Home উন্মাদনা উন্মাদনা পর্ব ৫৫

উন্মাদনা পর্ব ৫৫

উন্মাদনা পর্ব ৫৫
কায়নাত খান কবিতা

‘আর পড়তামই না প্যান্টননননন!’
ছোটুর বুকফাটা চিৎকারে চারপাশ যেন মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠে। অভী অবশ্য তার সামনে দাঁড়িয়ে একেবারে চুপচাপ। মুখে কোনো ভাবান্তর নেই, শুধু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছোটুর দিকে। আর ছোটু? রাগে তার সমস্ত শরীর কাঁপতে থাকে । ছোট্ট দুটো হাত নড়ছে, মাথা দুলছে, চোখেমুখে ফুটে উঠছে জমে থাকা ক্ষোভ। মনে হচ্ছে, অভীর বিরুদ্ধে তার যত অভিযোগ, সবকিছু একসঙ্গে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ দিয়ে প্রকাশ করার দায়িত্ব নিয়েছে সে।
অভীর ওপর ছোটুর এই রাগ অবশ্য আজকের নয়। বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভ তার। কারণ অভী যখনই তাকে রাস্তায় একা পায়, তখনই কোনো না কোনোভাবে তার প্যান্ট নিয়ে টানাটানি শুরু করে দেয়। আর সুযোগ পেলেই প্যান্ট খুলে নিয়ে দৌড় দেয় সে! ছোটু যতই পালাক, যতই চিৎকার করুক, অভীর দুষ্টুমি থামার নামই নেয় না। এতে ছোটুর মনে প্রশ্ন জাগে,সে ছোট বলে কি তার কোনো সম্মান নেই? রাস্তায় মানুষের সামনে তার মান-সম্মান বলে কি কিছু থাকতে নেই?

সবচেয়ে বড় কথা, এই প্যান্টের কারণেই তো তার প্রেমটাও অসমাপ্ত হয়ে আছে!মাত্র দশ বছর বয়সেই পূর্বপাড়ার পুচকির সঙ্গে ছোটুর প্রেমটা সবে একটু একটু করে জমে উঠেছিল। বয়সে পুচকি তার চেয়ে এক বছরের ছোট, নয় বছরের। তাদের প্রেমও ছিল তাদের বয়সের মতোই সরল। কখনো হাঁড়ি-পাতিল খেলা, কখনো ঘর-ঘর খেলা, আবার কখনো পুচকি বউ আর ছোটু জামাই সেজে কল্পনার সংসার পাতত।
ছোটুর কাছে ব্যাপারটা অবশ্য নিছক খেলা ছিল না। তার নয় বছরের হৃদয়ে তখন সত্যিই একটু একটু করে প্রেম নামের অদ্ভুত অনুভূতিটা জায়গা করে নিচ্ছিল।
সেদিনও দুজনে ঘর-ঘর খেলছিল। পুচকি বউ সেজেছে, ছোটু জামাই। হাঁড়ি-পাতিল সাজানো, কল্পনার সংসারও বেশ জমে উঠেছিল। ছোটু মনে মনে হয়তো ভাবছিল, এই সংসার এভাবেই চলতে থাকলে একদিন সত্যিকারের সংসারও করা যেতে পারে। কিন্তু ছোটুর সেই স্বপ্নের সংসারে সবচেয়ে বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়াল অভী।খেলার মাঝখানে হঠাৎ কোথা থেকে এসে অভী ছোটুর প্যান্ট খুলে দৌড় দিল।
ছোটু তখন নিজের সম্মান বাঁচাতেই ব্যস্ত। আর সেই দৃশ্য নিজের চোখে দেখার পর পুচকির মনে ছোটুর জন্য যে সামান্য প্রেম ছিল, সেটুকুও যেন উধাও হয়ে গেল। এরপর থেকে পুচকি ছোটুকে দেখলেই কেমন একটা বিরক্ত মুখ করে অন্যদিকে চলে যেত। যে পুচকি একটু আগেও ছোটুর সঙ্গে জামাই-বউ সেজে ঘর-সংসার করছিল, সেই পুচকিই পরে তাকে আর পাত্তা দিল না।ছোটুর প্রেম সেখানেই শেষ।না কোনো ঝগড়া, না কোনো বিচ্ছেদ, না কোনো শেষবারের মতো কথা। শুধু অভীর একখানা দুষ্টুমির কারণে নয় বছরের ছোটুর প্রেমের গল্পটা মাঝপথেই থেমে গেল।

