আমার আলাদিন শেষ পর্ব
জাবিন ফোরকান
গাঢ় নিস্তব্ধতা। শুধু ঘড়ির কাঁটার ঘূর্ণনের শব্দ তাতে ছেদ ঘটাচ্ছে। সোফায় চুপটি করে বসে আছে সাইবান। তার পাশে বসার বদলে তিতলি বসে আছে বিপরীত দিকের সোফায়। নিবিড় পর্যবেক্ষণ করছে সাইবানকে যার মুখে কোনো রা নেই। তিতলির দিকে তাকাচ্ছেও না সে। চেয়ে আছে শূন্যপানে।
“কেমন আছিস?”
অবশেষে নীরবতা ভাঙল তিতলি। সাইবান তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালনা। শুধু একটু হেলান দিয়ে বসে সিলিংয়ের দিকে চেয়ে জানাল,
“যেমন থাকার কথা।”
“কেমন থাকার কথা?”
“তুই কি আমাকে দরদ দেখাতে এসেছিস তিতলি? যদি তাই হয়, তবে আই ডোন্ট নিড ইওর সিমপ্যাথি রাইট নাউ।”
তিতলিকে কিছুটা মনমরা দেখালো। পরক্ষণেই সে চেহারার মলিনতা ঝেড়ে ফেলল। মৃদু হেসে শুধাল,
“তোর কি মনে হয়? আমি নতুন করে সুযোগ খুঁজতে এসেছি?”
সাইবান উত্তর করলনা। তিতলি নিজের বাম হাতটা তুলে দেখাল। সেখানে জ্বলজ্বল করছে একটা হীরের আংটি।
“আ’ম এঙ্গেজড, জিনি। আজ আমি তোর কাছে এসেছি শুধু একজন পুরোনো বন্ধু হিসাবে, আর কিছু নয়।”
এবার সত্যিই সাইবানের দৃষ্টি আকর্ষিত হলো। মাথা নামিয়ে সে তিতলির হাতের দিকে তাকাল। বাগদান কবে হলো এই মেয়ের? সাইবান তো শোনেনি! বাকিরাও কিছু বলেনি। অবশ্য, বরিশাল থেকে ফেরার পর থেকে তিতলি তাদের ফ্রেন্ডগ্রুপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল পুরোপুরি। তাই বলে এত বড় ঘটনা ঘটিয়ে ফেলবে? সাইবানকে থ হয়ে চেয়ে থাকতে দেখে তিতলি নিজের হাতটা সরিয়ে কোলের উপর গুটিয়ে রাখল। নরম গলায় বলল,
“জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না, এটা বুঝতে আমার একটু বেশিই সময় লেগে গেল। হ্যাঁ, তোকে পেলে হয়ত জীবনটা অন্যরকম হতো, তবে আমি মানিয়ে নিয়েছি। খুব বেশি খারাপ তো নেই। ওই মানুষটাও অনেক ভালো। আমার ভীষণ যত্ন নেয়।”
তিতলির শেষ বাক্যটা কেন যেন সাইবানের বিবেকবোধে লাগল। যত্ন নেয়? যে যত্নের যোগ্য তিতলি, সে যত্ন অবশেষে মেয়েটা পাচ্ছে। দুহাত মুঠো পাকিয়ে ফেলল সাইবান। নিজের কোলের দিকে চেয়ে নতমুখে বসে রইল। তিতলি বন্ধুকে দেখল মনোযোগ দিয়ে। তারপর বলে উঠল,
“তুই কি দেখতে পাচ্ছিস, কতটা বদলে গিয়েছিস? যে ছেলেটার হাসি দেখলে বাকিরা এমনিতেই হেসে ফেলত, যে সবসময় মানুষের মাঝে খুশির খোড়াক বিলিয়ে যেত, সে কেমন রংহীন ধূসর হয়ে গিয়েছে। তোকে কষ্টের ভেতর দিয়ে যেতে আমি বহুবার দেখেছি। তবে সেই কষ্টের একটা মাত্রা ছিল। আজ তোকে কেমন দেখাচ্ছে জানিস? বাঁচার থেকে মরে যাওয়াকে বেশি ভালো মনে করবি এমন।”
“হয়ত তাই। বেঁচে থেকে আর কী লাভ? আমার জীবনটা পঁচিশেই আটকে গেছে।”
