ডেসটেনি পর্ব ৪০
সুহাসিনি মিমি
মুখটা গোল করে রোবোটের মত দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে অর্ণব। তাজধীর অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে পাঞ্জাবির কলারটা টানল আরেকবার। কেশে গলা ঝাড়লো। অস্বস্তিটা ঢাকতে চেহারায় গম্ভীর ভাবটা ফিরিয়ে আনতে চাইল খুব করে।
এই বুঝি ব্যাটা সিসি ক্যামেরা সবটার কৈফিয়ত জানতে চাইল। তাজধীর যে পর্যন্ত একে না বুঝাচ্ছে সে পর্যন্ত এ বান্দা হাত ধুয়ে পরে থাকবে ওর পিছনে। তবে তাজধীর কে পুরোদস্তর তাজ্জব করে দিয়ে অর্ণব হুট্ করে বলে উঠল,
’আমি কিন্তু কিচ্ছু দেখিনি ভাই! সত্যি বলছি, আমি একদম কিচ্ছু দেখিনি! আর সবচেয়ে বড় কথা আমি কিন্তু পুরো ব্যাপারটা হান্ড্রেড পার্সেন্ট বুঝে গেছি। এসবই তো ওই অ্যাক্সিডেন্ট তাই না? ইটস কমপ্লিটলি ওকে ভাই! এক্সিডেন্টালি তুই করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলি। এক্সিডেন্টালি ভাবিও ভুল করে ওই অন্ধকার রুমটার ভেতরে ঢুকে পড়েছে। আর ঠিক তখনই পথ ভুল করে এক্সিডেন্টলি তুইও ওই একই রুমে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিস! তারপর হাওয়ার ধাক্কায় ধুম করে এক্সিডেন্টলি রুমের দরজাটাও লক হয়ে গেছে! আর আমি? আমি তো ভাই নিছক একজন পথচারী! এক্সিডেন্টলি এই জুসের গ্লাস হাতে একদম সঠিক সময়ে এখানে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছি! ইট ওয়াজ জাস্ট আ চেইন অফ এক্সিডেন্টস, রাইট?’
অর্ণবের এরূপ বাক্যয় ভ্যাবাচ্যাকা খেলো তাজধীর।
পরক্ষণেই নিজের ভড়কে যাওয়া চেহারাটা সামলে চোয়াল শক্ত করল। এর সঙ্গে আপাতত একই জায়গায় থাকা মানেই বিপদ। তাই সামনের দিকে পা বাড়াল তাজধীর। যেতে যেতে অর্ণবের উদ্দেশ্য হাঁক ছাড়ল গজগজিয়ে,
’রাস্কেল!’
দাঁড়াল না তাজধীর। দীর্ঘ, ভারী পদক্ষেপে গজগজ করতে করতে করিডোর পেরিয়ে অন্যদিকে চলে গেল। তাজধীর যেতেই সেখানে ধীরপায়ে হেঁটে এলো ফাহিম। এক বন্ধুর চলে যাওয়ার দিকে আরেক বন্ধুকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফাহিম কপালে ভাজ ফেলে জিজ্ঞেস করল,
’কীরে? তুই এভাবে হা করে ওর দিকে এভাবে আহাম্মকের মত তাকিয়ে আছিস কেন? আর তাজধীর অত রাগে গজগজ করতে করতে গেল কেন? কী বলেছিস তুই ওকে?’
অর্ণব গ্লাসের অবশিষ্ট জুসটুকু এক নিঃশ্বাসে গিলে নিলো। মিটিমিটি হেসে জবাব দিলো,
’আর বলিস না রে ফাহিম!একটু আগে জীবনের সবচেয়ে ঐতিহাসিক একটা অ্যাক্সিডেন্ট স্বচক্ষে দেখে ফেললাম!’
ফাহিম আরও বেশি বিভ্রান্ত হয়ে কপাল কুঁচকাল,
‘মানে? কীসের আবোলতাবোল বকছিস তুই আবার?’
অর্ণব আর কোনো ব্যাখ্যায় গেল না। মাথা নেড়ে হতাশ গলায় বলল,
‘তুই বুঝবি না। এটা বুঝতে হলে অ্যাক্সিডেন্টের সাক্ষী হতে হয়।’
ফাহিমের ভ্রু আরও কুঁচকে গেল।সন্দীহান হয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
‘কীসের অ্যাক্সিডেন্ট?কার অ্যাক্সিডেন্ট?’
অর্ণব গলা নামিয়ে বলল,
‘এক অ্যাকসিডেন্টাল হিটলারের চরম অ্যাকসিডেন্টাল রোমান্স!’
ফাহিম কিছুক্ষণ বোকার মতো তাকিয়ে রইল।
‘মানে?কী বলছিস বাল?কীসের অ্যাক্সিডেন্ট?’
‘রোমান্সের অ্যাক্সিডেন্ট।’
‘রোমান্স এর আবার অ্যাক্সিডেন্ট হয় নাকি?’