তাই অভীর প্রতি ছোটুর এত রাগ।তার কাছে অভী শুধু তার প্যান্টের শত্রু নয়, তার অসমাপ্ত প্রেমেরও মূল হোতা।রাগে শরীর ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে ছোটু অভীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনের লাইগাই আমার জীবন শেষ!’
অভী ভ্রু কুঁচকে তাকাল ছোটুর দিকে। এমন দেড় ব্যাটাটির জীবন শুরু-ই কবে হলো, যে শেষ হবে? না-কি দুনিয়া এতোটাই ডিজিটাল হয়ে গেলো যে, এসব দেড় ব্যাটারিরা মায়ের পেট থেকে পড়তেই পুরো জীবনের স্বাদ পেয়ে যায়? অভী কপাল কুঁচকে আওড়ালো,
‘তোর জীবন শুরুই কবে হইলো রে ক্যাসেট?’ ‘
ছোটু কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর অভীর প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে এমন গম্ভীর মুখ করল, যেন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটা প্রকাশ করতে যাচ্ছে সে। খুব জোরে নিঃশ্বাস ফেলে ছোটু উত্তর দিল, ‘পুচকির লগে আমার প্রেম আছিল!’
কথাটা শুনে অভীর মুখের ভাব এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তারপর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল সেই চেনা দুষ্টু হাসি।

‘ওহ!’
ছোটু আরও রেগে গেল। অভী এমন ভাবে ওহ বলল, যেন তার কোনো ফারাকই পড়ছে না। দু-জন মানুষ দু’প্রান্তে চলে গেলো। তাদের প্রেম অসমাপ্ত থাকলো। অথচ অভী শুধু ওহ করলো। ছোটু খুব বড়ো গলা করে বলে, ‘হ, প্রেম আছিল! ওই কোচিং এ আমার থেইক্কা কলম লইছিল।’
‘ কলম নেওয়াতে প্রেম?’
‘ সারা কোচিং এ এতোজন থাকতে ওই আমার কাছ থেইক্কাই ক্যান কলম লইছিল? ভবিষ্যতে বিয়া করতো আমারে তাই..! ঘর ঘর খেলার সময় আমারেই জামাঔ বানাইতো..!’
অভী এবার বেশ আগ্রহী হওয়ার ভান করে বলল,‘তারপর কী হইল?’
ছোটু বুক ফুলিয়ে গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার মুখে তখন এমন এক বিরহের ছাপ, যেন মাত্র দশ বছরের জীবনেই সে প্রেম-বিচ্ছেদের সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়ে এসেছে। চোখেমুখে এমন বেদনাময় ভাব, দেখলে মনে হবে পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ এসে একমাত্র তার বুকেই আশ্রয় নিয়েছে।
‘আপনের লাইগা শেষ।পুচকি আমার পা:ছা দেইখা দৌড় দিছিল। আর আইলো না..!’
অভীর মুখের হাসিটা এবার আর কোনোভাবেই আটকে রাখা গেল না। আর ছোটু দাঁড়িয়ে রইল রাগে ফুলতে ফুলতে। তার দশ বছরের জীবনের সবচেয়ে বড় অভিযোগ তখন একটাই, সে ছোট হতে পারে, কিন্তু তারও একটা সম্মান আছে। তারও একটা প্রেম ছিল। আর সেই প্রেমের কবর যে মানুষটা নিজের হাতে খুঁড়ে দিয়েছে, সেই মানুষটাই এখনো দিব্যি তার সামনে দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসছে!

