অভিসৃতি পর্ব ২২
নওরিন কবির তিশা
“বিশেষ সংবাদ… গত মধ্যরাতে বান্দরবানের সীমান্তবর্তী সাঙ্গু নদীর অদূরে গহীন অরণ্যে বিজিবি ও যৌথ বাহিনীর সুপরিকল্পিত আড়াই ঘণ্টাব্যাপী এক অতি স্পর্শকাতর যৌথ অভিযান সম্পন্ন হয়েছে। সীমান্তে সক্রিয় আন্তর্জাতিক অস্ত্র, মাদক পাচারকারী চক্রের আস্তানা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হলেও, দুই পক্ষের মধ্যবর্তী তীব্র গোলাগুলিতে চারজন সেনা সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন এবং ঘটনাস্থলেই শহীদ হয়েছে দুজন কৃতি কর্মকর্তা…”
সদ্য বোজা অক্ষিপল্লব তড়িৎ বেগে উন্মোচিত হলো। বক্ষপিঞ্জরে সহস্র অবাধ্য অশ্বের উন্মাদ দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে ইতিমধ্যেই। প্রচন্ড কম্পনে মৃগী রোগীর ন্যায় ঝাঁকুনি দিচ্ছে সর্বাঙ্গ। আপাতত,ওর সমগ্র দুনিয়া স্থবির হয়েছে এক নিদারুণ আশঙ্কার বিন্দুতে!
সংবাদের প্রতিটি শব্দ পাশের কক্ষের উচ্চৈঃস্বরে বাজতে থাকা টেলিভিশন হতে ভেসে আসছিল স্পষ্ট হয়ে। কিন্তু ভয়ের তোড়ে, অসীম আতঙ্কে শেষপর্যন্ত কান দুটো স্তব্ধ হয়ে এলো–ঘোষিত সেই দুজন শহীদ কর্মকর্তার নাম আর কায়রার শ্রবণগোচর হলো না!
জায়নামাজে ক্রন্দনরত অবস্থিত কখন যে, হঠাৎ নিদ্রায় তলিয়ে ছিলো তার খেয়াল নেই। বিছানার অপরপ্রান্তে মেধা আর তুজা তখনো বেঘোরে ঘুমিয়ে। কায়রার কণ্ঠ ফুঁড়ে বের হয়ে আসা অস্ফুট ফুঁপিয়ে কান্নার রুদ্ধ আওয়াজে আচমকা ঘুম ভেঙে গেল দুজনের। মেধা ধড়ফড় করে উঠে বসে তুজাকে ঠেলে তুলল। কায়রার র’ক্তা’ভ, ভয়ার্ত চোখদুটি আর কাঁপতে থাকা শরীর দেখে ব্যাকুল কণ্ঠে শুধাল,
“কী হয়েছে কায়রা? তুই এভাবে কাঁপছিস কেন? কাঁদছিস কেন রে?”
কায়রা কথা বলতে পারল না। বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে নিঃশ্বাসটা অবধি আটকে আসছে ওর! কোনো মতে তোতলে রুদ্ধশ্বাসে আকুতি জানাল,
“সং… সংবাদটা চালা! প্লিজ সংবাদটা দে টিভিটা অন কর!”
কিংকর্তব্যবিমূঢ় তুজা-মেধা একে অন্যের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করল। মাত্রই ঘুম ভাঙা ক্লান্ত মস্তিষ্কে কায়রার এই অসংলগ্ন আচরণ বুঝে ওঠার আগেই কায়রা তীব্র হাহাকারে চিৎকার করে উঠল,
“তোরা টিভিটা অন করবি কি না?”
