তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২৬
রিমঝিম বৃষ্টি
” কী রে ইভান এত সকাল সকাল কোথায় যাস..?”
ছোট মা একটু কলেজে যাবো ওখানকার স্যার ডেকেছে আমাদের..! ”
সুমানা সোফায় বসে কাপড় ভাঁজ করতে করতে বললো,
” তার মানে তুই সাবাহ্’র কলেজে যাচ্ছিস..?”
ইভান জুতো পড়তে পড়তে বললো,
” হে কেনো ছোট মা সাবাহ্ কলেজ যায় নি আজ..?”
” গিছে পাজী মেয়েটা আজ শাড়ি পড়েছে সেজেগুজে গেছে সব বান্ধবী মিলে নাকি কলেজের পাশেই একটু ঘোরাঘুরি, সময় কাটাবে তাই একটু দেখিস তো দেখা হলে শাসিয়ে আছিস যেনো কোথাও ছোটাছুটি না করে..! ”
ইভান ঠাস করে পাশে বসে পড়লো। গম্ভীর কন্ঠে বললো,
” তুমি ওকে যেতে দিলে কীভাবে ছোট মা। এখনকার দিনকাল কী ভালো তার ওপর আবার শাড়ি পড়েছে..?”
সুমানা কাপড়গুলো হাত থেকে ঠাস করে ফেলে ঝাড়ি মেরে বললো,
” শোন আমায় বকবি না তুই, ইদানীং তোর বোনের খুব লায় বেড়েছে। আমার একটা কথাও কানে করে না সে
ওর বাবাকে এ কথা জানাতে চাইছি তো। তোর চাচ্চু বাড়িতে বসার সময় পাচ্ছে না ইদানীং তাই বলছি না কারণ অফিস থেকে ফিরলেই মাথা গরম হয়ে থাকে তার.!”
” তুমি কাকে কী বলছো ছোট বউমা ওর হাতে তো খালি মাইর। তোমার মেয়েকে দেখলেই মেরে বসবে..!”
বলতে বলতে আয়েশা চৌধুরী এগিয়ে আসতেই ইভান উঠে বের হতে হতে বললো,
” খ্যাক খ্যাক করো জন্যই মাথার বুদ্ধিটাও খ্যাক খ্যাক হয়ে গেছে..! “,
বলেই বেরিয়ে গেলো তা দেখে আয়েশা মুখ বাকিয়ে বললো,
” এ বাড়িতে আর থাকা যাবো না দেখছি যে যা পারে আমারে শোনায় দেয়..!”
” মা বলছিলাম ভাবী রে আনার ব্যবস্থা করেন বাড়ি টা খালি খালি মনে হচ্ছে। না জানি কোথায় রাগ করে গেছে। মানুষ জানলেই বা কী বলবে ভাববে বাড়িতে নিশ্চয় অশান্তি লাগছে তাই বাড়ি থেকে চলে গেছে.!”
