তাকদিরে তুমি পর্ব ২৪
মোনালিসা মেহরোজ
হসপিটালের লম্বা করিডোরের এক মাথায় মাথা নিচু করে বসে আছে আসিফ। তার ঘোলাটে শূন্য দৃষ্টি স্থির হাতে ধরা একখানা কালো রঙা হিজাবের পানে। যা স্বয়ং তার স্ত্রী’র।
চারিদিকে তেমন একটা কোলাহল নেই। প্রাইভেট নার্সিংহোম হওয়ায় বেশ কড়া নিয়মের মধ্যেই চলে সবকিছু। ফাতিহাকে দেখছেন একজন ফিমেল ডক্টর। অবশ্য এটা আসিফের চেনা হসপিটাল। তাই প্রবেশ করে ডক্টরকে তড়িঘড়ি করে হাতের কাছে পেতে খুব একটা সমস্যা হয়নি।
ডক্টর ফাতিহাকে দেখেই প্রথমেই জানিয়ে দিয়েছেন ক্ষত গভীর নয়। তবে রক্তক্ষরণ ও আঘাতের তীব্রতা সহ্য না পেরেই ফাতিহা সেন্স হারিয়েছে। সাথে ফাতিহা মানসিক ভাবেও এলোমেলো। এখন ভেতরে তার চিকিৎসা করছেন তিনি৷
দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে থাকা আসিফ শুকনো ঢোক গিলে৷ চোখ তখনো তার ঝাপসা ভিষন। নিজের অজান্তেই নিজের কাজগুলোর জন্য ভিষনভাবে থমকে আছে সে। সাথে বেশ চিন্তায় আছে এরপর কি হবে? সে কেনো না জেনেই এমনটা করলো? কেনোই বা এতটা অন্যায় করলো মেয়েটার সাথে? শুধু কি ফাতিহা তাকে বিয়ে করেছে তাই?
আসিফ হিসেব মিলাতে পারছে না। ভিষন অনুতপ্ত সে। সাথে এটাও কোনদিন আশা করেনি যে ট্রেনে সাক্ষাৎ হওয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত সেই রমণী ফাতিহা নিজে, যে কি-না তার অজান্তেই স্ত্রী রূপে মির্জা বাড়িতে প্রবেশ করেছে। অথচ সে জানে না!
আসিফের মনে পরলো, ফাতিহার সাথে বিয়ে হওয়ার পর থেকে মেয়েটার প্রতি তার আচরণ, কেমন তাচ্ছিল্যতা সহ তাকাতো সে তার পানে। অথচ ফাতিহা!
রাতের পর রাত সে স্টাডি রুমে কাটিয়েছে ফাতিহার মুখ দেখবে না বলে। তার সংস্পর্শে যাবে না বলে। শেষের দিনগুলোতে সে একই ঘরে থাকতো রাতের বেলা। অথচ তবুও কোনদিন মেয়েটাকে দেখার চেষ্টা করতো না একবারও। রাতে ফাতিহা অদূরে বারান্দার কাছে বিছানা পেতে শুয়ে থাকতো। মাঝখানে ঝুলে থাকতো শুভ্ররঙা পর্দাগুলো। যা বারান্দাসহ বিশাল ঘরের বেশ কিছু জায়গায় অবস্থান করছে। সকালে উঠেই ফাতিহা সব টেনে সরিয়ে বিছানা গুছিয়ে নামাজ পড়ে কুরআন তেলওয়াত করতে লেগে পরতো।
প্রথমবার আসিফ বলেছিলো সে ফাতিহার মুখও দর্শন করতে চায়না—এবং সত্যিই সে মেয়েটার মুখ দেখতে চায়নি কখনো। ইচ্ছে থাকলে না-কি উপায় হয়! কিন্তু আসিফ তো তার বিবাহিত স্ত্রী’কে একপলক দেখার ইচ্ছে কোনদিনও পোষন করেনি।
আর আজ সন্দেহের বশে এটা করে বসলো সে? যার মুখ দেখতে চায়না, অথচ সেই মানুষটাকেই এতোদিন ভালোবেসে গেছিলো। ঢাকা শহরের অলিগলিতে খুঁজে বেড়িয়েছিলো যাকে, সে তার ঘরেই ছিলো। অথচ আসিফ তাকে চিনতে পারেনি। উল্টো দিনের পর দিন অপমান, অত্যাচার করে গেছে৷
আসিফের মনে পরলো বাবার কথা। আযান মির্জা তাকে বলেছিলেন, ফাতিহা শুধু তার জন্যই মির্জা বাড়িতে এসেছে। তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য এতো এতো অন্যায় সহ্য করেছে। অথচ আসিফ নিজের স্ত্রী”কে কোনদিনও বুঝতে চায়নি। কখনো খুঁতিয়ে দেখেনি ওই অচেনা মেয়েটা কি সত্যিই টাকার লোভে এসেছে কি-না!