কক্ষের মাঝে ওর চিৎকার ছড়াতেই দরজায় সশব্দে করাঘাত করল কেউ। তুজা ত্বরিত পদে এগিয়ে গিয়ে দুয়ার উন্মুক্ত করতেই সামনে দেখা মিলল নিহার আর রুশাফের ঘোর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অপ্রস্তুত মুখোশ্রীর। নিহার ভেতরে এক পা বাড়িয়ে অতি সংক্ষেপে বলল,
“কায়রাকে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিতে বল। রিসোর্টের নিচে কয়েকজন মিলিটারি অফিসার এসেছেন ওকে নিতে…”
কথাটা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই কায়রার মাথার ওপর প্রকাণ্ড আকাশটা ভেঙে পড়ল! হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া ক্ষণকালের তরে স্তব্ধ হলো যেন। হাত-পা সম্পূর্ণ হিম হয়ে আসছে। চোখ বুজলেই কেবল দুর্জয়ের সেই শেষ বার্তাটা মনে পড়ছে–‘বি স্ট্রং, মাই ম্যাজিস্টি!’ কায়রা কোনো কথা বলল না। আত্মভোলা মানবীর মতো সোজা ওয়াশরুমে গিয়ে মুখে দুটো পানির ঝাপটা দিল।
মুখটা মোছা কিংবা পরনের চাদরখানা সামলানোর ন্যূনতম হুঁশটুকুও আর রইল না কায়রার। অসাড়, নিশ্চল দুটি পায়ে ভর দিয়ে ও কেবল ধীর কদমে নিচে নেমে এলো। মেধা,তুজা সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসলেও সরাসরি ওদের প্রত্যাখ্যান করল কায়রা। নিচে নামতেই দুজন মহিলা সেনা সদস্য এগিয়ে এসে কেবল বলল,,
“আমাদের সঙ্গে চলুন!”
কায়রা যান্ত্রিক বেগে গাড়িতে উঠল্। অশ্রুহীন শুষ্ক নেত্রপটে কেবল এক সীমাহীন শূন্যতা। ঠোঁট দুটি বারংবার কেঁপে উঠলেও ভেতর হতে কোনো শব্দ নির্গত হলো না। একবারের জন্যও শুধাল না–কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ওকে? কাঙ্ক্ষিত মানুষটি বেঁচে আছে তো? নাকি ওই দুজন শহীদ কর্মকর্তার তালিকায় যুক্ত হয়ে গেছে মেজরের নামখানি? হৃদয়ের অসীম আতঙ্ক যেন কণ্ঠনালী সম্পূর্ণ রুদ্ধ করে দিয়েছে।ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে অথচ বাকশক্তি বিলুপ্ত হয়েছে সম্পূর্ণরূপে।
পেছনের অন্য একটি জিপে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখশ্রী নিয়ে ওদের অনুসরণ করছে ওর বন্ধুমহল।
কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছাতেই স্থির হলো গাড়িটা। চূড়ান্ত ভারাক্রান্ত এক প্রাঙ্গনে পা রাখতেই নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার জোগাড় কায়রার। কিঞ্চিৎ দূরত্বে নিহত সেনাসদস্যের পরিবারের করুণ আহাজারি প্রাঙ্গণকে গুমোটবদ্ধ করছে দ্বিগুণ,লাল-সবুজ পতাকায় মোড়ানো দুটি কফিন দৃষ্টিগোচর হতেই কায়রার অক্ষিপট ঝাপসা হয়ে এলো, অসাড় পা দুটি আর এক পা-ও সামনে এগোতে চাইল না।
চারপাশের এত চেনা-অচেনা মুখের ভিড়ে ওর চঞ্চল নয়নদুটি কেবল একটি অবয়বকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল। কোথায় সেই সদা শৃঙ্খলিত,কঠোর মেজাজধারী পুরুষটি? তার প্রকাণ্ড বুকটায় মুখ লুকিয়ে একটু নিশ্চিন্ত হওয়ার তো তীব্র আকুলতা ওর!অসীম আতঙ্কে পা দুটি অবশ হয়ে এলে, কায়রা ধপ করে ঘাসের ওপর বসে পড়তে চাইল। ঠিক সেই মুহূর্তে সুদৃঢ় দুটি বলীয়ান বাহু আঁকড়ে ধরল ওকে! শূন্যে বিলীন হতে যাওয়া কায়রা থমকে দাঁড়িয়ে আকুল নয়নে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাল।
সম্মুখে দাঁড়িয়ে স্বয়ং মেজর দুর্জয় আহসান। পরিহিত কম্ব্যাট ইউনিফর্মে ধূলিমলিন ও ক্ষ’তের আলামত স্পষ্ট হলেও, ওর কৃষ্ণচক্ষুতে পরম মায়া ,প্রচ্ছন্ন দায়িত্ববোধ। কায়রা স্তব্ধ হয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত—এ কি কেবলই বিভ্রম, নাকি ঘোর বাস্তব? দুর্জয় আলতো করে কায়রাকে সোজা করে দাঁড় করাল। আলতো স্পর্শে ওর অশ্রুসিক্ত গাল দুটো মুছে দিয়ে নিচু, ভরাট কণ্ঠে শুধাল,
“হোয়াট হ্যাপেনড?এই পাগলী, কাঁদছো কেনো?”