তিতলির ইচ্ছা হলো উঠে গিয়ে সাইবানের পাশে বসে। পুরাতন দিনের মতন তার কাঁধে হাত রাখে, জড়িয়ে ধরে, শান্তনা দেয়। তবে কোনোটাই সে করলনা। নিজের সোফাতেই বসে রইল। আবারও এক নীরবতা। তারপর একটা নিঃশ্বাস ফেলে তিতলি বলল,
“অনুদের কাছ থেকে আমি সব শুনেছি। তোর জীবন, তোর সিদ্ধান্ত। সেই নিয়ে আমি বাইরের মানুষ কী বলব? তবে একজন বন্ধু আর শুভাকাঙ্ক্ষী হিসাবে বলি, নিজেকে এভাবে হারিয়ে ফেলিস না। ইউ আর সাইবান আলাদিন, ডি জে আলাদিন! জীবনে কত চড়াই উৎরাই পেরিয়েছিস ভুলে গিয়েছিস? হ্যাঁ, এখন তোর ডাউনফল চলছে। তাই বলে আর কোনোদিন যে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবিনা সেটার গ্যারান্টি কোথায়? তোকে কেউ কিছুই নতুনভাবে শুরু করতে বলছে না। কিন্তু অন্তত, নিজেকে হারাতে দিসনা জিনি। এইযে, জিনি বলে ডাকি, কেন জানিস? কারণ তুই আমার কাছে আলাদিনের দৈত্যের মতোই। যে তার আশেপাশের মানুষের সব সমস্যা হেসে খেলেই দূর করে দিত। তুই মানুষের ভরসার পাত্র, স্বপ্নের প্রতীক। তুই বহু আগেই দেখিয়ে দিয়েছিস কীভাবে হেরে গিয়েও জিতে যাওয়া যায়! নিজেকে এমন এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিস যার হকদার একমাত্র তুই। আজ তুই যা কিছু, তোর যা যা আছে, তার সবটার অবদানই একান্ত তোর। নিজের সাফল্য আর অর্জন কোনোদিন ভুলিস না। আর তুই চাইলে ঠিক কী কী করতে পারিস সেটাও মনে রাখিস। এটুকুই বলার ছিল তোকে।”
তিতলি থেমে একটা নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর সোফা থেকে খুব ধীরে উঠে দাঁড়াল। স্কার্টটা হাত চেপে ঠিকঠাক করে নিয়ে বলল,
“তুই হয়ত আমাদের কেউ না। তোর পরিবারেরও কেউ না। কিন্তু এটুকু জেনে রাখ, তুই আমাদের সবার আপনজন। এমন একটা মানুষ, যার কাছে গেলে আমরা নিশ্চিন্ত হই। তোর উপর নির্ভর করে কত মানুষ নিজেদের হাসি খুঁজে পেয়েছে, জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছে! তুই হয়ত সেসব বুঝিসও না। তাই তোর কাছে নিজের জীবনটা এখন অর্থহীন লাগছে। অথচ গভীরভাবে ভাবলে দেখবি, তোর আশেপাশের প্রত্যেকটা মানুষের জীবনই তোকে কেন্দ্র করে ঘোরে। সামিয়া আন্টি, আহমদ আংকেল, সারিকা আপু, অনুরাগ, নীরব, আফনান, এমনকি সুগন্ধাও। সবার সাথে নিজের সম্পর্কের কথাটা চিন্তা করে দেখিস। কত যত্নে আগলে রাখলে তোর ২৫ টা বছরেও সন্দেহ হলোনা তুই ওই বাড়ির কেউ না? এটুকু ভাবলেই নিজের অস্তিত্বের অনেক উত্তর পেয়ে যাবি। আসি রে, যেখানেই থাকিস না কেন, ভালো থাকার চেষ্টা করিস।”
তিতলি দরজার দিকে পা বাড়াল। দরজা খুলেও ফেলল। তবে শেষ মুহূর্তে পিছন থেকে ডাক ভেসে এলো,
“তিতলি?”
ফিসফিসে একটা চাপা কন্ঠ। তিতলি থমকে পিছন ফিরল। সোফায় তখনো একইভাবে বসে আছে সাইবান। মাথাটা আরও ঝুঁকে আছে। পায়ে পায়ে তার কাছে গিয়ে দাঁড়াল তিতলি।
“কিছু বলবি?”
