Home অভিসৃতি অভিসৃতি পর্ব ২৪

অভিসৃতি পর্ব ২৪

অভিসৃতি পর্ব ২৪
নওরিন কবির তিশা

অদূরবর্তী বৃক্ষশাখার পাখপাখালির গুঞ্জন ভোরের জানান দিচ্ছে। শৈত্যপ্রবাহের পূর্ব ঘোষণা না থাকলেও ঘন কুহেলির আস্তরণের সামনে যৎ-কিঞ্চিৎ তেমন পরিস্থিতিরই সৃষ্টি হয়েছে। ফির-ফিরিয়ে চোরের ন্যায় কক্ষে প্রবেশ করছে মৃদুমন্দ পবন। তাতেই, হালকা কেঁপে উঠলো বিছানায় শায়িত নারীকায়া, সঙ্গে সঙ্গে ভারী পর্দা টেনে দিয়ে কক্ষের উষ্ণতা বাড়িয়ে দিল প্রিয় পুরুষ।
ভোরের নামাজের পর, কপত-কপতী পুনরায় নিদ্রার রাজ্যে পাড়ি জমিয়েছিলোলো। তবে অ্যালার্মের শব্দে, ঘুমটা দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয়নি দূর্জয়ের। তাই আর ব্যর্থ প্রচেষ্টা না করে, কায়রার কথা ভেবে এক কাপ আদা চা বানিয়ে এনে স্ত্রীর শয্যার পাশে বসে, কণ্ঠস্বর যথাসাধ্য কোমল করে ও ডাকলো।

“মাই লাভ?”
ডাকের কারণ বুঝে,কায়রা ক্লান্তিতে ক্ষণকাল অলস হয়ে চাদরখানা আঁকড়ে ধরে পাশ ফিরে শুলো। অস্পষ্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে চোখ বুজেই বিড়বিড় করল,,
“উম্ম… আর একটু ঘুমাই না! ভীষণ ঘুম পাচ্ছে তো!”
দুর্জয় প্রশ্রয়ের হাস্যে কায়রার এলোমেলো চুলগুলো কানে গুঁজে দিয়ে অতি ভালোবাসায় বলল,,
“আর ঘুমালে তো চা টা ঠান্ডা হয়ে জল হয়ে যাবে, মিসেস!”
স্বামীর অনড় কণ্ঠে বাধ্য হয়েই চোখ মিটমিট করে উঠে বসল কায়রা। অলসতা ভাঙার ব্যথায় সামান্য মুখ কুঁচকাতেই দুর্জয় চটপট স্বহস্তে চায়ের কাপটি কায়রার সুকোমল হাতে তুলে দিতেই কায়রা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলল। দুর্জয় ও দিকে চেয়ে শুধাল,,

“খুব বেশি প্রবলেম হচ্ছে কি?”
কায়রা তৎক্ষণাৎ নেতিবাচক মাথা নাড়লো। যাও সামান্য ব্যথার উপদ্রব ছিল সেটা নামাজ শেষে খাওয়া পেইন কিলারে বেশ অনেকটা কমে এসেছে। ও লাজুক হেসে জবাব দিল,,
“উহু, একদম না! এখন বেশ ভালো লাগছে।”
দুর্জয় কায়রার মুখশ্রীর ক্লান্তি মেপে ধীর কণ্ঠে বলল,,
“দ্যাটস গুড! স্টিল, ইফ ইউ ওয়ান্ট টু টেক সাম মোর রেস্ট, তুমি আজকে কিন্তু ঘরেই কন্টিনিউ করতে পারো। নো প্রবলেম!”
কায়রা চটজলদি চায়ের কাপ টেবিলে রেখে ঘড়ির কাঁটায় চোখ বুলালো। বেলা প্রায় সাড়ে আটটা ছুঁইছুঁই। ও তড়িঘড়ি বিছানা ছেড়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে আকুল কণ্ঠে বলল,,
“রেস্টের আর প্রয়োজন নেই! আজকে ভার্সিটিতে দুটো মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস আছে, একদম মিস করা যাবে না। উঠতেই হবে এখনই!”
“ওকে ম্যাম! দেন জলদি রেডি হয়ে নাও। বাট একদম হারি করতে গিয়ে নিজেকে হার্ট কোরো না, বি কেয়ারফুল ওকে?”
“উমম..ওকে।”