অর্ণব গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়ল।বলল,
‘হয়। একমাত্র আমাদের হিটলার কমান্ডার তাজধীর সিদ্দিক আযানের জীবনে হয়।’
‘তুই কী কিছু দেখেছিস? নাকি না দেখেই উল্টাপাল্টা বকছিস?’
অর্ণব খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল,
‘ আমি একজন প্রত্যক্ষদর্শী ভাই। একদম নিজ চোখে ধরেছি সালা কে।শুধু একবার প্রমাণটা হাতে পাই। এরপর হাতেনাতে ধরব খচ্চরটাকে!’
এই বলে জুসের গ্লাসটা ফাহিমের হাতে গুঁজে দিয়ে অর্ণবও গম্ভীর মুখে অন্যদিকে হাঁটা দিল।ফাহিম হাতে জুসের গ্লাস নিয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে চাইল অর্ণবের পথে। বিড়বিড় করল,
‘এই শালা আবার কী দেখল!’
প্রিয়ন্তী যখন আসল,দেখল মিতালীকে ঘিরে বসে আছে নুসরাত, মাহিরাসহ ওর সব মেয়ে কাজিনরা। প্রিয়ন্তী থমকে দাঁড়াল একপল। মিতালী অবশ্য দিব্যি স্বাভাবিক। ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে একেকজনের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে।প্রিয়ন্তী এগিয়ে আসতেই নুসরাত সবার আগে ওকে ডাকল,
‘এই যে প্রিয়! তুইও আয়। তোর ভাবিকে নিয়ে কিন্তু আজকে আমাদের অনেক অভিযোগ আছে!’
প্রিয়ন্তী অবাক হয়ে কাছে এসে বসল।শুষ্ক কণ্ঠে জানতে চাইল,
‘কী অভিযোগ?’
মাহিরা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
‘তোর ভাবির এত সুন্দর একটা ভাই আছে। অথচ এতদিন ধরে আমাদের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিস তোরা। এসব কী মানা যায় বল?’
নুসরাত উৎসাহ নিয়ে বলল,
‘সত্যি! আর তুইও বলিসনি আমাদের। এতো হ্যান্ডসাম একটা বেয়ায় আমাদের। ভাবতেই তো কেমন কেমন লাগছে!ভাইয়া কি সত্যিই কমান্ডার, ভাবি?’
‘হুম।’
‘নেভিতে?’
‘হুম।’
‘উফফ!’
কাজিনদের এই হইচই আর ব্যাকুলতা দেখে মনে মনে ফুসে উঠল প্রিয়ন্তী। মুখ ফুটে কিচ্ছু বলতেও পারছেনা। ননদের এহেন অবস্থায় ঠোঁট টিপে মিটিমিটি হাসছে মিতালি। ওদের একেকজনের একেক রকম উসখুস ভাব দেখে মনে মনে বেশ মজা পাচ্ছে ও। আড়চোখে বারবার প্রিয়ন্তীর দিকে তাকাচ্ছে। নুসরাত চট করে মিতালীর একদম কাছে ঝুঁকে আসলো।মিষ্টি গলায় বলল,
’ভাবি শোনো না! তোমার কমান্ডার ভাইটা কী সিঙ্গেল এখনো? মানে উনার কি কোনো পছন্দ-টছন্দ আছে নাকি খালি মাঠ? প্লিজ ভাবি, সত্যি করে বলো না! আমাদের মতো কিউট কিউট ননদদের একটু আকটু চান্স করে দাওনা।’
নুসরাতের আবদারে পুরো কাজিন মহল একযোগে হেসে উঠল। সবাই অধীর আগ্রহে মিতালীর মুখের দিকে চাইল উত্তরের আশায়। মিতালী আফসোস করে বলল,
’ইশ! তোমাদের আগ্রহ দেখে আমার নিজেরই খুব খারাপ লাগছে মেয়েদল! কিন্তু কী আর করা বলো? চরম সত্যিটা হলো আমার ওই গম্ভীর ভাইটি অলরেডি এনগেজড! সো সরি ডিয়ারস!’
’কীইইই?’
উৎসচ্ছাসিত মুকগুলো মলিন হয়ে এলো নিমিষেই। আধার নেমে এলো সকলের চেহারায়। নুসরাত হাহুতাশ করতে করতে বলল,
‘হায় হায়! বল কী ভাবি?এতো জলদি বুকড হয়ে গেছে? এ কেমন বিচার আল্লাহ!’
’তোমরা এভাবে মন খারাপ করছ কেন বল তো? একটা কমান্ডার এনগেজড হয়েছে তো কী হয়েছে? তোমাদের দুই বোনের মতো তোমাদের জন্যও ঠিক ওরকমই আরো ড্যাশিং কমান্ডার ধরে নিয়ে এসে বিয়ে দেব!’
