Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৮৪

শেহেজাদার আদর পর্ব ৮৪

শেহেজাদার আদর পর্ব ৮৪
সুমাইয়া ইসলাম নূর

রাত ক্রমেই গভীর হতে শুরু করেছে। চৌধুরী ভিলার চারপাশে নেমে এসেছে গভীর নীরবতা। ডাইনিং রুমে সবাই অপেক্ষা করছিল ইউভি আর ইনায়ার জন্য। সন্ধ্যার পর থেকে দুজনের দেখা নেই। রেদোয়ান কাউকে ইউভির ঘরে যেতে দিচ্ছে না।
অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষর পর কিছুটা হতাশ হয়ে রেশমা চৌধুরী ধীর কণ্ঠে বললেন।রেদোয়ান, সন্ধ্যা থেকেই অপেক্ষা করছি। এখন রাত বারোটা বাজতে চলল। দুজন কি ডিনার করবে না?লিখন চৌধুরী মৃদু হেসে স্ত্রীকে শান্ত করে বললেন। ঘুমোতে দাও, রেশমা। ইউভিকে দেখেছো? এই কয়েকটা দিন ইনায়ার চিন্তায় ঠিকমতো ঘুমাতেই পারেনি। একটু ঘুমোতে দাও ছেলেটাকে।

ঠিক তখনই ডাইনিং রুমের দরজার দিকে সবার দৃষ্টি চলে গেল। ইউভি ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল। মুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও চোখেমুখে আগের তুলনায় অনেকটাই প্রশান্তি। সে নিঃশব্দে একটি চেয়ার টেনে বসতে বসতে সবার দিকে তাকিয়ে বলল আমার জন্য অপেক্ষা না করলেই পারতে।তারপর সরাসরি সাবিহা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল সেজো মা, খাবার রেডি করো। আদরের খাবার রুমে নিয়ে যাব আমি।
রেশমা চৌধুরী ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলেন ঘুম কেমন হলো?ইউভি গম্ভীর মুখে খাবারের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল,

ঘুমোতে দিলে কই তোমরা?কথাটা শুনে সবাই মুচকি হেসে উঠলো। ঠিক তখনই রায়হান চৌধুরী গলা ঝেড়ে নরম স্বরে বললেন কেমন আছিস, ইউভি?ইউভি এক টুকরো খাবার মুখে দিয়ে উত্তর দিল খারাপ থাকার কথা ছিল নাকি, চাচ্চু?রায়হান চৌধুরী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে বললেন।সব ভুলে যা। আগের কথা মনে রেখে নিজেদের সম্পর্কগুলো নষ্ট করার কোনো মানে হয় না।
রায়হান চৌধুরীর কথায় টেবিলজুড়ে সবার মাঝে মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এলো। রেদোয়ান খাবার খেতে খেতে রাইহান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে কিছুটা চিন্তিত স্বরে বলল,বাদ দাও এই সব তো কী বিপদে পড়ছো নাকি, চাচ্চু? আই মিন, কোনো ঝামেলা হয়নি তো?রায়হান চৌধুরী মাথা নেড়ে শান্ত স্বরে বললেন না, রেদোয়ান। আমি নূরকে দেখতে এসেছি। তা ছাড়া সব ঠিক আছে। তিয়া এখন আমার বিজনেস সামলাচ্ছে।কথাটা শুনেই ইউভি হঠাৎ উচ্চস্বরে হেসে উঠল লাইক, সিরিয়াসলি চাচ্চু? ওইটা তোমার বিজনেস ? আমরা তো জানি, ওটার মালিক তিয়া মালিথা।রায়হান চৌধুরী এবার ইউভি আর রেদোয়ান এর দিকে তাকিয়ে বললেন আমার মানেই তো তিয়ার। তিয়া আমার মেয়ে।

ইউভি ভ্রু কুঁচকে আবারও অবাক হয়ে বলল,
তোমার মেয়ে?রায়হান চৌধুরীর মুখের হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। বুকের ভেতর জমে থাকা পুরোনো ব্যথা যেন আচমকাই চোখেমুখে ফুটে উঠল। তিনি ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে ফেললেন। কণ্ঠটা ভারী হয়ে এলো বুঝি তার হ্যা মেয়ে। আমার মেয়ে।লিখন চৌধুরী কিছুক্ষণ রায়হান চৌধুরীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ভাইয়ের কণ্ঠে জমে থাকা দীর্ঘদিনের অভিমান, কষ্ট আর অসহায়ত্ব যেন তার চোখের সামনেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। অবশেষে তিনি বললেন।তাহলে তুই কি বলতে চাচ্ছিস, ওইদিন তুই ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিলি?
রায়হান চৌধুরী কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। চোখের দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল টেবিলের ওপর, অথচ মনটা যেন বহু বছর আগের সেই দিনটায় ফিরে গেল। ঠোঁট কাঁপল সামান্য তার তারপর বুকের গভীর থেকে উঠে আসা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীরে ধীরে বললেন ওইদিন আমার কাছে আর কোনো অপশন ছিল না, ভাইয়া। সত্যি বলছি, আর কী-ই বা করতে পারতাম বলো? যেই মেয়েটাকে আমি সেই ছোট্টবেলা থেকে নিজের মেয়ে বলে জেনে এসেছি, যার মুখে ‘বাবা’ ডাক শুনে জীবনের এতগুলো বছর পার করেছি, হঠাৎ একদিন জানতে পারলাম, সে আমার নিজের মেয়ে নয়। বিশটা বছর পর জানতেপারলাম,মেয়েটা আমার রক্তের কেউ নয় সে অন্য কারও সন্তান। কিন্তু শুধু রক্তের সম্পর্ক নেই বলেই কি এতগুলো বছরের সম্পর্ক মুছে ফেলা সম্ভব ছিল?

তিয়াকে যখন ওর মা আমার কাছে রেখে চলে গিয়েছিল, তখন ও ছিল একেবারেই ছোট্ট একটা শিশু। সেই ছোট্ট তিয়াকে আমি নিজের কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছি। ওর প্রথম হাঁটা শুরু প্রথম কথা বলা শেখা ওর ছোট ছোট আবদার, ওর অসুস্থ হলে। রাত জেগে থাকা সবকিছুর সঙ্গে আমি জড়িয়ে ছিলাম। ও আমার রক্তের সন্তান কি না সেটা জানার আগেই ও আমার হৃদয়ের সন্তান হয়ে গিয়েছিল। তাই বিশ বছর পর সত্যিটা জানার পরও কীভাবে ওকে নিজের জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দিতাম বলো? ও তো শুধু আমার কাছে একটা সন্তান ছিল না, ভাইয়া ও ছিল আমার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ।

কিছুক্ষণ থেমে রায়হান চৌধুরী চোখ তুলে লিখন চৌধুরীর দিকে তাকালেন। চোখের কোণে তখন স্পষ্ট পানি চিকচিক করছে। তিনি মৃদু হেসে সেই হাসির আড়ালে গভীর বিষণ্নতা লুকিয়ে বললেন দেখো তো ভাইয়া তোমার মেজো ভাইয়ার রোবিউলের সবারই তো একটা করে পরিবার আছে। সবার ঘরেই বউ বাচ্চা আছে, সবার সামনে একটা ভবিষ্যৎ আছে। দিন শেষে সবাই নিজের ঘরে ফিরে যাওয়ার মতো একটা জায়গা পায়। কিন্তু আমার ভবিষ্যৎটা কী, বলো তো? আমি যদি সেদিন তিয়াকে মেনে না নিতাম, যদি ওকে নিজের মেয়ে বলে আগলে না রেখে এই বাড়িতেই থেকে যেতাম, তাহলে দিনশেষে কী হতো? তোমাদের সুখে ভরা পরিবারগুলো চোখের সামনে দেখতাম আর নিজের শূন্যতাটাকে আরও বেশি অনুভব করতাম। সেই শূন্যতা নিয়ে কি আমি বাকি জীবনটা কাটাতে পারতাম?
তিনি একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আর এই বয়সে এসে নতুন করে বিয়ে করার মতো মানসিকতা আমার নেই, ভাইয়া। সত্যি বলতে, সেই ইচ্ছেটাও নেই। আমি জানি না ভবিষ্যতে আমার জীবনে আর কী আছে। শুধু এটুকু জানি, তিয়াকে আমি আমার সন্তানের মতোই ভালোবাসি। হয়তো আমাদের মাঝে রক্তের সম্পর্ক নেই, কিন্তু রক্তের সম্পর্কের চেয়েও কিছু সম্পর্ক অনেক গভীর হয়। কিছু মানুষকে রক্ত দিয়ে নয়, বছরের পর বছর ভালোবাসা, যত্ন আর মায়া দিয়ে নিজের করে নিতে হয়। তিয়ার সঙ্গে আমার সম্পর্কটাও ঠিক তেমন।
রায়হান চৌধুরী এবার চোখের পানি মুছে নিয়ে ধীর কণ্ঠে বললেন, হ্যাঁ, ওর মা যেসব কথা বলেছিল, সেগুলো শুনে তিয়াও একসময় ভুল পথে চলে গিয়েছিল। আমিও ওর কিছু আচরণে অনেক কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু মানুষ ভুল করতেই পারে। ভুল বুঝতে পেরে নিজেকে শুধরে নেওয়ার সুযোগটাও তো তাকে দিতে হয়। আর তিয়া এখন নিজেকে অনেকটাই বদলে নিয়েছে। ও নিজের ভুল বুঝেছে, নিজের জীবনটাকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তাই পুরোনো সবকিছু আঁকড়ে ধরে আমি আর ওকে বিচার করতে চাই না। ও আমার মেয়ে এই সত্যিটাই আমার কাছে যথেষ্ট।