“প্লিজ আম্মু এটা আমি খাব না! প্লিজজজজ!”
,
সাজেদা চৌধুরী থালায় পুষ্টিকর সালাদ আর সেদ্ধ সবজির পরিবেশন অব্যাহত রেখে,‌কায়রার ছোটদের মতো অনুনয় ঝরানো কণ্ঠ বিন্দুমাত্র ধাত্তি না দিয়ে বললেন,
“আমাকে বলে লাভ নেই বাবা! এই হেলদি ডায়েটটা কমপ্লিট করতে তোমার বর বলেছে, আমি মাঝখান থেকে কিছু জানি না। যা করার তোমরা হাজব্যান্ড-ওয়াইফ মিটিয়ে নাও!”
কায়রা চরম অসন্তোষে মুখ কুঁচকে দুর্জয়ের দিকে তাকাল। তবে সেই পুরুষালির প্রখর অবয়ব তখন চরম নির্লিপ্ততায় নিজের নাস্তায় ব্যস্ত। কায়রা প্রাত্যহিক সকালে ভাজাপোড়া আর পরোটার তৈলাক্ত স্বাদে অভ্যস্ত, কিন্তু দুর্জয়ের আগমনে তার প্রিয় অভ্যাসে পূর্ণ ছেদ পড়েছে! খানিক পূর্বেও যে মানুষটা অসীম মায়ায় ভরা কোমল ব্যবহার করছিল, সে-ই এখন এমন পাষাণ হয়ে বসে আছে ভেবে কায়রার অন্তরে রাগের পারদ চড়ল।
সোজা আঙ্গুলে ঘি উঠবে না বুঝে ও শয়তানি বুদ্ধির আশ্রয় নিল। ডাইনিং টেবিলের অগোচরে নিজের নূপুরহীন কোমল পা-খানা ও দুর্জয়ের পায়ের দিকে বাড়িয়ে দিল। দুর্জয় নাস্তায় মনোযোগ রেখেই চোখ তুলে চাইতেই কায়রা চোখের ইশারায় সালাদের থালা সরানোর আকুতি জানাল। কিন্তু দুর্জয় তবুও নির্বিকার!

কায়রা এবার দমে না গিয়ে চঞ্চল দুষ্টুমির ছলে নিজের পা-খানা দুর্জয়ের পায়ের ওপর বুলাতে শুরু করল। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সাড়া মিললো না। শেষমেষ যেই না পা-খানা গুটিয়ে নিতে যাবে, অমনি দুর্জয় স্বীয় শক্তিশালী পা দিয়ে কায়রার পা-টিকে নিজের পায়ের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল!
বিস্ফোরিত নেত্রে চাইল কায়রা। দুর্জয়ের ওষ্ঠাধরে কেবল এক ফালি ক্ষুরধার বক্র হাস্যরেখার দেখা মিললো।ও কায়রার চেয়ারটা হালকা টানে নিজের ঘেষটে এনে, টেবিলের ওপারে মগ্ন ইকবাল আহসান ও সাজেদা চৌধুরীর অলক্ষে, হাতটা কায়রার কামিজের সূক্ষ্ম চেরা অংশ দিয়ে ভেতরে গলিয়ে দিল।
দুর্জয়ের বরফশীতল আঙুলের ছোঁয়া কায়রার তনু-উদরে ঠেকতেই মুহূর্তের মধ্যে কাঠের পুতুলের ন্যায় স্তব্ধ হয়ে গেল ও! শ্বশুর-শাশুড়ির সামনে এমন চরম পরিস্থিতিতে নড়ার বা টু শব্দ করার সাধ্যটুকুও রইল না। অন্তরে প্রচন্ড ঝড় আর চরম শঙ্কা নিয়ে মনে মনে আল্লাহর নাম জপতে লাগল ও।
দুর্জয়ের ধীর, অনমনীয় আঙুলগুলো ওর পেটের ওপর ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়ে নাভির অতি নিকটে প্রগাঢ় চাপে স্থির হলো। অতঃপর কায়রার রক্তবর্ণ ধারণ করা কানের কাছে ঝুঁকিয়ে, অতীব নিচু ভরাট ফিসফিসানি স্বরে দুর্জয় বলে উঠল,

“শান্ত নদীকে অহেতুক অশান্ত করার চেষ্টা কোরো না, মিসেস… জোয়ার সামলানোর ক্ষমতা কিন্তু তোমার নেই!”
পরম আধিপত্য মিশ্রিত কন্ঠস্বর; ক্ষণকাল হিমশীতল বরফ খন্ডের ন্যায় জমে গেল কায়রা। ভেতরে চলমান আবেগের উথাল-পাথাল কোনমতে সামাল দিলেও, হৃদস্পন্দন গতি হারিয়েছে বহু আগেই। তা নিয়ন্ত্রণের সাধ্য হলো না, শেষমেষ বাধ্য হয়েই খাবার প্লেটে মনোযোগ দিতে চাইলো ও। তবে দুর্জয়ের হাতটা বড্ড যন্ত্রণা দিচ্ছে!
অসভ্য লোকটা হাত ছড়ানোর নাম গন্ধও নিচ্ছে না! যেন পৈত্রিক সম্পত্তি পেয়েছে। রাগে লজ্জায় মেজাজ হারিয়ে ফেলছে কায়রা। কায়রা কম্পিত হাতে দুর্জয়ের হাতটা স্পর্শ করে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু অটল সামরিক ব্যক্তিত্বের সুদৃঢ় হাত সামান্যতম শিথিল হওয়ার বদলে আরও একটু খামচে ধরে যেন গভীর আধিপত্যের জানান দিল। কায়রা চটজলদি আড়ষ্ট নেত্রে দুর্জয়ের দিকে চাইল; মায়াবী অক্ষিপল্লবের আকুতি দিয়ে বোঝাতে চাইল—আর কখনো এমন ভুল বা দুষ্টুমি করবে না ও।
কিন্তু ক্ষুরধার সৈনিক ক্ষান্ত হওয়ার পাত্র নয়। কায়রাকে সম্পূর্ণ কাবু ও অস্থির করে তুলতে ও, ওর নাভির নিকটবর্তী স্পর্শকাতর স্থানটিতে আলতো সুড়সুড়ি দিয়ে আঙুলগুলো স্লাইড করতে লাগল। কায়রার মনে হলো, ও লজ্জায় আর সহ্যের সীমানায় না পেয়ে এখনই বুঝি কেঁদে ফেলবে!
ঠিক তখনই সাজেদা চৌধুরী আড়চোখে কায়রার এমন লালচে মুখমণ্ডল ও দুর্জয়ের দিকে অপলক চেয়ে থাকা প্রত্যক্ষ করে কৌতূহলী কণ্ঠে শুধালেন,

