Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬০ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬০ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬০ (২)
jannatul firdaus mithila

“স্ত্রী হয় আমার! কোনো যেন-তেন দু’পয়সার মেয়ে নয়—অধীর রায়ের অর্ধাঙ্গিনী হয় ও। সো, কল হার মিসেস অধীর রায়!”
রূঢ় মানবের কণ্ঠে উচ্চারিত প্রতিটি তীক্ষ্ণ বাক্য যেন এখনও বাতাসের বুকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। উপস্থিত হতভম্ব দর্শকদের কর্ণকুহরে বড্ড তীক্ষ্ণতার সনে বিঁধে যাচ্ছে সেই শব্দগুলো। সকলের বিস্ফারিত দৃষ্টিগুলো স্থির হয়ে আছে ক্ষুব্ধ সুদর্শনের ওপর। খানিকটা দুরত্বে এলোমেলো ভঙ্গিতে পড়ে আছেন মধ্যবয়স্ক হিমাংশু রায়, তাও আবার এক বলিষ্ঠ নিথর দেহের ভারে প্রায় পিষ্ট অবস্থায়! যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেছে তাঁর মুখাবয়ব। সামান্য নড়াচড়ার শক্তিটুকুও যে কোথায় হারালো, তা কে জানে!

অপরদিকে, অদূরের তকতকে মেঝেতে বসে আছে অষ্টাদশী নিরু। ঘটনাপ্রবাহে স্তব্ধ সে, বিধ্বস্ত হয়েছে রূঢ় মানবের তীক্ষ্ণ বাক্যবাণে। দৃষ্টিতে নেমেছে দিকভ্রান্ততা।মুখাবয়বে জমেছে এক অদ্ভুত শূন্যতা। বুকের গভীরে যেন তোলপাড় তুলে ছুটছে কোনো অদৃশ্য ঝড়। নরম হৃদয়খানা ক্রমশ চৌচির হয়ে যাচ্ছে অসহনীয় এক ব্যথায়। সেই ব্যথার অভিঘাতে চোখের কোণ দুটো ভিজে উঠছে তাঁর। ক্ষুদ্র বদন কাঁপছে অবিরত! কী শুনল সে?অধীর দা… বিবাহিত? সত্যিই কি অন্য কারো নামে নিজেকে লিখে দিয়েছে এই মানুষটা? তবে কী সে শূন্য? অষ্টাদশী শূন্য? তাহলে… তার এতগুলো দিনের অপেক্ষার কী হলো? তাঁর বাঁধহীন ভালোবাসা, অকল্পনীয় আকুলতা — সবকিছুরই কি কোনো মূল্য রইলো না? যে বেখেয়ালি পুরুষের অপেক্ষায় এতকাল রাঙিয়েছে নিজ সিঁথি, তারই বা মূল্য রইলো কোথায়? নিরু নিস্তব্ধ! ঝাপসা চোখদুটো তাঁর কেবল চাতকের ন্যায় স্থির হয়ে রইলো অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা ক্ষুব্ধ পুরুষটির মুখপানে। তার অপেক্ষায় কি তবে কোনো কমতি ছিল? বিধাতা যেহেতু হাতের তালুতে এত এত রেখা এঁকে দিয়েছেন, তবে সেই রেখাগুলোর কোনো একটিতে কেন লিখে দিলো না — ‘অধীর রায়ের ’ নাম? কেনো?

নিজ অভ্যন্তরে উত্থাপিত এরূপ প্রশ্নের উত্তরে হাসফাস বাড়লো নিরুর। অন্তঃকোণের যন্ত্রণায় জর্জরিত সে, নিঃশ্বাস ক্রমশ ভারী হয়ে উঠল কেমন। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা নির্দয় পুরুষটি এখনো ক্রোধে ফুঁসছে। ক্ষুব্ধ বাঘের মতো গর্জে উঠে, দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো পড়ে থাকা হিমাংশু রায়ের দিকে। মেরুদণ্ড সামান্য বাঁকিয়ে শক্ত হাতের মুঠোয় আচানক আঁকড়ে ধরল হিমাংশু রায়ের ওপর পড়ে থাকা নিথর দেহটা। অতঃপর প্রচণ্ড আক্রোশে প্রাণ হীন লোকটাকে ছুড়ে দিল কয়েক হাত দূরে! এদিকে, বুকের ওপর থেকে ওমন ভারী ওজনের মানুষটা সরে যেতেই প্রাণপণে শ্বাস টেনে নিজেকে সামলে নেওয়ার প্রয়াস চালালেন হিমাংশু রায়। কিন্তু সেই প্রয়াসটুকুও যেন বেচারার ভাগ্যে সইলো না। মুহুর্তব্যয়েই তাঁর বুক বরাবর এসে আছড়ে পড়ল মুগ্ধের এক প্রকান্ড লাথি। এরূপ জোরালো আঘাতের অভিঘাতে মধ্যবয়স্কের মুখগহ্বর হতে তৎক্ষনাৎ ছিটকে বেরিয়ে এলো লোহু। দুর্বল হয়ে এলো দেহখানা। চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ল এক অসহায় যন্ত্রণার ছাপ। তাতে অবশ্য রূঢ় মানবের ক্রোধে তেমন একটা ভাবান্তর হলো না! উল্টো জোর বাড়ালো পায়ের। কণ্ঠনালীর ওপর চাপ বাড়তেই আটকে গেল আহতের নিঃশ্বাস। অসহায় গোঙানিতে কেঁপে উঠল চারপাশ। রূঢ় মানব দাঁতে দাঁত চেপে হুংকার ছুড়ঁল—

