সাঁঝের মায়া পর্ব ৭১
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
— ‘ বাঁ’চানো গেলো না পেশেন্ট কে। ঠিক সময়ে রক্তই জোগাড় করে উঠতে পারেনি, তার পরিবার। যে পরিমাণ ব্লাড লস হয়েছিলো, তারওপর ব্লাডগ্রুপও রেয়ার। কি আর করা যেতো সর্বোচ্চ চেষ্টা করে গিয়েছে ডাক্তার। ‘
—’ দু ব্যাগ নাকি জোগাড়ও হয়েছিলো । কিন্তু নিয়ে আসতে আসতে…’
স্ট্রেচার নিয়ে দু’জন ওয়ার্ড বয় পার হয়ে যাচ্ছে করিডর দিয়ে। নূরি আর নাঈমের চোখাচোখি হলো তৎক্ষণাৎ। মুখে প্রকাশ করতে হলো না কোনোকিছুই। সুপ্ত ভয় দু’জনের মনের মধ্যেই গেঁথে আছে। সুতরাং হৃদপিণ্ড জোরসে বিট করে গেলো একসাথেই। নূরির ছোট্ট শরীরটা থরথর করে কেঁপে উঠতেই হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে এলো নাঈম। দু’হাতে আগলে নিতে গিয়েও নিলো না। কেনোমতে কাঁপতে থাকা কন্ঠে বললো,
—’ ওটি’র ওদিকে চলো। কিচ্ছু হয়নি। ‘
মেয়েটাকে শান্তনা দিলো ঠিকই, কিন্তু নিজেও কি এড়িয়ে যেতে পারলো ভয়টা! পারলো না। নূরি ছলছল করে তাকাতেই চোখের ইশারায় শান্তনা দিলো নাঈম। দু’জনেই ছুটলো অপারেশন থিয়েটারের দিকে।
খোদার রহমতে ভয়টা কেটে গেলো সেখানে আসতেই। ওয়ার্ড বয়রা সম্ভবত অন্য কোনো রুগীর কথাই বলছিলো। এখানকার কোনো আপডেট এখনো দেয়নি ভিতর থেকে। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো যেনো দু’জনেরই। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে পরিবারের সবার সাথে বসলো নূরি। মা, চাচি, অনিমা, নিশি সবাই একসাথে বসে আছে। তাদের ছোট চাঁচি মুক্তা কে রেখে আসা হয়েছে বাড়িতেই। চন্দ্রা দেওয়ান চাইলেও আসতে পারতো না হসপিটালে। তাছাড়া ছোট ছেলেমেয়েগুলোকে এসব ঝামেলার মধ্যে আনার কোনো মানেই হয় না। অনিমার শরীর খারাপ করছে এতক্ষণে। মেয়েটা যথেষ্ট শক্ত মন মানসিকতার। এর আগেও বহুবার সাজিদের বিপদের মূহুর্ত শক্ত হয়ে সামলে নিয়েছে। তবে এবারে দূর্বল হওয়ার কারণ গুলোর লিস্টও দীর্ঘ৷ সে মা হতে যাচ্ছে, অথচ সাজিদকে এখনো জানানো হয়নি। ছোট বেলা থেকে ঈশান তার বন্ধু কম, ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করে এসেছে। তিতিরটাও ছোট বোনের মতো। এতো গুলো কাছের মানুষ মৃ*ত্যুসয্যায়, কার মন মানবে এতো সহজে!