“কী হলো বাবুই? ওভাবে দুর্জয়ের দিকে চেয়ে আছো কেন? কিছু বলবে?”
ওনার প্রশ্নে তীব্র আতঙ্কে, কায়রা কিছু বলতে যাওয়ার আগেই, দুর্জয় শেষবারের মতো স্বীয় উষ্ণ আঙুলের এক সুগভীর ছোঁয়া দিয়ে হাতটি নিখুঁত কৌশলে বের করে নিল। কায়রার আর এক মুহূর্ত দাঁড়ানোর সাধ্য রইল না। অসন্তোষে ফোলা গাল ও চরম লজ্জায় রঞ্জিত বদনে ও একপ্রকার টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“না আম্মু, কিছু না! আমার… আমার ভার্সিটির দেরি হয়ে যাচ্ছে, আমি আসি!”
কথাটি শেষ করেই ও দ্রুত কদমে নিজ কক্ষের পানে প্রস্থান করল। আর দুর্জয় কায়রার চঞ্চল পলায়ন দেখে ওষ্ঠাধরের কোণে এক ফালি প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ের হাসি ছড়িয়ে নাস্তায় মনোযোগ দিল।

“কি বলিস,একেবারে বিয়ের তারিখ ঠিক করে ফেলল?”
বন্ধু মহলের প্রত্যেকের মুখেই চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট। তূজার কথাটা আপাতত বোধগম্য হচ্ছে না ওদের। গতকাল দেখতে এসেই পরশু বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করার মত পরিবার তূজার নয় কক্ষনো। অন্তত বন্ধু মহলের জ্ঞান সীমানা অনুযায়ী। নিহার বরাবরের ন্যায় জ্ঞানী কন্ঠে বলল,,
“তূজা লিসেন, ফ্যামিলি যেটা করে সেটা আমাদের ভালোর জন্যই করে। আমরা যতদূর জানি, তুই কখনো রিলেশনে জড়াস নি। ইভেন, তোর কোনো পছন্দের ছেলেও নেই। তাহলে শুধু শুধু ঝামেলা করে কি লাভ? আমার মতে আংকেল-আন্টির অবাধ্য হওয়াটা ঠিক না একদমই।”
বাকি চার সদস্যও সম্মতি জানায়।
“ব্যাপারটা তো এমন না যে, আদিল ভাইয়া ভালো কেউ না। তোর কথা অনুযায়ী উনি সরকারি চাকরি করে। বিসিএস ক্যাডার একটা ছেলের কাছে সব বাবা-মা-ই চাইবে তাদের মেয়েকে বিয়ে দিতে। আর তাছাড়া, ওনার তো কোনো পাস্ট রেকর্ডও খারাপ নেই। আর তুই কাউকে পছন্দও করিস না। তাহলে সমস্যা কোথায়?”
কায়রার প্রশ্নের জবাব খুঁজে পায় না তূজা। শূন্য মস্তিষ্ক কেবল এতোটুকুর জানান দেয়, বিয়ে কিছুতেই করতে পারবেনা ও। তবে বন্ধুমহলে যথাপযুক্ত কারণ দেখাতে না পারলে আরো সহস্র প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে এটা ভালো করেই জানা তূজার।

“তোরা বুঝতেছিস না, আমি পড়াশুনা শেষ করতে চাই। তারপর বিয়ে।”
কায়রা অনতিবিলম্বে কথা টেনে সস্নেহে বোঝানোর কণ্ঠে বলল,
“তুই পড়াশোনা নিয়ে এত ভাবছিস কেন তুজা? বিয়ের পরেও তো পড়াশোনা দারুণভাবে কন্টিনিউ করা যায়! এই যে আমি সংসার আর ভার্সিটি দুটোই ব্যালেন্স করছি না? তা ছাড়া তোর শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকেও তো স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছে যে বিয়ের পর তোকে পড়াশোনা করতে কোনো বাধা দেওয়া হবে না। তাহলে অহেতুক সমস্যাটা ঠিক কোথায়, বল তো?”
তুজা অধৈর্য হয়ে অদ্ভুত, এলোমেলো যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করল,
“আরে! তোরা বুঝছিস না কেন? পড়াশোনা করা আর মন থেকে একটা অচেনা মানুষকে হঠাৎ আপন করে নেওয়া তো এক কথা নয়! আমার ক্যারিয়ার নিয়ে অনেক বড় প্ল্যান আছে, এই হুট করে বিয়ে করে সংসার শুরু করলে সব পরিকল্পনা মেসড আপ হয়ে যাবে!”
ওর এসব ঠুনকো বাহানায় বন্ধু মহল যখন প্রচন্ড হতাশ, ঠিক সেই মুহূর্তে,এতক্ষণ যাবৎ নির্মিত থাকা ইভান উঠে দাঁড়ালো। অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্থানের প্রস্তুতি নিতেই, রুশাফ কিছুটা বিস্ময় নিয়ে শুধাল,
“কী রে ইভান, কোথায় যাচ্ছিস? দেখতেই পাচ্ছিস তুজাকে নিয়ে একটা ভীষণ সিরিয়াস আলোচনা চলছে, আর তুই হুট করে উঠে চলে যাচ্ছিস?”