“কী বলেছিস? আরেকবার বল, কু** বাচ্চা! কে যেন-তেন দু’পয়সার মেয়ে? কে? আবার বল, বাস্টার্ড! আবার বল!”
শ্বাস নেওয়াই যেখানে দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে বেচারা হিমাংশু রায়ের জন্য, সেখানে কথা বলা যেন অসম্ভবের নামান্তর! হিমাংশু রায় কাতরাচ্ছেন। লহুতে রঞ্জিত হাতদুটো দিয়ে মেঝেতে আঘাত করছেন বারংবার। মুগ্ধ ছাড়লো না তাকে। পায়ের জোরে পিষে ফেলতে চাইছে আহতের কন্ঠা! ঠিক তখনি, দু’হাত দুরত্ব হতে ছুটে এলো নিরু। তাও আবার বাচ্চাদের ন্যায় হামাগুড়ি দিয়ে। এসেই কেমন দু’হাতে আঁকড়ে ধরল রূঢ় মানবের পাদু’টো। বুকভাঙা কাতর আর্তনাদে বাবাকে বাঁচাতে অনুনয় জুড়লো রমণী! আওড়াল —

“ ভগবানের দোহাই অধীর দা! বাবাকে ছেড়ে দিন। উনি ম’রে যাবে তো। আপনার… আপনার মা’রতে হলে আমায় মা’রুন, মা’রতে মা’রতে মে’রেই ফেলুন আমায়। আমি কিচ্ছু বলব না অধীর দা। তবুও আমার বাবাকে ছেড়ে দিন।”
কথাটা বলতে দেরি, রূঢ় মানবের রুষ্ট হাতের আক্রমণ এসে হামলে পড়তে দেরি হলো না মেয়েটার ওপর! শক্তপোক্ত হাতখানা তাঁর মুহুর্তেই আঁকড়ে ধরল অষ্টাদশীর নরম চুলের গোছা। ওমনি চুলের ব্যথায় ককিয়ে ওঠে নিরু! ক্ষ্যাপাটে মানব ধীরলয়ে জোর বাড়ালেন হাতের। মেয়েটাকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে উঠিয়ে দাঁড় করালেন কোনমতে। কাতর রমণীর পেলব মুখখানার পানে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে চিড়বিড়িয়ে শুধালেন,
“ তুই না বললেও তুই আজ ম*রবি কু**বাচ্চা! আমার স্ত্রীর গায়ে হাত তুলেছিস তাই তো? মিসেস অধীর রায়ের গায়ে হাত তুলেছিস? এতবড় স্পর্ধা দেখাতে গেলি কোন সাহসে জার*জের বাচ্চা? আমার বাড়ির সামান্য চাকরের মেয়ে হয়ে, আমার রাণীর গায়ে হাত তুলেছিস কোন সাহসে?”

রূঢ় মানবের শেষবাক্যটুকু ঠোঁটের ডগা পেরুনোর পূর্বেই, তার রুক্ষ হাতের রুষ্ট চাপড়ে পিষ্ট হলো নিরুর নরম তুলতুলে গাল! এরূপ জোরালো থাপ্পড়ের অভিঘাতে তাল সইতে না পেরে মুহুর্তেই অদূরের মেঝেতে ছিটকে পড়ল অষ্টাদশী! মাথাটা ভনভন করছে তার। গাল জ্বলে যাচ্ছে ব্যথায়। মুখগহ্বরে স্পষ্ট স্বাদ পাচ্ছে ক্ষারীয় কিছুর। সন্দিগ্ধ রমণী ত্বরিত আঙুলের ডগা উঁচিয়ে আলতো করে ছুঁতে চাইলো নিজ আহত ওষ্ঠপুটের কার্নিশ, তবে তা আর হলো কই? তার পূর্বেই নির্দয় মাফিয়া বিস্ট এগিয়ে এসে ফের খামচে ধরল মেয়েটার নরম ঘাড়ের ত্বক। মুহুর্তেই তার আগ্রাসী নখরগুলো দেবে গেল বেচারির মসৃণ ঘাড়ের ত্বকে! অধরের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো কয়েক টুকরো ব্যথাতুর ধ্বনি। নির্দয় নিজের হিং স্রতায় মত্ত হলো ফের। অষ্টাদশীর ঘাড় আঁকড়ে তাকে ফের ছুঁড়ে ফেলল সম্মুখে। এবার যেন ক্ষুদ্র বদনে বড্ড চোট পেলো নিরু! উঠতে গিয়েও হোঁচট খেলো বারকয়েক। তন্মধ্যে ক্ষিপ্র কদমে এগিয়ে এসেছে রূঢ় মানব। ব্যস্ত হাতে কোমর হতে চামড়ার বেল্টটা একটানে খুলে আনলো সে। তা দেখেই অদূর মেঝেতে পড়ে থাকা হিমাংশু রায় কেমন আঁতকে উঠলেন। নিবুনিবু চোখে মেয়ের পানে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, দূর্বল হাত উঁচিয়ে ভাঙা কন্ঠে শুধালেন,

“ ন-না অধীর! ওকে মে-মেরো না।”
কে শোনে কার কথা! হিং স্র, নির্দয় মাফিয়া মনস্টার আদোও কোনোদিন শুনেছে কারো কথা? যে আজ শুনবে? সে যে আজ বড্ড ক্ষিপ্ত! ক্ষিপ্রতার সনে চামড়ার বেল্টের একের পর এক রুষ্ট আঘাতে পিষ্ট করতে লাগলো অষ্টাদশীর নরম তুলতুলে বদন। সহসা পুরো অন্দরমহল কেঁপে উঠতে লাগলো নিরুর অসহনীয় যন্ত্রণার আর্তনাদে। কাঁপতে লাগলো খানিকদূরে অনুভূতিশূন্য ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকা আহত সপ্তদশী! বোকা মানবী কাঁদছে এবার। কাঁপছে তার ক্ষুদ্র তনু। চোখের সামনে রূঢ় মানবের সে-ই পুরনো হিং স্র কর্মকাণ্ডগুলো আরেকবার দৃশ্যমান হতেই অন্তরাত্মাসহ ডুকরে উঠছে তার! দূর্বল পাদু’টো তাঁর ভর সইতে না পেরে তক্ষুনি টলতে লাগলো কেমন। তবে রমণীর শরীরে বড্ড জোর। সে-ই জোরে আগালো পা। কম্পিত কদমে খানিকবাদে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো ক্ষিপ্ত রূঢ় মানবের ঠিক পেছনে। কাঁপা কাঁপা ডানহাতটা আলগোছে বাড়িয়ে টেনে ধরল মুগ্ধের টি-শার্টের এককোণ। সহসা নিজ পৈ শা চি ক কর্মে হুটহাট বিরতি পেয়ে মাথায় র ক্ত উঠে গেল রূঢ় মানবের। আগের চেয়েও দ্বিগুণ রাগান্বিত ভাবস্রোতে ঘাড় বাকিয়ে যে-ই না গর্জন তুলবে ওমনি দৃশ্যপটের সম্মুখে আদুরে সপ্তদশীকে ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে থমকায় মুগ্ধ! থমকায় তার সকল পৈ শা চি ক কর্মকান্ড। সে মুহুর্তেই পাল্টে নিলো নিজ রং। নিরুর প্রতি যতটা ক্ষিপ্রতা প্রকাশ করেছে, তারচেয়েও দ্বিগুণ কোমলতা দেখিয়ে তৎক্ষনাৎ একহাতে আগলে নিলো মাহি’কে। আঁকড়ে ধরল রমণীর মেদহীন বাঁকানো কোমর! আহত সপ্তদশীর ঝাপ্সা চোখদুটো মুগ্ধের পানে নিবদ্ধ। ক্ষনে ক্ষনে গিলছে ঢোক! কালসিটে দাগ বসে যাওয়া অধর দু’টো নাড়িয়ে যে-ইনা কিছু আওড়াবে তার পূর্বেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো মুগ্ধের জোরপূর্বক শীতল কন্ঠ!