নুসরাত ভ্রু দুটো কুঁচকে তীক্ষ্ণ চোখে মিতালীর দিকে তাকাল। মাথা চুলকাতে চুলকাতে ফট করে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
’দাঁড়াও দাঁড়াও ভাবি! দুই বোন মানে? আমাদের পুরো পরিবারে তো কমান্ডারের সাথে বিয়ে হচ্ছে শুধু আমাদের মেহেরিনের! তাহলে তুমি আবার দুইজন পেলে কোথায়?অন্য বোনটা আবার কে?’
প্রিয়ন্তী এতক্ষণ নীরব দর্শক হয়ে শুনলেও এযাত্রায় খুক খুক করে কেশে উঠল। আড় চোখে চাইল ভাবির দিকে। মিতালী অবশ্য অভিজ্ঞ হাতে পরিস্থিতি সামলে নিলো। হুট করে গলা চেপে জোরে জোরে কাশতে কাশতে বলল,
‘আরে নুসরাত!একটু ঠান্ডা জুস্ দাওতো। ঐযে ঐটা।’
নুসরাত ব্যস্ত পায়ে উঠে এদিক ওদিক চাইল। খুঁজল জুস্। এক কোণায় পেয়েও গেলো। শাড়ির কুচি সামলে সেখানে গেল। এরপর এক কথায় দু কথায়, প্রসঙ্গ পাল্টালো মিতালী। কোথা উঠল সেহরোজ কে নিয়ে। মিতালী আগে থেকেই সেহরোজ কে চিনায় ওরা সবাই সেহরোজ এর সম্পর্কে এটা সেটা জানতে চাইল। মিতালীও আয়েশ করে করে প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর দিলো। কবে থেকে পরিচয়, কিভাবে পরিচয় সবটা খুলে বলল একে একে।
.
ভোরের কুয়াশার পাতলা চাদর সরিয়ে গ্রামের আকাশে ফুটফুটে রোদ উঠেছে। পাখিদের কিচিরমিচির আর মেহগনি গাছের পাতার ফাঁক গলে আসা সোনালী আলোয় হাওলাদার বাড়ির উঠানটা বেশ স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে। শেখ বাড়ি ও হাওলাদার বাড়ির মাঝখানে কেবল একটি বাড়ির ব্যবধান মাত্র। সামান্য দূরে হলেও প্রিয়ন্তীদের দোতলা বাড়ির ছাদ আর সামনের বারান্দাটা হাওলাদার বাড়ির উঠান থেকেই স্পষ্ট পরিলক্ষিত হয়।
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে উঠানে এসে দাঁড়িয়েছে তাজধীর। ধীর পায়ে উঠানের একদম শেষ সীমানায় এসে দাঁড়াল সে। সেখান থেকে চোখ তুলে সোজা তাকাল প্রিয়ন্তীদের বাড়ির দিকে। প্রিয়ন্তীর ঘরের বারান্দার গ্রিলটার দিকে একমনে চেয়ে রইল তাজধীর। গতকালের কথা স্মরনে আসতেই আলগোছে বাঁকা হাসি ফুটল অধর কোণে!পকেট থেকে ফোন বের করল। স্ক্রিন অন করেই কল লাগালো কাউকে।
সকাল করেই আজ ঘুম থেকে উঠেছে মিতালী। শশুর বাড়ির আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে নাস্তা শেষে রুমে আসলো সবেই। আসতেই দেখল ওর ফোনটা বেজে চলেছে। মিতালী খাটের ওপর থেকে ফোন উঠিয়ে পরখ করল। দেখল ওর ভাইয়ের নাম্বার। এতো সকালে ওর ভাই ওকে কল দিয়েছে? ভাবতেই ভ্রু কুঁচকে গেল মিতালীর। তড়িঘড়ি রিসিভ করল ফোনটা। বলল,
’হ্যাঁ ভাইয়া, বল?’
তাজধীর চোখের চাহুনি প্রিয়ন্তীদের বাড়ির ছাদের দিকে স্থির রেখেই বলল,
’ভাই এসেছে, কোথায় ভাইয়ের একটু খোঁজ খবর নিবি। ভাই খেয়েছে কিনা জানতে চাইবি। তা না নতুন পরিবার পেয়ে দিব্যি ভাইকে ভুলে বসে আছিস দেখছি।’
ভাইয়ের এহেন হেয়ালিপূর্ণ কথায় উত্তর দিলো মিতালী,
‘এসব বলার জন্য তো আর ফোন দাওনি নিশ্চই? তাই বলে রাখা ভালো, তুমি যার খোঁজে ফোন দিয়েছো সে এখনো ঘুমাচ্ছে। উঠেনি।’
তাজধীর খানিকটা থতমত খেল। ওর বোনটাও হয়েছে একদম ওর মতোই। নিজের ভড়কে যাওয়া ভাবটা সামলাতে এক হাতে চুল টানলো পিছনের দিকে। পরপর আদেশ করল বোনকে,
’ননদকে কি একদম নিজের মতো বানাতে চাইছিস নাকি? এখন কটা বাজে খেয়াল আছে? বেলা পার হতে চলল, আর সে এখনো নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে! মেয়েটাকে একটু আদব-কায়দা বা সংসারের কাজকামও তো শেখাবি ? দুদিন পর যে শ্বশুরবাড়ি যাবে, এভাবে পড়ে পড়ে ঘুমাতে দিলে কাজ শিখবে কখন?’
