Home অভিসৃতি অভিসৃতি পর্ব ২৩

অভিসৃতি পর্ব ২৩

অভিসৃতি পর্ব ২৩
নওরিন কবির তিশা

ইদানিং,পলকে ভস্মীভূত ক্ষণগুলোকে স্বচ্ছ কাঁচের পাত্রে জমিয়ে রাখার শখ জেগেছে কয়রার।মধুর লগণগুলো বড্ড তাঁড়া নিয়ে আমাদের জীবনে আসে,একটু বেশিই ক্ষণস্থায়ী তা। তাই,এমন ব্যতিব্যস্ত প্রহরগুলো আদতে কেমন সৌন্দর্যের বিচ্ছুরণ ঘটায়,তা জানার অদম্য ইচ্ছা সৃষ্টি হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয় বলেই মতবাদ কায়রার।
এইতো সেদিনের কথা, সূর্যাস্তকে ভীষণ কাছ থেকে উপভোগ করে একরাশ ভালোবাসার স্মৃতিসমেত ওকে রিসোর্টে পৌঁছে সেনানিবাসে ফিরে গিয়েছিল দুর্জয়। অথচ,প্রকৃতির নিয়ম দেখো! ইতিমধ্যেই,বারোটা দিন অতিক্রান্ত হয়েছে।প্রত্যেককে গা ভাসিয়েছে প্রাত্যহিকতার জোয়ারে।দুর্জয়ের প্রত্যাবর্তনের এখনো বাকি দিন দুয়েক। সেই বহুল প্রতীক্ষিত ক্ষণের আশায় দিন গুনে চলেছে কায়রা!

বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ তৃণাবৃত চত্বরে মধ্যাহ্নের ম্রিয়মাণ রোদ্দুরের দেখা মিলেছে। ক্লাসের ফাঁকে ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে গল্পে মেতেছে বন্ধু দল। তবে, কোলাহলের ভিঢ়ে তুজার আনমনা, চিন্তিত মুখশ্রী কায়রার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়ালো না। সকাল থেকেই মেয়েটা কেমন যেন নিঝুম মেরে আছে, এমনটা তো ওর স্বভাববিরুদ্ধ। সমীকরণ জটিলতর হতেই, কায়রা তুজার দিকে ঈষৎ ঝুঁকে শুধাল,
“কী হয়েছে রে তুজা? সকাল থেকে এত সিরিয়াস মোডে বসে আছিস কেন? এনিথিং রং?”
আচানচ, সম্বোধনে ভড়কে গেলো তুজা। অপ্রস্তুত হয়ে বলল,,
“ক-কই… না তো! কিছু হয়নি তো…”
তুজার এমন ইতস্তত ভঙ্গি দেখে পাশ থেকে মেধা খোঁচা মেরে বলে উঠল,
“আরে ঢং করিস না তো! তোর ফেস দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে পেটে বড় কোনো ক্যাচাল জমেছে। ঝেড়ে কাশ তো!”
রুশাফ আর নিহারও কৌতূহলী চোখে তাকাল। তুজা এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল,
“আসলে… তোদের আমার ফুপির ভাসুরের ছেলের কথা বলেছিলাম না? উনার ফ্যামিলি নাকি আজকে আমাকে দেখতে আসবে! আসতেই দিচ্ছিল না আমাকে আমি তো ইম্পর্ট্যান্ট প্রেজেন্টেশনের কথা বলে এসেছি। আম্মু এখনই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে বলল।”

তুজার আশানুরূপ বোমা বিস্ফোরণ হলো না এখানে। কারণটা অবশ্য অজ্ঞাত নয়, বন্ধু না হলে সকলেই তূজার আত্মীয়র ব্যাপারে জানতো। আর বড় কথা, তূজার কোনো প্রেম নামক ঝঞ্ঝাট না থাকায় উত্তর বরাবরই পজিটিভ ছিলো। সেই হিসাবেই মেধা বললো,,
“আরে! এতে এত প্যানিক করার কী আছে? তোর ফ্যামিলি তো আগেই এই সম্বন্ধ নিয়ে পজিটিভ ছিল, তাই না?”
তুজা মুখ কাঁচুমাচু করে ব্যাকুল গলায় বলল,,
“পজিটিভ ছিল মানে? আমি এখন কোনোভাবেই বিয়েটা করতে চাই না রে! আই জাস্ট কান্ট!”
হাতে থাকা কোল্ড ড্রিংকসের ক্যানটা হঠাৎ ইভানের আঙুলের চাপে ঈষৎ কেঁপে উঠল। তবে এক মুহূর্তের তরেও সে নিজের নির্লিপ্ত ভঙ্গি বিচলিত হতে দিল না। অত্যন্ত অনাসক্ত রুপে,ক্যানে চুমুক দিয়ে অন্যদিকে চেয়ে রইল ও, যেন এই আলোচনার সাথে ওর দূরতম কোনো সম্পর্কও নেই।
কায়রা তুজার হাত দুটি চেপে ধরে মিষ্টি হেসে বলল,