রায়হান চৌধুরী কথাগুলো শেষ করে চুপ করে গেলেন। ডাইনিং টেবিলের চারপাশে থাকা সবাইও যেন কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে রইল। তার কথার প্রতিটি শব্দে এত বছরের একাকিত্ব, ভালোবাসা আর তিয়াকে ঘিরে বেঁচে থাকার গল্পটা যেন নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো ঘরজুড়ে।ইউভি আর চুপ করে থাকতে পারল না। মুখের খাবারটুকু গিলে ধীরে ধীরে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রায়হান চৌধুরীর দিকে তাকাল।ঠোঁটের কোণে সামান্য বাঁকা হাসি ফুটিয়ে শান্ত অথচ কটাক্ষমাখা কণ্ঠে বলল,

— ওহ, রিয়েলি, মিস্টার রায়হান চৌধুরী? এসব ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে এই শেহজাদ ইউভি চৌধুরীকে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করো না। বুঝতে পেরেছি, তুমি তোমার রক্তের সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও নিজের মেয়ের মতো করে মানুষ করা তিয়াকে ছেড়ে থাকতে পারবে না। ওর প্রতি তোমার ভালোবাসা, দায়বদ্ধতা।সবকিছুই আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু একটা বিষয় আমার মাথায় ঢুকছে না, চাচ্চু।ইউভি টেবিলের ওপর রাখা গ্লাসটায় হাত রেখে ধীরে ধীরে বলল।ওই অসভ্য মহিলাটাকে তুমি আবার নিজের স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিলে কেন? মালিথাদের প্রতিটা খারাপ কাজের সঙ্গে সে জড়িত ছিল। শুধু জড়িতই নয়, অনেক ক্ষেত্রেই সে সবকিছুকে প্রশ্রয় দিয়েছে। তাহলে সে-ও তো সমান অপরাধী। পার্থক্য শুধু একটাই মালিথারা নিজেদের কাজের প্রমাণ রেখে গেছে, কিন্তু ওই মহিলা এতটাই চালাক ছিল যে নিজের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণই রেখে যায়নি সে তো মালিথা দের সাথেই বিশ্বাসঘাতঘতা করেছে।
রায়হান চৌধুরী কোনো উত্তর দিলেন না। ইউভি এবার আরও স্থির হয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো তুমি বলছো, তিয়াকে ভালোবাসো বলেই তুমি ওকে ছেড়ে থাকতে পারোনি। ঠিক আছে। কিন্তু তিয়াকে ভালোবাসার সঙ্গে ওই মহিলাকে ক্ষমা করার কোনো সম্পর্ক নেই। একজন মানুষকে ভালোবাসা আর তার চারপাশের মানুষদের অন্ধভাবে বিশ্বাস করা দুটো এক জিনিস নয়। তুমি তিয়াকে নিজের মেয়ে হিসেবে রেখেছো, সেটা তোমার সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের আড়ালে এমন একজন মানুষকে আবার নিজের জীবনে জায়গা দেয়েছো যার অতীত তুমি নিজেই জানো।

— তুমি বলছো, এই বয়সে তোমার আর নতুন করে সংসার করার মানসিকতা নেই। আমি সেটা মানছি। কিন্তু একা থাকার ভয় থেকে ভুল মানুষকে জীবনে ফিরিয়ে আনা বোকামি । এই ভুলের মূল্য একদিন তোমাকেই দিতে হবে। সে ধীরে ধীরে নিজের প্লেটটা সরিয়ে রেখে বলল।আমি তোমাকে তোমার মেয়েকে ছেড়ে দিতে বলছি না, চাচ্চু। তিয়াকে তুমি ভালোবাসো, ভালোবাসবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তিয়ার প্রতি তোমার ভালোবাসাকে ঢাল বানিয়ে এমন একজন মানুষকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করো না, যার অতীতের প্রতিটি অধ্যায় সন্দেহে ভরা। ভালোবাসা মানুষকে ক্ষমা করতে শেখায়, কিন্তু বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলতে শেখায় না আফসোস সে তোমাকে দিয়ে ওইটাই করেছে।
রায়হান চৌধুরী ইউভির দিকে তাকিয়ে রইলেন। ইউভির শেষ কথাটার জবাব দেওয়ার মতো কোনো যুক্তি যেন এই মুহূর্তে তার কাছে নেই। ইউভি আর কোনো কথা বলল না। ধীরে ধীরে ইউভি পানির গ্লাসটা তুলে নিলো। এক চুমুকেই পুরো টা পানি খেল। তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল খাবারটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, চাচ্চু। আবেগের আলোচনা পরে করলেও চলবে।

ডিনারের পর আয়াত, আতিকা রিদ আর প্রণয় সবাই মিলে ইচ্ছেকে দেখতে চলে গেল। এতক্ষণে ঘুমিয়ে থাকা ছোট্ট পুতুলটা তখন শান্ত হয়ে শুয়ে আছে। আয়াত ধীরে ধীরে ইচ্ছের পাশে বসে তার ছোট্ট মুখটার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে বলল, পুতুল সোনা, তুমি তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাও । আমরা রোজ একসঙ্গে খেলব। বাগানে দৌড়াব, বাইক চালাব, সাইকেল চালাব কত মজা করব আমরা!
আয়াতের কথা শুনে আতিকাও আর চুপ করে থাকতে পারল না। সে আয়াতকে একটু সরিয়ে দিয়ে বলল এই, তুই একটু সর না! আমি কথা বলব।
তারপর ইচ্ছের পাশে বসে বলল নো ডল তুমি কিন্তু আমার মতো হবে। আমরা একসঙ্গে সুইমিং করব ছবি আঁকব আমি তোমাকে সব শেখাব!রিদ এতক্ষণ চুপচাপ সবার কাণ্ড দেখছিল। এবার সে আর নিজেকে সামলাতে না পেরে বলল এই, তোরা চুপ করবি? আমার ভাগ্নিটি কিন্তু আমার মতো ড্যান্সার হবে!তার কথা শুনে ইনায়া হেসে ফেলল। রিদ আবার ইচ্ছের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়তে লাগল, যেন এখনই তাকে নাচ শেখানো শুরু করে দেবে।
ইনায়া ওদের কাণ্ড দেখে হাসতে হাসতে বলল,