দুর্জয়ের বুকে দু হাত রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল কায়রা। ব্যাকুল তোতোল কণ্ঠে অস্ফুটে বলল,
“আমি… আমি ভেবেছিলাম আপনি… আপনি আমাকে একা রেখে…..”
কায়রার কান্না বিজড়িত বাক্যের ইতি টানতে দিলো না দুর্জয়। নিজের প্রশস্ত বক্ষপিঞ্জরে ওকে নিবিড়ভাবে আঁকড়ে বলল,
“অস্তিত্বের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে জড়িয়ে আছ, তাকে ছেড়ে যাওয়ার সাধ্য কই আমার?”
দুর্জয়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো কায়রা । অঝোর ধারায় ঝরতে থাকা কান্নায় ভিজে যেতে লাগল দুর্জয়ের ধূলিমলিন কম্ব্যাট পোশাক। অস্ফুট কণ্ঠে বারংবার মেয়েটা আওড়িয়ে চলেছে,,
“ আপনাকে বড্ড ভালোবাসি, মেজর… বড্ড ভালোবাসি! প্লিজ কখনো আমাকে এভাবে একা রেখে যাওয়ার কথা ভাববেন না… প্রমিস করুন!”
দুর্জয় কায়রার ব্যাকুল ভালোবাসার তোড়ে আচ্ছন্ন হলো। চিরচেনা অভ্যাসে কায়রার হিজাবের ওপর থেকে স্নিগ্ধ ললাটে ঠোঁট ছুঁয়ে দিল ও। ক্ষণকাল নিস্তব্ধতা বিদ্যমান হতেই কায়রা আঁচল দিয়ে চোখ মুছে ত্বরিত গতিতে মুখ তুলল। উদ্বিগ্ন নয়নে দুর্জয়ের সর্বাঙ্গে ক্ষ-তের দাগ হাতড়ে শুধালো,
“কোথায় কোথায় আঘাত লেগেছে আপনার? ডান হাতের ওই রক্তের দাগটা কিসের, মেজর? সত্যি করে বলুন তো, বেশি পেইন হচ্ছে?”
