Home তুমি এলে বসন্ত নামে তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২৪

তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২৪

তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২৪
রিমঝিম বৃষ্টি

” এখানে বসে আছেন যে বাড়ি যাবেন না..!”
ইরাদ কথা বললো না সামনে তাকিয়ে রইলো এক ধ্যানে। তা দেখে পাশেই ফারিশা বসলো। ইরাদ সামনের দিকে তাকিয়েই বললো,
” ইয়াশ কোথায়..?”
” জাহিদের কাছে সবাই ফিরবো তাই গাড়ি ঠিক করতে গেছে..!”
ইরাদ পাশ ফিরে শীতল চাহনি নিক্ষেপ করে ফারিশার দিকে আর শান্ত গলায় বললো,
” ফারিশা আমার ছেলেকে একটাবারের জন্য তার বাবার ছবি দেখাও নি, তাকে জানাও নি তার বাবা কে..?”
ফারিশা ইরাদের প্রশ্নে স্থির হলো। মাথার হিজাব ঠিক করে সামনে তাকিয়ে বললো,
” আপনার ফেরার নিশ্চয়তা কী আদো ছিলো আমার কাছে বলুন। একটা টা দুইটা গোটা পাঁচ বছর তাই হাল ছেড়েছিলাম । একটা নিষ্পাপ বাচ্চা কে মিছে আশ্বাস দিতে আমার গায়ে বেঁধেছিলো ইরাদ। যদি সে বলতো বাবা কোথায় আমি কী বলতাম মারা গেছে না আমাদের ছেড়ে চলে গেছে আপনিই বলুন, তাই বলেনি আমি.!”
ইরাদ গা দুলিয়ে বললো,

” তার চেয়ে বলতে মরেই গেছে। এর চেয়ে বড় আঘাত আর কী হতে পারে ফারিশা যখন আমারি সামনে আমার ছেলেকে কেউ জিজ্ঞেস করলো “তোমার বাবা এটা ” তখন আমার ছেলে কী বললো ” না এতা মিলাদ, আমার বাবা কোতায়”। ফারিশা আমি কীভাবে বোঝাবো তোমায় আমার কতটা আঘাত লাগলো তখন তুমি কী বুঝো না! ”
” সময় দিন আমায় ও বাচ্চা মানুষ ইরাদ..!”
” সময়! আর কত সময় চাও তুমি এর চেয়ে মরণ আসাও দ্বিগুণ ভালো ফারিশা..!”
ফারিশা ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে রইলো। ইরাদের মুখে মরার কথা শুনে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
” এতটুকুতেই হাঁপিয়ে গেলেন, মরণ চাচ্ছেন। আর আমার যে কত কষ্ট হয়েছিলো এতগুলো বছর তা বুঝলেন না আপনি। আমি এতগুলো বছরে নিজেকে ভেঙেছি আবার নিজেই গড়েছি নিজেকে তখন কিন্তু আপনি ছিলেন না। তাই আমার জীবন, আমার সন্তানের জীবন তার ওপর সর্বপ্রথম কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার হুকুম এলে সেটা আমিই করবো আগে..!”,

এতটুকু বলেই ফারিশা উঠে চলে যেতে যেতে বললো,
” দ্রুত আসুন গাড়ি চলে এসেছে বোধহয়..! ”
ইরাদ রাগ দমিয়ে কয়েক সেকেন্ড বসে থেকে দ্রুত উঠে চলে গেলো।
বিদায় বেলায় তুবার কান্না দেখে যেনো গোটা বাড়ি কেঁদে উঠলো। জামাল উদ্দিন মেয়ের কান্না দেখে চোখ বুজে রইলো। পাশ থেকে তুবার ভাই শুধু তাকিয়ে দেখলো।
বয়সে ছোট হওয়ায় এসবে তার কোনো আবেগ কাজ করলো না তবে বোনের চলে যাওয়া দেখে মায়ের পাশেই ঠাঁই হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো শুধুু।
ফারিশা আগেই ছেলেকে নিয়ে গাড়িতে বসেছে। ইয়াশ মায়ের কোলে বসে বললো,
” আম্মু কখন যাবে? গালি যায় না কেন..?”
ছেলেকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ফারিশা শান্ত গলায় বললো,
” যাবে বাবা। আচ্ছা ইরাদ তোমার কে হয়..?”
ইয়াশ মায়ের দিকে তাকিয়ে চটপটা উত্তর দিলো,