— ওহ্! এখন থেকেই সবাই আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ ঠিক করে ফেলেছিস? এরই মধ্যে ছোট্ট প্রণয় চুপিচুপি এসে ইনায়ার পাশে বসে পড়েছে। সে কোনো কথা না বলে খুব মনোযোগ দিয়ে ইচ্ছের ছোট্ট মাথার ওপর থাকা ব্যান্ডটি নিয়ে খেলছিল। ইনায়া সেই মিষ্টি কাণ্ড দেখে মুচকি হেসে রিদকে উদ্দেশ্য করে বলল ভাই, তোর মতোই ড্যান্সার হবে। দেখ, এখন থেকেই হাত-পা ছুড়ে কীভাবে নড়াচড়া করছে!
কথাটা শেষ হতেই দরজার দিক থেকে ইউভির কণ্ঠ ভেসে এলো। হাতে কয়েকটি ফাইল নিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে সে চারপাশের হইচই শুনে ভ্রু কুঁচকে বলল কী হচ্ছে এখানে? ছোট নবাব, ভাগ্নিকে কী শেখাচ্ছো?রিদ মুচকি হেসে ইউভির দিকে তাকিয়ে বলল শেখাচ্ছি না, বলছি। তার বাবা কি ভাবে সবসময় আমাকে ফাঁসায়!ইউভি ভ্রু তুলে রিদের দিকে তাকাতেই রিদ ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে গেল। তারপর গলার স্বর নামিয়ে ফিসফিস করে বলল বড় নবাব, তোমার সঙ্গে একটু কথা ছিল মানে, একটু হেল্প লাগবে।
ইউভি কিছু বলার আগেই একে একে চৌধুরী পরিবারের বাকি সদস্যরাও ঘরে প্রবেশ করতে শুরু করল। পিয়াসা প্রণয়কে দেখে মুচকি হেসে বলল,

কী, ঘুম আসছে না তোমাদের?প্রণয় মায়ের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে আবার ইচ্ছের দিকে তাকাল।
রেশমা চৌধুরী ধীরে ধীরে ইচ্ছের কাছে গিয়ে তার ছোট্ট গালটা আলতো করে ছুঁয়ে আদর করে বললেন দাদুভাই দেখো তো সবাই তোমাকে দেখতে চলে এসেছে।ঠিক তখনই ইউভি চোখের ইশারায় রেশমা চৌধুরীকে কিছু একটা বোঝাল। রেশমা চৌধুরীও সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টা বুঝে নিয়ে ছোট্ট ইচ্ছেকে সাবধানে কোলে তুলে নিলেন। তারপর রায়হান চৌধুরীর দিকে এগিয়ে গিয়ে ইচ্ছে কে তার কোলে তুলে দিলেন।
রায়হান চৌধুরী ছোট্ট ইচ্ছেকে বুকে আগলে নিয়ে কিছুক্ষণ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আবেগমাখা কণ্ঠে বললেন মাশাআল্লাহ, ভাবি! বড্ড মায়াবী হয়েছে। একদম নূরের মতো।শিশুটির মুখের দিকে তাকিয়ে তার চোখেমুখে কোমলতা ফুটে উঠল, যেন বহুদিন পর তার সামনে কোনো নির্মল আনন্দ এসে দাঁড়িয়েছে।ঠিক তখনই প্রণয় আর নিজেকে সামলাতে না পেরে ছুটে এসে বলল,

— ও আমাল পুতুল! বুত্তো আমাল উত্তে।
প্রণয়ের আধো-আধো কথায় ঘরে থাকা সবাই মুচকি হেসে উঠল। রায়হান চৌধুরীও হেসে ছোট্ট প্রণয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।হঠাৎ রিদ বলল এই দাঁড়াও আজ তো সবাই একসঙ্গে হয়েছি। এতদিন পর পুরো পরিবার একসঙ্গে! একটা গ্রুপ ছবি তুলি!কথাটা শুনে সবাই আর আপত্তি করল না। কেউ কেউ ছোট্ট ইচ্ছেকে ঘিরে দাঁড়াল, রেদোয়ান প্রণয়কে কোলে নিল, সবাই আবার একে অপরকে একটু কাছে টেনে নিল। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো চৌধুরী পরিবার এক ফ্রেমে এসে দাঁড়াল।ক্যামেরার ক্লিকের সঙ্গে সঙ্গে বন্দি হয়ে গেল চৌধুরী পরিবারের সেই বিশেষ মুহূর্ত পরিবারের ভালোবাসা হাসি আনন্দের ছবি।

চৌধুরী ভিলায় আজ যেন উৎসবের ঢেউ উঠেছে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে পুরো তিনটি বছর। আজ সেই ছোট্ট ইচ্ছের তৃতীয় জন্মদিন। তিন বছর আগে যে ছোট্ট পুতুলটাকে ঘিরে চৌধুরী পরিবারের প্রতিটি মানুষের চোখে আনন্দের অশ্রু জমেছিল, আজ সেই পুতুলটিই পুরো বাড়ির প্রাণ হয়ে উঠেছে। তার জন্মদিন উপলক্ষে চৌধুরী ভিলায় আয়োজন করা হয়েছে সুন্দর একটা প্রোগ্রাম। বাড়ির প্রতিটি কোণ সাজানো হয়েছে সুন্দর করে।
পুরো পার্টির থিম রাখা হয়েছে ইচ্ছের সবচেয়ে পছন্দের রং পিঙ্ক। ভিলার প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে বাগান, হলরুম, সিঁড়ির দুপাশ।সবকিছুতেই গোলাপি রঙের সাজসজ্জা রাখা হয়েছে। নানা আকারের বেলুন, ফুল, রিবন আর ঝলমলে আলোয় পুরো বাড়িটা যেন রূপকথার কোনো রাজপ্রাসাদে পরিণত হয়েছে। ইচ্ছের পছন্দের নানা কার্টুন আর টেডি বিয়ারের সাজসজ্জাও রাখা হয়েছে পার্টির বিভিন্ন জায়গায়।

একে একে অতিথিরা আসতে শুরু করেছে। তুবা, নাতাশা এহসান, রাজ্জো ও তুর্যও এসে পৌঁছেছে। ইনায়ার নানুবাড়ির আত্মীয়স্বজন, ইউভির নানুবাড়ির আত্মীয়স্বজন মাগুরা গ্রামের বাড়ি থেকেও একে একে অতিথিরা এসে চৌধুরী ভিলায় এসে পৌঁছেছে। বাড়ির ব্যস্ততা যেন কোনোভাবেই কমছে না।
চৌধুরী পরিবারের তিন গিন্নি রেশমা চৌধুরী, নুসরাত চৌধুরী ও সাবিহা চৌধুরী তিনজনই একই রঙের শাড়ি পরেছেন। তাদের সাজেও ছিল একই রকমের আভিজাত্য। অন্যদিকে লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী, রোবিউল চৌধুরী ও রায়হান চৌধুরীও পরেছেন একই ধরনের ড্রেস। পুরো পরিবারের মধ্যেই যেন আজ এক অন্যরকম ঐক্যের ছাপ।এদিকে ইউভি, রেদোয়ান ও রাজ্জো পুরো আয়োজনের প্রতিটি দিক সামলাতে ব্যস্ত। কোথাও যেন কোনো কমতি না থাকে, সেদিকে ইউভি নিজে থেকে নজর রাখছে। মেয়ের তৃতীয় জন্মদিন বলে কথা এই দিনটাকে স্মরণীয় করে রাখতে কোনো কিছুতেই সে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেনি।
ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে এল রিমঝিম মির্জা, পিয়াসা, তুবা ও ইনায়া। ইনায়ার কোলে তখন ছোট্ট ইচ্ছে গোলাপি রঙের সুন্দর বার্বি ড্রেসে ছোট্ট পুতুলটাকে আজ যেন আরও বেশি মায়াবী লাগছে। মাথায় ছোট্ট একটি সুন্দর হেয়ারব্যান্ড, মুখে স্নিগ্ধ নিষ্পাপ হাসি পুরো বাড়ির সাজসজ্জা দেখে ইচ্ছের চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে উঠেছে।

এতসব সাজসজ্জা আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা টেডি বিয়ারগুলো দেখেই ইচ্ছা আর মায়ের কোলে স্থির থাকতে পারল না। মায়ের কোল থেকে নামার জন্য ছটফট করতে করতে অবশেষে নিচে নামতেই ছুটে গেল সাজানো টেডিগুলোর দিকে।কিন্তু সিঁড়ির শেষ ধাপটায় তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে হঠাৎই তার পা পিছলে যাওয়ার উপক্রম হলো। মুহূর্তের মধ্যেই প্রণয় ছুটে এসে তাকে ধরে ফেলল।প্রণয় সঙ্গে সঙ্গে ইচ্ছের দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে বলল সাবধানে! এক্ষুনি তো পড়ে যেতে! শুনিস না কেন আমার কথা? বল তো! এই সোজা হয়ে দাঁড়া। সাবধানে দৌড়াবি, বুঝতে পেরেছিস?

