প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩৯
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না
গাড়ির বন্ধ জানালার ওপারে শহরের পরিচিত দৃশ্যগুলো দ্রুত পেছনে সরে যাচ্ছে। জিয়া চুপ করে বসে আছে ড্রাইভিং সিটের পাশে। আর স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হাত রেখে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে ড্রাইভ করে চলেছে ইফাত। কিছুক্ষণ আগেই ভার্সিটির সামনে থেকে একপ্রকার জোর জবরদস্তি করেই জিয়াকে গাড়িতে তুলে এনেছে সে। জিয়ার আসার একদমই ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু ইফাতের চরম জেদ আর জোরাজোরির কাছে তাকে শেষমেশ নতি স্বীকার করতেই হয়েছে। এমনকি এই হুট করে চলে আসার পেছনে রিত্তিকাকেও মিথ্যা বলতে হয়েছে তাকে—হালকা একটা বাহানা দিয়ে বলেছে যে জরুরি কিছু কাজ পড়ে যাওয়ায় তাকে এখনই যেতে হচ্ছে।
গাড়ি তার আপন গতিতে ছুটে চলেছে রাজপথ ধরে। ভার্সিটি থেকে তাকে তোলার পর থেকে এ পর্যন্ত ইফাতের মুখ থেকে একটা শব্দও বের হয়নি। থমথমে নীরবতার পর অবশেষে গাড়িটি এসে থামলো এক বিশেষ গন্তব্যস্থলে। গাড়ি থামতেই জিয়া সামনের দিকে তাকাল। একটি সুনির্দিষ্ট সাইনবোর্ড চোখে পড়তেই বিষম খাওয়ার জোগাড় তার। সে বিস্ময় ভরা চোখে ইফাতের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
__ “আমরা কাজী অফিসে কেন এলাম, ইফাত?”
ইফাত তার দিকে না তাকিয়েই গম্ভীর কণ্ঠে পাল্টা প্রশ্ন করল,
“__মানুষ কাজী অফিসে কেন আসে?”
__”বিয়ে করতে।” জিয়ার সরল স্বীকারোক্তি।
__”তাহলে নিশ্চয়ই আমরাও তাই করতে এসেছি।” ইফাতের সোজাসাপ্টা জবাব।
জিয়া এবার সত্যি সত্যি হতবাক হয়ে গেল। চোখ দুটো বড় বড় করে সে বলে উঠল, “মানে… কি সব বলছেন আপনি! বিয়ে? কিন্তু হঠাৎ করে কেন?”
ইফাত এবার সোজা জিয়ার চোখের দিকে তাকাল। চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত গাঢ়তা নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি আমাকে ভালোবাসো না?”
জিয়ার কণ্ঠ খানিকটা নিচু হয়ে এলো, “বাসি, কিন্তু…”
__”কিন্তু কিন্তু করছো কেন বারবার? তুমি কি ভয় পাচ্ছো? নাকি আমাকে অবিশ্বাস করছো?” ইফাতের গলায় আকুলতা।
__”আপনাকে যদি অবিশ্বাসই করতাম, তাহলে তো আর আপনার সাথে এতদূর আসতাম না।” জিয়া নিজের অবস্থান স্পষ্ট করল।
ইফাত কালবিলম্ব না করে জিয়ার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, “তাহলে চলো…”
জিয়া মৃদু শক্তিতে হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বোঝানোর মতো করে বলল, “বিয়েটা কোনো ছেলেখেলা না, ইফাত। পরিবারের কাউকে কিচ্ছু না জানিয়ে এভাবে হুট করে আমরা বিয়ে করতে পারি না।”
ইফাতের চোখের কোণে যেন এক অদ্ভুত ভয়ের ছাপ ভেসে উঠলো—যেন প্রিয় কোনো কিছু চিরতরে হারিয়ে ফেলার আতঙ্কে শিউরে উঠছে সে। নিজের স্বাভাবিক কন্ঠস্বর একধাপ খাদে নামিয়ে অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে বলল,
___”তোমাকে হারানোর বড্ড ভয় পাচ্ছি আমি, জিয়া। যদি কখনো তোমায় হারিয়ে ফেলি? বিশ্বাস করো, যেদিন তোমার সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল, সেদিনই এই হৃদয়ে তোমার জন্য এক গভীর অনুভূতির জন্ম হয়েছিল। আমি তোমাকে পেতে চেয়েছি একদম হালালভাবে, সম্মান দিয়ে। তোমাকে হারিয়ে ফেললে আমি ভেতর থেকে নিঃশেষ হয়ে যাবো। যেদিন থেকে শুনেছি তোমার বিয়ের কথা উঠছে বাসায়, সেদিন থেকে মুহূর্তের জন্যও শান্তিতে থাকতে পারছি না। কেবল মনে হচ্ছে তোমায় হারিয়ে ফেলবো।”
বাতাসের গতি যেন নিমিষেই স্তব্ধ হয়ে গেল। ইফাতের মুখ থেকে ভালোবাসার এমন গভীর আর আকুল স্বীকারোক্তি শুনে জিয়া সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে রইল। কোনো শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না সে মুখে দেওয়ার মতো। যে মানুষটা তাকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে এমন পাগলামি করতে পারে, তাকে সে কীভাবে ফিরিয়ে দেয়?
