রাগে অনুরাগে পর্ব ৪৬
সুহাসিনি ফাতেহা
“নিয়ে যাবো।”
ফারাজের মুখে “নিয়ে যাবো” ওমন দুটো বাক্য শুনার-ই অপেক্ষা করছিলো যেন অপেক্ষারত রমণী। চোখমুখ উজ্জল হয়ে উঠলো সহসা।
ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল তৃপ্তির হাসি। খুশিতে একপ্রকার দিশেহারা হয়ে গেলো মেয়েটা।
মুহূর্তেই সবকিছু ভুলে গিয়ে আচমকা করে বসে আরেক কান্ড। ফারাজের গায়ের উপর দুপা ছড়িয়ে দিয়ে টানটান হয়ে শুলো উপুড় হয়ে। ফারাজ তার থেকে অনেক লম্বা ও ভীষণ চওড়া হওয়ায় তার পাদুটো ফারাজের হাটু অবধি ঠেকেছে আর মাথা ফারাজের কপাল পর্যন্ত এসেছে। মুখটা তুলে হুট করেই ফারাজের নাকের ডগায় চুমু খেলো পরপর খোঁচাখোঁচা দাড়িযুক্ত গালে চুমু খেলো অতন্ত খুশিখুমি মনে। ফারাজ ঘুম থেকে উঠায় এলোমেলো হয়ে আছে চুলগুলো। এতে সুদর্শন পুরুষটাকে যেন আরও মারাত্মক সুদর্শন লাগছে। তিতলি ঢোক গিলে ফারাজের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মুখ ফসকে বলেই বসল,
“আপনি এত্তো ভালো হয়ে গেলেন? আমার যে কি খুশি লাগতেছে, এখন আর আমাকে আগের মতো ধমক দেননা কেন?”
ওদিকে তিতলির কান্ডে ফারাজ হাসবে নাকি কাঁদবে ঠিক বুঝতে পারছেনা। তার চোখদুটো তখনো তিতলির পেলব মুখখানার পানে স্থির।
তিতলির সাথেসাথে সেও খুঁজতে বসেছে তিতলির কথার উত্তর। যেমন, আজকাল মেয়েটার কোনো কথায় সে ফেলতে পারেনা। এইযে এখন এত আদুরে গলায় আবদার করলো, যদি না বলতো যেন নিজের মনেই শান্তি পেতো না। সাথেসাথে আরও অনেক কারণ আছে। যেগুলোর কোনো কারণ-ই সে খুঁজেনি। মূলত খোঁজার প্রয়োজন-ই মনে করিনি। হয়তো দীর্ঘসময় একসাথে থাকায় মায়া জন্ম নিয়েছে। এর বেশি কিছু সে ভাবেনি। তবে এখন..এখন আরও কিছু কারণ খুঁজতে ইচ্ছে করছে, বড্ড ইচ্ছে করছে কি এমন কারণ? তবে এখন এত কিছু ভাবার সময় তার কাছে আছে কি? তার বউ তাকে স্বেচ্ছায় চুমু খেল আর সে এখন কিছুই করবেনা তা কি করে হয়? এভাবে গায়ের উপর শুয়ে যে তাকে সিডিউস করে দিচ্ছে ওটা কি তার বউ আদৌ জানে? এখন তো সে ছাড়বে না। তাছাড়া এতবড় একটা সুযোগ হাতছাড়া করবার মানুষও তো সে নয়। তক্ষুনি বাঁকা হাসল যুবক। অসম্ভব রকম গরমে জ্বলে’পুড়ে যাচ্ছেন তেমন ভাব-ভঙ্গিমা ধরে রেখেই আওড়ালেন,
“রুমটায় এসি চলছে তাও মনে হচ্ছে খুউব গরম। উফফ, বরফ ঠান্ডাতেও গরম লাগে। কি করা যায় বলো তো?”