দুর্জয় মৃদু হাস্যে কায়রার ব্যাকুল হাত দুটো নিজের মুঠোয় পুরে নিল,
“ইটস জাস্ট আ মাইনর স্ক্র্যাচ, কায়রা। বুলেটের স্প্লিন্টার লেগেছিল সামান্য, ফাস্ট এইড নেওয়া শেষ। অন দ্য ফিল্ড এগুলো সোলজারদের খুব নরমাল বিষয়, সো প্যানিক করো না।”
ঠিক সেই মুহূর্তে পেছনে এসে পৌঁছাল কায়রার চিন্তিত বন্ধুমহল। দুর্জয়কে সুরক্ষিত ও অ’ক্ষত দেখে ওদের উৎকণ্ঠিত চেহারায় স্বস্তির নিঃশ্বাস নামল। তবে প্রাঙ্গণে বিরাজমান শোকার্ত পরিবেশ অনুধাবন করে সবাই নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইল।
সামনের সুপ্রশস্ত মাঠে তখন শহীদ সেনাসদস্যদের প্রতি অন্তিম সামরিক সম্মান ও শ্রদ্ধা নিবেদনের বেদনাতুর প্রক্রিয়ার সূচনা হচ্ছে। জাতীয় পতাকায় মোড়ানো দুটি কফিনের সম্মুখে সুবিন্যস্ত সারিতে দাঁড়িয়ে সেনাদল। বিউগলের করুণ ও বুকচেরা সুর বাতাসের হিমেল পরশে ছড়িয়ে পড়তে পুরো চত্বরে বড্ড হৃদয়বিদারক আবহ সৃষ্টি হলো।
দুর্জয় কায়রাকে স্নেহের বেষ্টনীতে পাশে রেখে সামরিক পোশাকে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ডান হাতটি কপালে তুলে শহীদ সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে শেষবারের মতো স্যালুট ঠুকে শ্রদ্ধা জানাল। অশ্রুসিক্ত নয়নে সেই অকুতোভয় বীরদের শেষ বিদায় প্রত্যক্ষ করল কায়রা ও তার বন্ধুরা। সহযোদ্ধাদের হারানোর বেদনা ও দেশের জন্য আত্মত্যাগের এক অপরিসীম মহিমান্বিত বাস্তবতা হৃদয় দিয়ে স্পর্শ করল প্রাঙ্গণে উপস্থিত প্রতিটি প্রাণকে।
“আচ্ছা মেধা,ভালোবাসা কাকে বলে?”
তুজা কায়রাদের দিকে আচ্ছন্ন নেত্রে চেয়ে আছে। কতো যত্নে কায়রারকে আগলে রেখেছে দূর্জয়;একদম ছোট্ট বিড়াল শাবকের ন্যায়। মেধা ঘাড় ঘুরিয়ে ওর দিকে চায়। প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে তুজা পুনরায় শুধায়,,
“বল না,ভালোবাসার সংজ্ঞা কি?”
মেধা কোনরূপ ভণিতা ছাড়াই হৃদয়ে চলমান কথাগুলো উগড়ে দিলো,,
“যখন কেউ তোকে সমস্ত সময় আশপাশের মানুষের তোয়াক্কা না করে,আগলে রাখবে।তোর মতামতের সর্বোচ্চ মূল্য দিবে, প্রায়োরিটি লিস্টে তোর নাম টপে রাখবে।তখন তার প্রতি তোর যে স্বর্গীয় অনুভূতির সৃষ্টি হবে তাকেই ভালোবাসা বলে।”
তুজার ঘোর কাটে।জিজ্ঞাসু দৃষ্টি সরাসরি মেধার দিকে নিবদ্ধ করে বলে,,
“কিন্তু এটা তো বন্ধুত্বেও হয়।”
“উঁহু,ভালোবাসায় একটা স্পেশ্যাল ফিলিংস আছে।যার সাথে কথা বলেও শান্তি! একটা অন্যরকম টান,যা সব সম্পর্কে থাকে না।”
“তবে আমি যে এমন প্রায়োরিটি অন্য একজনের কাছ থেকেও পেয়েছি।কিন্তু কোনো অন্যরকম ফিলিংস তো আসে নি।”