জিয়া মৃদুস্বরে বলল,
__”এতটা ভালোবাসেন আমায় আপনি?”
ইফাত কোনো দ্বিধা না রেখে তৎক্ষণাৎ জবাব দিল, “হ্যাঁ,
ভীষণ ভালোবাসি। তোমায় ভালোবাসি আমার নিজের থেকেও অনেক বেশি।”
জিয়া একটু ইতস্তত করে বলল, “কিন্তু আমি তো এর কিছুই জানি না! বাসায় যদি আমার বিয়ের কথা ওঠে, তবে তো আমার অন্তত জানার কথা।”
ইফাত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “এটা তোমার দাদু আমার দাদুকে বলেছেন, আর তখনই আমি জানতে পেরেছি।”
কথার মাঝেই ইফাত জিয়াকে নিয়ে কাজী অফিসের ভেতর প্রবেশ করল। চারপাশের কোলাহলহীন নীরব পরিবেশ, কোনো জমকালো আয়োজন নেই, নেই আত্মীয়স্বজনের ভিড়। কেবল দুজন মানুষের মন আর ভালোবাসাকে সাক্ষী রেখে কাজী সাহেব বিয়ের খাতা এগিয়ে দিলেন। জিয়ার হাত সামান্য কাঁপছিল, কিন্তু ইফাতের চোখের দিকে তাকাতেই তার সব দ্বিধা কেটে গেল। একে একে কবুল বলা এবং খাতায় সই করার মাধ্যমে দুজন মানুষ এক পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেল। কাজী অফিস থেকে বের হয়ে তারা আবার গাড়িতে এসে বসল—এখন তারা কেবল ভালোবাসার মানুষ নয়, একে অপরের জীবনসঙ্গী।
বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর গাড়িটি আবার শহরের রাস্তায় নামল। ঠিক তখনই হুট করে জিয়া চিৎকার করে গাড়ি থামানোর জন্য হাঁক ছাড়ল।
__”গাড়ি থামান ইফাত! তাড়াতাড়ি গাড়ি থামান!”
জিয়ার আকস্মিক ও ভয়ংকর চিৎকারে ইফাতের বুকটা কেঁপে উঠল। কোনো অঘটন ঘটল কি না সেই আতঙ্কে সে সজোরে গাড়িতে ব্রেক কষল। টায়ার ঘষার বিকট শব্দে গাড়ি থেমে গেল। ইফাত উদ্বেগে জিয়ার দিকে ফিরে তাকাল।
__”কী হয়েছে? গাড়ি থামাতে বললে কেন এত হন্তদন্ত হয়ে?”
জিয়া গাড়ি থেকে মুখ বাড়িয়ে বাইরের দিকে একনজর দেখে নিয়ে ইফাতের দিকে তাকিয়ে উৎফুল্ল গলায় বলল,
__”ফুচকা!”
ইফাত চারপাশে তাকাল, “কোথায় ফুচকা?”