ইচ্ছে কিছুক্ষণ প্রনয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব নিরীহ মুখ করে মাথা নেড়ে দাঁড়িয়ে রইল তুর্যও সঙ্গে সঙ্গে তাদের কাছে এগিয়ে এসে ইচ্ছের হাত ধরে বললো চল, আমরা টেডির কাছে গিয়ে খেলি।রৌদিকও দৌড়ে এসে উত্তেজিত কণ্ঠে বলল ওই পাশে অনেকগুলো টেডি আছে! চলো, চলো!তিনজনের কথায় ইচ্ছের মুখে আবার হাসি ফুটে উঠল। সে টেডিগুলোর দিকে তাকিয়ে এক পা এগোতেই হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একজনের দিকে সেই একজন আর কেও নয় তার পাপ্পা।
চারপাশে এত মানুষের ভির তারপরও ছোট্ট ইচ্ছের চোখ যেন এক মুহূর্তেই শুধু তার বাবাকেই খুঁজে পেল। বাবাকে দেখামাত্রই তার মুখের হাসিটা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।দূর থেকে ছুটে এসে ইচ্ছে হঠাৎই ইউভিকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। ছোট্ট দুটো হাত দিয়ে বাবার কোমর আঁকড়ে ধরে আনন্দে বলল পাপা, দেখো তো! তোমার পিনতেত তে কত কিউত লাগতে ইচ্ছে কথাটা বলেই নিজের পোশাকের দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। ইউভি অবাক চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। কয়েক মুহূর্ত যেন তার চোখ সরলই না। তারপর মেয়েটাকে নিজের সামনে এনে আদর করে গাল টিপে বলল,আমার প্রিন্সেসকে আজ এত সুন্দর লাগছে!
ইচ্ছের মুখে সঙ্গে সঙ্গে আরও বড় হাসি ফুটে উঠল। সে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে মিষ্টি কণ্ঠে বলল,

লাভ ইউ পাপা ইউভির চোখেমুখে মুহূর্তেই মায়া ছড়িয়ে পড়ল। মেয়ের কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে বলল লাভ ইউ টু মা। ইচ্ছে খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে বলল তুনো।, তুনো! ইউভি মেয়ের কথাটা ভালো করে শোনার জন্য কানটা তার মুখের কাছে এগিয়ে দিল। ইচ্ছে বাবার কানে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
আমি তোমাল সাতে ঘুলতে দাব। একটু পলে শুধু তুমি আল আমি দাব, আমি মাম্মামকে নেব না, ঠিক আতে ? মেয়ের এমন আবদারে ইউভির ঠোঁটের কোণে প্রশস্ত হাসি ফুটে উঠল। সে ইচ্ছের নরম গাল দুটোতে আলতো করে হাত রেখে আদুরে কণ্ঠে বলল ওকে মা, ঠিক আছে। পার্টি শেষ হলেই তোমাকে নিয়ে ঘুরতে যাব। তবে তার আগে আমার ছোট্ট রাজকন্যাকে পার্টিটা উপভোগ করতে হবে।
বাবার কথা শুনেই ইচ্ছের আনন্দ যেন আর ধরে না। খুশিতে আবারও খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর এক ছুটে চলে গেল প্রণয়ের কাছে।

কিছুক্ষণ পর অবশেষে কেক কাটার মুহূর্ত এসে গেল। সবাইকে ঘিরে ছোট্ট ইচ্ছেকে দাঁড় করানো হলো। চারপাশে আনন্দের রেশ। ইচ্ছে ছোট্ট হাতে ছুরি ধরে কেক কাটতেই সবাই একসঙ্গে হাততালি দিয়ে উঠল।কেক কাটার পর প্রথম টুকরোটাই ইচ্ছে বাবার মুখের সামনে এগিয়ে দিল। ইউভি মেয়ের হাত থেকে সামান্য কেক নিয়ে মুখে দিল, তারপর সেই কেকেরই ছোট্ট এক টুকরো নিজের হাতে তুলে মেয়েকে খাইয়ে দিল। ইচ্ছে খিলখিল করে হেসে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।এরপর একে একে ইচ্ছে ইনায়া, প্রণয়, পিয়াসা, রেদোয়ানসহ বাড়ির প্রত্যেক সদস্যকে নিজের হাতে কেক খাইয়ে দিল। ছোট্ট হাতের সেই আদুরে আপ্যায়নে পুরো বাড়িটাই যেন আনন্দে মুখর হয়ে উঠল।
কেক কাটার পর শুরু হলো উপহারের পালা। পরিবারের একেকজন একেক রকম উপহার নিয়ে ছোট্ট ইচ্ছের হাতে তুলে দিতে লাগল। বিশেষভাবে পছন্দ করে আনা উপহার নিয়ে হাজির হলো সবাই। ইচ্ছে প্রতিটি উপহার হাতে নিয়ে আনন্দে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বললো এতো তকলেট।
ঠিক তখনই ইউভি মুচকি হেসে মাইক্রোফোনটা হাতে তুলে নিল। হলরুমের সবাই তার দিকে তাকাল।ইউভি মেয়ের দিকে তাকিয়ে মায়াভরা কণ্ঠে বলল মাই লিটিল প্রিন্সেস তাকাও এদিকে।”
ইচ্ছে বাবার দিকে তাকাতেই ইউভি মৃদু হেসে বলল,

আজ তোমার জন্য আরও একটা ছোট্ট সারপ্রাইজ আছে বাবার পক্ষ থেকে ঠিক সেই মুহূর্তে রেদোয়ান বড় প্রজেক্টরের পর্দায় একটি ভিডিও চালিয়ে দিল।
পর্দাজুড়ে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল একটি অপূর্ব বাড়ির দৃশ্য।
ঢাকার গুলশানের শান্ত, নিরিবিলি এক এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে বিশাল দুতলা ডুপ্লেক্স বাড়িটি। চারপাশ যেন সবুজের চাদরে ঢাকা। বাড়ির সামনে বিস্তৃত লন, ছাঁটা ঘাসের ওপর ছড়িয়ে থাকা নরম আলোর আভা দুপাশে সারি সারি গাছ আর নানা রঙের ফুলের বাগান। বাড়ির চারপাশের উঁচু গাছগুলো এমনভাবে ছায়া তৈরি করে রেখেছে, যেন বাইরের ব্যস্ত শহরটা এখান থেকে বহু দূরের কোনো পৃথিবী।বাড়িটির স্থাপত্যে ছিল নিখুঁত সৌন্দর্য আর আধুনিকতার মিশেল। কাচের জানালাগুলো দিয়ে ভেতরের উষ্ণ আলো বাইরে এসে পড়েছে। সামনের প্রশস্ত বারান্দা, কাঠের নকশা করা দরজা।পাথরের দেয়াল আর চারপাশের সবুজের সমন্বয়ে পুরো বাড়িটাকে দেখাচ্ছিল যেন কোনো স্বপ্নের ঠিকানা। বাড়ির পেছনেও রয়েছে বিস্তৃত সবুজ বাগান, ছোট্ট জলাধার আর বসার জন্য সাজানো নিরিবিলি একটি জায়গা।
ভিডিওতে বাড়িটির প্রতিটি কোণ একে একে ফুটে উঠতে থাকল।সবকিছুর মধ্যেই ছিল পরিপাটি আভিজাত্য। হলরুমে উপস্থিত সবাই মুগ্ধ হয়ে পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল। কেউ কিছু বলল না। শুধু ছোট্ট ইচ্ছের চোখ দুটো বিস্ময়ে আরও বড় হয়ে উঠল।
ভিডিও শেষ হতেই ইউভি মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

