Home আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৩২ (২)

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৩২ (২)

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৩২ (২)
সাবিলা সাবি

কেবিনের নীরবতায় বসে দুর্ধর্ষ সিআইডি অফিসারটি অনেকক্ষণ ধরে কোমায় আচ্ছন্ন অপরাধী নারীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে নারী নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে তাকে মৃত্যুর মুখ থেকে সরিয়ে আনতে ছুটে গিয়েছিল, আজ সেই নারীই মৃত্যুর সঙ্গে নিঃশব্দ লড়াই করছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এই দৃশ্যটা দেখার পরও তার মনে রাগ কিংবা পুরোনো কোনো অভিযোগ ফিরে আসছে না; বরং বারবার একটা অস্বস্তিকর সত্য তার চিন্তার ভেতর জায়গা করে নিচ্ছে—যে মানুষটাকে পৃথিবী একবার মৃত বলে মেনে নিয়েছিল, কোনো এক অদৃশ্য নিয়তিতে সে আবার ফিরে এসেছিল। তাহলে কি এবার সত্যিই তার জীবনে মৃ*ত্যুর সময় এসে গেছে?
ভাবনাটা বুকের ভেতর ছু*রি চালানোর মতো অনুভূতি তৈরি করল লিওনের।
সে আর নিজেকে দূরে রাখতে পারল না। চেয়ারটা ধীরে ধীরে বিছানার আরও কাছে টেনে নিয়ে শরীরটা সামান্য ঝুঁকিয়ে আ/হত ক্রিমিনাল নারীর কানের কাছে মুখ নিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল,

“আরেকবার বাঁচবে? শুধুমাত্র আমার জন্য?”
হিয়ার কাছ থেকে কোনো উত্তর এলো না। নিঃশ্বাসের সঙ্গে বুকের সামান্য ওঠানামা ছাড়া সেই মুখে কোনো পরিবর্তন নেই। তবু লিওন থামল না। এতদিন যে কথাগুলো মুখে আনতে পারেনি, আজ যেন সেগুলো বলার জন্যই এই নীরব কেবিন তাকে সুযোগ দিয়েছে।
“তুমি তো বলেছিলে, তুমি আমাকে ভালোবাসো। বলেছিলে, আমাকে অন্য কারও কখনোই হতে দেবে না। তাহলে আজ কেন আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চাইছ?”
তার কণ্ঠের দৃঢ়তাটুকু ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে এলো।
“আমি চাই তুমি আবার আমাকে বিরক্ত করো। সারাদিন জ্বালাতন করো, আমার মাথা গরম করে দাও, আমার সামনে এসে এমন সব কাণ্ড করো যাতে আমি তোমার ওপর রাগ করতে বাধ্য হই। শুধু এই একটা কাজ করো—চোখ খুলে আবার আমাকে সেই পুরোনো ঝামেলার মধ্যে টেনে নাও।”
শেষ কথাটার সঙ্গে নিজের অজান্তেই লিওনের ঠোঁটে সামান্য হাসি ফুটেছিল, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে জমে থাকা আতঙ্কটা লুকানো গেল না।
কয়েক মুহূর্ত সে চুপ করে রইল। তারপর নিস্তেজ হয়ে থাকা নারীর মুখের দিকে তাকিয়ে এমন এক সিদ্ধান্তের কথা বলল, যেটা লিওনের নিজের কাছেই শেষ অস্ত্রের মতো শোনাল।

“লাস্ট ওয়ারনিং দিলাম।” কণ্ঠটা এবার স্পষ্টভাবেই কেঁপে উঠল।
“তুমি যদি না ওঠো, তাহলে আমি সত্যি এবার মায়াকে বিয়ে করে নেব।”
কথাটা বলার পর নিজেই কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে থাকল সে। নিজের বলা কথাটার প্রতিক্রিয়া নিজেই বুঝতে চাইছে। কিন্তু বিছানায় শুয়ে থাকা নারীটি কোনো উত্তর দিল না।
দুর্ধর্ষ সিআইডি অফিসারটির বুকের ভেতর জমে থাকা শক্ত আবরণটা এবার আরও খানিকটা ভেঙে গেল। সে বুঝতে পারছিল না, এই হুমকি সত্যিই কোনো কাজে আসবে কি না; তবু তার মনে হচ্ছিল, হয়তো মস্তিষ্কের কোথাও সেই দুর্ধর্ষ নারী তার কথা শুনছে। হয়তো কোমার অন্ধকারের মধ্যেও তার কণ্ঠটা পৌঁছে যাচ্ছে।
সে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে বিছানার পাশে রাখা নিস্তেজ হাতটার কাছে থামল। ছুঁতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত থেমে গেল। কিছু সম্পর্কের নাম দেওয়ার আগেই মানুষ বুঝে ফেলে, তার কাছে অন্যজন কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আর আজ সেই সত্যিটাই সবচেয়ে বেশি ভয় দেখাচ্ছে তাকে।
কারণ এতদিন সে ভেবেছিল, আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই দুর্ধর্ষ নারীকে হারালে তার জীবন আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
আজ প্রথমবার মনে হচ্ছে—সে নারী যদি সত্যিই আর ফিরে না আসে, তাহলে স্বাভাবিক বলে যে জীবনটাকে সে চিনত, সেটাও হয়তো আর কখনো ফিরে আসবে না।

কোমার গভীর অন্ধকারে তখন হিয়া নিজেকে একটা কুয়াশায় ঘেরা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। চারপাশে কোনো পরিচিত পথ নেই, নেই শহরের আলো কিংবা আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই চেনা অন্ধকার; শুধু সাদা কুয়াশার ভেতর দূরে কয়েকটি অবয়ব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
হিয়া স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার বাবা-মা আর ছোট ভাই।
যে মুখগুলোকে সে বছরের পর বছর শুধু স্মৃতির ভেতর খুঁজে ফিরেছে, আজ তারা সত্যিই তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। হিয়ার চোখ ভিজে উঠল। সে ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে কাঁপা গলায় বলল,
“আব্বু… আম্মু…”
কথাটা বলতেই এতদিনের জমে থাকা কষ্ট যেন একসঙ্গে গলা বেয়ে উঠে এলো।
“আমি ওই আয়মান আর আসাদ খানকে মেরে ফেলেছি। তোমাদের জন্য যে প্রতিশোধ নিয়েছিলাম, সেটা শেষ করেছি। কিন্তু তোমার ওপর লাগা কলঙ্কের দাগটা মুছতে পারিনি, আব্বু।”
হিয়া মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল তারপর পুনরায় বললো—“এই পৃথিবী এখনো তোমাকে খারাপ মানুষ হিসেবেই জানে। সবাই এখনো মনে করে, ইশতিয়াক খান একজন আদর্শ সিআইডি অফিসার হয়েও আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আমি সত্যিটা প্রমাণ পারিনি।”

কণ্ঠটা ক্রমশ ভেঙে আসছিল হিয়ার। “আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি পারিনি…”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে চোখ তুলে বাবা-মায়ের দিকে তাকাল।
“তার আগেই মৃত্যু আমার দুয়ারে চলে এসেছে। মনে হয় এবার সে আমাকে তোমাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে এসেছে। তাই আমি চলে এসেছি। দেখো, তোমাদের মেয়ে এখন থেকে তোমাদের কাছেই থাকবে।”
কাঁপা কাঁপা গলায় কতগুলো বলতে থাকলো হিয়া—
“আমি তখন সেই নূজহাত হিয়া ছিলাম, যে নিজের চোখের সামনে তোমাদের মরতে দেখেও কিছু করতে পারেনি। কিন্তু আজ আমি যে ভাইপার… যদি এই আমি সাত বছর আগেই থাকতাম, তাহলে তোমাদের এমন পরিণতি কখনো হতো না।”
বুকের ভেতর জমে থাকা অপরাধবোধ এবার আর সামলাতে পারল না সে।

“এই ভারটা আমি আর বইতে পারছি না। পৃথিবীতে আমার আর বেঁচে থাকার কোনো কারণ নেই। আমার তো কেউ নেই… তোমরাই তো ছিলে আমার সবকিছু।”
হিয়া কুয়াশার ভেতর দাঁড়িয়েই দুহাত বাড়িয়ে দিল।
“আমাকে তোমাদের কাছে নিয়ে যাও।”
ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর।
“হিয়া, যেও না।”
হিয়া থমকে গেল। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখতে পেল, ঘন কুয়াশার আড়াল থেকে একজন এগিয়ে আসছে।
দুর্ধর্ষ সিআইডি অফিসার লিওন। আজ তার মুখে সেই পরিচিত কঠোরতা নেই। চোখজোড়ায় আজ শুধু অসহায় অনুরোধ।
“তুমি তো বলেছিলে তুমি আমাকে ভালোবাসো। তাহলে আমাকে রেখে কেন চলে যাচ্ছ?”
হিয়া স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে তারপর বললো—“তুমি তো আমাকে ভালোবাসো না।”
কণ্ঠে অভিমান আর ভাঙা বিশ্বাসের মিশ্রণ ফুটে উঠলো তার “তুমি আমাকে ঘৃণা করো। তোমার চোখে আমি একজন আন্তর্জাতিক অপরাধী ছাড়া আর কিছুই নই।”
সে আবার বাবা-মায়ের দিকে ফিরতে চাইল।

“তাই আমাকে যেতে দাও।”
কিন্তু পা বাড়ানোর আগেই তার বাবা হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন।
“আসিস না, হিয়া।”
হিয়া থমকে দাঁড়ালো।
“আসিস না।”
ইশতিয়াক খানের কণ্ঠে কঠোরতা নেই, আছে গভীর একট মমতা।
“তোকে বাঁচতে হবে। তুই আবার বাঁচবি, মা। তবে এবার আর কোনো প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য নয়। আমাদের হারানোর বোঝা বুকে নিয়ে নয়।”
তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “এবার নিজের জন্য বাঁচবি। এতগুলো বছর অন্য সবার জন্য লড়েছিস। এই একবার নিজের জন্য বেঁচে দেখ হিয়া।”
হিয়ার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি গড়িয়ে পড়ল।

