Home অভিসৃতি অভিসৃতি পর্ব ২৭

অভিসৃতি পর্ব ২৭

অভিসৃতি পর্ব ২৭
নওরিন কবির তিশা

সেদিনের পর কেটে গিয়েছে আরো দু’দিন। নব দম্পতির সংসার শুরু হয়েছে অন্য ধাঁচে। দুজনেই বর্তমানে শিক্ষার্থীর হওয়ায়, দু’পরিবার ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, দুজন আপাতত পরিবারের সঙ্গেই থাকবে। অতঃপর পড়াশুনার সমাপ্তি ঘটিয়ে ইভান যখন নিজের পায়ে দাঁড়াবে, ঠিক তখনই না হয় ওরা আলাদা সংসার পাতবে।
এবং আপাতত পরিবারের খরচেই ওদের পড়াশোনা ও আনুসঙ্গিক বিষয়াদি চলবে। কিন্তু এই প্রস্তাবে ঘোর আপত্তি জানিয়েছিল আত্মমর্যাদাশীল ইভান। শেষমেশ সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্তে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে, তূজার স্বাভাবিক চলাফেরা ও নিজস্ব খরচের দায়িত্ব ইভান নিজেই বহন করবে, তবে নিজের সাধ্যের সীমাটুকুর ভেতরেই। আর বাদবাকি বিষয়াদির খেয়াল পরিবারই রাখবে।

এদিকে….
আহসান কুঞ্জের দিনগুলো কাটছে স্বাভাবিক নিয়মেই। সেদিন রাতের ফ্লাইটেই জরুরিভিত্তিতে দেশের বাইরে যেতে হয়েছে দুর্জয়কে। কবে নাগাদ ফিরবে, কিংবা কোন দেশে গিয়েছে, সে বিষয়ে কায়রাকে স্পষ্ট করে কিছুই বলে যায়নি লোকটা। লোকটা এমনই, দীর্ঘদিন বাদে এসে ক্ষণস্থায়ী পবনের ন্যায় ছুঁয়ে যায় কায়রাকে। মায়ার পরিমাণ সহস্র গুন বাড়িয়ে, পরক্ষণেই বিদায় নেয়। হৃদয় ভারাক্রান্ত হলেও সর্বক্ষণের মতো নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে কায়রা। অবশ্য, সাজেদা চৌধুরীর মত মানুষের সঙ্গ পেলে, মন খারাপের উপায় কোথায়?
সেই সঙ্গে পরিবারের সকলের ভালোবাসা তো রয়েছেই।সকাল থেকেই কায়রা ইথিকার রুমে গল্পে মশগুল। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে কাজ টুকিটাকি সারছে ইথিকা।কথা প্রসঙ্গে কায়রা কিঞ্চিৎ কৌতূহলী হয়ে শুধাল,,

“আচ্ছা আপু, একটা কথা জিজ্ঞেস করব? কিছু মনে করবেন না তো?”
ইথিকা হাতে থাকা কাপড় গুছিয়ে রেখে মৃদু হেসে বলল,,
“কী কথা? আরে বলো না, এতে মনে করার কী আছে?”
কায়রা চঞ্চল চোখে চাইলো,,
“আপনাদের তো লাভ ম্যারেজ শুনেছিলাম! কিন্তু আপনাদের লাভ স্টোরিটা ঠিক কীভাবে শুরু হয়েছিল, সেটা তো আর জানা হয়নি। শুনতে ভীষণ ইচ্ছে করছে!”
ইথিকা কায়রার কিঞ্চিৎ উৎসুক মুখখানিতে চেয়ে মৃদু হাসল। স্মৃতির পাতায় ডুব দিয়ে বললো,,
“তেমন সিনেম্যাটিক কোনো গল্প নয়, জুনিয়র! উজান আর আমি একই কলেজে পড়তাম। আমার গ্রামের বাড়ি দাকোপে। তখন বাবা না থাকায় আমি খুলনায় মামাদের বাড়িতে থেকেই পড়াশোনা করতাম। উজান আমার এক ইয়ার সিনিয়র ছিল। নোট’স আর ইম্পর্ট্যান্ট লেকচার শিট নেওয়ার বাহানাতেই প্রথম কথা হয় ওর সাথে। উজান মানুষ হিসেবে ভীষণ রেসপন্সিবল আর হেল্পফুল ছিল। কথা বলতে বলতে বেশ ভালো একটা ফ্রেন্ডশিপ আর আন্ডারস্ট্যান্ডিং গড়ে ওঠে আমাদের মাঝে। ওই নরমাল ফ্রেন্ডশিপ থেকেই আস্তে আস্তে ফিলিংসের গ্রোথ… প্রায় দু’বছরের রিলেশনশিপ ছিল আমাদের। তারপর দুই ফ্যামিলিকে জানিয়ে খুব সিম্পলভাবেই আমাদের বিয়েটা হয়।”
কায়রা বেশ মনোযোগী হয়ে শুনছিল।ইথিকার কথা শেষ হতেই, ও প্রশস্থ হেসে বলল,,
“বাহ্ আপু! আপনি এটাকে নর্মাল বলছেন? আমার কাছে এগুলো অ্যাডভেঞ্চার টাইপ! কলেজ লাইফের লাভ স্টোরিগুলো সত্যিই ভীষণ সুইট হয়!”