ইভান নিজ নির্লিপ্ত,স্বাভাবিক কণ্ঠ বজায় রেখে সংক্ষেপে জবাব দিল,
“আমার একটা আর্জেন্ট কাজ আছে, এখন যেতে হবে।”
ওর এই আপাত অনাসক্ত আচরণে উপস্থিত সকলেই খানিকটা বিরক্ত হলো। বন্ধু মহলে এমন একটা জটিল পরিস্থিতিতে ইভানের এমন চলে যাওয়াটা যেন একদমই মানানসই ঠেকলো না। তা সত্ত্বেও কেউ আর অনর্থক চাপাচাপি করল না। ইভান শান্ত কদমে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।
ইভানের দূরবর্তী প্রস্থানপথের পানে কায়রা ক্ষণকাল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে, পুনরায় তুজার সাথে আলোচনায় মনোনিবেশ করল।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই ইকবাল আহসানের বিস্তৃত ড্রয়িংরুমের পরিবেশন জমজমাট হয়ে উঠেছে। ধোয়া ওঠা চা আর নাস্তা সামনে রেখে, কায়রা, ইথিকা আর ঊষা তিনজনে বেশ খোশগল্পে মেতেছে। উজান তখনও অফিসিয়াল ঝামেলা চুকিয়ে ফিরেনি, আর দুর্জয়ও একটা জরুরি কাজে বাহিরে গিয়েছে।
গল্পের মাঝপথেই আকস্মিকভাবে ইথিকার চোখের সামনে যেন থোকা থোকা অন্ধকার নেমে এলো। ক্ষণকালের তরে,‌ যেন ঘোরে চক্কর কেটে উঠলো সমস্ত পৃথিবীটা। ও শক্ত করে সোফার হাতল আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামলে নিলো। বছরখানেক ধরে প্রায়শই এমনটা ঘটে বলে ও আর বাড়তি পাত্তা দিলো না, মন ফেরাতে চাইলো কায়রার কথায়।
কিন্তু কায়রার প্রখর দৃষ্টি এড়ালো না ইথিকার এই সাময়িক অস্বস্তি। ও ব্যাকুল হয়ে ঈষৎ ঝুঁকে শুধালো,

“কোনো প্রবলেম হচ্ছে আপু? শরীরটা কি খারাপ লাগছে?”
ইথিকা ঠোঁটের কোণে ঈষৎ মলিন হাসি ফুটিয়ে সামলে নেওয়ার ছলে বললো,
“না কায়া, তেমন কিছু না! সামান্য মাথাটা একটু ঝিমঝিম করে উঠলো আরকি। ইদানিং কাজের বেশ প্রেশার যাচ্ছে তো, তাছাড়া আমার ছোটবেলা থেকেই লো আয়রনের একটা প্রবলেম আছে। সো ইটস নট আ বিগ ডিল!”
পাশেই বসে থাকা ঊষা এবার ইথিকার ফ্যাকাশে মুখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে চেয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে উঠলো,
“না ভাবি, আমার কিন্তু একদম ভালো ঠেকছে না! তোমার চোখ-মুখ কেমন যেন ফুলে গিয়েছে। শরীরটাকে এভাবে অবহেলা করা একদম ঠিক হচ্ছে না।”
কায়রাও পরম সহমর্মিতায় সায় দিয়ে বললো,

“ঊষা ঠিকই বলেছে আপু। আপনার কিন্তু প্রপার একটা হেলথ চেক-আপ করানো উচিত। ছোটখাটো অবহেলা থেকেই তো পরে বড় কোনো জটিলতা তৈরি হয়! কালকেই আপনি একবার ডক্টর দেখিয়ে নিন না প্লিজ?”
ইথিকা ওদের এমন গভীর উদ্বিগ্নতায় কিছু একটা উত্তর সাজাতে যাবে, ঠিক তখনই ছোট্ট কুহু রঙিন একখানা পুতুল হাতে নাচতে নাচতে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলো। আধো-আধো মিষ্টি কণ্ঠে ডেকে উঠলো,
“মাম্মা! দেখো, আমার ডলটা কত্ত সুন্দর!”
ইথিকা মৃদু হেসে কুহুকে কোলে তুলে নিলো, ঊষা আর কায়রাও ব্যস্ত হলো ওকে নিয়ে। ফলাফল স্বরূপ তিনজনের গুরুগম্ভীর স্বাস্থ্য আলোচনার ইতি ঘটলো এখানেই।