আয়েশা মুখ টা শুকনো করে পাশে বসেই বললো,
” আচ্ছা তোমারে জন্য না হয় আমিই ছোট হলাম। বড় বউ তো ছেলে না আসলে ফিরব নানে আগে ছেলে আর ছেলের বউকে আনি তারপর যা হবে দেখা যাবে। আমি ঘরে যাচ্ছি বড় পোলা আসলে পাঠায়ে দিও কথা আছে..! “,
বলেই ধীর পায়ে উঠে নিজের রুমে চলে গেলো। তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে সুমানা মনে মনে বেশ হাসলেন এই ভেবে যে শেষমেশ হার মানলেন ইরাদের জন্য, ইরাদের বুদ্ধি আছে মানতে হবে।
কলেজের পাশেই একটা নিরিবিলি লেক আছে সেখানে ছোটখাটো পিকনিক বানালে মন্দ হয় না যেনো। দূর থেকে ভেসে আসছে মৃদু বাতাস। সামনেই কিছুটা বড় পুকুর যার ঠান্ডা বাতাসে পুরো জায়গা আরও সুন্দর করে তুলেছে ঠিক নিখুঁত ভাবে যেমন ক্যানভাসে আঁকা ছবি হয় তেমন। সাবাহ্’র পরনে আজ সিল্কি বেগুনি আর সাদা মিশ্রিত রঙের শাড়ি, দু-হাত ভর্তি মেচিং করে রেশমি সুতোর চুরি পড়েছে, চুলগুলো খোলা, দু’চোখ কাজল দিয়ে রাঙিয়েছে সাথে ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক এতেই যেনো মারাত্মক লাগছে। সাবাহ্ পুকুর পাড়ে এক বেঞ্চের ওপর সুন্দর করে পা গুটিয়ে বসলো। দূর হতে পুকুর পাড়ে এক ধ্যানে চেয়ে রইলো। পুকুরের ঢেউ যেনো তার সব মনের দুঃখ উড়িয়ে করলো তাকে পাথর। শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুধু পুকুরের ঢেউ দেখলো। তার থেকে কিছুটা দূরে বসে আছে তার বান্ধবী লাবিবা আর কেয়া । সাবাহ্ কে এভাবে বসে থাকতে দেখে লাবিবা বললো,
” আমরা এসেছি পিকনিক করতে, একটু পিক তুলতে আর মহারানী দেখছি দুঃখ বিলাস করছে। আচ্ছা ব্যাপার কী তোর বল তো প্রেমে পড়েছিস কারোর..!”
সাবাহ্ সেদিকে তাকিয়েই বললো,
” এমনটা কেনো মনে হলো তোর..?”
” কারণ তুই কখনো শাড়ি পড়িস নি আর না এতো সেজেগুজে বাইরে এসেছিস কখনো । হ্যাঁ শাড়ি পড়েছিস কিন্তু বাইরে বের হতি না তো তাই সন্দেহ হচ্ছে..! ”
সাবাহ্ হেসে উঠলো আর বললো,
” তোমারে কইয়া লাভ কী সোনা। যারে বুঝাইতে চায় সে তে বুঝলো না আর না পড়তে পারছে আমার এই মন! ”
কেয়া লাবিবার কাঁধে হাত রেখে হতাশার সুর গাইলো,
” আহারে বান্ধবী মনে হয় একদম সেই হারে প্রেম পুকুরে ডুব দিয়েছে..!”
মেয়ে দুটো আরও কিছু বলতে যাবে তার আগেই পিছনে একজনকে দেখে চুপ মেরে গেলো। সাবাহ্ দু’জন কে চুপ থাকতে দেখে বেঞ্চের সাথে হাত ঠেকিয়ে মুখে হাত দিয়ে বললো,
” তোরা চলে যা আমি এখানেই থাকবো আজ..?”
” তুই কী করবি এখানে, বসে বসে পুকুরের পানি গুনবি..?”
চেনা কন্ঠ স্বর শুনতেই সাবাহ্ চট করে পাশ ফিরতেই দেখলো ইভান। ডানদিক ঘুরে দেখলো তার বান্ধবী গুলো কিছুটা দূরে সরে গিয়ে ছবি উঠছে। ফের বাম সাইডে ফিরলো ইভানকে দেখে যেনো এবার তার পিলে চমকে উঠলো। পা দুটো নামিয়ে পিটপিট তাকিয়ে বললো,
” আপনি এখানে কি করছেন ইভান ভাই..?”
সাবাহ্’র মুখ দেখে ইভান যেনো পড়তে পড়তে পড়লো না, গিয়ে ধাক্কা খেলো বেঞ্চের সাথে। বেঞ্চের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বসে বললো,
” কি রে কানী! এই কানী এসব কী সেজেছিস তুই। একেই তো পুচঁকে তার ওপর পড়েছিস শাড়ি। আর তোর চোখ দু’টোর সাথে এক পেয়ারি লালের মিল পাচ্ছি ইশশ মারাত্মক লেভেলের..! “,
বলেই চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো তা দেখে সাবাহ্ মাথা কিছুটা সরিয়ে এনে বললো,
” কার মতো লাগছে ইভান ভাই..! ”
ইভান নিজের বুকেই হাত রেখে চোখ খুলে উৎফুল্ল কন্ঠে বললো,
” পুরোই গরুর দু’টো চোখের মতো ইশশ..!”