“ হেই! আমার চড়ুই ভয় পাচ্ছে? কই দেখি দেখি! তাকা তো। খবরদার ভয় পাবি না! আমি আছি না? আমি থাকতে ভয় কিসের? যা, ওদিকে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাক। যা।”
রমণীর কন্ঠভর্তি বাক্য! তবে আওড়ানোর সুযোগের অভাবে গিলতে হচ্ছে অনিচ্ছা সত্ত্বেও। মুগ্ধ নিজ বাক্য শেষ করে ত্বরিত ছেড়ে দিলো রমণীর কোমর। শক্তমুখে আদেশের স্বরে ফের বললো,
“ গো!”
মাহি কদম পেছালো! মুগ্ধ ততক্ষণে ফের ঘুরে দাঁড়ালো র ক্তা ক্ত নিরুর পানে। মেয়েটার বদন ভর্তি কালসিটে দাগ। ক্ষিপ্ত আঁচড়ে চামড়া ফেটে চৌচির হয়েছে বেশকিছু জায়গায়। তাতেও যেন মন ভরলো রাক্ষুসে লোকটার! তিনি ফের বেল্ট উঁচালেন নিরুর ওপর। তবে এবারের জোরালো আঘাতটুকু অষ্টাদশীর গা স্পর্শ করার পূর্বেই কয়েক হাত দুরত্ব হতে ভেসে এলো হিমাংশু রায়ের ভাঙা ভাঙা কন্ঠ!

“ থেমে যা অধীর! নয়তো আমি এক্ষুণি এই মেয়ের গলা কে-টে দিবো।”
সহসা থেমে গেল মুগ্ধের ব্যস্ত হাত। দৈবাৎ শক্তিতে পরপরই কাত হলো বলিষ্ঠ ঘাড়টা! তীক্ষ্ণ, কুটিল দৃষ্টিজোড়া একত্রে হিমাংশু রায়ের পানে তাক হতেই তটস্থ হলেন মধ্যবয়স্ক। ত্বরিত সপ্তদশী’র কন্ঠা বরাবর ঠেকিয়ে রাখা ধারালো চা কু টা জোরপূর্বক আরেকটু দাবিয়ে বসলেন তিনি। তক্ষুনি সটান হয়ে গেল মাহি! অনুভুতিশূন্য দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে রইলো অদূরের রূঢ় মানবের পানে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বর্বর হিমাংশু রায়, প্রস্তুতি নিচ্ছে যেকোনো সময় রমণীর কন্ঠা বরাবর ছু রি বসাবার! তা দেখে ঠোঁট পিষে হাসল রূঢ় মানব। কি ভয়ংকর সে হাসি! এহেন হাসি অবলোকন হওয়া মাত্রই অভ্যন্তরে কেঁপে উঠলেন হিমাংশু রায়। কম্পিত কণ্ঠে আওড়ালেন,
“ আমার মেয়েকে ছেড়ে দে অধীর! নাহলে আমি সত্যি ওকে মে’রে দিবো।”
কথাটা আওড়াতে দেরি, সম্মুখ হতে রূঢ় মানবের হুংকার ছুঁড়তে দেরি হলো না যেন! সে কেমন ত্রস্ত ঘুরে দাঁড়াল হিমাংশু রায়ের পানে। চোয়ালের পেশি টানটান করে নিয়ে গর্জে বলল,
“ মা’রবি? মা’র! আরে মা’র না’রে কু**বাচ্চা। মা’র, মার! দেখি তোর কলিজা কতবড় হয়েছে, দেখি। আমার ডোডোর একবেলার নাস্তা হবে কি-না দেখি!”

এহেন বাক্য কর্ণধার হতেই অন্দরমহলের আদ্যপ্রান্তে বিছিয়ে রাখা, নরম গদির কেদারায় বসে থাকা বৃদ্ধ কেমন বাঁকা হাসলো! এতক্ষণ নিরব দর্শকের ন্যায় চা খেতে খেতে সবটা উপভোগ করলেও, এবার যেন চুপ করে থাকতে পারলেন না তিনি। মুহুর্তেই পায়ের ওপর তুলে রাখা পা-টা সামান্য নাচিয়ে শ্লেষাত্মক কন্ঠে বলে উঠল,
“ আবে বেহেন**দ হিমাংসু! তুনে ইয়ে কেয়া মাল বানায়া হ্যায় বে? এ তো আভি তুঝপার হি ভারি পড় রাহা হ্যায়। ইতনা বেকাবু হ্যায় — কি কিসিকো মানতা হি নেহি। ক্যা চিজ বানায়া হ্যায়, মাইরি! তুঝে তো পেহলে হি মা’র দে না চাহিয়ে থা বেহেন***! আভি ভুগত।”
( আবে বেহে**দ হিমাংশু! তুই এ কী মাল বানিয়েছিস রে? এটা তো এখন তোর ওপরই ভারী পড়ে যাচ্ছে। এতটাই বেপরোয়া যে কাউকেই মানে না। কী জিনিস বানিয়েছিস, মাইরি! তোকে তো আগেই মেরে ফেলা উচিত ছিল, বে***দ! এখন ভুগ।)