সাইবান এক মুহূর্ত কোনো কথা বললনা। অতঃপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“তোর সাথে আমি বুঝে হোক বা না বুঝে, অনেক অন্যায় করেছি। অনুভূতি সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিলনা। আমি জানতাম না এতটা যন্ত্রণা হয়, অনুভূতি দগদগে ঘা হয়ে বুকের মাঝে রয়ে যায়। তোর কষ্টটা অনুধাবন করার পর্যায়ে এসেছি আমি। এখন জানি, তুই যাকে ভালোবাসিস সে তোকে ভালো না বাসলে কেমন লাগে। এই মরম বেদনায় আমি তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছি। তুই এতদিন কীভাবে বেঁচে ছিলি? তাই বলি, তুই আমার থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী রে। অনেক বেশি।”
তিতলির চোখজোড়া ছলছলে হলো। ইচ্ছা করল সাইবানের মুখ তুলে নিজের দিকে ঘোরায়। কিন্তু সেটা না করে সে নিজের ডান হাতটা আলতো করে সাইবানের মাথায় রাখল, জানাল,
“আমরা দুজনই অবুঝ ছিলাম। ভালোবাসা, প্রেম, অনুভূতি সবকিছু ছেলেখেলা মনে হত। নিজেদের জালে নিজেরাই ফেঁসেছি। তাছাড়া আমার দোষ কম ছিলনা। তোকে পাওয়ার তীব্র বাসনায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। যেটা আমার ভাগ্যে লিখা হয়নি, সেটা পেতেই মরিয়া হয়ে গিয়েছিলাম। সেটাই আমার ডাউনফলের কারণ।”
“তোর সাথে আমি অনুভূতি নিয়ে অন্যায় করেছি। আমাকে মাফ করে দিস।”
“মাফ করলাম। তুইও আমাকে মাফ করিস তোর জীবনে অশান্তি সৃষ্টি করার জন্য।”
“আচ্ছা। মাফ করলাম।”
এরপর আসলেই আর বলার কিছু থাকেনা। তিতলি একটা ঢোক গিলে সাইবানের কাঁধে অন্তিম চাপড় দিয়ে বলল,
“ভালো থাকিস। আবারও পুরাতন সাইবান আলাদিন হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসিস। আমরা অপেক্ষায় থাকব।”
সাইবান আর কিছু বললনা। মাথা নুইয়ে বসে রইল। তিতলি শেষ একনজর তাকে দেখে উল্টো ঘুরে হেঁটে বেরিয়ে গেল ফ্ল্যাট থেকে। দরজাটা তার পিছনে মৃদু শব্দ তুলে আটকাল। তিতলি চলে যেতেই মুখ তুলে সোফায় এলিয়ে পড়ল সাইবান। ভারী বুকটা কিছুটা হলেও হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে, বিবেকের আদালতে চেপে রাখা একটা বোঝা নেমে গেছে। একটু হলেও ভালো লাগছে তার।
ক্ষণে ক্ষণে ফোঁপানোর শব্দ ভেসে আসছে। মেঝেতে বসে পা গুটিয়ে চোখেমুখে ওড়না চেপে কাঁদছে সুগন্ধা। সামিয়া আরামকেদারায় বসে দুলছেন। শারীরিক অবস্থা তার বিধ্বস্তপ্রায়। চুলগুলো উষ্কখুষ্ক। চোখে ঘুমের অভাবে রক্তিম দৃষ্টি। চেয়ে আছেন সিলিংয়ের দিকে। সুগন্ধা তার পায়ের কাছেই মেঝেতে বসে আছে। মেয়েটার কান্নার শব্দে সামিয়ার শীতল অন্তরে অনুভূতির জোয়ার উঠল। আর কেউ বাকি নেই তার, শুধু এই সন্তান বাদে। অজান্তেই কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে সুগন্ধার মাথায় রাখলেন তিনি। বসে যাওয়া গলায় প্রশ্ন করলেন,
“কাঁদছিস কেন পাগলী?”
সুগন্ধা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল,
“কানমু না? আপনে এমন ক্যান আম্মাজান? যেমনে আমারে কইলেন, তেমনে সবাইরে কইয়া দেন। সবাই আপনারে ভুল বুঝতেছে। সবার সামনে আপনি অপরাধী।”
মলিন হাসলেন সামিয়া।
“আমিই তো সবকিছুর মূল রে সুগন্ধা। এটা তো মিথ্যা নয়। আমার জন্যই শুরু হয়েছে যেহেতু, শেষটাও আমার মধ্য দিয়ে হোক?”
জোরে জোরে মাথা নাড়ল সুগন্ধা।
“না। আপনারও তো কোনো উপায় ছিলনা। এমন করেন ক্যান সবাই? কেমন ভাইঙা গেল এই পরিবারটা। কিছু করেন না আম্মাজান! আমার কষ্ট হইতেসে।”
হাত বাড়িয়ে সুগন্ধাকে আগলে নিলেন সামিয়া। তার কোলে মাথা রেখে ডুকরে কাঁদতে লাগল সুগন্ধা। সামিয়া তার মাথায় আর পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন,
“তুই তো আছিসই আমার কাছে। তাতেই নাহয় চলে যাবে আমার।”
একটু থামলেন তিনি। তারপর ভাঙা গলায় পুনরায় বললেন,
“আমি চাইনা এই অভিশাপ আমার সন্তানদের মতন তোর উপরেও পড়ুক, মা। তোর জীবনটা সাজিয়ে দিয়ে যেতে পারলেই এখন আমার চিরমুক্তি।”
“না। এমনে কইবেন না, আম্মাজান। কই যাইবেন, আপনি?”