সাবাহ্ রেগে সামনে ঘুরে তাকালো সে আর তাকাবেই তার দিকে একটু কি প্রশংসা করতে পারে না সে এমন কেনো। সাবাহ্ গাল ফুলিয়ে বললো,
” এইজন্য আপনার ওপর ভীষণ রাগ হয়। এক সেকেন্ডের জন্যও আপনি আমার প্রশংসা করেন না ইভান ভাই..! ”
ইভান সাবাহ্’র রাগ দেখে হেসে উঠলো আর বললো,
” তুই শেওলা গাছের পেত্নী তোর আর কী প্রশংসা করবো বপশি প্রশংসা করলে আবার যদি ঘাড়ে চেপে বসে যাস তখন..?”
সাবাহ্ জবার দিলো না। পুকুরের দিকে এক ধ্যানে চেয়ে রইলো তা দেখে ইভান সামনে তাকিয়ে বললো,
” পুকুরের দিকে তাকিয়ে কী এত চিন্তা করছিস..!”
সাবাহ্’ ভাবান্তর হয়ে ঠোঁট উল্টালো আর বললো,
” ভীষণ অভাবে ভুগছি ইভান ভাই..? ”
ইভানের ভ্রু কুঁচকে গেলো। বেঞ্চের ওপর মাথা কাত করে সাবাহ্’র মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
” তা কীসের অভাব শুনি..?”
” প্রেমের অভাব পড়েছে। মন চাচ্ছে প্রেম সাগরে ডুবে মরি কিন্তু মরার সঙ্গী পাচ্ছি না হবেন আমার সঙ্গী..?”
সাবাহ্’র কথায় ইভান নাক-মুখ ছিটকে বললো,
” না ভাই এখনো বিয়ে করিনি বাচ্চা-কাচ্চার মুখ দেখিনি, জামাই-বউমার মুখ দেখি নাই আগেই মরতে চায় না..!”
” উমম… আইসে আমার জামাই-বউমার মুখ দেখতে কী শখ। নিজে করলো না বিয়ে উনি আগেই তার বাচ্চারও বাচ্চার কথা ভাবছে ঢং..!”
সাবাহ্’র কথা শুনে ইভান মুখ টিপে হাসলো আর বললো,
” এদিকে তাকা..?”
” ঢেঁড়স! কেন তাকাবো আবার ছাগলের রুপ খুঁজবেন বুঝি..?”
ইভান হাত এগিয়ে সাবাহ্’র থুতনি চেপে নিজের দিকে করাতেই সাবাহ্’র দৃষ্টি নরম হলো সব রাগ ভুলে পানি হয়ে গেলো। ইভানের হাত খানা ধরে দুলাতে দুলাতে মিষ্টি হেসে বায়না করলো,
” আমার ইভান ভাই কত.. ভালো একটু দেন না ছবি তুলে..?”
ইভান ভাব নিয়ে ক্যামেরা টা নিয়ে উল্টো দিক ঘুরে বললো,
” তোর তো ভালোই চায় না তাহলে পিক তুলে দিবো কেন আবার খারাপ হলে বলবি ইচ্ছে করে করেছি..?”
সাবাহ্ বেঞ্চ থেকে নামতে নামতে বললো,
” আরে দিন তো ছবি তুলে..?”
