Born to be villains part 40

Born to be villains part 40
মিথুবুড়ি

“আমার পাপের ভার কি এতটাই ছিল যে আমার ছোট অস্তিত্বটার জায়গা হলো না তোমার গর্ভে?”
বাথটবে পিঠ ঠেকিয়ে ধসে পড়া ইমারতের মতো বিধ্বস্ত অবস্থায় বসে আছে সাবেক ফাইটার পাইলট রিচার্ড কায়নাত। এলিজাবেথ তখনও নিশ্চল, নিস্পন্দ। তার শূন্য দৃষ্টি কোথাও যেন আটকে আছে। তবে সেই চোখে না আছে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব, না আছে বিন্দুমাত্র ভাঙন। র ক্তলাল জলে আধডোবা এলিজাবেথকে মনে হচ্ছে যেন লাল সাগরে ভাসতে থাকা একখণ্ড জমাট বরফ।
রিচার্ডের নিস্তেজ ও ভারাক্রান্ত কণ্ঠস্বরও এলিজাবেথের পাথুরে নিস্তব্ধতায় কোনো আলোড়ন তুলতে পারল না। এভাবে কিছুটা সময় বয়ে যায়। থমথমে পরিবেশ একসময় অসহ্য নীরবতায় ঢেকে যায়, যেন কোনো কবরস্থানের নিঝুম বিষাদ।

হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতার বাঁধ ভাঙল। এলিজাবেথের এই শীতলতা রিচার্ডের ভেতরের হিংস্র সত্তাটাকে ভয়ংকর আগ্নেয়গিরির মতো জ্বালিয়ে তুলল। মুহূর্তের মধ্যে রিচার্ড এলিজাবেথের কণ্ঠনালি সজোরে চেপে ধরে তাকে বাথটব থেকে তুলে দেয়ালে ঠেসে ধরল। এলিজাবেথের ভেজা শরীর বেয়ে র ক্তলাল জল মেঝেতে গড়িয়ে পড়তে লাগল। সেই লাল জলের দু-এক ফোটা বোধহয় ছিটকে গিয়ে পড়ল রিচার্ডের সমুদ্র-নীল চোখে। নয়তো নীল মনির পাশের সাদা অংশ এতো লাল হবে না? তার বিধ্বংসী ক্রোধের তাণ্ডবে শক্ত চিবুকের রগগুলো চড়চড় করে উঠল, গলার রগগুলো ফুলে-ফেঁপে উঠল। অথচ এতেও এলিজাবেথের মধ্যে কোনো হেলদোল নেই, সে যেন সত্যিই অনুভূতিহীন বরফখণ্ড।
এবার উন্মত্ত পশুর মতো গর্জে উঠল রিচার্ড, “কেন করলি এটা? কেন? কোন অধিকারে ওকে মারলি তুই?”
প্রতিটা প্রশ্নের সাথে সাথে রিচার্ডের হাতের চাপ বাড়তে থাকে। অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগের ফলে এলিজাবেথের নাক দিয়ে সূক্ষ্ম র ক্তের ধারা বয়ে আসে।
রিচার্ডের গর্জন আরও ভয়ংকর হয়,”ও আমার ছিল! আমার! এই রিচার্ডের অংশ ছিল! আমার সন্তান… আমার রক্ত!”

এলিজাবেথ অত্যন্ত শান্ত, বরফশীতল দৃষ্টিতে রিচার্ডের দিকে তাকাল। নিঃসংকোচে, বিষাক্ত নির্মমতার সাথে বলে উঠল,”সেইজন্যই তো!”
কথাটার নির্মমতা রিচার্ড কায়নাতের চোখের ক্রোধকে স্তব্ধ বিস্ময়ে বদলে দিল। বিস্ময়ে ঝলসে উঠল ক্ষিপ্ত চোখ দু’টো। রিচার্ড এবার সজোরে এলিজাবেথের মাথাটা দেয়ালে আঘাত করল। কপালের পাশ ফেটে র ক্ত গড়িয়ে এলিজাবেথের গাল বেয়ে পড়তে লাগল। তা সত্ত্বেও গলা ছেড়ে না দিয়ে আচ্ছন্ন স্বরে চিৎকার করে উঠল রিচার্ড,
“ও… ও তো আমাদের ছিল! একবারের জন্যও তোর বুক কাঁপেনি? নিজের মৃত্যুর ভয় হলো না? উত্তর দে, জানোয়ার!”
দাম্ভিক লোকটার কণ্ঠ জড়িয়ে আসছে। ভেতরের অসীম শূন্যতায় জিহ্বা বার বার শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। এদিকে এলিজাবেথের ফুসফুসে অক্সিজেনের টান পড়েছে। নাক আর কপাল বেয়ে র ক্ত গড়িয়ে পড়ছে শ্বেতশুভ্র ত্বকে। তা সত্ত্বেও তার ঠোঁটের কোণে বিষাক্ত আর তৃপ্তির হাসি। রিচার্ডের চোখের কোণে জমে ওঠা যন্ত্রণাটাই যেন এই মুহূর্তে তার জীবনের সবচেয়ে বড় জয়। ভাইয়ের খু নিকে কষ্ট পেতে দেখছে, এরচেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কি হতে পারে?
এক ফোঁটা র ক্ত টুপ করে এসে পড়ল এলিজাবেথের ঠোঁটে। সে র ক্তভেজা ঠোঁট দুটো সামান্য নাড়িয়ে, রিচার্ডের সমুদ্র-নীল চোখে চোখ রেখে বলতে লাগল,

“আমি তো আপনার স্বৈরাচারী আচরণগুলোকেও পরম ভালোবাসায় গ্রহণ করেছিলাম। আপনার জন্য নিজের পরিবারকে পর্যন্ত ত্যাগ করেছিলাম। সবকিছু এমনভাবে ভুলে গিয়েছিলাম, যেন আমার কোনোদিন কোনো পরিবারই ছিল না। আপনার সমস্ত অন্যায়, ভুল, বিষাক্ত টক্সিসিটি আর আধিপত্য বিস্তারকারী আচরণ…সবকিছুকে প্রিয় অলংকারের মতো গায়ে জড়িয়ে আপনার সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেছিলাম। কিন্তু আপনি? আমার সেই অন্ধ বিশ্বাসের মর্যাদা দিলেন কীভাবে? মে রে ফেললেন আমার নিষ্পাপ ভাইটাকে? কী ক্ষতি করেছিল ও আপনার? এই অপরাধটা আড়াল করার জন্যই বুঝি এতদিন আমাকে পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন? বাহ্, মিস্টার কায়নাত, বাহ্! প্রেমিক তুমি প্রেয়সীর সস্তা হৃদয়ের সাথে কী ছলনাই না করলে!”
এলিজাবেথের কথায় রিচার্ডের সামান্য শিথিল হয়ে আসা হাতের চাপ আবারও হিংস্র রূপ নিল। হাত দুটো দিয়ে এলিজাবেথকে আরও উপরে তুলে দেয়ালে ঠেসে ধরল। এরপর দাঁতে দাঁত চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে প্রতিটা শব্দ উচ্চারণ করল,