সুগন্ধার ক্রন্দনধ্বনি আরও বাড়ল। সামিয়ার নিজের চোখের অশ্রু জমল। টপটপ করে পড়ল ঠিক সুগন্ধার মাথার উপর। ঝুঁকে একটা চুমু খেলেন তিনি। বললেন,
“সবাইকেই তো একদিন না একদিন চলে যেতে হয় সৃষ্টিকর্তার কাছে। আমি নশ্বর মানুষ। সব তো ধ্বসিয়েই দিয়েছি। আমার জন্য তুই আর নিজেকে নষ্ট করিস না।”
“আপনি যা বলবেন, আমি তাই করমু আম্মা!”
সামিয়ার কোমর জড়িয়ে ধরে হাহাকার তুলল সুগন্ধা,
“আপনি যারে বলবেন, তারেই বিয়া করমু! যেভাবে বলবেন, অমনে চলমু। শুধু আপনি কোথাও যাইয়েন না।”
এত নিবেদনের বিপরীতে সামিয়ার আর কিছু বলা হলোনা। নীরবে সুগন্ধার পিঠ চাপড়ে দিলেন তিনি।
বিমানবন্দরের পরিবেশে রোজকারের ব্যস্ততা। পদচারণা যাত্রী এবং নিরাপত্তারক্ষী সদস্যদের। কোলাহল, মাইক্রোফোনে কিছুক্ষণ পরপর ফ্লাইটের ঘোষণা। সাইবান হাঁটছে আহমদের পিছু পিছু। লাগেজ দুটো টেনে নিয়ে যাচ্ছেন আহমদই। তাদের গন্তব্য চেকিংয়ের দিকে। কিছু ঘণ্টা বাদেই এই দেশ ছেড়ে উড়াল দেবে পিতা এবং পুত্র। এখনো ইমিগ্রেশনের কিছু সময় বাকি আছে। তাই তারা ওয়েটিং চেয়ারে বসল। আহমদ কফি কিনে নিয়ে এলেন। নীরবে সেটায় চুমুক দিল সাইবান। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল সে। অদূরে একটি পরিবার দেখা যাচ্ছে। বাবা, মা এবং তাদের ছোট এক ছেলে সন্তান। ছেলেটার বয়স চার কি পাঁচ! একটা খেলনা গাড়ি নিয়ে বাবার সাথে খুনসুঁটিতে লিপ্ত। ছেলেকে কোলে বসিয়ে অসংখ্য চুমু খাচ্ছেন বাবা। অপরদিকে মা নিজের ফোনে পারিবারিক মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দী করে রাখছে। দৃশ্যটার দিকে নিগূঢ় দৃষ্টিতে চেয়ে রইল সাইবান। নিষ্পলক, দীর্ঘ সময়জুড়ে।
কাঁধে আহমদের স্পর্শে মনোযোগ ভাঙল তার।
“চল, সময় প্রায় হয়ে গেল।”
মাথা দোলালো সাইবান। উঠে দাঁড়াল। অন্তিম একবার তাকাল হাসিখুশি পরিবারটার দিকে। তারপর হাঁটতে শুরু করল পিতার পিছু পিছু। ইমিগ্রেশনের কাছাকাছি পৌঁছাতেই হঠাৎ,
—বাব্বা!
জমে গেল সাইবান। সমস্ত শরীরে তরঙ্গ খেলে গেল বুঝি। পায়ের তলায় শিকড় গজাল। জগৎটা চোখের সামনে বুঝি দুলতে লাগল। ঝট করে পিছনে ফিরে তাকাল সাইবান। অথচ তার বুকের ভেতর জমা হওয়া ক্ষীণ আশার আলোটুকু দপ করে নিভে গেল। আশেপাশে কেউ নেই। সবাই নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। তবে ডাকটা কোথা থেকে এলো? সাইবানের অবাধ্য অন্তরের কল্পনা। এছাড়া কিছু নয়। হাত মুঠো করে ফেলল সে, আঙুলে আংটির অস্তিত্ব অনুভূত হলো। ঘুরে দাঁড়াল সে, তখনি আবারও কানে ভেসে এলো ওই ডাক,
—বাব্বা! বাব্বা!