তূজার আনমনে বলা কথাটায় মেধা কৌতুহলী দৃষ্টি হেনে ওর দিকে চাইলো। প্রশ্ন করতে গেলো, কার থেকে? কিন্তু তার আগেই বাকি তিন সদস্যের উপস্থিতিতে চাপা পড়ল তা। নিহার ওদের উদ্দেশ্যে বলল,,
“পরিস্থিতি আপাতত স্বাভাবিক। কায়রা মেবি দুর্জয় ভাইয়ের সঙ্গে যাবে।আমরা রওনা দেই চল।”
ওরাও দ্বিমত করলো না। একত্রে রওনা হলো, রিসর্টের উদ্দেশ্যে।
প্রাতঃরাশ সেরে,কক্ষে এসেই শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিয়েছে পায়রা।শীতকালীন বেলা গুলো যেমন হয়;ম্রিয়মান রৌদ্রের উপস্থিতি ভোরের নির্দেশনা দিলেও ঘড়ির কাঁটা সে ভ্রম ভাঙ্গছে। বেলা সাড়ে দশটা এখন। ম্যাসেঞ্জারে বান্ধবীর সঙ্গে খোশগল্পে মগ্ন।সমগ্র বাড়িটা আপাতত ফাঁকা।নুরা বেগম আর আঞ্জুমান ইয়াসির পায়রার মামাতো ভাইয়ের বিয়ের কেনাকাটা করতে গিয়েছে আর আনোয়ার ইয়াসির তো নিজের অফিসে।
আচানক,ফোনটা বেজে উঠতেই পায়রা সরু দৃষ্টিতে দেখলো অপরিচিত নম্বর। কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত হয়ে, তা রিসিভ করে হ্যালো বলতেই,অপরপ্রান্ত হতে ভেসে এলো এক উদ্বিগ্ন কণ্ঠ,,
“ হ্যালো, কেডা?সায়মন বাজানরে চিনেন? মুই সিরাজ সারের নাম্বারে কল দিছি, মাগার ফোন ধরেক নাই কা!বাজানের মেলা জ্বর ইকটু কইতে পারবেন কিতা করতাম?”
বয়স্ক লোকটার কথায় স্পষ্ট,বড্ড পেরেশান তিনি।তবে, সব ছাপিয়ে সায়মনের নামটা অবাক করলো পায়রাকে। ওর জ্বর? কিন্তু,সিরাজ আংকেলের সাথে যোগাযোগের পথ রুদ্ধ এখন।উনি বর্তমান ইউএসএ বিসনেস ট্যুরে।বাবাকে কাল কথা বলতে দেখেছে ও। দিগদ্বিক জ্ঞানশূন্য হয়ে চিন্তিত স্বরে ও বলল,,
“আপনি চিন্তা করবেন না আংকেল।আমি আসছি। জ্বর কি খুব বেশি?”
“হ,মা!”
“আচ্ছা,আপনি পেরেশান হবেন না।আসছি আমি।”
ফোন কেটেই,কোনরূপ প্রস্তুতি ছাড়া বেরিয়ে গেলো ও।
মিনিট পঁচিশের ব্যবধানে এক বিশাল বহুতল ভবনের সম্মুখে এসে থামে পায়রার গাড়ি। দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে লিফট ধরে সায়মনদের প্রকাণ্ড ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়াল ও। দরজায় পরপর কয়েকবার কলিংবেল বাজাতেই ভিটেমাটির পুরোনো বৃদ্ধ কেয়ারটেকার চাচা এসে দুয়ার উন্মুক্ত করলেন। পায়রাকে দেখে তিনি যেন কূলে পানি পেলেন,
“মা! আইছেন আপনি? বাজান তো ঘরের ভেতরে নিথর হয়া পইড়া আছে, কত ডাইকাও সাড়াশব্দ পাইলাম না! স্যারও নাইকা…”
পায়রা আর একমুহূর্ত কালক্ষেপণ না করে জিজ্ঞেস করল,
“আঙ্কেল, ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে লক খুলেছিলেন?”
