শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৩৪
আয়েশা শেখ
বণফুল- আভরণ খুলিয়া ফেলিয়া
আলুথালু এলোকেশ গগনে মেলিয়া
পাগলিনী নেচে যায় হেলিয়া দুলিয়া
ধূলি-ধূসর কায়…
জল তরঙ্গে ঝিলমিল ঝিলমিল
ঢেউ তুলে সে যায়…
কাজি নজরুলের সুরের মূর্ছনায় তুরানের ছন্দময় পদচারণায় কেঁপে উঠছিল ঘরের প্রতিটি কোণ। তার হাতের মৃদু হেলেদুলে ওঠা, চোখের মায়াবী ইশারা আর দেহের নিখুঁত অঙ্গভঙ্গি গানের প্রতিটি শব্দকে আরও জীবন্ত করে তুলছিল। পাশে বসে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তা দেখছিল ইরান।
নাচ থামতেই উছলে উঠে ইরান হাততালি দিয়ে বলে উঠল,
—বাহ্, আপা! কত সুন্দর নাচো তুমি! ঠিক এই ভাবে আমাকেও শেখাও।
তুরান ওড়নাটা কোমর থেকে খুলে গলায় ঝোলাতে ঝোলাতে বলল,
— পারবি না, কতদিন দেখিয়ে দিয়েছি।
ইরান আবদারের সুরে বলল,
— আজ আর একবার দেখিয়ে দাও না, আপা!
— আজ আর পারব না রে। শরীরটা ক্লান্ত লাগছে।
বলেই তুরান একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য বিছানায় বসল। ইরান নতুন করে কিছু বলতে যাবে, তখনই নজর গেল তার দরজার দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে তাদের চাচাতো ভাই। তাদের বড় ভাই।
পরনে সাধারণ সুতির লুঙ্গি, গলায় একটা গামছা পেঁচানো। তাকে দেখে ইরান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— ভাইয়া, আপনি এখানে?
গম্ভীর গলায় বড় ভাই বলল,
— লাফালাফি বন্ধ করে কাজের দিকে মন দে।
— এখন আবার কী কাজ করব?
— আমি গোসল করব, পানি তুলে দে। মা আর চাচী রান্নাবান্নার কাজে ব্যস্ত।
ভারী গলায় জবাব দিল সে। ইরান মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠল,
— অ্যাহ! নিজের পানি নিজে তুলে নিতে পারো না?
ইরানকে একপ্রকার থামিয়ে দিয়ে তুরান চটজলদি বলে উঠল,
— ইরান তুই চুপ কর তো! ভাইয়া, আপনি একটু দাঁড়ান, আমি এক্ষুনি পানি তুলে দিচ্ছি।
তাদের বড় ভাই গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে কলপাড়ের দিকে হেঁটে গেল। তুরানও দ্রুত পা চালিয়ে টিউবওয়েলের কাছে গিয়ে বালতি ভরে পানি তুলতে লাগল। কিছুক্ষণ পর বড় ভাই সেখানে এসে পরনের বাড়তি পোশাক আর গামছাটা পাশের বাঁশের আলনায় রাখল। এতক্ষণ স্বাভাবিকভাবেই পানি তুলছিল তুরান, কিন্তু হঠাৎই এক অস্বস্তি গ্রাস করল তাকে। এমনিতে লোকটার সামনে এলে কেমন যেন বুক ঢিপঢিপ করে, তার ওপর এখন লোকটা খালি গায়ে দাঁড়িয়ে! বুকের ভেতর অজানা তোলপাড় শুরু হলো তুরানের।
— কী রে, পানি তুলতে এত সময় লাগে? গোসল সেরে তো নামাজে যেতে হবে।
লোকটির গমগমে কণ্ঠ কানে যেতেই দ্রুত চলতে লাগল তুরানের হাত। অবশেষে বালতি ভরে গেলে সে দু-পা পিছিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল,
— পানি তোলা হয়েছে, ভাইয়া।
বড় ভাই তার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
— তাহলে দাঁড়িয়ে না থেকে যা এখান থেকে। নাকি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাকে গোসল করতে দেখবি?
তুরান এক মুহূর্ত অপলক পুরুষটির চোখে তাকিয়ে থেকে লাল হয়ে ওঠা মুখ লুকিয়ে দ্রুত সেখান থেকে সরে গেল। বাইরে আসতেই বড় চাচী রূপালী বেগম তুরানের হাতে একটা ডালা তুলে দিয়ে চাল বাছতে দিলেন। উঠোনে মোড়া পেতে বসে চাল বাছতে লাগল দুই বোন—ইরান ও তুরান। হঠাৎই প্রাঙ্গণে অপরিচিত পায়ের ছাপ। তিন জন লোক প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়াল। সামনের লোকটির বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। মোটা-সোটা, সুঠাম ও শ্যামলা গড়নের। তার চালচলনেই স্পষ্ট আভিজাত্য ও অর্থের গরম। পেছনে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে দুজন দেহরক্ষী। তাদের দেখা মাত্রই দুই বোন ঘোমটা টেনে দ্রুত ঘরে চলে গেল এবং নিজেদের মা সোহানা বেগম ও চাচী রূপালী বেগমকে খবর দিল। রূপালী বেগম আঁচলটা ভালো করে মাথায় টেনে বাইরে এলেন। লোকটিকে দেখেই তিনি আঁচ করতে পারলেন তাদের উদ্দেশ্য। বললেন,
— আপনারা নিশ্চয়ই এই ভিটাবাড়ির ব্যাপারে কথা বলতে এসেছেন?