ছোটুর মনে হলো, এই দুনিয়ায় তার সঙ্গে এর চেয়ে বড় অবিচার আর কিছু হতে পারে না। দশ বছরের ছোট্ট জীবনে এত বড় ধাক্কা সে আর কখনো খায়নি। তার অকালপ্রয়াত প্রেমের প্রতি ন্যূনতম সমবেদনাটুকুও না দেখিয়ে অভী যেভাবে হাসছে, তাতে ছোটুর বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমানটা যেন আরও ফুলে উঠে,
‘ বদদোয়া দিলাম..আপনার বউও ও আপনারে পাত্তা দিতো না..!’
ছোটুর অভিশাপ শুনে অভীর মুখের হাসি নিমিষেই মিলিয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠল তার। যেন এতক্ষণকার সমস্ত রসিকতা হঠাৎ করেই কোথাও হারিয়ে গেছে।অভী ধীরে ধীরে আশপাশে চোখ বুলায়। হঠাৎই রাস্তার পাশে পড়ে থাকা একটা চ্যালা কাঠের টুকরোর ওপর গিয়ে থামল তার দৃষ্টি। কাঠটা চোখে পড়তেই তার মুখের গাম্ভীর্য যেন আরও গভীর হয়ে উঠে।এক মুহূর্তও দেরি না করে সে কাঠটার দিকে এগিয়ে গেল।
ছোটু প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। অভী কাঠের টুকরোটা হাতে তুলে নিয়ে তার দিকে এক পা এগিয়ে আসতেই মুহূর্তের মধ্যে ছেলেটার চোখ কপালে উঠে গেল। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে বুক ফুলিয়ে সাহসের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল, সেই সাহস কোথায় যেন নিমেষেই উধাও হয়ে গেল।ছোটু তড়িঘড়ি দু-এক পা পিছিয়ে গেল। গলায় কাঁপুনি নিয়ে বলল, ‘কাকা… কাঠ নামান!’

অভী কোনো উত্তর দিল না। বরং কাঠটা শক্ত করে হাতে ধরে আরও এক পা এগিয়ে গেল। তার মুখের গাম্ভীর্য দেখে ছোটুর বুকের ভেতরটাও যেন ঢিপঢিপ করে উঠল। পরক্ষণেই অভী কাঠটা হাতে নিয়ে ছোটুর দিকে তেড়ে গিয়ে বলল,‘আজকে তোর পিরিতের ভাব-সম্প্রসারণ লিখব আমি। কাছে আয়, ভাতিজা…!’
ছোটু আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। প্রাণপণে দৌড় দিল। ছোট্ট দুটো পা যতটা দ্রুত সম্ভব ছুটতে থাকে, আর তার ঠিক পেছনেই চ্যালা কাঠ হাতে ধেয়ে আসছে অভী। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে ছোটু অভীকে ঝাড়ু খেতে দেখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা নিচ্ছিল, এখন সেই ছোটুরই প্রাণ ওষ্ঠাগত। হাসির বদলা যে এত দ্রুত নিজের ঘাড়ে এসে পড়বে, তা বোধহয় সে স্বপ্নেও ভাবেনি।
‘কাকা, মাই’রেন না!’
পেছন থেকে অভীর গম্ভীর গর্জন ভেসে এলো,‘আগে দাঁড়া, তারপর কইতেছি!’
ছোটু দৌড়াতে দৌড়াতেই আতঙ্কিত গলায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘দাঁড়াইলেই তো মারবেন!’
‘না, দাঁড়া!’
‘আপনের কথা আমি বিশ্বাস করি না, কাকা!’