তিতলি ভ্রু কুঁচকালো তৎক্ষণাৎ । চোখ ছোট করে ফারাজের দিকে তাকাল। কই তার থেকে তো কোনো গরম লাগছেনা। বরং সারারাত ধরে এসি চলায় গা শীতল হয়ে এসেছে। এই লোকের জন্য আবার এক্সর্টা গরম কোথা থেকে আসলো। ফারাজের পেটে বুকে হাত বুলিয়ে দেখল সব তো ঠান্ডা লাগতেছে তার কাছে। সন্দেহের গলায় ফারাজকে প্রশ্ন করলো,
“বেশি গরম লাগছে? পাখা নিয়ে আসব?”
অলোক্ষে ঠোঁট পিষে হাসল ফারাজ। বালিশ থেকে মাথাটা একটু উঁচু করে মুখটা আরেকটু ঝুঁকিয়ে এনে,ফারাজ কেমন গভীর দৃষ্টে তাকাল মেয়েটার মায়াবী চোখদুটোর পানে। অতঃপর বাঁকা কন্ঠে আওড়ালো,
“উঁহু, খুউব বেশি,এই গরম তো এসি, ফ্যান, পাখা দিয়েও কমার নয়। গেঞ্জি তো নেই এখন ট্রাউজার টাও খুললে যদি একটু-আধটু স্বস্তি পাই আরকি!”
ফারাজের এরূপ কথায় তরাগ চোখ তুলে চাইলো তিতলি, ফারাজের এমন ঘুরানো পেঁচানো কথাগুলো এখনো তার কানে বজ্রপাতের ন্যায় বাজছে। ভ্রুকটি করে ভাবছে, কি বুঝাতে চাচ্ছেন ওনি? ট্রাউজার খুললে গরম কমবে? মতলব তো সুবিধার লাগছেনা। তক্ষুনি নাকমুখ কুঁচকে ঝাঁঝিয়ে শুধালো,
“মনে হচ্ছে কেয়ামত গনিয়ে এসেছে? মাথার একহাত উপর সূর্য! আর সেই গরম সহ্য করতে না পেরে আপনার ট্রাউজারও খুলে ফেলতে হবে। কি ঠিক বলছি না?”
তিতলি শুধু তাতেই থামল না। পরপরই ফারাজের দিকে তাকিয়ে থেকে সন্দেহের গলায় বললো,
“কি বোঝাতে চাচ্ছেন সেটা সোজা বলে দিলেই পারেন। এত নাটক করেন কেন?হুহ!”
ফারাজ ভ্রু উঁচিয়ে হাসল। তার মুখভঙ্গি দেখে মনেই হচ্ছেনা সে তিতলির কথাগুলো একটুও গায়ে মেখেছে। গা ছাড়া ভাবটা যা ধরেছে না? এখন তিতলি যাই বলুক তার বলার ধরণ বদলাবে তো আদৌ? তিতলিকে আরও জ্বালিয়ে মারার জন্য বললো,
“আমি বলা শুরু করলে আর থামব না? এখন শুরু করবো নাকি করবো না সেটা পুরোপুরি তোমার উপর ডিপেন্ড করে, ডিপেন্ডস অন ইউ।”
তিতলি ভাবলো কি এমন বলবে? সেও একটু শুনতে চাই? তবে সেটা মুখে পুরোপুরি স্বীকারোক্তি না দিলেও কথার মাঝেই বুঝিয়ে দিলো সে আসলে শুনতে চাই,
“আপনি বলুন আর নাই বলুন আপনার বলা না বলা দিয়ে কি আমি ধুয়ে ধুয়ে পানি খাবো?”
ফারাজের অভিব্যক্তি একটুও বদলাল না। শুধু একটু নাক কুঁচকে মৃদু গলায় বলল,
“শুধু পানি নয়,চাইলে কিন্তু রসও খেতে পারো।”
“খেঁজুর গাছের রস? এখন রস কোথায় পাবো?”