“তোর ভাইকে আমি মে রে ছি বলে তুই আমার সন্তানকে হ ত্যা করলি? একবারের জন্যও তোর বুক কাঁপল না? একটুও মায়া হলো না? ও তোর নিজের গর্ভে বেড়ে উঠছিল না? ও কি তোর কেউ ছিল না?”
সামান্য থেমে, কণ্ঠস্বরে আরও বেশি বিষ ঢেলে জানতে চাইল, “কাল যদি জানতে পারিস আমি তোর যমজ বোনকেও মেরে ফেলেছি, তবে কি আমাকেও তুই খু ন করবি? বল?”
“হ্যাঁ, করতাম! জ্যান্ত মেরে ফেলতাম!”
এলিজাবেথের এই অকপট, ক্ষুরধার জবাবে রিচার্ডের ক্রোধ এবার সীমান্ত ছাড়াল। তার ভেতরের সুপ্ত নরপিশাচটা মেঘলা আকাশে কালবৈশাখীর বিদ্যুতের মতো জ্বলে উঠল। শূন্যে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকা এলিজাবেথকে আছড়ে ফেলল র ক্তে ভেসে যাওয়া হিমশীতল মেঝেতে।
তারপর ক্ষিপ্র গতিতে তেড়েফুঁড়ে গিয়ে এলিজাবেথের হাত ধরে টেনে-হিঁচড়ে কোথাও নিয়ে যেতে যেতে ভয়ংকর আচ্ছন্ন স্বরে বলে, “তোকে কখনোই আমার আসল রূপটা দেখাতে চাইনি। চাইনি আমার এই ধ্বংসাত্মক চেহারাটা কখনো তোর সামনে আসুক। তুলোর পুতুল করে আগলে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছিলাম হীরা কাটতে হলে হীরাই ব্যবহার করতে হয়।”

ডাইনিং টেবিলে প্রতিদিনের মতোই সবাই উপস্থিত, শুধু নেই এলিজাবেথ। সবাই একসাথে ব্রেকফাস্টে থাকলেও তবে কারও মেনুর সাথে কারও মিল নেই। সোফিয়া সকালবেলা সাধারণত হালকা খাবার পছন্দ করে, তাই সে সিদ্ধ ডিম আর ব্রেড খাচ্ছে। অন্যদিকে রিচার্ডের জন্য শুধু চিনি ছাড়া ব্ল্যাক কফি। রিচার্ডের চেয়ারের দুপাশে চিবুকে গাম্ভীর্য নিয়ে প্রহরীর মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ন্যাসে আর লুকাস। পুরো টেবিল জুড়েই থমথমে নীরবতা।
তবে এই দমবন্ধ নীরব পরিবেশের মধ্যেও একজনকে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে আর তৃপ্তি নিয়ে খেতে দেখা যাচ্ছে, তিনি ফাদার। আজ সকালে বিশেষ কষা মাংস রান্না করা হয়েছে। মাংস ফাদারের খুব পছন্দ। তাই সকাল সকাল আর মাংসের লোভ সামলাতে পারলেন না ফাদার। তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে ওগ্রু।
ফাদার যত না তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছেন, তাঁর চেয়ে বহুগুণ বেশি তৃপ্তি নিয়ে তার খাওয়া পর্যবেক্ষণ করছে রিচার্ড। প্রতিটি লোকমা মুখে নিয়ে ফাদার যখন ঢোক গিলেন, রিচার্ডের ভেতর তখন যেন প্রশান্তির দ্যোতনা খেলে যায়। নরম মাংসের টুকরো দাঁতের চাপে গলে গিয়ে ফাদারের মুখে স্বাদের বিস্ফোরণ ঘটাতেই রিচার্ডের ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে সূক্ষ্ম হাসি।

কফিতে একটা ধীর চুমুক দিয়ে টেবিলের অপর প্রান্ত থেকে ফাদারের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় রিচার্ড,
“হাউ ওয়াজ দ্য মিট?”
ফাদারের খাওয়া তখন প্রায় শেষ। হাত দিয়ে আঙুল চাটতে চাটতে তৃপ্তির হাসি হেসে তিনি বললেন,
“আজকের মাংসটা খুব সফট আর জুসি হয়েছে।”
“জাস্ট লাইক তাসা?”
ফাদার তখন মাত্র একটি সলিড মাংসের টুকরোটি মুখে তুলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু রিচার্ডের এই অদ্ভুত প্রশ্নে হঠাৎ থমকে গেলেন। চমকে তাকালেন রিচার্ডের দিকে। সোফিয়াও মুখের খাবার থামিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল রিচার্ডের দিকে।

“মা—মানে?”
ফাদারের কণ্ঠস্বরে অদ্ভুত কাঁপুনি ফুটে ওঠে। সেই কাঁপন দেখে আত্মতৃপ্তির পৈশাচিক হেসে কফির মগটা নাড়াতে নাড়াতে রিচার্ড বলে,
“রক্ষিতাদের শরীরের স্বাদের মতোই মাংসের স্বাদও দারুণ, তাই না?”
ফাদারের হাত থেকে মাংসের টুকরোটি প্লেটে খসে পড়ল। এবার তাঁর কণ্ঠে স্পষ্ট আতঙ্ক আর কম্পন,
“তু… তুমি কী বলছ এসব?”
রিচার্ড একদম নির্লিপ্ত ও শান্ত স্বরে জবাব দিল,”এটা তাসার মাংস, ফাদার। আপনার জন্য আমি নিজের হাতে রান্না করেছি।”

কথাটা শুনে ফাদারের দু’চোখ ভূত দেখার মতো আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেল। তিনি বিস্ফোরিত চোখে পেছনে থাকা ওগ্রুর দিকে তাকাতেই ওগ্রু ভেতরে দিকে ছুটে গেল। তবে সোফিয়ার মধ্যে কোনো বিশেষ ভাবাবেগ দেখা গেল না। সে কেবল মন্থর ও স্থির দৃষ্টিতে সন্দেহ নিয়ে রিচার্ডের দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ তার চোখ পড়ল রিচার্ডের বাঁ-হাতের দিকে, হাতটা ব্যান্ডেজ করা। অথচ কালকেও তো হাতটা একদম ভালো ছিল!
কিছুক্ষণ পর ওগ্রু ভেতর থেকে প্রায় দৌড়ে এলো। ফাদার অস্থির চোখে তাকাতেই ওগ্রু তীব্র আতঙ্কে দু’পাশে মাথা নেড়ে বলল,”তাসা… তাসা কোথাও নেই!”
ফাদার ঝড়ের গতিতে ছুটে গিয়ে রিচার্ডের শার্টের কলার দু’হাতে শক্ত করে টেনে ধরলেন। উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠলেন,
“কী করেছ তুমি তাসার সাথে?”
রিচার্ড কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্ভাবনায় হাসল,”আপনার জন্য চমৎকার এক ব্রেকফাস্ট রেডি করেছি, ফাদার।”
“রিচার্ড!!”
ঠাস করে একটি সশব্দ চড় এসে আঁচড়ে পড়ল রিচার্ডের গালে। আজ জীবনের প্রথমবার ফাদার রিচার্ডের গায়ে হাত তুললেন।

রিচার্ড গালে হাত রেখে কিছুক্ষণ একদম নির্বিকার দৃষ্টিতে ফাদারের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ক্ষীণ ক্ষণিকের মধ্যে তার দু’চোখে তীব্র বেদনার গভীর ছায়া ফুটে উঠল, পুরো মুখশ্রী ধারণ করল বিবর্ণ রূপ। তার কলার চেপে ধরে রাখা ফাদারের হাত দুটোকে সে হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। রিচার্ডের হাতের শিরার ভেতর যে ব্যাকুল কম্পন ছিল, তা স্পর্শমাত্রই অনুভব করতে পেরে ফাদার ভেতরে ভেতরে চমকে উঠলেন।
তিনি বিহ্বল চোখে রিচার্ডের দিকে তাকাতেই বড় ধাক্কা খেলেন। সেই তেজদীপ্ত, কঠিন চোখ দুটিতে আজ কিসের এত আকুলতা, কিসের এত ব্যাকুল উৎকণ্ঠা?
“কী দোষ করেছিল আমার সন্তান?”লোকটার কণ্ঠে ফুটে উঠল স্পষ্ট ভাঙনের সুর।
“মা… মানে?”
ভগ্ন কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল রিচার্ড, “আপনাদের এই নোংরা রাজনীতি ওকে এই পৃথিবীর আলো পর্যন্ত দেখতে দিল না!”
ফাদার রিচার্ডের এই কথার অর্থ ঠিক অনুধাবন করতে পারলেন না। তিনি ঝলসানো দৃষ্টিতে রিচার্ডের আর্তনাদ দেখে যান,