“হুম! তবে আমাদের তত কিছু ছিল না। বিয়ের আগ পর্যন্ত ও প্রচন্ড গম্ভীর ছিল। যা কথাবার্তা,ফাজলামি,ঘোরাঘুরি সবকিছু আমিই করতাম। ওশুধু আমার আবদার পূরণ করতো।”
কায়রার হাস্যজ্জল মুখে চেয়ে, ইথিকা পুনরায় বলল,,
“তবে একটা ব্যাপার জানো? অনেকে বলে, ম্যারেজ ইজ স্ক্যারি। ইদানিং, আরো বেশি শুনি শব্দটা। তবে উজান পাশে থাকলে, আমার মনে হয় এই মতবাদ দেওয়া মেয়েগুলোকে ডেকে এনে আমি দেখিয়ে দি, সঠিক মানুষের হাত ধরলে ম্যারেজ কক্ষনো স্ক্যারি হয় না। স্ক্যারি তো তখন হয় যখন, আমরা ভুল মানুষকে বেছে নেই!”
হঠাৎ,কথাটা শেষ করতেই ইথিকার চেহারাটা কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। আচমকা মাথাটা তীব্র বেগে চক্কর দিয়ে উঠতেই ও বিছানার চাদরটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে চোখ দুটো বুজে ফেলল। কায়রা তৎক্ষণাৎ উদ্বিগ্ন হয়ে ইথিকার কাঁধে হাত রেখে ব্যাকুল কণ্ঠে শুধাল,,
“কী হয়েছে, আপু? শরীর খারাপ লাগছে?”
ইথিকা সঙ্গে সঙ্গে বিছানায় বসে নিজেকে সামলে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে কপালে হাত চেপে ধরে ক্ষীণ গলায় বলল,,

“না জুনিয়র, আই থিংক সিরিয়াস কিছু নয়… মেবি লো আয়রনের প্রবলেমটা ইদানিং বেশ বেড়েছে। হঠাৎ মাথাটা ব্ল্যাঙ্ক হয়ে যায়। ডক্টরের কাছে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া দরকার। যাই হোক, উজান অফিসের কাজে খুলনার বাইরে গিয়েছে।ফিরলেই ডক্টরের কাছে যাব আমরা। আই থিংক আই নিড সাম রেস্ট একটু শুলেই ঠিক হয়ে যাবে…”
ও সবে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই দরজার ধার থেকে মিষ্টি কণ্ঠে কুহু ডেকে উঠল,,
“মাম্মাম! মাম্মাম! হাঙ্গ্রি!”
ইথিকার শরীরটা এতটাই দুর্বল লাগছিল যে,উঠে দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও পাচ্ছিল না ও। কায়রা পুরো বিষয়টা অনুধাবন করে চটজলদি এগিয়ে গিয়ে কুহুকে কোলে তুলে নিল। অতপর কুহুর তুলতুলে গালে চুমু এঁকে বলল,,
“আজকে আমার লিটল প্রিন্সেসকে তার মামুনি খাইয়ে দেবে, ওকে মাই চকোলেট? মাম্মার আজকে একটু ঘুম দরকার।”
কুহুর সাথে কায়রার এমনিতেই বেশ সখ্যতা। তাই ও আনন্দচিত্তে কায়রার গলায় দু’হাত জড়িয়ে ধরে মিষ্টি হেসে ও বলল,,

“ওক্কে মামুনি! চলো!”
ইথিকা মৃদু হেসে, কৃতজ্ঞতার সুরে কায়রার উদ্দেশ্যে বলল,,
“থ্যাংক ইউ সো মাচ, জুনিয়র! ও খুব বেশি দুষ্টুমি করলে, আমাকে জাস্ট একটা ডাক দিয়ো।”
“একদম চিন্তা করবেন না আপু, আপনি শান্তি মতো রেস্ট নিন!”

পার্কের নির্জন এক কোণ, কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে পাতা কাঠের বেঞ্চটিতে পাশাপাশি বসে ছিল ইভান ও তূজা। গায়ে শীতের মিঠে রোদ এসে আঁচড় কাটছে বারবার, তবে হালকা হাওয়ায় হিমেল ভাবটাও বেশ স্পষ্ট। ইভান পকেট থেকে, যত্ন করে মোড়ানো ছোট্ট প্যাকেট বের করে তূজার দিকে বাড়িয়ে দিল।কৌতুহলী তূজা হাত বাড়িয়ে নিতেই দেখলো ডজন খানেক র’ক্ত বর্ণের কাঁচের চুড়ি সেথায়। রৌদ্রের আলোয় চুড়িগুলোর দ্যুতি ঠিকরে পড়ছে, পছন্দের জিনিস পেয়ে খুশিতে বেচারী উদ্ভট প্রশ্ন করে বসলো,,
“আমার জন্য?”
“উমমম…এখানে তো অন্য কাউকে দেখছি না!”
ইভানের ফাজলামিতে তূজা চোখ পাকিয়ে তাকাতেই,ও বোকা হাস্যে ঘাড় চুলকে বললো,
“তা,পছন্দ হয়নি?”
তূজা ওর দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে, হাতে চুড়িগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে একগাল হেসে বলল,
“পছন্দ আবার হবে না? অসাম হয়েছে! থ্যাংক ইউ!”