জিয়া গাড়ির খোলা জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে বাইরে একটি ঝলমলে ফুচকার ভ্যানের দিকে নির্দেশ করে বলল,
__”ফুচকা! ওই যে দেখুন, ফুচকা!”
কথা শেষ করার এক মুহূর্তও দেরি করল না জিয়া। গাড়ি থেকে চটজলদি নেমে সোজা দৌড় দিল ফুচকার দোকানটার দিকে। দোকানে গিয়েই মামাকে স্পেশাল ফুচকার অর্ডার দিল এবং কালবিলম্ব না করে তুলে খেতে লাগল। ঝালের চোটে ততক্ষণে জিয়ার দুই গাল আর কান লাল হয়ে উঠেছে, তাও সে থামার পাত্রী নয়। সে দোকানদার
মামাকে হাত নেড়ে তাড়া দিল,
__ “মামা! আরও ঝাল দেন তো। এত কম করে কেন দিচ্ছেন? বেশি করে ঝাল বানিয়ে দেন!”
জিয়ার আদেশমতো দোকানদার মামাও কাঁচামরিচ আর ঝাল মশলা বাড়িয়ে আরও এক প্লেট স্পেশাল ফুচকা বানিয়ে সামনে দিল। পিছন পিছন ইফাত সেখানে এসে পৌঁছাল। জিয়ার দিকে তাকাতেই সে দেখল জিয়ার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে, ফর্সা গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে গিয়েছে, তবুও পরম তৃপ্তি নিয়ে খেয়ে চলেছে সে। দেখলেই বোঝা যাচ্ছে অসম্ভব ঝাল লেগেছে। ইফাত এবার সত্যি সত্যি রেগে গেল জিয়ার এই কান্ড দেখে।
ইফাত একটু কঠোর গলায় বলল,
__ “জিয়া! চলো এবার, আর খেতে হবে না। এত ঝাল লেগেছে তবুও হা করে খেয়েই যাচ্ছ কেন?”
কিন্তু কে শোনে কার কথা! জিয়া যেন কানেই তুলল না ইফাতের কথা। পুরো ফুচকার প্লেটটা শেষ করে যখন সে আবার অন্য আরেকটা প্লেটের দিকে হাত বাড়াতে গেল, তখন ইফাত চরম রাগে জিয়ার দিকে তাকাল। দোকানদারের হাতে দ্রুত টাকা গুজে দিয়ে জিয়ার হাত ধরে প্রায় টানতে টানতে এনে গাড়িতে বসিয়ে দিল।
গাড়ির দরজা বন্ধ করে ইফাত বিরক্তি নিয়ে বলল,
__ “ঝাল যখন একদমই সহ্য করতে পারো না, তখন অত শখ করে খাও কেন? নিজের চেহারার অবস্থা দেখেছ একবার আয়নায়? এইজন্যই কি তোমায় এখানে নিয়ে এসেছিলাম?”
জিয়া জিব বের করে বাতাসের তাড়া নিতে নিতে কোনোমতে বলল,
__”ঝাল… উফফ, অনেক ঝাল! পানি দিন… ঝাল ঝাল পানি দিন!”
ইফাত দ্রুত গাড়ির ড্যাশবোর্ডে আর পেছনের সিটে পানির বোতল খুঁজল, কিন্তু কোথাও পানি পেল না। এদিকে মেয়েটার পুরো মুখ ঝালের তীব্রতায় টকটকে লাল হয়ে উঠেছে, চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে।
জিয়া আবার হাঁসফাঁস করে বলে উঠল,
__”ঝাল… উফফ অনেক ঝা—”
বাক্যটি পুরোপুরি উচ্চারণ করে শেষ করার আর সুযোগ পেল না সে। জিয়ার কষ্টের ছটফটানি দেখে আর পানি না পেয়ে, ইফাত হুট করেই ঝুঁকিয়ে এসে জিয়ার নরম ঠোঁট জোড়া নিজের ঠোঁটের মাঝে গভীরভাবে চেপে ধরল। ইফাতের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও আচমকা কাণ্ড দেখে জিয়ার চোখ মুহূর্তে বিস্ময়ে বিস্ফোরিত হলো। স্তব্ধ হয়ে গেল সে। জিয়া প্রথমে ইফাতকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পরমুহূর্তেই ইফাতের পুরুষালী শক্তি আর গভীর ভালোবাসার টানের কাছে সে হার মানতে বাধ্য হলো। ইফাত যেন জিয়ার ঠোঁটে লেগে থাকা সমস্ত ঝাল আর উত্তাপ নিজের ঠোঁটের মাঝে শু’ষে নিচ্ছে পরম