সময়ের কাটা ঘুরছে। নিয়াজ আর অমিত ঈশানের সহ বাকিদেরও ব্লাড জোগাড় করে নিয়ে এসেছে। বাইরে বড়রা দোয়াদরুদ পরে যাচ্ছে একপ্রকার। খোদাকে ডাকছে একমনে। সবার মনটা শান্ত করে সবার আগে খবর এলো সাজিদেরই। শঙ্কামুক্ত নয় এখনো। তবে অপারেশন সাকসেসফুল। ইমারজেন্সি তে রাখা হবে আপাতত।
একদফা হাফ ছাড়লো যেনো সবাই। ডাক্তারের প্রস্থান হতেই দু’হাতে মুখ চেপে কেঁদে ফেললো অনিমা। রিক্তা দেওয়ান বুকে জড়িয়ে রইলেন মেয়েটাকে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নিভলো তিতিরের অপারেশন থিয়েটারের লাল আলো। আরেকদফা হুড়মুড়িয়ে এগোলো সবাই। ডাক্তার ভদ্রমহিলাটি বের হলো অন্ধকার মুখ নিয়ে। টানা তিন ঘন্টা ধরে চলছে ভিতরের এই অপারেশন টা। তার চোখেমুখেও ক্লান্তি ফুটে উঠেছে। রাইসুল দেওয়ান আর রাহেলা বিধ্বস্ত চোখেমুখে মহিলার কথা বলার অপেক্ষায় আছে বুঝতেই সামান্য স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো চোখমুখ। বয়যেষ্ঠ দু’টো মানুষ কে হুটহাট কিছু বলে ফেলতে চাইলো না। সেটা বোধহয় তার চোখের ইশারাতেই টের পেলো নাঈম, নিয়াজ। তারা পাশে এসে দাঁড়াতেই মহিলা শান্ত গলায় বললো,
—’ পেশেন্টর বাবা মা আপনারা? ‘
মাথা ঝাঁকালেন রাইসুল দেওয়ান আর রাহেলা। ভদ্রলোক ব্যাগ্র গলায় শুধালো,
—’ আমি ওর বাবা। আমার মেয়েটা কেমন আছে? অপারেশন সাকসেসফুল হয়েছে? হ্যা? ‘
ডাক্তার সোজাসুজি উত্তর দিলো না রাইসুল সাহেবকে।
—’ আপনারা ওর পরিবার ? ‘
—’ জি। ‘
—’ ওর হাসবেন্ড কোথায়? ‘
চোখাচোখি হলো পরিবারের সবার মধ্যে। তবে এদিক থেকে কেউ কিছু বলার আগেই, মহিলার পিছন থেকে তার এসিস্ট্যান্ট ফিসফিস করে বললো কিছু একটা। মহিলার মুখটা অন্ধকার হলো বড্ড। বড্ড কাতর চোখে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো পাশের ওটির দিকে। নিয়াজ দ্রুত গলায় বললো,
—’ অপারেশন থিয়েটারে..দু’জনেই..।’
—’ অ্যাম সরি। আমি জানতাম না। ‘
—’ তিতির কেমন আছে ডাক্তার? ‘
—’ বিয়ের কতদিন ওদের? ‘
এবার মুখ খুললো রাহেলা।
—’ তিনমাস আঠাশ দিন। ‘
মহিলা ঠোঁট টিপে শ্বাস ফেললো একটা। তারপর শীতল সুরে বললো,
—’ দেখুন, আপনাদের পরিবারের ওপর দিয়ে যে কঠিন সময় যাচ্ছে, আমি খানিকটা হলেও আন্দাজ করতে পারি। আরও খারাপ লাগছে এ কারণে – এমন একটা অবস্থায় ওর স্বামীও পাশে নেই। আপনাদেরই শক্ত হতে হবে কিন্তু। ‘
বুকের ধুকপুকানির শব্দ জোরালো হলো সকলেরই। ভদ্রমহিলাযে এতক্ষণ যাবৎ কিছু একটা কঠিন বাক্য আউরাতে গিয়েও আউরাচ্ছে না, সেটা বুঝলো সবাই। রাহেলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শক্ত করলো নিজেকে। ঈশান আরশাদের মা সে। এতো সহজে তাকে ভেঙে পরলে চলবে কেনো। ছলছল করা আখিজোড়া শাড়ির আঁচলে মুছে নরম গলায় শুধালো,