“আমার কাছে আছে।”
কপাল গোছালো তিতলি। মুখাবয়বে হতভম্বতার রেশ ধরে আচানক মুখ তুলে শুধালো,
“কই দেখি।”
তিতলি বলতে দেরি ফারাজের ইশারায় কিছু দেখাতে দেরি হলোনা। তিতলি থতমত খেয়ে গেলো ফারাজের এমন ইশারা দেখে। একসময় তিতলিও অনায়াসে বুঝে গেল লোকটার মতলব। এবং যা বুঝল তা অত্যন্ত সংবেদনশীল ও লজ্জাজনক পর্যায়ের ইশারা। নিমিষেই ছেয়ে গেল গাল বরাবর লালিমা। ফারাজ শুধু তাতেই থামেনা। হঠাৎ তিতলির কানের কাছে মুখ নিয়ে ইশারায় দেখানো কথাটার মানে বোঝাতে শুরু করল। ধীরলয়ে এমন
কিছু কথা বললো, যা কর্ণকুহরে পৌছানো মাত্রই দুহাতে কান চেপে ধরলো তিতলি,
“থামুন, অসভ্য লোক !”
ফারাজ ঠোঁট কামড়ে ক্ষীণ নাচাতে নাচাতে বলল,
“আমি আগেই বলছি আমি একবার বলা শুরু করলে আর থামব না। তুমি সোজা বললেই পারতে যে আমি কিছু শুনতে চাইনা। বলার সুযোগটা তো তুমি নিজেই করে দিয়েছো। রাইট নাও?”
“মা..মানে?”
“ইউ ডোন্ট নো দ্যাট মিসেস তিতলি? ওকে ফাইন, বুঝিয়ে বলতেছি, পাখি চাই তার খাঁচায় ঢুকতে…”
ফারাজের কথা পথিমধ্যেই থেমে গেলো। তিতলি লজ্জায় মরিমরি হয়ে দুহাতে ফারাজের মুখ চেপে ধরলো তৎক্ষণাৎ। কোন পাখি খাঁচায় ঢুকতে চাই? আজব ব্যাপার স্যাপার তো। যত যাই বলুক অত্যন্ত এটা বুঝলো ফারাজের মুখ আর সহজে থামবেনা। তাইতো থামানোর চেষ্টায় মুখ চেপে ধরেছে। কিন্তু তাতেও ঘটলো ঘোর বিপত্তি। ফারাজ চোখে হাসল যেন। ধারালো দাঁতের ছোঁয়ায় মুখে চেপে রাখা তিতলির নরম আঙুল কামড়ে ধরল। তিতলি ব্যথায় কুঁকিয়ে উঠে। অস্পষ্ট আওয়াজে আর্তনাদ করে এক ঝটকায় নিজের হাত সরিয়ে আনলো।
তাও ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে,
“কোন পাখি?”
ফারাজ চোখ ছোট করে রেখে, তিতলির মাথার চুল এলোমেলো করে দিতে দিতে ঠোঁট কামড়ে হাসল। পাতলা অধর নেড়েচেড়ে বলল,
“আমি আকাশে উড়া পাখির কথা বলছি। তুমি ছোট মাথায় অন্যকিছু ভেবে বসে আছো নিশ্চয়? আমি ঐসব নোংরা কথা বলিনি।”
“আমি কোনো অন্য কথা ভাবিনি আমি খাঁচার পাখির কথায় ভাবছি।”
সহজ সরল মনে কথাটা বলে তিতলি এক লাফে বিছানা থেকে নেমে গেলো। উফফ! আঙুল বুঝি খেয়ে নিয়েছে। নিজের আঙুলে ফু দিতে দিতে ফারাজের গা থেকে নেমে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। ফারাজ আর তিতলিকে জ্বালালো না। যথেষ্ট হয়েছে। তিতলি দরজা খুলে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। এই অসভ্য লোক তাকে শান্তিতে থাকতে দিবেনা।
নাছিমা বেগমকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ডাক্তার পরিক্ষা-নিরিক্ষা করে বলেছেন ওনার মুখের অবস্থা গুরুতর। যাকে বলে সহজে ঠিক হবেনা। তাও মলম ঔষুধ দিয়েছেন। কিছুক্ষণ আগে আবার বাড়িতে আনা হয়েছে। নাছিমা বেগমের রুমে এখন শুধু নাছিমা বেগম আর তার ছেলে রোহান। মা ছেলে কি নিয়ে যেন কথা বলছে। ফারাজ সে রুম দিয়ে পাড় হওয়ার সময় ফিসফিসানো কথা শুনে আচমকা,অজান্তেই দাঁড়িয়ে গেলো। সে জানে কারও কথা লুকিয়ে শোনা ঠিক নয়। কিস্তু সন্দেহের বশত শুনতে ইচ্ছে হলো বড্ড। ভেতর থেকে ফিসফিসিয়ে ভেসে আসছে নাছিমার বেগমের কথাগুলো,
আমি তখন বুঝতে পারিনি রে রোহান। চোখে ঝুল পড়তেই আমি কলপাড়ে দৌড় দিয়েছিলাম। এতকিছু মনে ছিলোনা তখন। পানি গুলো তে আমি ওই মেয়ের জন্যই মেডিসিন মিশিয়ে রেখেছিলাম। ফারাজ কলপাড়ের বালতিতে পানি রেখেছে তার বউয়ের জন্য ওটা শুনেই তো তোকে বলছিলাম কিছু একটা করতে হবে।
“যা বুঝলাম তোমার দ্বারা কোনো কাজ হবে না আম্মু। প্রথমে ওই ওষুধ টাও তুমি নিজেই ভাতের সাথে খেয়েছ এখন আবার পানিতে মেডিসিন মিশিয়েও সে একই কাজ করলে।”
“আমি কি জানি?”