চুড়িগুলো এক এক করে হাতে গলিয়ে নিতে নিতে তূজা খুশিতে বাগবাকুম হয়ে নানা কথার ঝাঁপি খুলে বসল। ইভান চুপচাপ মুগ্ধ চোখে তূজার উচ্ছ্বলতা দেখছিল। কিন্তু হুট করেই ওর মনে হলো, কোথায় যেন একটা সুর কাটছে! তূজা গল্প করছে ঠিকই, কিন্তু কোনো ওকে সরাসরি কোনো সর্বনামে সম্বোধন করা এড়িয়ে চলছে সন্তর্পণে।ইভান হঠাৎ খপ করে তূজার হাতটা চেপে ধরে একটু বাঁকা চোখে তাকাল।
“ওয়েট আ মিনিট! তুই পুরো সময়টায় আমাকে কীভাবে যেন এড়িয়ে কথা বলছিস! হঠাৎ এমন অদ্ভুত বিহেভ করার রিজন কী? সামথিং রং?”
তূজা আচমকা ধরা পড়ে গিয়ে থতমতো খেয়ে গেল। মুখের চঞ্চল ভাবটা নিমেষেই উধাও হয়ে, একগাল কাচুমাচু হাসি হেসে নিচের দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ।ইভান আবার তাগাদা দিল,
“কী হলো? চুপ করে আছিস কেন?”
তূজা এবার বেশ দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
“আসলে… মানে… তোকে এখন আগের মতো একদম ‘তুই’ করে বললে কেমন একটা দেখায় না? কেমন যেন অদ্ভূত লাগে!”
ইভান ভ্রু কুঁচকে শুধাল,

“কেন? প্রবলেম কী? এতদিন ধরে তো তুই-ই বলে আসছিস!”
তূজা হাতের চুড়িগুলো নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করে মুখ নিচু রেখেই, মিহি গলায় বলল,
“তখনকার বিষয় আর এখনকার বিষয় কি সেম? এখন তো… এখন তো তুই আমার অফিশিয়ালি হাজব্যান্ড! হাজব্যান্ডকে নাকি তুই করে বলতে নেই, বড়রা শুনলে কী ভাববে বল তো?”
তূজার মুখ থেকে ‘হাজব্যান্ড’ শব্দটা শোনামাত্র ইভানের হৃদস্পন্দন ছন্দ হারালো মূহুর্তের তরে। আনন্দের ঢেউয়ে উচ্ছ্বাসিত হলো বক্ষপিঞ্জর। ইভান নাটকীয় ভঙ্গিতে বাম বুকের ওপর ডানহাতটা চেপে ধরে বলল,
“আহ্! কী শান্তি! এত কাঠখড় পুড়িয়ে শেষমেষ কাঙ্খিত মুখ থেকে হাজব্যান্ড শব্দটা শুনতেই পেলাম ! আই কান্ট বিলিভ মাই ইয়ার্স!”
তূজা কাল্পনিক রাগে মুখ হাঁড়ি করে বলল,,
“ড্রামা বন্ধ করবি একদম! আমি খুব সিরিয়াসলি বলছি। আজ থেকে ‘তুই’ বলা একদম বন্ধ। তুইও আমাকে তুমি করে বলবি, আমিও তোকে তুমি করে বলব। তুই করে বললে কেমন একটা আনকালচারড আর ফরমালিটির অভাব মনে হয়!”
তূজার মুখ থেকে এক নিঃশ্বাসে নির্গত ‘তুই’ আর ‘তুমি’র এই অদ্ভুত খিচুড়ি শুনে ইভান আর নিজের হাসি ধরে রাখতে পারল না। শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“ওয়াও! কী ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া! তুই নিজেই পুরো বাক্যে পাঁচবার ‘তুই’ ব্যবহার করে বলছিস ‘তুই’ বলা যাবে না! আর সিরিয়াসলি, এখন থেকে এত বছরের হ্যাবিট চেঞ্জ করে ফরমাল হতে হবে?”
তূজা একটু লজ্জা পেয়ে মাথা নোয়ালো,কিন্তু নিজের যুক্তিতে অটল থেকে বলল,
“আরেহ্! ফার্স্ট ফার্স্ট একটু প্রবলেম তো হবেই! প্র্যাকটিস করতে করতে একদম পারফেক্ট হয়ে যাবে, ইয়্যু উইল সি! সুতরাং, একদম নো অবজেকশন!”
ইভান তূজার বাচ্চাদের মতো ব্যার্থ গম্ভীর মুখখানার দিকে চেয়ে, আলতো করে ওর কপালে নিজের কপাল ছোঁয়াল।
“জো হুকুম বেগম সাহেবা।”