—’ আমরা শক্তই আছি, ম্যাডাম। বলুন। আমার মেয়েটা কেমন আছে? ‘
—‘ পেশেন্ট প্রেগন্যান্ট ছিলো । এক মাসের একটা অপরিপক্ক ভ্রু’ণ ছিলো । সম্ভবত এখনো জানতেন না তিনি । ‘
বজ্রাহত হয়ে গেলো দেওয়ান পরিবার। এতক্ষণ ধরে দাঁত কামড়ে নিজেদের শক্ত করে রাখার চেষ্টা মাঠে মারা গেলো বোধহয়। অনিমা রিক্তার কাঁধে মাথা রেখে বসে ছিলো। খোদার কাছে নিজের সন্তানের বাপকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য শুকরিয়া আদায় করছিলো। তবে ঈশান -তিতিরের সন্তানের কথা শোনা মাত্রই বাকরূদ্ধ হয়ে গেলো যেনো। নিশি, নূরির হাতখানা খামচে হতভম্বের মতো দাড়িয়ে রইলো। সবাই বোধহয় ভাবছে ভুল শুনলো কি-না। ডাক্তারের মুখে তিতির প্রেগন্যান্ট এই কথাটা শুনতেই, রাহেলার মন আটকালো “ছিলো ” শব্দটিতে। নাঈম কে সরিয়ে হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে এলেন তিনি। ব্যাকুল গলায় শুধালেন,
—‘ ছিল মানে? ‘
—‘ অ্যাম সরি, ম্যাডাম । যেখানে পেশেন্টের অবস্থাই ক্রি’টিকাল সেখানে বাচ্চাটার কথা ভাবার মতোও নয়। তাছাড়া, গু’লিটা এমন জায়গায় লেগেছে…বলতে খুবই খারাপ লাগছে — ভ্রুণটার অস্তিত্ব একদম ন’ষ্ট হয়ে গিয়েছে। কোনোভাবেই বাঁচানো সম্ভব নয় । ‘
রাহেলা হতভম্ব, স্তম্ভিত নয়নে তাকালো শুধু পাশাপাশি দু’টো অপারেশন থিয়েটারের দিকে। কতটা অভাগা হলে, দু’জনে জানতেও পারলো না– বাবা- মা হতে যাচ্ছিলো ওরা! রাইসুল দেওয়ান এর মতো শক্তপোক্ত পুরুষ মানুষও থরথর করে কাঁপতে থাকা পা জোড়া নিয়ে বসে পরলেন। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মেঝের দিকে।
রাহেলাকেও নিশি ধরে নিয়ে সরিয়ে আনলেন। ডাক্তার ভদ্রমহিলার দিকে ফিরে কাঁপা গলায় বললেন,
—’ মা হতে যাচ্ছিলো আমার বোনটা? ‘
—’ জি, আপনারা জানতেন কি? ‘
—’ না।’
—’ মেয়েটার বয়স কম, সম্ভবত নিজেও জানতো না। আই থিংক হাজবেন্ডের থেকে দূরে আছে বেশ কয়েকদিন যাবৎ।’
—’ জি, ভাইয়ার কাজের সূত্রে…’
—’ হ্যা, পরীক্ষায় বুঝেছি। দেখুন আমাদের হাতে ছিলো না কিছুই। গু*লিটা একদম ভ্রুণ কে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়ে গিয়েছে। গু*লিটা লাগার সঙ্গে সঙ্গে মা*রা গিয়েছে। সুতরাং, এখানে কারোর কিচ্ছু করার নেই। ‘
থমকে দাড়িয়ে রইলো সবাই। ডাক্তার বোঝেন সবার মনের অবস্থা। শান্তনা দেওয়ার মতে করেই বললো,