নাছিমা বেগম ছেলের রাগী মুখের দিকে তাকিয়ে আবার বললেন,
“না না আমি সব জানি।”
“তুমি কিছুই জানবে না। যা করার এবার আমাকেই করতে হবে।”
“কি করবি তুই? ফারাজ তুকে…”
“আরে আস্তে কথা বলো এত জোরে কথা বললে কেউ শুনে যাবে। দেওয়ালের ও কান আছে সেটা ভুলে গেলে নাকি?”
“দেওয়ালের কান আছে কিনা আমি কি জানি?”
“তুমি বোধহয় পাগল হয়ে গেছো আম্মু। কি আমি কি জানি আমি কি জানি করছো দূর।”
রোহানের কথাগুলো ঠিক শুনতে না পেলেও নাছিমা বেগমের কান্নামিশ্রিত কন্ঠ স্পষ্ট শুনতে পেলো ফারাজ। কারণ তিনি রীতিমত গলা ছেড়ে দিয়েছেন দুঃখে। নাছিমা বেগমের কথাগুলো শুনে এক আকাশসম রাগে ঘাড়ের রগ গুলো টানটান হয়ে আসে ফারাজের। তার বউ? তার বউয়ের মুখ ধুয়ার পানিতে? ওগুলো তো সে বালতিতে রেখে বাইরে যাওয়ার সময় তিতলিকে বলে এসেছে ঘুম থেকে উঠলে ওখানে পানি রেখেছে হাত-মুখ ধুয়ে নিতে। আর ভাবতে পারছেনা সে। যদি সত্যি তার বউ পানিতে মুখ ধুয়ে ফেলতো? তখন..তখন? সহসা তিতলির মায়াবী মুখখানা ভেসে উঠল ফারাজের চোখদুটোতে। হুট করেই বুকের বাঁপাশটা বড্ড জ্বলছে তার। ফেলা রাখা হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ করে নিচ্ছে বারবার যেন সবকিছু ধ্বংস করে দিবে এখন। দাঁতে দাঁত চাপল পরক্ষণে। যুবকের চোয়াল শক্ত,হ্যাজেল রঙা চোখদুটোর দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। নিরবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছে রোহান আর নাছিমা বেগমের ফিসফিসানো বাক্যালাপ। নাছিমা বেগমের মুখটা দেখার ইচ্ছে জাগলো বড্ড। তার বউয়ের জন্য মিশিয়ে রাখা পানিতে ওনি নিজেই মুখ ধুয়েছে এখন ওনার মুখটা দেখার ইচ্ছে তো জাগবেই। তক্ষুনি শক্তপোক্ত হাতের থাবায় দরজায় ধাক্কা দিলো ফারাজ।
রোহান মাকে কানেকানে বলল,
“বাইরে কেউ এসেছে। তুমি শুয়ে পড়ো আম্মু। আমি দরজা খুলে দেখছি।”
নাছিমা বেগম হাফাতে হাফাতে বললেন,
“আমাদের কথাগুলো শুনে ফেলল নাতো?”