ইভান দাঁড় হলো। ক্যামেরা টা হাতে নিয়ে সাবাহ্ কে রেডি হতে বললো,
” নে পোস দে সুন্দর করে এবার.! ”
সাবাহ্ সুন্দর করে দাঁড়িয়ে পোস দিলো কখনো ঘাসের ওপর বসে আবার কখনো পুকুরের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুললো। ইভান ছবি গুলো দেখে ভ্রু কুঁচকে বললো,
” কিছু একটা মিসিং মনে হচ্ছে..? ”
সাবাহ্ ঘাসের ওপর বসেই বললো,
” এতগুলো পোস দেওয়ার পর আপনার মিসিং মনে হলো.?”
ইভান আশেপাশে তাকাতেই দেখলো পদ্ম বিক্রি করছে একজন। লেকের পাশ আর সাথেই কলেজ হওয়ায় ফুলের দোকান রয়েছে এখানে বেশ কয়েকটা । ইভান দৌড়ে ফুল টা নিয়ে সাবাহ্ কে দিয়ে বললো,
” নাউ পারফেক্ট..! ”
সাবাহ্ ফুল পেয়ে তো মনে যেনো লাড্ডু ফুটলো তার। ছবি ওঠার পর দু’জনে পুকুরের পাশে এসে বসলো। টলটলে পানিতে পা ডুবিয়ে রেখেছে সাবাহ্। দূর হতে তার বান্ধবী গুলোকে দাঁড়িয়ে গল্প করতে দেখলো ছেলেদের সাথে তা ইভান খেয়াল করলো এক নজর তারপর সেদিকে তাকিয়েই জিজ্ঞেস করলো,
” আচ্ছা ওই দুটো একা বুঝলাম কিন্তু পাশের তিনটা মেয়ের সাথে তিনটা ছেলে কি করছে..?”
সাবাহ্ সেদিকে তাকিয়ে একবার শুকনো ঢোক গিলে ইভানের দিকে তাকিয়ে বললো,
” আরে ওরা তো আমাদের সাথে আসেনি। আমার সাথে এই দু’জন এসেছে শুধু..!”
ইভান সরু চোখে তাকালো আর বললো,
” কাহিনি করিস তুই মিথ্যে বলবি আর বিশ্বাস করবো ভাবছিস ওই গুলোকে আমি তোর প্রাইভেটে দেখছি সত্যি করে বল তো ওরা কি করতে আসছে..!”
” আসলে হয়েছে কী ওগুলো ওদের বয়ফ্রেন্ড আমরা ঠিক জানতাম না ওরাও আসবে কিন্তু আমরা তিনজন কিন্তু একসাথে আছি ওদের কাছে যা…….
বাকি কথা বলার আগেই ইভান পুকুরের পানিতে হাত ডুবিয়ে পানি তুলে সাবাহ্’র মুখে দিলো। এক হাত সাবাহ্’র ঘাড় চেপে ধরে তার মুখের সব সাজ ধুইয়ে দিলো। সাবাহ্ রাগে চেঁচিয়ে উঠলো,
” ছাড়ুন কি করলেন আপনি..! ”
ইভান সব ধুইয়ে সরে এসে বললো,
” ঠিক করেছি, বাড়ি ফিরবি আমার সাথে এখুনি নয়তো ছোট মাকে বলে দিবো তুই বয়ফ্রেন্ড এর সাথে দেখা করতে এসেছিলি..!”
” যান গিয়ে বলেন তখন আমি বলবো যে ইভান ভাই আমার সেই বয়ফ্রেন্ড..! “,
বলেই মুখ বাকালো তা দেখে ইভান স্থির হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়লো। রাগে সেখানেই দাঁতে দাঁত চেপে রইলো।
” আচ্ছা আপনি জানলেন কি করে আমি এখানে আর আপনিই বা এখানে কেনো..?”