সবকিছু ভেবে ক্লান্ত হাসে আসিফ। আজ তার নিজেকে বড্ড অভাগা লাগছে৷ নিজের ভেতরের অহম, জেদ কোথায় জানি গায়েব হয়ে গেছে এক ধাক্কাতে! নিজেকে ভিষন অসহায় লাগছে।
আসিফ তপ্ত শ্বাস ফেলে। আলগোছে হিজাবটা টেনে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নেয়। তখন তারাহুরোই হিজাবটা কোনমতে পেঁচিয়ে স্ত্রী’কে সেখান হতে আড়াল করে এনেছিলো সে। এলোমেলো মস্তিষ্ক এটুকু সতর্ক হতে সাহায্য করেছিলো তাকে। নইলে ফাতিহা নূরের এতো লড়াই যে শেষ অবদি বিফলে যেতো।
—কি হবে এরপর?
বিড়বিড় করে আওড়ায় পুরুষটি। মাথা পুরো এলোমেলো হয়ে আছে। আরশাদ, মৃন্ময় বেশ কয়েকবার ফোন করেছে। তবে সে রিসিভ করেনি। অদ্ভুত এক অস্থিরতায় ভুগছে সে। হৃদপিণ্ড ছুটছে বেগতিক ভাবে। যার ইয়ত্তা নেই।
ভাবনার মাঝেই পকেটে রাখা ফোনটা ফের কর্কশ আওয়াজে বেজে উঠলো। আসিফ জিভ দ্বারা অধর ভেজায়। এবার আর ফোনটা সেভাবেই রেখে দেয়না। বরং নিজেকে খানিক শান্ত করে ফোনটা বের করে আনে। আর আনতেই স্ক্রিনে বাবা নামটা ভেসে ওঠে৷ যা ভেসে উঠতেই বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে আসিফের। বুঝে উঠতে পারেনা বাবাকে কি জবাব দিবে!
আসিফ মাথা ঠান্ডা করে। সময় ব্যায় না করে ফোনটা ধীরস্থির ভাবে কানে ধরে। তৎক্ষনাৎ ওপাশে আযান মির্জা অস্থির চিত্তে ছেলেকে বলেন—–
—ফাতিহা কোথায়?ঠিক আছে সে? তুমি কি….
—বাবা….!
ভাঙা গলায় ডেকে ওঠে আসিফ। ওপাশে আযান মির্জার শরীর হিম হয়ে আসে অজানা আশংকায়। কয়েক মুহূর্ত থেমে ফের সুধায়—
—কি? কি হয়েছে?
উত্তর করে না আসিফ। ঘনঘন শ্বাস ফেলে কেবল। চোখমুখ অস্বাভাবিক লাল হয়ে এসেছে। মাথার উসকোখুসকো চুলগুলো ঘামে লেপ্টে আছে মুখময়।
আসিফ ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ায়। আস্তে করে হেঁটে বেড়িয়ে আসে হসপিটাল থেকে। কানে তখনো তার ফোন ধরা। তবে কথা বলার ভাষা নেই। আযান মির্জা নিজেও থমকে আছেন আসিফের নিস্তব্ধতা দেখে। বুঝে উঠতে পারছেন না কি হয়েছে আসিফের। না-কি সে ফাতিহাকে দেখেছে? তাহলে ফাতিহা কি অবস্থায় আছে এখন? তাদের মধ্যে সব ঠিক আছে তো!