” মিলাদ হয়..!”
” ওটা তোমার বাবা হয় যেমন দিয়ার বাবা আছে, ইরাদও তোমার তেমন বাবা। তুমি এখন থেকে ইরাদকে বাবা বলে ডাকবে হে সেনা..!”
ইয়াশ মায়ের দিকে তাকিয়ে গোলগোল চোখ করে শুধালো,
” মিলাদ বাবা হয় আমাল..?”
” হুম তোমার বাবা..!”
” কিন্তু আমার যে মিলাদ ভালো লাগে..?”
ফারিশা ছেলের কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে দুই গাল টেনে বললো,
” কিন্তু বাবা যে কষ্ট পাচ্ছে, তুমি বাবাকে বাবা বলে ডাকলে বাবা ভীষণ খুশি হবে, দিয়ার বাবার মতো তোমাকেও প্রতিদিন আদর করবে..!”
ইয়াশ কথা বললো না মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো শুধু তা দেখে সেও আর ছেলেকে জোর করলো না ।
একে একে সবাই দ্রুত গাড়িতে উঠতেই রওনা হলো ঢাকার উদ্দেশ্যে ।

ঢাকা————-
ফিরতে ফিরতে রাত বাজলো ১১ টা। এত রাতে জাহানারা জাহিদ আর ফারিশাদের বাড়ি যেতে দিলো না। বসার রুমে সবাই বসে আছে । জাহিদ রুমে চলে গেছে সে আগেও মাঝেমধ্যে জিসানের বাড়ি এসে থাকতো তাই নিজের মতো চলে গেলো এদিকে আর ফিরেও তাকালো না। তুবা মাথা নিচু করে বসে আছে সোফায় পাশেই ফারিশা। বা সাইডের ডিভানে বসে আছে ইরাদ আর ইয়াশ। জিসান মায়ের ডাকে মায়ের রুমে গেছে।
” আম্মু আসবো..?”
” ভেতরে এসো..! ”
জিসান ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে মায়ের পাশে দাঁড় হতেই জাহানার ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
” কষ্ট হচ্ছে..! ”
জিসান মায়ের কথা যেনো হেসেই উড়িয়ে দিলো,
” কী যে বলো আম্মু কষ্ট হবে কেন বরং নিজেকে আজ আসলেই যোগ্য মনে হচ্ছে যে একজনকে রক্ষা করেছি..!”
জাহানার সোফায় বসে চশমা টা খুলে পাশের টেবিলে রেখে বললো,
” তা আমার ছেলে কেমন সেটা আমিও জানি। জিসান আমি জানি তোর তুবাকে মানতে কষ্ট হবে কিন্তু ভাগ্য যেহেতু তোদের জুড়ে দিছে আর অমত করিস না, ভেঙে পড়িস না আর। ভুলে যাস না তুই এখন বিবাহিত সেই অবস্থায় আর দ্বিতীয় কোনো নারীর কথা মাথাও আনিস না..!”
মায়ের কথায় জিসান এগিয়ে এসে হাটু গেড়ে বসে মায়ের হাটুর ওপর নিজের মাথা খানা কাত করে রাখলো আস্তে করে। মায়ের পা জড়িয়ে উদাস সুরে বললো,

” আম্মু সবকিছু ভোলা কী এত সহজ। ফারিশা কে কীভাবে ভুলবো আমি, সে যে আমার জীবনের আসা প্রথম নারী ছিলো কিন্তু দেখো ভাগ্য আমার সাথে কী নিষ্ঠুর খেললো শুরু থেকেই তাকে পায় নি আমি..!”
জাহানারা প্রসঙ্গ পাল্টাতে কিছুটা ঠাট্টার স্বরে বললো,
” তোর বাবা কিন্তু খুশি হয়েছে একটাবারের জন্যও জানতে চায় নি মেয়ে কে শুধু বলেছে কী জানিস, বলেছে আমার ছেলে সত্যি বিয়ে করে ফেললো।”
মায়ের কথায় জিসান হেসে উঠলো টলমল চোখ দ্রুত মুছে মাথা তুলে হেসে উঠলো আর বললো,
” বাবা আসতিছে কী..? ”
” তা আর বলতে অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে সে এক সপ্তাহের। সে নাকি তার ছেলে আর বউমার সাথে দিন কাটাবে তাই রওনা দিয়েছে তবে আজ বোধহয় তোদের সাথে দেখা হবে না। তোর বাবার ফিরতে ফিরতে রাত ১-২ টা বাজবে। আর তোর বড় বোন এসেছে আর নাইমা সকালে আসবে..!”
জিসান উঠে দাঁড়ালো আর বললো,