আঞ্জুমান ইয়াসিরের হাঁপানির সমস্যা রয়েছে। ঔষধ গুলো সাধারণত বাসাতেই মজুদ থাকে। ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই, কেয়ারটেকার জামাল করিমকে দিয়ে সেগুলো আনিয়ে রাখেন আনোয়ার ইয়াসির। তবে প্রায় সপ্তাহখানেক দেশের বাইরে থাকায়, ব্যাপারটায় ছেদ পড়েছে। যদিও, অস্ট্রেলিয়াতে বসেই পারিবারিক সমস্ত কিছুর দেখভাল করছেন উনি,তবুও ঘটনা ক্রমে এই ব্যাপারটাই হয়তো ভুলে গিয়েছেন ব্যস্ততায়।
কিছু ঔষধ ফুরিয়েছে ঘন্টাখানেক হলো। ব্যাপারটা দেখামাত্রই, ফার্মেসিতে এসেছিলো পায়রা। অবশ্য জামাল করিমকে না বলার কারণ নিজেরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই সংগ্রহ। তাই একবারই বেরিয়েছিল পড়ন্ত বিকেলে। নিজস্ব গাড়ি কখনোই ব্যবহার করেনা ইয়াসির সাহেবের দুই মেয়ে। এ কারণে ঝঞ্ঝাটেও পরে প্রচুর। আজকেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়েই রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে পায়রা। গাড়ির দেখা নেই।সবগুলাই হয় ভিন্ন গন্তব্যের নয় বুক। রাগে-বিরক্তিতে তিরতিরিয়ে চড়ছে মেজাজের পারদ। গতদিন বেশ বৃষ্টি হয়েছিলো। যার ফলে জায়গায় জায়গায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এইযেমন পায়রার বর্তমান অবস্থানের ঠিক সামনেই চৌকোনা গর্তে পানি জমে ছোটখাটো পুকুর হয়ে আছে। এক্ষুনি গাড়ি আসলেই সমস্ত পানি গিয়ে পায়রার উপর পড়বে।
ব্যাপারটা অনুধাবন করে চট জলদি সেখান থেকে সরে আসতে চাইলো পায়রা।আর ঠিক তক্ষুণি কূফার ন্যায় একটা গাড়ি এসে ভাবনাটাকে সত্যি করে ছাড়লো।ভিজে পরে কোনমতে হাতা থাকা জিনিসগুলোকে বাঁচাতে পারল ও।
গাড়িটাকে কিঞ্চিৎ দুরত্বে থামতে দেখেই,ক্রোধাগ্নিতে ফুঁসে উঠে গটগট করে এগিয়ে গেল ও,অচেনা গাড়িটার পানে। চঞ্চল কদমে গাড়ির দরজার কাছে গিয়ে সশব্দে কাচে করাঘাত করল। কাচ নামতেই ভেতরে চালকের আসনে উপবিষ্ট সায়মনকে প্রত্যক্ষ করে পায়রার মেজাজের পারদ যেন মুহূর্তেই চৌদ্দটা ছুঁয়ে ফেলল!
“কোন লেভেলের কানা লোক!মদনের মতো গাড়ি চালিয়ে মানুষের ক্ষতি না করলে পেটের ভাত হজম হয় না,না?”
সায়মন প্রথমে কিঞ্চিৎ লজ্জিত ও কুণ্ঠিত হয়ে নিজের ভুল স্বীকারপূর্বক ‘স্যরি’ বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু পায়রার অযাচিত ঝাঁজালো কথাবার্তা আর উগ্র মেজাজ দেখে সেও উল্টো বেঁকে বসল। ভ্রু কুঁচকে, গাড়ি হতে নেমে হাত দুটো বুকে বাঁধল ও,,

“স্টপ ইট! রাস্তা গাড়ি চলার জন্যই বানানো হয়েছে, জলাবদ্ধতার পাশে ক্যাজুয়াল ওয়াক করার জন্য নয়! আপনি ঠিক কোন আক্কেলে এই কর্দমাক্ত গর্তের এত কাছে দাঁড়িয়েছিলেন, বলতে পারেন?”
পায়রা রাগে ফুঁসে উঠে বলল,
“হোয়াট আ রিডিকুলাস লজিক! গাড়ি আস্তে চালানোর কমন সেন্সটুকুও কি নেই? অসভ্য, অকৃতজ্ঞ একটা লোক! দু-দিন আগে যে মানুষটা আপনাকে মরো-মরো জ্বর থেকে বাঁচাল, আজকে তার সাথে এই আপনার ব্যবহার? থুঃ, আপনার মতো কৃতজ্ঞ মানুষকে হেল্প করাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল!”
“ওহ, রিয়েলি? আমি কি আপনাকে পায়ে ধরে রিকোয়েস্ট করেছিলাম আমাকে বাঁচানোর জন্য? সাহায্য করার পর ক্রেডিট নিয়ে আজীবন বলে বেড়ানো নিশ্চয় আপনার স্বভাব?বাট, প্লিজ এখন ভাঙা ক্যাসেটের মতো বাজা বন্ধকরুন। অসহ্য লাগছে।”
“অসভ্য, হাড়ে বজ্জাত লোক!আপনাকে তো আমি!”
ওদের তীব্র বাকবিতণ্ডায় অচিরেই আশপাশের বেশ কিছু পথচারী আর উৎসুক লোক জড়ো হয়ে গেল। পায়রা পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে আনতে এবং সায়মনকে চরম শিক্ষা দিতে অমনি কান্নার ভান করে উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠল,