এবার আর পারলনা সাইবান। উল্টো ঘুরে দিল দৌঁড়। আশেপাশে হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগল কিছু একটা। মানুষজন তাকে অবাক চোখে দেখল। আহমদও ছেলের কান্ডে হতচকিত হয়ে গেলেন। দ্রুত কাছে এলেন। কিন্তু সাইবান হুশে নেই। সে মানুষের ভিড়ে খুঁজে চলেছে কাউকে। অবশেষে পেয়েও গেল। অনেকটা দূরে, টার্মিনালের কাছে লাগেজ নিয়ে হেঁটে আসছে চারজনের একটা পরিবার। বছর পাঁচ ছয়ের একটা মেয়ে মায়ের হাত ধরে হাঁটছে। পাশেই বাবা, আর তার কোলে এক শিশুকন্যা। সেই শিশুটিই ‘বাবা বাবা’ করে পিতাকে ডাকছে। মুচকি হেসে তার ডাকের জবাব দিচ্ছে পিতা। সাইবান থমকাল। বুকটা ভেসে গেল জলোচ্ছ্বাসে। আহমদ পিছন থেকে এসে ছেলেকে ধরলেন।
“কী হয়েছে?”
“কিছুনা।”
অস্ফুট জবাব সাইবানের। আহমদ মায়াভরা চোখে সন্তানকে দেখলেন। তারপর কাছে ঘেঁষে বললেন,
“জানি। কষ্ট হচ্ছে। তবুও নিজেকে শক্ত কর। সময় সব ঠিক করে দেবে। আয়।”
এবার আর পিতার বিপরীতে কিছু বললনা সাইবান। দীর্ঘ এক প্রশ্বাস টানল। মনে হলো, যত টান তাকে এই দেশের মাটিতে বেঁধে রেখেছে, সব টানই একটু একটু করে ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এক পা এক পা করে এগোল সে, এক এক করে ছিঁড়ল সম্পর্কের সুতো। একটা সময় আর পিছুটান রইল না। কল্পনার কোনো বাবা ডাক তাকে থামাতে পারলনা। পিতার পাশাপাশি হেঁটে ইমিগ্রেশনের দিকে চলে গেল সাইবান। পাড়ি জমালো এক নতুন জগতে।
সময়ের পরিক্রমায় হাজির নতুন একটি দিন। নতুন এক সূচনা। এক মাসের জীবনযুদ্ধে এখনো লড়ে যাচ্ছে এক মা। আজ তার মহাযুদ্ধ। সন্তানের অধিকারের যুদ্ধ। সুন্দর ভবিষ্যতের যুদ্ধ।
আজ আদালতের চতুর্থ শুনানি।
সকাল থেকেই ব্যস্ত ইরাম। এমনিতেই সে সারাদিন ব্যস্তই থাকে। আজ একটু বেশিই। রাতে দুই ঘণ্টা ঘুমিয়েছে মোটে। ফজরের আজানের সাথে সাথে উঠে নামাজ আদায় করে রান্নাবান্না আর ঘরের কাজকর্ম সেরে ফেলেছে। রাবিয়ার রান্না ছাড়াও টুকটাক কাজ ইরামই করে দেয়। এই যেমন সমস্ত ঘর ঝাড়ু দেয়া, আসবাব মোছা, শুকনো কাপড় ভাঁজ করে গুছিয়ে রাখা ইত্যাদি। রাবিয়া এখনো ঘুম থেকে উঠেনি। মেয়েটা দেরীতে ওঠে। কারণ সারারাত কাজ এবং পড়াশোনা করে। নিশাচর সে, রাতের পাখি। দিনে নাকি ঘুমাতেই আরাম। আজকালকার ছেলেমেয়েদের এমন রাত্রিপ্রিয়তা বেশি কেন ইরাম বোঝেনা। দুপুরের খাবার রান্না করে সব ঠিকঠাক করে রেখেছে ইরাম। রাবিয়া উঠলে নিজে থেকে খেয়ে নিতে পারবে। ইযানকেও গোসল করিয়ে জামা পড়িয়ে তৈরি করে নিয়েছে সে। বাচ্চাকে রেখে যাওয়ার মতন ভরসাযোগ্য স্থান নেই। রাবিয়া মুখে যতই বলুক, মেয়েটা ছোট আর ইরাম হুট করে সারাদিন তাকে বাচ্চার দেখভাল করতে দিতে পারেনা। সুবিধা অসুবিধার ব্যাপার আছে। তাই ইযানকে নিয়েই যাওয়া হবে। আটটার মধ্যেই সমস্ত কাজকর্ম শেষ ইরামের। নিজে জলদি একটা গোসল দিয়ে এসে আলমারির সামনে দাঁড়াল। হৃদয় থমকাল তার ক্ষণিকের জন্য।