লোকটি বিনীত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— আপনি ঠিকই ধরেছেন। চারপাশের সব বাড়িঘর ইতিমধ্যে খালি হয়ে গিয়েছে। আপনাদের এই জমিটুকু পেলেই আমাদের নতুন বহুতল কোম্পানির কাজ শুরু হবে। এর আগেও কয়েকজন লোক পাঠিয়ে আপনাদের জানানো হয়েছে, তবু আপনাদের পক্ষ থেকে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।
এমন সময় সাড়া পেয়ে এগিয়ে এলেন সুলতান সাহেব। বাড়ির আঙিনাতেই তাদের বিশাল গরুর খামার। খামারের কাজ ফেলে গায়ে গামছা মুছতে মুছতে তিনি সেখানে এলেন। সুলতান সাহেব হলেন তুরান ও ইরানের বাবা। লোকটির কথা শুনে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বললেন,
— না জনাব, আমরা এই পৈতৃক ভিটা ছেড়ে কোথাও যেতে পারব না। দুই ভাই মিলে ঘাম ঝরিয়ে এই সংসার আর ভিটেমাটি গড়ে তুলেছি। হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলের বিশাল খামার করেছি। মাছ চাষের জন্য কষ্ট করে দুটো পুকুর খনন করেছি। এই জীবিকা, এই শিকড় ফেলে আমরা কোথাও যাব না।
— আপনাদের এই ভিটার বিনিময়ে আমরা যে অঢেল অর্থ দেব, তা দিয়ে আপনারা শহরের অভিজাত এলাকায় বিশাল ফ্ল্যাট কিনে রাজকীয়ভাবে থাকতে পারবেন।
লোকটি বেশ গলায় উত্তর দিল। এবার সুলতান সাহেবের বদলে উত্তর দিল অন্য একজন।
— আমরা এভাবে, এখানে থেকেই অভ্যস্ত সাহেব! অহেতুক রাজকীয়তা আমাদের পোষাবে না। আমাদের পেছনে সময় নষ্ট না করে যতটুকু জমি পেয়েছেন, ততটুকুতেই কোম্পানির কাজ শুরু করুন। কোনো সমস্যায় পড়লে বলবেন পাশে থাকব, কিন্তু ভিটে বিক্রি করতে পারব না।
গোসল সেরে শুকনো আরেকটা লুঙ্গি আর টি-শার্ট পরে গামছা দিয়ে মাথার চুল মুছতে মুছতে সেখানে এসে দাঁড়াল তুরান ও ইরানের সেই জ্যাঠাতো ভাই। সে এ বাড়ির বড় কর্তা সুলেমান সাহেবের একমাত্র ছেলে। ভীষণ একরোখা ও স্বাবলম্বী এক যুবক। তার বাবা সুলেমান আর চাচা সুলতান সাহেব কিছুটা রাজি ছিলেন বাড়ি বিক্রি করার পক্ষে, কিন্তু সে কোনোভাবেই এই ভিটেমাটি ছাড়তে প্রস্তুত নয়।
লোকটি যুবকের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বলল,
— তুমি?
সুলতান সাহেব খানিকটা নিচু স্বরে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন,
— ও আমার বড় ভাইয়ের ছেলে।
লোকটি হালকা হেসে জিজ্ঞেস করল,
— কোথায় পড়াশোনা করছ?
যুবক কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে কঠিন চোখে দাঁড়িয়ে রইল। পরিস্থিতি সামলাতে আবারও সুলতান সাহেব বলে উঠলেন,
— জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। কিছুদিন হলো ছুটিতে বাড়িতে এসেছে, আবার চলে যাবে। ভীষণ মেধাবী আমার এই ভাতিজা।
— মাশাল্লাহ! শহরে পড়াশোনা করছ, তাহলে তো শহরে থাকাই ভালো। গ্রামের দিকে পড়ে থেকে কী আর তেমন সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়? আমাদের কোম্পানিটা হয়ে যাক, এখানে ভালো একটা চাকরি-টাকরির ব্যবস্থাও করে দেওয়া যাবে।
লোকটি কথাগুলো বেশ স্বাভাবিকভাবে বললেও তার আসল উদ্দেশ্য বুঝতে যুবকের একটুও সমস্যা হলো না। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ও কঠিন গলায় বলল,
— টাকা হলে নিজ যোগ্যতায় শহরে চলে যাব। কিন্তু নিজেদের বাপ-দাদার ভিটে বিলিয়ে দিয়ে কোথাও যাব না। আপনারা এখন আসতে পারেন।
লোকটি নিজের পরবর্তী বাক্য বলার জন্য আবার মুখ খুলতে চাইল। তবে তার আগেই যুবক হাত উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
— আহা আঙ্কেল! এই বয়সে এসে এখানে অপমানিত হবেন না। দয়া করে কেটে পড়ুন!
লোকটি কিছুক্ষণ থম মেরে চুপ করে বসে রইল। তারপর মুখের ওপর এক চিলতে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে বিদায় নিয়ে প্রাঙ্গণ ত্যাগ করল। তবে তার চাহনি বলে দিচ্ছিল সে এখান থেকে এত সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নয়। এবং এটাই তার এখানে শেষ আসা ছিল না।
লোকগুলো চলে যেতেই যুবকটি সুলতান সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আব্বা কোথায়?