‘’সামান্য একটা রক্ষিতার জন্য আপনার এত কষ্ট হচ্ছে? তা হলে এবার ভাবুন, একটা সন্তানহারা বাবার ভেতর দিয়ে ঠিক কী বয়ে যাচ্ছে? এই চোখ দুটো দেখতে পাচ্ছেন? এখানকার যন্ত্রণা অনুভব করতে পারছেন? পারছেন না বুঝতে? আপনিও তো একজন বাবা, আপনার তো এটা অনুভব করার কথা!”
ফাদার বিমূঢ় হয়ে পড়লেন। তবে রিচার্ডের যুক্তিতে নয়, সন্তানসম এই ছেলেটার হাহাকার মেশানো কথা আর ছিন্নভিন্ন করা চোখের চাউনিতে।
ওদিকে রিচার্ডের প্রতিটি বাক্যে থরথর করে কেঁপে উঠল সোফিয়া। রিচার্ড এসব কী বলছে? সোফিয়া নিজের বুকের ভেতরের দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া কষ্টটা শক্ত করে চেপে ধরে অস্থির চোখে চারপাশটা দেখে নিল। না, এলিজাবেথ কোথাও নেই। আজ সকাল থেকেও তো তার কোনো টিকিটি দেখা যায়নি! তবে কি মেয়েটা…? ভাবনাটা মাথায় আসতেই সোফিয়া দুই হাতে মুখ চেপে ধরল। অজান্তেই তার চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
সন্তান হারানো এক পিতা আজ কাতর ও ক্ষুব্ধ কণ্ঠে ভয়ংকর এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, “আমার জন্ম ভালো ছিল না বলে আমার সাথে এমনটা করলেন?”

কথাটা বিষাক্ত তীর হয়ে ফাদারের বুকে গিয়ে বিঁধল, বুকটা ছিন্নভিন্ন করে দিল। ফাদার আকুল হয়ে রিচার্ডের কাতর শরীরটা শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলেন, “রিদ… আমার বাবা, আমার ছেলে… তুমি আমাকে ভুল বুঝছ! তোমার বাবা কি কখনো সন্তানের সাথে এমন করতে পারে?”
রিচার্ড ঝটকায় ধাক্কা মেরে ফাদারকে সরিয়ে দিল,
“একদম ছুঁবেন না আমাকে!”
মাতালের মতো টলমল পায়ে রিচার্ডের শরীরটা দুলে উঠল। সন্তানহারা পিতার চোখ দিয়ে হয়তো অশ্রু ঝরছিল না, কিন্তু ঝরছিল অদৃশ্যের রক্তধারা। কাঠিন্যে ভরা তার চেহারায় আজ সমস্ত ধ্বংসস্তূপ এসে হানা দিয়েছে। ইস্পাত-দৃঢ় বসের এমন প্রকাশ্যে ভেঙে পড়া দেখে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা দুই সহকর্মীর চোখও ভিজে উঠল। ন্যাসো আর লুকাস এগিয়ে এসে বসকে আগলে নিতে চাইলে রিচার্ড হাত তুলে তাদের সরিয়ে দেয়।

ফাদারের ব্যথাক্লিষ্ট চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে রিচার্ড ভাঙা কাচের মতো ধারালো আর চূর্ণ-বিচূর্ণ কণ্ঠে বলল,”আমার যন্ত্রণা যদি আপনি অনুভব করতে পারতেন, তাহলে আজ অন্তত আমার গায়ে হাত তুলতেন না।”
ফাদার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না, শিশুদের মতো কেঁদে উঠলেন। কোনো পুরুষালি অহংকার আর অবশিষ্ট রইল না তাঁর মাঝে। রিচার্ডের এই নিঃশব্দ ভাঙন তাঁর ভেতরের যাবতীয় শক্ত দেয়াল গুঁড়িয়ে চুরমার করে দিয়েছে। তিনি রিচার্ডের সেই কাতর চোখের দিকে তাকিয়ে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বললেন,
“আমি মরে যাব রিদ, আমি সত্যিই মরে যাব! তুমি এভাবে আমাকে ফিরিয়ে দিলে আমি বাঁচব না। বাবার বুকে আসো, রিদ… বাবার ওপর এভাবে রাগ করতে নেই। বাবাকে ভুল বুঝো না, বাবারা কখনো সন্তানের ক্ষতি করতে পারে না!”

রিচার্ডকে স্পর্শ করার জন্য ফাদার ব্যাকুল হয়ে ছটফট করতে লাগলেন।
হঠাৎ এক তোড়জোড় ঝড়ের মতো ছুটে এসে সোফিয়া রিচার্ডের জামার কলার চেপে ধরল। অস্থিরতায় চেঁচিয়ে জানতে চাইল,”ওই মেয়েটা কোথায়? ওকে সকাল থেকে কেন দেখছি না?”
রিচার্ড এই বিধ্বস্ত অবস্থার মধ্যেও নির্মম হাসল। অন্য যেকোনো দিন তাকে স্পর্শ করার দুরাশা দেখালে হয়তো সে চিৎকার করত, কর্কশ ভাষায় অপমান করে ধাক্কা মেরে ফেলে দিত। কিন্তু আজ সে তার কিছুই করল না। কেবল নিষ্কম্প পৈশাচিক হেসে জবাব দিল,
“শি গট হার পানিশমেন্ট।”
ভেতর থেকে কেঁপে উঠল সোফিয়া। অনুশোচনায় দগ্ধ হতে লাগল মন। সে রিচার্ডের কলার আরও শক্ত করে চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল, “মানে! কী করেছ তুমি ওর সাথে?”
রিচার্ডের স্তব্ধ হয়ে থাকা ক্রোধ এবার সমস্ত সংযমের বাঁধ ভাঙল। সে সোফিয়াকে চেপে ধরল ডাইনিং টেবিলের সাথে,ধারালো নাইফ গলায় চেপে ধরে চিড়বিড়িয়ে উঠল, “একবারই বলেছিলাম… কখনো আমাকে ছোঁয়ার দুঃসাহস দেখাবি না!”

অন্যান্য দিন হলে ফাদার ছুটে এসে মেয়েকে রক্ষা করতেন, রিচার্ডের ওপর ভীষণ ক্ষিপ্ত হতেন। কিন্তু আজ তিনি স্তব্ধ হয়ে রইলেন, কিছুই করলেন না। রিচার্ড সোফিয়াকে ছেড়ে দিয়ে রাগে ফুঁসতে লাগল। এই সুযোগে সোফিয়া ছুটে কোথাও যেন গেল!
দু’হাটু ভেঙে ঠান্ডা মেঝেতে খসে পড়ল রিচার্ড। ফাদারও কালবিলম্ব না করে রিচার্ডের মুখোমুখি হাঁটু গেড়ে বসলেন। কাঁপা কাঁপা দুটো হাত পরম মমতায় চেপে ধরেন রিচার্ডের চোয়াল। রিচার্ড চোখ তুলে ফাদারের অশ্রুসিক্ত চোখের দিকে তাকাল। ধীরে ধীরে তার কঠিন ভেতরটা মোমের মতো গলে আসতে লাগল, ঠোঁটের কোণ দুটো ভেঙে আসতে চাইল বেদনায়। কিন্তু সে তো পুরুষ, কঠিন আবরণে মোড়ানো এক শক্ত পুরুষ। চাইলেই তো আর সবার সামনে কাঁদতে পারে না!

