Home অবেলায় ফোঁটা পুষ্প অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৫২ (২)

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৫২ (২)

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৫২ (২)
রুপা

রাতের ঝুম বৃষ্টির পরে আকাশ আবার পরিষ্কার হয়ে গেছে—দেখে বোঝার উপায় নেই রাতে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছিল। সকাল শুরু হতেই সরকারবাড়িতে আবার ব্যস্ততা শুরু—কেউ রান্না করছে, কেউ আবার চা খাচ্ছে, তো কেউ সকালের নাস্তা করছে। মেহমান বেশি হওয়ায় একসাথে খাবার খাওয়ার সুযোগ নেই, তাই যে যেমন পারছে, তেমনভাবেই একজন-দুজন করে খেয়ে নিচ্ছে।
এদিকে পুষ্প রান্নাঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে সবার কাজকর্ম। কারণ সে কিছু করতে চাইলেও শেহনাজ সরকারের বারণের জন্য করতে পারছে না। এতে পুষ্পর মন খারাপ হয়ে গেল।
এমনিতেই তার মন খারাপ, কারণ আর্য তাকে না বলে সে ঘুম থেকে ওঠার আগেই চলে গেছে! তাকে ঘুম পাড়িয়ে লোকটা কোথায় গেছে, কিছুই জানে না পুষ্প। ভোরে সে ফজরের নামাজ আদায় করে যখন প্রতিদিনের মতো নিচে আসতে চাইল, তখন আর্য আসতে দিল না; একপ্রকার জোর করেই বিছানায় পুষ্পকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে রাখল এবং আরও বলল, ‘বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, আমি ছাড়া বাইরে গিয়ে কী করবে?’ অগ্যথা শুয়ে থাকতে থাকতে পুষ্প কখন ঘুমিয়ে পড়ে, বুঝতেই পারে না।

পুষ্প ঘুমিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে আর্য উঠে শাওয়ার নিয়ে একটা কালো হুডি পরে বেরিয়ে যায়। তারপর সবাই ঘুম থেকে ওঠার পরে পুষ্প ঘুম থেকে উঠে দেখে আর্য নেই—তাকে ঘুম পাড়িয়ে নিজে চলে গেছে! এতে রমণীর মন খারাপ হয়, তবে সে রুমে বসে থাকে না; নিচে নেমে এসে দেখে যে যার মতো কাজ করছে, কেউ গল্প করছে তো কেউ চা খাচ্ছে। পুষ্প সোজা রান্নাঘরে গিয়ে শেহনাজ সরকারের পাশে এক কোণে দাঁড়িয়ে সবার কাজ দেখতে থাকে। নিজে কিছু করতে চাইলেও করতে দেয় না।
হঠাৎ সেখানে সারা আসল। সারার চোখ-মুখ ভীষণ শুকিয়ে গেছে, চোখের নিচে কিছুটা কালি পড়েছে—হয়তো সারারাত নির্ঘুম পার করেছে! শেহনাজ সরকার এক পলক সারার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—
– “কী হয়েছে সারা, ঘুম হয়নি তোমার? চোখ-মুখের এই অবস্থা কেন?”

সারা বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল—কী করে বলবে, চাইলেও ঘুমাতে পারছে না সে? আজকে বাদে কাল স্নিগ্ধর সাথে সিমরানের বিয়ে—এইটা ভাবতেই খুব কষ্ট হচ্ছে, নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার মতো ছটফট করছে! চোখ বন্ধ করলেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে বর সেজে বসে থাকা স্নিগ্ধর প্রতিচ্ছবি, আর তার পাশে বধূরূপে বসে আছে সিমরান! অথচ সেখানে বসে থাকার কথা ছিল তার! কেন লোকটা সেদিন আসল না তাকে বিয়ে করতে? তাহলে তো তার মাকেও হার্ট অ্যাটাকে মরতে হতো না! সারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সব ভাবনা ঝেড়ে ফেলতে চাইল—না, সে এসব একদম ভাববে না! লোকটা নিজে তাকে বিয়ের কথা বলে বিয়ের আসরে ফেলে চলে গেছে, তার ভালোবাসার দাম দেয়নি—সে কেন কষ্ট পাবে? সে শেহনাজ সরকারের কথায় হেসে আমতা আমতা করে বলল—