— “এটা কার বাড়ি জানো মা ? ইচ্ছে অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। ইউভি নিজেই মৃদু হেসে বলল ভাবছো, আমার বাড়ি? না। এই বাড়িটা হলো অ্যাভিয়ানা ইচ্ছে চৌধুরীর বাড়ি। আমার মেয়ের নিজের বাড়ি। কথাটা শুনে উপস্থিত সবাই আবারও বিস্মিত হয়ে ইউভির দিকে তাকাল।ইউভি কয়েক মুহূর্ত থেমে এবার আরও গভীর কণ্ঠে বলল এই বাড়িটা ইচ্ছের বাবার বাড়ি নয়, এটা তার স্বামীর বাড়িও নয়। এই বাড়ির মমালিকানা শুধু আমার মেয়ে। এই বাড়ির আসল মালকিন ইচ্ছে।ইচ্ছের চোখ তখন বিস্ময়ে স্থির হয়ে আছে বাবার মুখের দিকে চেয়ে ।ইউভি মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল একজন বাবা কখনোই চায় না তার মেয়ে সারাজীবন অন্য কারও ওপর নির্ভর থাক। আজ আমি আছি, কালও থাকব ইনশাআল্লাহ। কিন্তু একজন বাবা হিসেবে আমার দায়িত্ব শুধু আজকের জন্য নয়, আমার মেয়ের পুরো ভবিষ্যতের জন্য।

এর পর ইচ্ছের উদ্দেশ্য বললো মা আমি চাই, একদিন তুমও যখন বড় হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেবে তখন তোমার মাথার ওপর নিজের একটা ছাদ থাকবে। কারও কাছে তোমার থাকার অধিকার চাইতে হবে না।আর এই বাড়িটা থাকবে তোমার নিজের পরিচয়ের একটা অংশ হয়ে। আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ কারও দয়ার ওপর থাকবে না। তার জীবনে যে মানুষই আসুক, সে যেন আমার মেয়েকে ভালোবাসে। আমার ইচ্ছে কারও ওপর নির্ভরশীল হয়ে বাঁচবে না। সে নিজের পরিচয়ে বাঁচবে।কথাগুলো শুনে চারপাশের সবাই নিঃশব্দ হয়ে গেল। আর ছোট্ট ইচ্ছে কিছুই বুঝতে না পেরে শুধু বাবার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল।
ইউভিও মেয়ের সেই হাসির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে উঠল।

হয়তো আজ ইচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না। কিন্তু একদিন যখন সে বড় হবে, তখন বুঝবে তার বাবা তাকে শুধু একটি বাড়ি উপহার দেননি, তার পুরো ভবিষ্যৎটাকে নিজের হাতে নিরাপদ করে রেখে গিয়েছে।ইনায়া ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ইউভির পাশে এসে দাঁড়াল। এতক্ষণ ধরে পর্দায় ভেসে ওঠা বাড়িটির দৃশ্য দেখেছে ইউভির কথাগুলো ও মন দিয়ে শুনেছে আনন্দে চোখের কোণে চিকচিক করছে অশ্রু। কিছুক্ষণ ইউভির দিকে নীরবে তাকিয়ে থেকে বলল বর, তোমাকে যত দেখি, ততই অবাক হয়ে যাই। একটা মানুষ এতটা পারফেক্ট কী করে হয় বলো তো?
ইউভির ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। ইনায়া চোখের পানি মুছে আবার ধীরে ধীরে বলল আমার যতদূর মনে পড়ে, আজ থেকে প্রায় আট বছর আগে আমরা যখন লন্ডনে গিয়েছিলাম, আমাদের শেষ রাতটা আমরা এখানেই কাটিয়েছিলাম তাই না? সেদিন তো আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এই বাড়িটা কার? তুমি বলেছিলে সময় হলে জানতে পারবে।আজ বুঝতে পেরেছি এই সময়টার জন্যই তুমি অপেক্ষা করছিলে। আর আজ… অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত সময়টা এসে গেছে।ইউভি কিছু না বলে ধীরে ধীরে ইনায়ার কাঁধে হাত রাখল। তারপর তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিয়ে মায়াভরা চোখে বলল সুন্দর, না?
ইনায়া একবার পর্দার দিকে তাকিয়ে আবার ইউভির দিকে ফিরে মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

— “হ্যাঁ… অনেক সুন্দর।
তবে তুমি এত কিছু বদলে ফেলেছ, বর। এই কয়েক বছরে কত কিছু বদলে গেছে!ইউভির মৃদু স্বরে বলল এই ক্রেডিট কিন্তু আমার নয়। ইনায়া কৌতূহলী চোখে তাকাতেই ইউভি হেসে বলল,
সব ক্রেডিট রেদোয়ানের। বাড়িটার প্রতিটা জিনিস, প্রতিটা পরিবর্তন সবকিছুর পেছনে ওর হাত আছে। আমি শুধু আমার মেয়ের জন্য কী চাই, সেটা ওকে বলেছি। বাকিটা আমার ব্রো নিজের মতো করে সামলে নিয়েছে।ইনায়া ইউভির বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে মৃদু হেসে বলল তোমরা দুজন মিলে সত্যিই ইচ্ছের জন্য একটা পৃথিবী বানিয়ে ফেলেছ।ইউভি নিচের দিকে তাকিয়ে ইনায়ার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল।

ইচ্ছের জন্মদিনের অনুষ্ঠানটা সুন্দরভাবেই শেষ হলো। দীর্ঘ সময় ধরে চলা আনন্দ-উচ্ছ্বাস, হাসি-আড্ডা আর শুভেচ্ছার পর একে একে পরিবারের সব সদস্য ও আত্মীয়স্বজন খাবার টেবিলে এসে বসতে শুরু করলেন। ডাইনিং হলরুমটা তখনও উৎসবের আমেজে মুখর হয়ে আছে সবাই গল্প করতে করতে খাবার খাচ্ছে,।
খাওয়া-দাওয়ার একপর্যায়ে প্রণয়, রৌদিক আর তুর্য—তিনজন একসঙ্গে বসে ডেজার্ট খাচ্ছিল। ঠিক তখনই ছোট্ট ইচ্ছে সেখানে এসে দাঁড়াল। তার চোখ গিয়ে আটকাল প্রণয়ের হাতে থাকা ডেজার্টের দিকে। মিষ্টি কিছু দেখলেই যেন ইচ্ছের চোখ চকচক করে ওঠে ইচ্ছে প্রণয়ের কাছে গিয়ে মিষ্টি কণ্ঠে বলল,আমালে দাও না, ভাইয়া!প্রণয় সঙ্গে সঙ্গে পাশের একটা চেয়ার টেনে ইচ্ছেকে বসিয়ে দিল। তারপর নিজের হাতে ডেজার্ট তুলে তাকে খাওয়াতে খাওয়াতে একটু বিরক্তির ভান করে বলল।এত মানুষ থাকতে আমার কাছেই এসে খেতে হয় কেন, বল তো?
ইচ্ছে ডেজার্ট মুখে নিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর গাল ফুলিয়ে মিষ্টি স্বরে বলল মদা প্রণয় সঙ্গে সঙ্গে ভুরু কুঁচকে ইচ্ছের দিকে তাকিয়ে বললো আমার হাতেই খেতে তোর ভালো লাগে অনেক?

ইচ্ছে আবারও অস্পষ্ট স্বরে বলল।মোদা… অনেত মোদা ইচ্ছের কথাটা ঠিকমতো বুঝতে না পারলেও তার ভঙ্গিটা এতটাই মজার ছিল যে তুর্য আর রৌদিক দুজনেই একসঙ্গে হেসে উঠল। প্রণয়ও শেষ পর্যন্ত হেসে পারল না ঠিক তখনই তুর্যের চোখ চলে গেল কিছুটা দূরে বসে থাকা ইনায়া, পিয়াসা আর তুবার দিকে। তিনজনই বেশ আরাম করে বসে গল্প করতে করতে চকলেট খাচ্ছিল। তাদের দেখে তুর্য কিছু বলার আগেই প্রণয়ও সেদিকে তাকিয়ে
বলল দেখেছিস, তুর্য? তোর মা আমাদের কালকে কত বকাবকি করল! বলল, চকলেট খেলে দাঁতে পোকা হবে। আর এখন দেখ নিজেরাই বসে বসে চকলেট খাচ্ছে। ইচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে কথাটা শুনে চোখ বড় বড় করে বলল,দানো ভাইয়া! পাপা তো মাম্মামের দন্য চককেট এনে দেয় রাতে, কিন্তু মাম্মাম আমাকে দেয় না। লুকিয়ে থাই আমি দেখেতি।ইচ্ছের অভিযোগ শুনে প্রণয়, রৌদিক আর তুর্য তিনজনই একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল। তিনজন একসঙ্গে উঠে দাঁড়াল।প্রণয় ইচ্ছেকে কোলে তুলে নিল। রুদ্র আর তুর্যও তাদের পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করল। তিনজনই ছোট্ট ইচ্ছেকে নিয়ে দ্রুত এগিয়ে গেল ইনায়া, পিয়াসা আর তুবার দিকে।পেছন থেকে তুর্য একটু জোরে বলল মা! তোমরা চকলেট খাচ্ছ? তুর্যের প্রশ্ন শুনে ইনায়া, পিয়াসা আর তুবা তিনজনেই একসঙ্গে থেমে গেল। হাতে ধরা চকলেট আর মুখের হাসি দুটোই যেন মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।