ওই বাড়ির কারো সঙ্গেই ইরামের আর যোগাযোগ হয়না। একমাত্র একজন বাদে। সুগন্ধা। সপ্তাহে একবার ইরাম নিজে থেকে সুগন্ধাকে ফোন করে, খবরাখবর নেয়। সামিয়ার শরীরটা নাকি বিশেষ ভালো যাচ্ছেনা। হাসপাতাল থেকে লম্বা ছুটি নিয়েছেন তিনি। বাসাতেই থাকেন। মায়ের দেখভালের জন্য সারিকা গত সপ্তাহে গিয়েছে ওই বাড়িতে। তারও আগে আরেকটা খবর জেনেছে ইরাম। প্রায় সপ্তাহ তিনেক আগে আহমদ আর সাইবান দুজন বাংলাদেশ ছেড়েছেন। কোন দেশে গিয়েছে, কেউ জানেনা। সুগন্ধাও বিস্তারিত বলতে পারেনি। কারণ বিস্তারিত কেউই জানেনা। সাইবান চলে গিয়েছে, বহু দূরে, ঠিক যেমনটা ইরাম চেয়েছে। বুকের ভেতরের শূন্যতাটা কী দিয়ে মাপা যায়? অজান্তেই আলমারির হাতল শক্ত করে ধরল ইরাম। আঙুলগুলো ফ্যাকাশে হলো তার। শেষমেষ সত্যিই সব বন্ধন ছিন্ন করে তার আলাদিন চলে গিয়েছে। ইরামের খুশি হওয়া উচিত। ছেলেটা যদি দূরে গিয়ে ভালো থাকে, নিজের মতন নতুনভাবে জীবন সাজাতে পারে, তবে ইরামের অপরাধবোধের বোঝা কমবে। কিন্তু বুকে এমন হাহাকারের অর্থ কী? প্রায় রাতেই সে স্বপ্নে দেখে সাইবানকে। ঠিক সেই মুহূর্তগুলো তার চোখে ভাসে যখন তারা সুখী ছিল। যখন ছেলেটা দুষ্টু মিষ্টি নিবেদনে তার জীবন রাঙিয়ে তুলেছিল। ছেলের জন্য সম্পর্কের সূত্রপাত ঘটালেও কবে যে সাইবান আলাদিন নামক রগচটা, বেপরোয়া, দায়িত্বজ্ঞানহীন পুরুষটার হৃদয়ের বাঁধনে ইরাম জড়িয়ে গিয়েছে নিজেও আজকাল ভেবে পায়না। আচ্ছা? এই অনুভূতির শুরু কবে হয়েছিল?
যে রাতে সে সাইবানের ভয়াল অতীত জানতে পেরেছিল? নাকি যেদিন ছেলেটা তাকে ভালোবাসি বলতে বলতে পাগল করে তুলেছিল? কোন সময়ে ইরামের স্বার্থান্বেষী অন্তরটা স্বার্থ ভুলে একটুখানি কাছে আসতে চেয়েছিল? ভালোবাসা অনুভব করতে চেয়েছিল? ইরাম বলতে পারেনা। গেঞ্জি গেঞ্জি করতে করতে কবে সে গেঞ্জির প্রেমে পরে গিয়েছে সেটা এক অদ্ভুত রহস্য বটে। প্রতিটা সেকেন্ড, প্রতিটা মিনিট, প্রতিটা ঘণ্টা আর প্রতিটা দিনে ওই ছেলেটার তীব্র অভাববোধ করে সে। গভীর রাতে একলা বসে ছোট্ট ইযানকে নির্ঘুম চোখে ঘুমাতে দেখে। তখন তার মনে হয়, এই বুঝি অন্ধকার থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে আসবে সাইবান। নিজের সহজাত দুষ্টুমির হাসি মেখে বলে উঠবে, ‘ঘুমাননি, মাই প্রেশিয়াস? আমার বুকে আসুন। আমি আপনার চোখে ঘুম নামিয়ে আনব।’ কিন্তু সেই কল্পনা কখনো বাস্তব হয়না। সেসব রাতে ইরাম গোপনে লাগেজ থেকে বের করে নেয় একটা পোশাক। কালো ট্যাংক টপ। যেটা গায়ে জড়িয়ে সবসময় ঘুরঘুর করত ছেলেটা। যেটা গায়ে দিয়ে তাকে বডি দেখিয়ে আকর্ষণ করতে গিয়ে আছাড় খেয়ে কপাল ফুলিয়েছিল স্বামী তার। স্মৃতি মনে করে মুচকি মুচকি হাসে ইরাম। তারপর সেই গেঞ্জি ছেলেটার গেঞ্জি বুকে জড়িয়েই চুপটি করে ঘুমিয়ে পড়ে। মনে হয়, তার বুকের মাঝেই আছে সে। তার সমস্ত অস্তিত্বে মিশে গিয়েছে ওই মানুষটার নাম।