জাতীয় নিরাপত্তার চরম ঝুঁকি রুখতে, গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে শুরু হয়ে গিয়েছে মহা-অপারেশন। চার বড় মহানগরে-ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেটে একযোগে নাশকতা চালানোর যে ছক কষা হয়েছিল, তার মূল হোতাদের আজই একজালে গোটানোর মোক্ষম সুযোগ। ওদের সুসংগঠিত চক্রান্ত ভেস্তে দিতে চার মহানগরে চারজন বিচক্ষণ সেনা অফিসারের নেতৃত্বে শুরু হয়েছে বিশেষ যৌথ অভিযান।
খুলনা অঞ্চলের অপারেশনের দায়িত্ব ন্যস্ত দুর্জয়ের ওপর।রূপসা ঘাটের কাছে এক অখ্যাত, ঝুপড়ি চায়ের দোকান। ধোঁয়া ওঠা মাটির কাপ হাতে এক কোণে বসে আছে আজমল। বিগত দুই মাস ধরে পলাতক থাকা দাগী আসামি ও। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখে ও পলাতক হলেও, মূলত ওকে ইচ্ছা করেই অবাধে ঘুরতে দেওয়া হয়েছিল এক বিশেষ রণকৌশলের অংশ হিসেবে।
আজমলের থেকে কয়েক হাত দূরে, অতি সাধারণ এক সুতি শার্ট আর জিন্স পরে কাঠের বেঞ্চে বসে ধূমায়িত চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলো দুর্জয়। কানে গোঁজা অতি সূক্ষ্ম ওয়ারলেস ইয়ারপিসে ভেসে আসছে বাকি সদস্যের স্পষ্ট কণ্ঠ,
“স্যার, বাকি তিনজনের লোকেশন ট্রেসড। ওরা অলরেডি নিজেদের মূল আস্তানার দিকে মুভ করছে।”
দুর্জয় নিচু স্বরে উত্তর দিল,

“কপি দ্যাট। আমার টার্গেট এখনো চায়ের টঙে। ডোন্ট মেক এনি র‍্যাশ মুভ আনটিল আই গিভ দ্য অর্ডার।”
কিছুক্ষণ বাদে আজমল মেলাই ধীরেসুস্থে চায়ের দাম মিটিয়ে একটা গলির ভেতর সাঁটালো। দুর্জয়ও বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সতর্ক পায়ে অনুগমন করল। গলি পেরিয়ে আজমল উঠে পড়ল একটা স্থানীয় লোকাল বাসে। দুর্জয়ও কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে চেপে বসল সেই একই যানবাহনে।
এরপর শুরু হলো এক চতুর ক্যাট-অ্যান্ড-মাউস গেম। আজমল সর্বমোট তিনবার তার বাহন বদল করল। বাস থেকে নেমে অটো, তারপর এক পুরোনো প্রাইভেট কার। দুর্জয়ও নিখুঁত কৌশলে প্রতিবার নিজের গাড়ি বদলে পিছু ধাওয়া বজায় রাখল, যাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ না জাগে।
অবশেষে গাড়িটি এসে থামল খুলনার রূপসা রূপসী রূপায়ণ প্রজেক্টের কাছে, এক ছমছমে নিস্তব্ধ জনমানবহীন এলাকায়। ঘন ঝোপঝাড় আর বড় বড় কড়ই গাছে ঘেরা এক পরিত্যক্ত, চারতলা পুরোনো ইটের কাঠামো। ভাঙাচোরা নোনাধরা দেয়ালের বদৌলতে চারপাশে অদ্ভুত ভৌতিক নিস্তব্ধতা।
গাড়ি থেকে নেমেই আজমল চারপাশটা একবার আড়চোখে পরখ করে নিল। কিন্তু হঠাৎই কী মনে করে গাড়ি ঘোরানোর আগেই রিভলভার বের করে চালকের মাথায় গুলি চালিয়ে দিল ও! বিন্দুমাত্র সাক্ষী প্রমাণ রাখতে চায় না লোকটা। চালক র”ক্তাক্ত হয়ে স্টিয়ারিংয়ের ওপর ঢলে পড়তেই আজমল দ্রুত পায়ে চারতলা ভবনের ভেতরে সেঁধিয়ে গেল।

দুর্জয় ততক্ষণে দ্রুত গতিতে অকুস্থলে পৌঁছেছে। তৎক্ষণাৎ কানে গোঁজা ইয়ারপিসে সংক্ষিপ্ত কণ্ঠে নির্দেশ ছুঁড়ল ও,
“টিম বি, ইমিডিয়েটলি কভারিং স্পটে একটা সিভিল অ্যাম্বুলেন্স পাঠাও! ড্রাইভারে ব্লিডিং হচ্ছে, হি নিডস ইমিডিয়েট মেডিকেল এটেনশন!”
ততক্ষণে ইয়ারপিসে বাকি তিন টিমের কনফার্মেশন ভেসে এসেছে,অন্য তিন সন্দেহভাজনও এই ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেছে। পুরো চারতলা বিল্ডিংটি ইতিমধ্যেই সেনাবাহিনীর স্পেশাল কমান্ডো ও গোয়েন্দা সদস্যদের দ্বারা নিঃশব্দে ঘেরাও করে ফেলা হয়েছে। কোনো ইঁদুরও এই ব্যূহ ভেদ করে বের হতে পারবে না।
দুর্জয় নিজের কোমর থেকে ৯ এমএম ট্যাকটিক্যাল পিস্তলটা বের করে এক ঝটকায় লোড করল। ঘেরাও করে থাকা টিমের উদ্দেশ্যে ইয়ারপিসে পুনশ্চ নির্দেশনা ছুঁড়লো,,
“লিসেন এভরিওন, ভেতরে বিশাল এক্সপ্লোসিভের মজুদ থাকতে পারে। সো,নো ক্যাজুয়ালটি ফ্রম আওয়ার সাইড! অস্ত্র রেডি রাখো, সিগন্যাল পাওয়া মাত্রই ব্রিচ করবে। গো, গো, গো!”