“আরে পাগল! বিয়ে হলেই কি লাইফ থেমে যায়? এই যে আমি পড়াশোনা করছি, সংসারও সামলাচ্ছি। মেজর তো আমাকে পুরোপুরি সাপোর্ট করে। তোর হবু বরও নিশ্চয়ই…”
তুজা কায়রার কথা মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে ক্ষুব্ধ,সকাতর কণ্ঠে বললো,
“তুই নিজের সাথে আমার সিচুয়েশন মেলাচ্ছিস কেন, কায়রা? তোর সিনারিও আলাদা! কিন্তু আমি সত্যি এই মুহূর্তে কোন বিয়ে-শাদীর ঝামেলার মধ্যে ঢুকতে চাই না! আমার আরও পড়াশোনা বাকি, ফিউচার প্ল্যান আছে… তোরা কেন কেউ আমার প্রবলেমটা বুঝছিস না?”
মেধা তুজার কাঁধে হাত রেখে বোঝানোর স্বরে বলল,
“রিল্যাক্স তুজা! আমরা তো তোকেই সাপোর্ট করছি। তুই যদি মেন্টালি প্রিপেয়ার্ড না থাকিস, তবে আন্টিকে সোজা গিয়ে বল। এভাবে একা একা প্যানিক করে তো কোনো সলিউশন হবে না।”
তুজা আড়চোখে একবার নিস্পৃহ ইভানের পানে চাইল। কিন্তু ইভানের সেই পাথরের মতো কঠিন নিস্তব্ধতা ওর বক্ষপিঞ্জরে কেবল যন্ত্রণার মাত্রা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিল। ও ওষ্ঠাধর কামড়ে ব্যাগটা কাঁধে চেপে উঠে দাঁড়াল,
“আমি বাড়ি যাচ্ছি। বাকিটা আল্লাহ ভরসা!”
তুজা দ্রুত পায়ে চলে যেতেই পুরো দলটার মাঝে থমথমে নীরবতা ঘাঁটি গাড়লো।

“তুমি কি কোন ব্যাপারে চিন্তিত, উজান?”
ঘর্মাক্ত বদনে পিছন ঘুরে চাইলো উজান। হাতে থাকা ফাইলগুলো জলদি হাতে সরিয়ে, হাত বাড়িয়ে ইথিকাকে টেনে নিজের পাশে বসিয়ে, ওর উরুতে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। উজানের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও ক্লান্তিকর আচরণে ইথিকার মনের গহীনে অতি সূক্ষ্ম সংশয়ের মেঘ জমল। বৈবাহিক জীবনের সুদীর্ঘ পথচলায় ও খুব ভালো করেই জানে,উজানের মন যখন কোনো অজানা দুশ্চিন্তার ভারে নুয়ে পড়ে, কেবল তখনই ও নিঃশব্দে এভাবে ইথিকার ক্রোড়ে মাথা রেখে মানসিক প্রশান্তি খোঁজে।
ইথিকা পরম মমতায় উজানের ঘামে ভেজা চুলে হালকা আঙুল চালিয়ে দিল। উজান চোখ দুটি বুজে এক গভীর, তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলল। ইথিকা প্রজ্ঞাময়ী স্ত্রীর ন্যায় নরম, স্নিগ্ধ কণ্ঠে শুধাল,
“কিসের এত চাপ উজান? কয়দিন ধরেই দেখছি তুমি বড্ড অন্যমনস্ক। মন খুলে কিছু বলছও না। অফিসিয়াল কোনো ক্যাচাল চলছে নাকি?”
উজান চোখ না খুলেই ইথিকার কোমল হাতের ওপর নিজের এক হাত রাখল। মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে অতি ক্লান্ত কণ্ঠে বলল,