ফিক করে হেসে উঠল মিতালী। টেনে টেনে বলল,
’কী করব বলো ভাইয়া? ননদের পাশাপাশি সে তো এখন আমার বড় ভাবিও বটে! তো সেই হিসেবে বড় ভাবিকে কি আর এত হুকুম দিয়ে কাজ করানো বা কাজকাম শেখানো যায়, বলো?’
‘হয়েছে। তা ম্যাডামের ফোন বন্ধ কেন?’
’সেটা তো জানি না ভাইয়া! বোধহয় চার্জ নেই। দাঁড়াও ডেকে দিচ্ছি!’
ফোনটা হাতে নিয়েই মিতালী দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল প্রিয়ন্তীর রুমের দিকে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখল ননদ তার তখনো বিছানায় উপুড় হয়ে আরামে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে! এলোমেলো কালো চুলগুলো বালিশজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। মুখখানা নিষ্পাপ শিশুর মতো শান্ত।মিতালী গিয়ে পাশে বসল। আলতো করে ডাকল,
’প্রিয়? এই প্রিয়! ওঠ রে আর কত ঘুমাবে?’
প্রিয়ন্তী অলস ভঙ্গিতে একটু নড়েচড়ে উঠল। বালিশে মুখ গুঁজে আধো-বোঁজা চোখে ঘুমে জড়ানো কণ্ঠে গ্যানগ্যান করে বলল,
’উফ ভাবি… ঘুমাতে দাও না প্লিজ! বড্ড ঘুম পাচ্ছে!’
মিতালী ঠোঁট টিপে হেসে ফোনের স্পিকারটা চট করে প্রিয়ন্তীর কানের কাছে ধরে বাঁকা সুরে বলল,
’এই যে ননদিনী! আগে উঠে কথা বলে ঠান্ডা করুন আপনার স্বামীকে! বেচারার আপনার চিন্তায় রাতে ঘুমই হয়নি।’
স্বভাবতই প্রিয়ন্তীর ঘুম গভীর। রাতে এমনিতেই ঘুমিয়েছে দেরি করে।তাই ওভাবেই ঘুমে তলিয়ে রইল। মিতালী ডাকল আবারও,
’আরে বাবা!একটু তো কথা বল। ভাই আমার তো সকাল সকালেই ফোন করে এজেন্টের ওপর ঝাড়ঝাড় শুরু করেছে।’
‘এজেন্টের দায়িত্ব যখন নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছ, তখন এমন প্রেশার তো সহ্য করতেই হবে!’
নড়েচড়ে উত্তর দিলো প্রিয়ন্তী। মিতালী আর কোনো কথা না বাড়িয়েই ফোনটা ধরিয়ে দিলো প্রিয়ন্তীর হাতে। এরপর বেরিয়ে গেল রুম ছেড়ে। প্রিয়ন্তী ঘুমঘুম চোখে ফোনটা কানের কাছে চেপে ধরে ক্ষীন কণ্ঠে শুধাল,
’হ্যাঁ… হ্যালো?’
আধো-আধো, ঘুমঘুম কণ্ঠস্বরটি স্পিকার গলে তাজধীরের কানে পৌঁছানো মাত্রই এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল লোকটা! বুকের ভেতরের স্পন্দন থমকে দাঁড়াল। বাঁ হাতের তালুটা নিজের সুগঠিত বুকের বা পাশে এনে আলতো করে চেপে রাখল সে। চোখের পাতা আপনাআপনি বন্ধ হয়ে এলো।আকস্মিক এক মাতাল অনুভূতির ঢেউ আছড়ে পড়ল শরীরজুড়ে। যেই অনুভূতির শীতল স্পর্শ একদম অসাড় করে দিল তাকে! গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল তাজধীর। কয়েক সেকেন্ডের মোহাচ্ছন্নতা কাটিয়ে স্বরটা কিছুটা স্বাভাবিক করল ও। খানিকটা গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
’ফোন বন্ধ ছিল কেন আপনার?’
প্রিয়ন্তী ওপাশে চোখ বুঁজেই জড়ানো গলায় বলল,
’চা-চার্জ ছিল না ফোনে!’
তাজধীর নিজের কণ্ঠস্বরটা এক ধাক্কায় অনেকটা খাদে নামিয়ে আনল। নিচু স্বরে বলল,
’সামনে আসেন একবার, পুরো চার্জ দেওয়ার সুব্যবস্থা করছি!’