“আব্বু…”
কিন্তু তার ডাকের কোনো উত্তর এলো না। মা এগিয়ে এসে মেয়ের দিকে মমতাভরা চোখে তাকালেন। ছোট ভাইটিও যেন নীরবে তাকে আশ্বস্ত করল। পরের মুহূর্তেই তিনটি পরিচিত অবয়ব ধীরে ধীরে কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে যেতে শুরু করল।
“না!”
হিয়া ছুটে গেল তাদের দিকে।
“আব্বু! আম্মু! অন্তর!”
কিন্তু তার হাত শুধু শূন্য কুয়াশা ছুঁয়ে ফিরে এলো।
চারপাশে আর কেউ নেই। হিয়া অসহায়ের মতো এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। তার চোখের পানি আর থামল না। বছরের পর বছর শক্ত হয়ে থাকা সেই দুর্ধর্ষ অপরাধীনি এবার নিজের ভেতরের ছোট্ট মেয়েটার মতো কেঁদে উঠল।
“আমাকে রেখে যেও না…”
কণ্ঠটা কান্নায় ভেঙে যাচ্ছিল বারবার। ঠিক তখনই পেছন থেকে আবার সেই কণ্ঠটা ভেসে এলো।
“হিয়া…”
সে ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল। দুর্ধর্ষ সিআইডি অফিসারটি এখনো সেখানে দাঁড়িয়ে। কণ্ঠটা এবার আরও কাঁপল লিওনের।

“আমি তোমাকে শেষবারের মতো বলছি। তুমি যদি ফিরে না আসো, তাহলে কিন্তু আমি সত্যিই অন্য কারও হয়ে যাব। মায়াকে বিয়ে করে নেব।”
কথাটা কুয়াশায় দাঁড়িয়ে থাকা হিয়ার বুকের ভেতর সরাসরি আঘাত হানলো। কয়েক মুহূর্ত সে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুগুলো গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। তারপর হঠাৎ যেন সমস্ত দ্বিধা ভেঙে গেল।
সে ছুটে গেল লিওনের দিকে। পরক্ষণেই শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে।
এমনভাব আঁকড়ে ধরলো মনে হলো এই মানুষটাকে ছেড়ে দিলেই তার পৃথিবীটা আবার অন্ধকারে ডুবে যাবে; এতক্ষণ যে মৃত্যুর দিকে পা বাড়াচ্ছিল সে, সেই মৃত্যুর হাত থেকে শেষ মুহূর্তে জীবনের দড়িটাই আঁকড়ে ধরেছে হিয়া।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে—
বাস্তবের হাসপাতালের কেবিনে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে থাকা হিয়ার চোখের কোণ বেয়ে ধীরে ধীরে একটি উষ্ণ অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল।
পাশে বসে থাকা লিওনের চোখ হঠাৎ সেই অশ্রুর ওপর আটকে গেল। এক মুহূর্তের জন্য তার নিঃশ্বাস থেমে গেল।

“হিয়া…?”
সে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে তাকাল।
“ডক্টর!”
তার কণ্ঠে এবার শুধু উৎকণ্ঠা ছিল না—ছিল বহুক্ষণ পর ফিরে পাওয়া একফোঁটা আশাও। নার্স ছুটে এলো। মনিটরের দিকে তাকিয়ে দ্রুত ডাক্তারকে খবর দিল।
কয়েক মুহূর্ত পর ডাক্তার এসে পরীক্ষা শুরু করতেই নার্স ধীরে বলল,
“স্যার, এবার আপনাকে বাইরে যেতে হবে। আমাদের শেষ একটা চেষ্টা করতে হবে।”
লিওন আর কোনো কথা বলল না। ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়েও একবার থেমে গেল। বেডের ওপর শেষবারের মতো তাকাল কোমায় থাকা নিস্তেজ মুখটার দিকে।
হিয়ার চোখের কোণে তখনও সেই অশ্রুবিন্দুর চিহ্নটা স্পষ্ট। আর তারপর দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
আর কেবিনের ভেতর শুরু হলো—জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা শেষ লড়াই।
দরজা বন্ধ হতেই কেবিনের ভেতরের পরিবেশটা মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল।
কয়েকজন চিকিৎসক দ্রুত হিয়ার চারপাশে অবস্থান নিলেন। মনিটরের পর্দায় ওঠানামা করা হৃদস্পন্দনের রেখার দিকে একজন চিকিৎসক চোখ রাখলেন, আরেকজন তার শ্বাস-প্রশ্বাস ও অক্সিজেনের মাত্রা পরীক্ষা করতে শুরু করলেন।

“সাচুরেশন কত?”
“নব্বইয়ের নিচে নেমে যাচ্ছে, ডাক্তার।”
“অক্সিজেন সাপোর্ট বাড়ান। এয়ারওয়ে সিকিউর করুন।”
নার্স দ্রুত নির্দেশ পালন করল।
হিয়ার মাথায় গুরুতর আঘাতের কারণে মস্তিষ্কে চাপ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। চিকিৎসক তার চোখের মণির প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করলেন, রক্তচাপ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক সূচকগুলো পর্যবেক্ষণ করলেন।
“পিউপিল রেসপন্স?”
“খুব স্লো।”
ডাক্তারের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হলো।
“নিউরোসার্জারি টিমকে এখনই কল করুন। আর ব্রেনের নতুন স্ক্যান লাগবে।”
একজন নার্স সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই হিয়াকে পর্যবেক্ষণের জন্য প্রস্তুত করা হলো। মাথার ভেতরে কোনো রক্তক্ষরণ বেড়েছে কি না কিংবা মস্তিষ্কের ফোলা কতটা—সেটা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
স্ক্যানের রিপোর্ট হাতে আসার পর নিউরোসার্জন দীর্ঘ কয়েক মুহূর্ত ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“ইনজুরি গুরুতর,” তিনি নিচু গলায় বললেন। “ব্রেইনে প্রচণ্ড ট্রমা হয়েছে। এখন মূল লক্ষ্য হলো ব্রেইন প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং আরও ক্ষতি ঠেকানো।”

“সার্জারি লাগবে?”
প্রশ্নটা শুনে তিনি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না।
“এই মুহূর্তে সবচেয়ে আগে তার ভায়টাল সাইন স্থিতিশীল রাখতে হবে। যদি চাপ বা রক্তক্ষরণের মাত্রা এমন পর্যায়ে যায় যেখানে অস্ত্রোপচার ছাড়া উপায় থাকে, তখন আমাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
ওষুধ দেওয়া শুরু হলো। মাথার ভেতরের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চিকিৎসকরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালিয়ে গেলেন। একই সঙ্গে তার রক্তচাপ, অক্সিজেন, হৃদস্পন্দন এবং স্নায়বিক অবস্থার ওপর সারাক্ষণ নজর রাখা হলো।
কেউ এক মুহূর্তের জন্যও কেবিন ছাড়ল না।
সময় এগিয়ে যাচ্ছিল।
এক ঘণ্টা।
দুই ঘণ্টা।
তবুও হিয়ার চোখ বন্ধ। শরীরটা নিস্তব্ধ, অথচ তার ভেতরে তখন অদৃশ্য একটা যুদ্ধ চলছে।
হঠাৎ মনিটরের রেখায় সামান্য পরিবর্তন দেখা গেল।
নার্স দ্রুত স্ক্রিনের দিকে তাকাল।

“ডাক্তার…”
চিকিৎসক এগিয়ে এসে মনিটর পরীক্ষা করলেন।
“ভাইটাল সাইন কিছুটা স্টেবল হচ্ছে।”
কেউ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল না। কারণ তারা জানে, এই অবস্থায় কয়েক মিনিটের উন্নতি মানেই বিপদ কেটে যাওয়া নয়।
নিউরোসার্জন ধীরে বললেন, “আমরা এখনো নিরাপদ জায়গায় নেই। তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। আগামী কয়েক ঘণ্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
কেবিনের বাইরে তখনও কাঁচের ওপারে দাঁড়িয়ে আছে সেই দুর্ধর্ষ সিআইডি অফিসার। তার চোখ একবারও দরজা থেকে সরছে না। ভেতরে চিকিৎসকরা জীবন বাঁচানোর লড়াই করছেন।
আর বাইরে একজন মানুষ নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে—যে কয়েক ঘণ্টা আগেও ভাবেনি, একজন অপরাধীর জন্য তার বুকের ভেতর এতটা ভয় জন্মাতে পারে।
কিন্তু আজ তার কাছে হিয়া কোনো অপরাধী নয়।
আজ সে শুধু একজন মানুষ, যাকে হারানোর কথা ভাবলেই তার নিজের ভেতরটা অজান্তেই শূন্য হয়ে যাচ্ছে।
চিকিৎসকদের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা তখনও থামেনি। কেবিনের ভেতর একের পর এক চিকিৎসা প্রক্রিয়া চলছে, মনিটরের নিরন্তর শব্দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চিকিৎসকরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন কোমায় থাকা নারীটিকে মৃত্যুর কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনতে।