“নিউ প্রজেক্টটার ডেডলাইন খুব কাছে চলে এসেছে জানু। তাছাড়া বোর্ড মেম্বারদের কিছু আনরেসপন্সিবল ডিসিশনের জন্য কাজগুলো ডাবল খাটনি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সামলাতে গিয়ে এক প্রকার হিমশিম খাচ্ছি আরকি।”
ইথিকা প্রবোধ দেওয়ার ছলে মৃদু হেসে উজানের ললাট স্পর্শ করল,
“কাজের প্রেশার তো থাকবেই উজান, তাই বলে নিজেকে এভাবে তিলে তিলে শেষ করবে নাকি? শরীরের তো একটা লিমিট আছে, তাই না? রাত জেগে এভাবে ভাবলে কাজের সমাধান হবে না, বরঞ্চ তোমার হেলথ স্পয়েল হবে।”
উজান এবার ধীর গতিতে অক্ষিপল্লব মেলে ইথিকার ব্যাকুল ও মমতাময় মুখের পানে চাইল। হৃদয়ের এক প্রচ্ছন্ন কষ্ট গোপন রেখে, ওষ্ঠাধরে একচিলতে কৃত্রিম হাসির রেখা ফুটিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আই নো, জানু। তবে তুমি পাশে থাকলে সব স্ট্রাগল সামলানো ইজি মনে হয়। জাস্ট আর দুটো দিন… প্রজেক্টটা প্যাক-আপ হলেই সব নরমাল হয়ে যাবে, প্রমিস।”
ইথিকা আর কথা বাড়াল না। প্রজ্ঞাবান নারীর মতোই নীরবে স্বামীটির চুলে আঙুল বুলাতে বুলাতে ভাবনার সমুদ্রে তলিয়ে গেল।

সন্ধ্যা নামতেই রান্নাঘরে কাজের ছলে সাজেদা চৌধুরীর পিছু পিছু ঘুরঘুর করছিল কায়রা। উনি বারংবার কায়রাকে নিজের ঘরে গিয়ে পড়তে বললেও, শাশুড়ির এই প্রজ্ঞাময়ী মাতৃত্বের সান্নিধ্য ছেড়ে ওঠার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল না ওর। হঠাৎ, ড্রয়িংরুমের রুদ্ধদ্বারে কলিংবেলের তীক্ষ্ণ আওয়াজ বেজে উঠল। কায়রা ঈষৎ আশ্চর্য হলো, কারণ এমন সময় সচরাচর কারো আগমন ঘটে না। ইকবাল আহসানও নিজের ঘরে মগ্ন হয়ে সংবাদ দেখছেন। কায়রা সাজেদা চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আম্মু, আপনি কাজ করুন। আমি গিয়ে দেখছি।”

চটজলদি ড্রয়িংরুম পেরিয়ে মূল ফটকের লকটি খুলে দরজা উন্মুক্ত করতেই কায়রার সমগ্র অস্তিত্ব যেন নিমেষে স্থাণু হয়ে গেল! অক্ষিপল্লব বিচলিত করার সাধ্যটুকুও হারিয়ে ফেলল ও। বাইরে আলো-আঁধারির মাঝে সুদৃঢ় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং মেজর দুর্জয় আহসান। গাঢ় জলপাই রঙের শার্ট আর ট্রাউজারে আবৃত প্রকাণ্ড সেই বলীয়ান অবয়ব। ট্রাভেল ব্যাগটি এক হাতে ঝুলিয়ে প্রখর কৃষ্ণচক্ষু নিবদ্ধ রেখেছে কায়রার ওপরেই।
কায়রা একদম নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। হৃদস্পন্দন যেন মুহূর্তের তরে গতি হারিয়েছে। লোকটার তো আরও দু-দিন পর ফেরার কথা ছিল! কায়রা নিজের মাথায় আলতো করে এক গাট্টা মেরে অস্ফুটে নিজেকেই ভর্ৎসনা করে বলল,
“মাথাটা তোর পুরো গেছে, কায়রা! সারাক্ষণ লোকটার কথা ভাবতে ভাবতে এখন দরজায় দাঁড়ালেও ওনাকেই দেখতে পাচ্ছিস! নিজেকে সামলা স্টুপিড, ওনার আসতে এখনো দু-দিন বাকি!”
কায়রার এমন শিশুসুলভ পাগলামি ও সকাতর আত্মভোলা আচরণ প্রত্যক্ষ করে দুর্জয়ের গম্ভীর ওষ্ঠাধরের কোণে একচিলতে অত্যন্ত মিষ্টি,প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠল। তবে ও মুখে কোনো কথা বলল না, পরম নির্লিপ্ততায় প্রিয়ার চঞ্চল মুখশ্রীর পানে চেয়ে রইল। ঠিক তক্ষুণি রান্নাঘর থেকে সাজেদা চৌধুরীর হাঁক ভেসে এলো,