তবুও নিজের ভেতরের এই অবুঝ দুর্বলতাটা সে আজ আর লুকিয়ে রাখতে পারল না। ছোট বাচ্চাদের মতো করে বলে উঠল, “ফাদার… ফাদার, ছোটবেলায় যেমন আদর করতেন, আজ ঠিক তেমন করে একটু আদর করবেন? সেই ছোটবেলার মতো আমার মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেবেন? আমি একটু ঘুমাতে চাই ফাদার… এই অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে চাই! ভেতরের ঝড়টা যে কোনোভাবেই থামছে না!”
ফাদার এক মুহূর্তও ইতস্তত করলেন না। তৎক্ষনাৎ
মেঝের ওপর পা দুটো বিছিয়ে দিলেন। রিচার্ড তাঁর উরুর ওপর মাথা রেখে ঠান্ডা মেঝের মধ্যে কুঁকড়ে শুয়ে পড়ল, চোখ দুটো বুজল। ফাদার স্নেহে রিচার্ডের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। তাঁর চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া একফোঁটা অশ্রু এসে জমা হলো রিচার্ডের কপালে।
বাবা আর ছেলের এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে আড়ালে দাঁড়িয়ে চোখ মুছল মেড’রা। চোখের জল সংবরণ করতে পারল না ন্যাসো আর লুকাসও।

সোফিয়া ছুটে গেল ফাদারের রুমে। দ্রুত হাতে বালিশের নিচ থেকে তুলে নিল কাঙ্ক্ষিত চাবিটা। এরপর দৌড়ে গেল নিজের রুমে। খাটের নিচ থেকে বের করে আনল একটি হকিস্টিক। অস্ত্র আর চাবি হাতে এবার তার গন্তব্য রিচার্ডের গ্যারেজ।
বাহির থেকে চকমকে, আলিশান মনে হলেও এই গ্যারেজের নিচেই লুকিয়ে আছে একটি রহস্যময় বাঙ্কার। আর সেই বাঙ্কারের চাবি কেবল রিচার্ড এবং ফাদারের হস্তগত। তবে দীর্ঘদিনের কৌশলে ফাদারের কাছ থেকে রিচার্ডের সব গোপন খবরই বের করে নিয়েছিল সোফিয়া। তাই আজ এত সহজে চাবিটা হস্তগত করা সম্ভব হলো। ভাগ্য সহায় ছিল বলে গ্যারেজে তখন কেউ ছিল না। নিঃশব্দে সে নামতে শুরু করল ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারের আঁধার ঢাকা সিঁড়ি দিয়ে। যে মেয়েটির চোখে সর্বক্ষণ আতঙ্ক লেগে থাকত, আজ এই ভয়ংকর অন্ধকারের মুখে দাঁড়িয়েও তার চোখেমুখে ভয়ের বিন্দুমাত্র ছাপ নেই।

বাঙ্কারের তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই থমকে দাঁড়াল সোফিয়া। চারপাশের পুরো দেওয়াল জুড়ে শুধুই কাঁচ! যেদিকে চোখ যায়, কেবল নিজেরই অসংখ্য প্রতিবিম্ব ভেসে উঠছে। এমনকি পায়ের নিচের মেঝেও স্বচ্ছ কাঁচের। সোফিয়ার বুঝতে বাকি রইল না, এটাই রিচার্ডের মিরর হাউস। শুকনো ঢোক গিলে সে কাঁচের সেই সংকীর্ণ পথ ধরে সাবধানে এগোতে লাগল। কিছুদূর এগোতেই যেন পায়ের তলার মাটি সরে গেল। সামনের দৃশ্যটা তার কল্পনাকেও হার মানায়!
কাঁচের তৈরি একটি বিশাল আকৃতির জার। উপরটা শক্তভাবে আঁটা, শুধু সামান্য একটা ছিদ্র রাখা হয়েছে, যা দিয়ে অতি ক্ষীণ অক্সিজেন ভেতরে প্রবেশ করছে। একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য তা কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। আর সেই জারের ভেতরে বন্দি হয়ে আছে এলিজাবেথ!

জারের তলদেশ থেকে ধীরে ধীরে পানি উঠছে। পানি উঠতে উঠতে ডুবে যাচ্ছে এলিজাবেথ। যখুনি পানি তার নাক ছুঁয়ে তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করায়, ঠিক তখুনি আবার সেই পানি নিচ দিয়ে নেমে যায়। কিন্তু তা সাময়িক! কিছুক্ষণ পরেই আবার একই প্রক্রিয়ায় পানি উঠতে শুরু করে। গত রাত থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে এই নির্মম খেলা। প্রতিবারই মৃত্যু এসে এলিজাবেথকে ছুঁয়ে যায়, আবার এক ফোঁটা বাঁচার আশা দেখিয়ে পিছিয়ে যায়।
চারপাশের কাঁচের ঠিকরে পড়া আলোয় দেখা যায় এলিজাবেথের চোখেমুখে স্পষ্ট ফুটে উঠা মৃত্যুর বিভীষিকা। দীর্ঘ সময় পানির নিচে দম আটকে থাকায় সেই চেনা লাবণ্যময় মুখটা এখন মৃত মানুষের মতো ফ্যাকাসে, রক্তশূন্য। বাঁচার তাগিদে কাল রাত থেকে অনেক ছটফট করেছে সে, আপ্রাণ চেষ্টা করেছে জারের কাঁচ ভেদ করে বের হতে। কিন্তু এই দানবীয় জারের মুখ ভাঙা তার পক্ষে অসম্ভব।
সোফিয়া অসহায় দৃষ্টিতে নিঃশব্দে চেয়ে রইল এলিজাবেথের দিকে। তার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল, অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“আমি জানতাম… আমি জানতাম একদিন ঠিক এমনটাই হবে। এখানকার মানুষের ভালোবাসা যতটা ভয়ংকর, এদের প্রতিশোধ তারচেয়েও ভয়ংকর! সেদিন কেন পালিয়ে গেলে না? আমি তো তোমাকে এই অভিশপ্ত ম্যানশন থেকে মুক্ত করে দিয়েছিলাম!”

তাহলে কি সেদিন সে-ই এলিজাবেথকে সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে ম্যানশন থেকে বের করে বোর্ডে তুলে দিয়েছিল? রিচার্ড আর সোফিয়া সেদিন যখন মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল, সোফিয়াই কি তবে ধূর্ত কৌশলে রিচার্ডের কোমর থেকে চাবিটা হাতিয়ে নিয়েছিল? আর যার নির্মম পরিণতি আর শাস্তি পোহাতে হয়েছিল নির্দোষ তাসাকে, ঠিক যেমনটা আজকেও সে পেল!
হঠাৎ সোফিয়া আর এলিজাবেথের চোখাচোখি হলো। এলিজাবেথ ততক্ষণে আবারও পানির নিচে তলিয়ে গেছে, কিন্তু এবার আর পানি নিচে নেমে যাচ্ছে না। এলিজাবেথের সেই নিস্তেজ, ফ্যাকাসে দৃষ্টিতে কী এমন মায়া কিংবা আকুতি ছিল কে জানে! মুহূর্তের মধ্যে সোফিয়ার চোখমুখ থেকে সমস্ত অসহায়ত্ব আর ভয় ডরে ছাওয়া ভাবটা কর্পূরের মতো উবে গেল। সে এক ঝটকায় হকিস্টিকটা হাতে তুলে নিয়ে রুখে দাঁড়াল। তারপর শরীরের সমস্ত শক্তি একবিন্দুতে এনে, বেশ খানিকটা দূর থেকে দৌড়ে এসে সে সজোরে আঘাত করল কাঁচের জারে। কিন্তু সুবিশাল সেই জারের তুলনায় তার এই আঘাতটা ছিল হাতির শরীরে পিঁপড়ার কামড়ের মতো তুচ্ছ! এত বিশাল এক কাঁচের প্রাচীর কি তার একার পক্ষে ভাঙা সম্ভব?