” আচ্ছা আমি ফ্রেশ হতে গেলাম তুমি নিচে যাও একটু..!”
তারপর দু’জনেই বেরিয়ে গেলো।
” তুবা তুমি ভাইয়ার বউ হবে তা ভাবতেই পারিনি..! ”
জারার কথায় তুবা কেবল মাথা নিচু করে রইলো। অতিরিক্ত কান্নার ফলে মাইগ্রেনের ব্যাথা যেনো জেঁকে বসেছে। পাশ থেকে ফারিশা কিছুটা বুঝতে পেরে বললো,
” জারা আপু ওর বোধহয় মাইগ্রেনের ব্যাথা উঠছে বাড়িতে মেডিসিন নেই থাকলে একটু দাও তো..!”
জারা শোনামাত্রই কাজের বোয়াকে ডেকে খাবার আর সাথে মেডিসিন আনতে বললো। জাহানারা বাইরে এসে বললো,
” ফারিশা তোমরা ওপরের রুমে গিয়ে ঘুমিয়ো রুম পরিষ্কার করাই আছে। আগে খেয়ে এসো অনেক রাত হয়েছে তো বোরকা পড়ে আসো কখন থেকে..!”
” না না আন্টি এত রাতে আর কিছু খাবো না..!”

ইরাদ ডিভানে বসে ফোন স্ক্রল করছে পাশ থেকে ইয়াশ হাসফাস করতে করতে বললো,
” মিলাদ আমাল হাগু পেয়েছে.!”
হয়েছে কাম সারছে এবার ইরাদ চোখ তুলে সামনে তাকাতেই দেখলো ফারিশা নেই এখানে শুধু জিসানের বড় বোন বসে আছে। ইরাদ পাশ ফিরে ছেলেকে বললো,
” একটু চাপিয়ে রাখো আম্মুকে ডাকছি..! ”
” না হবে না বেলিয়ে যাবে..!”
ইরাদ কিছুটা গলা উঁচিয়ে ফারিশাকে ডাকতেই পাশ থেকে জারা ফোন স্ক্রল করতে করতে বললো,
” ফারিশা তুবার সাথে একটু রুমে গেছে..?”
” দোতলার কোন রুম ফাঁকা আছে..!”
জারা ওপরের দিকে দেখিয়ে বললো,
” ডান সাইডের শেষ রুম..!”

ইরাদ ইয়াশকে কোলে নিয়ে দ্রুত হাটা শুরু করলো ওপরের যাওয়ার জন্য। ওপরের রুমের দিকে যেতে পথেই ফারিশার সাথে ইরাদের দেখা হতেই ইরাদ ফারিশাকে বললো,
” তোমার ছেলের হাগু পেয়েছে ফারিশা নিয়ে যাও..!”
ফারিশা তাড়া গলায় বললো,
” আমি একটু রুমে নিয়ে শুধু প্যান্ট টা খুলে দেন ও একাই যেতে পারবে আমি নিচ থেকে এই যাবো আর এই আসবো..!”,
বলেই ছুটে চলে গেলো সিঁড়ি দিয়ে ইরাদ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কয়েক সেকেন্ড তারপর চলে গেলো রুমে তা সিঁড়ির আড়াল থেকে ফারিশা ইরাদের ওমন মুখখানা দেখে মুখ টিপে হেসে উঠলো। ইরাদ দ্রুত রুমে গিয়ে ওয়াশরুমের দরজা খুলে বললো,

” যাও..! ”
ইয়াশ নিজেই প্যান্ট খুব ইরাদের হাতে প্যান্ট দিয়ে চলে গেলো। ইরাদ ইয়াশকে যেতে দেখে হাফ ছেড়ে বাঁচলো যেনো, বেডের ওপর বসতে গেলেই ফের ইয়াশের কন্ঠ পেয়ে।
” মিলাদ..!”
ইরাদ এগিয়ে এসে ফ্লোরে হাটু ভেঙে বসে বললো,
” কি হলো বাবা..?”
” মিলাদ ভেতরে ওইটা কী আমি ওটাতে বসবো না, ভয় কলে..!”
ইরাদ বুঝতে পারলো ছেলে কমোত চিনে না কিন্তু এখন হবে কী? ফারিশা এই আসবো বলে এখনো এলো না। ইরাদ ছেলের দিকে তাকিয়ে বোকা হেসে বললো,
” বাবা ওইটাতে আরও ভালো করে বসতে পারবে চলো নিয়ে যায়…!”
ইয়াশ ইরাদের কাছে ছুটে এসে ইরাদের গলা চেপে ধরে বললো,
” না যাবো না..!”
ইরাদ ছেলেকে দু’হাতে চেপে ধরে বললো,
” হাগু পেয়েছে যে বললে তুমি..?”
” নেই হয়ে গেছে..?”
ইরাদের ভ্রু কুঁচকে গেলো ছেলের কথায়।
” নেই হলো কীভাবে এতো তাড়াতাড়ি মিথ্যে বলছো না তে…?”
ইয়াশ খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো আর বললো,

” জানি না.!”
” প্যান্টি ভরে করে দিবে না তো আবার..!”
ইরাদের কথায় ইয়াশ আরও জোরে হেসে উঠলো আর বললো,
” এত জোরে চাপে নাই আমাল..!”
ইরাদ চোখ দুটো ছোট ছোট করে তাকিয়ে ছেলেকে প্যান্ট পড়িয়ে বাইরে আসতেই দেখতে পেলো বাম সাইডের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে জিসান। তা দেখে ইরাদ ছেলেকে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে বললো,
” কী রে যা বউ অপেক্ষা করছে তো..!”
জিসান কারোর গলা পেয়ে পিছন ঘুরে ইরাদকে দেখে শক্ত চোখে তাকিয়ে বললো,
” বাড়িতে এসেছেন চুপচাপ নিজের রুমে যান প্লিজ আজ লড়াই করার মুডে নেই..! ”
ইরাদ ইয়াশকে নিয়ে সূক্ষ্ম হেসে পিছন ফিরে যেতে যেতে বললো,
” ওল দ্যা বেস্ট ভাই..!”,
বলেই বাঁকা হাসি দিয়ে চলে গেলো নিজের রুমে। জিসান সেদিকে তাকিয়ে হাত দুটো মুঠো করে ফেললো। নিজেকে সামলে রুমে ঢুকে দরজা আটকে দিলো। পিছন ঘুরে দেখলো তুবা তার বেডের ওপর চোখ বুজে বসে আছে। জিসান গম্ভীর চোখে তা একবার অবলোপন করে এগিয়ে গিয়ে বললো,
” বেড সাইডের ড্রয়ারে দেখ মেডিসিন আছে খেয়ে নে.?”
কারোর কন্ঠ পেতেই তুবা হচকচিয়ে উঠলো, সবেমাত্র ঘুম এসেছিলো তার চোখে। সামনে জিসান কে দেখে বেডের আরও কোণায় সরে গিয়ে বললো,
” খেয়েছি মেডিসিন..! ”
তুবার কথা শুনে কাবাট থেকে একটা গেঞ্জি আর টাওজার নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো জিসান তার কয়েক মিনিট বাদে বের হতেই তুবা এক নজর সেদিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিয়ে বেড থেকে নামতে নামতে বললো,