“কে এলো রে বাবুই?”
কায়রা দরজার দিকে চেয়ে না দেখেই অমনি উচ্চস্বরে জবাব দিল,
“কেউ না আম্মু!”
সাজেদা চৌধুরী আর কথা বাড়ালেন না। কিন্তু কায়রা এবার দু-হাত দিয়ে নিজের চোখ দুটো ভালো করে কচলিয়ে নিল। অক্ষিপট উন্মীলন করতেই দেখল দৃশ্যপটের কোনো পরিবর্তন হয়নি! সেই একই পুরুষালী প্রকাণ্ড উপস্থিতি, সেই প্রখর মায়াবী চোখ!
বিস্মিত কায়রা দ্বিধাগ্রস্ত নয়নে চায়। প্রগাঢ় শঙ্কা ও বিস্ময় সংমিশ্রিত কণ্ঠে আনমনে শুধায়,,
“মেজর…?”
দুর্জয় ঈষৎ মাথা দুলিয়ে, নিচু ও অতীব ভরাট গাঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল,
“ইয়েস, মাই ম্যাজিস্ট্রি?”

কথাটি শোনামাত্রই কায়রার সমস্ত সংশয়ের মেঘ কেটে গিয়ে প্রকাণ্ড এক আনন্দের বন্যা বয়ে গেল বক্ষপিঞ্জরে! আর কোনো যুক্তি, কোনো ধারণার তোয়াক্কা করল না ও। দু-পা এগিয়ে এক প্রকার লাফিয়ে গিয়ে দুর্জয়ের প্রশস্ত বুকের ওপর আছড়ে পড়ল কায়রা! পরম অনুরাগে দু-বাহু দিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল প্রিয়তম পুরুষের গলার চারপাশ।
দুর্জয় ত্বরিত গতিতে এক হাতে কায়রার কোমর পেঁচিয়ে ধরে নিজের বক্ষস্থলে নিবিড়ভাবে পিষে নিল ওকে, আর অন্য হাতে দরজার লকটি ভেজাতে ভেজাতে আবেশঘন কণ্ঠে বলল,
“এত ব্যাকুলতা? তবে যে বললে মনের ভুল?”
কায়রা দুর্জয়ের শার্টের বুকে নিজের মুখটি পুরোপুরি গুজে দিয়ে, ক্ষুব্ধ অথচ চরম তৃপ্তির তোড়ে ফিসফিস করে বলল,
“আপনি বড্ড বাজে লোক, মেজর! এভাবে সারপ্রাইজ দিয়ে কারো হার্টফেল করানোর কোনো মানে হয়? আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না!”
দুর্জয় মুচকি হেসে কায়রার অবনত মাথায় ঠোঁট ছুঁয়ে দিল; পরম যত্নে ওকে নিজের সাথে জড়িয়ে রেখে নিচু গাঢ় স্বরে বলল,