আনার সাহেব ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজার লক আগেই খুলে রেখেছিলেন। পায়রা সোজা ভেতরের ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করতেই থমকে গেল,ভারী মকমলের পর্দার দরুন সমগ্র ফ্ল্যাটজুরে নিকষ আঁধার আর ভ্যাপসা নিস্তব্ধতার সাম্রাজ্য।
পায়রা দ্রুত হেঁটে গিয়ে ড্রয়িং রুমের পর্দাগুলো এক টানে সরিয়ে দিল। অমনি ঘরে ছড়িয়ে পড়ল প্রভাতের স্নিগ্ধ রোদ। ঘর পেরিয়ে ভেতরের মূল শোবার ঘরের দিকে এগোতেই পায়রার কানে ভেসে এলো তীব্র জ্বরের ঘোরে কাঁপতে থাকা সায়মনের অতি মৃদু কাতরানি।
আর্তনাদের উৎস লক্ষ্য করে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতেই পায়রার বুকটা ধক করে উঠল! বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে ব্যারিস্টার সায়মন রহমান। পরনে কালচে ট্রাউজার আর অফ-হোয়াইট রঙের টি-শার্ট। গায়ে থাকা পাতলা কম্বলটা একপাশে সরে গিয়ে মেঝের ওপর গড়াচ্ছে। প্রখর জ্বরের তীব্রতায় সুগঠিত শরীরটা কুণ্ডলী পাকিয়ে রয়েছে ওর, শুষ্ক ফ্যাকাশে ঠোঁট দুটি তিরতিরিয়ে কাঁপছে।
পায়রা তড়িঘড়ি এগিয়ে গিয়ে বিছানার কোণে বসল। পাশে অবহেলায় পড়ে থাকা ব্ল্যাঙ্কেট টেনে সায়মনের গায়ে ভালো করে জড়িয়ে দিল। অতঃপর দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে কোমল হাতটি সায়মনের তপ্ত কপালে ছোঁয়াতেই চমকে উঠল পায়রা–যেন আগুনের উত্তপ্ত কোনো শলাকা স্পর্শ করল ও! হাতের তালু এক নিমেষে জ্বলে উঠল সায়মনের গায়ের আঁচে।
পায়রা উদ্বিগ্নভরে দরজার দিকে চেয়ে চেঁচিয়ে ডাকল,
“আঙ্কেল! ও আঙ্কেল! শুনছেন?”
কেয়ারটেকার আনার পাটোয়ারী ত্বরিত দরজার কাছে এসে দাঁড়াতেই পায়রা অতি দ্রুত ও ব্যাকুল কণ্ঠে বলল,
“আংকেল, আপনি জলদি নিচের ফার্মেসি থেকে প্যারাসিটামল আর একটা থার্মোমিটার নিয়ে আসুন তো! আর যাওয়ার আগে আমাকে একটা পাত্রে ঠান্ডা জল আর পাতলা সুতির সুতি তোয়ালে এনে দিন, তাড়াতাড়ি!”
আনার সাহেব এক দৌড়ে নিচে চলে গেলেন এবং মিনিট দুয়েকের মধ্যে বাটিতে জল ও কাপড় এনে পায়রার হাতে দিলেন। পায়রা আর সময় নষ্ট না করে তোয়ালেটি পানিতে ভিজিয়ে নিংড়ে নিল। অত্যন্ত যত্ন ও মমতায় সায়মনের কপালে জলপট্টি দিতে শুরু করল ও। প্রখর তাপে বারংবার তোয়ালেটি শুকিয়ে উঠলেও পায়রা ধৈর্য ধরে অবিরত সেবা চালিয়ে গেল।
ঘণ্টাখানেকের আপ্রাণ প্রচেষ্টার পর প্রখর জ্বরের বেগ কিছুটা শিথিল হলো সায়মনের। কপালে শীতল তোয়ালের স্পর্শে আচ্ছন্ন ভাবটা কাটতেই ধীর গতিতে দুটি র’ক্তা’ভ অক্ষিপল্লব উন্মোচিত করল ও। ঘরের ছাদ ঝাপসা হতে স্পষ্ট হতেই, চোখের সম্মুখে কায়মনোবাক্যে সেবা দিতে থাকা স্নিগ্ধ রমণীর অবয়বটি দৃষ্টিগোচর হলো!