তবুও সে হার মানে না। বারবার, অজস্র বার, অগুনতি আঘাত চালিয়ে যেতে থাকে কাঁচের জারটির গায়ে। সংঘাতের চোট হাত ফেটে রক্তের ধারা নেমে এলেও সে থামে না। দানবীয় গতিতে আঘাতের পর আঘাত করে যেতে থাকে। ওদিকে এলিজাবেথের ফুসফুসে জমে থাকা শেষ নিঃশ্বাসটুকুও ফুরিয়ে আসছিল। সে নিভে আসা চোখে স্তব্ধ হয়ে দেখছিল, মেয়েটা নিজের হাত রক্তাক্ত করেও কীভাবে তাকে বাঁচানোর জন্য কাঁচ ভাঙার মরণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে!
এলিজাবেথ বাঁচার আশা ত্যাগ করলেও সোফিয়া হাল ছাড়েনি। অবশেষে তার এক চূড়ান্ত ভয়ংকর আঘাতে কাঁচের গায়ে হালকা ফাটল ধরে উঠল! এই সূক্ষ্ম ফাটলটাই সোফিয়ার শরীরে অলৌকিক শক্তির সঞ্চার করল। সে সর্বশক্তি নিংড়ে দিয়ে শেষ আঘাতটা হানতেই পুরো কাঁচের জারটা সশব্দে দ্বিখণ্ডিত হয়ে ভেঙে পড়ল!
ভেতরে জমে থাকা জলের জলোচ্ছ্বাস উথলে বের হতে লাগল। পানির প্রবল তোড়ে এলিজাবেথের অবশ শরীরটাও ছিটকে পড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তেই সোফিয়া ওকে ছাঁক দিয়ে ধরে ফেলল। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধাল, “তুমি… তুমি ঠিক আছো তো?”

সোফিয়া এলিজাবেথকে টেনেটুনে বাঙ্কারের একটি নিরাপদ স্থানে নিয়ে বসাল। কাঁচের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে এলিজাবেথ হাপরের মতো জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল, পাশে বসে সোফিয়াও হাঁপাচ্ছিল সমান তালে। কিন্তু এলিজাবেথের পুরো শরীরকে থরথর করে কাঁপতে দেখে সোফিয়ার আর বুঝতে বাকি রইল না। সে কোনো কিছু না ভেবে দ্রুত এলিজাবেথের গায়ের ভেজা পোশাক খুলে একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দিল। এলিজাবেথের শারীরিক অবস্থা তখন এতটাই নাজুক যে বাধা দেওয়ার মতো ন্যূনতম শক্তিও তার অবশিষ্ট ছিল না।
সোফিয়া ত্বরান্বিত হাতে নিজের গায়ের ভারী ফ্রকটা খুলে এলিজাবেথকে পরিয়ে দিল। তার নিজের শরীরে তখন কেবল ভেতরের লং ইনার গেঞ্জি আর শর্টস। কিন্তু তা সত্ত্বেও এলিজাবেথের শরীরের ভয়াবহ কাঁপুনি থামছিল না। সোফিয়া অল্প দ্বিধায় পড়ল, কিন্ত সেই দ্বিধা বেশি সময় টিকল না। সে এলিজাবেথকে নিজের বুকের ভেতর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে গায়ের উষ্ণতা দিতে শুরু করল। কাঁচের জার ভাঙার জন্য দীর্ঘক্ষণ ধরে যে অমানুষিক পরিশ্রম সে করেছিল, তার ফলে সোফিয়ার শরীর তখন প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে ছিল। সেই উত্তাপের ছোঁয়া পেতেই এলিজাবেথ আশ্রয়ের তীব্র আকুতিতে সোফিয়ার বুকে আরও নিবিড়ভাবে লেপ্টে গেল।

পরিস্থিতি তখন এমন এক চরম পর্যায় পৌঁছেছিল যে, কারও মনেই আর কাউকে ঘৃণা করার মতো অবকাশ রইল না। একে অপরের শেষ ভরসা হয়ে দুটি প্রাণ একদেহে লীন হয়ে রইল। কালচক্রের চাকা এভাবে কিছুক্ষণ গড়িয়ে গেল।
হঠাৎ কারও পায়ের শব্দে দুজনেই একযোগে চমকে সামনে তাকাল। ভয়ে শিউরে উঠল তাদের শরীর। তখন তাড়াহুড়ো করে নামার কারণে বাঙ্কারের দরজার তালাটা লাগানোর কথা সোফিয়ার একদমই মনে ছিল না। আর সেই সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগিয়ে গ্যারেজের এক লোলুপ গার্ড ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
গার্ডের কামাতুর, নোংরা দৃষ্টি দেখে এলিজাবেথের গা গুলিয়ে উঠল। তাক লাগানো রূপের বিচারে এলিজাবেথ ছিল সোফিয়ার চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে। সোফিয়ার সৌন্দর্য যদি হয় হৃদয় ছোঁয়া কোমলতার প্রতীক, তবে এলিজাবেথের রূপ ছিল যেকোনো পুরুষের সুপ্ত কামনাবাসনাকে জাগিয়ে তোলার মতো তীব্র এবং প্রখর। তাই সোফিয়া অর্ধাঙ্গ উন্মুক্ত অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও গার্ডের নোংরা চোখ গিয়ে আটকাল এলিজাবেথের অনাবৃত রূপের ওপরই।
গার্ডের ওই পাশবিক দৃষ্টি দেখে এলিজাবেথের ভেতরটা ঘৃণায় ভরে উঠল, চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল ভয়ের জল। এই মুহূর্তে সোফিয়ার বুকটাই তার একমাত্র নিরাপদ রক্ষাকবচ মনে হচ্ছিল। ভয়ে শিউরে উঠে সে সোফিয়াকে খামচে ধরল। সোফিয়া নিস্পৃহ, শান্ত চোখে এলিজাবেথের দিকে তাকাল, তার শরীরে পুনরায় ফিরে আসা কাঁপুনিটা আবার অনুভব করল। সে মৃদু ঢোক গিলল। তারপর নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়াতে চাইলে এলিজাবেথ আতঙ্কে তাকে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। ভয়ার্ত চোখে মাথা নেড়ে আকুতি জানাল না ওঠার জন্য।
সোফিয়া চোখের ভাষায় ওকে অভয় দিয়ে, নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। তারপর হাতের হকিস্টিকটা শক্ত করে ধরে দানবের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

সোফিয়া হাতের হকিস্টিকটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে গার্ডের দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
“যেখানে স্বয়ং আমি উপস্থিত আছি, সেখানে এভাবে নজর দেওয়াটা একটু বেশিই বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না?”
তার মুখের কথা শেষ হতে না হতেই সে বাতাসের মধ্য দিয়ে এমন তীব্র গতিতে হকিস্টিকটা ছুঁড়ে মারল যে, তা বাতাসের বুক চিরে তা সরাসরি আঘাত করল গার্ডের পায়ে। হকিস্টিকের প্রচণ্ড আঘাতে গার্ডটি তাল সামলাতে না পেরে ছিটকে নিচে আছড়ে পড়তে গেল। এই সুযোগ সঙ্গে সঙ্গে সোফিয়াও হিংস্র চিতার মতো শূন্যে ঝাপিয়ে পড়ল! গার্ডটি সম্পূর্ণ নিচে লুটিয়ে পড়ার আগেই সোফিয়া বাতাসের মধ্যে দু’বার চক্কর খেয়ে শূন্যে থাকা অবস্থাতেই তার একটা হাত ধরে মুচড়ে দিল। বাঙ্কারের নীরবতা চিরে হাড় ভাঙার মটমট শব্দ গুঞ্জরিত হলো।
গার্ডটি নিথর হয়ে নিচে আছড়ে পড়তেই সোফিয়া তার বুকের ওপর চেপে বসল। মুহূর্তের মধ্যে পাশ থেকে হকিস্টিকটা তুলে নিয়ে তার সরু অংশটা সরাসরি ঢুকিয়ে দিল গার্ডের চোখের ভেতরে! গার্ডটি যন্ত্রণায় চিৎকার করে আর্তনাদ করার সুযোগটুকুও পেল না; তার আগেই সোফিয়া পাশ থেকে এক টুকরো ধারালো ভাঙা কাঁ চ তুলে তার হাঁ করা মুখের ভেতর গুঁজে দিল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য শরীরটা ছটফট ও ধড়ফড় করে একসময় চিরতরে নিস্তেজ হয়ে গেল লোকটা।