আবেশে। জিয়ার ধাক্কা দেওয়া হাত দুটো ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে এলো। সে নিজেও কেমন যেন এক ঘোরলাগা মোহের মধ্যে তলিয়ে যেতে লাগল। এক অদ্ভুত অনুভূতির বশবর্তী হয়ে সে ইফাতের শার্টের কলার দুটো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে নিজের দিকে টেনে নিল। চারপাশের কোলাহল, গাড়ির হর্নের শব্দ—কোনো কিছুই এই মুহূর্তে তাদের অনুভূতির জগতে ব্যাঘাত ঘটাতে পারল না।
প্রায় দীর্ঘ পাঁচ মিনিট পর ইফাত ধীরগতিতে জিয়ার ঠোঁট থেকে নিজের ঠোঁট সরিয়ে নিল। জিয়া লজ্জায় রাঙা হয়ে সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল গাড়ির জানালার দিকে। তবে তার গাল দুটো এতক্ষণ ফুচকার ঝালে লাল হয়ে ছিল, নাকি এখন ইফাতের এই কাণ্ডে চরম লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে—তা আলাদা করা সত্যি বড় দায়!
ইফাত কিছুটা লজ্জিত ও আমতা আমতা কণ্ঠে বলল,
__”আই অ্যাম সরি, জিয়া… আসলে তোমার ঝালটা কমানোর জন্যই হঠাৎ আমার এমনটা করা।”
সময় তার নিজস্ব নিয়মে বহমান। কালস্রোত তো আর কারো মনের অনুভূতি বা পরিস্থিতির জন্য এক জায়গায় থমকে থাকে না। দেখতে দেখতে চোখের পলকে আরও কয়েকটি দিন কেটে গেল। সেদিনের পর ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে জিয়ানকে রিত্তিকা বলেছিল যে, সে একা ফ্ল্যাটে না থেকে এখন থেকে কায়সার ম্যানশনে সবার সাথে একসঙ্গে থাকতে চায়। একা ফ্লাটে মন টিকছে না আর তার।
রাত এখন প্রায় তিনটা। কায়সার ম্যানশনের প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই জিয়ানের চোখ গেল ড্রয়িং রুমের দিকে। দেখল সোফার ওপর এক পায়ের ওপর ওপর পা তুলে বেশ শান্ত ভঙ্গিতে বসে আছেন নওশাদ কায়সার। জিয়ান তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কোনো কথা না বলেই পাশ কাটিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে যেতে চাইল। কিন্তু সে পদক্ষেপ ফেলার আগেই গম্ভীর কণ্ঠে নওশাদ কায়সার বলে উঠলেন,
__”দাঁড়াও।”
মুহূর্তেই জিয়ানের পা দুটো যেন মেঝেতেই থমকে যায়। সে ধীরে ধীরে পেছন ফিরে নিজের বাবার কঠোর মুখের দিকে তাকাল।
নওশাদ কায়সার বিরক্তি ভরা গলায় বললেন,
__ “দিন দিন বড্ড নালায়েক আর বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছ তুমি, জিয়ান।”
জিয়ান অত্যন্ত ভাবলেশহীন ও চাবুক মারা ভঙ্গিতে জবাব দিল, “আমি আবার কী করলাম?”
ছেলের এই অবাধ্য ও উদাসীন কথায় চরম রেগে গিয়ে নওশাদ কায়সার হুংকার দিয়ে বললেন,
__ “আহনাফকে কেন মেরেছ তুমি? তুমি কি মনে করো তোমার কোনো কুকীর্তির কথাই আমার কানে আসে না?”
আহনাফের নামটা শুনতেই মুহূর্তের মধ্যে জিয়ানের মুখের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। রগের রগগুলো ফুলে উঠল রাগে। তার পুরো গা যেন রি রি করে জ্বলতে লাগল। সে কঠিন কণ্ঠে বলল,
__ “জাস্ট দুটো হাড় ভেঙেছে, এটা ওই বাস্টার্ডের চরম সৌভাগ্য! আরিফ যদি আজ মাঝে পড়ে আমাকে না থামাত, তবে আমি ওকে আজ সোজাসুজি জানে মেরে ফেলতাম!”