তুবা আমতা আমতা করে বলল আমরা মোটেই চকলেট খাচ্ছি না। আমরা তো জাস্ট টেস্ট করে দেখছি চকলেটগুলো ভালো না খারাপ। এগুলো তো তোমাদের জন্যই খারাপ কিছু কি মা তোমাদের খেতে দিতে পারে?তুর্য আর প্রণয় বিষয়টা বুঝতে পেরে একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল ওহ্, তাই তো কী বুঝলে, চকলেটগুলো ভালো না, তাই না?পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,
হ্যাঁ, একটুও ভালো না। আমি তোমাদের জন্য বেস্ট চকলেট এনে দেব।ঠিক তখনই রিমঝিম খাবার নিয়ে খেতে খেতে সেখানে এসে বলল কখন থেকে তিনটায় শুধু চকলেটই খাচ্ছিস খাবার খাবি না? চল।

ইচ্ছে তখন ইনায়ার কাছে গিয়ে চারপাশে ঘুরঘুর করতে করতে অস্পষ্ট স্বরে বলল তকোলেট দিলে না, মাম্মাম!এই কথা বলেই কান্না করতে করতে ইউভির কাছে চলে গেল। পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে রিমঝিমকে ইশারা করে বলল কী বলো ফুপিমণি আমরা কই চকলেট খেলাম? আমরা তো জাস্ট টেস্ট করছি, তাই তো!রিমঝিমও বিষয়টা বুঝতে পেরে মুচকি হেসে বলল হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই তো! রৌদিক রিমঝিম কে জরিয়ে ধরে বললো মা বাবা আসে নি রিমঝিম ছেলেকে জরিয়ে ধরে বললো না বাবা আগামী কাল পিকনিক প্রোগ্রামে থাকবে। পিয়াসা বললো কিসের পিকনিক রিমঝিম পালটা উত্তর দিলো আগামী কাল আমরা পুরো চৌধুরী পরিবার পিকনিক এ যাব সঙ্গে তুবা রাজ্য তুর্য থাকবে।
লোকেশন ইচ্ছের বাড়ি কাল কেও অফিসে যাবে না।
ওদিকে ইচ্ছে ততক্ষণে ইউভির কাছে গিয়ে তার হাত ধরে টানতে শুরু করেছে। ছোট্ট মুখে কান্নার ছাপ নিয়ে সে বাবাকে টেনে বাইরে নিয়ে যেতে যেতে বলল,পাপা, আতো আততো পাপা!ইউভি সঙ্গে সঙ্গে মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে বলল, কী হয়েছে মা? আমাকে বলো। কান্না করছো কেন?

ইচ্ছে এবার বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বাড়ির বাইরে এসে বলল,বাইলে ঘুলতে যাবো।ইউভি মুচকি হেসে মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে বলল ওকে মা, ঠিক আছে। লেটস গো, মাই প্রিন্সেস।এরপর ইউভি ইচ্ছেকে কোলে নিয়েই বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেল। গাড়ি স্টার্ট দিতেই ইচ্ছে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে তার গালে চুমু খেতে খেতে আধো-ভাঙা কণ্ঠে অস্পষ্ট স্বরে বলল পাপা, মাম্মাম দুত্তু!ইউভি মুচকি হেসে বলল নো মা তোমার মাম্মাম বেস্ট। তোমার মা অনেক ভালো।ইচ্ছে বাবার বুকে মাথা রেখে চুপচাপ বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎই কিছুটা দূরে একটা দোকান দেখে তার চোখ চকচক করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে বাবার গলা জড়িয়ে উত্তেজিত স্বরে বলে উঠল পাপা, স্টপ পাপা!ইউভি সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। মেয়ের কথামতো তাকে কোলে নিয়েই নিচে নামল। আর নামতেই ইচ্ছে বাবার হাত শক্ত করে ধরে দোকানের দিকে তাকিয়ে বলল,তককেট, আইসকিম তিনে দাও!

ইউভি মুচকি হেসে মেয়ের জন্য চকলেট কিনে দিল। কিন্তু চকলেট হাতে পাওয়ার পরও ইচ্ছের আবদার যেন শেষ হলো না। সে এবার বায়না শুরু করে দিল,অনেক তিনে দাও না, পাপা। আমি তো তোমাল পিনতেত, পিনতেতকে অনেত চকলেট দিতে হয়!ইউভি এবার একটু হেসে হাঁটু গেড়ে মেয়ের সমান হয়ে বসে তার গাল দুটো আলতো করে ধরে বলল,মা, শোনো। চকলেট আর আইসক্রিম একসঙ্গে এত খেতে হয় না। কম কম খেতে হয়, বুঝেছো?ইচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে কান্নাভেজা চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল তুমি মাম্মামকে তককেট, আইচকিম তিনে দাও তেনো মা আমালে দেকে সব লুকাই দেয় না।
ইচ্ছের অভিযোগ শুনে ইউভি মুচকি হেসে বলল,

আচ্ছা, অনেক অনেক কিনে দেব। তবে রোজ একটা তুমি পাপাকে প্রমিস করো, বেশি খাবে না। আমরা রোজ রাতে এসে একটা করে কিনে খাব। মাম্মামকে দেব না।ইচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল, নো পাপা, দুইতা দিতে হবে!ইউভি কিছুক্ষণ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,এই মা-মেয়েকে নিয়ে আমি একদিন পাগল হয়ে যাব শেষ পর্যন্ত মেয়ের কাছেই হার মেনে ইউভি মুচকি হেসে বলল,ওকে, দুটো। এখন বাড়ি যেতে হবে, মা। চলো
গাড়ি ছাড়ার পর বেশ কিছুটা পথ পেরোতেই ক্লান্তিতে ছোট্ট ইচ্ছে বাবার বুকের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। ইউভি এক হাতে মেয়েটাকে বুকের সঙ্গে এমনভাবে আগলে রেখেছে, যেন সামান্য ঝাঁকুনিতেও তার ঘুম না ভাঙে।আর অন্য হাতে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে স্টিয়ারিং সামলাচ্ছে। গাড়ির গতি স্বাভাবিকের চেয়েও ধীর মাঝেমধ্যে রাস্তার দিকে চোখ রেখেই সে মেয়ের ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকাচ্ছে, তারপর অতি সাবধানে কপালে চুমু এঁকে দিচ্ছে। কতবার যে সেই ছোট্ট কপালে ভালোবাসার চুমু দিয়েছে, তার হিসাব বোধহয় ইউভি নিজেও জানে না। নিজের সমস্ত ব্যস্ততা, ক্লান্তি আর পৃথিবীর হাজারো চিন্তার মাঝেও এই ছোট্ট মানুষটাকে বুকের কাছে পেয়ে যেন তার মনটা অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে ভরে আছে।

কিছুক্ষণ পর গাড়ি এসে থামল চৌধুরী ভিলার সামনে। রাত অনেক গভীর হয়েছে বাড়ির প্রায় প্রতিটি সদস্যই ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু ইনায়া সোফায় বসে অধীর অপেক্ষায় ছিল। কিছুক্ষণ পর রেশমা চৌধুরীও এসে তার পাশে বসলেন। সে ও ছেলের জন্য অপেক্ষা করছে অপেক্ষায় থাকা দুজনের চোখই বারবার চলে যাচ্ছিল প্রধান দরজার দিকে। অবশেষে রেশমা মৃদু স্বরে বললেন, “এখনও তো ওরা আসেনি তোকে কিছু বলে গেছে ইনায়া মুখটা একটু ভার করে অভিমানী কণ্ঠে বলল না, বড়মা। এখন আর আমাকে কোথাও নিয়ে যায় না। আমার ভালোবাসার বুঝি এখন আর কোনো মূল্যই নেই, বুঝলে?
রেশমা চৌধুরী বললেন হুম, বাবা আর মেয়ে দুজনেই খুব বড় অন্যায় করে ফেলেছে দেখছি!”