পরিত্যক্ত চারতলা দালানটার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ বড্ড থমথমে। প্রচন্ড আধারাচ্ছন্ন চারপাশের সোঁদা গন্ধ, নোনাধরা দেয়াল আর ইটের ধুলোবালিতে সাধারণ মানুষের দম বন্ধ হবে নিঃসন্দেহে। দুর্জয়ের নির্দেশে কমান্ডো দল নিঃশব্দে ভবনের প্রধান ফটক ও পেছনের জরুরি বেরোনোর পথ কর্ডন করে ফেলল। দরজার মুখে পিস্তলের সাইলেন্সার উঁচিয়ে প্রথম প্রবেশ করল ক্যাপ্টেন মেহমেদ ও দুর্জয়।
মুহূর্তের মধ্যেই নির্জনতা চিরে গর্জে উঠল অস্ত্র! সন্ত্রাসীরা কমান্ডোদের উপস্থিতি টের পেতেই এলোপাতাড়ি ব্রাশফায়ার শুরু করল। ইটের টুকরো আর কংক্রিটের ধুলোয় একাকার হয়ে গেল সমগ্র করিডোর।
“কভার নাও! রিটার্ন ফায়ার!”
দুর্জয় চেঁচিয়ে নির্দেশ ছুঁড়েই পিলারের আড়ালে পজিশন নিল। কমান্ডোদের নিখুঁত কাউন্টার অ্যাটাকে দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হলো র’ক্ত’ক্ষয়ী গোলাবর্ষণ । ৯ এমএম আর একে-৪৭ এর ভয়াবহ শব্দে কেঁপে উঠল ভুতুড়ে দালান। একপর্যায়ে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে এক সন্ত্রাসী আড়াল থেকে আচমকা ফায়ার করলে এক সোর্সের তাজা গুলি এসে লাগে ইয়াং কমান্ডো মেহেদির বুকে! ঘটনাস্থলেই ঢলে পড়ল ছেলেটা। শহীদের তাজা র’ক্তে রঞ্জিত হলো মেঝে।
“মেহেদি!”

আর্তচিৎকার করে উঠল পাশে থাকা আরেক সেনা সদস্য, মুহূর্তেই তার পায়ে এসে বিঁধল দ্বিতীয় গুলিটি। র’ক্তে ভিজে তলপেট চেপে ধরে লুটিয়ে পড়ল সে-ও। সহযোদ্ধার পতনে দুর্জয়ের কৃষ্ণচক্ষু হিংস্র থেকে হিংস্রতর হয়ে উঠল। চোখের পলকে পিলারের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে ফায়ার করল ও। দু’জন সন্ত্রাসী বুক গু’লি’বি’দ্ধ হয়ে মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে, পৃথিবীর মায়া কাটালো।
কিন্তু ঠিক তখনই, প্রধান হোতাদের একজন ছাদের সিঁড়ির কোণ থেকে দুর্জয়কে লক্ষ্য করে দু’ রাউন্ড গু’লি ছুলল। প্রথম গু’লিটি দুর্জয়ের বাঁ কাঁধের পাশ ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল, আর দ্বিতীয় তীব্র বুলেটটি তার বুকের ঠিক ডান পাশে পাঁজর ছুঁয়ে মাংস চিরে বেরিয়ে গেল!

“ম্যান ডাউন! স্যার ইজ হিট!”
ইয়ারপিসে আসা শব্দ কর্ণকুহরে ‌ তীব্র বেগে আঘাত হানল। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে দূর্জয়ের, শার্ট চুইয়ে গড়িয়ে পড়েছে তাজা লাল র’ক্ত। কিন্তু ও দমার পাত্র নয়! বাঁ হাত দিয়ে শক্ত করে ক্ষ’তস্থান চেপে ধরে ডান হাতে পিস্তল উঁচিয়ে শেষ শটটি চালাল দুর্জয়। গুলি সোজা গিয়ে বিঁধল ওকে গু’লি ছোঁড়া ড়া ব্যক্তির ডান হাঁটুতে! যন্ত্রণায় চিৎকার করে অস্ত্র ফেলে মাটিতে বসে পড়ল লোকটা।
বাকি সন্ত্রাসীরা চারিদিক থেকে কর্ডন হওয়া সেনা ও পুলিশ সদস্যদের অস্ত্রের মুখে কোণঠাসা হয়ে অবশেষে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন সেই পোড়া করিডোরে দাঁড়িয়ে হাঁফাচ্ছিল দুর্জয়। র’ক্তক্ষ’রণে শরীর ভেঙে আসলেও তার চেহারার দৃঢ়তায় বিন্দুমাত্র চির ধরেনি। স্পেশাল ফোর্সের সদস্যরা তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে দুর্জয়কে ধরে ফেলল।
আজমলসহ বাকি জীবিত অপরাধীদের শক্ত দড়িতে বেঁধে সাঁজোয়া গাড়িতে তোলার নির্দেশ দিয়ে, বিষণ্ণ চোখে মেহেদির নিথরদেহের দিকে তাকাল দুর্জয়। অতি সংক্ষেপে, কেবল নিজের ক্ষ’ত চেপে ধরে ক্ষীণ গলায় বলল,
“মিশন অ্যাকমপ্লিশড… মেহেদিকে সম্মানের সাথে নিয়ে চলো। ইনফর্ম দ্য হেডকোয়ার্টার্স, অল দ্য ট্র্যাশেস আর ক্লিনড।”