প্রিয়ন্তীর ঝিমানো মস্তিস্কতা সচল হলো আচমকাই। কথাটা পুরোপুরি বুঝতে না পেরে সন্ধিহান কণ্ঠে শুধাল,
’ক-কিছু বললেন?’
’জি না! তা ম্যাম, আপনি কাল রাতে আসলেন না যে?এই যে একের পর এক আমার হুকুম অমান্য করে নিজের শাস্তির পরিমাণটা অনবরত বাড়াচ্ছেন। সবকটা শাস্তি কিন্তু সুদে-আসলে একদম একসাথে উসুল করব। তখন কিন্তু সেই শাস্তির উত্তাপ একা সামলাতে পারবেন না আপনি। নিতে পারবেন তো সেই ভার, মাই লেডি?’
মিউয়ে এলো প্রিয়ন্তী। গায়ে জড়ানো কাথাটা খামচে ধরল হাতে। বুকটা দড়াস দড়াস করে কেঁপে উঠল। মারাত্মক ইতস্তত বোধ করল ও। কী উত্তর দেবে, কী বলবে খুঁজে পাচ্ছিলোনা। আমতা আমতা করে বলল তাই,
’আ-আসলে… মানে কাল রাতে আমি… ঘুমিয়ে পড়েছিলাম খুব ক্লান্ত হয়ে।’
তাজধীর বিড়বিড় করে বলল,
’কিছু করার আগেই এতো ক্লান্ত?’
‘জি কিছু বললেন?’
‘জিহ নাহ! বারান্দায় আসুন তো।’
‘কেন?’
‘হেলিকোপটার নিয়ে আপনার জন্য অপেক্ষা করছি তুলে নিয়ে যাবো তাই!’
প্রিয়ন্তী বেঙ্গাল মনে মনে। উঠে দাঁড়ালো এরপর। ফোনটা কানে ধরেই তড়িঘড়ি বিছানা ছাড়ল। ওড়নাটা খুঁজে নিয়ে গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো বারান্দায়।
হাওলাদার বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে আছে তাজধীর। মাঝ খানে খুব একটা দূরত্ব না থাকলেও দুজনের চেহারা বুঝা যাচ্ছেন স্পষ্ট। প্রিয়ন্তী বারান্দায় দাঁড়াতেই সকালের রোদ্দুর এসে ভারি খেল ওর ঘুমন্ত চেহারায়। অগোছালো, এলোমেলো চুল, ফোলা ফোলা গাল, ঘুম ঘুম চোখের প্রিয়ন্তীকে দেখে মন্ত্রমুগ্ধর ন্যায় চেয়েই রইল তাজধীর। এমন অবস্থায় মেয়েটাকে আর আগে কখনো দেখেনি সে।
তাজধিরের গায়ে ছিল একটা মব কালারের পোলো টি শার্ট। সাথে এডিদাস এর একটা কালো ট্রাওজার। একহাত পকেটে গলিয়ে আরেকহাত কানে চেপে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। ঐদিকে চোখ পড়তে প্রিয়ন্তীরও নাজেহাল অবস্থা। লোকটাকে যেন সব রঙেই মানিয়ে যায়। মানতে হবে লোকটার ড্রেসিং সেন্স মারাত্মক।
’আমার রাতের ঘুম নষ্ট করে দিয়ে নিজে আরামসে ঘুমাচ্ছিলেন এটা কি মানা যায়?’
লজ্জায় কান দিয়ে গরম ধোঁয়া উঠল রমণীর। কথার মোড় পাল্টাতে থতমত খেয়ে হুট করে প্রশ্ন করে বসল,
’আ-আপনি খেয়েছেন সকালে?’
‘জি নাহ।’
‘আরে প্রিয়! তুই উঠে পড়েছিস? ভাগ্যিস উঠলি! জলদি নিচে চল। নাস্তা সেরে ঝটপট রেডি হয়ে নে। আমরা কিন্তু সবাই অলরেডি রেডি! একটু পরই কিন্ত বের হব আমরা!’
কথাগুলো বলতে বলতেই নুসরাত হন্তদন্ত হয়ে রুম পার হয়ে সোজা বারান্দায় এসে দাঁড়াল প্রিয়ন্তীর পাশে। আতঙ্কে চমকে উঠে চট করে কান থেকে ফোনটা নামিয়ে কল কেটে দিল প্রিয়ন্তী! নুসরাত এসে দাঁড়াল ওর কাছ ঘেঁষে। বারান্দার গ্রিল ধরে নিচে তাকাতেই নুসরাতের নজর গিয়ে পড়ল হওলাদার বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে থাকা তাজধীরের ওপর। কানে ফোন ধরা অবস্থায় লোকটা দাঁড়িয়ে আছে। মুখের কথা মুখেই আটকে রইল মেয়েটার।
‘ঐটা ভাবির ভাইটা না?’