— পুকুর পাড়ে বোধহয়। মাছের খাদ্য দেওয়া দেখতে গেছে।
— দূরে কোথাও যেন না যায় এখন। লোকগুলোর চালচলন কিন্তু মোটেও সুবিধার ঠেকছে না।
সুলতান সাহেব মাথা নাড়িয়ে সায় দিলেন, তারপর নিজের কাজের দিকে পা বাড়ালেন। খামারের কাজে বেশ কয়েকজন লোক রাখা হয়েছে, তাদের জন্য প্রতিদিনই বড় পাতিলে ভাত-সালুন চড়াতে হয় রূপালী বেগম আর সোহানা বেগমকে। তারা আবারও রান্নাঘরের ব্যস্ততায় ডুবে গেলেন।
বারান্দার খুঁটি ধরে এতক্ষণ বুকটিপটিপ করা হৃদয়ে এসব কথা শুনছিল তুরান। জ্যাঠাতো ভাইয়ের কড়া মেজাজটা সে ভালো করেই চেনে। লোকগুলো চলে যেতেই তুরানের দিকে চোখ পড়ল যুবকের। সে সেদিকে তাকিয়ে সংক্ষিপ্ত গলায় বলল,
— লুঙ্গিটা ধুয়ে মেলে দিস। জুম্মার সময় হয়ে আসছে, নামাজে যাব।
তুরান কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা কলপাড়ে চলে গেল। সাবান খুব যত্ন নিয়ে লুঙ্গিটা ধুয়ে দিল সে। যুবক নিজের ঘরে গিয়ে সুতি একটি সাদা পাঞ্জাবি জড়িয়ে নিল, মাথায় দিল গোল টুপি। নামাজে যাওয়ার উদ্দেশ্যে উঠানে পা রাখতেই তার চোখে পড়ল তুরান খুব সাবধানে তার ধোয়া লুঙ্গিটি মেলে দিচ্ছে। যাওয়ার পথে যুবকের ধীর অথচ স্পষ্ট কণ্ঠ ভেসে এল,
— গোসল সেরে নামাজটা পড়ে নিস। অত নাচানাচি আমার পছন্দ নয়।
কথাটা বলেই দীর্ঘ পদক্ষেপে যুবকটি বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। কিন্তু তুরান যেন নিজের জায়গায় পাথর হয়ে জমে রইল। তার হাত দুটি তখনও আলনায় ধরা, স্তব্ধতায় নিঃশ্বাস থমকে গেছে। তার মানে… তখন ঘরের দরজার আড়াল থেকে সে তুরানকে নাচতে দেখছিল? তুরানের সারা শরীরে যেন বিদ্যুতের তরঙ্গ খেলে গেল। লজ্জার জোয়ার এসে আছড়ে পড়ল তার পুরো মুখে-গালে। কানে-মুখে যেন ছড়াতে লাগল আ”গুনের উত্তাপ। সে তো এসব লোকচক্ষুর আড়ালে, বন্ধ ঘরের খাঁজে নিজের ভেতরের আনন্দকে রূপ দিতে করে! কেউ দেখে ফেললে সে এমনিতেই লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যায়, আর সেখানে কিনা দেখেছে ওই লোকটা! যে লোকটার সামনে এলে এমনিতেই তার বুকের ভেতর হাজারটা ঢাক-ঢোল বাজতে শুরু করে, যার গম্ভীর চোখের চাউনি সহ্য করার ক্ষমতা তার নেই!
কলিং বেলের শব্দে চমকে উঠল ইরান ও ঝিলমিল। হাসপাতাল থেকে বের হয়েই তড়িঘড়ি করে একটা সিএনজিতে উঠে পড়েছিল ঝিলমিল। সোজা চলে এসেছে ইরানের ফ্ল্যাটে। এসে ইরানকে সবটা খুলে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে—আজ রাতটা সে এখানেই থাকবে, কোনোভাবেই বারিশের কাছে ফিরবে না। ইরান প্রথমে অনেক বুঝিয়েছিল, রাগ ভাঙিয়ে বারিশের কাছে ফিরে যাওয়ার পরামর্শও দিয়েছে। কিন্তু ঝিলমিল যাবে না মানে যাবেই না। উল্টো ইরানকে থামিয়ে দিয়ে তার বোন আর সেই কাজিনের গল্প শুনতে বসে পড়েছে। মাঝে মাঝেই ওদের কথা ভাবায় ঝিলমিলকে, তাই ভাবল আজ না হয় পুরো রাতটা গল্প শুনেই কাটাবে। কিন্তু হঠাৎ এই অনাকাঙ্ক্ষিত কলিং বেল বাজায় বেশ বিরক্তই হলো সে। ইরান উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই পুরো নিথর হয়ে গেল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে দীঘি। এমন অসময়ে তাকে তো দূর, সাধারণ সময়েও এই ফ্ল্যাটে দীঘি আসবে—তা ইরানের কল্পনাতেও ছিল না।
— কী হলো? ভেতরে আসতে বলবে না?
দীঘি চোখের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল। ইরান তবু চুপচাপ কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইল। দীঘিকে ভেতরে আসতে বলবে কি বলবে না, তার মগজ যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। ভেতর থেকে ঝিলমিল আস্তে আস্তে এগিয়ে আসতে আসতে কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
— ফুপি! তুমি এখানে?
— তুই এখানে?
দীঘির কণ্ঠেও উপচে পড়ল বিস্ময়।
— আমি… হ্যাঁ, আমি একটু আগেই এসেছি।
— বারিশ কোথায়?
— ওনার কথা দয়া করে আমাকে জিজ্ঞেস করবে না! আস্ত একটা মিথ্যেবাদী লোক!
ঝিলমিল ক্ষোভে গসগস করে উঠল।
— ‘কী করেছে আবার?’ দীঘি জানতে চাইল।
ঝিলমিল বারিশের সব কীর্তি এক নিঃশ্বাসে উগড়ে দিল। দীঘির চেহারায় খুব একটা অবাক হওয়ার ছাপ দেখা গেল না। সে অনায়াসে ভেতরে প্রবেশ করে চারপাশের ঘরদোর আর আসবাবের ওপর চোখ বোলাতে লাগল। তার পরনে ডার্ক চকলেট রঙের শার্ট হাতাগুলো সামান্য রোল-আপ করে পরা। সাথে হাই-ওয়েস্টেড, ক্রিম রঙের প্লিটেড ওয়াইড-লেগ প্যান্ট। প্যান্টের সাথে একটি সরু কালো বেল্ট পরা হয়েছে। ফ্ল্যাটের এদিক-ওদিক হাঁটাহাঁটি করতে করতে সে বলল,
— ইরান, তুমি এখানে একাই থাকো?