কাঁচের দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুর্ধর্ষ সিআইডি অফিসারের চোখ এক মুহূর্তের জন্যও ভেতরের বিছানা থেকে সরে যাচ্ছিল না। কিছুক্ষণ আগেই সে নিজের জীবন বাজি রেখে এই কেবিনে ঢুকেছিল। এখন দূর থেকে দাঁড়িয়ে শুধু অপেক্ষা করা ছাড়া তার আর কিছুই করার নেই।
ঠিক তখনই করিডোরে হঠাৎ কয়েকজন মানুষের দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেলো। লিওন শব্দের দিকে তাকাতেই তার দৃষ্টি থমকে গেল।
অন্ধকারের মতো কঠিন মুখ, চোখে অস্থির আগুন—
আন্ডারওয়ার্ল্ডের কিং—দানিয়েল এগিয়ে আসছে।
তাকে দেখেই লিওন বুঝে গেল, আর এক মুহূর্তও এখানে থাকা যাবে না। এই মানুষটি তাকে এখানে দেখতে পেলে পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নিতে পারে, আর এই মুহূর্তে কোনো সংঘাতের সুযোগ নেই। বিশেষ করে সেই মানুষটির জীবন যখন কয়েক হাত দূরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে।
শেষবারের মতো কাঁচের ওপারে তাকাল সে। তারপর নিঃশব্দে সরে গিয়ে নিজের কেবিনের দিকে ফিরে গেল।
দানিয়েল এগিয়ে এসে সরাসরি কেবিনের সামনে থামল। ভেতরে চিকিৎসকদের ব্যস্ততা দেখে তার মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল।
কিছুক্ষণ পর একজন চিকিৎসক বাইরে এসে তার দিকে তাকালেন। দানিয়েল এক পা এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“ও এখন কেমন আছে?”
চিকিৎসক শান্ত স্বরে বললেন, “এই মুহূর্তে ওনার রেসপন্স ভালো। আমরা চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি এবং এখন পর্যন্ত শরীর চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছে। তাই সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে।”
দানিয়েলের চোখ কাঁচের ওপারে স্থির হয়ে গেল।
“পুরোপুরি?”
“এখনই নিশ্চিত করে বলা যাবে না। মাথায় গুরুতর আঘাত রয়েছে, তাই ঝুঁকি এখনো আছে। তবে আশার জায়গাটা আমরা হারাইনি।”
কথাটা শুনে দানিয়েলের মুখের কঠোরতা সামান্য নরম হলো।
চিকিৎসক আরও বললেন, “এই সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আমাদের দিক থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আপনাদের এখন যেটা করতে হবে, সেটা হলো সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করা। চিকিৎসা আমরা করব, বাকিটা তাঁর হাতে।”

দানিয়েল কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু দীর্ঘ কয়েক মুহূর্ত কাঁচের ওপারে তাকিয়ে রইল। বিছানায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকা মুখটা যেন তার সমস্ত কঠোরতা এক মুহূর্তে নিঃশব্দ করে দিয়েছে।
তারপর হঠাৎ সে পেছনে ফিরে ইভানা আর মার্কের দিকে তাকাল।
“তোমরা এখানে থাকবে।”
ইভানা মাথা নাড়ল। দানিয়েলের কণ্ঠ এবার আরও কঠিন হয়ে উঠল।
“এক পাও নড়বে না এখান থেকে। আমি আসছি।”
মার্ক কিছু বলার আগেই দানিয়েল ঘুরে দাঁড়াল।
কোনো ব্যাখ্যা দিল না। কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে—সেটাও বলল না। শুধু দ্রুত পায়ে করিডোর ধরে এগিয়ে গেল সে।
ইভানা আর মার্ক দুজনেই তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

অন্যদিকে নিজের কেবিনে ফিরে গিয়েও সিআইডি অফিসারের মন পড়ে রইল সেই কাঁচের দরজার ওপারে—যেখানে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে নিঃশব্দে শুয়ে আছে সেই আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুর্ধর্ষ অপরাধী নারী।
কালো একটা গাড়ি ছুটে চললো শহরের হাইওয়েতে। গাড়িটা এসে থামল লন্ডনের পুরোনো এক চার্চের সামনে।
দরজা খুলে নামার পর কয়েক মুহূর্ত সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল অন্ধকার জগতের সম্রাট। তার চোখ চলে গেল চার্চের উঁচু দেয়াল আর ক্রুশের দিকে। কত বছর হয়ে গেছে এই জায়গায় পা রাখেনি, তার হিসাবও হয়তো এখন আর মনে নেই। একসময় যে মানুষটা নিয়মিত এখানে আসত, প্রার্থনার সময় মাথা নত করত, আজ সেই মানুষটাই বছরের পর বছর ধরে এই দরজা থেকে দূরে থেকেছে।
কারণ সময় তাকে বদলে দিয়েছে।

জীবন তাকে এমন এক পথে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে ভালো-মন্দের হিসাব অনেক আগেই মুছে গেছে। ক্ষমতা, প্রতিশোধ আর রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে সে নিজের একটা সাম্রাজ্য তৈরি করেছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের মানুষগুলো তাকে ভয় পায়, তার একটা নির্দেশে শহরের অন্ধকার দিকের অসংখ্য দরজা খুলে যায়। তার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস খুব কম মানুষেরই আছে।
কিন্তু আজ সেই মানুষটার চোখে কোনো ক্ষমতার ছাপ নেই। আজ সে শুধু একজন মানুষ।
হিয়ার নিস্তেজ মুখটা বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। হাসপাতালের সেই বিছানায় শুয়ে থাকা মেয়েটার জন্যই আজ এত বছর পর সে আবার এই দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
সে জানে, হিয়ার ধর্ম আর বিশ্বাস তার থেকে আলাদা। তবু তাতে কী আসে যায়?
সৃষ্টিকর্তার কাছে পৌঁছানোর পথ আলাদা হতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের অসহায় প্রার্থনা কি আলাদা হয়ে যায়?
আর এক মুহূর্তও না ভেবে সে চার্চের ভেতরে প্রবেশ করল। ভেতরে তখন গভীর নীরবতা। দূরে কয়েকটি মোমবাতির আলো জ্বলছে। ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সে যিশুর মূর্তির সামনে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণ কোনো কথা বের হলো না তার মুখ থেকে।
যে মানুষটা জীবনে অসংখ্য কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার সামনে মৃত্যুও বহুবার মাথা নত করেছে, সেই মানুষটার ঠোঁট আজ কাঁপছিল।
শেষ পর্যন্ত সে ধীরে ধীরে মাথা নত করল।

“আমি জানি, আমি পবিত্র মানুষ নই।”
কণ্ঠটা নিচু আর ভারী শোনালো।
“আমি জানি আমি এমন অনেক কিছু করেছি, যেগুলোর ক্ষমা হয়তো আমার প্রাপ্য নয়। আমি এমন একটা জীবনে আছি, যেখান থেকে ফিরে আসার পথও হয়তো আমার জন্য আর খোলা নেই।”
সে কিছুক্ষণ থামল। চোখ বন্ধ করতেই হাসপাতালের সেই কেবিনটা আবার মনে পড়ল।
“কিন্তু আজ আমি নিজের জন্য কিছু চাইতে আসিনি।”
তার কণ্ঠ এবার আরও নরম হয়ে গেল।
“ওকে বাঁচিয়ে দিন।”
দুই হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সে।

“ওর ওপর যত রাগ, যত অভিমান, যত হিসাব আছে—সব আমার কাছ থেকে নিয়ে নিন। শুধু ওকে ফিরিয়ে দিন। ও লাইফে অনেক কষ্ট পেয়েছে। এবার ওকে বাঁচতে দিন। নিজের জন্য বাঁচতে দিন।”
কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর সে আবার ফিসফিস করে বলল,
“আমি জানি না আপনি আমার কথা শুনবেন কি না। তবু আজ এত বছর পর আপনার সামনে দাঁড়িয়ে একটা কথাই চাইছি—ওকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যাবেন না।”
চার্চের নীরবতার মধ্যে তার কণ্ঠটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। যে মানুষটার নাম শুনলেই আন্ডারওয়ার্ল্ডের মানুষগুলো সতর্ক হয়ে যায়, আজ সে-ই মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে একজন অসহায় মানুষ হয়ে।
হিয়াকে বাঁচানোর জন্য তার কাছে আজ ক্ষমতা, টাকা কিংবা অস্ত্র—কোনোটারই মূল্য নেই। আজ তার একমাত্র ভরসা প্রার্থনা।
প্রার্থনা শেষ হলেও সে সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে সরে গেল না। অনেক বছর পর সৃষ্টিকর্তার সামনে দাঁড়িয়ে আজ প্রথমবার নিজের জন্য কিছু না চেয়ে অন্য কারও জীবন চেয়েছে সে। তাই উত্তর না পেলেও মাথা নিচু করে আরও কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।

প্রায় সাত ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে।
হাসপাতালের দীর্ঘ করিডোরে বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল। সাদা দেয়ালজুড়ে দিনের শেষ আলো এসে পড়েছে, অথচ করিডোরের পরিবেশে দিনের কোনো উষ্ণতা নেই। চারপাশে চিকিৎসক, নার্স আর নিরাপত্তারক্ষীদের নিয়মিত চলাচল থাকলেও একটি কেবিনকে ঘিরে, আলাদা একটা নীরবতা তৈরি হয়ে আছে।
সেই কেবিনেই কোমায় শুয়ে আছে হিয়া—লন্ডনের আন্ডারওয়ার্ল্ডে যার পরিচয় একজন দুর্ধর্ষ ক্রিমিনাল হিসেবে। পুলিশের চোখে সে বহু অপরাধের সঙ্গে জড়িত, আর অন্ধকার জগতের মানুষদের কাছে সে এমন এক নাম, যার উপস্থিতিই যথেষ্ট ছিল পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ বদলে দেওয়ার জন্য। অথচ আজ সেই একই মানুষটা হাসপাতালের বিছানায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে; চারপাশে যন্ত্রের শব্দ, শরীরে অসংখ্য চিকিৎসা-সরঞ্জাম, আর প্রতিটি মুহূর্ত তার বেঁচে থাকার সঙ্গে লড়াই করছে।