ঠিক তখনই প্রধান দরজা দিয়ে ইউভি ছোট্ট ইচ্ছেকে কোলে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। মেয়েটা এতক্ষণ গভীর ঘুমে থাকলেও পরিচিত কণ্ঠ আর নড়াচড়ায় ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। ইউভি রেশমা চৌধুরী ও ইনায়ার কাছে এসে দাঁড়াতেই ইচ্ছের ঘুম পুরোপুরি ভেঙে গেল। ইউভি মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মায়াভরা কণ্ঠে বলল, “ঘুম ভেঙে গেল, মা? চলো রুমে চলো। এখন ঘুমাতে হবে।ইচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে বাবার বুক থেকে মুখ তুলে ইনায়ার দিকে তাকাল। তারপর মাথা নেড়ে শিশুসুলভ ভঙ্গিতে বলল নো, পাপা! আমি মাম্মার সাতে ঘুমাবো না। আমি দাদুভাই আর দাদুর সাথে ঘুমাবো!
কথাটা বলেই সে ইউভির বুক থেকে নেমে রেশমা চৌধুরীর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ইউভি কিছু বলতে যাবে, তার আগেই রেশমা হেসে বললেন ঠিক আছে, দাদু। চলো, আমার সাথেই চলো।রেশমার কোলে মাথা রেখে যেতে যেতে ইচ্ছে হঠাৎ পেছনে ফিরে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি অভিমানে বলল, “মাম্মার উপলে লাগ কলে আছে ইত্তে ইনায়া ঠোঁট চেপে হাসি সামলে বলল যাও। আমিও দেখি, তোমার মায়ের কাছে কতক্ষণ না এসে থাকতে পারো ইচ্ছে তখন আর দাঁড়াল না। দাদুর দিকে যাওয়ার পথে ছোট্ট হাত নেড়ে বলল আমি দাদুভাইয়ের সাতে ঘুমাবো। গুড নাইত পাপা-মাম্মা!

ইচ্ছে চলে যেতেই ইউভি সিঁড়ির দিকে তাকাল। তারপর ইনায়ার দিকে চোখ পড়তেই তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক চিলতে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। সে উপরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই বলল, “আদর, রুমে এসো। বড্ড ক্লান্ত লাগছে। ইনায়া কোনো উত্তর দিল না। একই জায়গায় বসে রইল। ইউভি কয়েক পা এগিয়ে আবার ফিরে তাকিয়ে বলল ওই আদর?এবার ইনায়া অভিমান ধরে রাখতে না পেরে মুখ ঘুরিয়ে রাগে চিৎকার করে বলল যাব না আমি আপনার সঙ্গে! আমিও আমার মায়ের সঙ্গে ঘুমাবো। এখন আমাকে কেন লাগবে আপনার? সারাদিন মেয়েকে নিয়ে ঘুরবেন, মেয়ের সঙ্গে থাকবেন, আর রাতে এসে আমাকে বলবেন আপনার সঙ্গে যেতে! আমি যাব না।কথাগুলো বলে ইনায়া উঠে নুসরাত চৌধুরীর ঘরের দিকে পা বাড়াতেই ইউভি দ্রুত তার কাছে গিয়ে এক ঝটকায় তাকে কোলে তুলে নিল। হঠাৎ এমনভাবে কোলে ওঠায় ইনায়া অবাক হয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরল।
ইউভি তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো
বেয়াদব কি আর সাধে বলি। কী বলিস এসব? সাহস অনেক হয়েছে। আমাকে ছাড়া রাত কাটাবি এমন কথা মুখেও আনবি না।ইনায়া অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল তুই করে বলছ কেন?

ইউভির মুখের হাসি মুহূর্তেই একটু গম্ভীর হলো। সে ইনায়াকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে বলল তোকে একদিন বলিনি? আমাকে ছাড়া একটা রাত থাকার কথাও ভাববি না। তুই আমার বউ, আদর। সারাদিন যতই অভিমান করিস যতই আমার ওপর রাগ দেখাস দিনের শেষে তোর জায়গাটা আমার বুকে তাই আমার সঙ্গে রাগ করে মায়ের ঘরে পালিয়ে যাওয়ার এই পরিকল্পনা মাথা থেকে বের করে দে। আমি তো রাগ করে বলেছি রাগ বোঝ তুমি? ইউভি তার কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে বলল রাগ করেছিস, কর। তোর রাগ ভাঙানোর দায়িত্বটাও তো আমারই। কিন্তু আমাকে ছেড়ে দূরে গিয়ে রাগ করার অনুমতি তোকে কে দিল, সেটা আগে বল?

ইনায়া আর কিছু বলতে পারল না। অভিমানী মুখটা ইউভির কাঁধের কাছে লুকিয়ে ফেলল। ইউভি ইনায়া কে আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।ঘরের ভেতরে ঢুকতেই ইউভি আর এক মুহূর্তও দেরি করল না ইনায়াকে বিছানার ওপর ফেলে দিতেই সে মৃদু স্বরে বলে উঠল
আআাআআআ।পরক্ষণেই অভিমানী চোখে ইউভির দিকে তাকিয়ে বলল অসভ্য লোক একটা! এভাবে কেউ কাউকে বিছানায় ছুড়ে ফেলে?।ইউভি কোটটা খুলে পাশে রেখে শার্টের দুটো বোতাম আলগা করে বিছানার দিকে এগিয়ে এলো। ঠোঁটের কোণে ফুটে
উঠল সেই চেনা দুষ্টু হাসি। তারপর ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,মাঝেমধ্যে তোমার মুখ থেকে ওই স্বরবর্ণ শব্দগুলো শুনতে বেশ ইচ্ছে করে। তাই একটু জোরে ছুড়ে ফেললাম। এই একটা কায়দাতেই তো তোমার মুখ থেকে আমার পছন্দের শব্দটা বের করানো যায়। ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে কোমর সোজা করে উঠে বসে বিরক্ত চোখে তাকাল। তারপর ভ্রু কুঁচকে বলল,একদম ওইভাবে তাকাবেন না, আর হাসবেনও না। আমি কখন স্বরবর্ণ বললাম? আজব মানুষ একটা!ইউভি এবার মৃদু হেসে ঘড়িটা খুলতে খুলতে ধীর পায়ে তার কাছে এগিয়ে গেল। চোখে-মুখে তার তখন স্পষ্ট দুষ্টুমি। বিছানার একেবারে কাছে এসে নিচু স্বরে বলল,

মনে করে দেখো তো, আদর। তোমাকে বিছানায় ফেলার পর প্রথম কোন শব্দটা তোমার মুখ থেকে বের হয়েছে?
ইনায়া কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ নিজের কথাটা মনে পড়তেই মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। ইউভির দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।ইউভি সেই দৃশ্য দেখে মৃদু হেসে বলল এই তো! এখন চুপ করে গেলে কেন? ইনায়া রাগী চোখে ইউভির দিকে তাকিয়ে বলল বুড়ো হয়ে গেছেন আপনি! এই বয়সেও এসব কথা মানায় নাকি, মিস্টার চৌধুরী? কিছুদিন পর মেয়ে বিয়ে দিতে হবে আর আপনি এখনো নিজেকে পরিবর্তন করছেন না। আপনি আর আগের সেই কচি খোকাটি নেই।ইনায়ার কথা শুনে ইউভি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল রহস্যময় এক হাসি। এগিয়ে আসতে আসতে শার্টের বোতামগুলো একে একে খুলতে খুলতে গম্ভীর স্বরে বললো সে দ্য লাইন এগেইন এগেইন সুইটহার্ট।ইনায়া আমতা আমতা করে বলল,তো কী?
ইউভি আর কোনো কথা না বলে শার্টটা খুলে মেঝেতে ছুড়ে ফেলল। ইউভির এমন দৃষ্টিতে ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল। মনে মনে সে নিজেকেই বকতে লাগল,