” তোর আম্মা বলছে আমার নাগিন রে ধরে নিয়ে আয় আমার কাছে তো বিন নাই কিন্তু হাত আছে বুঝলি তো..! “,
বলেই চট করে সাবাহ্ কে পাজা কোলে তুলে নিলো সাবাহ্ তা দেখে কটমটিয়ে বললো,
” নামান কিন্তু ইভান ভাই আমি এখন বাড়ি যাবো না..? ”
ইভান শুনলো না সোজা হাঁটা ধরলো দূর হতে তার বান্ধবী গুলো হা হয়ে রইলো শুধু। ইভান সোজা বাইকের সামনে এসে তাকে দাঁড় করিয়ে নিজের বসে বললো,
” জলদি উঠবি নয়তো বাইক দিয়েই চাপা মেরে চ্যাপ্টা বানিয়ে ফেলে রেখে যাবো..! ”
সাবাহ্ বাইকে উঠে ইভান গলা টেনে ধরে বললো,
” বাড়িতে চলুন আগে তারপর বোঝাচ্ছি মজা..!”
” ছাড় কানী..! ”
সাবাহ্ ছেড়ে দিতেই দু’জনেই বাড়ির দিকে চলে গেলো।
” এই মেয়েকে দেখেছেন এখানে. বা আশেপাশে থাকতে…?”
লোকটি ফোনে থাকা সাদা থ্রিপিস পরা মেয়েটার ছবিটা এক নজর দেখে বললো,
” না ভাই দেখি নাই..!”
তরুণ টি লোকটির কথায় আর দাঁড়ালো না সামনে হাটা ধরতেই দেখা হলো তার ক্লাইমেট এর ছোট বোনের সাথে। মেয়েটি এগিয়ে এসে বললো,
” আরে আপনি রাইশা আপির ফ্রেন্ড তাই না ভাইয়া.? ”
ছেলেটা প্রথমে চিনতে অসুবিধা হলেও পরক্ষণেই চিনতে পেরেই মৃদু হেসে বললো,
” হে কী খবর তোমার আর তোমার আপুর? ”
মেয়েটি ক্ষীণ হেসে বললো,
” আপু তো বাচ্চা-কাচ্চা সামলাতেই দিন যাচ্ছে আর আমি এই তো ভার্সিটিতে উঠবো ভাইয়া দোয়া কইরেন..!”
” অবশ্যই.! ”
মেয়েটি ছেলেটার ঘাম জড়ানো শার্ট আর মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
” কোথায় গেছিলেন ভাইয়া এত ঘেমেছেন যে..?”
” তেমন কিছু না এসেছিলাম একজনের খোঁজে..! ”
ছেলেটার কথায় মেয়েটি বললো,
” তা পেয়েছেন তাকে..?”
ভারী শ্বাস ছেড়ে ছেলেটা মেয়েটাকে বললো,
” না পায় নি..!”
” কে সে জানতে পারি কি..?”
মেয়েটার কথায় ছেলেটা ভ্রু কুঁচকে এক নজর তাকিয়ে কিছু একটা ভেবে ফোন টা তার সামনে ধরে বললো,
” এই মেয়েটার খোঁজে আসছিলাম..?”
মেয়েটার ফোনের স্ক্রিনে কয়েক সেকেন্ড দম ধরে থেকে তাকিয়ে বললো,
” কোথায় যেনো দেখেছি উনাকে কেমন চেনা চেনা লাগছে..?”
মেয়েটার কথায় ছেলেটার বুক ধড়ফড়িয়ে উঠলো কিছুটা উৎফুল্ল কন্ঠে বললো,
” আরেকটু ভালো মনে করে দেখো তো..! ”
মেয়েটা তৎক্ষণাৎ তাড়া গলায় বললো,
” আরে ওনাকে তো আমি একটা ক্যাফেতে দেখেছিলাম সাথে বাচ্চা ছিলো আর একটা ছেলেও ছিলো বোধহয় ওনার হাসবেন্ড হবে..! ”
হাসবেন্ড এর কথা শুনতেই ছেলেটা চমকালো আর বললো,
” আরে না ও বিয়ে করবে কেনো। একটু বলবে কোন ক্যাফেতে দেখেছিলে তাকে..?”