পায়রাকে নিজের শিয়রে বসে থাকতে দেখে সাইমন চরম বিস্ময়ে এক প্রকার ধড়ফড় করে লাফিয়ে উঠতে গেল,,
“পায়রা? ইউ… ইউ হিয়ার? কীভাবে…”
কিন্তু শারীরিক চরম দুর্বলতার দরুন মাঝপথেই ওর পুরো শরীর প্রতিক্রিয়া দেখালো। দৃষ্টিজুড়ে অন্ধকার ঘনিয়ে আসা মাত্র সায়মন পুনরায় বিছানার বুকে ঢলে পড়তে নিলে, পায়রা চট করে সামনে হাত বাড়িয়ে ওর কাঁধ আঁকড়ে ধরে সামলে নিল!
সায়মনের গায়ের প্রখর উত্তাপ আর অতল চোখের চাওয়া পায়রার বক্ষপিঞ্জরে এক অজানা কম্পনের সৃষ্টি করল। সায়মন কপালে হাত দিয়ে দুর্বল কণ্ঠে অস্ফুটে বলল,
“আপনি এখানে কি করছেন, পায়রা? হাউ ডিড ইউ নো?”
পায়রা নিজেকে সামলে গম্ভীর হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করল। সায়মনকে বালিশে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিয়ে অত্যন্ত রাশভারী স্বরে বলল,
“বেশি কথা বলবেন না, মিস্টার সায়মন! আপনার কেয়ারটেকার আমাকে ফোন দিয়েছিলেন। খুব সম্ভবত আপনি আমার সাথে শেষ বার কলে কথা বলেছিলেন, তাই কন্ট্রাক্ট লিস্টে আমার নামটা উপরে পেয়েছেন তাই উনি কল করেছেন। আর ভালোই হয়েছে যে এসছি, এভাবে কেউ গা ভাসিয়ে অসুস্থ হয়ে থাকে?”
সায়মন নিজের দুর্বল কণ্ঠে বলল,
“অযথা কষ্ট করতে গেলেন কেন? একা একা তো বেশ কেটে যাচ্ছিল… আই ওয়াজ ম্যানেজিং!”
সায়মনের এমন আত্মভোলা ও অবহেলাময় উত্তরে পায়রার মেজাজ গরম হয় খানিকটা। ও চট করে টেবিল থেকে ওষুধের প্যাকেট তুলে সায়মনের সামনে ধরে তীক্ষ্ণ গলায় বলল,
“হ্যাঁ, খুব ম্যানেজ করছিলেন! কপালে ১০০ ডিগ্রির উপরে জ্বর আর আপনি হাত কেটে, না খেয়ে বিছানায় কাতরাচ্ছেন! চুপচাপ ওষুধটা খান তো, জ্ঞান দিতে হবে না!”
সায়মন দৃষ্টি মেলে চায়। দু’দিন আগেই না মেয়েটাও ওর সাথে কথায় কথায় ঝগড়া করছিল। অথচ আজ একেবারে পেশাদার সেবিকার মত যত্ন করছে। মন্দ লাগছে না! আবার ভালোও না। ফ্ল্যাটটা সম্পূর্ণ ফাঁকা। সিরাজ সাহেব থাকলেও ব্যাপারটা নিয়ে এতটা মাথা ঘামাতো না সায়মন। কিন্তু একা ফ্ল্যাটে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে থাকাটা কিছুতেই মেনে নিতে পারল না ও। অবশ্য, কারণ একটাই–পার্শ্ববর্তী ফ্ল্যাট গুলোতে মানুষজন ঠাসা। বাজে কথা রটতে সময় লাগবে না, তাতে করে মেয়েটা সাহায্য করতে এসে ঝঞ্ঝাটে ফাঁসবে।
সায়মন সোজা হয়ে বসে দাঁতে দাঁত চেপে নিজের সমস্ত দুর্বলতা জোর করে চেপে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করল। অতঃপর অত্যন্ত শুষ্ক,গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“ধন্যবাদ পায়রা। কিন্তু আপনার আর এখানে থাকার দরকার নেই, আপনি এবার যেতে পারেন।”
পায়রা ভ্রু কুঁচকে, বিস্ময়াবিষ্ট নেত্রে ওর দিকে তাকাল। যে মানুষটি একটু আগেই জ্বরের ঘোরে কাৎরাচ্ছিল, তার মুখে এমন হঠাৎ অনভিপ্রেত শীতলতা দেখে মেজাজটা খিঁচে গেল ওর। সশব্দে পানির গ্লাসটা টেবিলে রেখে বেশ ঝাঁজের সঙ্গেই বলল,
”“মানে? হঠাৎ তাড়িয়ে দিচ্ছেন কেন? আপনার কি মাথাটা সম্পূর্ণ খারাপ হয়ে গেছে নাকি?”