অবিশ্বাস আর আতঙ্কে এলিজাবেথের চোয়াল ঝুলে পড়ে। কে এই মেয়ে?! এটাই কি ফাদারের সেই মানসিকভাবে অসুস্থ, রুগ্‌ণ মেয়েটা? যে কি না ঠিকভাবে কথা পর্যন্ত বলতে পারত না! এত অবিশ্বাস্য শক্তি আর হিংস্রতা কোথা থেকে এলো এই মেয়ের শরীরে? একটা জোয়ান গার্ডকে সে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে সম্পূর্ণ কাবু করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে বাধ্য করল! তবে এলিজাবেথের বিস্ময়ের ঘোড় কাটার আগেই ওপর থেকে আরও কয়েক জোড়া ভারী বুটের শব্দ দ্রুত নিচে নেমে এলো।
“কী হচ্ছে এখানে?”

কর্কশ কণ্ঠের শব্দের সাথে সাথে আরও চারজন সশস্ত্র গার্ড বাঙ্কারের ভেতর হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল। তাদের দৃষ্টি প্রথমেই গিয়ে থামল মেঝেতে র ক্তা ক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা সহকর্মীর লা শের ওপর, আর তার বুকের ওপর চেপে বসে থাকা র ক্তচ ক্ষু যমদূত সোফিয়ার ওপর! সঙ্গে সঙ্গে রাগে আর আতঙ্কে তাদের হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এলো। কিন্তু পরমুহূর্তেই তাদের দৃষ্টি যখন কোণায় গুটিয়ে থাকা এলিজাবেথের ওপর গিয়ে পড়ল, তখন র ক্তচক্ষুর সেই রাগ নিমিষেই পশুপাখির মতো লালসায় রূপান্তরিত হলো। চার জোড়া লোলুপ পা একসাথে এগিয়ে যেতে লাগল এলিজাবেথের দিকে।

কিন্তু এবারও সেই পশুদলের সামনে একাই পাহাড়ের মতো ঢাল হয়ে দাঁড়াল সোফিয়া। আগের লোকটির মতোই কোনো সুযোগ না দিয়ে চারজনের মধ্যে দু’জনকে নিমিষে কাবু করে কাঁচের মেঝেতে ফেলে দিল সোফিয়া। তার বিদ্যুতগতির ক্যারাটে স্কিল দেখে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গার্ডরাও হতবাক হয়ে গেল! এলিজাবেথ শুধু হাঁ করে বিস্ময় ভরা চোখে তাকিয়ে দেখতে লাগল—একটা মেয়ে হয়েও সে কীভাবে এতগুলো অতিকায় পুরুষের সাথে সমানে লড়ে যাচ্ছে!
কিন্তু বিপত্তি ঘটল ঠিক তখুনি। মারামারির এক পর্যায়ে সোফিয়ার অসাবধান পা গিয়ে পড়ল মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা ভাঙা কাঁচের টুকরোর ওপর। ধারালো কাঁচটা গলে সোফিয়ার পায়ের তালু চিরে গভীরে ঢুকে গেল! যন্ত্রনায় চিৎকার করে সোফিয়া হাঁটু গেড়ে নিচে পড়ে গেল। তার তেজ অনেকটাই নিভে এলো।
বাকি অবশিষ্ট দুজন গার্ড এবার পৈশাচিক অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। তাদের হিংস্র আর লালসাতুর দৃষ্টি এবার এলিজাবেথকে ছেড়ে সোফিয়ার অর্ধ নগ্ন শরীরের দিকে নিবদ্ধ হলো। নিজেদের শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে কামুক ভঙ্গিতে তারা এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
“ওটাকে পরে দেখা যাবে… আগে তোকে শিকার বানাব। শরীরে খুব তেজ, না? তোর শরীরের কোথায় ঠিক কতটুকু তেজ আছে, আজ সেটাই মেপে দেখব!”

সোফিয়া অসহায় দৃষ্টিতে তার র ক্তা ক্ত পায়ের দিকে তাকাল। কাঁচ যেখানটায় গভীরভাবে গেঁথে গেছে, তার পাশেই রয়েছে পুরনো একটি কাটা দাগ। এই ছোট্ট দাগটিকে কেন্দ্র করেই তো সূচনা হয়েছিল তার জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আর স্নিগ্ধ অধ্যায়টির। সেদিন তার পায়ের ক্ষ ত আর র ক্ত দেখে একটা মানুষের চোখে যে আকুলতা আর উৎকণ্ঠা ফুটে উঠেছিল, তা আজ মানসপটে ভেসে উঠতেই সোফিয়া এবার একবারে নিস্তেজ হয়ে পড়ল। তার প্রতিটি হাড় ব্যথায় কাঁপতে লাগল। সে ধসে পড়ল মেঝের ওপর।
সেদিন তো তার সামান্য ব্যথায় ব্যাকুল হয়ে ছুটে এসেছিল একজন, তবে আজ কেন আসছে না? কোথায় সে? সোফিয়ার চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল। অস্পষ্ট চোখে সে শুধু দেখতে পাচ্ছিল, লোলুপ হায়নার মতো গার্ড দুটো কীভাবে তার দেহটাকে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসছে। এবার সোফিয়ার স্মৃতির পাতায় উঁকি দিল তঅতীতের আরেকটি র ক্তা ঙ্কিত, ভয়ংকর রাত! তার জীবনের সবচেয়ে অভিশপ্ত সেই রাতে একদল হিংস্র হায়না এভাবেই তাকে ছিঁড়ে খেয়েছিল।

সেই কালরাতের বিভীষিকাময় ট্রমা থেকে ভালোবেসে তাকে বের করে এনেছিল যে মানুষটা, তার সব কলুষতা আড়াল করে নিজের নিরাপদ বুকে আশ্রয় দিয়েছিল যে, সকল বিপদ থেকে শক্ত হাতে আগলে রাখত যে, আজ সে কোথায়? সে কেন আসছে না? আজ আবার কতগুলো হায়নার হাত সেই রাতের মতো তার দিকে ধেয়ে আসছে, অথচ তাকে বাঁচানোর জন্য আজ কেউ নেই! তবে কি সে মানুষটা আর এই পৃথিবীতে নেই বলে তাকে বাঁচানোর মতো আর কেউ অবশিষ্ট রইল না? সে কি তবে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে পুরোপুরি একা হয়ে গেল?
গার্ড দুটোর নোংরা হাত যখন প্রায় সোফিয়ার অনাবৃত শরীর ছুঁয়ে ফেলবে, তখন সোফিয়া দু’হাতে মুখ ঢেকে আর্তনাদ করে উঠল। কিন্তু বিস্ময়করভাবে গার্ডদের হাত সোফিয়াকে ছুঁতে পারল না। পরপর দুটি তীব্র আঘাতের সশব্দে গার্ড দুটো আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়ল! সোফিয়া হাত সরিয়ে চমকে সামনে তাকাল। দেখতে পেল হাতে র ক্তমাখা হকিস্টিক নিয়ে দরদর করে ঘামতে থাকা এলিজাবেথ দাঁড়িয়ে আছে! মেয়েটার হাত থরথর করে কাঁপছে, তবুও সে দ্বিধা করেনি।