” এই বাম সাইডে গলিতে গিয়ে দেখেন টেকআউট এর সাথেই এক ক্যাফে হাউজ আছে..!”
মেয়েটার কথায় আর দাঁড়ালো না ছুটলো সেদিকে। ও যদি বিয়ে করে থাকে তাহলে তার মা-বাবা তাকে বলে নি কেনো। ছেলেটা বিড়বিড়িয়ে নিজেকে শান্ত্বনা দিতে লাগলো যেনো,
” না আমার ফারিশা বিয়ে করে নি এখনো..?”
দুপুর গড়াতেই খাওয়া শেষ করে ইয়াশ ইরাদের পাশে বসে আছে। ইরাদ ল্যাপটপে কাজ করছে। ফারিশা পাশের রুমেই বসে আছে। ইয়াশ ইরাদের কাজ করতে দেখে বললো,
” তুমি কিন্তু আমায় গালি দেখাতে নিয়ে যাবে বলেচো..?”
ছেলের এখনো রাতের কথা মনেই আছে তা ভেবে ইরাদ ইয়াশের গাল টেনে বললো,
” আচ্ছা যাবো বিকেল হোক আগে..?”
” মিলাদ এই লাস্তায় ( রাস্তায়) একটা কুকুল ( কুকুর) আছে তুমি কী ভয় পাও কুকুল দেখে..!”
ইয়াশের এমন কথায় ইরাদ সূক্ষ্ম হেসে ল্যাপটপ টা সরিয়ে বললো,
” অনেক.. ভয় পায় বাবা তুমিও ভয় পাও..!”
ইয়াশ মুখে হাত দিয়ে হেসে বললো,
” কুকুল কে ভয় পায় কিন্তু কুকুল এর এত কষ্ত কেনো বাবা..?”
ইরাদের ভ্রু জোড়া কুঁচকে যেনো এক হলো। ছেলেকে শুধালো,
” কুকুরের আবার কষ্টও আছে জানতাম না তো। তা কুকুরের কী কষ্ট বাবা..!”
” আলে আমাদের মতো ওল বাততুম( বাথরুম) নেই তাই তো ওলা লাস্তায়ই হাগু করে দেয়..! ওদের কষ্ত না তাহলে বলো তুমি..?”
ইরাদ না চাইতেও হো হো করে হেসে উঠলো ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বললো,
” ওরে আমার দয়ালু রে এত গভীর চিন্তা আমাদের মাথাও আসেনি বোধহয় তুমি তো দেখছি বিজ্ঞানীদের ঘোল খাইয়ে দিবে.!”
” এই যে রুমে আসেন তাড়াতাড়ি..! ”
ফারিশার গলায় পেয়ে ইয়াশ ইরাদের কোল থেকে মাথা তুলে দরজার দিকে তাকাতেই দেখলো মায়ের হাতে বই তা দেখে ইয়াশ ইরাদের দিকে তাকিয়ে বললো,
” মিলাদ যে আমায় নিয়ে এখন ঘুলতে যাবে..?”
ইরাদ পাশ ফিরে ছেলের মুখ পানে গোলগাল করে তাকালো শুধু। ফারিশা এগিয়ে এসে বললো,
” একটু পড়াশোনা করো তাহলে তোমায় ঘুরতে যেতে দিবো..!”
মায়ের কথা শুনে এবার ভদ্র ছেলের মতো উঠে তার কোলে চলে গেলো, ফারিশা নিয়ে পাশের রুমে চলে গেলো। ইরাদ এক নজর সেদিকে তাকিয়ে ফের কাজ করতে বসলো। পাশ থেকে ফোন টা বাজতেই ইরাদ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো, স্ক্রিনে নিজের মায়ের নাম্বার দেখে ঠোঁট জোড়া প্রশস্ত করে ফেললো। ফোনটা হাতে নিয়ে রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বললো,
” কী রে কেমন আছিস তুই? সব ঠিক আছে তো ওদিকে ইরাদ…? ”
” হ্যাঁ আম্মু তুমি চিন্তা করো না..! ”
” আর কতদিন থাকবো বলতো ওরাই বা কী ভাববে..?”