বলেই বৃদ্ধ ফের মনোনিবেশ করলেন চা-টুকু সম্পূর্ণ করতে। ওদিকে হিমাংশু রায় অভ্যন্তরে ভীষণ ঘাবড়ালেও, বাইরে থেকে বেশ কঠোর! চারপাশের ওমন তাচ্ছিল্যভরা বাণী কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই চোয়াল শক্ত হয়ে গেল তার। রূঢ় মানবের পানে চেয়ে দাঁত খিঁচে শুধালো,
“ রুশদী! লুক!”
তক্ষুনি রমণীর কন্ঠনালীর মসৃণ চামড়ায় তীক্ষ্ণ অস্ত্রের স্পর্শ বসাতে চাইলেন হিমাংশু রায়। তবে ঠিক তখনি, পেছন থেকে একখানা শক্তপোক্ত হাত এসে মুহুর্তেই পেঁচিয়ে ধরল হিমাংশু রায়ের কন্ঠা! অন্যহাত খানা তাঁর, রুক্ষতার সনে খামচে ধরল মধ্যবয়স্কের অস্ত্র ধরে রাখা হাতটা। এহেন ঘটনার আকস্মিকতায় ভড়কায় হিমাংশু রায়। ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকাতে উদ্যোত হলেই কন্ঠা বরাবর চেপে রাখা হাতটা জোর বাড়ালো নিজের। কানের কাছে কেউ একজন কটমটিয়ে বলল —
“ রুশদী’র সিগনোরাকে মে’রে দেয়া এতো সহজ? তাও আবার এডউইন বেঁচে থাকতে? ওহহো! বুইড়া ভাম বলে কি?”

তৎক্ষনাৎ থমকে গেলেন হিমাংশু রায়! চিনে গেলেন পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে। সাপের ন্যায় মোচড়াতে চাইলেন তিনি, তবে পারলেন না এডউইনের বলিষ্ঠ জোরের সঙ্গে। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা রুশদী এবার বাঁকা হাসলো। দু’হাত কোমরে ঠেকিয়ে গমগমে গলায় শুধালো,
“ এডউইন! চিতা রেডি কর। একসঙ্গে ৩টা!”
আঁতকে উঠেন হিমাংশু রায়! ভয়ার্ত ঢোক গিলে অধর নাড়াবে তার পূর্বেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো এডউইনের বাধ্য কন্ঠ!
“ ইয়েস মনস্তার!”
থামলো মুগ্ধ! একমুহূর্তে স্থবির হয়ে আলগোছে দৃষ্টি তুলে তাকালো কয়েকহাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা মায়াবিনীর পানে। গম্ভীর মুখাবয়বে দু’টো কদম সম্মুখে অগ্রসর হতেই আচমকা হকচকিয়ে ওঠে মাহি। দৃষ্টিযুগলে ভয়ার্ত আবহ ঢেলে, হতচকিত কন্ঠে ত্বরিত চিৎকার দিয়ে ওঠে,
“ বিস্ট!”
মানবীর বাক্য শেষ হবার পূর্বেই রূঢ় মানবের বাহাতটা আলগোছে দক্ষ কৌশলীর ন্যায় ঘুরে গেল পেছনে। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রতিহত করলো পেছন থেকে আগত আক্রমণকে। মাহি ভড়কায়! হতচকিত দৃষ্টিতে তাকাতেই দেখে — মুগ্ধের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে অচেনা বৃদ্ধটি। যার একহাতে ধরে রাখা একখানা ওয়াকিং-স্টিক, যার সরু ডগা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ! ঠিক যেন কোনো এক ধারালো অস্ত্র। আলোর ছিটেফোঁটা যার গা স্পর্শ করতেই চকচক করছে কেমন। তবে তা স্পর্শ করতে পারেনি রূঢ় মানবের গা। তার আগেই ধারালো স্টিকের অংশটা হাতের মুঠোয় চেপে ধরেছে সে।
এদিকে, বৃদ্ধ বড্ড অসন্তুষ্ট রুশদীর এরূপ কান্ডে! দাঁড়ি-গোফভর্তি মুখখানায় এক আকাশসম বিরক্তি লেপ্টে, তিক্ত কন্ঠে আওড়ালেন,

“ আবে ক্যায়া ইয়ার! এক ভার তো বানতা হ্যা না?”
বলেই তিনি নিজ লাঠির শেষ ডগায় একখানা সুইচে আঙুল চাপলেন। তক্ষুনি মুগ্ধের শক্তপোক্ত হাতখানা সাক্ষাৎ পেলো বিশাল এক বিদ্যুৎস্পৃষ্টের সনে। মুহুর্তেই রূঢ় মানবের পাহাড়সম দেহটা কেমন কেঁপে উঠল দেখো! এই সুযোগে কুটিল হাসলেন বৃদ্ধ। তৎক্ষনাৎ নিজ জোরালো শক্তিতে সজোরে টেনে নিলেন লাঠিটা। পরমুহূর্তেই সামান্য কম্পিত রূঢ় মানবের রুক্ষ পিঠে বসালেন এক শক্ত লাথি। কিন্তু বালাইষাট! সে-ই লাথির অভিঘাতে পাহাড়সম বলিষ্ঠ পুরুষ টললো তো না-ই, তবে বৃদ্ধ কেমন ছিটকে গেল দু-কদম দুরত্বে! মুহুর্ত ব্যয়ে নিজেকে কোনমতে সামলে নিয়ে তাকালো সম্মুখে। দাঁত খিঁচে আওড়াল,