ইরান নিজেকে সামলে নিয়ে বিনীত গলায় বলল,
— জি, আব্বুও থাকেন। উনি বোধহয় বাইরে আছেন।
— ওহ।
দীঘির এমন বেপরোয়া আনাগোনা আর স্বভাব দেখে ঝিলমিল বলল,
— ফুপি, তুমি হঠাৎ এখানে কেন এসেছ?
— কেন, আসতে পারি না? এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম, ভাবলাম একবার ঘুরে যাই…
কথা বলতে বলতে দীঘি ইরানের বন্ধ রুমটার দিকে হেঁটে গেল। দরজার নবে হাত দিয়ে একটু নাড়ানোর চেষ্টা করতেই বুঝল লক করা। সে একটু ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,
— বাসায় থেকেও নিজের ঘরে তালা মেরে রেখেছ কেন?
— এমনি… আমি আসলে রুমটা সবসময় তালা মেরেই রাখি।
দীঘি কিছুক্ষণ ইরানের থমথমে মুখের দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে রইল। তারপর গলা একটু হালকা করে বলল,
— মেহমান এলে চা বা কফি বানাতে হয়, জানো না?
— স্যরি, স্যরি! আমার একদম খেয়াল ছিল না। আপনি বসুন, আমি দ্রুত কফি বানিয়ে আনছি।
ইরান তড়িঘড়ি করে কিচেনের দিকে পা বাড়াল। সেখানে গিয়ে ফোন বের করে মেসেজ করল কাউকে। ঝিলমিল সোফায় এসে আবার বসল। তার পরনে থাকা কুর্তির ওপর এখনো শক্ত করে জড়ানো শালটা। দীঘি ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
— এই গরমে এত শক্ত করে চাদর জড়িয়ে রেখেছিস কেন রে?
— শ-শীত লাগছে একটু… তাই।
দীঘি বেশি ঘাটাতে চাইল না। সে সোফা ছেড়ে সোজা কিচেনের ভেতরে গিয়ে দাঁড়াল। ইরান ততক্ষণে কফির পানির ক্যাটলি চাপিয়ে দিয়েছে। দীঘি আড়ালে এসে আচমকা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
— তাহসিনকে তুমি চেনো, ইরান?
নিজের মনের ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকা প্রশ্নটা শেষমেশ করেই ফেলল সে। ইরান মুহূর্তের জন্য হকচকিয়ে গেলেও নিজেকে সামলে শান্ত গলায় বলল,
— আপনাদের বাসার তাহসিন সাহেবের কথা বলছেন? না তো… ওনাকে আমি আলাদা করে কীভাবে চিনব? যতটুকু জানি বা চিনি, আপনাদের বাসায় যাতায়াতের সুবাদেই।
— আচ্ছ।
দীঘি কাউন্টারের ওপর রাখা কাচের জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে খেতে লাগল। পানি খাওয়ার মাঝেই হঠাৎ তার চোখ চলে গেল কিচেনের এক কোণে। সেখানে পরিষ্কার করে রাখা একটা চাইল্ড ফিডার আর তার পাশেই কয়েকটা ছোট বাচ্চার খাবার প্রস্তুতের বাটি রাখা। কপাল কুঁচকে গেল দীঘির গ্লাসটা কাউন্টারে রেখে সন্দেহভরে বলল,
— বাচ্চা? তোমাদের ঘরে কি কোনো ছোট বাচ্চা আছে নাকি?
ইরান আবারও এক লহমার জন্য একদম জমে বরফ হয়ে গেল। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শব্দ বাড়লেও মুখে কৃত্রিম স্বাভাবিকতা এনে বলল,
— নাহ্! বাচ্চা আবার আসবে কোত্থেকে?
— তাহলে এগুলো কার? তুমি ব্যবহার করো নাকি?
ফিডারটার দিকে নির্দেশ করে তীক্ষ্ণ গলায় বলল দীঘি।
— ওটা… আসলে…
— কী?
— আমার এক আত্মীয় এসেছিল পরশু, তাদের বাচ্চার জিনিসপত্র ভুল করে ফেলে রেখে গেছে।
কথাটা দীঘির মনঃপুত হলো না, যথেষ্ট অবিশ্বাস বাসা বাঁধল তার চোখে। তবে সে আর বাড়াবাড়ি না করে বাইরে বেরিয়ে এসে আবার সোফায় ঝিলমিলের পাশে বসল। ঝিলমিল তখন সোফায় পিঠ ঠেকিয়ে ঢুলছে। শরীরটা বেশ ম্যাচম্যাচ করছে তার। হাসপাতালে যাওয়ার আগে অবেলায় শাওয়ার নেওয়া, আর তার ওপর গায়ের ব্যথায় জ্বর জ্বর ভাব নেমে এসেছে শরীরে।
টেবিলে কফির মগ রাখার মৃদু শব্দে ঝিলমিল চোখ মেলে সোজা হয়ে বসল। কফির মগ টেবিলে রাখলেও দীঘির দৃষ্টি আটকানো ছিল ইরানের সেই বন্ধ রুমের দরজার ওপর। তার মনের অন্দরে বারবার কে যেন তাগিদ দিচ্ছে এই মুহূর্তে ওই বন্ধ ঘরটার ভেতরে ঢোকা বড্ড জরুরি।
— কফিটা খেয়ে নিন। ঝিলমিল, তুইও নে।
দীঘি দরজার ওপর থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে কফির মগটা হাতে নিল। ঝিলমিলও একটা মগ তুলে নিয়ে গরম ধোঁয়া ওঠা কফিতে আলতো চুমুক দিল।
দরজায় আবারও ধামধাম শব্দে তোলপাড় পড়ে গেল। কলিং বেলের বদলে এবার এলো থা”পড়ানোর শব্দ। শব্দটা শুনেই ইরানের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। সে ভালো করেই চেনে এই ধা”ক্কানোর ধরণ। এটা নিশ্চিত তার বাবা, সুলতান সাহেবের কাজ! বিরক্তিতে ভরে গেল তার ভেতরটা। আসার আর সময় পেল না লোকটা? অন্য দিন মাঝরাতে ফেরে, আর আজ কাঁটায় কাঁটায় রাত নয়টার সময়েই বাড়ি এসে হাজির!