“দেখুন তো ভাইয়েরা! এই অসভ্য লোকটা আমাকে ইভটিজিং করছে! উল্টো আমাকেই নানাভাবে থ্রেট দিচ্ছে! আপনারা এর একটা বিচার করুন!”
পায়রার আকুল আবেদন আর ক্রন্দনরত রূপ দেখে ক্ষিপ্ত জনতা মুহূর্তেই সায়মনকে ঘিরে ধরল। গণপিটুনির মতো অনভিপ্রেত আশঙ্কায় সায়মনের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল সহসা। নিজেকে তড়িঘড়ি রক্ষা করতে সে হাত তুলে জনতাকে উদ্দেশ্য করে দ্রুত গতিতে বানিয়ে বলল,
“আরে আরে! আপনারা রিল্যাক্স করুন, ভাই সব! ইট’স জাস্ট আ পার্সোনাল ফাইটিং! ও আমার ক্লোজ ফ্রেন্ড, আমাদের মাঝে একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে তাই রেগে গিয়ে এমন চাইল্ডিশ বিহেভ করছে! গড প্রমিস, এমন কোনো সিন নেই, আপনারা প্লিজ যান!”

জনতা সন্দিগ্ধ চোখে কিছুক্ষণ উভয়ের পানে চেয়ে ধীর পায়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। বিপদ কাটতেই পায়রা সায়মনের দিকে ক্ষিপ্ত চাউনি হেনে পুনশ্চ বকাঝকা শুরু করতে চাইল। কিন্তু সায়মন আর এক মুহূর্ত কালক্ষেপণ না করে একপ্রকার জোর করেই পায়রার কবজি আঁকড়ে ধরে টেনে এনে নিজের গাড়ির সামনের প্যাসেঞ্জার সিটে বসিয়ে দিল! শক্ত হাতে দরজার লকটি চেপে ধরে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“চুপচাপ বসে থাকুন! আপনার সব পেনাল্টি আমি মিটিয়ে দিচ্ছি আজ!”
গাড়ি সোজা গিয়ে থামল শহরের নামীদামী এক শপিং কমপ্লেক্সের সম্মুখে। পায়রাকে মুখ ঘুরিয়ে অনড় হয়ে বসে থাকতে দেখে সায়মন নিজের জেদে অনড় থেকে একাই দ্রুত শপিং মলে প্রবেশ করল। মিনিট দশেক বাদেই বিশাল দুটো এক্সপেনসিভ ব্র্যান্ডের ড্রেসের ব্যাগ নিয়ে ফিরে এলো সে। পায়রার কোলের ওপর রুক্ষ ভঙ্গিতে ব্যাগগুলো ছুড়ে মেরে অহংকারী গলায় বলল,

“আপনার একটা কাপড় নষ্ট হয়েছে, বদলে ডাবল ব্র্যান্ডেড ড্রেস দিয়ে দিলাম! নাউ জাস্ট শট ইয়োর মাউথ! আর কোথায় কত টাকার ড্যামেজ হয়েছে বলুন? ডাইরেক্ট ক্যাশ পেনাল্টি দিয়ে দিচ্ছি!”
কথাটি বলেই সায়মন পকেট থেকে চামড়ার ওয়ালেটটি বের করতে গেল। সায়মনের এই তীব্র অর্থের অহংকার ও দাম্ভিক আচরণ পায়রার আত্মসম্মানে চরম আঘাত হানতেই ও ক্ষুব্ধ চোখে চেয়ে হাত দিয়ে সায়মনের ওয়ালেটটি সজোরে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে তীব্র ধিক্কারে বলে উঠল,
“আমাকে কি আপনার ফকিন্নি মনে হয়, ইডিয়ট? নিজে একটা জঘন্য ভুল করে এখন টাকার গরম দেখাচ্ছেন? আমার বাবার কী পরিমাণ প্রোপার্টি আর ব্যাংক ব্যালেন্স আছে, তার বিন্দুমাত্র ধারণা আছে আপনার? আপনার এই ফালতু অহংকার আর বিশ্রী ড্রেস নিজের কাছেই রাখুন!”
পায়রার এমন প্রখর ও আত্মসংযমী কথাবার্তায় সায়মন মুহূর্তের জন্য আক্ষরিক অর্থেই স্থাণু হয়ে গেল। কোনো প্রতিউত্তরের সুযোগ না দিয়েই পায়রা গাড়ির লক খুলে স্বদর্পে নেমে পড়ল।

ঊষারা চলে গিয়েছে কিছুক্ষণ হলো। সাজেদা চৌধুরীর সঙ্গে খানিক গল্প করে কক্ষে এসেছে কায়রা। দুর্জয় ফেরেনি এখনো। নিস্তব্ধ কক্ষে, পূর্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে টেবিল হাতের ফোনটা হাতে তুললো কায়রা। কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে, অতঃপর কল করলো কাঙ্খিত নম্বরে। দু একবার রিং হতেই অপরপ্রান্ত হতে ভেসে আসলো কাঙ্খিত কণ্ঠস্বর,,
“বল?”
কায়রার প্রথমবারেই প্রশ্নটা করতে মন চাইলো না। তবে অপরপক্ষকে বড্ড তাড়াহুড়োয় দেখে না পারতে প্রশ্নটা করেই বসলো ঝটপট,,
“ডু ইয়্যু লাইক তূজা?”
মুহূর্তেই হয়তো হতভম্ব হওয়া উচিত ছিল অপর পক্ষর। অন্তত, কায়রা সেটাই আশা করেছিল। কিন্তু অপর পাশ থেকে ইভান সোজাসাপ্টা জবাব দিল,,