“ কিয়া খাতা হ্যা রে তু মাদারদোচ?”
মুগ্ধ দাঁত খিঁচল এবার! আকাশ ছুঁই ছুঁই রাগের বশে হাতদুটো করে নিলো মুষ্টিবদ্ধ। ত্রস্ত শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়াতেই আচমকা তার বুকের ঠিক বাঁপাশে লাঠির তীক্ষ্ণ ডগা চেপে ধরলেন বৃদ্ধ! মুগ্ধ টললো না। শক্তমুখে একবার তাকালো নিজ বুকের দিকে। সেখান থেকে লহু গড়াচ্ছে ধীরলয়ে! ক্ষত হচ্ছে গাঢ়। বৃদ্ধের মুখভঙ্গি পাল্টে গেল এবার। রাগে হারালো হিতাহিত জ্ঞান! আচমকা গর্জে উঠে বলল,
“ মাদারদোচ! যেই ভুলের কারণে তোর মা হারিয়েছিল নিজ জাত-কূল, সে-ই একই ভুল আজ ৩০টা বছর পর তাঁরই সন্তান হয়ে করতে যাচ্ছিস কোন সাহসে? আরে ঐ বাঞ্চোত! তুই ভাবলি কিভাবে আমি একই ইতিহাস আবারও হতে দিবো? তোর মা পাপ করেছে। এক বিধর্মীকে ভালোবেসে নিজের সমাজ-জাত-ধর্ম সবকিছুকে উপেক্ষা করেছে। অথচ বিনিময়ে কি পেয়েছে? তোর বাপ মাদারদোচ তো ঠিকই তোকে তোর মা’র পেটে রেখে আত্ম……”
সহসা বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিজোড়া উঁচু হলো মুগ্ধের। তাক হলো বৃদ্ধের পানে! সহসা বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন বৃদ্ধ। বিচক্ষণ মস্তিষ্ক তাঁর, হুটহাট বিপদসংকেত দিতেই চুপ করে গেলেন তিনি। মাত্রই রাগের মাথায় বলে বসতে গিয়েছিলেন সবচেয়ে বড়ো লুকনো সত্যিটা। যা পরমুহূর্তে টের পেতেই আমতা আমতা করে উঠলেন বৃদ্ধ! দোনোমোনো চিত্তে নজর উঁচাতেই আচানক তাঁর বুক বরাবর আছড়ে পড়ল একখানা শক্তপোক্ত লাথি। মুহুর্তেই আক্রমণের অভিঘাতে অদূরে ছিটকে পড়লেন বেচারা বৃদ্ধ। ভয়ার্ত হিমাংশু রায় এবার চিৎকার দিয়ে উঠলেন রূঢ় মানবের এহেন অজানা ঔদ্ধত্যে!

“ না! অধীর। তুমি চেনো না ওনাকে। ওনার গায়ে হাত দিও না। থেমে যাও অধীর!”
শুনলো না বেপরোয়া যুবক! উল্টো দাম্ভিক কদমে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো বৃদ্ধের সম্মুখে। মুখাবয়বে এক আকাশসম নাটকীয় ভাবভঙ্গিমা ফুটিয়ে আওড়াল,
“ ও বাবা! যার এক ঠ্যাং চিতায়, আরেক ঠ্যাং যাতায় তার ভয়ে তো আমি কেঁপে উঠলাম বে!”
একমুহূর্ত থামলো মুগ্ধ! তক্ষুনি নিজ ডানহাতখানা ছোঁয়াল নিজ স্পর্শকাতর অঙ্গে। ফের মুখাবয়বে কপট নাটকীয় ভাবভঙ্গি টেনে আওড়াল,
“ দেখ! তোর ভয়ে আমার পাখি-টাও কেঁপে উঠল। ইশশ্, এবার আমার কি হব্বে?”
বৃদ্ধ হতভম্ব! কে বলবে এই ছেলে রুশদী? এ যে এতটা বেপরোয়া, ঔদ্ধত্যের অধিকারী, তাতো জানতেন না। বৃদ্ধ কেমন মুখ কুঁচকে বলে ওঠে,
“ মশকরা বন্ধ কর বা***ঞ্চোত! তুই জানিস তুই কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিস?”

সহসা চোয়াল শক্ত হলো মুগ্ধের! চোখে নামলো অদৃশ্য আগুন। ক্ষ্যাপাটে ষাঁড় ফের ক্ষেপে গেলেন যেন। চোয়াল শক্ত করে খানিকটা ঝুঁকে এসে একটানে খুলে নিলেন বৃদ্ধের (ভেস্তি) (লুঙ্গি)। মুহুর্তেই একদফা চাপা হাসির রোল পড়ে গেল গোটা অন্দরমহলে। বৃদ্ধ কেমন হতবিহ্বলের ন্যায় তাকিয়ে রইলেন রূঢ় মানবের পানে। ভাগ্যিস তার পরনে ছোট আন্ডারওয়্যার ছিল, নয়তো এতক্ষণে যে কি হতো! রূঢ় মানব তক্ষুনি খুলে নেওয়া লুঙ্গিটা নিজ গলায় পেঁচালেন কয়েক দফায়। এগিয়ে এসে আচমকা পা রাখলেন বৃদ্ধের বুক বরাবর। দাঁত খিঁচে আওড়ালেন,
“ কলকাতায় তুই হাজার জনের বাপ হলেও, ক্ষমতায় আমি তোর চৌদ্দগোষ্ঠীর বাপ! মাইন্ড ইট।”
বৃদ্ধের ঘোলাটে চোখদুটো অপমানে চকচক করছে! চোয়ালের পেশি কাঁপছে থরথর করে। তিনি নজর ঘোরালেন আশেপাশে! হাসতে থাকা মানুষগুলো তৎক্ষনাৎ গিলে ফেললেন নিজেদের উপচে পড়া হাসিগুলো। মুগ্ধ ধীরলয়ে পা সরালো বৃদ্ধের ওপর থেকে। ঠিক তখনি অদূর থেকে হিমাংশু রায় চিড়বিড়িয়ে বলে ওঠেন,