সোফিয়ার অশ্রুসজল চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লেও তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল অপরূপ হাসি।
সোফিয়ার সেই কান্নাভেজা হাসির দিকে তাকিয়ে এলিজাবেথ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,”আমি কারও ঋণ রাখি না।”
এলিজাবেথ হাত বাড়িয়ে দিল সোফিয়ার দিকে। সোফিয়া এক মুহূর্ত এলিজাবেথের প্রসারিত হাতের দিকে তাকিয়ে থেকে তা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। এলিজাবেথ একটানে ওকে টেনে সোজা করে দাঁড় করাল। এরপর দুজনে একত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ল পশুতুল্য গার্ড দুটোর ওপর। শুরু হলো বাঁচা-মরার অসম লড়াই।
কিন্তু পুরুষের পাশবিক শক্তির সাথে দুটি শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত নারীর পক্ষে বেশিক্ষণ পেরে ওঠা সম্ভব নয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই গার্ড দুটো সোফিয়া আর এলিজাবেথকে সম্পূর্ণ কাবু করে নিচে আছড়ে ফেলে তাদের গলা চিপে ধরল।

টানা বারো ঘণ্টারও বেশি সময় জারের পানিতে নিমজ্জিত থাকার কারণে এমনিতেই পানি এলিজাবেথের ভেতরের সমস্ত জীবনীশক্তি শুষে নিয়েছিল, ফলে গলা চেপে ধরতেই এলিজাবেথ তার শেষ প্রতিরোধ ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলল। সোফিয়া নিজেও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছিল, তবুও সে মরিয়া হয়ে নিজেকে মুক্ত করার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু এলিজাবেথকে এত সহজে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখে সোফিয়ার নিজের আত্মরক্ষার কথা ভুলে গিয়ে এলিজাবেথের দিকে তাকাল। আচ্ছন্ন অবস্থাতে হাতড়াতে হাতড়াতে একটি কাঁচের টুকরো কুড়িয়ে নিল। তারপর কাঁচের টুকরোটি সজোরে বসিয়ে দিল এলিজাবেথের গলায় চেপে ধরা গার্ডের হাতের কবজিতে। একইভাবে কাঁচটি গেঁথে দিল নিজের গলা চেপে ধরা গার্ডটির হাতেও!

যন্ত্রণায় চিৎকার করে হাত আঁকড়ে ধরে গার্ড দুটো দূরে সরে যেতেই সোফিয়া সুযোগ কাজে লাগাল। সে এক ঝটকায় উঠে বসে গার্ডের বুকের ওপর চড়ে বসো হাতে থাকা ধারালো কাঁচ দিয়ে অনবরত আঘাতের পর আঘাত চালাতে লাগল গার্ডটার মুখ ও গলায়। সোফিয়াকে অনুকরণ করে পাশে থাকা এলিজাবেথও কাঁচ উঁচিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল অপর গার্ডের ওপর। আঘাতের পর আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই নিথর হয়ে গেল পশুতুল্য দুটো লোক।
এলিজাবেথ হাঁপাতে হাঁপাতে র ক্তা ক্ত গার্ডের ওপর থেকে সরে আসে। কিন্তু তখনও সোফিয়ার ভেতরের পৈশাচিক তেজ কমেনি। তার মধ্যে যেন তখন ভর করেছে ভয়াল অশরীরী কোনো আত্মা! গার্ডের মুখের মাংস ছিন্নভিন্ন হয়ে র ক্তে ভেসে যাচ্ছিল, বাঙ্কারের মেঝে জুড়ে র ক্তের প্লাবন বয়ে যাচ্ছিল, তাতেও সোফিয়ার হাত থামার নাম নেই। র ক্ত ছিটকে এসে সোফিয়ার নিষ্পাপ পুরো মুখমণ্ডল ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

উপর, নিচ, পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ—চারপাশের কাঁচের দেওয়ালে ক্রমাগত প্রতিফলিত হতে লাগল সোফিয়ার এই ভয়ংকর, র ক্তা তুর রূপ। মেয়েটা অঝোরে কাঁদছে আর দানবের মতো অন্ধের মতো আঘাত করে যাচ্ছে। তার মগজে আর কানে তখন বারবার প্রতিধ্বনি হয়ে বাজছিল একটা অতি পরিচিত পুরুষের গাঢ় গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
“আর কখনো যদি কেউ তোকে বাজেভাবে ছুঁতে আসে, জাস্ট মেরে দিবি। ডিরেক্ট খুন করে ফেলবি! বাকিটা আমি সামলে নেব। তিন হাত মাটির দূরত্ব আমি সইতে না পারলেও, চৌদ্দ শিকের দূরত্ব আমি হাসিমুখে সয়ে নেব।”
দশ বছর আগে সে পারেনি আত্মরক্ষা করতে, শয়তানগুলোর হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে; সেদিন সে হেরে গিয়েছিল। কিন্তু আজ আর সে হারবে না। ক্ষণে ক্ষণে মেয়েটার ভেতরের সেই সুপ্ত নৃশংসতা আরও ভয়াল রূপ নিতে লাগল।

এলিজাবেথ হতবিহ্বল হয়ে সোফিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। এমন অদ্ভুত, অনিয়ন্ত্রিত আচরণের অর্থ কী? মেয়েটা এভাবে কাঁদছেই বা কেন? আর কিসের এত আক্রোশ আর তেজ জমে আছে তার শরীরে?
এলিজাবেথ আর স্থির থাকতে না পেরে দ্রুত ছুটে গিয়ে পেছন থেকে সোফিয়াকে টেনে সরিয়ে আনার চেষ্টা করল। সোফিয়া সরতে চায় না, তার রক্তা তুর হাত তখনও আছড়ে পড়তে চাইছে লা শ টা র ওপর। এলিজাবেথ তার সমস্ত শক্তি দিয়ে টেনেহিঁচড়ে সোফিয়াকে ক্ষত-বিক্ষত লা শ টার ওপর থেকে সরিয়ে আনল।
আঘাত থামতেই সোফিয়া দু-হাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। মাটি থেকে এত গভীরে এই বাঙ্কারটা না থাকলে, তার সেই বুকফাটা কান্না বোধহয় আকাশ ছুঁয়ে ফেলত। এলিজাবেথ কেবল বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে সোফিয়ার দিকে। হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল সোফিয়ার র ক্তা ক্ত কাটা পায়ের দিকে। চিরে যাওয়া ক্ষত থেকে তখনও চুইয়ে চুইয়ে র ক্ত ঝরছে। এলিজাবেথ শুকনো ঢোক গিলে সোফিয়ার পায়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। ক্ষণিকের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে সে পরনের কাপড়ের কিছুটা অংশ ফেরে ছিঁড়ে সোফিয়ার র ক্তভেজা পা-টা শক্ত করে বেঁধে দিল।