“নো!”
কিন্তু ব্যাপারটা কিছুতেই বিশ্বাসযোগ্য ঠেকলো না কায়রার, পুনশ্চ শুধালো,,
“সত্যি বল ইভু। তুই অন্তত আমার কাছ থেকে কিছু কখনো সিক্রেট করিস না। বলনা এটাও। বিশ্বাস করিস না আমাকে? প্লিজ ভাই! শুধু একবার আমাকে বলে দেখ। সবটা ঠিক করে দিব আমি।”
“কি করবি তুই কায়া? সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে!”
কায়রার কন্ঠ সন্দিহান হলো,,“ তার মানে তুই ভালবাসিস?”
এবার আর অস্বীকার করতে পারল না ইভান। গতবারের প্রশ্ন ছিল পছন্দ নিয়ে, সেটা অস্বীকার করা যায় নিঃসন্দেহে। কেন না ওতো পছন্দ করে না, ভালোবাসে। একদম পাগলাটে প্রেমিকের মতো ভালোবাসে। কিন্তু, পছন্দের মত ভালবাসার কথাটা কি অবলীলায় অস্বীকার করা যায় নাকি? নৈঃশব্দ্যের মাঝে কেবল ওর কাশির শব্দ শুনতে পেল কায়রা।

“তুই স্মোক করছিস ইভু?”
মোক্ষম সময় মোক্ষম প্রশ্ন করেছে ও। তবুও বরাবরের ন্যায় নির্লিপ্ত হয়েই জবাব দিলো ইভান,,
“হ্যাঁ!”
কায়রা এবার চরম বিচলিত হয়ে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে উঠল,
“ফর গডস সেক, ইভান! তুই অন্তত আমার কাছে পুরো ব্যাপারটা শেয়ার করতে পারতিস! মেয়েটাকে আড়াল থেকে এভাবে ভালোবেসে গেলি, অথচ আমাদের কাউকে একটাবার জানানোর প্রয়োজনবোধ করিসনি? এমনকি তুই তো কখনো আমার থেকে কিছু লুকাসনি রে, ইভু! আজকে সব জেনেও তুই এভাবে নীরব থাকবি?”
ইভান অপর প্রান্ত হতে এক দীর্ঘ বিষণ্ণ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। সিগারেট ধোঁয়ার রাশি ছাড়তে ছাড়তে অত্যন্ত নিস্পৃহ,ভারী গলায় বলল,

“জানিয়ে কী হতো, কায়রা? ও তো অন্য কাউকে পছন্দ করে, অন্য কারও যোগ্য। আমার এই একপাক্ষিক আবেগ দিয়ে তো আর ওর জীবনটা আটকে রাখা যায় না। এখন যখন ওর পরিবার ওর বিয়ে ঠিক করেই ফেলেছে, তখন মাঝখান থেকে আমি কোনো ঝঞ্ঝাট তৈরি করতে চাই না।”
“আরে গাধা! ও কাউকে পছন্দ করে না! তুই একবার সোজা গিয়ে বললেই তো সব সমাধান হয়ে যায়! আমি তোকে বলছি তো, ও নিজের মুখে বলেছে ওর কোনো পছন্দ নেই! প্লিজ ইভান, এভাবে নিজের অনুভূতিগুলোকে বিসর্জন দিস না!”
ইভান আর কোনো কথা বাড়াল না। সংক্ষেপে কেবল বলল,
“অনেক দেরি হয়ে গেছে কায়রা।”
কথাটা শেষ হওয়া মাত্রই ফোনটি কেটে গেল। কায়রা স্তব্ধ হয়ে কান থেকে ফোনটা নামিয়ে ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। বুকের গহীনে এক প্রকাণ্ড দুশ্চিন্তার ভার চেপে বসতেই কপালে হাত দিয়ে গভীরভাবে চিন্তায় তলিয়ে গেল ও। যে করেই হোক এই সমস্যার সমাধান বের করতেই হবে। নিজের সবচেয়ে ভালো দুজন বন্ধুর সঙ্গে কখনোই খারাপ কিছু হতে দিতে পারবে না ও।