“ তুই কি সত্যিই শ্যামৌপ্তীর ছেলে? এ্যাই উত্তর দে জা*নোয়ারের বাচ্চা! তোর গায়ে সত্যিই শ্যামৌপ্তীর র–ক্ত বইছে? যে মায়ের মৃ ত্যুর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে ছোট থেকে এতকিছু সহ্য করেছিস, দিনের পর দিন অন্ধকার জগতে টিকে থাকবার লড়াই করেছিস, যে-ই জা**নোয়া**রের বাচ্চাকে মা-রার জন্য ছদ্মবেশে বাংলাদেশে গিয়েছিলি, শেষে কি-না ঐ জা**নোয়ারের বাচ্চার মেয়েকে নিজের স্ত্রী বানাতে বুক কাঁপলো না তোর? এই কু****বাচ্চা! বুক কাঁপেনি তোর? তুই কি ভুলে গিয়েছিস ওর বাপ কি করেছিলো? ভুলে গিয়েছিস ওর বাপের লালসার শিকার হতে হয়েছিল তোর মা’কে? ভুলে গিয়েছিস ওর বাপ, তায়েফ এহসান — যে কি-না তোর মা’র নামে মিথ্যে অভিযোগ তুলেছিল, পুরো কোর্টভর্তি মানুষের সম্মুখে মিথ্যে, বানোয়াট তথ্য দিয়ে প্রমাণ করেছিল — শ্যামৌপ্তী রায় নাচনেওয়ালী, নিষিদ্ধ পল্লীর শীর্ষ বে**শ্যা!”

“ চোপপপপ! এ্যাই কু****বাচ্চা চোপপপ। একদম চুপ। আমার চাশমিস দাঁড়িয়ে আছে ওদিকে! চুপ, ওর সামনে এসব বলবিনা। ও সহ্য করতে পারবে না এসব। চুপ, চুপ!”
বাঁধ মানলেন না হিমাংশু রায়! আজ এক অপ্রতিরোধ্য সত্তায় আবির্ভূত তিনি! মুখাবয়বে এক আকাশসম ঘৃণা লেপ্টে তাকালেন খানিক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সপ্তদশীর পানে। মুখভর্তি থুতু নিয়ে আচানক ছুঁড়ে ফেললেন রমণীর পায়ের কাছে। মাহি নিষ্প্রাণ! নিস্তব্ধ চোখে তাকিয়ে আছে হিমাংশু রায়ের পানে। বাবার নামে বলা প্রতিটি তীক্ষ্ণ বাক্যবাণ যেন ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে মায়াবিনীর ক্ষুদ্র হৃদয়টা। অদূর থেকে রূঢ় মানব তক্ষুনি উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ছুটে এলো মাহি’র নিকট। উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
“ গো ব্যাক টু ইউর রুম চাশমিস!”
হতবুদ্ধিকর ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাহি। এরইমধ্যে হিমাংশু রায় ফের কর্কশ কন্ঠে বলে উঠলেন,
“ খু নির বাচ্চা ও! একটা রেপি**স্টের দূষিত র ক্ত বইছে ওর গায়ে। ওর বাপ একটা জা**নোয়ারের বাচ্চা!”
এবার আর নিজেকে সংবরণ করে রাখতে পারলোনা মুগ্ধ! তক্ষুনি শক্ত চোয়ালে কটমট করতে করতে ঝড়ের বেগে ছুটে এলো হিমাংশু রায়ের নিকট। একহাতের জোরালো পাঞ্চে মুহুর্তেই থেঁতলে দিলো আহত লোকটার নাকমুখ! পরমুহূর্তেই আকাশসম রাগে গজগজ করতে করতে শক্ত দু-হাতে খামচে ধরল হিমাংশু রায়ের কুর্তার গলা। চিড়বিড়িয়ে বলে ওঠে,

“ তোকে চুপ করতে বলেছি না কু***বাচ্চা? গলায় খুব জোর এসেছে তাই না? একদম টোটলা ধরে টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলব বান্দীর ছেলে! দোষ করলে ওর বাপ করেছে, শাস্তি পেলে ওর বাপ পাবে। এর ভেতরে ওকে টানিস কোন সাহসে বান্দীর ছেলে? শি ইজ ইনোসেন্ট! ডিড ইউ হিয়্যার মি? শি ইজ ইনোসেন্ট।”
“ দোষী বাপের শাস্তি যদি নিষ্পাপ মেয়ে না পায়, তাহলে নির্দোষ মায়ের শাস্তি কেনো নির্দোষ ছেলে পেলো? কেন তুই শাস্তি পেলি অধীর? কেন ওর বাপ, তায়েফ এহসান — তোকে, তোর মা’কে শাস্তি দিলো? কেন দিলো? তুই ওর হয়ে সাফাই গাচ্ছিস? অথচ তুই-ই সেই অধীর না? যে শুরু থেকে বলে এসেছিল — তার সকল শত্রুর বংশকে নির্বংশ করে দেবে? তাহলে কি হলো তোর জবানের? কি করে পারলি নিজের সকল বাঁধ ভুলে গিয়ে — নিজের শত্রুর মেয়েকে স্ত্রী বানাতে?”

রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য রূঢ় মানব! তক্ষুনি মুষ্ঠি উঁচালেন হিমাংশু রায়ের পানে। জোরালো পাঞ্চটা বসাতেই যাবে ওমনি পেছন থেকে তার রুক্ষ হাতটা টেনে ধরে দু’টো নরম তুলতুলে হাত। মুহুর্তেই থেমে গেল মুগ্ধ! পেছনে না ঘুরেও চিনে গেল পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানবীকে। ত্রস্ত হাত নামিয়ে এনে ঘুরে দাঁড়াল সে। মায়াবিনীর চোখদুটো অঝোরে ঝরাচ্ছে অশ্রু! লাল হয়ে গিয়েছে সুশ্রী গৌরবর্ণা মুখখানা। তক্ষুনি বুকটা কেমন ধ্বক করে উঠল রূঢ় মানবের। ব্যাকুল কন্ঠে কিছু আওড়াতেই যাবে, তার পূর্বেই কোনরূপ সময় ব্যয় না করে মানবী বলে ওঠে,
“ ও–ওরা য-যা বললো ত-তা কী সত্যি? আমার আব-আব্বু…!”
রমণীর কম্পিত কণ্ঠ! তাঁর ভগ্ন হৃদয়ের করুণ দশা — যা স্পষ্ট টের পেলেন নির্দয় মাফিয়া মনস্টার। ত্বরিত নিজ চিরচেনা খোলস ছেড়ে দিয়ে, রুক্ষ দু’হাতের আঁজলায় আলগোছে তুলে ধরল সপ্তদশীর পেলব মুখখানা। কন্ঠে একরাশ উদ্বিগ্নতা ঢেলে আওড়াল,