তারপর সোফিয়ার পাশে কাঁচের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ক্লান্ত শরীরে বসে পড়ল। সোফিয়া কান্নার বেগ কমিয়ে এলিজাবেথের দিকে তাকাল।
“আমি তো তোমাকে অনেক স্ট্রং ভেবেছিলাম।
এটা তুমি কী করলে?”
সোফিয়ার কথা শেষ হতে না হতেই হঠাৎ এলিজাবেথ ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। তার চোখ থেকে অঝোর ধারায় গড়িয়ে পড়া নোনা জল থমকে দিল সোফিয়াকে। সে আর কোনো প্রশ্ন করল না। একজন মায়ের জন্য সন্তান হারানোর চেয়ে কষ্টের আর কী-ই বা হতে পারে?
তবে সোফিয়াকে বিস্ময়ের অতল গহ্বরে তলিয়ে দিয়ে অকস্মাৎ এলিজাবেথ সোফিয়ার ডান হাতটি শক্ত করে চেপে ধরল। সোফিয়া চমকে উঠল, এলিজাবেথের এই অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে তার পুরো শরীর শিউরে উঠল। সে হতবিহ্বল, অথচ বিদ্যুৎ চমকের মতো চমকে ওঠা দৃষ্টিতে এলিজাবেথের মুখের দিকে তাকাল। এলিজাবেথ কোনো কথা না বলে সোফিয়ার হাতটা সন্তর্পণে নিয়ে রাখল তার তলপেটের ওপর। ভাঙা কাঁচের মতো থরথর করে কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক করে, করুণ আকুতিতে বিড়বিড় করে বলল,
“হেল্প মি ! প্লিজ!”

পাহাড়ের চুড়োয় দাউদাউ করে জ্বলছে ছয়টি চিতা। এরা সেদিন পার্টির রাতে সুরাকারকে ভুল করে রিচার্ড ভেবে তার ওপর হামলা চালিয়েছিল। সেদিন ঘটনাক্রমে সুরাকার বেঁচে গেলেও, রিচার্ড তাদের বাঁচতে দেয়নি।
সেদিন তো রিচার্ড কত শক্ত গলায় বলেছিল, সে তাকে ভাই বলে মানে না। না মানলে আজ কেন এই নির্মম প্রতিশোধ?
জ্বলতে থাকা আগুনের সামনে নিশ্চল, বিশাল এক পাহাড়ের মতো ঠাঁই দাঁড়িয়ে ছিল রিচার্ড। তার ঠিক এক হাত পেছনে উৎকণ্ঠিত চোখে দাঁড়িয়ে তার দুই বিশ্বস্ত সহচর। সকাল থেকেই বসের হাবভাব তাদের ভালো ঠেকছে না। মানুষটা আজ অস্বাভাবিক, ভয়ংকর রকম নীরব।
চিতাগুলো জ্বলে ছাইয়ে পরিণত হতেই রিচার্ড ধীরপায়ে হেঁটে গিয়ে থামল পাহাড়ের শেষ প্রান্তে। একদম খাঁদের মুখে। সহচর দুজন টু শব্দ না করে পিছু নিল। তারা স্পষ্ট বুঝতে পারছে, এই কঠিন মানুষটার ভেতরে কী তোলপাড় চলছে। কিন্তু রিচার্ড যখন আচমকা পাহাড়ের চূড়ায় বসে পড়ে শূন্যে পা দুটো ঝুলিয়ে দিল, লুকাস আর ন্যাসো তখন আর স্থির থাকতে পারল না। একসাথে বলে উঠল,

“বস, এটা বড্ড রিস্কি!”
রিচার্ড কোনো জবাব দিল না। নির্বিকার, অনুভূতিহীন চোখে তাকিয়ে রইল সুদূরে। লুকাস আর ন্যাসো আর কথা বাড়াল না। তবে পা বাড়িয়ে একদম বসের গা ঘেঁষে দাঁড়াল। যদি অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে যায়, তবে যেন মুহূর্তেই তাঁরা টেনে ধরা যায়।
হঠাৎ নীরবতা ভাঙল রিচার্ড। শূন্য কণ্ঠে বলল, “না হতে পারলাম ভালো স্বামী, না বাবা। অথচ চেয়েছিলাম সুন্দর একটা পরিবার। আই’ম সাচ আ লুজার!”
পাশের পাহাড়ের চূড়া থেকে দৃশ্যটি দেখছিল নিক। রিচার্ডের এই বিধ্বস্ত রূপ দেখে তার ভেতরের সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সুরাকারের ওপর। সে ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে উঠল, “এবার খুশি হয়েছ তো তুমি? এখন অন্তত শান্তি পেয়েছ? যে মানুষটা তোমার প্রাণ বাঁচাল, বারবার তোমার ঢাল হয়ে দাঁড়াল, মুখে ভাই না বলেও জ্যেষ্ঠের মতো তোমাকে শত্রুর হাত থেকে আগলে রাখল, এমনকি তোমাকে মারতে আসা খুনিদেরও নির্মমভাবে শেষ করে দিল—তুমি তার সংসারটা ভাঙার জন্যই উঠেপড়ে লাগলে? তুমি আসলেই একটা সাইকো, ক্রীশ! তোমার এই হিংসার আগুনে একটা নিষ্পাপ প্রাণ পৃথিবী থেকে ঝরে গেল!”
একটু বিরতি নিয়ে,

“তুমি তোমার বইয়ের চরিত্রগুলোর মতোই একটা সাইকো! আসলে আমারই আগেই বোঝা উচিত ছিল, এমন অসুস্থ চরিত্র যে সৃষ্টি করতে পারে, সে নিজে কতটা ভয়ংকর হতে পারে!”
অপর মানুষটি পাহাড়ের চূড়ায় সর্বহারা পাখির মতো বসে থাকা রিচার্ডের দিক থেকে চোখ ফেরাল। সুরাকার ওরফে ক্রীশের চোখ দুটো র ক্তবর্ণ। ভেতরের যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল সে, “হ্যাঁ! আমি সাইকো। কারণ আমি সহ্য করতে পারছি না আমার ভালোবাসার মানুষটা অন্য কারো আলো হয়ে সংসার করছে। যে রূপের প্রেমে আমি পড়েছিলাম, যে মুখটাকে আমি প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিলাম, সেই মুখটা অন্য কাউকে ভালোবাসবে? আমার মতো দেখতে অন্য একজনের বুকে মাথা রাখবে? তার সন্তানের মা হবে? না! এটা আমি মেনে নিতে পারিনি, কোনোদিন পারবও না! এমন একটা সুন্দর সংসার তো আমারও হওয়ার কথা ছিল! আমিও তো বাবা হতে যাচ্ছিলাম… কোথায় আমার সেই সন্তান? কোথায় আমার রোজবেথ?”
নিক বিরক্ত হয়ে বলল, “তুমি কেন বুঝতে পারছ না ক্রীশ, ভাগ্য আমাদের হাতে থাকে না। ডেসটিনি বলেও তো একটা কথা আছে। যা কপালে থাকে না, তা কখনো জোর করে পাওয়া যায় না। মেনে নাও, এই জন্মে তোমার আর রোজবেথের একসাথে হওয়া লেখা ছিল না।”

 Born to be villainspart 39

কিন্তু বাস্তবতার এই নির্মম সত্য মানতে নারাজ ক্রীশ। নিজের অবাধ্য মনে সে কেবলই আওড়াতে লাগল, “যেহেতু পরপার বলে কিছু নেই, সুতরাং এই জন্মেই আমার ওকে আমার চাই।”
নিক চমকে উঠল, “তার মানে? কী বলতে চাইছ তুমি? ডোন্ট টেল মি দ্যাট তুমি ওকেই পেতে চাও?!”
হঠাৎ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না ক্রীশ। কাঁচা সবুজ ঘাসের ওপর হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল সে। বুকের বাঁ পাশটা যেন খাঁ খাঁ আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে! সে উন্মাদের মতো বুক ঘষতে ঘষতে আর্তনাদ করে উঠল,
“ওকে এনে দাও না, নিক! প্লিজ…. এখানটা জ্বলে যাচ্ছে, পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে!”

 Born to be villains part 41

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here