—’ ওর অপারেশন ভালোমতোই শেষ হয়েছে।।তবে প্রচুর ব্লাডলস হয়েছে। একে-তো প্রেগন্যান্ট ছিলো। তার থেকেও বড় কথা, মেয়েটা সম্ভবত একটু মানসিক চাপে ছিলো বেশ কয়েকদিন যাবৎ। আগে থেকেই শরীরের কন্ডিশন খুব একটা ভালো মনে হলো না। প্রচুর দূর্বল ছিলে। সেই শরীরে এরকম অত্যাচার। আপনারা সচেতন, শিক্ষিত পরিবার। চব্বিশ ঘন্টার আগে ওর জ্ঞান ফিরবে না। তবে জ্ঞান ফিরলে আমি সাজেশন দেবো– বাচ্চার কথাটা জানাবেন না। স্বামী- সন্তান সবকিছুর শোক একসাথে সওয়া ওর জন্য সহজ হবে না। হিতে বিপরীত হওয়ার সম্বাবনা তীব্র। এবং আমাদের মেডিকেল সায়েন্স অনুযায়ী জ্ঞান ফেরার পর মেয়েটা প্রচুর মানসিক চাপে থাকবে। ডিপ্রেশন যাকে বলে। আপনাদের সামলাতে হবে সে-সব। হুট করে এত বড় একটা খারাপ সংবাদ ওকে জানিয়ে দিলে, মেন্টালি সিক হয়ে যাওয়ার চান্স বেশি। ‘
বিপদ যখন আসে চারিদিক থেকেই আসে বোধহয়। কেউকি কখনো ভেবেছিলো, এরকম একটা দিন দেওয়ান বাড়িতে আসবে! পুরানো ক্ষত মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো যেনো। রাইসুল সাহেব থ মেরে বসে রইলেন। রাহেলা এসে বসলেন স্বামীর হাত চেপে। মুখোমুখি করিডরের ওপাশে একই ভঙ্গিতে বসা রাসেদ সাহেব আর রাহিয়ান সাহেব। নিয়াজ, নয়ন, অমিত, নাঈম, তমা সহ বাদবাকিরাও কথা বলতে ভুলে গেলো বোধহয়। ঈশানের কোনো আপডেট এখনো জানানো হচ্ছে না। আর কতক্ষণ লাগবে সেটাও বুঝতে পারছে না কেউ। কে কাকে শান্তনা দেবে! কি বলেই বা দেওয়া যায়। রাইসুল সাহেব মুখ খুললেন দীর্ঘ সময় পর। মলিন হেসে অসহায় গলায় বললেন,
—’ আমার যখন বিশ বছর বয়স, তখন তনয়ার জন্ম হয়। বন্ধুবান্ধব রা প্রচন্ড হাসাহাসি করতো। যে বয়সে আমার বিয়ে করার সময়, সে বয়সে আমার নাকি একটা বোন হয়েছে। আমি অবশ্য বিষয়টাকে খুব আদুরে হিসেবে নিলাম। আমি নাকি ওর বাপের বয়সি। হলোও তাই। আব্বার বয়স হয়ে গিয়েছে বেশ, আমরা তিন ভাই মাথায় করে রাখতাম একপ্রকার। ও বড় হতে হতে আমরাও ম্যাচুয়র হয়ে গেলাম। আরও আদর বাড়লো আমার বোনটার। বড় হলো, বিয়ে দিলাম, ওর একটা সংসার হলো। বছর কয়েকের মাথায় ওর কোল আলো করে আমার তিতির মা এলো। কি যে খুশি তখন আমার বোনটা। আমরা তিনভাই তো ওর থেকেও খুশি। আমার পুতুলের ঘরে আরেকটা পুতুল এসেছে। আমার ছোট্ট তনয়া, আমার বোন, আমার জানের ঘরে নাকি বাচ্চা এসেছে। সবাই জানেই এটা, সব ছেলেমেয়ের থেকে তিতির, নিশি আর নূরি আদরের বেশি। আমার বাড়ির মেয়েরা সবথেকে আদরের। তনয়া আর হেলাল দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করলো আচমকা। আমাদের সংসার টাকে এলোমেলো করে দিয়ে চলে গেলো। আমানত রেখে গেলো। আমার তিতির মা টাকে। ও যে আমার নয়, আমার বোনের সন্তান, এটা আমি আজীবন ভাবতে নারাজ ছিলাম। আজীবনই। একসময় আমার ছেলের বউ করে ওকে নিয়ে আসলাম ঘরে। বাকিদের মতো হয়তো হৈ হল্লা করে নিজের খুশি্টা প্রকাশ করা হয়নি। কিন্তু ও বাদবাকি জীবন আমার বাড়িতেই থাকবে। আমার চোখের সামনেই থাকবে। এটা ভাবতেই খুশিতে আত্মহারা হতাম আমি। ওর চোখমুখ অবিকল আমার তনয়ার মতো। ‘
থমালেন ভদ্রলোক। কোন কারনে এ-সব বলছেন তিনি তা বোধহয় নিজেও জানেন না। অসহায় চোখমুখ নিয়ে পাশাপাশি দু’টো অপারেশন থিয়েটারের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ভাবলেশহীন কন্ঠে বললেন,
—’ তবে যদি বলি, আমি আমার একরোখা ছন্নছাড়া বদমেজাজি ছেলের সাথে আমার তিতির মা’কে কখনো ভাবিনি। এটাও হয়তো এখন শুনতে খারাপই লাগবে। তবে ভাবিনি, সত্যিই ভবিনি। তবে যখন বিয়েটা হয়েই যায়, ওদের একটা সংসার হবে। আমার ছেলেটা ওকে আগলে নেবে, ভালোবাসা দেবে। এটা দেখার স্বপ্ন আমার বহুদিনের। তিতির হাসবে, আমার ছেলেটার কাছে আবদার করবে এটা- সেটার। আমাদের নাতিনাতনি আসবে। এত গভীর কল্পনা করারও সাহস পেতাম না আমার রুক্ষ ছেলেটার ভয়ে… অথচ আমার ছেলের কথাই ঠিক। ভালোবাসা হয়েছিলো ওদেরও। ভালোবাসার চিহ্ন আসতো আমার বাড়িতে। দেওয়ান বাড়িতে খুশির বন্যা বয়ে যেতো। খোদা নিষ্ঠুর। বড্ড নিষ্ঠুর। ‘
রাইসুল দেওয়ান বসে থাকতে পারলেন না সেখানটায়। ভদ্রলোক হয়তোবা কাঁদতে চলেছেন এখন। পরিবার, আত্মীয়, ছেলেমেয়েগুলো– সবার সমানে সেই যদি ভেঙে পরে। সেটা কি ভালো দেখায়! পাঞ্জাবি টা টেনেটুনে ঠিক করতে করতে দ্রুত পায়ে প্রস্থান করলেন সেখান থেকে।
রাহেলাকে দু’পাশ থেকে জড়িয়ে ধরলো নূরি আর নিশি। হু হু করে কেঁদে উঠলো দু’বোন। নিশি মায়ের বাহুতে মুখ গুজে অস্পষ্ট গলায় বললো,
—’ এমন কেনো হলো আমাদের সাথে মা? আমাদের বার্বি টা… জীবনের শুরুতেই কত বড় একটা ধাক্কা পেলো। কি করে সামলাবে ও। কি জবাব দেবো আমরা ওকে…’
রাহেলা নিজেও স্তব্ধিত আজকে। খোদার কাছে অভিমান জানাবে নাকি অভিযোগ বুঝে উঠতে পারলো না সে। জন্মের দু বছরের মাথায় বাপ – মা হারিয়েছে মেয়েটা। নিজের স্মৃতির মানসপটে কোত্থাও নেই ওর বাপ-মায়ের স্মৃতি। যা আছে সবই একপ্রকার কাল্পনিক। ছবিতে দেখে এসেছে বরাবরই। আর পরিবারের সবার গল্প গুজবে তৈরি করে নিয়েছে একটা পরিবার। সেই হতভাগীকে গোটা জীবন আগলে এসেছে। মায়ের স্নেহে বড় করেছে। মেয়ে থেকে ছেলের বউ করেছে। আজ সেই মেয়েটা তার মা হতো। তার একমাত্র ছেলের অংশ জন্ম নিতো ওই মেয়েটার থেকে।
—’ তিতির কে তোরা কিচ্ছু জানাবি না কেমন? ‘
—’ জানাবো না। ‘
—’ ঈশানকেও জানাবি না। ‘
নিশি নাক টানে। বিরবির করে বলে,
—’ বাবা – মা হতে যাচ্ছিলো ওরা। ওদের জীবনেও এতো বড় একটা সংবাদ কি করে এড়িয়ে যাবো আমরা, মা? ‘
—’ তো কি জ্ঞান ফেরা মাত্র জানাবো ওদের এতবড় একটা দুঃসংবাদ। মানতে পারবে ওরা? বাঁচতে পারবে এটা শুনে? ‘
—’ মা…’