ইরান বড় একটা শ্বাস ফেলে দরজার লক খুলে দিল। দরজা খুলতেই বাইরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল মদের গন্ধে। ভেজা টলটলে চোখ আর উসকোখুসকো চুলে দড়াম করে ভেতরে প্রবেশ করলেন সুলতান সাহেব। গায়ে একটা ঢিলেঢালা ময়লা শার্ট, যার অর্ধেক বোতাম খোলা, আর প্যান্টের এক পাশ হাঁটুর ওপরে উঠে আছে।
হাঁটতে গিয়ে সোজা দরজার চৌকাঠে একটা জোরদার ধাক্কা খেলেন তিনি।
— ওহ্ নো… দেয়ালটা আবার আমার সঙ্গে কুস্তি লড়তে এলো কেন? সরো হে!
নিজের কপালে এক হাত ডলে দেয়ালকেই ধমক দিলেন সুলতান সাহেব।
টলতে টলতে ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই দুজন অচেনা মেয়েকে দেখে থমকালেন তিনি। পরক্ষণেই ভাঙা গলার হাসি ফুটিয়ে সোফায় তাদের ঠিক পাশে ধপ করে গিয়ে বসে বললেন,
— এই! তোমরা বুঝি আমার বউয়ের খোঁজ দিতে এসেছ? তা কোথায় আছে আমার বউটা?
লোকটার গা থেকে ভেসে আসা মদের কটু গন্ধে বমি আসার জোগাড় ঝিলমিলের। সে চাদরটা আরও শক্ত করে পেঁচিয়ে একটু পেছনের দিকে সরে বসল। দীঘি অবশ্য একদম নীরব। শান্ত নজরে লোকটার আপাদমস্তক একবার দেখে নিয়ে শুধাল,
— কে আপনি?
— আমি… আমি তো ইরানের বাবা!
— আপনার বউয়ের খোঁজ দিতে আমরা কেন আসতে যাব?
— তাহলে কেন এসেছ?
— আমরা ইরানের পরিচিত, তাই এসেছি।
ইরান ততক্ষণে কাছে এসে বাবার হাত ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করে ব্যগ্র কণ্ঠে বলল,
— আব্বু, তুমি গিয়ে ঘরে শুয়ে পড়ো তো!
— না! একদম না! আমি ওদের সাথে গল্প করব, তোমার মায়ের কথা বলব। ওরা যদি খুঁজে দেয় আমার বউটাকে?
সুলতান সাহেব জেদ ধরে বসলেন। দীঘি এবার নিরাসক্ত কণ্ঠে সোজা বলে উঠল,
— আপনার বউকে আমরা কোথায় পাব? উনি তো মৃ”ত।
কথাটা শোনামাত্রই সুলতান সাহেবের উচ্ছল মুখটা চুপসে গেল। মাতাল চোখেও এক অদ্ভুত শূন্যতা নেমে এল। তিনি বিড়বিড় করে উঠলেন,
— তাই তো… আসলেই তো মৃত!
ইরানের বাবা একের পর এক আওলা ঝাওলা কথা বলা শুরু করল। তার এলোমেলো কথায় ঝিলমিল আবারও ঝিমিয়ে পড়ল। খুব ঘুম পাচ্ছে তার, শরীরটাও গরমে ভারী হয়ে আসছে। তার এসব মাতলামি আর বিশৃঙ্খল কথাবার্তার মাঝেই আবার বেজে উঠল কলিং বেল। ঝিলমিল এবার আর সোজা হয়ে বসল না। যে ইচ্ছা আসুক, তাতে তার কী যায় আসে! ইরান এবার দ্রুত পা বাড়াল দরজার দিকে। ওদিকে সুলতান সাহেবের বকবক উপেক্ষা করে দীঘি টেবিল থেকে চট করে ইরানের বন্ধ ঘরের চাবিটা তুলে নিল। ধীরপায়ে এগিয়ে গেল সেই নিষিদ্ধ ঘরটার দরজার দিকে। লক খুলে দরজাটা মেলার ঠিক আগের মুহূর্তে হঠাৎ কোথা থেকে যেন একটা শক্ত হাত এসে বেশ জোরের সাথেই দীঘির হাত চেপে ধরল! খানিকটা ভরকে গেল দীঘি। ছিটকে সরে এসে সামনে তাকাতেই মুহূর্তের জন্য থমকে গেল সে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে তাহসিন! তাহসিন ওর হাত থেকে চাবিটা একপ্রকার কেড়েই নিল
তারপর থমথমে গলায় বলল,
— অন্যের বাসায় এসে এভাবে পারমিশন ছাড়া ঢোকা কি আপনার মতো মানুষের সাথে মানায়, ম্যাম?
দীঘি কিছু উত্তর দেওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই বাইরে থেকে হুরমুড়িয়ে ভেতরে ঢুকল বারিশ আর মেহরাজ। ভেতরে ঢুকে সোফায় ঝিলমিলকে ঝিমাতে দেখেই সপ্তমে চড়ে গেল বারিশের মেজাজ। সে গটগট করে এগিয়ে এসে ঝিলমিলের চুল শক্ত করে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল,
— ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছিস বেয়াদব! কখন থেকে খুঁজে বেড়াচ্ছি খেয়াল আছে তোর?