কেবিনের বাইরে নিরাপত্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ইভানা ও মার্ক। অনুমতি ছাড়া সেখানে কারও প্রবেশের সুযোগ নেই। কারণ হিয়া শুধু একজন রোগী নয়, সে একজন বিপজ্জনক অপরাধী; তার শত্রুর সংখ্যা যেমন কম নয়, তেমনি তার চারপাশের প্রতিটি ঝুঁকিও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি।
আর সেই কারণেই CID-এর একজন অভিজ্ঞ অফিসার হয়েও তাকে শেষবারের মতো দেখতে যাওয়ার সুযোগ পেল না লিওন।
চিকিৎসকরা অবশেষে লিওনকে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ করে দিয়েছে। দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের পর এখন তাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য তার পরিবার এসে পৌঁছেছে। হাসপাতালের নিচে গাড়ি অপেক্ষা করছে, পরিবারের সদস্যরা তার ফেরার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু হাসপাতাল ছাড়ার আগে তার পা যেন বারবার থেমে যেতে চাইছিল সেই কেবিনের দিকেই।
একজন CID অফিসার হিসেবে সে জানে, নিয়ম ভাঙা যাবে না। জানে, নিরাপত্তার কারণটাও অযৌক্তিক নয়। তবু একজন অফিসারের সমস্ত যুক্তির আড়ালে আজ একজন মানুষের অসহায় অপেক্ষা লুকিয়ে আছে।
সে আরেকবার হিয়াকে দেখতে চেয়েছিল।
কোমায় থাকা সেই মেয়েটার মুখটা একবার চোখের সামনে দেখতে চেয়েছিল, শুধু নিশ্চিত হতে চেয়েছিল যে সে এখনও লড়ছে, এখনও বেঁচে আছে।
কিন্তু সুযোগ হলো না।

করিডোরের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে সে কিছুক্ষণ কেবিনের বন্ধ দরজাটার দিকে তাকিয়ে রইল। দরজার ওপাশে হিয়া আছে, অথচ এতটা কাছাকাছি থেকেও তার কাছে পৌঁছানোর কোনো পথ নেই।
শেষ পর্যন্ত তাকে চলে আসতেই হলো।
হাসপাতালের প্রধান দরজার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময়ও তার দৃষ্টি বারবার পেছনে ফিরে যাচ্ছিল। একজন CID অফিসারের জন্য এই শহরের অপরাধীদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কঠিন কিছু নয়; গুলির সামনে দাঁড়ানো, বিপদের মুখোমুখি হওয়া কিংবা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করাও তার কাজের অংশ। কিন্তু নিজের অজান্তেই যার জন্য বুকের ভেতর এতটা অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার বন্ধ কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে অসহায় হয়ে থাকা—এই অনুভূতিটা তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত।

গাড়ির কাছে পৌঁছেও সে একবার থামল।
দূরের হাসপাতাল ভবনটার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর খুব নিচু স্বরে নিজের কাছেই বলল,
“আবার আসব আমি।”
কথাটা কাউকে শোনানোর জন্য নয়। হয়তো হিয়াও শুনতে পাচ্ছে না। তবু সে জানে, এই বিদায়টা শেষ নয়।
আজ একজন CID অফিসার হাসপাতাল ছেড়ে যাচ্ছে, কিন্তু একজন মানুষ তার সমস্ত ব্যস্ততা, দায়িত্ব আর পৃথিবীর সমস্ত নিয়মের মাঝেও সেই কোমায় থাকা অপরাধী মেয়েটার কাছে ফিরে আসার একটা কারণ রেখে যাচ্ছে।
হিয়া জানে না। হয়তো জানবেও না। তবু সে আবার আসবে।
অন্যদিকে চোখের কোণে জমে থাকা সামান্য আর্দ্রতা হাতের পিঠ দিয়ে মুছে নিয়ে চার্চ থেকে বেরিয়ে এল দানিয়েল। বাইরের ঠান্ডা বাতাস মুখে লাগতেই কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। লন্ডনের আকাশ তখন মেঘে ঢাকা। চারপাশের শহর নিজের নিয়মে ছুটে চলেছে, অথচ তার কাছে পৃথিবীটা যেন হঠাৎ থেমে গেছে।
গাড়িতে উঠে বসার পরও সে কিছু বলল না।
ড্রাইভার গাড়ি চালিয়ে দিল। জানালার বাইরে একের পর এক রাস্তা, আলো আর ব্যস্ত মানুষ পেছনে পড়ে যেতে লাগল। কিন্তু তার চোখে সেসবের কিছুই ধরা পড়ছিল না। বারবার শুধু একই মুখটা মনে পড়ছিল—হিয়ার নিস্তেজ মুখ।

একজন মানুষ, যে এতদিন মৃত্যুকে চোখে চোখ রেখে দেখেছে, আজ প্রথমবার বুঝতে পারছিল, নিজের হাতে সবকিছু থাকা সত্ত্বেও কিছু কিছু মুহূর্তে মানুষ কতটা অসহায় হয়ে যায়।
তার কাছে টাকা আছে, ক্ষমতা আছে, মানুষ আছে, অস্ত্র আছে। কিন্তু একটা বন্ধ চোখ খুলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা নেই।
গাড়ি হাসপাতালের সামনে এসে থামতেই সে কোনো কথা না বলে দ্রুত নেমে গেল। হাসপাতালের করিডোরে ঢোকার পরই একজন ডাক্তার তার দিকে এগিয়ে এলেন।
তার হাঁটার গতি থেমে গেল। ডাক্তারের মুখের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে চেষ্টা করল, খবরটা কেমন।
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর ডাক্তার শান্ত গলায় বললেন,
“উনি এখন আউট অব ডেঞ্জার।”

কথাটা শুনে এতক্ষণ শক্ত হয়ে থাকা মুখে খুব সামান্য স্বস্তি ফুটে উঠল। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
“তবে জ্ঞান কখন ফিরবে, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। আগামী চব্বিশ ঘণ্টা গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে জ্ঞান ফিরে আসতে পারে, আবার আরও সময়ও লাগতে পারে।”
সে কোনো উত্তর দিল না। শুধু কাঁচের ওপাশে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর সে ধীরে ধীরে কাঁচের কাছ থেকে সরে এল দানিয়েল। আজ তার হাতে করার মতো আর কিছু নেই। তাই শুধু অপেক্ষা করতে হবে।
চব্বিশ ঘণ্টা। একটা দীর্ঘ, অনিশ্চিত চব্বিশ ঘণ্টা।
আর সেই অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্তে তার মনে পড়তে থাকবে চার্চের সামনে বলা নিজের সেই একমাত্র প্রার্থনাটা—ওকে বাঁচিয়ে দিন।

পরেরদিন সকাল।
চব্বিশ ঘণ্টার অপেক্ষা অবশেষে শেষ হয়েছে, কিন্তু সেই অপেক্ষার সঙ্গে যে অস্থিরতা জড়িয়ে ছিল, তার কোনো শেষ যেন এখনও আসেনি। হাসপাতালের কেবিনে সকালের ম্লান রোদ জানালার কাচ ভেদ করে ধীরে ধীরে মেঝের ওপর নেমে এসেছে। পর্দার ফাঁক দিয়ে আসা আলোয় হিয়ার নিস্তেজ মুখটা আরও ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল। পাশে রাখা মনিটরের নিয়মিত শব্দই শুধু জানান দিচ্ছিল, তার শরীর এখনও নিঃশব্দে লড়াই করে যাচ্ছে।
দরজা খুলে ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করল দানিয়েল।
গতকাল চার্চ থেকে ফিরে আসার পর থেকে তার মুখে যে কঠিন স্থিরতা ছিল, আজও তার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। আন্ডারওয়ার্ল্ডের মানুষটির অভ্যাসই এমন—নিজের ভেতরে যত বড় ঝড়ই উঠুক, তার সামান্য আঁচও মুখের ওপর পড়তে দেয় না। বহু বছর ধরে ক্ষমতা, বিপদ আর মৃত্যুর সঙ্গে বসবাস করতে করতে নিজের অনুভূতিগুলোকে সে এমনভাবে আড়াল করতে শিখেছে যে, তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই কোন খবর তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয় আর কোনটা তার কাছে নিছক আরেকটি ঘটনা।
কিন্তু হিয়ার বেডের কাছে এসে সেই স্থির মানুষটির পায়ের গতি থেমে গেল। কিছুক্ষণ সে কোনো কথা না বলে তাকিয়ে রইল।

হিয়া এখনও চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, অথচ এই নিস্তব্ধ মুখটাই যেন গত চব্বিশ ঘণ্টা ধরে তার সমস্ত চিন্তার কেন্দ্র হয়ে আছে। সে জানে না, কতবার এই একই মুখটা দেখার জন্য তার দৃষ্টি অজান্তে ফিরে এসেছে। জানে না, কতবার মনে হয়েছে—যদি চোখ দুটো হঠাৎ খুলে যায়!
চেয়ারটা টেনে বেডের পাশে বসে পড়ল দানিয়েল।
ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে আবার চোখ রাখল হিয়ার মুখে। সময় এগিয়ে চলল নিজের নিয়মে, কিন্তু সে নড়ল না। কেবিনের নীরবতার সঙ্গে সঙ্গে তার অপেক্ষাটাও মিশে গেল।
তারপর হঠাৎ হিয়ার আঙুল সামান্য কেঁপে উঠল।
দানিয়েলের দৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে সেদিকে চলে গেল।

কয়েক মুহূর্ত পর আবার নড়ল আঙুলগুলো। এবার সে অজান্তেই চেয়ার থেকে সামান্য সামনে ঝুঁকে এল। এতক্ষণ যে মানুষটি পাথরের মতো স্থির হয়ে বসেছিল, তার চোখে প্রথমবারের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠল অপেক্ষার তীব্রতা।
হিয়ার চোখের পাতায় ধীরে ধীরে কাঁপন উঠল।
দানিয়েলের বুকের ভেতরটা অকারণে শক্ত হয়ে এল। বহু বিপজ্জনক মুহূর্তেও যে মানুষ নিজের শ্বাসের গতি হারায় না, সেই মানুষটাই আজ একটি চোখের পাতা ওঠার অপেক্ষায় নিঃশব্দ হয়ে বসে রইল।
সে খুব নিচু স্বরে ডাকল, “হিয়া?”
হিয়ার কাছ থেকে কোনো উত্তর এল না। আবার চোখের পাতায় কাঁপন উঠল। এবার ধীরে ধীরে খুলে গেল চোখ দুটো।

প্রথমে আলোটা হিয়ার চোখে অসহ্য লাগল। সে আবার চোখ বন্ধ করে ফেলল। কয়েক মুহূর্ত পর আরও ধীরে চোখ মেলতেই চারপাশের দৃশ্য তার কাছে ঝাঁপসা লাগলো।
ঝাঁপসা সাদা ছাদ, মৃদু আলো, যন্ত্রের শব্দ—সবকিছুই অচেনা অথচ পরিচিত লাগছিলো হিয়ার।
তারপর পাশে থাকা মানুষটির দিকে চোখ গেল হিয়ার।
প্রথমে শুধু একটা ঝাপসা অবয়ব দেখতে পেলো হিয়া।