“শুনলাম, কেউ একজন আমার ফেরার অপেক্ষায় ক্যালেন্ডারের দাগ দিয়ে চলেছে।তাই তার আকুল অপেক্ষার প্রহরগুলো আর দীর্ঘ করতে ইচ্ছে করল না!”
পরোক্ষ অর্থপূর্ণ কথায় মৃদু হাসলো কায়রা। বক্ষে মুখ গুজেই নাক ঘোষলো প্রতিবার ন্যায়। দুর্জয় কায়রার ক্ষীণ কোমরখানা স্বীয় শক্তিশালী বাহুডোরে গাঢ়ভাবে পেঁচিয়ে ধরে পরম আবেশে ওকে সামান্য তুলে নিয়ে অভ্যন্তরে পা বাড়াল। কায়রা অকস্মাৎ এমন কান্ডে চমকে উঠে চঞ্চল বিড়ালছানার মতো ছটফট করে ফিসফিসিয়ে উঠল,
“কী করছেন কী মেজর? ছাড়ুন! কেউ দেখে ফেলবে তো!”
দুর্জয় কায়রার বিচলিত ওষ্ঠাধরের পানে চেয়ে মৃদু হেসে ওর কোমরের বাঁধন আরও সুদৃঢ় করতে যাবে, ঠিক তখনই উপস্থিত হলেন সাজেদা চৌধুরী। শাশুড়িকে সম্মুখপানে দেখা মাত্রই কায়রার লাজুকতার সীমা রইল না। ও ধড়ফড় করে দুর্জয়ের কোল থেকে নেমে মেঝেতে দাঁড়িয়ে চটজলদি ওড়নার আঁচলে সামলে মাথা অবনত করল। মুখখানিতে যেন লজ্জার রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ল নিমেষে।
হঠাৎ অবেলায় দূরদূরান্ত থেকে ছেলে ফিরেছে দেখে সাজেদা চৌধুরী প্রথমাংশে কিঞ্চিৎ স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। অতঃপর প্রগাঢ় মাতৃস্নেহে দু-পা এগিয়ে এসে দুর্জয়ের চিবুক ছুঁয়ে গদগদ কণ্ঠে বলে উঠলেন,

“আব্বাজান! তুই না বলে ছিলি দুইদিন পরে আসবি?
দূর্জয় আলতো হাতে মাকে জড়িয়ে নিলো। কপালে উষ্ণ চুমু এঁকে বলল,,
“ব্যাস চলে এলাম।”
সাজেদা চৌধুরী আনন্দিত চিত্তে এবার ড্রয়িংরুমের দিকে চেয়ে উচ্চস্বরে ডেকে উঠলেন,
“শুনছো? দূর্জয় এসেছে!”
স্ত্রীর আহ্বানে কক্ষ হতে চশমাটা নাকে এঁটে ইকবাল আহসান ব্যস্ত কদমে বেরিয়ে এসে দুর্জয়ের কাঁধে হাত রেখে প্রগাঢ় স্নেহে বললেন,
“ওয়েলকাম ব্যাক, প্রাউড সন! সীমান্ত এলাকার অবস্থা এখন তো স্বাভাবিক মনে হচ্ছে, নাকি? পেপারওয়ার্ক সব ক্লিয়ার করে এসেছ তো?”
“ইয়েস বাবা, অল ক্লিয়ার। হেডকোয়ার্টার্স থেকে অলরেডি পারমিশন ক্লিয়ারেন্স পেয়েই ব্যাক করেছি। সো আপাতত নেক্সট ফিউ ডেস আর কোনো ঝামেলা নেই।”
ইকবাল আহসান সন্তুষ্ট চিত্তে ছেলের পিঠ চাপড়ে বললেন,
“দ্যাটস গ্রেট! ফ্রেশ হয়ে নাও গিয়ে। কায়রা মা, দুর্জয়কে রুমে নিয়ে যাও তো। আর সাজেদা, ওকে গরম গরম এক কাপ চা আর জলখাবার করে দাও, জার্নির ক্লান্তি তো আছে।”
কায়রা লাজুক হেসে মাথা নাড়িয়ে দুর্জয়ের ট্রাভেল ব্যাগটি হাতে নিতে চাইল। কিন্তু দুর্জয় ব্যাগটি নিজে টেনে নিয়ে, কায়রাকে আগে আগে তার পিছু পিছু কক্ষপানে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত করল।