প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছিল সে। আচমকা আ’’ক্রমণে আঁতকে উঠল মেয়েটা। চোখ মেলতেই যন্ত্রণায় মুখ কুঁচকে গেল। র”ক্তচক্ষু বারিশকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সমস্ত ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে সে বারিশের বুকে দু’হাতে সজোরে ধাক্কা মেরে চেঁচিয়ে উঠল,
— একদম ধরবেন না আমাকে! হাত সরান!
— ধরব না মানে? কোথায় কোথায় খুঁজে এসেছি তোকে জানিস?
ঝিলমিল ঝটকা মেরে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
— কেন খুঁজেছেন? যান না, গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে পাহাড়ে পার্টি করুন! ম’দ খান, মুরগি চুরি করুন!
বারিশ একটু থামল। চোয়াল শক্ত করে চোখ বন্ধ করে আবার তাকিয়ে নিজের গলাটা কিছুটা নিচু করে বলল,
— দেখো, আমি সরি। অনেক হয়েছে, এবার বাসায় চলো।
— আমি যাব না! যাওয়ার জন্য তো আসিনি! আব্বু ঠিকই বলতেন, আপনার চেয়ে ওই ফাহিম…
কথা শেষ করার আগেই বারিশের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল।
— ঝিলমিল!
উন্মত্তের মতো গর্জে উঠে সজোরে চ”ড় মারার জন্য হাত তুলল বারিশ। ঝিলমিল ভয়ে চোখ বুজে ফেলে। কিন্তু আ”ঘাতটা ওর গালে পৌঁছানোর আগেই মেহরাজ বারিশের শূন্যে ওঠা হাতটা চেপে ধরে। শক্ত বাঁধনে আটকে দিয়ে গজগজ করে বলল,
— বারিশ! মাথা ঠান্ডা কর! আমার সামনে আমার ভাতিজির গায়ে হাত তোলার সাহস দেখাবি না!
দীঘিও কঠোর চোখে তাকাল বারিশের দিকে। তার দৃষ্টি স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে—মেয়েটার গায়ে হাত দিলে ফল খুব একটা ভালো হবে না। যদিও এসব হুমকি-ধামকিকে বারিশ এক পয়সার তোয়াক্কাও করে না। বারিশ বিষাক্ত শ্বাস ছেড়ে রাগ চেপে নেওয়ার চেষ্টা করল। কণ্ঠ যতটা সম্ভব নরম করে ঝিলমিলের হাত ধরে বলল,
— ফিরে চলো। তামাশা বন্ধ করো।
ঝিলমিল সঙ্গে সঙ্গে ঝারা মেরে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সোজা গিয়ে দাঁড়াল মাতাল সুলতান সাহেবের পেছনে। কান্নামেশানো গলায় বলল,
— আঙ্কেল! লোকটাকে এখান থেকে যেতে বলুন! দেখুন, উনি আমাকে কি”ডন্যাপ করতে এসেছেন!
সুলতান সাহেব চোখ দুটো বড় বড় করে বারিশের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,
— কী বলো মা… আমার বাসায় কি”ডন্যাপার? এটা কি”ডন্যাপার? তা-ই তো বলি! এমন চোরের মতো চেহারা কেন ছেলেটার!
সুলতান সাহেবের কথা শুনে বারিশ তাজ্জব বনে গেল। চোর? তাকে… বারিশকে নাকি চোরের মতো লাগে? মেহরাজ পাশ থেকে তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করে উঠল,
— আরে! আমার বন্ধুকে মোটেও চোরের মতো লাগে না! এত হ্যান্ডসাম একটা ছেলেকে আপনি চোর বললেন? আপনার কোনো ধারণা আছে কত মেয়ের স্বপ্নের পুরুষ ও? কত নামিদামি মেয়ের প্রপোজাল রিজেক্ট করেছে ও?
ঝিলমিল সুলতান সাহেবের পাশ থেকে মাথা বের করে বলল,
— হ্যাঁ, তো ওইসব মেয়েদের সঙ্গেই গিয়ে থাকতে বলো ওনাকে!
মেহরাজ বলল,
— আরে তুই আবার রেগে যাচ্ছিস কেন?
সুলতান সাহেব এবার বারিশের চুল থেকে পা পর্যন্ত স্ক্যান করে নাক সিটকে বললেন,
— হাহ্! এই ছেলেকে কোন মেয়ে প্রপোজ করে? ইশশ! চুলের কী অবস্থা! যেন টাকার অভাবে কতদিন ধরে চুল কাটে না! এই ছেলে, নিয়মিত চুল কাটবে, বুঝলে?
ইরানের বিরক্তির মাত্রা চরমে পৌঁছাল। নিজের মাথায় জট লেগে আছে, সে আবার আরেকজনের স্টাইলিশ হেয়ারকাট নিয়ে মন্তব্য করছে! ওদিকে অপমানে বারিশের রাগের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে গেল। সে আর কথা না বাড়িয়ে ঝিলমিলের হাত খপ করে ধরে আবার হিঁচড়ে টানতে টানতে বলল,
— অনেক নাটক হয়েছে! এখন চুপচাপ চলো!
ঝিলমিল জোর খাটিয়ে নিজের হাত আবার ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে চেঁচাল। ঠিক তখনই সুলতান সাহেব কোথা থেকে যেন একটা লাঠি কুড়িয়ে এনে বারিশের দিকে উঁচিয়ে ধরলেন,
— এই যা! কেটে পড় বলছি! দিনেদুপুরে আমার বাসায় ঢুকে মেয়েধরাগিরি? ভাগ!
— আরে ও আমার ওয়াইফ!
দাঁতে দাঁত চেপে বলল বারিশ। ঝিলমিল মাথা নেড়ে বলল,
— একদম মিথ্যে কথা! আমি কোনো মিথ্যেবাদীর ওয়াইফ নই!
— আমি জানি মামনি, একদম ঠিক বলেছ!
সুলতান সাহেব লাঠি উঁচিয়ে বললেন
— এমন একটা পুতুলের মতো নিষ্পাপ মেয়ের বর কি এই চোর হতে পারে কখনো?