ধরণীর বুকে সাঁঝের আঁধার নেমেছে বেশ কিছুক্ষণ। কুহুকে ঘুম পাড়িয়ে ইথিকা কায়রার কাছে এসে বসল। কায়রা চায়ের কাপ গুছিয়ে এনে সবাইকে পরিবেশন করছে। সন্ধ্যাকালীন সংবাদের অপেক্ষায় ড্রইংরুমের সোফায় বসে আছেন ইকবাল আহসান।
কায়রা তাঁর হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপটি তুলে দিয়ে ইথিকার পাশে গিয়ে বসল। ইকবাল আহসান রিমোট চেপে বোবা টেলিভিশনটির প্রাণ ফিরিয়ে দিলেন। স্ক্রিনে ফুটে উঠল একটি চেনা সংবাদ চ্যানেলের চেহারা। হঠাৎই পরিচিত আবহসংগীত থামিয়ে মোটা লাল হরফে পর্দায় ভাসলো শিরোনাম, “আন্তর্জাতিক ভয়াবহতার মাঝে বাংলাদেশ!”
ইকবাল আহসান চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে স্বগত কণ্ঠে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,
“ইদানিং দেশে কী যে সব শুরু হলো! খবর খুললেই শুধু অশান্তি।”

কায়রা মৃদু হেসে ইথিকার দিকে তাকিয়ে গল্প জুড়তে যাবে, ঠিক তখনই উচ্চস্বরে সংবাদ পাঠিকার কণ্ঠ ভেসে এল,
“এইমাত্র পাওয়া সংবাদ,দেশের চার বৃহৎ মহানগরীতে রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্ত ভেস্তে দিতে একযোগে পরিচালনা করা হয়েছে এক বিশাল যৌথ অভিযান। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট এবং খুলনা—চারটি অঞ্চলেই চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও চরমপন্থী গোষ্ঠীকে সশরীরে আটক করতে সক্ষম হয়েছেন সেনাবাহিনীর স্পেশাল কমান্ডো দল…”
ইকবাল আসহান টিভির দিকে একদৃষ্টিতে তাকালেন। ইথিকা আর কায়রাও কৌতুহলী চোখে স্ক্রিনের দিকে চাইল। সংবাদ পাঠিকা বিস্তারিত বলে চলেছেন,

“ প্রথমে খুলনা,এ অঞ্চলের রূপসা সংলগ্ন একটি পরিত্যক্ত ভবনে চলেছে তীব্র র’ক্ত’ক্ষয়ী সংঘাত। অভিযানে চরমপন্থীদের পুরো দলটিকে জীবিত ও মৃত অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হলেও, সন্ত্রাসীদের ছোঁড়া গুলিতে এক সেনাসদস্য শহীদ হয়েছেন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন অভিযানের দায়িত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তা…”
কথাটি শেষ হতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল খুলনা অভিযানে আটক হওয়া ও অপরাধস্থলে নি’হত অপরাধীদের ছবি, অবহেলা ভরে সে দিকে চাইতে, ইথিকার হাত থেকে চায়ের কাপটা শব্দের ঝংকার তুলে মেঝেতে পড়ে নিমেষেই ভেঙে খানখান হয়ে গেল! তপ্ত চা গড়িয়ে পড়ল শ্বেত পাথরের মেঝেতে, কিন্তু সেদিকে নজর দেওয়ার মতো হুঁশ নেই কারোরই।
জায়নামাজ গুটিয়ে ঘর থেকে বের হতে নেওয়া সাজেদা চৌধুরী স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দরজার চৌকাঠে পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কায়রা বিস্ফারিত নেত্রে চেয়ে রইল স্ক্রিনে ভেসে ওঠা শেষ ছবিটায়।

“এটা হতে পারে না! ওটা ও নয়! ওরা-ওরা ভুল দেখাচ্ছে, ওটা-ওটা আমার উজান না। ইয়া আল্লাহ,আমার কি হবে। আমি-আমি….আমার-আমার কুহু!ইয়া আল্লাহহহহহহহ!”
টেলিভিশনের বিশাল পর্দায় ভাসমান উজানের র’ক্তাক্ত নিথর দেহের ছি’ন্ন’ভি”ন্ন অবস্থায়, ইথিকার বুকফাটা আর্তনাদে থরথরিয়ে কেঁপে উঠল নিস্তব্ধ ভবনের প্রতিটি ইট-পাথরও। ঊষা আর কায়রা ওকে কোনোমতে আঁকড়ে ধরে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে, কিন্তু বেপরোয়া ইথিকাকে ধরে রাখা দায়। ইমতিয়াজ আহসান ও ইকবাল আহসান স্তব্ধ হয়ে পাশাপাশি বসে আছেন; আতিকা বেগমকে ধরে রেখেছেন ‌সাজেদা চৌধুরী।
উপায়ান্তর না পেয়ে কায়রা কাঁপা হাতে ফোন বের করে দুর্জয়ের নম্বরে ডায়াল করতে যাবে, ঠিক তখনই ড্রইংরুমের ল্যান্ডলাইন ফোনটি বিকট শব্দে বেজে উঠল। ইকবাল আহসান হন্তদন্ত হয়ে রিসিভারটা তুলে কান লাগালেন,,
“হ্যালো! এটা কি মেজর দুর্জয় আহসানের ফ্যামিলি?”
ইকবাল আহসান শুষ্ক গলায় উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, বলছি…”