ফুপিয়ে উঠলো নিশি। নূরিও আঁচলে মুখ গুঁজে কাঁদছে তখন থেকেই। রাহেলা খোদার কাছে চুপচাপ কি অভিযোগ জানালো সেটা জানা গেলো না। তবে মুখে বললো,
—’ খোদার জিনিস, খোদা নিয়ে গিয়েছে। ওর আয়ু ছিলোই না পৃথিবীতে। কি করে আসতো? তবে, আমার মেয়েটাকে এতবড় শাস্তি খোদা না দিলেও পারতো। একজন মেয়ে মা ছাড়া, আর নিজে মা হওয়া ছাড়া – সম্পূর্ণ অসহায়। আমার মেয়েটা নিজের এইটুকু বয়সে দু’টো যন্ত্রনাই অনূভব করলো।
কতবড় হতভাগ্য আমার ছেলেমেয়ে দু’টো। যে সংবাদ টা শোনার জন্য মানুষ দিনের পর দিন অপেক্ষা করে। ওদের জীবনেও এমন একটা সংবাদ আসলো অথচ… মৃত্যু সয্যায় শুয়ে জানতেও পারলো না বাবা – মা হতে যাচ্ছিলো দুজনে। আমার অভাগী মেয়েটা, আমার ওই রগচটা, একরোখস ছেলেটার অংশ পেটে ধরেছিলো। স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে, সন্তান খুয়িয়ে বসালো। এদিকে খোদা স্বামীকেও…’
ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন তিনি। খোদার মর্জির ওপর আর কি-ই বা করতে পারেন তারা!
রাইসুল দেওয়ান ফিরে এলেন বেশ খানিকটা সময় পরেই। চোখমুখে অস্বাভাবিক দেখাচ্ছে। রক্তিম হয়ে আছে। ভদ্রলোক যে চোখের পানি ফেলে এলেন তা তার মুখটা দেখেই বুঝতে পারা যাচ্ছে। পায়জামার অংশ গোটানো আর মাথায় টুপি দেখে বোঝা গেলো নামাজে গিয়েছিলেন হয়তোবা। যেমনটা রেখে গিয়েছিলেন ফিরে এসেও একইভাবে অপেক্ষা করতে দেখতে পেলেন পরিবারের সবাইকে। সাজিদ আর তিতিরকে খানিক পরে ওটি থেকে বের করে ইমারজেন্সি তে নিয়ে যাওয়া হবে। কঠোর তদারকি তে থাকবে দু’জন। দু’জনেই চব্বিশ ঘন্টা যাওয়ার আগে জ্ঞান ফেরার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
রাইসুল সাহেবকে দেখে নয়নই এগিয়ে গেলে আগে। মলিন গলায় বললো,
—’ বড় আব্বু, তুমি একটু স্থির হয়ে বসো। কিচ্ছু হবে না ভাইয়ারও। এতো টেনশন করার কিচ্ছু নেই। ‘
রাইসুল সাহেব বসলেন ঠিকই। তবে নয়নের কথায় পাত্তা দিলেন না। গম্ভীর গলায় বললেন,
—’ তোমাদের আমি কিছু কথা জানাতে চাই। আমার সিদ্ধান্তও বলতে পারো। তার আগে এখানে উপস্থিত সবাই জবাব দাও তো। তোমরা কে কে ঈশানের পরিচয় জানতে? ‘
কাচুমাচু করে উঠলো রাহেলা, নাঈম, নিয়াজ আর অমিতের মুখটা। ঠোঁট টিপে নত হলো মস্তিষ্ক। বাকিরা জানতো না। জেনেছে ওদের এই এক্সিডেন্টের পরে। স্ত্রী কে কিছু বললেন না তিনি। তবে ছেলের বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—’ জানতে তেমরা? ‘
জবাব দিলে নাঈম। বিনয়ের সাথে বললো,
—’ আগে জানতাম না আংকেল। কয়েকমাস যাবৎ…’
মুখের কথার দখলদারি নিলেন ভদ্রলোক। কঠিন গলায় বললেন,
—’ আমি যে ওর এই প্রফেশনটা বহু বছর আগেই নাকচ করে দিয়েছিলাম। জানতে না তোমরা?’