“ হুঁশশ! ডোন্ট ক্রায়!”
মাহি শুনলো না। কাঁপতে কাঁপতে কাঁদছে মেয়েটা! কম্পিত হাতদুটো দিয়ে আলগোছে খামচে ধরল রূঢ় মানবের টি-শার্টের একাংশ। হেঁচকি তুলে ফের ভগ্ন কন্ঠে শুধালো,
“ শুধু একটাবার বলুন। একটাবার বলুন, ওরা যা বলেছে সব মিথ্যে। একটাবার বলুন না বিস্ট! বলুন না, আমার আব্বু এমন না। আপনি বলুন না বিস্ট!”
মানবীর এহেন ভেঙে পড়ার আশঙ্কাই যেন হচ্ছিল মুগ্ধের। পরিস্থিতির গেরাকলে তাই হলো যেন! বোকা মানবীর এহেন করুণ দশা যেন মোটেও সহ্য হলো না নির্দয় মানবের। দিনদুনিয়া ভুলে তৎক্ষনাৎ অন্দরমহলভর্তি মানুষের সম্মুখে রমণীর ক্ষুদ্র মাথাটা আলগোছে চেপে ধরল নিজ রুক্ষ বুকের সনে। এমুহূর্তে ক্রন্দনরত রমণীর একমাত্র ভরসাস্থলে আবির্ভূত সে। খানিকবাদে গমগমে গলায় প্রতুত্তর করল —
“ চুপ! একদম চুপ। কিচ্ছু শুনিসনি তুই তুই সিগনোরা। কিচ্ছু না। তোর বাপকে নিয়ে কিচ্ছু জিজ্ঞেস করিস না আমায়, ওসব তোর সহ্য হবে না। আর যা তোর সহ্য হবে না, তা আমারও সহ্য হবে না।”
মুহুর্তেই ডুকরে উঠলো মাহি! ধীরলয়ে মুখ তুললো রূঢ় মানবের রুক্ষ বক্ষভাঁজ হতে। ছলছল চোখজোড়া মানবের পানে নিক্ষেপ করে, জড়ানো কন্ঠে আওড়াল,

“ তারমানে… সবটা সত্যি? আমায় ছুঁয়ে বলুন তো।”
সহসা হাতদুটো আলগা হয়ে গেল মুগ্ধের! নিরব থেকেও বলে দিলো অনেককিছু। শক্তমুখে চোখদুটো ঘুরিয়ে তাকালো অন্যত্র। রয়েসয়ে গমগমে গলায় বলল,
“ ঘরে যা।”
বোকা মানবী হুট করেই কান্না থামালো নিজের। মানবের পানে তাকিয়ে রইলো কয়েকপল। তার দৃষ্টিতে একরাশ আকুলতা! মন ভরে দেখছে বোধহয় সুদর্শনকে। কিয়তক্ষন বাদেই চুপচাপ পাদু’টো ছোটালো সিঁড়ির পানে। আর দাঁড়ালো না সে। মুগ্ধ আড়দৃষ্টে মেয়েটার চলে যাওয়া দেখল!

সময় পেরুলো মিনিট দশেক! রূঢ় মানব শক্তমুখে বসে আছে অন্দরমহলের বড়ো সোফাটায়। তার সম্মুখে আহতদের ঢল। একে একে সরানো হচ্ছে তাদের। অদূরের বৃদ্ধ লুঙ্গি ছাড়াই থমথমে মুখে বেরিয়ে যাচ্ছেন জমিদার বাড়ি থেকে। পেছন থেকে তার সাগরেদরা বারংবার বলছে,
“ বস! লুঙ্গিটা পরে নেন।”
কারো কথাই কানে তুললেন না বৃদ্ধ। উল্টো মাঝপথে থামালেন পা-জোড়া। ঘাড়টা সামান্য ঝুঁকিয়ে একবার তাকালেন নিজ অর্ধনগ্ন গায়ে, আরেকবার তাকালেন নিজ বুকে। যেথায় স্পষ্ট দাগ বসেছে রুশদীর পায়ের চিহ্ন! বৃদ্ধ কিয়তক্ষন গম্ভীর থাকলেও আঁচানক কুটিল হাসলেন। বিড়বিড়িয়ে বললেন,
“ আজকের মিটিংটা আমি খুব করে মনে রাখলাম রুশদী! পরবর্তী মিটিংটা তুই মনে রাখবি।”

“ মনস্তার! মনস্তার আপনার সিগনোরা…!”
হুট করেই তিনতলার করিডর হতে ধেয়ে আসা এডউইনের উদ্বিগ্ন কন্ঠে ঘাড় উঁচিয়ে তাকালো মুগ্ধ। ত্বরিত বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে মুখাবয়বে খানিক অস্থিরতা ঢেলে আওড়াল,
“ হোয়াট হ্যাপেন্ড টু হার?”
ঘামছে এডউইন! কম্পিত কণ্ঠে বলে ওঠে,
“ উনি ছাঁদে গিয়ে দরজা লক করে দিয়েছে। বাইরে থেকে কয়েকবার ডেকেছি, তবে খুলছে না দরজা!”
মুহুর্তেই শক্ত হলো মুগ্ধের চোয়াল। দৃষ্টিতে নামলো আগুন। কটমট কন্ঠে হুট করেই ধমকে বলে ওঠে,
“ দরজা ভাঙার অপশন বলে কিছু একটা থাকে, সেটা জানিস না বাস্টা’র্ড? চলে এসেছিস এখানে মুখ তুলে। আমার বউয়ের কিছু হলে — সবক’টাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলব বলে দিলাম।”
বলেই নিজ পাদু’টো ক্ষিপ্র গতিতে ছোটালো মুগ্ধ। দক্ষ এথলেটের ন্যায় কয়েক লাফে উঠে গেল সিঁড়ি বেয়ে।