সায়মন পায়রার চোখের দিকে সরাসরি তাকাতে পারল না। দৃষ্টি এড়িয়ে, কণ্ঠে যথাসম্ভব কৃত্রিম কঠোরতা এনে বলল,
“আমি সত্যি বলছি, আই অ্যাম একদম ফাইন নাউ। একটু পরেই আমি নিজে ড্রাইভ করে ডাক্তারের কাছে চলে যাব, সো ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু ওরি। আপনি প্লিজ এবার আসুন।”
“আপনি ফাইন?শরীরে এখনো চৈত্রের রোদের মতো উত্তাপ, আর আপনি বলছেন একা একা ডাক্তারের কাছে যাবেন? ঠাট্টা করছেন আমার সাথে? চলুন, আমি আপনাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছি।”
পায়রার এহেন অদম্য জেদে সায়মনের ভেতরের শক্ত বাঁধটা ভেঙে যেতে চাইলেও ও নিজেকে সামলে নিল অত্যন্ত সংযমের সাথে। অত্যন্ত নিচু অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“বুঝতে চেষ্টা করুন পায়রা, এখানে বেশিক্ষণ থাকাটা আপনার জন্য ঠিক হচ্ছে না। খালি ফ্ল্যাটে একটা প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের এভাবে অচেনা পুরুষের সাথে থাকাটা আশেপাশের মানুষ ভালোভাবে নেবে না। অহেতুক কটু কথা আর স্ক্যান্ডাল রটবে, যা আমি কোনোদিনও হতে দেব না। তাই বলছি, জাস্ট লেট মি হ্যান্ডেল দিস। প্লিজ, এবার বাড়ি ফিরুন।”
সায়মনের দূরদর্শী অথচ সংবেদনশীল কথাগুলোর পেছনের প্রচ্ছন্ন সুরক্ষাবলয়টি মুহূর্তেই উপলব্ধি করতে পারল পায়রা। ওর স্পষ্টভাষী মেজাজটি নিমেষেই যেন শান্ত হয়ে এলো। বুঝতে পারল, লোকটার এই রূঢ়তার পেছনে কেবল ওরই সম্মানের ভাবনা লুকিয়ে আছে।
পায়রা আর জোর করল না। এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে, টেবিল থেকে নিজের হ্যান্ডব্যাগটি তুলে নিয়ে সায়মনের দিকে শান্ত চোখে চাইল,
অভিসৃতি পর্ব ২১
“ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি। কিন্তু প্রমিস করুন, এখনই আপনি কেয়ারটেকার আঙ্কেলকে সাথে নিয়ে ক্লিনিকে যাবেন আর আমাকে ফোন করে আপডেট দেবেন?”
সায়মন মৃদু মাথা নেড়ে অস্ফুটে বলল,
“প্রমিস। সাবধানে বাড়ি পৌঁছাবেন।”
পায়রা সম্মতি সূচক মাথা নাড়িয়ে, ধীর কদমে প্রস্থান করল।