“আপনারা আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ইমিডিয়েটলি খুলনা সেনানিবাসে চলে আসুন। মেজর দুর্জয় আহত।”
কিঞ্চিৎ ক্ষণের ব্যবধান।আবারও কল এলো সেনানিবাস থেকে। তবে,এবার আর কোনো নির্ভীক সৈনিকের সম্মানে নয়,একজন দাগি আসামি,দেশপ্রেমিকের হাতে নি’হত একজন দেশদ্রোহীর সংবাদের।উজানের বাবা-মা রীতিমতো বাকরুদ্ধ হয়ে,মৃ’ত ছেলের কুকীর্তি সম্মন্ধে অবগত হচ্ছেন আর ফ্যালফ্যালিয়ে কাঁদতে কাঁদতে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য মেয়েটাকে দেখছেন।
তবে ‌আর বিলম্ব করার সুযোগও নেই। কায়রা চটজলদি ভেতরের রুমে গিয়ে ঘুমন্ত কুহুকে কোলে তুলে নিল। উষা ইথিকাকে জড়িয়ে ওর কাপড় পরিবর্তন না করিয়ে,বেহাল দশা ঢাকতে শুধু মাথায় হেজাব পরিয়ে দিলো। অতঃপর,তারা একত্রে রওনা হলো সেনানিবাসে।

সেনানিবাসের বিস্তৃত উদ্যানজুড়ে দুঃসহ, ভারাক্রান্ত নিস্তব্ধতা। একপাশে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় শহীদ দুই সেনা অফিসারের সারিবদ্ধ কফিন রাখা, একটু পর শুরু হবে জানাজা। অন্যদিকে সারিবদ্ধভাবে রাখা নিহত চার সন্ত্রাসীদের লাশ; যাদের পরিবার এসেছে তাদের হাতে হস্তান্তর করা হচ্ছে, আর বাকিদের আইনানুগ প্রক্রিয়া শেষে তাদের মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
ইথিকার পা যেন আর চলছে না, শরীর ভারী হয়ে আসছে প্রতি পদক্ষেপে। যে মানুষকে সে চিনেছে একজন যত্নশীল, দায়িত্ববান স্বামী হিসেবে-সেই উজান কিনা এক ঘৃণ্য দেশদ্রোহী সন্ত্রাসীরূপে মৃত্যুবরণ করেছে! কিছুক্ষণ আগেও তো ইথিকা কয়রার সাথে গর্বভরে লোকটাকে নিয়ে আলোচনায় মেতে ছিল।অথচ মাত্র কিছুঘণ্টার ব্যবধানে!
এই নিষ্ঠুর সত্যটা মেনে নিতে না পেরে আতিকা বেগম ইতিমধ্যেই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছেন, তাকে সামলাচ্ছেন সাজেদা চৌধুরী। আর ক্ষোভ, অপমানে ইমতিয়াজ আহসান গাড়ি থেকেই নামেননি; রাষ্ট্রদ্রোহী ছেলের মুখ দর্শন করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তাঁর নেই। ঊষা কোনোমতে ইথিকাকে ধরে ধরে পার্শ্ববতী একটা চেয়ারে বসিয়েছে।ঊষা মেয়েটার অবস্থা সবচেয়ে নাজুক।নিজের প্রাণপ্রিয় ভাইকে হারিয়েছে,অথচ পরিবার সামলাতে গিয়ে প্রাণখুলে কান্নারও অবকাশ পাচ্ছে না!ভেতরে ভেতরে গুমরে মরছে মেয়েটা।
অন্যদিকে কায়রার কোলে ঘুমন্ত কুহু ততক্ষণে জেগে উঠেছে। অবুঝ শিশুটিকে নানা মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করছে কায়রা, কিন্তু চঞ্চল কুহু ছটফট করে বারংবার বলছে,

“মামুনি, আমি মাম্মামের কাছে যাব! আর আমরা এখানে কেনো?আমরা কি পালার অফিসে এসেছি? পাপাকে দেখব… পাপা কোথায়?”
কুহুর সেই নিষ্পাপ আবদারে কায়রা বক্ষে তখন তুমুল তুফান।ও কান্না চেপে কোমল স্বরে বলল,
“চল, আমরা তোমার চাচাইয়ের কাছে যাই…”
কিন্তু কুহু নাছোড়বান্দা,
“না! আমি পাপার কাছে যাব!”

উপায় না দেখে কায়রা কিছুটা জোরপূর্বক কুহুকে কোলে নিয়েই,এক বুয়ার সাহায্যে দুর্জয়ের অবস্থানরত কক্ষের দিকে পা বাড়াল। দুর্জয়কে প্রাথমিক চিকিৎসা আর কিছু মেডিসিন দিয়ে রাখা হয়েছিলো। কিন্তু ওর মতো শক্ত মানসিকতার মানবের কাছে এ ক্ষ’ত নিতান্ত নগণ্য, তাই আর বিছানায় থাকার প্রয়োজনবোধ করেনি ও, বেরিয়েছে এসেছে। কায়রাকে কুহুকে কোলে নিয়ে এগোতে দেখে দুর্জয় ধীরপায়ে এগিয়ে এল।
কায়রার কোল থেকে কুহুকে নিজের বাহুডোরে তুলে নিতে চাইল সে। দুর্জয় আঘাতগ্রস্থ জানা থাকায় কায়রা আলতো করে,ওকে সাহায্য করল যাতে ওর ক্ষ’তস্থানে চাপ না পড়ে। দুর্জয়কে দেখতে পেয়েই কুহু তার ছোট ছোট হাত দিয়ে ওর গলা জড়িয়ে ধরে,কয়রার নামে অভিযোগের ডালা সাজিয়ে বসলো,,
“চাচাই,মামুনি ব্যাড হয়ে যাচ্ছে এখন!আমি কতবার বললাম পাপার কাছে যাবো।কিন্তু ও আমায় নিয়েই যাচ্ছে না!”
দুর্জয় কুহুর মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে, মিষ্টি গলায় দুর্জয় বলল,,