ছোটুর শেষ কথাটা শুনে অভীর মুখের গাম্ভীর্যের আড়ালেও যেন হাসির রেখা ফুটে উঠে। কিন্তু হাতে ধরা চ্যালা কাঠটা নামল না। আর ছোটু? সে তখন পেছনে তাকানোর সাহসটুকুও হারিয়ে, নিজের ছোট্ট পা দুটোকে জীবনের সবচেয়ে বড় দৌড়ের জন্য কাজে লাগিয়ে ছুটে চলেছে।
ছোটুর চিৎকার আর অভীর হাঁকডাকে চারপাশের পরিবেশটাও যেন মুহূর্তেই জমজমাট হয়ে উঠল। পথচারীদের কেউ কৌতূহলী চোখে তাকাচ্ছে, কেউ আবার মুখ টিপে হাসছে। আর এদিকে ছোটুর দৌড় যেন থামার নামই নিচ্ছে না।একবার পেছনে ফিরে তাকিয়ে ছোটু দেখল, অভী বেশ খানিকটা কাছে চলে এসেছে।
দৃশ্যটা দেখেই তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। পরক্ষণেই নিজের সর্বশক্তি দিয়ে পা চালিয়ে দৌড়ের গতি আরও বাড়িয়ে দিল সে।কিন্তু ভাগ্য বোধহয় আজ ছোটুর সঙ্গে ছিল না।দৌড়াতে দৌড়াতেই হঠাৎ তার পা রাস্তার উঁচু-নিচু একটা জায়গায় আটকে যায় । মুহূর্তের মধ্যে শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়তে যাচ্ছিল সে। কোনো রকমে হাত-পা সামলে নিজেকে সামলে নিল ছোটু। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে আবার ছুটতে উদ্যত হলো।কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই অভীর দৃষ্টি আটকে গেল সামনে।
তার চোখের সামনে দেখা দিল আরও ভয়ংকর এক দৃশ্য,ঝাড়ু হাতে ছোটুর মা এগিয়ে আসছেন।অভীর পা যেন আপনাআপনিই থেমে গেল।ছোটু তখনও জানে না, পেছনের বিপদ থেকে বাঁচতে গিয়ে সামনে সে কোন বিপদের মুখোমুখি হতে চলেছে।

অভীর পা যেন আচমকাই মাটিতে গেঁথে গেল। প্রথমে তার চোখ গেল মহিলার মুখের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে নেমে এলো হাতে ধরা ঝাড়ুটার দিকে। আবার একবার মহিলার মুখের দিকে তাকাল সে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য অভী আর ছোটুর মায়ের চোখাচোখি হলো। সেই দৃষ্টিতেই যেন অভী বুঝে গেল, এই মুহূর্তে ছোটুর পেছনে দৌড়ানোর চেয়ে নিজের প্রাণ বাঁচানো অনেক বেশি জরুরি।
হাতে ধরা চ্যাল কাঠটার দিকে একবার তাকাল অভী। তারপর এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সেটাকে মাটিতে ফেলে দিল, যেন কাঠটা সে জীবনে কোনোদিন দেখেইনি।ছোটুর মা কড়া চোখে তাকিয়ে বললেন,‘ জা’ওড়া চাঁদ খবর আছে তোর..!’

অভী মুখে একেবারে নিরীহ ভাব এনে বলল, ‘ কালিতারা খেপছে রে..!’
ছোটু সঙ্গে সঙ্গে মায়ের আড়াল থেকে মুখ বের করে চেঁচিয়ে উঠে বলল, ‘ আম্মা! তোমারে কালিতারা কয়..!’
অভী চোখ কুঁচকে ছোটুর দিকে তাকাল। ছোটু সঙ্গে সঙ্গে আবার মায়ের পেছনে লুকিয়ে গেল।মহিলার হাতে থাকা ঝাড়ুটা এবার সামান্য ওপরে উঠতেই অভীর মুখের চেহারা মুহূর্তেই পাল্টে গেল। দুষ্টুমি, হাসি, সাহস সবকিছু একসঙ্গে গায়েব। সে খুব ধীরে ধীরে এক পা পিছিয়ে গেল। ছোটুর মা-ও এক পা এগিয়ে এলেন।অভী আর দ্বিতীয়বার ভাবল না।ঘুরে সোজা দৌড়!
‘ জাও’ড়া চাঁদ খাঁড়া আইজকা তুই..!’
পেছন থেকে ছোটুর মায়ের গর্জন ভেসে এলো।অভী দৌড়াতে দৌড়াতে পেছন ফিরে চিৎকার করল, ‘ ওরে কালি রে.. এবারের মতো মাফ করে দে..!’
‘দাঁড়া কইলাম!’