রোহান মায়ের কথার জবাব না দিয়ে দরজার দিকে এগালো। দরজার খুলেই দেখল তার সামনে দাঁড়ানো ফারাজ। ফর্সা পেটানো দেহখানায় আষ্টেপৃষ্ঠে আঁটকে আছে একখানা কালো রঙা হাতাকাটা ট্যাংক-টপ, সঙ্গে জুড়েছে কালো-রঙা ঢিলেঢালা ট্রাউজার। হাতদুটো কেমন আত্ম-অহমিকায় গুঁজে আছে ট্রাউজারের পকেটে। ফলে ফুলেফেঁপে উঠেছে তার মাংসল বাহুদ্বয়!
ফারাজ বারবারই অনেক লম্বা সব কাজিনদের থেকে। বলতে গেলে ওর উচ্চতা,বডি, চেহারা মুখভঙ্গি, হাটাচলা, কথা বলার ধরন, এ্যাটিটিউট, সবকিছু সবার থেকে আলাদা। রোহান ফারাজকে দেখলেই হিংসায় জ্বলে যায় মাঝেমধ্যে। কিন্তু এখন সেসবের লেশ মাত্র নেই মুখে। কেমন সন্দেহ নিয়ে বললো,
“ফারাজ তুই?”
ফারাজ এইমুহূর্তে রেগে আছে কিনা সেটা তার মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই। চোখদুটো তীক্ষ্ণ করে রোহানকে উপেক্ষা করেই রুমের ভেতরে তাকাল।
রোহানকে পাশ কাটিয়ে রুমের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিদ্রূপ হাসি এনে বলল,
“তোর মাকে দেখতে এসেছি।”
ফারাজ বিছানার কাছে গিয়ে নাছিমা বেগমের জ্বলসে যাওয়া মুখটা পরখ করল। সাথে সাথে তিতলির মুখটাও ভেসে উঠল। অজান্তেই চোখ দুটো কেমন ছলছল করে উঠল তার। যেন তিতলিকে ভাবছিলো এমন অবস্থায় আর সেটা মনসপটে ভেসে উঠতেই কেমন কেমন লাগলো রুঢ় মানবের ভেতরে। পরক্ষণেই চোয়ালের দুপাশের হাড়ে কটমট শব্দ হলো ফারাজের। সে-ই শব্দ গিয়ে আচমকা কানে পৌঁছাল বিছানায় শুয়ে থাকা নাছিমা বেগমের। তক্ষুনি বেচারি থমকে গেলেন। বাকরুদ্ধ হয়ে বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে নাছিমা বেগম চোরের মতো এদিক-ওদিক তাকালেন। যেন ছেলেকে খুঁজছেন। কেউ দেখলে মনে হবে যেন পুলিশের কাছে চুরের ধরা পরা একটা দৃশ্য। শুকনো ঢোক গিলে নাছিমা বেগম একটু হাসার চেষ্টা করে বললেন,
“ফারাজ তুই আমাকে দেখতে এসেছিস? আমার তো বিশ্বাস হচ্ছে না রে।”
ফারাজ একটু তাচ্ছিল্য হাসি হাসল। কিছুই জানেনা তেমন ভাব-ভঙ্গিমা ধরে রেখেই বললো,
“মুখটার এ-কি অবস্থা খালামনি? কীভাবে হলো এসব?”
সহসা আঁতকে উঠলেন নাছিমা বেগম। কি বলবেন এখন? বালতির পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে এমন অবস্থা এটা কি কাউকে বলতে পারবেন তিনি?