বারিশ দু’হাত শক্ত মুঠো করে ফেলল। নিজের জীবনে বোধহয় আজ সে সবচেয়ে বড় অপমানের মুখোমুখি হচ্ছে। তাও একটা মাতালের কাছে! পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই মেহরাজ চট করে বারিশকে টেনে ধরে দরজার দিকে নিয়ে গেল। তাহসিন তখনও ইরানের সেই বন্ধ দরজার কাছেই ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে ছিল। সে দীঘির হাত চেপে ধরে টানতে টানতে ফ্ল্যাটের বাইরে নিয়ে এল।
ফ্ল্যাটের বাইরে সিঁড়ির ঘরে আসতেই দীঘি তাহসিনের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে বলল,
— আমাকে এভাবে টেনে নিয়ে এলে কেন?
— কারণ ওখানে আপনার কোনো কাজ নেই।
— আমার কাজ আছে কি নেই, সেটা কি তুমি ঠিক করে দেবে?
দীঘি চোখ পাকিয়ে শোধাল।
— তর্ক না করে চুপচাপ বাসায় চলুন।
— নিজের সীমা ভুলে যাবে না তাহসিন!
বাইরে থেকে হঠাৎ হৈ-হল্লার শব্দ পেয়ে তাহসিন আর দীঘি দুজনই মুহূর্তে সতর্ক হয়ে উঠল। কথাকাটাকাটি থামিয়ে তারা সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই দেখল মেহরাজ হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে নিচে নেমে আসছে। তার মুখে স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ। সে হাঁপাতে হাঁপাতেই জানাল, বারিশ সোজা গিয়ে এই ছয় তলার ছাদে উঠে পড়েছে! শুধু উঠেই ক্ষান্ত হয়নি, ছাদের ভারী লোহার দরজাটা ওপাশ থেকে লক করে দিয়েছে, যাতে কেউ ওপরে গিয়ে তাকে থামাতে না পারে। শুধু তাই নয়, নিচে চিৎকার-চেঁচামেচি করে আশেপাশের দোকানের লোকজন আর পথচারীদের নিজেই ডেকে জড়ো করেছে।
মেহরাজ ঝিলমিলকেও ডেকে নিয়ে এল। ঝিলমিল, ইরান, দীঘি আর তাহসিন সবাই একপ্রকার দৌড়ে নিচে নেমে এসে দাঁড়াল
বিল্ডিংয়ের সামনে। নিচে ততক্ষণে ভিড় জমে গেছে। শত শত মানুষের চোখ এখন ছয় তলার কার্নিশের দিকে, যেখানে বারিশ একদম রেলিং এর উপর ভয়ডর ছাড়া দাঁড়িয়ে আছে। মেহরাজ নিচে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল,
— বারিশ! নেমে আয় বলছি! কী পা”গলামি শুরু করেছিস তুই?
— আগে তোর ভাতিজিকে বল, ও যেন আমার সঙ্গে বাসায় ফিরে যায়! নইলে আমি এখনই লাফ দেব! জাস্ট মার্ক মাই ওয়ার্ডস!
বারিশের কাণ্ড দেখে ভিড়ের ভেতর থেকে এক দোকানদার চোখ কপালে তুলে বলে উঠল,
— আরে! এই ছেলের মাথা কি পুরোটাই খারাপ নাকি? ছয় তলা থেকে লাফ দিলে হাড্ডিগুড্ডির খোঁজ পাওয়া যাবে?
পাশ থেকে আরেকজন রিকশাচালক চাচা বলল,
— আহা রে! কী সুন্দর ফুটফুটে চেহারা ছেলের! প্রেমিকার লগে ঝগড়া কইরা জীবনডা শেষ করতে আইছে নাকি? পোলাপানের মাথা গরম ইদানীং বড্ড বেশি!
ভিড়ের মাঝখান থেকে এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক বিরক্তি প্রকাশ করলেন,
— এসব কী ভাই? সামান্য বিষয় নিয়ে আজকালকার ছেলেমেয়েরা পুরো রাস্তা ব্লকড করে ফেলে! পুলিশে খবর দে কেউ।
ওদিকে বারিশের দৃষ্টি সোজা নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ঝিলমিলের দিকে। আলো-আঁধারিতে মেয়েটার থমথমে ফর্সা মুখটা দেখা যাচ্ছে। একদম বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেহরাজ এবার অতিষ্ঠ হয়ে ঝিলমিলের দিকে ঘুরে বলল,
— ঝিলমিল, কিছু একটা বল প্লিজ! ও ভীষণ ডেঞ্জারাস! সত্যি সত্যিই লাফ দিয়ে দেবে!
রক্তশূন্য মুখে সোজা ছাদের দিকে তাকিয়ে রুদ্ধ কণ্ঠে বলল ঝিলমিল,
— তুমি তাকে এখনো বিশ্বাস করো চাচ্চু? দিতে বলো লাফ! আমি জীবনেও তাকে ক্ষমা করব না!
তাহসিন বলল,
— মিস্টার বারিশ, আপনি লাফ দিয়ে দিন! আপনার মিসেস আপনাকে মাফ করছে না!