– “আসলে আন্টি, নতুন জায়গা, তাই হয়তো ঠিকমতো ঘুম হয়নি।”
– “আচ্ছা!”
শেহনাজ সরকার এবার দুই প্লেটে নাস্তা সাজিয়ে দিয়ে পুষ্প আর সারার হাতে দিলেন। তারপর পুষ্পকে বললেন—
– “পুষ্প, সারাকে নিয়ে রুমে যা, নাস্তা খেয়ে নে। এখানে অনেক মানুষ, বসার জায়গা পাবি না।”
শেহনাজ সরকারের কথায় পুষ্প এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল, আসলেই রান্নার পেঁয়াজ-মসলার সরঞ্জামে রান্নাঘরের অর্ধেক জায়গা দখল করে নিয়েছে। পুষ্পকে এদিক-ওদিক তাকাতে দেখে শেহনাজ সরকার আবার বললেন—
– “যা, দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
– “ফুফুমনি, তুমি খেয়েছ?”
– “নাহ, আমি রান্না শেষ করে খেয়ে নেব।”

পুষ্প এবার তাকিয়ে দেখল—আরও অনেক রান্না বাকি! এত রান্না শেষ করে তারপর খাবে, ততক্ষণে তো অনেক বেশি খিদে পাবে! পুষ্প এবার আশেপাশে তাকিয়ে দেখল, পাশে একটা বস্তা পড়ে আছে—হয়তো পেঁয়াজ-রসুনের হবে, বিয়ের বাজার করার সময় এনেছে। পুষ্প সারাকে তাতে বসে খেয়ে নিতে বলল। তারপর পরোটা ছিঁড়ে ডিমভাজি আর সবজি নিয়ে শেহনাজ সরকারের মুখের সামনে ধরে। নিজের সামনে খাবার দেখে শেহনাজ সরকার খাবারের মালিকের দিকে তাকিয়ে দেখলেন—পুষ্প। ওনাকে তাকাতে দেখে পুষ্প বলল—
– “ফুফুমনি, তোমার রান্না শেষ হতে অনেক দেরি হবে। ততক্ষণে তোমার অনেক খিদে পাবে, তুমি বরং রান্না করতে করতে আমার হাতে খেয়ে নাও।”
পুষ্পর কথা শুনে শেহনাজ সরকার আলতো হেসে খাবারটা মুখে পুরে নিলেন। খাবার চিবোতে চিবোতে বললেন—
– “পুষ্প, তুই কিন্তু একদম আমার মা হয়ে যাচ্ছিস!”
পুষ্প কিছু বলে না, নিজেও খেতে খেতে বলল—
– “তো, আমি তো তোমার মা-ই! ফুফুমনি, তুমি জানো, ছোটবেলায় আব্বু আমাকে ‘মা’ ডাকত? আমি নাকি দাদির মতো ছিলাম! আমি যদি আব্বুর মা হই, তাহলে তোমারও মা।”
শেহনাজ সরকার নীরবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বললেন—

– “হুম, আসলেই তুই মায়ের মতো, তোর দাদির কার্বন কপি!”
পুষ্প কিছু বলে না, নিজে খাওয়ার সাথে সাথে শেহনাজ সরকারকেও খাইয়ে দেয়। এদিকে রান্নাঘরে থাকা বাকি মহিলারা অবাক হয়ে দেখছেন শেহনাজ সরকার আর পুষ্পকে! কে বলবে এরা শাশুড়ি-বউমা? কেউ দেখলে এককথায় বলবে মা-মেয়ে! মানুষের এত অবাক চাহনি খেয়ালও করে না; শাশুড়ি-বউমা তারা, তো কথা বলছে আর খাচ্ছে! সারা নিজেও খেতে খেতে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে দুজনকে—আজকালকার দিনে এমন শাশুড়ি-বউমা দেখা দুষ্কর!