কাঁপা কাঁপা বদনে আওড়ালেন,
“পানি ভেবে ভুল করে গরম দুধ চা দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলছিলাম রে।”
ফারাজ যেন পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছে নাছিমা বেগমের কথা শুনে। মনেমনে আহব্বান জানিয়ে বলে, “বাহ বাহ ভারী মিথ্যা কথা বলতে পারছেন দেখছি। ইচ্ছে তো করছে এখন আপনার গলা টেনে ধরে উপরে তুলে আবার নিচে নামাতে। আপনি ফারাজ খানকে চিনেন? চিনেন? জানেন তার জানের দিকে হাত বাড়িয়ে নিজের মৃত্যু নিজেই ডেকে আনছেন। তবে সেটা মুখে বললোই না। এখন নাছিমা বেগম সহ তার ছেলে মেয়েকে শত্রুছাড়া কিছুই ভাবছেনা ফারাজ। আর শত্রুদের কীভাবে শায়েস্তা করতে হয় সেটা খুব ভালো ভাবেই জানা তার।
পকেটে দুহাত গুঁজে রেখেই আফসোসের সুরে বললো,
“ও আচ্ছা তাই? একটু দেখে শুনে মুখটা ধুয়া উচিত ছিলো না? এখন যে আজীবনের জন্য মুখটা গেলো। বিষয়টা সত্যি মেনে নেওয়ার মত নয়। নেক্সট টাইম কিছু করার আগে একটু ভেবেচিন্তে কাজ করবেন কেমন?”
কথাটা বলে ধুপধাপ পা ফেলে ফারাজ রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। নাছিমা বেগম হতভম্ব হয়ে গেলেন ফারাজের লাস্টের কথাগুলো শুনে। কিছু বুঝে গেলো না তো? রোহানও বাঁকা চোখে ফারাজের যাওয়া দেখল।
নিধি এসেছে হুশিয়ার সাহেবের বাড়িতে। কালকে বিকেলেই,ও টাঙ্গাইলে এসেছে ফুপুর বাসায়। নিধির ফুপুর বাসা হুশিয়ার সাহেবের বাড়ি থেকে বেশি দূরে নয়। তিতলির সাথে আড্ডা দেওয়ার আশায় চলে আসলো। পরনে একটা রেপ এমব্রয়ডারি গোল জামা। সাথে পিংক রঙা ওড়না গায়ে জড়িয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে হুশিয়ার সাহেবদের বিশাল গেট পেরিয়ে আসতেই দেখল লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে কিছু ছেলে। আলভী, ফরহাদ,অয়ন,সহ তিতলির মামাতো ভাইয়েরা। নিধি কয়েকজনকে চিনলো। আলভী ফরহাদের কাঁধে টোকা দিয়ে বলল,
“দেখ মেয়েটাকে চিনা চিনা লাগতেছে না? মেয়েটা কিন্তু সুন্দর আছে!”
ফরহাদ অয়নকে ধাক্কা দিয়ে বললো,
“এরে অয়ন সুমি ভাবিরে কল দে তো।”
“এরে কল দিস না। সুমি এসব শুনলে আমার হাতপা গাছের সাথে বেধে রাখবে।”
ফরহাদ আলভীর মাথায় টোকা দিয়ে বলে,
“মেয়ে দেখলে মাথা ঠিক থাকেনা তোর? বাবা হয়ে যাচ্ছিস একমাস পর তাও…”
নিধি ফরহাদের কথার মাঝেই তাদের পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। শুধু অয়ন চুপচাপ। অয়ন পরক্ষণেই বললো,
“তুমি তিতলির ফেন্ড না?”
নিধি ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে ফিরে কারো কন্ঠ শুনে। অয়নকে সে আগে থেকেই চিনে। কতবার কত জায়গায় দেখা হয়েছে। তাদের ছবি তুলেছে। তিতলির হলুদের দিন ধাক্কা লেগে হলুদ লাগিয়ে দিয়েছে। না চেনার কোনো উপায়ও নেই। একটু মুচকি হেসে বলল,
“জ্বি ভাইয়া।”
“এখানে কার কাছে এসেছো?”