ইরাদ গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
” তা বাবাকে বলো দীদাকে রাজি করাতে তার এত কি? সেদিন তো তোমার খোঁজে এসেছিলো ইশশ তোমার বরের মুখ দেখার মতো ছিলো বউয়ের জন্য পাগল হয়ে গেছিলো একদম বুঝলে তো..?”
ইভা ছেলের কথায় মুখ খানা ছোট করে বললো,
” বাপ কে এতো চিন্তায় ফেলিস না এমনিতেই প্রেসার উঠলে তার শরীর আর ঠিক থাকে না..! ”
” হু আর তোমার ছেলের কী হবে..! ”
” আচ্ছা শোন তমার মা তোকে ফোন দিতে চাচ্ছে কিন্তু ওর ফোনে ব্যালেন্স নাই একটু ফোন দিয়ে দেখ তো তোকে কী বলবে..?”
” আচ্ছা রাখলাম তাহলে..!”,
বলেই কেটে দিয়ে সুমানার কাছে ফোন দিলো।
” বলো অ আ..!”
” অ আম…!”
ফারিশা বইয়ের ওপর আঙ্গুল রেখেই বললো,
” এই তোমায় আমি আম বলতে বলেছি..?”
” আ এতে আম হয় তো আম্মু..!”
ইয়াশের কথা শুনে ফারিশা বললো,
” তা তো হয়..! আচ্ছা তারপর বলো ই..!”
” আম্মু কেমন গনধো বেল হচ্ছে..! “,
বলেই নাক ধরলো। ছেলের কথায় ফারিশা স্মেইল টা নিতেই মৃদু হেসে বললো,
” নিচের তলায় বোধহয় কেউ ইলিশ মাছ রান্না করছে। ভালো গন্ধ নাক ছেড়ে দাও..!”
” ইলিস..!”
ছেলের কথায় ফারিশা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললো,
” নাও তো পড়ো এবার বলো ই..!”
ইয়াশ বইয়ের দিকে তাকিয়ে ই এর নিচে মাছের ছবি দেখে বললো ,
” আম্মু ই তে কি হবে..?”
” ইলিশ হবে বাবা..!”
ইয়াশ আরেকটু বইয়ের কাছে ঝুঁকে এসে গোলগাল চোখে তাকিয়ে বললো,
” আম্মু আমি ইলিস খাবো…!”
ফারিশা বইয়ের পাতা চট করে উল্টে ফেলল আর বললো,
” আচ্ছা খেয়ো রাতে দিবো এখন কবিতা বলো তো! ”
তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ২৫
মায়ের কথা শুনে হাসি মুখে কবিতা পড়তে শুরু করলো।
পড়া শেষ হতেই ইয়াশ রেডি হয়ে ইরাদের সাথে ঘুরতে বের হলো। বাড়ি থেকে কয়েক মিনিটের রাস্তা পেরুলেই একটা খোলামেলা মাঠ যেখানে বিকেল হলেই সবাই খেলাধুলা করে দূর হতে মাঠের পাশ দিয়ে রাস্তা গিয়েছে সেখান দিয়ে গাড়িও যাতায়াত করে। মাঠে ঘুরতে ঘুরতে ইয়াশ ইরাদকে বললো,
” মিলাদ আজ অলপো গালি দেখবো আম্মু বলেছে লাতে ( রাতে) ইলিস দিবে..!”
ইরাদ ঘাসের ওপর বসেই পাশে ইয়াশকে বসিয়ে বললো,
” তাই নাকি আচ্ছা তাড়াতাড়ি চলে যাবো..! তোমার কী ইলিস ভালো লাগে..?”
” হুম সুনদর দেখতে হোয়াইত ইলিস..!”