‘ আমার জুতা দাঁড়াইবো..!’
ছোটু তখন মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছে। কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটা চ্যাল কাঠ হাতে তাকে তাড়া করছিল, সেই মানুষটাই এখন ঝাড়ুর ভয়ে প্রাণপণে ছুটছে। ছোটুর মুখে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক চওড়া, পরম তৃপ্তির হাসি।তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে খুব গম্ভীর গলায় বলল,‘ আম্মা, জোরে দৌড়াও। আমার প্যান্ট ফুলছে কাকা..!’
এক দৌড়ে অভী সরু গলিটার ভেতর ঢুকে এমনভাবে উধাও হয়ে যায় , যেন এইমাত্র সেখানে তাকে দেখা যায়ইনি। চোখের পলকেই লোকটা কোথায় মিলিয়ে গেল, ছকিনা আর ছোটুর দুজনেরই তাকে ধরার সাধ্য রইল না।
ছকিনা কিছুক্ষণ গলিটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হাতের ঝাড়ুটায় শক্ত করে মুঠো বসিয়ে ছোটুর কবজি চেপে ধরল। ছোটু তখন হাঁপাতে হাঁপাতে দাঁড়িয়ে আছে, মুখে আতঙ্কের ছাপ, অভীর পিছু নেওয়ার পরিবর্তে এবার তাকেও টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অন্য এক গন্তব্যের দিকে।
‘চল!’

ছকিনার এক কথায় ছোটুর আর কোনো প্রতিবাদ করার সাহস হলো না। ঝাড়ু হাতে, ছোটুর কবজি চেপে ধরে অভীর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল ছকিনা।অভীকে আজ হাতের কাছে পাওয়া গেল না ঠিকই, কিন্তু ছকিনার মাথায় এরই মধ্যে নতুন এক বুদ্ধি এসে গেছে। অভীর এখন বউ হয়েছে। আর বউয়ের কাছে স্বামীর কীর্তিকলাপের খবর পৌঁছে দিলে হয়তো মানুষটার মাথায় সামান্য হলেও বুদ্ধি ফিরতে পারে।অন্তত ছকিনার বিশ্বাস, অভীকে মানুষ করার দায়িত্বটা এবার তার নিজের হাতে না রেখে তার বউয়ের হাতেই তুলে দেওয়া উচিত। তাই ঝাড়ু হাতেই ছকিনা অভীর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়..!
শেষ পর্যন্ত ছোটুর মা ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে অভীদের বাড়ির সামনে এসে উপস্থিত হয়। ছোটু তখনও মায়ের পাশে হাঁটতে হাঁটতে মাঝেমধ্যে পেছনে তাকায়। অভী আবার কোথা থেকে বেরিয়ে এসে তার ওপর নতুন কোনো বিপদ চাপিয়ে দেয় কি না, সেই আশঙ্কা এখনো তার মন থেকে যায়নি।এদিকে বাড়ির ভেতরে তখন নেমে এসেছে বিকেলের শান্ত আবহ।