—’ জানতাম। ‘
—’ ওইসময় টায় তোমার বন্ধুর সাথে উঠতে বসতে আমার অশান্ত হতো। অবাধ্য ছিলো সে বরাবই। আমি কখনো চাইতাম না ওর এই পেশা। কতদিন তোমরা ওকে আমার বাড়িতে বুঝিয়ে শুনিয়ে নিয়ে এসেছো। মনে আছে?’
—’ আছে আংকেল। ‘
—’ তাহলে! তোমাদের আন্টির কথা না-ই বলি। সে তার ছেলের কথায় এতেটাই গলে গিয়েছিলো যে। নিজের স্বামীর সাথে বিশ্বাস-ঘাতকতা করে গিয়েছে। বরাবরই জানতো সে। অথচ আমাকে জানানোর প্রয়োজন টাও বোধ করেনি। আমি ওর বাপ। খারাপ চাইতাম ওর?’
নিয়াজ বোঝানের চেষ্টা করেন ভদ্রলোককে। তিনি খেপলেন দ্বিগুণ। ধমকে উঠলেন একপ্রকার।
—’ দেশের ভালো? তাই নাকি! দেশের ভালো, জনগনের ভালো, সব্বার ভালো করতে গিয়ে, সে তার পরিবার কে সুরক্ষা দিতে পারেনি। আগের জীবন বাদই দিলাম। বিয়ে করেছে। নতুন আরেকটা জীবন, আরেকটা মানুষের নাম জুড়ে গিয়েছে তার নামের সাথে। তার থেকেও লুকিয়েছে এই সত্য।’
—’ আংকেল, তিতিরের ভালো জন্যই..।’
—’ চুউপ। ‘
গর্জে উঠলেন তিনি। দাঁতে দাঁত পিষে বললেন,
—’ কার ভালো হলো? আমার মেয়েটার কিসের ভালো হলো? বলো? জবাব দাও। সে দেশের ভালো করতে গিয়ে পরিবার আগলে রাখতে ভুলে গেলো। বিয়ে করলো, অথচ বউয়ের সুরক্ষা করতে ভুলে গেলে।’
সবাই চুপ, হাসপাতালের করিডরে উপস্থিত সব্বাই। পুলিশের লোকজনও ছিলো বেশ কয়েকজন। তারা বোধহয় পারিবারিক আলোচনার থাকতে চাইলো না। সরে গেলো এখান থেকে। ভদ্রলোক হিসহিসিয়ে উঠলেন,
—’ বউ, সন্তান দু’টো জিনিসকেই রক্ষা করতে ব্যার্থ সে। তার পুরুষ জন্ম ব্যার্থ। তার জন্য, তার পেশার জন্য তার বউ আজ মৃ ত্যু সয্যায়। শত্রুর গু লি তার সন্তান কে পেটের ভিতরেই ক্ষতবিক্ষত করেছে। ভাবতে পারছো? ওর একরোখামি, অবাধ্যতার দাম কাকে দিতে হলো? তিতির কে…’
ভদ্রলোক দম ফেললো জোরে জোরে। স্ত্রীর দিকে তাকালেনও না একবার। বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ঈশানের ওটির দিকে দৃষ্টি তাক করে দাতে দাঁত পিষে করা গলায় বললেন,
সাঁঝের মায়া পর্ব ৭০ (৩)
—’ আর নয়! যা হবার হয়ে গিয়েছে। ওই অবাধ্য, বেতমিজ ছেলের সংসার আমি আর তিতিরকে করতে দেবো না। আমি এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত নিজে করবো। তিতির মা’কে আমি আলাদা করবো এই ছেলের থেকে।অনেক দূরে নিয়ে যাবো। ওদের ডিভোর্স করাবো। একটা সাধারণ, সাধাসিধা, সংসারি ছেলের সাথে বিয়ে দেবো। এটাই আমার শেষ কথা। আমার জবান দেওয়া রইলো এটায়। কেউ এটায় বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করলে মরা মুখ দেখবে আমার। ‘