প্রায় মিনিট তিনেক লাগলো রূঢ় মানবের, ছাঁদের গেট অব্ধি পৌঁছাতে। সে এসেই দুয়ার ধাক্কা দেবার মতো কোনরূপ কালবিলম্ব করল না। উল্টো শক্ত পায়ের জোরালো লাথিতে এক ঝটকায় ভেঙে দিলো দুয়ারটা। মুহুর্তেই ঝনঝনিয়ে উঠল কাঠের দুয়ারখানা, অবহেলায় গড়িয়ে পড়ল সম্মুখে। উদ্ভ্রান্ত নির্দয় মানবের সন্ধানী চোখদুটো তখন মুহুর্তেই আছড়ে পড়ল সম্মুখে। ওমনি স্তব্ধ হয়ে গেল মুগ্ধ! চোখদুটো হয়ে গেল বিস্ফোরিত। অদূরেই ছাঁদের একদম দ্বার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে মাহি! সম্মুখে একটু ঝুঁকে গেলেই পড়ে যাবে যেকোনো সময়। মানবীর এহেন কীর্তিকলাপে অস্থিরতা বাড়লো মুগ্ধের। তক্ষুনি পাদু’টো ছুটিয়ে ব্যাকুল কন্ঠে শুধালো,
“ হেই নো নো নো! সিগনোরা, সিগনোরা লিসেন টু মি। হেই, ডোন্ট ডু দিস। কাম ডাউন বেইব।”
সহসা ঘাড় বাঁকায় মাহি। মুগ্ধকে নিজের দিকে ওমন ছুটতে দেখে তক্ষুনি উঁচায় হাত। বাঁধ সেধে বলে,
“ দাঁড়ান বিস্ট! নয়তো আমি এক্ষুণি লাফ দিবো।”
ত্বরিত থেমে গেল মুগ্ধ! অস্থিরতায় হাসফাস করতে করতে আওড়াল,
“ পাগলামি করিস না পিচ্চি! তোর কি এমন দুঃখ? যে তুই আমাকে একা করে দিয়ে চলে যাবি? এ্যাই মেয়ে! তুই জানিস না? তুই ছাড়া আমার কেউ নেই?”
বোকা মানবী আজ আর বোকা নয়! ডুকরে উঠল অন্তরের ব্যথায়। হাতদুটো মুখের কাছে এনে কাঁদল অঝোরে। অস্ফুটে আওড়াল,

“ আমাকে মাফ করে দিন। আমি জানিনা আমার আব্বু সত্যিই দোষী কি-না! তবে আমি এতটুকু বিশ্বাস করি আপনার সাথে যা যা হয়েছে, তা একেবারেই কাম্য নই!”
পাগলাটে যুবক! রমণীর এরূপ বাক্যে দিশাহীন সে। মুহুর্তেই কয়েক কদম এগিয়ে এসে ব্যাকুল কন্ঠে আওড়াল,
“ তুই চুপ কর পিচ্চি! একদম ঐসব নিয়ে কথা বলিস না। তোর ওসব নিয়ে ভাবতে হবে না। সি, আ’ম ওকে! আ’ম টোটালি ওকে।”
মাহি শুনলো না। উল্টো ঘুরে দাঁড়াল আবার। মুগ্ধ এবার আরেকদফা উদ্বিগ্ন হলো। হাসফাস করতে করতে এগিয়ে এলো আরও খানিক। কম্পিত কণ্ঠে আওড়াল,
“ হেই নো নো! সিগনোরা, লিসেন।কেউ কিচ্ছু বলবে না তোকে। কেউ তোকে কিছু বলতে এলে, সবক’টারজিভ ছিঁড়ে দিব আমি। তোর বাপকে নিয়ে কেউ কিচ্ছু বলবে না চড়ুই। আই প্রমিজ, কেউ কিচ্ছু বলবে না। তুই পাগলামি করিস না পিচ্চি! নেমে আয়, তোর কিছু হলে আমি…..”

কন্ঠরুদ্ধ হলো মুগ্ধের। যেই দেখল মানবী কেমন আহত হেসে তার পানে ছলছল চোখজোড়া নিয়ে তাকালো। মেয়েটার একপা ক্রমশ বাইরে যাচ্ছে। তার ব্যথাতুর কন্ঠ ফুঁড়ে অস্ফুটে বেরুলো,
“ আমার সহ্য হচ্ছে না বিস্ট! আমার বুক ফেঁটে যাচ্ছে। আমার কষ্ট হচ্ছে খুব। আমি পারব না, খু নির মেয়ের তকমা নিয়ে বেঁচে থাকতে। আ’ম সরি বিস্ট! আমি আমার আব্বুকে খু নি হিসেবে মেনে নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবো না।”
একমুহূর্ত থামলো মাহি! ঠোঁটের কোণে অদ্ভুতভাবে ফোটালো এক চিলতে ব্যথাতুর হাসির রেশ। শুধালো,

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬০

“ আমি জানতাম না — আমার ওপর করা আপনার অত্যাচারগুলোর পেছনে লুকিয়ে আছে এতবড় কারণ। আমি জানতাম না — আমি আপনার জীবনে কাল হয়ে এসেছি। শুনুন — মির্জা সায়ান মুগ্ধ! এই একটা জীবনে আমি আপনার চোখে আমার জন্য ঘৃণা দেখেছি, লুকনো অনুরক্তি দেখেছি, যত্ন দেখেছি! তবে আমি আপনার ঐ চোখদুটোতে নিজের জন্য কাতরতা দেখতে পারব না। শুনুন, নির্দয়দের দূর্বলতা থাকতে নেই! আমায় ক্ষমা করে দিন! আ’ম সরি।”
বলেই রমণী চোখবুঁজল। হাতদুটো আলগোছে ছড়িয়ে দিলো দুপাশে। অতঃপর পাদু’টো হারালো ঠাঁই! ভাসলো শূন্যে।

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬১