Home অগ্নিশিখার অন্তরালে অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ২১

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ২১

মেঝেতে ঝুঁকে ঝাড়ু দিচ্ছিল কিয়ারা। কপালে জমে থাকা কয়েক ফোঁটা ঘাম হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে নেওয়ার মুহূর্তেই ওর ফোনটা সুরেলা আওয়াজে বেজে উঠল। কিয়ারার বুকটা এক নিমেষে দোলা দিয়ে উঠল, ও ভাবল বোধহয় ইয়াশ রেস্টুরেন্টের কাজ থেকে একটু সময় পেয়ে ফোন দিয়েছে। কিন্তু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখল ইয়াশ নয়,
বড় বোন ইনায়া ফোন করেছে।
মুহূর্তেই কিয়ারার মলিন ঠোঁটে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। মির্জা বাড়ি ছাড়ার পর এই কঠিন দিনগুলোতে কেউ ওদের খোঁজ না নিলেও, ইনায়া দূর থেকেই সবসময় বোনের খবর রাখে। লুকিয়ে চুরিয়ে অনেকভাবে সাহায্য করারও চেষ্টা করে। কিয়ারা ফোনটা কানে দিয়ে আদুরে গলায় বলল, “উমম আপ্পি, বলো বলো বলো, তোমাকেই মিস করছিলাম”
ওপাশ থেকে ইনায়া কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠলো, “কেমন আছিস বুনু? কিছু খাবি? কী খাবি বল, আমি নিয়ে আসি?”
কিয়ারা ঘরের এক কোণে ঝাড়ুটা হেলান দিয়ে রেখে বিছানায় বসল। এক বুক স্বস্তি নিয়ে বলল, “খুব ভালো আছি আপ্পি। তুমি কেমন আছো? আর কিছু খেতে হবে না, তুমি শুধু এমনিই একবার আসো না। তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।”
ইনায়া নাছোড়বান্দার মতো আবার বলল, “আরে বল না, মোমো খাবি? নাকি আইসক্রিম নিয়ে আসবো?”
কিয়ারা হেসে ফেলে বলল, “বললাম তো এসব কিচ্ছু লাগবে না, তুমি শুধু তাড়াতাড়ি আসো।”
ইনায়া আচ্ছা বলে ফোনটা কেটে দিল। কিয়ারা ফোনটা পাশে রাখতে যাবে, ঠিক তখনই ইনায়ার ফোনেই আবার একটা কল চলে এলো। তবে এবার স্ক্রিনে রুদ্র নামটা ভেসে উঠতেই ইনায়ার মেজাজটা সপ্তম আকাশে চড়ে গেল। এই ছেলেটা যে কী পরিমাণ ফাজিল! সারাদিন কোনো কাজকাম নেই, খালি ফোন দিয়ে বউ বউ করে মাথাটা চিবিয়ে খায়।ইনায়া একদম দাঁত কিড়মিড় করে কলটা রিসিভ করেই ঝাড়ি মেরে বলল, “এই শালা! তুই আবার ফোন দিয়েছিস কেন রে? তোকে কতবার বলেছি আমি তোর চেয়ে বয়সে বড়, তোর বড় বোন হই আমি? আমাকে ফোন করে উল্টা পাল্টা বলবি না। তোকে কতো গুলো নাম্বার থেকে ব্লক করেছি আমি?”
ওপাশ থেকে রুদ্র মোটেও দমে গেল না। সে বেশ রোমান্টিক গলায় আহ্লাদ করে বলল,
“ও বউ! তুমি কেন বোঝো না বলো তো? আমি তোমাকে সত্যিই অনেক পেয়ার করি!”
ইনায়া রুদ্রর এমন ফাজলামি শুনে রাগে একদম লাল হয়ে গেল। ফোনের ওপাশে থাকা রুদ্রকে যেন চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে, এমন গলায় চেঁচিয়ে বলল,
“মেরে একদম তোমার মুখের সব কটা দাঁত ভেঙে দেবো, বেয়াদব ছেলে! বয়সে আমি তোমার কত বড়, তোমার বড় আপু হই আমি! আমাকে এভাবে বউ বলতে তোমার একটুও লজ্জা করে না?”
রুদ্র অবশ্য ইনায়ার এই চিৎকার একটুও গায়ে মাখল না। সে ফোনের ওপাশ থেকে বেশ আয়েশ করে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে হাসতে হাসতে বলল,
“আরে বউ তো বউই হয়! এখানে আবার সিনিয়র আর জুনিয়র কিসের? বয়সের ডিফারেন্স দিয়ে কি আর ভালোবাসা আটকানো যায়? আমি কিন্তু আপনাকে বিয়ে করেই ছাড়বো, আপু!”
রুদ্রর মুখে একাধারে বউ আর আপু ডাক শুনে ইনায়া নিজের কপালে হাত দিল। এই ছেলের পাগলামির কোনো ওষুধ নেই। সে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলল, “তোমার কি মাথায় কোনো সমস্যা আছে রে ভাই? নাকি ছোটবেলায় তোমাকে পোলিও খাওয়ানো হয়নি? একদম মেন্টাল একটা!”
কথাটা শুনে রুদ্র ওপাশ থেকে একটু নাটকীয় সুর করে বলল, “আরে একদম পিউর কথা বলেছেন! বিয়ের পর আপনি যখন আমাকে নিজের হাত দিয়ে পোলিও সেবন করাবেন, সেই সুযোগটা রাখার জন্যই তো ছোটবেলায় পোলিও একটু কম খেয়েছি। এমনকি ছোটবেলায় দুধও ঠিকমতো খেতাম না, কারণ ভাবতাম বিয়ের পর নিজের বউয়ের ছিহ ছিহ! কী বলতে গিয়ে কী কইতাছি!”
রুদ্রর মুখের এই ডাবল মিনিং আর অসভ্য মার্কা কথা শুনে ইনায়ার কান দুটো ঝাঁঝাঁ করে উঠল। লজ্জায় আর রাগে তার গাল দুটো লাল হয়ে গেল। সে আর এক সেকেন্ডও এই জানোয়ারটার কথা শোনার প্রয়োজন মনে করল না। চিৎকার করে বলল, “আস্ত একটা জানোয়ার তুই! আজ থেকে আর কোনোদিন আমাকে কল দিবি না!”
কথাটা বলেই ও ওপাশ থেকে রুদ্রর কোনো জবাব না শুনেই খট করে কলটা কেটে দিল। রাগ সামলাতে সামলাতে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা খালি রিকশা ডেকে ঝটপট উঠে বসল। ইনায়ার গন্তব্য এখন কিয়ারার বাসা।
রিকশায় বসেও ওর মাথাটা রুদ্রর ওপর গরম হয়ে ছিল, তবে রিকশাটা যখন মেইন রোড ছেড়ে ভেতরের গলিগুলোতে ঢুকতে শুরু করল, তখন ইনায়ার মনটা কেমন যেন ভারী হয়ে এলো। এই তো মাত্র কয়েক মাস আগের কথা, কত রাজকীয় একটা বাড়িতে কিয়ারা থাকত। আর আজ এই ভাঙাচোরা, ঘিঞ্জি গলির ভেতর ওকে আসতে হচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর রিকশাটল একটা পুরনো, চুনকাম খসে পড়া তিন তলা বাড়ির সামনে এসে থামল। ইনায়া পার্স থেকে ভাড়া মিটিয়ে রিকশা থেকে নামল। এর আগেও সে একবার লুকিয়ে কিয়ারার এই বাসায় এসেছিল। আজ নিয়ে এটা দ্বিতীয়বার। চারপাশের পরিবেশটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে
ইনায়া কিয়ারার ছোট্ট ভাড়াবাড়ির ভেতরে ঢুকেই এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। চারপাশটা ভালো করে দেখে ওর মনের ভেতর এক অদ্ভুত ভালো লাগা ছুঁয়ে গেল। এই সামান্য ঘরটাকে কী নিখুঁত আর সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছে মেয়েটা! ঘরে পা রাখতেই যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য। আগেরবার যখন ও একদম নতুন অবস্থায় এই বাসায় এসেছিল, তখন চারপাশটা বেশ অগোছালো আর মলিন ছিল। কিন্তু আজ সব চেনা ছবি বদলে গেছে। ঘরের দেয়াল থেকে শুরু করে ছোট খাটটি পর্যন্ত পরিপাটি। ইনায়া মনে মনে ভাবল, ওর চঞ্চল মেয়েটা তাহলে সত্যিই পুরোপুরি সংসারি হয়ে উঠেছে!
ঠিক তখনই ইনায়াকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিয়ারা মুখে এক গাল মিষ্টি হাসি নিয়ে দৌড়ে এলো। কোনো কথা না বাড়িয়ে ও এক ঝটকায় ইনায়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কতদিন পর আপন কাউকে এভাবে কাছে পাওয়া! কিয়ারা ইনায়ার গালে একটা ভালোবাসার চুমু দিয়ে আদুরে গলায় বলল, “এসেছো তুমি আপ্পি? তোমাকে যে কত মিস করছিলাম আমি!”
ইনায়ারও বুকটা মায়ায় ভরে গেল। ও-ও পাল্টা কিয়ারার কপালে একটা চুমু এঁকে দিয়ে নরম গলায় বলল,
“উমম, আমিও তোকে ভীষণ মিস করেছি রে বুনু। তা… তোর বর কই? কাজে গেছে?”
কিয়ারা আলতো করে বোনকে ছেড়ে দিয়ে একটু মলিন কিন্তু শান্ত হেসেই বলল, “হুঁ, সকালেই চলে গেছে ও।”
ইনায়া কিয়ারার দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। বোনের চোখের দিকে তাকিয়ে বেশ গভীর ও চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করল, “একটা সত্যি কথা বল তো কিয়ারা, তুই কি সত্যিই এখানে ভালো আছিস?”
কিয়ারা এবার একটু শব্দ করেই হেসে উঠল। নিজের পরনের সাধারণ সুতির জামাটার দিকে ইশারা করে বলল, “কেন বলো তো? আমাকে দেখে কি তোমার মনে হচ্ছে আমি খুব খারাপ আছি?”
ইনায়া বোনের মুখের সেই চেনা হাসি দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলেও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “নাহ, তাও… মনটা কেমন যেন করে তোর এই অবস্থা দেখে।”
বোনের মন ভালো করতে কিয়ারা চটপট টপিক বদলে বেশ উৎসাহের সাথে বলল, “আচ্ছা শোনো, আজ সকালে আমি নিজের হাতে একটু গরম গরম খিচুড়ি রান্না করেছি। খাবে তুমি?”
রান্না শব্দটা শুনে ইনায়ার চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। ও অবাক হয়ে বলল, “বলিস কী! তুই শেষ পর্যন্ত রান্নাও শিখে গেছিস?”
কিয়ারা বেশ গর্বের সাথে মাথা নেড়ে বলল,
“হুঁ, এই কয়েক মাসে আমি একা একা সংসারের সব কাজ শিখে গেছি।”
ইনায়া আর লোভ সামলাতে পারল না। ও হেসে ফেলে কিয়ারার গালটা আলতো করে টিপে দিয়ে বলল,
“বাহ্! তাহলে তো খেতেই হয়। দে জলদি বেড়ে দে, দেখি আমার ছোট বোন কেমন রাঁধুনি হয়েছে!”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here