—নিহাদ! তোর জন্য পাত্রী দেখেছি। দু’টো মেয়েকে পছন্দ হয়েছে আমার। বেশ ভালো পরিবার। ছবি রেখেছি তোর ঘরে, দেখে জানা কাকে পছন্দ!
ঘামে জুবুথুবু হয়ে সদ্যই বাড়িতে পা রেখেছে নিহাদ। আর পা রাখতেই মা ইফতিয়ার কথায় মুখে তার তীব্র বিরক্তি ফুটে উঠলো। ফুটবল ম্যাচ ছিলো একটা, সেখানেই গিয়েছিলো দুপুরের পর-পর”ই। এখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ঘরে ফিরে কি একটু বিশ্রাম করবে তার আগেই উটকো এক ঝামেলা মা তার কাঁধে ফেলে দিলো। উটকো ঝামেলায় বটে!
বিয়ে-শাদির ব্যাপারে বড্ড উদাস ছন্নছাড়া যুবকটি। সবসময় নিজের মন-মর্জি মতো চলতে পছন্দ করে। নিজের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা তার ইহকালেও পছন্দ নয়। সেখানে যখন-তখন বিয়ে বিয়ে করে পরিবারের লোকেরা তার মাথা খেয়ে ফেলছে। সাথে তুলনা দিচ্ছে আসিফের৷ তারা দু”জন সমবয়সী। আসিফ তার চৌদ্দ দিনের ছোট হয়েও বিয়ে করে সংসার করছে৷ আর সে করছে না কেনো এই নিয়ে রোজ বাড়িতে একটা না একটা ঝড় বয়েই যায়। যা মোটেও সহ্য করতে পারে না নিহাদ।
ইফতিয়া কথাগুলো বললেও নিহাদ কোন উত্তর দিলো না। বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে পা বাড়ালো নিজের ঘরের পানে৷ অন্যদিকে ইফতিয়ার মনঃক্ষুণ্ণ হলো বেশ। চোখে খানিক বিষন্নতাও ফুটে উঠলো। এই ছেলের এতো উদাসীনতা আর নিতে পারছেন না তিনি৷ গুটিগুটি পায়ে নিজেও ছেলের ঘরের দরজায় সামনে এসে থামলেন। ফের বললেন—-
—দেখে জানাস কিন্তু!
নিহাদ তাকায় মায়ের পানে। তপ্ত শ্বাস ফেলে বলে—–
—এসব ঝামেলা না বাধাঁলেই কি নয়?