সারাদিনের ধকল, ছোটাছুটি আর নানান ঝামেলার পর আনন্দী সবে মাত্র বিছানায় এসে শুয়েছিল। ক্লান্তিতে শরীরটা যেন ভার হয়ে আছে। মাথাটা বালিশে রাখতেই চোখ দুটো আপনাআপনি বুজে আসছিল। মনে হচ্ছিল, আজ অন্তত একটু শান্তিতে ঘুমানো যাবে।কিন্তু সেই শান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।হঠাৎ দরজার বাইরে থেকে ভেসে এলো কলিংবেলের শব্দ। আনন্দীর চোখ সঙ্গে সঙ্গেই খুলে গেল। কয়েক মুহূর্ত সে নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে রইল, যেন শব্দটা সত্যিই শুনেছে কি না, সেটাই বোঝার চেষ্টা করছে সে।আবারও বেজে উঠে কলিংবেল।
আনন্দী বিরক্ত মুখে উঠে বসে। এলোমেলো চুলগুলো কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে, ক্লান্ত চোখে ঘুমের ভার। একবার দরজার দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবে, এই ভর সন্ধ্যায় আবার কে এলো!অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সে।
ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে এগিয়ে গেল সে। দরজা খোলার আগমুহূর্তেও তার কোনো ধারণা ছিল না, বাইরে এমন দুজন দাঁড়িয়ে আছে, যাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর আজকের রাতের শান্তিটুকুও আর তার কপালে থাকবে না।

দরজা খুলতেই আনন্দীর চোখ প্রথমে গিয়ে পড়ে এক কম বয়সী মহিলা দিকে। গঠন এবং গড়ন দেখে বোঝা যায় বসয় খুব একটা বেশি হবে না। গায়ের রং বেশ কালো।তার সঙ্গে রয়েছে উলঙ্গ এক ছেলে। হয়তো ভাই হবে তার। আনন্দী কৌতুহল নিয়ে তাকাতেই ছকিনা কর্কশ গলায় বলে, ‘ নিজের জামাইরে সামলাও। আবার পোলার প্যান্ট খুইলা দৌড় মারে..!’
পোলার কথা শুনতেই আনন্দীর চোখ কপালে উঠে যায়। বয়স তো খুব একটা বেশি নয়। তাহলে এই বয়সে এতো বড়ো ছেলে? আনন্দী কিছু বলতে যাবে ছোটুর মা আবার ও বলে, নিজের ভাতা’ররে সামলাও। এমনে তো টিকা যাইতো না..!’
‘ ভাতার কী?’
‘ যারে হাঙ্গা করছো..সামলাও..! ‘

আনন্দী কিছুক্ষণ নীরবে ছোটুর মা আর ছোটুর দিকে তাকিয়ে রইল। মহিলার মুখে তখনও অভিমানের রেশ, আর ছোটু মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে এমনভাবে মুখ ফুলিয়ে আছে, যেন অভীর বিরুদ্ধে তার অভিযোগের শেষ নেই। আনন্দী শেষ পর্যন্ত মৃদু স্বরে বলল,’আপনি চিন্তা করবেন না। আমি অভীকে বুঝিয়ে বলবো!’
ছোটুর মা আর কথা বাড়ালো না। ছোটুর হাত ধরে চলে যায়। আনন্দী ও রাগে ফুলতে থাকে।দরজা বন্ধ করে আনন্দী কয়েক মুহূর্ত সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। মুখের শান্ত ভাবটা ধীরে ধীরে বদলে গেল। চোখ দুটো সরু হয়ে এলো, ঠোঁট শক্ত হয়ে জোড়া লাগল। সারাদিনের ক্লান্তির ওপর আবার অভীর নতুন কাণ্ডকারখানার খবর এসে যেন তার মেজাজটাকে আরও বিগড়ে দিল।
‘ অসহ্য কর একটা লোক..!’
নিজের মনেই বিড়বিড় করল আনন্দী।তারপর বিছানার ওপর রাখা ফোনটা হাতে তুলে নিল। স্ক্রিনে পশু নাম খুঁজে পেতে খুব বেশি সময় লাগল না। নামটা দেখেই তার ভ্রু আরও কুঁচকে যায়। এতক্ষণ যে মানুষটার জন্য অন্যের কাছে কথা দিতে হলো, তাকে এখনই সামনে এনে জিজ্ঞেস করা দরকার, সারাদিন ধরে সে আসলে কী কী কাণ্ড করে বেড়াচ্ছে!আনন্দী কল দিল।ওপাশে কয়েকবার রিং হতেই অভী ফোন ধরে,