“ফুপুর বাড়িতে। এখন তিতলির সাথে দেখা করতে এসেছি।”
নিধি চলে গেলো কথাটা শেষ হতেই। ফুপুকে অনেক কষ্টে রাজি করিয়ে এসেছে। টাঙ্গাইলে সে আরো অনেকবার এসেছে তার তেমন অসুবিধা হয়না।
নিধিকে দেখে তিতলির মনটা অনেক ভালো হয়ে গিয়েছে। দু বান্ধুবি এতদিনের জমিয়ে রাখা কথাগুলো একদিনেই শেষ করে ফেলতে চাইছে যেমন। নিধি কথার কথায় তিতলিকে বললো,
“তোর মোবাইল কি হয়ছে রে? কোনো কল ডুকছে না কেন? ”
তিতলি একটু চুপ থেকে বলল,
“মোবাইল নেই। কটকটি দের কাছে বিক্রি করে ফেলেছি। ”
“কিহহহ! এত দামী আইফোন তুই কটকটির কাছে বিক্রি করে ফেলেছিস? ”
“থাক বাদ দে। দুঃখের কথা বলি লাভ নাই।”
“তাও ঠিক বলছিস।”
“আজকে আমরা ঘুরতে যাবো বিকেলে। তুই যাবি আমাদের সাথে?”
“কোথায়?”
“স্বপ্ন বিলাস যাবো।”
“ওখানে তো আমি অনেকবার গেছি। কাজিনদের সাথে। এখন মনে হয় অনেক চেঞ্জ হয়ছে আরও সুন্দর হয়ে গিয়েছে। আচ্ছা আমি ফুপুকে বলবো যদি যেতে দেয় তাহলে যাবো।”
“যেতেই হবে তুই।”
“ওকে বাবা যাবো।”
ঘড়িতে বিকেল তিনটা বাজে।
তিতলি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ির পরার চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছুতেই কুচি মিলাতে পারছেনা। বারবার অধৈর্য হয়ে আবার চেষ্টা করছে। লম্বা আঁচল পড়ে গিয়ে মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। শর্টম্লিভ হালকা রঙা একটা ব্লাউজ পরেছে। নিচে শুধু কোমড়ে পেঁচানো শাড়ি আছে এইটুকুই। ফর্সা,মসৃণ পিঠ,পেট,নাভি, বুকের ভাঁজ সবকিছু দৃশ্যমান। তিতলিকে এখন কতটা আবেদনময়ী লাগছে তা সে একদমই উপলব্ধি করতে পারছেনা৷ এইযে এতটা মনেযোগ দিয়ে শাড়ির কুচি ঠিক করতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। কেউ একজন যে রুমে এসে গভীর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে সেটা কি তার নজরে আছে? যুবকের ঘোরলাগা চোখদুটো অটল। ত্রস্ত এক পা দু পা এগোতে শুরু করল সে। তিতলি কুচি ঠিক করতে করতে এক সময় অনুভব করল তার ঘাড়ে কারো বড়বড় নিশ্বাস আছড়ে পড়ছে। মুহূর্তেই হাতের কুচি গুলো খুলে ছড়িয়ে পড়ল ফের। এক লহমায় পেছনে ঘুরতেই দেখল একদম সম্মুখে দাঁড়িয়ে ফারাজ। তাকিয়ে আছে কেমন করে যেন কিছু ভাবছে। তিতলি যত্রতত্র নুইয়ে গেলো। ধীরলয়ে ফের পেছনে ঘুরে গেল। এভাবে তাকিয়ে থাকার কি আছে? টেনেটোনে নিজের ব্লাউজ বড় করার চেষ্টা করছে সে।
কুন্ঠা ঠেলে মিনমিনিয়ে বললো,
“এভাবে তাকিয়ে থেকে কি ভাবছেন?”