সাইবান আলাদিন। ইরামের আলাদিন।
ইরাম মাথা ঝাঁকাল। জোরপূর্বক চিন্তাগুলো মাথা থেকে সরাতে চাইল। স্মৃতিগুলো তাকে বড্ড জ্বালায়। কখনো হাসায়, কখনো বা কাঁদায়। সে শুধু একটাই প্রার্থনা করে। ওই মায়াবী বাউন্ডুলে ছেলেটা যেখানেই থাকুক না কেন, যেন ভালো থাকে। অবশেষে আলমারি খুলে ভেতর থেকে একটা গোলাপী রঙের জামদানি শাড়ি বের করে নিল ইরাম। ইযান ইতোমধ্যেই তৈরি। বিছানায় বসে খেলনা গাড়ি দিয়ে খেলছে। ইরাম ছেলের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে শাড়িটা দেখাল। ঠোঁটে মোলায়েম হাসি নিয়ে বলল,
“এই শাড়িটা তোমার বাবার দেয়া প্রথম উপহার। কী মনে হয় কুচুপু? আমরা জিতবোই আজ, তাইনা?”
“বাব্বা… আম আম!”
উত্তেজিত হয়ে দুহাত নাড়ল ইযান। যেন সহমত জানাচ্ছে মায়ের কথায়। ইরাম শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে নিল। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল মুগ্ধভরে। নাহ, ওই মানুষটার ছোঁয়া যখন তার সাথে আছে, তখন সে পারবেই। আজ তাকে পারতেই হবে।
তৈরি হতে হতে বিল্ডিংয়ের নিচে সি এন জি নিয়ে চলে এলো ইহান। আজ কোর্টে সেই ইরামের সাথে যাচ্ছে। ছেলেকে নিয়ে নিচে নামল ইরাম। একটু আগেভাগেই যাচ্ছে কারণ আরেক উকিলের সাথে তার আলোচনা আছে। নয়টার আগেই আদালত প্রাঙ্গণে পৌঁছে গেল তারা। বেশ সকাল হলেও চারপাশে ইতোমধ্যে মানুষের উপস্থিতি বেড়েছে। ইতিউতি ফাইল হাতে দৌঁড়াচ্ছে কেউ। উকিলদের সাথে কথা বলছে অনেকে। আবার জুনিয়র উকিলরা চাওয়ালার পাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে আলাপ আলোচনা করছে। ইহান সামনে সামনে, তার ঠিক পিছনে ইরাম। আশেপাশে বিশেষ নজর নেই রমণী, সে ছেলেকে বুকে চেপে ধীরপায়ে হাঁটছে। হুট করে ঝড়ো একটা হাওয়া বয়ে গেল। শুকনো বালি বাতাসে উড়তে লাগল। সেই ঝাঁপটা থেকে বাঁচাতে ইযানকে নিজের বুকে চেপে আড়াল করে নিল ইরাম। তার খোলা চুলগুলো উড়ল বাতাসে, ছড়িয়ে পড়ল কপালে, আড়াল করে ফেলল চোখের দৃষ্টি। সেই ঝাপসা নয়নে হঠাৎ একটা ছায়া নজরে এলো বুঝি। অবয়বটা পরিচিত। শুকনো মাটিতে কালো ছায়ামূর্তি। খুব কাছে এক নিগূঢ় অস্তিত্ব যেন। বাতাসে চিরচেনা সুঘ্রাণ। কয়েক লহমার জন্য ইরাম সম্পূর্ণ জমে গেল। বুকের ভেতর হৃদপিন্ডের তেজ কেন বাড়ল বুঝতে পারলনা। মায়ের অস্থিরতা টের পেয়ে ইযান তার বুকে নড়চড় শুরু করল। দিগ্বিদিক ভুলে ঝট করে ঘুরে চাইল ইরাম। তার চোখজোড়া হন্যে হয়ে খুঁজল আশেপাশে। কিন্তু সেই ছায়ামূর্তির দেখা মিললনা। যেন ঝোড়ো বাতাসের সাথেই মিলিয়ে গিয়েছে তার অস্তিত্ব। ইরাম ছুটে গেল আশেপাশে, অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করল প্রতিটা চেহারা, প্রতিটা মানুষ। তবে তাকে আশাহত হতে হলো। না, নেই সে। নিশ্চয়ই ইরামের কল্পনা।
“আপু? কী ব্যাপার?”