আঙ্গুল উঁচিয়ে সেদিকে দেখাতেই প্রিয়ন্তী খপ করে হাত চেপে ধরল বোনের।ইশারায় চোখ রাঙালো। নুসরাত পাত্তা দিলোনা। জোড় করে হাত ছাড়িয়ে বুঁকের পাশটা চেপে ধরে বলল,
’ও মাই গড! আল্লাহ! লোকটা এতো হ্যান্ডসাম কেন রে বোন? ইশ আর কিছুদিন আগে যদি ব্যাটাকে পেতাম না। তাবিজ করে হলেও আমার করে রাখতাম।’
‘নজর সামলা মাইয়া। অন্যের জিনিসে এভাবে নজর দেয়া ঠিক না।’
মিনমিন করে আওড়াল প্রিয়ন্তী। এরপর নুসরাত এর হাত চেপে জোরপূর্বক টেনে নিয়ে গেল ভিতরে।
প্রিয়ন্তী নুসরাতকে একপ্রকার টেনেহেঁচড়ে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার পরও তাজধীর তার দৃষ্টি সরালো না। হাত দুটি ট্রাউজারের পকেটে গুঁজে ধীর স্থির ভঙ্গিতে ওপরের ফাঁকা বারান্দাটার দিকেই তাকিয়ে রইল। ঠিক তখনই পাশ থেকে আবির্ভাব ঘটল অর্ণবের!চোখ কপালে তুলে অর্ণব একবার ওপরের ফাঁকা বারান্দার দিকে চাইল। পরক্ষণেই ঘাড় ঘুরিয়ে চাইল বন্ধুর দিকে।
’ সাতসকালে এইভাবে অন্যের বাড়ির বারান্দায় এভাবে চোরের মত উঁকিঝুকি মারছিস কেন হ্যা?’
অর্ণবের কণ্ঠে চোখ নামাল তাজধীর। হাতে থাকা ফোনটা সামনে এনে স্ক্রল করতে লাগল। অর্ণব কপাল কুঁচকে বলল ফির,
‘এ ব্যাটা! তোর লজ্জা-শরম কি একেবারেই ধুয়ে মুছে শীতলক্ষা নদীতে সাফ হয়ে গেছে? তুই না মাত্র সেদিন বিয়ে করলি? তুই এভাবে আমার পরীর মত ভাবি টাকে ঠকাচ্ছিস? এতটা অধঃপতন কবে থেকে হলো তোর?’
তাজধীর অর্ণবের আজগুবি বক্তৃতা শুনেও বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। শুধু এক নজর ঠান্ডা চোখে অর্ণবের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অর্ণবকে জবাব দেওয়া মানে নিজের মূল্যবান সময় আর এনার্জি দুটোই অপচয় করা। পাশেই ওদের জিপটা পানির পাইপ দিয়ে পরিষ্কার করছিলো সেহরোজ। উত্তরটা দিলো সে’ই,
’ওইটা ওর শ্বশুরবাড়ি, গর্দভ!’
‘ওহ তাই নাকি? ঐটা আমাদের ভাবির বাড়ি? তা আগে বলবি না ব্যাটা। আমি তো ভাবলাম বিয়ের পরপরই পরকীয়ার খাতায় আমার বন্ধু নাম লিখাতে গেল নাকি আবার। মার ভাই মার। আরও মন ভরে উঁকি মার! প্রয়োজন হলে আমি নিচ থেকে একটা মই এনে দিচ্ছি, একদম সোজা বারান্দায় উঠে পড়!পরে গেলে আমরা তো আছিই ধরার জন্য!’
তাজধীর চোখ গরম করে চাইতেই অর্ণব পিছিয়ে দাঁড়ালো এক পা। পরপর কিছুক্ষণ হাঁ করে সেহরোজের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখ দুটো সরু করে বলল,
’হুমম! বুঝলাম! মানলাম ওর শ্বশুরবাড়ি দেখে সাতসকালে বারান্দার দিকে হাঁ করে দাঁড়িয়ে বউকে দেখছিলো।কিন্তু তুই? তুই ব্যাটা এখানে এত সকালে কী করছিস শুনি? তোর তো এখনো বিয়েই হয়নি! তার আগেই বউকে দেখতে লাইনে এসে দাঁড়িয়েছিস? এই ছিল তোর মনে?’
সেহরোজ পানির পাইপটা হাতে নিয়েই গজগজ করল। এরকম অদ্ভুত কথা একমাত্র এই অর্ণবের পক্ষেই বলা সম্ভব। ধমকে উঠল সেহরোজ,
’অর্ণব! ফালতু কথা বলবি না বলছি! দেখছিস না আমি এখানে কী করছি?’
‘কী করছিস?’
‘ইডিয়েট কাজ করছি দেখতে পাচ্ছিস না?’