মস্তিষ্ক তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি তার। বাস্তবতা আর স্বপ্নের মাঝখানে তার চেতনা এখনও দুলছে। কয়েক মুহূর্ত আগেও সে অন্য এক জগতে ছিল, যেখানে লিওন ছিল তার একেবারে কাছে; যেখানে সে কোনো ভয় ছাড়াই তাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল, যেন সেই মানুষটাকে ছেড়ে দিলেই আবার সবকিছু হারিয়ে যাবে।
সেই স্বপ্নের শেষটুকু তখনও হিয়ার চোখে লেগে ছিল।
তাই সামনে বসে থাকা অবয়বটাকেও সে লিওন বলেই মনে করল। অচেতন ঘোরে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে দিল হিয়া। তার আঙুল গিয়ে ছুঁয়ে গেল সামনে থাকা মানুষের গালে।
দানিয়েল স্থির হয়ে গেল। হিয়ার স্পর্শ এতটাই স্বাভাবিক ছিল যে তাতে কোনো দ্বিধা ছিল না, কোনো সংকোচও ছিল না। সে জানত না কাকে ছুঁয়ে আছে। হয়তো তার চোখ এখনও তাকে অন্য কারও অবয়ব দেখাচ্ছে।
তবু সেই অচেতন স্পর্শ দানিয়েলের ভেতরে এমন একটা অনুভূতির দরজা খুলে দিল, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে সে নিজেই এতদিন অবগত ছিল না।

তার গালের ওপর হিয়ার আঙুল ধীরে ধীরে ছুঁয়ে দিতে লাগলো।। দানিয়েল চাইলে হাতটা সরিয়ে দিতে পারত।
কিন্তু পারল না। বরং খুব স্বাভাবিক এক অজুহাতের মতো করে হিয়ার হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখলো। আঙুলের চাপ ছিল সামান্য যাতে মনে হয় অসুস্থ মানুষটাকে শুধু আশ্বস্ত করছে। অথচ নিজের কাছেই সে জানত, এই স্পর্শটা ছেড়ে দিতে তার বড্ড এক অনীহা হচ্ছে।
সে কণ্ঠটা যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,
“রিল্যাক্স। এত তাড়াহুড়ো করে উঠতে হবে না। আস্তে আস্তে ওঠো।”
হিয়া তার কণ্ঠ শুনল, কিন্তু পুরোপুরি বুঝতে পারল না। ধীরে ধীরে আরো ভালো করে চোখটা মেলে তাকাল সামনে থাকা মানুষটির দিকে।

এবার ঝাপসা অবয়বটা পরিষ্কার হতে শুরু করেছে।
প্রথমে মুখের রেখা। তারপর চুল। আর সবশেষে চোখ।
একজোড়া তীক্ষ্ণ ল্যাভেন্ডার চোখ। হিয়ার দৃষ্টি সেখানে গিয়ে থেমে গেল।
পরিচিত সেই চোখ দুটো দেখার সঙ্গে সঙ্গে তার ঘোর কেটে গেল। স্বপ্নের মানুষ আর বাস্তবের মানুষ যে এক নয়, সেটা বুঝতে তার আর বেশি সময় লাগল না।
এগুলো লিওনের চোখ নয়। সামনে বসে থাকা মানুষটি লিওন নয়।
এটা তার বস—আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই মানুষ, যার নামের সঙ্গে ক্ষমতা, ভয় আর অন্ধকার জগতের অসংখ্য গল্প জড়িয়ে আছে।

হিয়ার শুকনো ঠোঁট সামান্য নড়ল। দুর্বল কণ্ঠে বিস্ময় মিশিয়ে সে বলল, “বস… আপনি?”
দানিয়েল কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। হিয়ার চোখে ফিরে আসা চেতনার ছাপটা সে নীরবে লক্ষ্য করল, হিয়া সঙ্গে সঙ্গে নিজের হাতটা দানিয়েলের গাল থেকে সরিয়ে আনতে চাইলো কিন্তু পারলো না কারন দানিয়েলের হাত তখনও তার হাতের ওপর ধরে
রাখা। দানিয়েল নিজের গাল থেকে হিয়ার হাতটা সরতে দিলো না। তারপর মুখের ভাব না বদলিয়ে শান্ত গলায় বলল, “দ্বিতীয়বার।”
হিয়া কথাটার অর্থ বুঝতে না পেরে দুর্বল চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। দানিয়েল একটু পেছনে হেলান দিয়ে বসে ধীরে ধীরে বলল,

“সাত বছর আগে যখন প্রথমবার কোমা থেকে উঠেছিলে, তখনও চোখ খুলে প্রথম আমাকে দেখেছিলে।”
কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠে কোনো বিশেষ আবেগ ছিল না। কিন্তু শেষ কথাটা বলার আগে সে হিয়ার চোখের দিকে একবার গভীরভাবে তাকাল।
“আর আজ দ্বিতীয়বার চোখ খুলে… কাকে দেখবে বলে আশা করেছিলে?”
কেবিনের বাতাসটা মুহূর্তের জন্য ভারী হয়ে গেল।
হিয়া কোনো উত্তর দিল না। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধা ফুটে উঠল, তারপর সে দানিয়েলের দৃষ্টি এড়িয়ে অন্যদিকে তাকাল। প্রশ্নটার উত্তর তার জানা, কিন্তু এই মুহূর্তে সেটা উচ্চারণ করার মতো শক্তি তার নেই—হয়তো ইচ্ছেটাও নেই।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সে প্রসঙ্গ বদলে খুব আস্তে বলল, “ইভানা ওরা কোথায়?”
দানিয়েল তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। প্রশ্নটা যে ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, সেটা বুঝতে তার এক মুহূর্তও লাগল না। তবু সে কোনো মন্তব্য করল না।
বরং ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বেডের পেছনের বালিশটা ঠিক করে দিল। “আগে ঠিকমতো বসো।”
হিয়া নিজে উঠে বসার চেষ্টা করতেই শরীরের কোথাও ব্যথা উঠল। তার মুখটা সঙ্গে সঙ্গে কুঁচকে গেল।
দানিয়েল এক মুহূর্ত দেরি না করে তার কাঁধে হাত রেখে তাকে সামলে দিল। “ধীরে। তোমার শরীর এখনও দুর্বল।”
বালিশটা ঠিক করে দেওয়ার পর টেবিল থেকে পানির গ্লাস তুলে নিল সে। গ্লাসটা হিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল,“পানি খাও।”

হিয়া দুর্বল হাতে গ্লাসটা ধরল। তার আঙুলগুলো কাঁপছিল বলে দানিয়েল কয়েক মুহূর্ত গ্লাসের নিচটা ধরে রাখল, যতক্ষণ না সে নিজে সামলে নিতে পারল।
হিয়া ধীরে ধীরে পানি খেল। দানিয়েল তখন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো অভিযোগ নেই। শুধু সেই পরিচিত স্থিরতা।
তবু তার নিজের ভেতরে গত কয়েক মিনিটের একটা দৃশ্য বারবার ফিরে আসছে—হিয়ার অচেতন হাত, তার গালে এসে থেমে যাওয়া আঙুল, আর সেই স্পর্শের পর নিজের অজান্তে হাত বাড়িয়ে দেওয়া।
সে জানে না, সেই মুহূর্তে ঠিক কী অনুভব করেছিল।
শুধু এটুকু জানে, অনুভূতিটা তার পরিচিত কোনো অনুভূতির মতো ছিল না। তাই সেটার কোনো নামও সে দিল না। নামহীন কিছু অনুভূতিকে কখনো কখনো নাম না দিয়েই বাঁচিয়ে রাখা যায়। আর দানিয়েল ঠিক সেটাই করল।হিয়ার দিকে তাকিয়ে তার মনে শুধু একটাই কথা এলো— গতকাল চার্চে সে যে প্রার্থনা করেছিল, তার উত্তর অন্তত আপাতত সে পেয়ে গেছে।

হিয়া চোখ খুলেছে। বাকি কথাগুলো সময়ই একদিন বলে দেবে।
হিয়া গ্লাসের শেষটুকু পানিও ধীরে ধীরে শেষ করে বিছানার পাশে রেখে দিল। শরীরটা এখনও ভারী লাগছে, মাথার ভেতরেও যেন কুয়াশা জমে আছে, তবু এতক্ষণে একটা বিষয়ই তার কাছে সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে। সে দানিয়েলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আমাকে কবে ডিসচার্জ দেবে?”
ঠিক সেই সময় কেবিনের দরজা খুলে ডাক্তার ভেতরে প্রবেশ করলেন। হাতে থাকা রিপোর্টগুলো একবার দেখে তিনি হিয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
“এত তাড়াতাড়ি বাড়ি যাওয়ার কথা ভাবছেন?”
হিয়া একটু বিরক্ত মুখে বলল, “আর কতদিন থাকতে হবে এখানে?”
ডাক্তার বিছানার পাশে এসে রিপোর্টগুলো দেখলেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন, “আপনার শরীর এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। এতক্ষণ কোমায় থাকার পর হঠাৎ উঠে বসেছেন, তার ওপর শরীর যথেষ্ট দুর্বল। তাই অন্তত কয়েকদিন আপনাকে এখানে পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে। ভালোভাবে বিশ্রাম নিতে হবে, নিয়মিত পরীক্ষা হবে। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে তারপর ডিসচার্জের কথা ভাবা যাবে।”
হিয়া সঙ্গে সঙ্গে মুখ কুঁচকে ফেলল। “কয়েকদিন?”
তার কণ্ঠে এমন একটা বিরক্তি ফুটে উঠল, যেন ডাক্তার তাকে কয়েকদিন হাসপাতাল নয়, কয়েক বছর কারাগারে থাকার সাজা শুনিয়েছেন।

“আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে এখানে। আমি আজকেই টাউন হাউসে ফিরতে চাই।”
ডাক্তার কিছু বলার আগেই দানিয়েল এতক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা জায়গা থেকে উঠে দাঁড়াল।
তার মুখে কোনো রাগ নেই, কণ্ঠেও কোনো উত্তেজনা নেই। বরং সেই শান্ত স্বরটাই হিয়াকে বুঝিয়ে দিল, সিদ্ধান্তটা নিয়ে তার সঙ্গে তর্ক করার কোনো সুযোগ নেই। “তুমি রেস্টে থাকবে।”
হিয়া তার দিকে তাকাল। দানিয়েল দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে আবার বলল,“এখান থেকে কোথাও যাবে না।”

কথাটা বলে সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দরজা খুলে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা মিলিয়ে যেতেই হিয়া কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ হয়ে রইল।
ডাক্তার তখনও পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি হিয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন। “আপনি এখন সত্যিই বিশ্রাম নিন। শরীরের অবস্থা আপনার ধারণার চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল।”
হিয়া আর কিছু বলল না। চোখটা অন্যমনস্কভাবে জানালার দিকে চলে গেল।
কিছুক্ষণ আগেও হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য তার ভেতরটা অস্থির হয়ে উঠছিল। কিন্তু এখন সেই অস্থিরতার কারণটা আরও পরিষ্কার হয়ে গেল।
লিওন।

হিয়ার বুকের ভেতর হঠাৎ একটা চাপ অনুভূত হলো।
সে জানে না লিওন এখন কেমন আছে। জানে না সে হাসপাতালেই আছে কি না, নাকি তাকে ছেড়ে দিয়েছে। কোমায় থাকা অবস্থায় সে অনেক যুদ্ধ করেছে নিজের সাথে তবে তার কেনো যেনো মনে হচ্ছে লিওন ছিলো তার পাশে সে লিওনের কন্ঠটাও শুনেছিলো।
লিওন কেমন আছে, সেটা তাকে জানতেই হবে।
শুধু খবর নিলে হবে না। তাকে দেখতে হবে।
আজই।
হিয়া ধীরে ধীরে বিছানায় একটু সোজা হয়ে বসল। শরীর দুর্বল, মাথা ভারী, তবু চোখের দৃষ্টিতে সেই পুরোনো জেদটা ফিরে এসেছে। ডাক্তার তাকে কয়েকদিন বিশ্রাম নিতে বলেছেন।
দানিয়েল বলে গেছে কোথাও যাওয়া যাবে না।
কিন্তু হিয়া নিজের মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।
হাসপাতালের এই ঘরে শুয়ে থেকে সে অপেক্ষা করবে না। লিওনকে একবার নিজের চোখে না দেখা পর্যন্ত তার শান্তি হবে না।

বিকেলের দিকে লিওনের ফোনটা বেজে উঠল।
বাড়ির নীরবতা ভেঙে হঠাৎ বেজে ওঠা ফোনের শব্দে সে সোফা থেকে উঠে বসল। শরীর এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়। হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার পর থেকেই পরিবারের সবাই তাকে বিশ্রামে থাকতে বলেছে। চিকিৎসকরাও একই পরামর্শ দিয়েছেন।
কিন্তু ফোনের ওপাশ থেকে যখন CID হেডকোয়ার্টারে আসতে বলা হলো, তখন বিশ্রামের কথাটা আর মাথায় রইল না।

ACP নিজেও তাকে বাড়িতে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন খুব জরুরী কাজ পড়েছে তাই তাকে ফোন করা হলো আর লিওন জানে, তার পেশা শুধু একটা চাকরি নয়। এই শহরের অন্ধকার দিকের মানুষগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর যে দায়িত্ব সে নিয়েছে, সেটা নিজের ক্লান্তি কিংবা শরীর খারাপের অজুহাতে পাশে সরিয়ে রাখা তার স্বভাবে নেই।
বাবা-মা তাকে থামানোর চেষ্টা করলেন। বোনও বলল, এত দ্রুত কাজে ফেরার কোনো প্রয়োজন নেই।
কিন্তু লিওন কারও কথাই শুনল না। জ্যাকেটটা গায়ে চাপাতে চাপাতে শুধু বলল, “আমাকে যেতে হবে। বেশি সময় লাগবে না।”

শিরিন হায়াস উদ্বিগ্ন চোখে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুই এখনও পুরোপুরি সুস্থনা বাবা।”
লিওন জুতোর ফিতা বাঁধতে বাঁধতে মৃদু হেসে বলল,
“আমি ঠিক আছি।”
কথাটা বললেও সে নিজেই জানে, পুরোপুরি ঠিক নেই।
তবু দায়িত্বের সামনে নিজের অসুবিধাকে সে কখনো বড় করে দেখেনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

CID হেডকোয়ার্টারের একটি নির্দিষ্ট অংশে তখন অন্যরকম ব্যস্ততা।
সাধারণ অফিসের মতো নয়, ভবনের ভেতরের একটি সুরক্ষিত কনফারেন্স রুমের দরজা বন্ধ। বাইরে কোনো অফিসারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে না। ভেতরে বসে আছেন ACP, অফিসার রওশন এবং নোভা।
কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে লিওন ভেতরে ঢুকল।
কক্ষে ঢুকেই তার চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা ফাইলগুলোর দিকে। পরিবেশ দেখে বুঝতে তার এক মুহূর্তও লাগল না—এটা কোনো সাধারণ মিটিং নয়।
ACP তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এসো লিওন বসো।”
লিওন চেয়ার টেনে বসল। রওশন আর নোভা তখনও নীরবে তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
ACP সামনে রাখা একটি ফাইল খুললেন। “কয়েক মাস আগে তুমি একটা কথা বলেছিলে।”
লিওনের দৃষ্টি ফাইলের ওপর স্থির হলো। “ভাইপারের মতো একজন ক্রিমিনালকে শুধু বাইরে থেকে অনুসরণ করে ধরা সম্ভব নয়। তার জগতে ঢুকতে হলে আমাদের নিজেদের একজনকে তার ভেতরে পাঠাতে হবে।”
লিওন ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

“আন্ডারকভার।”
“ঠিক তাই।”
ACP ফাইলটা বন্ধ করে টেবিলের ওপর রাখলেন।
“কিন্তু সমস্যা ছিল একজন উপযুক্ত মানুষ খুঁজে পাওয়া।”
রওশন সামান্য সামনে ঝুঁকে বলল, “কারণ ভাইপারের চারপাশে যারা থাকে, তারা সাধারণ অপরাধী নয়। একজন সিআইডি অফিসারকে গ্যাংস্টারের বেশে দাঁড় করিয়ে দিলেই সে গ্যাংস্টার হয়ে যাবে না। কথাবার্তা, আচরণ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরন—সবকিছুতেই তাকে এমন হতে হবে, যাতে একবারও সন্দেহের সুযোগ না থাকে।”
অফিসার নোভা ধীরে বলল, “একটা ভুল মানেই পুরো অপারেশন শেষ।”
লিওন চুপ করে শুনছিল। ACP এবার তার দিকে তাকালেন।
“এই কারণেই এতদিন আমরা কাউকে পাঠাইনি।”
কয়েক সেকেন্ড ঘরে নীরবতা নেমে এল। তারপর ACP ধীরে ধীরে বললেন, “কিন্তু গত কয়েক মাসে একজনকে আমরা প্রস্তুত করেছি।”
লিওনের চোখে কৌতূহল ফুটে উঠল।

“কে?”
ACP সরাসরি উত্তর দিলেন না। বরং টেবিলের ওপর রাখা আরেকটি পাতলা ফাইলের দিকে হাত বাড়ালেন। ফাইলটা এতক্ষণ উল্টো করে রাখা ছিল।
“কয়েক মাস ধরে বিশেষ প্রশিক্ষণ চলছে। অস্ত্র, হাতাহাতি, অপরাধী চক্রের ভেতরের আচরণ, জিজ্ঞাসাবাদ সামলানো, পরিচয় গোপন রাখা—সবকিছুতেই তাকে প্রস্তুত করা হয়েছে।”
রওশন বিস্মিত চোখে ACP-এর দিকে তাকাল।
“আমরা তো ভেবেছিলাম এখনো কাউকে চূড়ান্ত করা হয়নি।”
ACP শান্তভাবে বললেন, “তোমরা জানতেই না, কারণ জানার প্রয়োজন ছিল না।”
নোভা ভ্রু কুঁচকে বলল, “তাহলে সেই মানুষটা এখন কোথায়?”
ACP এবার ঘড়ির দিকে তাকালেন। “হেডকোয়ার্টারে।”
লিওন কিছুটা অবাক হলো।
“আজ এসেছে?”
“হ্যাঁ।”

ACP-এর কণ্ঠে এবার অদ্ভুত একটা দৃঢ়তা ফুটে উঠল।
“আজই প্রথমবার এই হেডকোয়ার্টারের ভেতরে পা রেখেছে।”
কক্ষের তিনজনই একে অপরের দিকে তাকাল।
রওশন ধীরে বলল, “কেউ তাকে দেখেনি?”
“না।”
“নাম জানে?”
ACP মাথা নাড়লেন। “তোমরা কেউ না।”
কয়েক মুহূর্তের নীরবতার পর লিওন বলল, “তাহলে আপনি ছাড়া আর কেউ তার পরিচয় জানে না?”
ACP চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বললেন, “ঠিক তাই।”
তারপর টেবিলের ওপর আঙুল ঠুকে ধীরে ধীরে যোগ করলেন, “কারণ একজন আন্ডারকভার অফিসারের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তার পরিচয় নয়—তার পরিচয় সম্পর্কে অন্যদের অজ্ঞতা।”
লিওনের চোখে এবার আগ্রহের সঙ্গে সতর্কতাও ফুটে উঠল। সে বুঝতে পারছে, আজকের মিটিংয়ের আসল বিষয়টা এখনো সামনে আসেনি।
ACP ফাইলটার ওপর হাত রাখলেন। “আর একটা বিষয় মনে রেখো—এই অপারেশনে যে মানুষটাকে আমরা পাঠাব, তাকে দেখে কেউ যেন একবারের জন্যও ভাবতে না পারে যে সে একজন সিআইডি।”