পিছন থেকে ইহান এগিয়ে এলো চিন্তিতমুখে। হাত বাড়িয়ে বোনের শাড়ির ভাঁজে আটকে যাওয়া ধূলিকণা ঝেড়ে দিল। মাথা দোলালো ইরাম, আস্তে করে জানাল,
“কিছুনা। মনে হলো…কাউকে বুঝি দেখলাম।”
“কাকে দেখেছ? কী না কী কল্পনা করো! সত্যি করে বলো তো, গতকাল রাতে ঘুমিয়েছ?”
ইরাম এই প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল। অলীক কল্পনা! নিজের বোকামিতে নিজের মৃদু হাসল সে। তারপর পা বাড়াল কোর্টের দিকে। ইহান এগোল পিছুপিছু। ইযান মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে ডেকে উঠল,
“আম!”
ইরাম ছেলেকে আঁকড়ে তার গালে চুমু দিয়ে বলল,
“তোমার আম্মু লড়বে সোনা। শেষ নিঃশ্বাস অব্দি কুচুপুর আম্মু তার আপনজনদের জন্য লড়ে যাবে।”
ঝোড়ো বাতাস বয়ে গেল আবারও। তবে এবার আর ইরাম পিছু ফিরলনা। চোখে দৃপ্ত দৃষ্টি ফুটল তার। এখন থেকে তার আর পিছুটান নেই, পিছুপথ নেই। সে এগোবে, ছেলেকে সাথে নিয়ে শুধুই সামনে এগোবে।
আজ কোর্টের জন্য বের হতে একটু দেরী হয়ে গিয়েছে অরণ্যর। একে তো ঘুমটা ভেঙেছে দেরীতে, উপরন্তু রান্নার লোক রাঁধতে গিয়ে করেছে আরেক ঝামেলা। শেষমেষ অরণ্য সাড়ে নয়টার দিকে দ্রুত তৈরি হয়ে নিচে নেমে এলো। হাতঘড়ি লাগাতে লাগাতে লম্বা পায়ে এগোল বাইরের দিকে। গাড়ি অপেক্ষা করছে তার।
“স্যার?”
কেয়ারটেকারের ডাকে অরণ্য থমকাতে বাধ্য হলো। গলা চড়িয়ে একটা ধমক দিল,
“কী সমস্যা? যাত্রার সময় পিছু ডাকিস কেন? গর্ধব!”
কেয়ারটেকার শুকনো ঢোক গিলে কাছে এলো। একটা খাম বাড়িয়ে দিল অরণ্যর দিকে। জানাল,
“কাইল দুফুরে আপনার জন্য এইটা আইসিলো।”
ভ্রু কুঁচকে ফেলল অরণ্য।
“কাল এসেছে, আজ দিচ্ছিস? শালা! একটাও কাজের না!”
“আপনে তো বাইত ছিলেন না। রাইতে আইসেন।”
“তো রাতে দিবিনা?”
“ভুইলা গেছিলাম।”
“ভোল! ভুলে বসে থাক। সর এখন চোখের সামনে থেকে। পরে এসে দেখব।”
বলেই অরণ্য পা চালিয়ে চলে যাচ্ছিল কিন্তু কেয়ারটেকার ডেকে উঠল,
“আদালত থেইকা আইসে!”
আমার আলাদিন পর্ব ৭০
অরণ্যর পা হড়কাল। দরজার ফ্রেম ধরে নিজেকে ধাতস্থ করল সে। তারপর উল্টো ঘুরে হনহনিয়ে হেঁটে গিয়ে কেয়ারটেকারের হাত থেকে খাম ছিনিয়ে নিল। দ্রুতহাতে খুলল। ভেতরের কাগজের কালো কালিতে টাইপ করাটা তার টানা টানা দু চোখে ভাসল অভিশাপের মতন। এমন এক অভিশাপ, যা পথ ঘুরে তার দুয়ারেই ফিরে এসেছে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০
মামলা/ আবেদন নং: ১৩৯/২০২৭
ইরাম কিবরিয়া- আবেদনকারী
বনাম
অরণ্য মির্জা সওদাগর- প্রতিপক্ষ
কারণ দর্শানোর নোটিশ
অর্ধসমাপ্ত