’ওরে আমার কামলা রে! আমার গৃহস্থের খাটুনিদার রে! শোনেন শোনেন দেশবাসী, আমাদের সেহরোজ সাহেব নাকি কাজ করছেন! সবসময় তো কাজ বলতে বুঝিস আমাদের দুজনের পাছার পেছনে আঙুল দিয়ে প্যাঁচ মারা আর হুকুম চালানো! সেই তুই আজ নিজ থেকে এসে কাজ দেখাচ্ছিস কাকে? শশুর বাড়ির মানুষজন কে? নিজের ক্রেডিট নিতে চাচ্ছিস? ভদ্রতার মুখোশ পড়ছিস শশুর বাড়ির লোকদের সামনে?’
সেহরোজ এবার সত্যি সত্যি রেগে গেল।রক্তচক্ষু তুলে অর্ণবের দিকে একধাপ এগিয়ে এসে ভেতরের সমস্ত রাগ ঢেলে দিয়ে ধমকে উঠল,
’সবসময় এতো বারো লাইন বেশি বুঝিস কেন তুই? ব্লাডি ননসেন্স! শাট দ্য ফাক আপ!’
“আহারে!গালিটাও ঠিকঠাক উচ্চারণ করতে পারছে না ছেলেটা। তাজধীর রে ব্যাটা নিজের বাদ দিয়ে একবার বন্ধুর চিন্তাটাও কর! দেখছিস না একটু ভাবিকে দেখতে না পেয়ে আমাদের পাত্রটা কেমন ক্ষেপা ষাঁড়ের মত গুতাতে আসছে। মুখটাও কেমন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। ভাই, তোর না ওই বাড়ির সাথে কানেকশন চরম শক্তিশালী? ওই বাড়িতে তোর বউও আছে, আবার তোর নিজের বোনও আছে! দুটোই তো আছে ব্যাটা। তোর তো পাওয়ার এমনিতেই অনেক বেশি! তুই চাইলেই কিন্তু আমাদের পাত্রের মুখে হাসি ফুটাতে পারিস। একটু দেখার ব্যবস্থা করে দে ভাই। একটু দেখা করলেই বেচারার এই শুকিয়ে যাওয়া মুখটা একদম উজ্জ্বল হয়ে যাবে!’
অর্ণবের কথায় সেহরোজ রেগে ওর দিকে তেরে যাচ্ছিলো কী সুমি আসলেন সেখানে। হাতে একটা লিস্ট নিয়ে এসে সেটা ছেলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
’বাবু।নাস্তাটা সেরে একটু বাজারে যা তো বাবা। বাজারে গিয়ে এই জিনিসগুলো তাড়াতাড়ি কিনে নিয়ে আয়।’
সেহরোজ কপালে ভাঁজ ফেলে হাতের কাগজটা উল্টেপাল্টে দেখে খানিকটা অবাক হয়ে শুধাল,
’কিসের কাগজ এটা?’
’কিসের আবার বাজার? বিয়ের বাজার! শেষ মুহূর্তে তো কত কী-ই লাগে। তবে বেশিরভাগ প্রয়োজনীয় কেনাকাটাই আমি ঢাকা থেকেই গুছিয়ে রেডি করে এনেছি, চিন্তা করিস না। আপাতত এই টুকটাক জিনিসগুলোই লাগবে।’
সেহরোজ কাগজটা পকেটে পুড়তে পুড়তে বলল,
‘আচ্ছা!’
কথাটা বলতে বলতেই হঠাৎ মাঝপথে আটকে গেল সেহরোজ! মস্তিষ্ক এক ধাক্কায় থমকে দাঁড়াল। ফট করে চোখ তুলে চাইল মায়ের দিকে। ভ্রু দুটো এক করে বেশ অবাক হয়ে শুধাল,
’ওয়েট! আগে থেকে মানে? তুমি আগে থেকে সব রেডি করে রেখেছ কীভাবে? তুমি কীভাবে নিশ্চিত হলে যে আমি এই বিয়েতে রাজি হবই হব?’
ভদ্রমহিলা ছেলের এই গম্ভীর আর ভড়কে যাওয়া মুখ দেখে বিন্দুমাত্র ঘাবড়ালেন না। বরং উত্তর দিলেন সোজাসাপ্টা,
’কেন? অর্ণবই তো আমাকে ফোন করে সবটা রেডি রাখতে বলেছিল!’
বলতে বলতেই জিভ কাটলেন সুমি। ইশ!কী থেকে কী বলে দিয়েছেন তিনি? সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির ভিতরে অগ্রসর হতে হতে বললেন,
‘আমি নাস্তা রেডি করতে বলছি। তোমরা জলদি এসো সবাই!’
ওদিকে অর্ণবের কণ্ঠ শুকিয়ে এলো। শুকিয়ে যাওয়া মুখটা আরো করুন হলো যখন দেখল সেহরোজ ওর দিকেই চেয়ে আছে। চোখ দুটো গোল গোল করে, শুকনো একটা ঢুক গিলল অর্ণব। সেহরোজ হাতের কাগজটা মুঠো করে চেপে দাঁতে দাঁত চেপে অর্ণবের দিকে এগোতে এগোতে বলল,
’অর্ণবববব!’