“তাকে এমন একজন গ্যাংস্টার হতে হবে, যার ওপর সন্দেহ করার কোনো কারণ থাকবে না।”
কথাটা বলে ACP কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
বন্ধ কনফারেন্স রুমের ভেতর তখন এমন এক নীরবতা নেমে এসেছে, যেন দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অদৃশ্য মানুষটির আগমনের অপেক্ষায় পুরো ঘরটা নিঃশ্বাস আটকে আছে।
কারণ কয়েক মাসের প্রস্তুতি শেষে আজ শুরু হতে যাচ্ছে এমন এক অভিযান, যেখানে একজন সিআইডি অফিসারকে নিজের পরিচয় ভুলে অপরাধীর পরিচয় বেছে নিতে হবে।
আর সেই মানুষটিকে এখনও কেউ দেখেনি।
কেউ তার নাম জানে না। শুধু ACP জানেন—
ভাইপারের অন্ধকার জগতে ঢোকার জন্য এই মুহূর্তে এর চেয়ে নিখুঁত মানুষ আর কেউ নেই।
হেডকোয়ার্টারের মূল ভবনের ব্যস্ততা থেকে অনেকটা আড়ালে থাকা করিডোরের শেষ প্রান্তের দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।

কনফারেন্স রুমের ভেতরে তখনও আলোচনার গম্ভীর পরিবেশ। ACP টেবিলের ওপারে বসে থাকা লিওন, রওশন আর নোভার দিকে একবার তাকিয়ে দরজার দিকে চোখ ফেরালেন।
দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা যুবকটির দিকে ইশারা করে বললেন, “তোমাদের সঙ্গে একজনের পরিচয় করিয়ে দিই।”
যুবকটি ধীর পায়ে ভেতরে এসে দাঁড়াল।
প্রথম দেখায় তাকে দেখে বিশেষ কিছু বোঝার উপায় নেই। লম্বা, সুদর্শন চেহারা, ঘাড় ছুঁই ছুঁই কালো চুলগুলো স্বাভাবিকভাবেই কপালের কাছে নেমে এসেছে। পোশাক-পরিচ্ছদে যথেষ্ট পরিপাটি, আচরণে সংযত এবং চোখেমুখে এমন এক শান্ত ভাব, যা তাকে একজন নতুন CID অফিসার হিসেবেই বেশি মানায়।
ACP বললেন, “ইথান ব্লেক।”
ইথান সবার দিকে তাকিয়ে ভদ্রভাবে মাথা নাড়ল।

“গুড মর্নিং।”
রওশন আর নোভা দুজনেই চুপচাপ তাকে দেখছিল। লিওনের দৃষ্টিও কয়েক মুহূর্ত তার ওপর স্থির হয়ে রইল।
ACP এবার আসল কথায় এলেন। “ইথান আমাদের সঙ্গে আজই আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছে। তবে তোমরা যেটা জানো না, সেটা হলো—ওকে সাধারণ ডিউটির জন্য আনা হয়নি।”
ঘরের পরিবেশ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। ACP ইথানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“গত তিন মাস ধরে ও বিশেষ প্রশিক্ষণের মধ্যে ছিল। কারণ কয়েক মাস আগে লিওন যে পরিকল্পনাটা দিয়েছিল, সেই পরিকল্পনার জন্য আমাদের এমন একজন অফিসার দরকার ছিল, যে শুধু ছদ্মবেশ ধারণ করবে না, বরং প্রয়োজনে নিজের পরিচয় পুরোপুরি বদলে ফেলতে পারবে।”
লিওনের দৃষ্টি এবার ACP-এর দিকে উঠল।

সে জানতো এই পরিকল্পনাটা তারই ছিল। কিন্তু এতদিন ধরে কে সেই দায়িত্ব নেবে, সেটা সে জানতো না।
ACP আবার বললেন, “ভাইপারের মতো একজন ক্রিমিনালের জগতে ঢুকতে হলে বাইরে থেকে তাকে অনুসরণ করে লাভ হবে না। তার বিশ্বাস অর্জন করতে হবে, তার কাছের মানুষদের মধ্যে ঢুকতে হবে। আর তার জন্য দরকার এমন একজন মানুষ, যাকে দেখে প্রথমবার তো দূরের কথা, বারবার দেখলেও কেউ সিআইডি বলে সন্দেহ করবে না।”
কিছুক্ষণ থেমে তিনি ইথানের দিকে তাকালেন।
“এই কারণেই আমরা অফিসার ইথানকে বেছে নিয়েছি।”
রওশন এবার আর চুপ থাকতে পারল না। ইথানকে একবার ভালো করে দেখে নিয়ে বলল, “স্যার, কিছু মনে করবেন না… কিন্তু অফিসার ইথানকে দেখে তো কোনোভাবেই গ্যাংস্টার মনে হচ্ছে না।”
নোভার ঠোঁটের কোণেও হালকা হাসি ফুটে উঠল।
ইথান কিছু বলার আগেই ACP শান্তভাবে বললেন,

“সেটাই তো দরকার, রওশন। প্রথম দেখায় যেন গ্যাংস্টার মনে না হয়। কিন্তু যখন ও নিজের চরিত্রে যাবে, তখন যেন তোমরাও ওকে চিনতে না পারো।”
রওশন এবার ইথানের দিকে তাকাল। “সত্যি বলতে কী, আপনার এই চেহারা নিয়ে ভাইপারের জগতে ঢোকা একটু কঠিন মনে হচ্ছে।”
ইথানের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল। চোখে এবার এমন এক আত্মবিশ্বাস দেখা গেল, যা তার শান্ত চেহারার সঙ্গে বেশ অদ্ভুতভাবে মানিয়ে গেল।
সে বলল, “ডোন্ট ওরি, অফিসার রওশন। আজ আমাকে দেখে আপনার এমনটাই মনে হওয়ার কথা।”
রওশন ভ্রু তুলে তাকাল। “মানে?”
ইথান সামান্য কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “আগামীকাল দেখবেন।”

তার স্বরটা ছিল স্বাভাবিক, কথার ভেতর হালকা দুষ্টুমি, যেন বিষয়টাকে নিয়ে সে নিজেই বেশ উপভোগ করছে।
“আজ আমি ইথান ব্লেক। কালকে আমাকে দেখে আপনি নিজেই ঠিক করবেন, লোকটা আসলে কতটা ভদ্র ছিল।”
নোভা হেসে ফেলল। “বেশ আত্মবিশ্বাস আছে দেখছি।”
“থাকতেই হবে,” ইথান সহজ ভঙ্গিতে বলল। “না হলে তিন মাস এত কষ্ট করে কী শিখলাম?”
লিওন এতক্ষণ কোনো কথা বলছিল না। তার দৃষ্টি ইথানের ওপর স্থির ছিল। ইথানকে দেখে তার মনে হচ্ছে, লোকটা যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। প্রশিক্ষণও নিশ্চয়ই ভালো হয়েছে।
ACP সেই নীরবতা লক্ষ্য করলেন। “লিওন, তুমি কী বলো?”
লিওন কিছুক্ষণ ইথানের দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত গলায় বলল, “ছদ্মবেশে আসার পরই আসলটা বোঝা যাবে।”
ইথান সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল। “আপনিই অফিসার লিওন?”
“হ্যাঁ।”
“সিনিয়র অফিসার।”

লিওন শুধু মাথা নাড়ল। ইথান মৃদু হেসে বলল,
“তাহলে আপনার কাছেই প্রথম পরীক্ষাটা দিতে হবে মনে হচ্ছে।”
লিওনের মুখে কোনো হাসি ফুটল না।
“পরীক্ষা নয়। কাজটা ঠিকভাবে করতে পারলেই হবে।”
ইথান এবার একটু গম্ভীর হলো। “সেটা নিয়েই চিন্তা করবেন না, স্যার।”
তারপর নিজের চুলে হাত বুলিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, “টানা তিন মাস শুধু গ্যাংস্টারের মতো হাঁটা শিখিনি। বাংলা ভাষা শিখেছি, আরও কয়েকটা ভাষা শিখেছি। আন্ডারওয়ার্ল্ডে কীভাবে কথা বলতে হয়, কীভাবে সন্দেহ এড়াতে হয়, কীভাবে নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখতে হয়—সবকিছুর ওপর কাজ করেছি।”
রওশন বলল, “তাহলে কাল থেকেই?”

ইথান মাথা নাড়ল। “কাল থেকে আপনারা আমাকে আর ইথান ব্লেক হিসেবে দেখবেন না।”
কথাটা বলেই সে হালকা হেসে যোগ করল, “কালকে আমার ম্যাজিকটা দেখবেন।”
ঘরের পরিবেশ আবার গম্ভীর হয়ে এল। ACP ফাইলটা খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন।
“তাহলে আজকের পর থেকে এই অপারেশন সম্পর্কে এই রুমের বাইরে একটা শব্দও যাবে না।”
সবাই নীরবে মাথা নাড়ল। লিওনের দৃষ্টি আবার টেবিলের ওপর রাখা হিয়ার ফাইলের দিকে গিয়ে থামল। পরিকল্পনাটা তার নিজের।
হিয়ার জগতে ঢোকার জন্য একজন আন্ডারকভার অফিসার প্রয়োজন—এই কথাটাও প্রথম সে-ই বলেছিল। এতদিন ধরে এই পরিকল্পনাকে সফল করার জন্যই তারা একজন উপযুক্ত মানুষ খুঁজছিল।
ইথান সেই মানুষটা হতে পারে। প্রশিক্ষণ, আত্মবিশ্বাস, ভাষাজ্ঞান—সবকিছু বিবেচনা করলে হয়তো এর চেয়ে ভালো কাউকে এই মুহূর্তে পাওয়াও কঠিন।
তবু ইথানকে হিয়ার আশেপাশে থাকার কথা ভাবতেই বুকের ভেতর কোথাও যেন অস্বস্তি জমে উঠল।
কারণ আন্ডারকভার মানে শুধু দূর থেকে হিয়াকে অনুসরণ করা নয়। ইথানকে তার খুব কাছে যেতে হবে। তার বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। প্রয়োজনে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তার আশেপাশে থাকতে হবে। হিয়ার জগতের একজন হয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে হবে, তার জীবন সম্পর্কে জানতে হবে, তার কাছের মানুষদের একজন হয়ে উঠতে হবে।