‘ সোনামণি..’
নিজেকে সামলে নিয়ে আনন্দী বলল, একটু বাড়ি আসতে পারবেন?’
অভীর গলায় সঙ্গে সঙ্গে আনন্দের ছাপ ফুটে উঠল। উচ্ছসিত কন্ঠে বলল, ‘ক্যান? আমারে মিস করতেছ?’
আনন্দী চোখ বন্ধ করে গভীর একটা শ্বাস নিল। এই মানুষটার সঙ্গে কথা বলার সময় তার ধৈর্যের পরীক্ষা কেন প্রতিদিনই দিতে হয়, সে নিজেও জানে না।
‘ একটু বাড়ি আসুন না প্লিজ..!’
কথাটা খুব শান্ত স্বরে বললেও সেই শান্তির নিচে লুকিয়ে থাকা রাগটা অভীর কানে পৌঁছাল না অভীর। বরং সে শুনল শুধু, আনন্দী তাকে বাড়িতে ডাকছে!অভীর মুখ মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
‘এখনই আসতেছি!’

কল কেটে দিয়েই অভী যেন মাটিতে পা রাখতে ভুলে গেল। এতক্ষণকার ক্লান্তি কোথায় উধাও হয়ে গেল কে জানে! আনন্দী নিজে ফোন করে তাকে বাড়িতে আসতে বলেছে, এই আনন্দেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠে।রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে কখনো দুই হাত ছড়িয়ে দুলতে লাগল, কখনো নিজের মনেই গুনগুন করে উঠল। পায়ের চলনেও যেন অকারণ এক ছন্দ এসে গেছে। মনে হচ্ছিল, তাকে কেউ বাড়িতে ডাকেনি, বরং কোনো বিশাল পুরস্কার নিতে যাওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছে।কিছুদূর গিয়ে আনন্দের চোটে একবার ঘুরেও দাঁড়িয়ে গেল অভী। তারপর নিজের মনেই মুচকি হেসে বলল, ‘ বউয়ের ফিলিস জাগছে রে..আজকে সেই খেলা হইবো..!’

উন্মাদনা পর্ব ৫৪

তারপর আবার খুশিতে দুলতে দুলতে হাঁটা দেয় অভী।অভীর মাথায় তখন ছোটু নেই, তার প্যান্ট নেই, চ্যাল কাঠ নেই, এমনকি ছোটুর মায়ের ঝাড়ুও নেই।তার মাথায় শুধু একটাই কথা, আনন্দী তাকে নিজে ফোন করে ডেকেছে।আর এই একটা কারণেই অভীর কাছে আজকের পুরো পৃথিবীটাই যেন হঠাৎ বেশ সুন্দর হয়ে উঠেছে।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই অভী বাড়ি পৌঁছে যায় । পকেট থেকে ডুপ্লিকেট চাবিটা বের করে নিঃশব্দে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই তার চোখ পড়ল আনন্দীর ওপর। হলরুমের সোফায় বসে আছে সে। ক্লান্ত মুখ, এলোমেলো চুল আর চোখেমুখে ঘুমের ছাপ, দেখেই বোঝা যাচ্ছে, প্রচুর ঘুম তার চোখে।
অভী দ্রুত দরজাটা বন্ধ করে দেয়। তারপর নিজের পাঞ্জাবি খুলে ফ্লোরে খুলে হুট করে এসেছে আনন্দীকে কোলে তুলে নেয়..
‘ বলো কই করবা? সোফাতে না-কি খাটে?’

উন্মাদনা পর্ব ৫৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here