অর্ণব সাথে সাথে উল্টো দিকে দিলো ভো দৌড়। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে চেঁচাল,
’আরে আন্টি! এটা কী করে গেলেন আপনি? আমাকে একেবারে মাঝসাগরে বলির পাঁঠা বানিয়ে ডুবিয়ে রেখে কোথায় পালাচ্ছেন?’
সেহরোজ চট করে পায়ের স্পঞ্জ জুতোটা খুলে আনল। ভয়ার্ত চিৎকার দিয়ে অর্ণব ছুটল পুরো উঠোন জুড়ে। থামল না সেহরোজও। একহাতে জুতো নিয়ে ছুটল সেও। বাড়ির উঠান আর প্যান্ডেলের চারপাশ ঘিরে অলরেডি দুই-তিন চক্কর দেওয়া হয়ে গেছে দুজনের! হাঁপাতে হাঁপাতে তিন নম্বর চক্কর দেওয়ার সময় অর্ণব নিজের প্রাণ বাঁচাতে চিৎকার করে উঠল,
’আরে সেহরোইজজ্জা রে ! কসম খোদার, এতে আমার কোনো দোষ নেই ! আমি কিচ্ছু জানি না! এসব চিপা বুদ্ধি আমার মাথা থেকে বের হয়নি! এসব শয়তানি প্লাগইন বের হয়েছে ওই শালা হিটলারের মাথা থেকে! ওই ব্যাটা আমাকে যা করতে বলেছিল, আমি তো ভাই শুধুই হুকুমের গোলাম হয়ে তাই করেছি!’
এতক্ষন শান্ত হয়েই দাঁড়িয়ে দেখছিল তাজধীর। নিজের নাম শুনতেই খানিকটা নড়েচড়ে দাঁড়াল। ততক্ষনে ফাঁকা বাতাসে শাঁ করে ছুটে সেহরোজের জুতোটা গিয়ে লাগল অর্ণবের পিঠ বরাবর!
’উফফ্ মা রে!’
অর্ণব ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলেও দৌড়ানো থামাল না। তবে পেছনে তাকিয়ে যখন দেখল সেহরোজ এক জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে, তখন ও-ও হাঁপাতে হাঁপাতে একহাতে নিজের পিঠটা ডলতে ডলতে থামল। বিড়বিড় করে চরম ব্যথাতুর গলায় বলে উঠল,
’কী নিশানা রে ভাই! অলিম্পিকে পাঠালে তো সোনার মেডেল নিয়ে আসতিস!’
সেহরোজ কপাল কুঁচকে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। সন্ধিহান,কড়া নজর গিয়ে পড়ল তাজধীরের ওপর। ওদিকে তাজধীরের ভাবখানা এমন যেন সে কিছুই জানেনা। করেনি কিছুই। সেহরোজ বিমর্ষ কণ্ঠে বলল,
’আযান… তুইও?’
ঠিক তখনই ভিতর থেকে হাই তুলতে তুলতে ধীরপায়ে বেরিয়ে এলো ফাহিম। ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা ফাহিমের হাত খানা সপাটে চেপে ধরে তাড়া দিয়ে বলল তাজধীর,
’আরে ফাহিম! এসেছিস তুই? এতক্ষণ ধরে তো তোর অপেক্ষাই করছিলাম। আয় আয়, জলদি আয়! নাস্তা একদম ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। আন্টি কতক্ষণ ধরে ডাকছেন! জলদি চল, জলদি!’
ফাহিম কে কিছু বলতে না দিয়েই ছেলেটাকে হলুস্তুরের মত টেনে নিয়ে ছুটল ভিতরে। সেহরোজ থমকে দাঁড়িয়ে রইল। অর্ণব মাটিতে পড়ে থাকা সেহরোজের জুতোটা তুলে এনে রাখল বন্ধুর পায়ের কাছে। নিজের পিঠটা সেহরোজের দিকে ঘুরিয়ে অত্যন্ত আকুল গলায় আর্জি জানাল,
’একটু ডলে দে না ভাই।সত্যি বলছি খুব লেগেছে!’
’অর্ণব!’
ডেসটেনি পর্ব ৩৯
এক ধমকেই সোজা হয়ে দাঁড়াল অর্ণব। পা বাড়াল বাড়ির ভিতরে। যেতে যেতে বলে গেল,
’হুমম! এখন তো আমাদের সহ্য হবেনা। ভালো কাজের দাম নাই বুঝলি?দেখব নে। বিয়েটা হতে না হতেই বউ নিয়ে বাসরঘরে ঢোকার জন্য এক পায়ে খাঁড়া হয়ে উঠেপড়ে লাগবি তখন! তখন সালা এর শোধ তুলব অক্ষরে অক্ষরে!’