—ঝামেলা বলছিস কেনো বাবা? বিয়ে করবি না বল! বয়স তো বসে থাকবে না তোর জন্য। সেদিকেও একটু তাকা।
ইফতিয়া ছেলের পানে এগিয়ে এলেন। ফের বললেন—
—আমরা তো তোর ভালোর জন্যই বলছি বাবা। চিরকাল কি বেঁচে থাকবো বল? ম*রার আগে অন্তত তোর বিয়েটা……
—মা প্লিজ! এসব কথা বলো না।
নিহাদ বিষন্নমুখে মায়ের পানে তাকায়। ইফতিয়া চোখ মুছেন আঁচলে। অতঃপর ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে যেতে যেতে বলেন—-
—ঠিক আছে, আর বলবো না। তবে যা বলছি তা এবার কর, বাবা।
নিহাদ ফাঁকা দৃষ্টিতে মায়ের চলে যাওয়ার পানে তাকালো। ধীর হস্তে পরণের ঘামে ভেজা গেঞ্জিটা খুলে ধপ করে বিছানায় বসে পরলো৷ তন্মধ্যে তার নজর গিয়ে আঁটকালো টেবিলের উপরে রাখা দু’টো ছবির পানে। একটার উপর আর একট ছবি পরে আছে। প্রথম ছবিটায় অল্প বয়সী গোলগাল এক মেয়ে থ্রি-পিস পরে মাথায় ওড়না চেপে আছে। মুখে তার লাজুক হাসি। নিচের ছবিটা দেখতে পেলো না নিহাদ। না তো দেখার ইচ্ছে পোষন করলো।
তিক্ত হেঁসে ধপ করে শুয়ে পরলো বিছানায়। চোখ বন্ধ করে নিলো খুব ধীরে। আর চোখজোড়া বন্ধ হতেই আনমনেই তার মানসপটে ভেসে উঠলো একজোড়া ধূসর রঙা আঁখিপল্লব। ঘন পাপড়ি বিশিষ্ট ভেজা মেঘের ন্যায় আঁখিদ্বয় তার। নিহাদের হৃদয় অজান্তেই পুলকিত হয়। ঠোঁটের কোণায় ফোটে এক টুকরো মলিন হাসি। সিগারেটে পোড়া কালচে ঠোঁট জোড়া নড়ে ওঠে অল্প—-
—সে অতিথি–আমার জীবনের, আর চির জীবনসঙ্গীনী–আসিফ মির্জার। তবুও তাহারেই মনে পরে, পাপ করতে না চাইলেও পাপ হতেই থাকে৷ হাহ…….!
—হোয়াট! ফাতিহা চলে গেছে?
—জ্বী, সেন্স ফেরার সাথে সাথেই তিনি আমাদের বারণ অমান্য করে বেড়িয়ে গেছেন। ইনফ্যাক্ট জুনিয়র একজন নার্সের থেকে মেবি ওড়নাও চেয়ে নিয়েছেন নিজের অসহায়ত্বের কথা বলে৷
আসিফের চোখ বিস্ফোরিত হয়। হাত-পা কাঁপে ভিষন। পিছিয়ে যায় কয়েকপা। হতভম্ব নয়নে তাকিয়ে রয় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানবীর পানে। তখন আযান মির্জার সাথে কথা বলার এক পর্যায়ে অন্যমনষ্কস আসিফ ব্যাথিত হৃদয় নিয়ে হসপিটাল থেকে বেড়িয়ে গিয়েছিলো। আপনমনে গিয়ে বসেছিলো পাশের পার্কের ছোট বেঞ্চিতে। আকাশ-পাতাল ভাবছিলো তখন, ফাতিহার সামনে কি করে দাঁড়াবে এই আশংকায় অস্থির হয়ে উঠেছিলো৷ এবং যখন ফিরলো, ততক্ষণে ফাতিহা তাকে না বলেই হসপিটাল থেকে বেড়িয়ে গেছে৷ ডক্টর তখন ছিলেন না, একজন জুনিয়র নার্সের সাহায্যে ফাতিহা কোনরূপ অনুমতির তোয়াক্কা না করে চলে গেছে মাথায় ওড়না চেপে।
যা হসপিটালে ফেরা মাত্র একজন নার্স তাকে জানালো। আসিফ দম খিঁচে রইলো। ভাবতে পারে নি ফাতিহা তাকে না বলে এভাবে চলে যাবে। আর ফাতিহার’ই বা কি দোষ?
আসিফ ধপ করে চেয়ারে বসে পরে। স্ত্রী’র সাথে করা তার এতো এতো অন্যায়ের পরেও আসিফ তার থেকে আর কিই-বা আশা করছে! ফাতিহা একা একা চলে যাওয়ার পর কি আসিফের কষ্ট হচ্ছে? রাগ হচ্ছে? না-কি জেদ!