“তাহলে,মামুনিকে বলে দি?”
কুহু তৎক্ষণাৎ আপত্তি জানিয়ে বলল,,
“আরে,না না।ও তো ভালোই, শুধু এখন পাপার কাছে নিচ্ছে না!”
দুর্জয় অতি স্বাভাবিক ভাবেই,ওকে বাচ্চা ভোলানোর ছলে বলল,
“জানো মাই লিটল প্রিন্সেস? একসময় মানুষ অনেক বড় হয়ে আকাশের তারা হয়ে যায়। ওই যে রাতের বেলা আমরা স্টার দেখি না? অমন। কেউ একটু আগে আকাশে যায়, কেউ একটু পরে। ধরো, তোমার পাপা আজকে তেমনই একটা ব্রাইট স্টার হয়ে আকাশে চলে গেছে। এখন কেমন হবে বলো তো?”
কুহু নিষ্পাপ চোখে দুর্জয়ের দিকে তাকিয়ে একটু ভেবে
“তাহলে তো আমি আর পাপাকে ছুঁতে পারব না! না না, আমি চাই না পাপা স্টার হোক!”
দুর্জয় নিজের স্বভাবজাত স্থির ব্যক্তিত্ব ধরে রেখে, কুহুর গালে হাত রেখে মিহি স্বরে বলল,
“কিন্তু সবাইকে তো স্টার হতেই হবে মাম্মা!”
“কিন্তু তাহলে আমার পাপা আমার জন্য ডল আর চকলেটস আনবে কীভাবে?”
“আমি এনে দিব!”

“কিন্তু আমি পাপাকে কি দেখব না?কালকেও দেখেছিলাম না!কুথায় জানি যাবে বলেছিল!তাহলে কি পাপা স্টার হয়ে আকাশে চলে যেতে চেয়েছিল, চাচাই?”
দুর্জয়ের স্থির ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন এলো না। ও পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,,
“তুমি চাইলে,শেষবারের মতো পাপাকে নিচে দেখতে পারো।”
কুহু কি বুঝল কে জানে?ও ফট করে বলে ফেললো,,
“তাহলে আমি পাপাকে শেষবারের মতো দেখব!”
দূরে পতাকাহীন কাঠের কফিনে উজানের নিথর দেহটা রাখা। দুর্জয় কুহুকে সেই দিকে ঘুরিয়ে দূর থেকেই দেখাল। কুহু কফিনের দিকে তাকিয়ে তার অবোধ শিশুসুলভ প্রশ্নে বলে উঠল,
“কিন্তু চাচাই,আমি পাপাকে একটু ধরে,তারপর কিস করতে পারব না?আর পাপা অই বক্সটার ভেতর কেন? পাপার দম বন্ধ লাগছে না?”
নিষ্পাপ কুহুর এমন শিশুসুলভ কথায়, বাঁধ ভাঙা কান্না আর চেপে রাখা সম্ভব হলো না কায়রার পক্ষে। ও ফোঁপাতে ফোঁপাতে শেষমেশ কেঁদেই উঠল। আর তা টের পেতেই দুর্জয় কথা না বলে, বাঁ হাত দিয়ে কায়রাকে আলতো করে নিজের বুকের কাছে টেনে, আগলে নিল। কায়রা তার প্রশস্ত বক্ষে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠতে লাগলে, দুর্জয় হীমশীতল কণ্ঠে বলল,

“কন্ট্রোল ইউরসেলফ, কায়রা! দেশদ্রোহীদের এই দেশের মাটিতে কোনো স্থান নেই-হোক সে আমার আপন কেউ! আর তার জন্য আমার ফ্যামিলির কাউকে এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলতে দেখতে চাই না আমি!”
কায়রা অশ্রুসজল নেত্রে দুর্জয়ের দিকে চেয়ে রুদ্ধকণ্ঠে বলল,
“আমার… আমার তো কুহুর জন্য বড্ড খারাপ লাগছে মেজর।”
দুর্জয় কিছুক্ষণ নিশ্চুপ ভঙ্গিমায় কায়রার দিকে চেয়ে রইল। অতঃপর স্থির কণ্ঠে বলল,
“কুহু আমার কলিজার টুকরো। আর যাকে আমি প্রাণের চেয়েও ভালোবাসি, তার ভালোবাসার জায়গাটা নিজের হাতে ধ্বংস করতে আমার যখন বুক কাঁপেনি, তখন তোমার কষ্ট হচ্ছে কেন?”

অভিসৃতি পর্ব ২৬

নিজের শ্রবণান্দ্রেয়কে বিশ্বাসযোগ্য ঠেকছে না কায়রার। মস্তিষ্ক উল্টাপাল্টা ভাবনায় ইতিমধ্যে শূন্য হয়ে এসেছে। মাত্র কি বললো লোকটা? ও তীব্র বিস্ময়ে চাইতেই, দুর্জয় নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো,,
“আমার ছোঁড়া বুলেটেই মা’রা গিয়েছে উজান।”

অভিসৃতি পর্ব ২৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here