সারাদিন কেটে যায়, আর্য বাড়িতে আসে না। পুষ্পর মন আরও খারাপ হয়—সারাদিনে একবারও সে তার সরকার সাহেবকে দেখেনি! একপলক দেখার জন্য চাতক পাখির মতো ছটফট করছে, বারবার সদর দরজার দিকে তাকিয়ে ছিল সারাদিন। ছটফট করতে করতে দুপুর থেকে কিছু খাইনি সে।
হঠাৎ সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করল মুন্নি। তাকে ঠিকঠাক লাগছে না; সে কোনো দিকে না তাকিয়ে ওপরে চলে গেল। তাদের দেওয়া গেস্টরুমে ঢুকে দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গড়গড় করে বমি করতে লাগল—পারলে পেটের নাড়িভুঁড়ি সহ বের করে আনবে! ওয়াক ওয়াক করতে লাগল সে।
হঠাৎ সেখানে এসে মুন্নির মা মেয়েকে এভাবে বমি করতে দেখে পেছন থেকে ধরলেন। অনেক কষ্টে মেয়েকে ধরে বিছানায় বসিয়ে চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন—
– “কী হয়েছে তোর? এভাবে বমি করছিস কেন? শরীর খারাপ লাগছে?”

মায়ের কথায় মুন্নি এবার ভাবতে লাগল আজকের কথা—সে সকালে খাওয়া শেষ করে একটু ঘুরে দেখেছিল সরকারবাড়িটা। হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির পেছনের দিকে চলে যায়, সেখানে হঠাৎ করে কেউ তার মুখে রুমাল চেপে ধরে! আর কিছু মনে নেই, কিন্তু যখন জ্ঞান ফেরে, তখন দেখে সে একটা চেয়ারে বাঁধা এবং সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুই-তিনজন লোক। হঠাৎ সেখানে একজন কালো হুডি পরা লোক আসে, হাতে একটা কুকুর! লোকটা পাশেরজনকে কিছু ইশারা করতেই লোকটা এক প্লেট বিরিয়ানি নিয়ে আসে। সেটা খুলে কুকুরের সামনে রেখে দেয়; কুকুরটা বেশ তৃপ্তি নিয়ে জিব দিয়ে চাটতে চাটতে খেতে শুরু করে। এদিকে মুন্নি সমানে চিৎকার করে যাচ্ছে—তাকে এখানে কেন নিয়ে এসেছে, কে সে? কিন্তু সামনের লোকগুলোর মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। সে এবার কুকুরের আধখাওয়া উচ্ছিষ্ট খাবারটা মুন্নির সামনে দিয়ে খেতে বলে। মুন্নি খেতে না চাইলে লোকগুলো ধরে মুখ চেপে ধরে হা করিয়ে খাবারগুলো মুখে ঢুকিয়ে দেয় মুখ চেপে ধরে রাখে—যতক্ষণ না খাবারগুলো গিলে! এভাবে কুকুরের উচ্ছিষ্ট খাবার খাওয়ানো শেষ করে আবারও অজ্ঞান করে সরকারবাড়ির পেছনে ফেলে রেখে আসে।
দৃশ্যগুলো ভাবতেই আবারও গা গুলিয়ে উঠল, আবার দৌড়ে গেল ওয়াশরুমে, গড়গড় করে বমি করতে লাগল! এদিকে মেয়ের অবস্থা দেখে কিছুই বুঝতে পারছেন না মুন্নির মা—কী হয়েছে?

সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ বাড়িতে আসল আর্য। সদর দরজা দিয়ে ঢুকে তার তৃষ্ণার্ত চোখ দুটো চারপাশে চোখ বুলিয়ে হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগল তার কাঙ্ক্ষিত মুখটা। কাঙ্ক্ষিত মুখের দেখা না পেয়ে সে ওপরে চলে গেল। করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তার দেখা হয় মুন্নির সাথে। মুন্নি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল আর্যের যাওয়ার দিকে—সেই কালো হুডিই আর্যের পরনে! এদিকে মুন্নিকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আর্যের ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে বেশ বিরক্তি নিয়ে বলল—
– “এই মেয়ে, নিজের চোখ সামলাও! নাহলে পরের বার ওই চোখ দুটো চোখের জায়গায় থাকবে না, তাকানোর জন্য।”

বলতে বলতে হেঁটে নিজের রুমে আসল। রুমে ঢুকতেই দেখল রুম খালি, তার ফ্লাওয়ার নেই। আর্যের মেজাজ খারাপ হলো—সারাদিন বাইরে ছিল ওই মুন্নি কে শাস্তি দিয়ে! বাড়ি আসার সময় অফিস থেকে কল আসে, তাই আর্যর আর বাড়িতে আসা হয় না, অফিসে চলে যায়। সেখানে গিয়ে পুষ্পকে নিজের রেখে যাওয়া ফোনে একশোর ওপরে কল করেছে, কিন্তু রিসিভ হয়নি। এখন সে বাসায় এসেছে বউকে দেখবে, চোখের তৃষ্ণা মেটাবে, বউয়ের অভাবে ছটফট করতে থাকা মনকে শান্ত করবে। কিন্তু এসে কী দেখল? বউ রুমে নেই!
বর বাইরে থেকে এসেছে, রুমে না থেকে কী করছে তার বাউ? এমনিতেই তার টেনশনের শেষ নেই—বাড়িতে অনেক ধরনের মানুষ, কে বন্ধু আর কে শত্রু, কে জানে! কেউ বউটার ক্ষতি করে দিলে কী করবে? আর্য আবার রুম থেকে বেরিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখল বউটা কোথায়। পুষ্পকে না পেয়ে একটা কাজের মেয়েকে পুষ্প কোথায় জিজ্ঞেস করতেই সে বলল, সিমরানের রুমে সবাই মেহেদি অনুষ্ঠানের জন্য রেডি হচ্ছে, পুষ্পকে ডেকে দিতে বলে আর্য আবার রুমে চলে গেল। কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল।

ঘণ্টাখানেক পর শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে আসে—পরনে ক্যাজুয়াল বেইজ টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার, তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে রুমে চোখ বুলিয়ে দেখল এখনো পুষ্প রুমে আসেনি! এবার আর্যর মেজাজ সপ্তমে চড়ল—সে এখানে বউয়ের অভাবে ছটফট করছে, এদিকে বউ অনুষ্ঠানের জন্য সাজতে ব্যস্ত! আর্য রেগে যেই না রুম থেকে বেরুতে যাবে, অমনি দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল পুষ্প। পরনে কলাপাতার রঙের সুতির শাড়ি, হাতে তার পরানো চুড়ি, নাকে ঝলমল করছে নাকফুল, গলায় তার দেওয়া চেইন, কানের দুল। লাইটের আলোয় চকচক করছে! মুখে এখনো কোনো প্রসাধনীর কৃত্রিম ছোঁয়া লাগায়নি, শুধু শাড়িটা পড়েছে। কোমরসমান দীর্ঘ চুলগুলো ছড়িয়ে আছে পুরো পিঠজুড়ে।

আর্য মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রমণীর দিকে। চোখের পলক যেন পড়ছে না, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে—সেই বিয়ের প্রথম রাতের মতো! হার্টবিট ইতিমধ্যে কয়েকটা মিস করেছে। আর্য যেন এগিয়ে যেতেই ভুলে গেছে, বহু কষ্টে ঢোক গিলল। সাথে সাথে গলার আকর্ষণীয় উঁচু অ্যাডামস অ্যাপলটা ওঠানামা করল। আর্যর গভীর দৃষ্টিতে আজ আর রমণী অপ্রস্তুত হয়ে হাঁসফাঁস করল না, দৌড়ে গিয়ে আর্যর গলা জড়িয়ে ধরল। আর্য পেছাতে গিয়েও পেছাল না, নিজেকে সামলে নিজের বাহুবন্ধনে আগলে নিল তার ফ্লাওয়ারকে। দুই হাতে রমণীর সরু কোমরটা উঁচু করে ধরে এগিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করতে গেলে হঠাৎ আর্যর চোখ যায় দরজার বাইরে—মুন্না দাঁড়িয়ে আছে! আর্য বেশি কিছু ভাবল না, দরজা বন্ধ করে দিল। কিছুক্ষণ দুজনের মাঝে নীরবতা বহাল রইল। শুধু ওই আলিঙ্গনের মধ্যেই শান্তি খুঁজে নিচ্ছে তারা, এতক্ষণ ধরে ছটফট করতে থাকা মনকে শান্ত করছে। নীরবতা ভাঙল পুষ্প। অভিমানী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
– “সারাদিন কোথায় ছিলেন আপনি? একবার ও বাসায় আসেননি কেন?”
পুষ্পর কথায় আর্যের ঠোঁটে দেখা যায় এক টুকরো হাসি। সেও পাল্টা জিজ্ঞেস করল—
– “আমার জন্য কি কেউ অপেক্ষা করছিল?”
– “হুমমম!”
– “তাহলে আমি আসার পরে আমার জন্য অপেক্ষা করা মানুষটাকে দেখতে পেলাম না কেন?”
– “আমি তো ড্রয়িংরুমে বসে অপেক্ষাই করছিলাম! আপনি আসছেন না দেখে আবার ওপরে চলে আসছি। পরে সবাই বলল রেডি হয়ে নিতে, জোর করে আমাকে শাড়ি পরাতে নিয়ে গেল। তো আমি কি বারণ করতে পারব যে আমি শাড়ি পরব না?”

– “তাহলে আমি ডেকে পাঠানোর পরেও কেন আসোনি?”
– “তখন তো শুধু শাড়ি পরানো শুরু করেছিল সারা। আমি কি অর্ধেক শাড়ি পরা অবস্থায় চলে আসতে পারব?”
আর্য চুপ করে গেল। নিজের বুক থেকে পুষ্পকে সরিয়ে সামনে দাঁড় করাল। শাড়ি পরায় পুষ্পকে একটু বড় বড় লাগছে, একদম যুবতী নারী লাগছে! শাড়ির আঁচল তুলে পরার কারণে পেটের কিছু অংশ উন্মুক্ত হয়ে দেখা যাচ্ছে। আর্য ঢোক গিলল—আবারও মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে অন্যরকম কিছু অনুভূতি! এদিকে হঠাৎ করে পুষ্প ঘামতে শুরু করল। কী রকম হাঁসফাঁস করছে! পুষ্প হাত দিয়ে বারবার গলায়-মুখে হাত বুলাতে লাগল। পুষ্পকে ঘামতে দেখে আর্য উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল—
– “ফ্লাওয়ার, কী হয়েছে? তোমার শরীর খারাপ লাগছে? এভাবে ঘামছো কেন?”
– “গ..গরম! অনেক গরম লাগছে, সরকার সাহেব!”

হঠাৎ পুষ্পর গরম লাগার কারণ বুঝতে পারল না আর্য। রুমে এসি’র টেম্পারেচার একদম কম, তাহলে গরম লাগছে কেন? পুষ্পর চোখের দৃষ্টি কী রকম ঘোলাটে হয়ে গেছে! পুষ্প এবার নিজের শাড়ির আঁচল টেনে সরাতে লাগল; পিন লাগানো থাকায় টানাটানির পরেও আঁচল সরাতে না পেরে আর্যর দিকে তাকাল অসহায় দৃষ্টিতে। হঠাৎ পুষ্পর চোখ যায় আর্যর গলার দিকে। আর্যর গলার পুরুষালি অ্যাডামস অ্যাপলটা পুষ্পকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করছে! পুষ্প কোনো কিছু না ভেবে আর্যর টি-শার্টের কলার ধরে টান দিল। আর্য একটু ঝুঁকতেই পুষ্প আর্যর অ্যাডামস অ্যাপলে ঠোঁট ছোঁয়ালো! আর্য নিজের হাত শক্ত করে মুঠ পাকিয়ে নিল—এমনিতে সে মেয়েটার কাছে এলে নিজেকে সামলাতে হিমশিম খায়, রমণীর এহেন কাণ্ডে আর্যর সংযমের দেওয়াল ধসে পড়তে চাইল, ভেঙে চুরমার হচ্ছে!
এদিকে পুষ্প থামার নাম নিচ্ছে না; সে যেন নিজের হুশে নেই! হুশ হারিয়ে চুমু দিতে গিয়ে এবার কামড় বসালো সে জায়গায়। আর্য মুখ কুঁচকে নিল, কিন্তু কোনো শব্দ বের করল না। আর্য অনেক কষ্টে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে, কিন্তু হঠাৎ আর্য পুষ্পকে টেনে নিজের কাছ থেকে সরাল। পুষ্পর অবস্থা দেখে আর্য কিছু একটা ভেবে জিজ্ঞেস করল—
– “ফ্লাওয়ার, কী খেয়েছ তুমি?”
– “আমি আপনাকে খাবো!”

আদুরে ও ভাঙা গলায় বলে উঠল পুষ্প।
পুষ্প কী রকম ঢুলছে—চোখ একবার বন্ধ করছে, একবার খুলছে! আর্য এবার পুষ্পর মুখে আলতো চাপড় মারতে মারতে বলল—
– “ফ্লাওয়ার, বলো না কী খেয়েছ? কেউ কিছু খেতে দিয়েছে তোমাকে?”
– “আমি আপনাকে খাবো।”
– “আচ্ছা, খেও আমাকে! আগে বলো, কেউ কিছু খেতে দিয়েছে তোমাকে? কী খেয়েছ?”
পুষ্প অনেকক্ষণ ভাবার পরে বলল—
– “হুম, একটা আপু দিয়েছে চকলেট! আমি খেতে চাইনি আপুটা বলল, খেয়ে দেখো তো মজা কি না, আমাকে বলো। তাই ওই চকলেটটা খেয়েছি। কিন্তু এখন আপনাকে খাবো!”
আর্যর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তার বুঝতে অসুবিধা হলো না যে ওই চকলেটে কিছু একটা ছিল! কার এত বড় সাহস হলো তার বাড়িতে এসে তার বউয়ের দিকে হাত বাড়ালো? আর্যর ভাবনার মাঝেই পুষ্প আবার আর্যকে জড়িয়ে ধরল, টি-শার্ট ধরে টানাটানি করতে লাগল। কী রকম বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে বলতে লাগল—
– “এইটা সরান! এটার জন্য আমি আপনাকে খেতে পারছি না!”

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৫২

পুষ্পর বাচ্ছামি দেখে না চাইতেও আর্য ঠোঁট টিপে হাসল—এমনিতেই খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে, এখন তো আরও বেশি খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে! এতোটা আদুরে হতে হবে কেন? এদিকে পুষ্প এখনো আর্যর টি-শার্ট ধরে টানাটানি করছে; এবার না পেরে টি-শার্টের ওপর দিয়েই কামড় বসালো আর্যর বুকে! আর্য চোখ খিচে বন্ধ করে ফেলল—তার শেষ সংযম যেন ধসে পড়ল! কোনো সতর্কতা ছাড়াই পুষ্পকে পাজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৫৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here