” তুই বেডে ঘুমা আমি সোফায় শুইয়ে পড়তে পারবো..!”
জিসান এগিয়ে এসে ভ্রু কুঁচকে তাকালো আর বললো,
” তোকে একবারও বলেছি আমি উঠতে, চুপ করে বেডে ঘুমা..! “,
তুবা জিসানের কথা শুনে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো জিসান পাশের থেকে একটা বালিশ নিয়ে সোফায় গিয়ে রাখতেই তুবা নিচু গলায় বললো,
” বললাম তো আমি ঘুমায় তুই গেলি কেন..?”
জিসান সোফায় শুইয়ে বললো,
” আমার এখানে শুইয়ে অভ্যাস আছে তুই ঘুমিয়ে পড় দ্রুত..! সকালে বাবা আসবে, আপু আসবে তোর সাথে দেখা করতে তাই দ্রুত ঘুমিয়ে যা..! ”
” খেয়েছিস তুই..? ”
জিসান উল্টো দিক হয়ে থাকায়,তুবা বুঝলো না তার মুখের ভঙ্গি। জিসান সূক্ষ্ম হেসে শুধু বললো,
” হুম..!”
তুবা আর কথা বললো না জিসানের দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘ শ্বাস ফেললো, বেডের এক কোণায় শুইয়ে পড়লো লাইট বন্ধ করে সারাদিনের ধকল সকল ক্লান্তি যেনো এসে চোখে ভার জমালো ।

” তোকে এত এত ধন্যবাদ কাজটা করে দেওয়ার জন্য। সিরিয়াসলি মাথায়ই ছিলো না তুই চট্টগ্রাম আছিস। আচ্ছা, এখন কী চাই তোর তাই বল..? ”
ফোনের ওপাশ থেকে তিহান হেসে উঠলো আর বললো,
” যেই বউয়ের জন্য এত কাহিনী করলি আগে তার হাতের বিরিয়ানি খেতে চায় একটু..!”
” নো ওয়ে আমার বউয়ের হাতের জিনিস তোকে কেনো দিবো অন্য কিছু বল..?”
ইরাদের কথায় তিহান দুঃখী দুঃখী ভাব করে বললো,
” থাক তোকে কিছু দিতে হবে না আমাকেও সন্দেহের তালিকার রাখছিস বোধহয়..! ”
ইরাদ সূক্ষ্ম হেসে বললো,
” আচ্ছা বউকে নিয়ে আগে বাড়ি ফিরে যায় তারপর তোকে ইনভাইট করবো কী না ভেবে দেখবো বাবাও তোকে দেখতে চেয়েছিলো অনেক আগে থেকেই সেই সাথে দু’টো কাজই হয়ে যাবে..! ”
তিহান ফিক করে হেসে বললো,

” ওকে ওকে ডান..!”
কারোর আসার আওয়াজ পেতেই ইরাদ ফোন টা কেটে দিয়ে পকেটে রেখে দিলো। ফারিশা এসে প্লেট টা ছোট্ট টেবিলের ওপর রেখে দরজা আটকে দিলো। তখন সে দেখলো ইরাদ ইয়াশকে নিয়ে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে । ফারিশা ভেতরে আসতেই ইরাদ ভেতরে এলো। বেডের ওপর বসতে বসতে বললো,
” বোরকা আর কতক্ষণ পড়ে থাকবে খুলো..!”
” খেয়ে নিন আগে..! ”
ইরাদ এক নজর প্লেটের দিকে তাকিয়ে বললো,

” একজনের খাবার কেনো, তোমার টা কয়..?”
” আমার খিদে নেই। আপনি আর ইয়াশ খেয়ে নিন এটা..!”
ইরাদ ইয়াশকে পাশ বসিয়ে দিয়ে হাত ধুইয়ে প্লেট টা নিয়ে বেডের ওপর রাখলো। ইয়াশ তো প্লেটের খাবার দেখতে ব্যস্ত। ফারিশা আয়নার সামনে গিয়ে হিজাবের পিন খুলতে বসলে পিছন থেকে ইরাদ তার হাত টেনে ধরে বেডে কাছে নিয়ে বসায়।
” কি হলো বললাম খান আপনারা..! ”
ইরাদ প্লেটের ভাত মাখিয়ে ফারিশার মুখে সামনে ধরে বললো,
” এতক্ষণ না খেয়ে কীভাবে আছো নাও হা করো..!”
” আপনার খাবার এঁটো হয়ে যাবে..? ”
ইরাদের ছেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো,
” উফফ কথা টা ভুল বললে ফারিশা। এক প্লেটে খেলে শুনেছি ভালোবাসা আরও বাড়ে এসব এঁটো আমি মানি না আমার বউ, বাচ্চার জন্য..! ”
ফারিশা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে হা করতেই ইরাদ খাইয়ে দিলো পাশ থেকে ইয়াশ মুখ এগিয়ে বললো,

” মিলাদ আমাকেও দাও..!”
ইরাদ ইয়াশকেও খাইয়ে দিলো সাথে নিজেও খেলো । খাওয়া শেষ করতেই রুম আটকে দিলো আজ একই রুমে থাকতে হবে ভেবেই ইরাদ সূক্ষ্ম হেসে উঠলো। ফারিশা প্লেট টা টেবিলে রেখে পিছন ঘুরতেই দেখতে পেলো ইয়াশ ঘুমের ঘোরে যেনো একবারে ঢুলছে তা দেখে এগিয়ে আসলে ইরাদ ইয়াশকে ধরে বললো,
” তুমি আগে বোরকা খুলো ওকে আমি নিচ্ছি..!”
ফারিশা এগিয়ে এসে ছেলেকে নিজের কোলের সাথে মিশিয়ে বললো,
” সমস্যা নেই ও এখনি ঘুমিয়ে যাবে আপনি বরং ফ্রেশ হয়ে আসুন..!”
ইরাদ ফারিশার দিকে তাকিয়ে ফ্রেশ হতে গেলো। কয়েক সেকেন্ড বাদে বেরিয়ে দেখতে পেলো ইয়াশ ঘুমিয়ে গেছে ইরাদ গিয়ে বেলকনির কাছে দাঁড়িয়ে আছে রুমের দিকে ঘুরে, ফারিশা ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে আয়নার সামনে গিয়ে বোরকা খুলতেই ইরাদ যেনো থ হয়ে রইলো কয়েক সেকেন্ড এর জন্য। স্থির হলো তার দৃষ্টি, শীতল চাহনি নিক্ষেপ করলো ফারিশার দিকে। ফারিশার পরনে তার দেওয়া বিয়ের পরের দিনের সেই প্রথম দেওয়া লাল শাড়ি টা দেখে যতটা অবাক হলো ততটায় প্রাণ জুড়ালো যেনো তার। ফারিশা বোরকা খুলে শাড়ির আঁচল টেনে বেলকনির দিকে পা বাড়াতে দেখে ইরাদ চটপট পিছন ঘুরে দাঁড়ালো, তার বুক যেনো উঠানামা করছে , ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলো । ফারিশা একদম ইরাদের পাশে গিয়ে দাঁড় হলো। আকাশের জ্বলজ্বল করা তারা আর চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললো,

” ঘুমাবেন না রাত কত বাজে দেখেছেন..? দ্রুত আসুন..!”,
” শাড়ি পড়েছো তুমি..?”
ফারিশা রেলিঙের ওপর হাত রেখে বললো,
” হুম একটায় ছিলো ভাবলাম বিয়ে বাড়িতে যায় পড়ে..!”
বলেই পিছন ঘুরতে লাগলে ইরাদ ফারিশা হাত ধরে নিজের বুকের কাছে টেনে নেয়। ফারিশা হুড়মুড়িয়ে ভয়ে ইরাদের শার্ট আঁকড়ে ধরে ফেললো। বড়বড় চোখে করে মিনমিন গলায় বললো,
” পাগল হয়েছেন পড়ে যেতাম যদি..?”
” পড়তে দিলে তো..! ”
” ছাড়ুন আমায়..!”
” শাড়িতে তোমায় বউয়ের মতো লাগছে ফারিশা..!”
ফারিশা ক্ষীণ হেসে বললো,
” সেই বউয়ের মতো চেহারা আর নেই ইরাদ, সময়ের অভাবে, অযত্নে হয়ে উঠেছে এক পোড়া, ক্ষয় হওয়া ফ্যাকাসে চেহারা..!”
ইরাদ ফারিশাকে আরেকটু আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে বললো,
” কিন্তু আমার কাছে তুমি সেই আগের ফারিশাই আছো। একটু জড়িয়ে ধরি তোমায়..!”
ফারিশার চোখ দুটো স্থির হলো। পিটপিট করে চোখের পলক ফেলে বললো,
” এখন না ছাড়ুন, ইয়াশ ঘুমাচ্ছে..! ”
ইরাদ ছাড়লো না তার চাহনি যেনো আরও শীতল হয়ে এলো। ফারিশার কাছে ঝুঁকে এসে তার কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ালো বেশ খানিকটা সময় নিয়ে তারপর সরে আসতেই দেখলো ফারিশার গাল বেয়ে জল পড়ছে। ফারিশার কান্নাভেজা চোখ খানায় নিজের ঠোঁট দু’টো আলতো করে ছোঁয়াতেই ফারিশা চোখ দু’টো বন্ধ করে ফেললো। ফারিশা সরে এসে কাঁপা কাঁপা স্বরে বললো,