সেদ্ধ সবজি আর এক কাপ গরম ধোঁয়া ওঠা চা সাজিয়ে অত্যন্ত মৃদু কদমে কক্ষে প্রবেশ করল কায়রা। উন্মুক্ত দ্বারের ফাঁক গলে নূপুরের ঈষৎ ঝঙ্কার পেতেই দুর্জয় অক্ষিপট হতে বাহু সরিয়ে চোখ মেলল। তবে নড়লো না একটুকুও। পুনরায় পূর্বের অবস্থানে ফিরে, শুয়ে রইলো।কায়রা দরজা আটকে, খাবারটুকু বিছানার পার্শ্ববর্তী টেবিলে রেখে দুর্জয়ের কাছে এগিয়ে এলো। উদ্বেগময় কণ্ঠে নিচু স্বরে বলল,
“মেজর? কিছুই তো খেলেন না! জার্নি করে কি খুব বেশি খারাপ লাগছে?”
দুর্জয় আলতো মাথা নেড়ে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,
“ভালো লাগছে না জাস্ট!”
কায়রা ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে আরও একটু ঝুঁকে দুর্জয়ের কপালে স্পর্শ করতে গেল,
“মাথা ব্যথা করছে? আসুন আমি মাসাজ করে দেই!”
হাতটি কপালে ঠেকতেই দুর্জয় চটজলদি কায়রার সুকোমল কবজিটি খপ করে ধরে,এক নিমেষে প্রকাণ্ড টান মেরে ওকে নিজের চওড়া বুকের ওপর এনে ফেলল ঘটনার আকস্মিকতায়, চরম হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল কায়রা। বিচলিত বক্ষপিঞ্জরে ও স্বস্তি খোঁজার তরে সামান্য নড়েচড়ে নিজেকে সামলাতে চাইল। ঠিক তখনই দুর্জয় ওর কামিজটা সামান্য সরিয়ে উদরে স্বীয় উষ্ণ হাতের ছোঁয়া এনে দিল।
এত এত স্পর্শের ভিড়ে এই প্রথম এতটা গভীরভাবে কায়রা কে স্পর্শ করেছে দুর্জয়। স্বভাবতই মৃগী রোগীর ন্যায় ঝাঁকুনি দিলো রমনীর ক্ষীণ কায়া। গম্ভীর লোকের এহেন মতিভ্রমের কারণ খুঁজে পেল না মস্তিষ্ক। হঠাৎ দুর্জয় অত্যন্ত গভীর, পুরুষালী কণ্ঠে নিচু স্বরে শুধাল,

“সুস্থ আছো?”
কায়রা প্রথমে ঈষৎ অবাক হলেও, পরক্ষণেই লোকটার গুঢ় প্রশ্নের অন্তর্নিহিত রহস্য উপলব্ধি করতে পারল। লালচে গাল দুটি বক্ষের উষ্ণতায় আরও লাজুক হয়ে উঠল। ও সামান্য মাথা দুলিয়ে নীরবে হ্যাঁ বলতেই, দুর্জয় ওল চোখে চোখ রেখে, অনির্বাণ অনুরাগে ভরাট কন্ঠে বলল,,
“দেন… মে আই ক্লেইম মাই রাইট টু নাইট, মাই লাভ?”
প্রিয়া হৃদয়ে অনুরাগের সুতীব্র ঝড় উঠল। কায়রা লজ্জায় অক্ষিপল্লব অবনত করে দুর্জয়ের প্রশস্ত ছাতিতে নিজের মুখখানি পুরোপুরি লুকিয়ে ফেলল। নীরব সমর্পণে সঁপে দিল নিজেকে স্বামীর পরম আশ্রয়ে। সম্মতি পেতেই, কায়রাকে নিজের বক্ষের ওপর তুলে, ওর ঘাড়ে মুখ গুজে, অন্য হাতে ওড়না টান দিতে যেতেই সঙ্গে সঙ্গে কায়রা আলতো হাতে প্রতিরোধ করল তা। দূর্জয় জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইতেই, লাজুক কায়রা মিনমিনিয়ে বলল,,

অভিসৃতি পর্ব ২২ (৩)

“লাইটটা অফ করুন!”
দূর্জয় চাপা হাসলো। দুষ্টুমির ছলে বলল,,
“অন থাকলে কি সমস্যা?”
“অনেক সমস্যা! অফ করুন, প্লিজ!”
“উঁহু, লাইট অন থাকুক। মেজর দুর্জয় আহসান সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পছন্দ করে।”
“মেজর!”
দূর্জয় আচানক কক্ষের সমস্ত আলো নিভিয়ে, কায়রার ওড়নাটা কৌশলে সরিয়ে ফেললো।পরিশেষে, এক হলো একজোড়া তৃষ্ণার্ত হৃদয়।

অভিসৃতি পর্ব ২৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here