাই আপনাকে খুঁজছেন। প্রধান অতিথি এসে গেছেন। ”
রিক্ত এক মুহূর্ত থামল। শার্টের দিকে না তাকিয়েই উত্তর করল,
“ আসছি। ”
শার্ট বদলানোর কথা মাথা থেকে সরে গেল।
দ্রুত প্যান্ডেলের দিকে হাঁটা দিল সে।
আর তার অজান্তেই…
সাদা শার্টের বুকের ওপর তখনও স্পষ্ট হয়ে লেগে রইল একটি নাম—
“ কাইফা ”
তখন কাইফার হাতের জন্য যা চোখে পড়েনি রিক্তর।

প্যান্ডেলে পা রাখতেই আবারও চারপাশের কোলাহল তাকে ঘিরে ধরল।
পরিচিত ব্যবসায়ী, আত্মীয়-স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী—একে একে সবাই এসে কথা বলতে শুরু করল। কেউ খৎনার অনুষ্ঠানের আয়োজনের প্রশংসা করছে, কেউ নতুন ব্যবসার প্রসঙ্গ তুলছে, আবার কেউ কেবল সৌজন্য বিনিময়েই ব্যস্ত।
রিক্তও স্বভাবসুলভ গম্ভীরতা বজায় রেখেই সবার সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছিল। ব্যস্ততার ভিড়ে শার্টের বুকে লেগে থাকা মেহেদির দাগটার কথা পুরোপুরি ভুলে গেছে সে।
তবে উপস্থিত অতিথিদের চোখ কিন্তু সেটা এড়িয়ে যায়নি।
যে-ই তার সামনে দাঁড়াচ্ছে, একবার না একবার বুকের দিকটায় তাকিয়ে নিচু স্বরে পাশের মানুষটিকে কিছু বলছে। কেউ ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখছে, কেউ আবার কৌতূহলী চোখে দ্বিতীয়বার তাকাচ্ছে।
প্রথমদিকে বিষয়টা খেয়ালই করেনি রিক্ত। কিন্তু ধীরে ধীরে অস্বাভাবিক দৃষ্টিগুলো তার চোখ এড়াল না।
ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল তার।
ঠিক তখনই পেছন থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো—

“ কিরে রিক্ত, বুকের মধ্যে কার ট্যাগ নিয়ে ঘুরছিস? ”
কথাটা বলেই হো হো করে হেসে উঠল ছেলেটা।
মুহূর্তের মধ্যে আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই রিক্তর বুকের দিকে তাকাল। রিক্তও স্বভাবতই নিচে দৃষ্টি নামাল। আর পরের মুহূর্তেই তার চোখ স্থির হয়ে রইল সাদা শার্টের ওপর। বুকের ঠিক বাম পাশে গাঢ় মেহেদির ছাপ। আর সেই ছাপের মাঝখানে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা—
“কাইফা”
কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল সে।
মনে ভেসে উঠল কিছুক্ষণ আগের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।
চারপাশে তখন চাপা হাসির রোল উঠেছে।

“ বাহ! নামটা তো একেবারে বুকের ভেতরেই লিখে ফেলেছিস! ”
“ ট্যাগটা কিন্তু বেশ পার্মানেন্ট মনে হচ্ছে!”
“ তো কে এই কাইফা? আমাদেরকেও পরিচয় করিয়ে দে তার সাথে? ”
একে একে মন্তব্য ভেসে আসতেই রিক্ত ধীরে ধীরে মুখ তুলে সবার দিকে তাকাল।
তার গম্ভীর দৃষ্টিতে হাসির শব্দ কিছুটা থেমে গেল। কোনোরূপ ব্যাখ্যা দিল না সে। শুধু আঙুলের ডগা দিয়ে একবার মেহেদির দাগটা ঘষে দেখল। রঙ একটুও উঠল না। নিঃশব্দে হাত নামিয়ে নিল মানব। অতঃপর গম্ভীর গলায় বলল,
“ ইট ওয়াজ এন এক্সিডেন্ট অর নাথিং! ”
এটুকুই। আর কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করল না সে। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা একজন কর্মচারীকে শান্ত গলায় বলল,
“ আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি। ”
কথাটা বলেই সবার বিস্মিত দৃষ্টি উপেক্ষা করে ধীর পায়ে বাড়ির ভেতরের দিকে হাঁটা দিল।

দূরে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনাটা নির্বাক চোখে দেখছিল রোশনী।
প্রথমে বিষয়টা বুঝতে না পারলেও, রিক্তর সাদা শার্টের বুকের ওপর স্পষ্ট করে লেখা “কাইফা ” নামটা চোখে পড়তেই তার ঠোঁটের কোণের হাসিটা মিলিয়ে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন হালকা চিনচিন করে উঠল। নিজের অজান্তেই মুঠো করে ফেলল ওড়নার এক প্রান্ত।

যেই তুমি এলে পর্ব ১০

অদ্ভুত এক অনুভূতি গ্রাস করল তাকে। সেটার নাম ঈর্ষা, নাকি কেবল অস্বস্তি–তা নিজেও বুঝে উঠতে পারল না। চারপাশের মানুষের হাসাহাসি তার ভালো লাগছিল না। তার চেয়েও বেশি খারাপ লাগছিল, রিক্ত নির্বিকার মুখে সবকিছু সহ্য করছে। একবার ইচ্ছে হলো এগিয়ে গিয়ে সবাইকে থামিয়ে দেয়। কিন্তু পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিল সে। নিঃশব্দে দৃষ্টি সরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। তবু বুকের ভেতরের অস্বস্তিটুকু আর সরাতে পারল না।
পরক্ষণেই ঘটনার আসল উৎপত্তি জানার আশায় কাইফাকে খুঁজতে লাগল।

যেই তুমি এলে পর্ব ১২