কক্ষে প্রবেশ মাত্র দৃষ্টি ঠেকল টেবিলের ওপর রাখা একগুচ্ছ শুভ্র কাঠ গোলাপ আর তার পাশে রাখা গাজরাটায়। অনিন্দ্য দৃষ্টিতে প্রফুল্ল চিত্তে এগিয়ে গিয়ে ফুলগুলো আলতো হাতে ছুঁয়ে দিল কায়রা। হঠাৎ ওয়াশরুম থেকে দূর্জয়কে বের হতে দেখে চটজলদি ফুলগুলো হাতে তুলে নিয়ে দুর্জয়ের সম্মুখে গিয়ে দাঁড়িয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে নিচু গাঢ় স্বরে শুধাল,
“ফুলগুলো কি আপনি এনেছেন, মেজর?”
দুর্জয় কায়রার প্রফুল্ল চঞ্চল মুখশ্রীর পানে ক্ষণকাল নিঃশব্দে চেয়ে রইল। কাজ সেরে ফিরতি পথের মোড়ে ফুলগুলো দেখেই হুট করে ওর সম্মুখে এক জোড়া চঞ্চল দৃষ্টি ভেসে উঠেছিল। তাই জীবনে প্রথমবার, গম্ভীর পুরুষটাকে ফুলের বাজারে দেখা গিয়েছিল। গোলাপ বেলি কিংবা অন্যান্য ফুল ছাড়িয়ে এটা যেন একটু বেশিই আকর্ষণ করছিল ওকে।
“ইয়েস! আজ ফেরার পথে জ্যামে আটকে ছিলাম। লোকাল এক ভেন্ডরের কাছে হুট করেই চোখে পড়ল। অ্যান্ড দেন…. ভাবলাম, নিয়ে যাই।”
কায়রা শুভ্র ফুলগুলোর গভীর সুবাস অক্ষিপল্লব বুজে আঘ্রাণ করে বলল,
“ইয়্যু নো? এটা আমার মোস্ট ফেভারিট ফুল! থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ, মেজর!”
দুর্জয় তোয়ালেটি একপাশে রেখে, সামান্য ভ্রু উঁচিয়ে শুধাল,

“লাইকড ইট?”
কায়রা চটপট মাথা নেড়ে বলল,
“ভীষণ! অনেক বেশি পছন্দ হয়েছে।”
দুর্জয় মৃদু হাসলো। অতঃপর টাওয়াল টা যথাস্থানে রেখে ঘুরে দাঁড়াতেই আবদার করে বসলো কায়রা, গাজরাটা এগিয়ে দিয়ে বলল,,
“নিন, পরিয়ে দিন তো। ”
গম্ভীর সৈনিকের কঠিন আননে ঈয়ত্তা করা কঠিন সেই দ্বিধার ভাব। বেশ অপ্রস্তুত হয়ে ও বলল,,
“আই ডোন্ট নো হাউ টু ডু দিস, কায়রা!”
“আরে, ট্রাই করেই দেখুন না! না চেষ্টা করলে পারবেন কী করে?”
কথাটি শেষ করেই ও চটপট সুকোমল হাত দিয়ে পেছনের দীর্ঘ কৃষ্ণকেশগুচ্ছ একত্র করে হাতখোঁপায় বেঁধে নিল। অতঃপর প্রগাঢ় অনুরাগে দুর্জয়ের দিকে পিঠ ফিরে দাঁড়াল,
“নিন, এবার পরিয়ে দিন!”

দুর্জয় কিছুক্ষণ নির্বিকার দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু প্রিয়তমার এমন অবাধ্য আবদার রক্ষা না করে উপায়ান্তর নেই। ও ধীর কদমে কায়রার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল। সুদৃঢ় হাতে পরম যত্নে স্নিগ্ধ গাজরাটি তুলে নিল। সৈনিকের যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষুরধার হাত দুটো আজ যেন প্রিয়ার চুলে ফুলের মালা গুঁজতে গিয়ে ঈষৎ অপটু, অনভ্যস্ত হয়ে উঠল।
কয়েকবার ব্যর্থ চেষ্টার পর অবশেষে নিখুঁতভাবে গাজরাটি কায়রার চুলে গেঁথে দিল ও। অতঃপর কায়রার ঘাড়ের কাছে নুয়ে পড়ে ধীর ভরাট কণ্ঠে বলল,,
“ইজ ইট অলরাইট,?”
কথাটি শেষ হওয়ামাত্রই কায়রা চটজলদি ঘুরে দুর্জয়ের সুদৃঢ় বক্ষস্থলে আছড়ে পড়ল! দু-হাত দিয়ে ওর গলা শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে, নিজের পা-খানা দুর্জয়ের জুতো জোড়ার ওপর তুলে ঈষৎ উঁচিয়ে উঠল। অতঃপর্ দুর্জয়ের প্রকাণ্ড চিবুকে পরম অনুরাগে স্বীয় ওষ্ঠাধর ঠেকিয়ে এক মিষ্টি,উষ্ণ চুমু এঁকে দিল!
দুর্জয়ের শার্ট আঁকড়ে ধরে চঞ্চল বিড়ালছানার মতো আলতো করে নাক ঘষে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,,
“আই থিংক, আপনার প্রেমে একদম ওই, বেপরোয়া প্রেমিকার মতো হয়ে ছন্নছাড়া গিয়েছি আমি। আপনি কাছে এলেই ন্যাকামি করতে মন চায়! হালাল প্রেম বুঝলেন তো? জোরটা একটু বেশি-ই!”

অভিসৃতি পর্ব ২৩

দুর্জয় আলতো হাতে ওর কোমরে হাত পেঁচিয়ে কপালে চুমু আঁকলো। বুকে জড়িয়ে ভরাট কণ্ঠে বল,,
“দেন জা্স্ট বি ইয়োরসেলফ! নিজের অভ্যাসের পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন নেই। তুমি, তোমার অভ্যাস সবকিছু মঞ্জুর করা হলো। যেভাবে খুশি জীবনকে উপভোগ করো। ডোন্ট ওয়ারি,অলওয়েজ প্রটেক্ট করার জন্য এই বুকটা তো আছেই।”

অভিসৃতি পর্ব ২৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here