নওশাদ কায়সার চোখ গরম করে বললেন,
__”জিয়ান! ভুলে গেছ তুমি আমি তোমার কে হই? লাগাম টানো তোমার মুখে!”
জিয়ান একচুলও পিছপা না হয়ে বলল,
__ “লাগাম জিনিসটা আমার ডিকশনারিতে নেই, সো সরি!”
কথাটি শেষ করেই জিয়ান বড় বড় কদম ফেলে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল, আর ড্রয়িং রুমে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন নওশাদ কায়সার।
নিজের ঘরে ঢুকে জিয়ান দেখল রিত্তিকা একটি কোলবালিশ শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে। রিত্তিকাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখেই যেন জিয়ানের ভেতরের সুপ্ত রাগটা আবার চড়চড় করে মাথায় চড়ে গেল। এই মেয়েটাকে সে কতবার, হাজারবার সাবধান করেছে ওই আহনাফের থেকে দূরে থাকতে! কিন্তু মেয়েটা যেন তার কোনো কথাই কানে তোলে না। আজকেও সে আহনাফের সাথে কথা বলেছে, আর সেই কারণেই জিয়ানের রাগটা আজ সীমানা ছাড়িয়ে গেছে।
জিয়ানের পায়ের শব্দে হঠাৎ রিত্তিকা চোখ পিটপিট করে খুলল। জিয়ানকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে ধড়ফড় করে শোয়া থেকে উঠে বসল।
রিত্তিকা নরম গলায় বলল,
__”আপনি এত রাত করে কেন এলেন, হুম? জানেন আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করতে করতে এখানেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম!”
জিয়ান রুক্ষ কণ্ঠে জবাব দিল, ”
__আমি কি তোমাকে বলেছি আমার জন্য জেগে অপেক্ষা করতে?”
রিত্তিকা তার স্বর শুনে থমকে গেল,
__”এভাবে কথা বলছেন কেন? রেগে আছেন নাকি? কিন্তু আমি আবার কী করলাম?”
জিয়ানের রাগ যেন এবার একদম সপ্তমে গিয়ে চড়ল। সে নিজের রাগ সামলাতে না পেরে সজোরে পেছনের শক্ত দেয়ালে এক সপটে ঘুষি মারল। দেয়ালে ঘুষি মেরে সে সোজা রিত্তিকার একদম কাছে এসে দাঁড়াল এবং রক্তচক্ষু নিয়ে বলল, “কতবার তোকে বলতে হবে ওই বাস্টার্ডের থেকে দূরে থাকতে, বল? আমার কথা তোর কানে ঢোকে না কেন?”
রিত্তিকা জিয়ানের চোখের রাগ আর হাতের অবস্থা দেখে এক মুহূর্তের জন্যও ভয় পেল না। সে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে জিয়ানকে আলতো করে জড়িয়ে ধরল। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে জিয়ান ঠিক কেন এতটা রেগে আছে। সে কোনো তর্কে না গিয়ে নিজেকে আরও সমর্পণ করল জিয়ানের বুকে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অভিমানী আর আদুরে কণ্ঠে বলল,
প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩৮
__”প্লিজ, এভাবে রেগে থাকবেন না তো! আপনার রাগ দেখলে খুব কষ্ট হয় আমার…”
জিয়ান তার বুকের ভেতর রিত্তিকার মৃদু কম্পন আর আকুতি অনুভব করল। তার ভেতরের তীব্র রাগের আগুনটা এক নিমেষে জল হয়ে গেল। সে রিত্তিকার পিঠে হাত রেখে সামান্য দুষ্টুমির সুর মিশিয়ে নিচু গলায় বলল,
__”ফিল পাচ্ছি না ভালো করে! আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরো, তারপর ভাবছি তোমার জন্য কী করা যায়।”
জিয়ানের এমন হুট করে মেজাজ বদলানো আবদার শুনে রিত্তিকা আর কথা বাড়াল না। সে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে জিয়ানকে আরও বেশি শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল।