” আপনার অপেক্ষায় হয়েছি আমি কাতর আর আপনি আসলেন এত দেরিতে। আমার এতদিনের কষ্ট দূর করতে পারবেন আপনি..?”
ইরাদ ফারিশাকে নাক টানতে দেখে তার মাথা টা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে বললো,
” কষ্ট কী জিনিস তার আর একচুলও তোমায় বুঝতে দিবো না ফারিশা। যদি আমাকে আল্লাহ ক্ষমতা দিতো তো আমি তোমার আগের সব কষ্ট নেই করে দিতাম। আমার আদরের সেই ফারিশাকে আমি আবার দেখতে চাই যে, আমার কাছে একটু বায়না করবে সেই আগের মতো , যে সময়ে-অসময়ে আমায় একটু যত্ন করবে ব্যাস এতটুকুই চায় ফারিশা..!”
ফারিশা ইরাদের বুকের মাঝেই মাথা রেখে চুপটি করে রইলো যেনো তার চেয়ে শান্তির স্থান আর নেই। ইরাদ ফারিশাকে চুপ থাকতে দেখে মাথায় হাত বুলিয়ে নরম গলায় বললো,
” চলো ঘুমিয়ে পড়ো সকাল হলেই ফিরতে হবে..!”
ফারিশা মাথা তুলে আর তাকালো না ইরাদের দিকে সোজা রুমে গিয়ে সোফার কাছে যেতে দেখে ইরাদ বেডের কাছে এসে বললো,
” বেডেই শুইয়ে পড়ো মাঝে এত সুন্দর একটা বেরিগেড থাকতে তোমার আলাদা করে চিন্তা করতে হবে না শুইয়ে পড়ো তাড়াতাড়ি..! ”

ফারিশা ইরাদের কথায় নিঃশব্দে হেসে ইয়াশের পাশের শুইয়ে পড়লো কোনো কথা ছাড়াই। তা দেখে ইরাদও তৃপ্তি হেসে উঠলো লাইট বন্ধ করে ইয়াশের আরেক পাশে শুইয়ে তার কাছে যেনো এখন পরিপূর্ণ একটা সংসার মনে হচ্ছে। ইয়াশের গায়ে হাত দিতেই ফারিশার হাতে হাত পড়লো, ফারিশাও ইয়াশের গায়ে হাত রেখেছিলো। ফারিশা ঠাস করে পেরে দিলো ইরাদের হাতে আর বললো,
” একদম কাছে আসবেন না বিছানা যথেষ্ট বড় আছে তাই ঠিক করে শুইয়ে থাকবেন.!”
ইরাদ পাশ থেকে অন্ধকারের মধ্যেই ভদ্র ছেলের মতো বললো,
” ওকে একদম আসবো না পাকাপাকি প্রমিস..!”

তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২৩

ফারিশা আর কথা বললো না চোখ বন্ধ করলো। সারাদিনের ব্যস্ততার কারণে কয়েক মিনিটের মাঝেই ঘুমিয়ে পড়লো কিন্তু ইরাদ ঘুমোয় নি সে ফারিশার ভারী নিঃশ্বাস ফেলার আওয়াজ পেতেই বাঁকা হাসি দিলো। ইয়াশকে আস্তেধীরে সরিয়ে তার অপর পাশে রাখলো, পড়ে যেনো না যায় তাই সুন্দর করে কর্ণারে কোলবালিশ টা রেখে দিলো তারপর আস্তেধীরে ফারিশার কাছে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করলো আর বিড়বিড়িয়ে বললো,
” আপাতত ইরাদের ব্রেন ইন্তেকাল করেছে তাই তার পাকাপাকি প্রমিস এর স্মৃতি হারিয়ে গেছে! “,
বলেই মুচকি হেসে ঘুমিয়ে গেলো।

তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here