এই রে! বনের সিংহটাকে খেপিয়ে ফেলেছি! রে ইনায়া্য়ায়া রে! আজ তো তুই শেষ! কে বলেছিল ইউভিকে বুড়ো বলতে! তবুও মুখে ভয়ের ছাপ না এনে ইনায়া বলল আর এগোবেন না মিস্টার চৌধুরী। বেশি এগোলে কিন্তু জ্বলে-পুড়ে শেষ হয়ে যাবেন!ইউভির ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও গাঢ় হলো। সে ধীরে ধীরে ইনায়ার আরও কাছে এগিয়ে এসে তার চুলের একগুচ্ছ আলতো করে মুঠোয় নিল। এক টানে তাকে নিজের কাছে টেনে এনে তার ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে দিয়ে ভারী মায়ামাখা স্বরে বলল জ্বলব না সুইট হার্ট জ্বালাব। আমাকে বুড়ো বলার প্রতিটা হিসাব নিতে হবে যে। বড় সাহস বেড়েছে তোর! একটু বেশি ভালোবাসি বলে মুখে যা আসে তাই বলে ফেলিস, তাই না? ইউভি আরও একটু কাছে এসে মৃদু স্বরে বলল আমার আত্মসম্মানে আঘাত করেছিস সুইট হার্ট কীভাবে বুঝলি বল তো আমি বুড়ো হয়ে গেছি? ইনায়া ইউভির কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে অভিমানের সুরে বলল বড্ড অসভ্য তুমি, বর!”

ইউভি ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে মুচকি হেসে বলল তুমিও যে বড্ড বেয়াদব বউ।
ইনায়া দ্রুত বারান্দার দিকে চলে যেতে চাইতেই ইউভি ঘরের সব আলো নিভিয়ে দিল। হঠাৎ চারপাশ অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় ইনায়া কিছুটা ভয় পেয়ে কাঁপা গলায় বলল, “কী হলো?” কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ইউভি তার কাছে পৌঁছে তাকে আলতো করে নিজের বাহুডোরে টেনে নিল। অন্ধকার ঘরে তার কণ্ঠ ভেসে এলো আমার আলো লাগবে না, বউ।”
তারপর ইনায়াকে কোলে তুলে বারান্দায় নিয়ে গিয়ে সোফার ওপর ছুরে দিয়ে ইউভি নিচু স্বরে বলল আরেকবার বলো তো তুমি বুরো হয়ে গেছ।ইনায়া কাঁপা কাপা কণ্ঠে বলল সরি বর, ভুল করে বলে ফেলেছি। সরি। ইউভি চাপা হাসি দিয়ে তাকে শান্ত করার ভঙ্গিতে বলল চুপ। আদর এত কাঁপাকাঁপি করে না।ইনায়া হার না মেনে ইউভির বুকের কাছে মাথা রেখে নরম স্বরে বলল সরি তো বলে দিয়েছি। এখানেই থেমে যাও।ইউভি তাকে আরও শক্ত করে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলল প্রশ্নই আসে না। বড্ড দেরি হয়ে গেছে। কথাটা শেষ করেই সে আবার ইনায়ার কপালে ভালোবাসার স্পর্শ রেখে তাকে আরও কাছে টেনে নিল।

ইনায়া চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল, তোমাকে জ্বালাতে গিয়ে আমি যে জ্বলে-পুড়ে শেষ হয়ে যাই, বর। ইউভি মুচকি হেসে বলল জ্বলছো বুঝি? ইনায়া ফিসফিস করে বলল কেন বুঝতে পারছো না?ইনায়ার মনের কথাটা বুঝতে পেরে ইউভির ঠোঁটে ফুটে উঠল দুষ্টু এক হাসি। সে আদুরে স্বরে বলল মিসেস চৌধুরী। ইনায়া কোনো উত্তর না দিয়ে লজ্জায় মুখ লুকিয়ে নিল ইউভির বুকে। ইউভিও তাকে ভালোবাসায় নিজের কাছে আগলে রাখল। দুজনের নীরবতার মাঝেও যেন অসংখ্য না-বলা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। ইনায়া ইউভির মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে আরও কাছে টেনে নিল ।ইউভি ধীরে ধীরে ইনায়ার ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে তার পরিচিত মিষ্টি সুবাসটা গভীরভাবে অনুভব করতে লাগল। সেই পরিচিত ঘ্রাণে যেন মুহূর্তেই তার সমস্ত অস্থিরতা শান্ত হয়ে এলো। ইনায়া লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ইউভির মাথাটা আলতো করে নিজের কাছে টেনে নিল। কিছুক্ষণ পর ইউভি মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ইনায়ার ঠোঁটে ভালোবাসার একটি কোমল চুম্বন এঁকে দিল। ইনায়াও চোখ বন্ধ করে সেই ভালোবাসার মুহূর্তটুকু নীরবে অনুভব করল।ইউভির ভালোবাসা ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে উঠতে লাগল। একসময় ইনায়ার চুলের বাঁধন আলতো করে খুলে দিল সে।

বাঁধনমুক্ত চুলগুলো ছড়িয়ে পড়ল তার কাঁধজুড়ে। ইউভি সযত্নে সেই চুলগুলো একপাশে সরিয়ে ইনায়ার ঘাড় ও পিঠে ভালোবাসার কোমল স্পর্শ চিহ্ন রেখে দিল। ইনায়া নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করে সেই মুহূর্তটুকু অনুভব করতে লাগল। দুজনের মাঝের দূরত্ব ক্রমেই মিলিয়ে যেতে লাগল চারপাশের নীরবতা হয়ে উঠল তাদের ভালোবাসার নীরব সাক্ষী।রাতের নীরবতা আরও গভীর হয়ে এলো। ইউভির ভালোবাসার স্পর্শে ইনায়ার সমস্ত অভিমান ধীরে ধীরে গলে যেতে লাগল। দুজনেই যেন সেই মুহূর্তে একে অপরের ভালোবাসায় সম্পূর্ণভাবে ডুবে গেল। ইউভি সযত্নে ইনায়াকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল ইনায়া লজ্জাইচোখ বন্ধ করে তার বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে রইল। তাদের মাঝে আর কোনো কথার প্রয়োজন রইল না নিঃশব্দ স্পর্শ আর গভীর অনুভূতিই যেন হয়ে উঠল তাদের ভাষা।
সময়ের সঙ্গে সেই ভালোবাসা আরও নিবিড় হয়ে উঠল। একে অপরকে জড়িয়ে তারা হারিয়ে গেল নিজেদের ছোট্ট পৃথিবীতে।ইনায়া মৃদু কাঁপা হাতে ইউভিকে আঁকড়ে ধরে রইল ইউভি তাকে পরম যত্নে আগলে রাখল।

মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। চারপাশ নিস্তব্ধ, জানালার ফাঁক গলে আসা মৃদু জ্যোৎস্না নীরবতাকে আরও মায়াবী করে তুলেছে। ইনায়া ইউভির বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে আছে। ইউভি একহাতে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে রেখে অন্যহাতে ধীরে ধীরে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ইউভি নিচু স্বরে বলল আদর
“হুম…

শেহেজাদার আদর পর্ব ৮৩

তোমাকে পাওয়ার তৃষ্ণাটা যেন তোমাকে পাওয়ার পরেই আরও বেড়ে যায়। তোমাকে পাওয়ার পরও তোমাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাটা কখনো শেষ হয় না আদর ইনায়া মৃদু হেসে মুখটা আরও ইউভির বুকেগুঁজে দিল তার বুকে। তারপর নরম স্বরে বলল,এটাকে কী বলবে তুমি? ইউভি একটুও দেরি না করে বলল ভালোবাসা।ইনায়া মুচকি হেসে বলল পাগলামি। ইউভি তার কপালে আলতো করে চুমু এঁকে মৃদু হেসে বলল তোমার জন্য এই পাগলামিটুকু সারাজীবন করতে রাজি আছি।

শেহেজাদার আদর শেষ পর্ব