আসিফ কি করবে ভেবে পায়না। দু’হাতে খামচে ধরে নিজের মাথার চুল। দাঁতে দাঁত চেপে নিজের ভেতরের অস্থিরতা সামলাতে মশগুল হয়ে পরে যুবক। হৃৎস্পন্দনের গতি অস্বাভাবিক ভাবে বেড়েই চলেছে। মুখটা ঘামে ভিজে উঠেছে তার।
অন্যদিকে….
এলোমেলো ফাতিহা ব্যথিত হৃদয়ে মির্জা বাড়ির ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে। হাতে তার ল্যাগেজ, বোরখা পাল্টে নিয়েছে। চোখমুখ অদ্ভুত শক্ত আর স্থির। কপালে শুভ্র রঙা ব্যান্ডেজ ঢেকে আছে হিজাবের আড়ালে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সায়না মির্জা মুখে আঁচল চেপে আছেন। আর আযান মির্জা বাকরূদ্ধ। কথা বলার ভাষা নেই তার। তার ছেলেটা যে এতোটা নিচে নামবে তা তিনি কল্পনাও করেননি। স্বপ্ন দেখছেন কি-না এই নিয়েও বেশ সন্দিহান তিনি। মুখে কোন রা নেই।
চারিদিকে তীব্র নিস্তব্ধতায় মোড়ানো। থমথমে পরিবেশের শোনা যাচ্ছে কেবল সায়না মির্জার কান্নার মৃদু আওয়াজ। চোখের অশ্রু গাল বেয়ে গড়িয়ে পরছে। পুত্রবধূর চলে যাওয়ার কথা শুনে বুকটা তার শুকিয়ে গেছে। বড্ড কষ্ট হচ্ছে। তবে ফাতিহাকে আঁটকানোর ক্ষমতা বা কারণ, কোনটায় আর অবশিষ্ট নেই। তাই তিনিও আজ নিশ্চুপ।
তন্মধ্যে ফাতিহা মাথা তুলে তাকালো সামনের দিকে। কাজের লোকগুলোও মাথা নুইয়ে আছে। কারো চোখে অশ্রু সুস্পষ্ট নজরে পরছে। ফাতিহা তপ্ত শ্বাস ফেলে নজর ফেরায় শাশুড়ীর দিকে। বলে না কিছুই। শরীরটা তার ভালো ঠেকছে না। মাথার ব্যথা ক্রমশ বাড়ছে।
—তুমি কি সত্যিই এই সিদ্ধান্ত নিলে,আম্মা?
আযান মির্জার কথার পাছে ফাতিহা মাথা নাড়ায়। উত্তর করে—-
—এটা ছাড়া আর কোন উপায় আমার জানা নেই, বাবা।
আযান মির্জা চশমা খোলেন। ফাতিহার কথার পাছে কোন বাক্য প্রয়োগ করতে পারেননা। সায়না মির্জা নিজেকে আঁটকাতে পারেননা। দ্রুত এগিয়ে এসে আগলে ধরেন ফাতিহার গাল। চাপা গলায় বলেন—-
—না গেলে হয়-না, মা?
ফাতিহা কেবল মলিন হাসে। তৎক্ষনাৎ আযান মির্জা বলেন—-
—আমার তোমায় আঁটকানোর মুখ নেই, ফাতিহা। আমার ছেলে তার সীমা পেরিয়ে গেছে, তার লাগাম আমি বাবা হয়ে টানতে পারিনি। তাই আজ আমি তোমায় আঁটকাবো না। যাও, খুঁজে নাও নিজের স্বাধীনতা।
এক মুহূর্ত থামেন তিনি। অতঃপর ফের বলেন—-
—আমি ভিষন শঙ্কিত, আজকের পর আসিফের মধ্যে কতটা পরিবর্তন আসবে, বা আদৌও আসবে কি-না তা নিয়ে।হয়তো আসিফ তার ভুল বুঝতে পারবে! তবে তার ভুল বোঝার সময় অথবা পথটা ছিলো অনাকাঙ্ক্ষিত। সে হয়তো তার স্ত্রী’কে চাইবে নিজের পাশে, কারণ তার স্ত্রী ফাতিহা তার পূর্বপরিচিত। তুমি সেই নারী, যাকে সে চেয়ে এসেছে। অথচ পেয়েও বোধহয় আর পাওয়া হলো না।
—ওনি তাকে চেয়েছেন, যার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি নিজের দিক ভুলেছিলেন। অথচ তিনি তো তার স্ত্রী’কে চাননি কখনো!