অদ্ভুতভাবে, এই অংশটাই লিওনের ভালো লাগল না।
সে নিজের মনকে বোঝানোর চেষ্টা করল—এটা একটা অপারেশন। এর সঙ্গে ব্যক্তিগত কোনো অনুভূতির সম্পর্ক নেই। তবু যুক্তি দিয়ে অস্বস্তিটাকে সরিয়ে দিতে পারল না।
ইথানকে দেখে তার মনে হলো, লোকটা হয়তো খুব ভালোভাবেই কাজটা করতে পারবে। আর ঠিক সেই কারণেই যেন অস্বস্তিটা আরও বাড়ল।
কারণ হিয়ার আশেপাশে এমন একজন মানুষকে সে কল্পনা করতে পারছে না, যার উপস্থিতি এতদিন তার নিজের অজান্তে হিয়ার জীবনের একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে ছিল না। লিওন ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিল।
কেউ তার মুখের দিকে তাকালে হয়তো কিছুই বুঝতে পারত না। কিন্তু নিজের ভেতরে সে শুধু একটা কথাই অনুভব করছিল—হিয়ার কাছাকাছি এই মানুষটাকে পাঠানোর ব্যাপারটা তার একদমই ভালো লাগছে না।
কেন ভালো লাগছে না, সেই উত্তরটা অবশ্য এখনো তার নিজের কাছেই নেই।
মিটিং শেষে ইথান বেরিয়ে গেল। কনফারেন্স রুমের দরজা বন্ধ হওয়ার কয়েক সেকেন্ড পরই সেখানে ঢুকলেন এসিপি। তিনি কোথাও একটা গিয়েছিলেন।
ফিরে আসতেই সবাই দেখলো তার হাতে ছোট্ট একটি কালো প্যাকেট সে সরাসরি লিওনের দিকে তাকিয়ে বললো “লিওন।”

লিওন তাকাল। “জি, স্যার?”
এসিপি প্যাকেটটা তার দিকে এগিয়ে দিলেন। “এটা তোমার।”
লিওন ভ্রু কুঁচকে প্যাকেটটা নিল। “আমার?”
“হাসপাতালে তোমার জিনিসপত্রের সঙ্গে এটাও জমা ছিল। আজ ওরা আমাকে দিয়ে পাঠিয়েছে।”
লিওন ধীরে ধীরে প্যাকেটটা খুলল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো তার হাতঘড়ি। এক মুহূর্তেই লিওনের দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। ঘড়িটার কাচ ভেঙে গেছে। কিন্তু ডায়ালের ভেতরের সেই নীল পাথরটা এখনো অক্ষত।
ব্লু স্টার ডায়মন্ড।
লিওন ঘড়িটা হাতে তুলে নিল।আঙুল দিয়ে ভাঙা কাচের ওপর আলতো করে ছুঁয়ে দিল।আর তখনই তার মনে পড়ল—এই ঘড়িটা তাকে দিয়েছিল হিয়া।

এই কয়দিনে এতোকিছু হয়ে গেলো, সবকিছুর মধ্যে সে সত্যিই ঘড়িটার কথা ভুলে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ চুপ করে ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে থেকে লিওন মৃদু স্বরে বলল, “থ্যাংক গড এটা হারিয়ে যায়নি…”
এসিপি কথাটা শুনে কিছুটা অবাক হয়ে তাকালেন।
কিন্তু লিওন আর কিছু বলল না। শুধু ঘড়িটা হাতে নিয়ে গভীরভাবে তাকিয়ে রইল।ভাঙা কাচটার দিকে চোখ পড়তেই তার মনে হলো—“অফিসের কাজটা শেষ করেই এর কাচটা ঠিক করাতে যেতে হবে।”
অদ্ভুতভাবে ঘড়িটার কথা তার একেবারেই মনে ছিল না। আর এখন সেটাই আবার তার হাতে ফিরে এসেছে।
অন্যদিকে বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে হাসপাতালের করিডোর পেরিয়ে কেবিনের ভেতরে ঢুকছে। জানালার কাচে শেষ বিকেলের রোদ এসে পড়েছে, অথচ হিয়ার কাছে চারপাশটা এখনও একই রকম বদ্ধ আর দমবন্ধ লাগছিল।

ডাক্তার তাকে কয়েকদিন পর্যবেক্ষণে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। আর দানিয়েল যাওয়ার আগে নিজের লোকদের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে গেছে—হিয়াকে কোনোভাবেই হাসপাতালের বাইরে যেতে দেওয়া যাবে না।
হাসপাতালের ভেতরে এবং বাইরে তার বিশ্বস্ত লোকজনও ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। দানিয়েল অবশ্য হিয়াকে চেনে।
সে জানে, হিয়াকে সাধারণ কোনো রোগীর মতো পাহারা দিয়ে রাখা যায় না। আন্তর্জাতিক অপরাধজগতের সঙ্গে বছরের পর বছর যুক্ত থাকা একজন মানুষকে নিরাপত্তার বলয় ভেদ করে বেরিয়ে যেতে হলে যতটা দক্ষতা দরকার, হিয়ার কাছে সেটা নতুন কিছু নয়। সুযোগ পেলে পাহারা এড়িয়ে যাওয়া, পরিস্থিতি বুঝে মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা অসম্ভব পথকে নিজের জন্য সহজ করে নেওয়া—এসব তার স্বভাবেরই অংশ।
তবু এবার দানিয়েল একটা জায়গায় ভুল হিসাব করেছিল। সে ভেবেছিল, হিয়া এখনও শারীরিকভাবে এতটাই দুর্বল যে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো কোনো ঝুঁকি সে নেবে না।
চব্বিশ ঘণ্টার বেশি কোমায় থাকার পর সবেমাত্র জ্ঞান ফিরেছে। শরীর এখনও দুর্বল, মাথা ঘোরার সম্ভাবনা আছে, হাঁটতেও কষ্ট হচ্ছে। এই অবস্থায় হিয়া নিজের নিরাপত্তা নিয়ে অন্তত কিছুটা সচেতন থাকবে—দানিয়েলের ধারণা ছিল এমনটাই।

সে বুঝতে পারেনি, হিয়ার কাছে কিছু মানুষকে দেখার ইচ্ছেটা নিজের নিরাপত্তার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে।
হিয়া কিছুক্ষণ বেডে বসে থাকার পর আবার দরজার দিকে তাকাল। বাইরে কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষী।
করিডোরের অন্য প্রান্তেও লোক আছে। তারপরও হিয়ার চোখে ধীরে ধীরে সেই পরিচিত দুষ্টু ঝিলিক ফিরে এল।
সে জানে, সামনের দরজা দিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করলে দানিয়েলের লোকেরা তাকে আটকে দেবে। আর হিয়া তাদের মেরে ফেললেও তারা দানিয়েলের নির্দেশে অমান্য করবেনা। তাই দরজার দিকে আর তাকাল না।
জানালার দিকে এগিয়ে গেল। জানালাটা খুলতেই বিকেলের ঠান্ডা বাতাস এসে তার মুখ ছুঁয়ে গেল। নিচে হাসপাতালের পেছনের অংশটা প্রায় ফাঁকা। আর জানালার পাশ দিয়েই নেমে গেছে একটি মোটা পানির পাইপ।
দোতলা। হিয়ার জন্য খুব কঠিন কোনো উচ্চতা নয়।
শরীর দুর্বল—এটাই শুধু সমস্যা। কিন্তু দুর্বল শরীর নিয়ে কীভাবে অসম্ভব কাজ করতে হয়, সেটা হিয়া অনেক আগেই শিখে গেছে।

সে জানালার ধারে উঠে বাইরে তাকাল। তারপর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে পাইপটা শক্ত করে ধরে নিচে নামতে শুরু করল। হাতের তালুতে চাপ পড়ল, শরীরের ভেতর ব্যথার ঢেউ উঠল, তবু সে থামল না।
দোতলার জানালা থেকে মাটিতে নামার পর কয়েক সেকেন্ড দেয়ালে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল। মাথাটা সামান্য ঘুরছিল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিল। তারপর হাসপাতালের পেছনের পথ ধরে দ্রুত এগিয়ে গেল।
পেছনে তাকিয়ে একবার হাসপাতালের জানালাটার দিকে চোখ পড়তেই হিয়ার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল। দানিয়েল ভেবেছিল, সে দুর্বল।
ভেবেছিল, এই অবস্থায় হিয়া কোনো বেপরোয়া সিদ্ধান্ত নেবে না।কিন্তু দানিয়েল একটা জিনিস ভুলে গিয়েছিল—
হিয়াকে দুর্বল অবস্থায়ও আটকানো সহজ নয়।
আর আজ তাকে থামিয়ে রাখার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী কারণও তার কাছে আছে।
লিওন।

লিওন এখন কেমন আছে, সেটা তাকে জানতেই হবে।
সে কোথায় আছে, হাসপাতাল থেকে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে কি না—কিছুই জানে না হিয়া। কিন্তু এতক্ষণ চার দেয়ালের মধ্যে শুয়ে থাকার পর তার ভেতরে একটা অস্থিরতা ক্রমেই বাড়ছিল।

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৩২

আজ তাকে লিওনকে দেখতেই হবে। শরীর যতই দুর্বল হোক, পথ যতই কঠিন হোক, দানিয়েলের নিরাপত্তা যতই শক্ত হোক—হিয়া জানে, সে বেরিয়ে পড়েছে যখন, তখন তাকে আর সহজে ফেরানো যাবে না।
আর হাসপাতালের গেটের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে তার মনে হলো, দানিয়েল হয়তো কয়েক ঘণ্টা পর বুঝতে পারবে তার ভুলটা। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে যাবে।

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৩৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here