আয়নায় তিতলির প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ফারাজের মন বলছে,
“তুমি মানুষ, নাকি পরি”
“আমি ভেবে,ভেবে মরি।”
ফারাজের হাতদুটো অজান্তেই তিতলির পেটের দুপাশে চলে এসেছে। তার লম্বা আঙুল গুলো তিতলির উন্মুক্ত কোমরে অনায়াসে জাপ্টে আছে। রমণীর তুলতুলে নরম নাজুক ত্বকের ভাঁজে আঁ’চড় কেটে যায় ফারাজের রু’ক্ষ হাতের প্রতিটি নখ। আরো খানিকটা দূরত্ব ঘোচায় সে।
তিতলি নিজেও পাথরের ন্যায়ে দাঁড়িয়ে। গরম শ্বাসপ্রশ্বাস থুবড়ে পড়ছে ঘাড়ে। বুকের উঠানামার গতি গুনে ফেলা যাবে। হৃদয়ের অস্বাভাবিক গতি কমাতে তিতলি পিছু যেতে নিয়ে অনুভব করলো ফারাজের আঙুলগুলো তার গতি হারিয়ে তুলতুলে নরম নাভির চারপাশে আঁকিবুকি চালাচ্ছে এবার। নাভিতেও আঙুল ছুঁয়ে দিলো। তিতলি এবার থরথর করে কেঁপে উঠলো। সহ্য করতে না পেরে ফারাজের হাতদুটোর উপর নিজের হাতদুটো রেখে খামছে ধরলো শক্তপোক্ত বলিষ্ঠ হাত। গ্রীবা বাঁকানোর সময় পেলো না বোধহয়। ফারাজ অধৈর্য হয়ে তিতলির কোমরে পেঁচানো যেটুকু শাড়ি আছে সেটাও খুলে ফেলতেছে সাথে যেমন সবকিছু স্পর্শ করছে। তিতলি বুঝি এবার মরে যাবে। তার গাল থেকে ঘাড় অবধি লাল আভায় রাঙিয়ে গিয়েছে। লজ্জায় চিবুক এসে ঠেকেছে গলায়। গলায় বুঝি সব শব্দরা আটকে গেল। কন্ঠ ছিড়ে অনেক কষ্টে বেরিয়ে আসলো দুটোবাক্য,
“ক-কি করছেন?”
ধনুকের মতো বাঁকানো নারী দেহের সুডৌল অঙ্গের ভাঁজে মুখ ডোবাতে ডোবাতে ফারাজ একহাতে বৃথা চেষ্টা চালাচ্ছে শাড়ি খোলার। হিসহিসিয়ে ধ্বনিত হলো তার মা’দকীয় কণ্ঠস্বর,
“এই শাড়ি ডিস্টার্ব করছে খুলে ফেলতেছি।”
“আপনি কি চাইছেন?”
“পুরোপুরি তোমাকে!”
তিতলির চোখে মুখে নিদারুণ বিস্ময়। আশ্চর্য কন্ঠে বলে উঠলো,
“এখন তো আমরা ঘুরতে যাবো তাইনা বলুন?”
তিতলির তাই না, তাই না শুনে ফারাজ আরও উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। এবেলায় অদ্ভুত গলায় পাল্টা শুধিয়ে বসল,
“ঘুরতে যাওয়ার আগে আমার কিছু পার্সোনাল কাজ আছে সেগুলো শেষ করতে হবে না বলো? তুমিতো আমাকে শান্তিতে থাকতে দিবে না? এমন হতে থাকলে আমি আর। সহ্য করতে না পেরে…”
বাদবাকি কথা শেষ করল না ফারাজ? সে তো ব্যস্ত বড্ড। তিতলির শরীরের মেয়েলী ঘ্রাণ পাগল করে দিচ্ছে তাকে। একটু সময় পর তিতলির শাড়ির আঁচল ধরে হাতে পেঁচাতে পেঁচাতে শুরু করল। ধীরেধীরে টেনে খুলতে থাকলো। ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে দেখল তিতলির কাঁপাকাঁপি।
রাগে অনুরাগে পর্ব ৪৫
লজ্জায় তিতলির বুক দুরুদুরু কাঁপছে। বুকে দুহাত গুঁজে নত হয়ে থাকল কিছুক্ষণ। যেন ফারাজের কথার অর্থ বুঝে নিচ্ছে। কী জানি কি বুঝল মেয়েটা! শাড়ি টেনে ধরে আমতাআমতা করে প্রশ্ন করলো,
“ব-বউ শাড়ি পরতে না পারলে বর পরিয়ে দেই আর আপনি আমার শাড়ি খুলে দিচ্ছেন কেন?”
তিতলির শাড়িটা একটানে সম্পূর্ণ খুলে দিয়ে ঘোরলাগা দৃষ্টে মাথা থেকে পা পর্যন্ত এক নজরে পরখ করল ফারাজ। অতঃপর নিরুদ্বেগ ভঙ্গিতে সময় নিয়ে জবাব দেয়,
“সবাই তো শাড়ি পরিয়ে দেই, কিন্তু তোমার বর অন্যকিছু করার চেষ্টা করছে।”