আযান মির্জা এক মুহূর্তের জন্য থমকান। কথা বলতে পারেননা তিনি। ফাতিহা আলতো হেঁসে এগিয়ে আসে। পুনরায় বলে—-
—সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কাউকে স্ত্রী হিসেবে বেছে নেওয়া অন্যায় নয়। এটা আমার ধর্ম বিরুদ্ধও নয়—তবে আসিফ মির্জা সহজে পাওয়া জিনিসের কদর জানেন না, আর এটা আপনি আমায় বলেছিলেন। মনে আছে?
আযান মির্জা চোখ বন্ধ করে নেন। দীর্ঘ নিশ্বাস বেড়িয়ে আসে বুক চিড়ে।
—আমি শুধু তার জীবনে মূল্যবান হতে চেয়েছিলাম—তার স্ত্রী হয়ে। আমি চেয়েছিলাম সে নিজের দীনকে আগলে নিক। আল্লাহর পথে ফিরে আসুক। শুধু পছন্দের মানুষ নয়, সে সকল মানুষকে গুরুত্ব দিতে শিখুক। সহবত, ভদ্রতা নিয়ে বাঁচুক। কিন্তু সে এতো সহজে ভালো হওয়ার পাত্র নয়, তাই এবার…..
ফাতিহা মাঝপথে থামে। বলে না আর কিছু। সায়না মির্জা ও আযান মির্জা খানিক মুহূর্ত একে অপরের পানে চাইলেন। তবে তা নিয়ে ফাতিহাকে বললেন না কিছু। বরং আযান মির্জা ফাতিহার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানালেন। ঠোঁটের কোণায় আলতো হাসি টেনে আওড়ালেন—–
—তুমি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারো, আম্মা। আমি বা আমরা—তোমায় আজ কেউ আঁটকাবো না।
ফাতিহা হাসে কেবল। চোখের কোণে পানি জমে সেই তালে। মাথা নাড়িয়ে শশুর-শাশুড়িকে সালাম করে তাকায় মেইডদের পানে। মৃদু হাসি ছোঁরে তাদের উদ্দেশ্য। অতঃপর নিজের ল্যাগেজ নিয়ে এগিয়ে যায় দরজার দিকে। তৎক্ষনাৎ সায়না মির্জার কম্পিত কন্ঠ হতে একটা শব্দ বেড়িয়ে আসে—–
—শেষ অবদি তুমিও হাল ছেড়ে দিলে, আম্মা?
শাশুড়ীর অভিমানী কন্ঠে ফাতিহা থমকায়। হাতের ব্যাগটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। তার নজর স্থির শূন্যে। ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের। বেশ কয়েক মুহূর্ত তাদের মধ্যে গাঢ় নিরবতা ঝুলে থাকলো। অতঃপর ফাতিহা হুট করেই মৃদু হাসলে। দৃঢ় গলায় আওড়ালো—-
তাকদিরে তুমি পর্ব ২৩ (২)
—সবে তো হাল ধরলাম,মা। এর আগে হাল ধরেছিলাম আসিফ মির্জার স্ত্রী—ফাতিহা নূর মির্জা হয়ে। তবে এবার হাল ধরলাম ফাতিহা নূর হয়ে। পার্থক্য শুধু এতোটুকুই যে, আগের বার তাকে ছাড় দিয়েছিলাম স্ত্রী হিসেবে, কিন্তু এবার তিনি তা পাচ্ছেন না।
এক মুহূর্ত থামে সে। অতঃপর সামনের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে পুনরায় বলে—-
—আসছি। ভালো থাকবেন, আর নিজেদের খেয়াল রাখবেন।