তাহসিনের উসকানিতে মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেল সবাই।
বারিশ কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হঠাৎই শরীরটা সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকে আনল! যেন এক পা বাড়ালেই ছয় তলা নিচে পাকা রাস্তায় আছড়ে পড়বে! সঙ্গেই সঙ্গেই নিচে দাঁড়িয়ে থাকা পুরো ভিড়ের মধ্যে আতঙ্কের তোলপাড় উঠে গেল। লোকজনের চেঁচামেচি আর হইচইয়ের মাত্রা এক লাফে বেড়ে গেল দশ গুণ। বারিশ এবার হাত উঁচিয়ে চূড়ান্ত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,
— ভিরের লোকজন, আপনারা শুনতে পাচ্ছেন? মিথ্যে বলার অপরাধে আমি আমার স্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাইছি। তাকে বলুন, বারিশ আর কখনো মিথ্যা বলবে না, আর কখনো ম’দ খাবে না। বলুন আমায় ক্ষমা করতে। সে ক্ষমা করলে আমি নিচে নেমে আসব, নয়তো আপনাদের সাক্ষী রেখে আজ রাতে একটা নিষ্পাপ ছেলে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে।
বাক্যগুলো শোনামাত্রই উপস্থিত সবাই ঝিলমিলের ওপর একপ্রকার চড়াও হলো। চারপাশে থাকা সাধারণ মানুষজন আর দোকানদারেরা আকুতি শুরু করে দিল,
— ও খালামণি, মাফ করে দাও! এত সুন্দর পোলাডা মইরা যাইব!
— রাগ কোরো না বোন, সামায়িক ভুলের জন্য একটা মানুষের জীবন নিও না! মাফ করে দাও, ওপর থেকে নেমে আসুক!
চারপাশের চি”ৎকার-চেঁচামেচিতে ঝিলমিলের কান্না পাচ্ছিল। কোথায় লোকটা একটু ভালোবেসে, অনুশোচনা নিয়ে ওর রাগ ভাঙাবে… তা নয়, পুরো বিশ্বকে ডেকে এনে এভাবে ব্ল্যাকমেইল করছে! সবার হাতজোড় আর চাপে দিশেহারা হয়ে ঝিলমিল কান্নামেশানো গলায় ওপরের দিকে চেয়ে চেঁচিয়ে বলল,
— হ্যাঁ! নেমে আসুন আপনি, ক্ষমা করে দিলাম আপনাকে!
নিচ থেকে একজন অমনি দু’হাত উঁচিয়ে সায় দিল,
— ও ভাই! এবার নেমে আসুন! আপনার বউ মাফ করে দিছে।
বারিশ ছাদ থেকে আবার শুধাল,
— জিজ্ঞেস করুন, ও আমার সাথে বাসায় ফিরবে কিনা!
ঝিলমিল অসহায় চোখে পাশে দাঁড়ানো লোকটার দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
— বলুন ফিরব…
লোকটা সঙ্গে সঙ্গে ওপরের দিকে হাত নেড়ে চিৎ’’কার করল,
— হ্যাঁ হ্যাঁ, ফিরবে! নেমে আয় তুই বাপ, নেমে আয়!
কিন্তু বারিশ সেখানে থামল না। সে আবার গম্ভীর গলায় হাঁক দিল,
— ওখানে ওর চাচা দাঁড়িয়ে আছে! তার মাথায় হাত রেখে শপথ করে বলতে বলুন যে, ও আমার সাথে বাসায় ফিরবে!
মেহরাজ এবার বিরক্তি নিয়ে বলল,
— এই তুই আমাকে মাঝখান থেকে ফাসিয়ে দিচ্ছিস কেন রে? নেমে আয় তুই! তুই নেমে আয়, আমি নিজে তোকে আর ঝিলমিলকে বাসায় রেখে আসব, গ্যারান্টি দিলাম!
আর কথা বাড়াল না বারিশ। ছাদের রেলিং এর উপর থেকে নেমে এসে নিজের পা থেকে দড়ির বাঁধনটা খুলল। ছাদে থাকা গেথে থাকা এক রডের সাথে শক্ত দড়ি বেঁধে, সেটার অন্য প্রান্ত নিজের পায়ের সাথে বেঁধে রেখেছিল! যাতে ভুলবশত পড়ে গেলেও মাঝপথেই শূন্যে ঝুলে থাকে।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল বারিশ।
নিচে এসেই, সেখানে জমা হওয়া লোকজন কিংবা মেহরাজ তাহসিন দীঘি কাউকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে, সে সোজা ধেয়ে এল ঝিলমিলের দিকে। এক হেঁচকা টানে ঝিলমিলকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরে জড়িয়ে ধরল। ঝিলমিলের কানের কাছে মুখ এনে বারিশ ফিসফিস করে রুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
— থ্যাংক ইউ ফর গিভিং মি আ নিউ লাইফ, ওয়াইফি!
ঝিলমিল কিছু বলল না। বারিশ আলতো করে ওর দুই গালে হাত রেখে কপালে ঠোঁট ছোঁয়াতে ঝুঁকে আসতেই চারপাশের মানুষজনের চোখ একদম গোল গোল হয়ে গেল! এতক্ষণ যে ছেলেটার জীবন বাঁচানোর জন্য সাধারণ পথচারী থেকে শুরু করে দোকানদারেরা চেঁচামেচি করল, সেদিকে ছেলেটার কোনো খেয়ালই নেই! সে যেন পুরো দুনিয়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের মতো মেতে আছে! হঠাৎ বারিশ মাথা তুলে উপস্থিত ভিড়ের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
— বউকে চুমু খাব! আপনারা আপাতত চলে যান, নাহলে নিজেরাই লজ্জা পাবেন।
ছেলেটার বেহায়াপনা দেখে ভিড় থেকে এক মুরব্বি মেজাজ খারাপ করে বলে উঠলেন,
— কেমন বেহায়া পোলা ! নিজে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে নির্লজ্জের মতো কাণ্ডকারখানা করতাছে, আবার আমাগো কয় লজ্জা পামু! চলেন তো ভাই সবাই, কাজের কাজ শেষ, এখন এসব ফালতু নাটক দেখার সময় নাই!
উপস্থিত লোকজন গজগজ করতে করতে ধীরে ধীরে যে যার মতো চলে গেল। রাস্তা ফাঁকা হয়ে গেল কিছুক্ষণেই। কেবল একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল ইরান, মেহরাজ, দীঘি আর তাহসিন। বারিশ ত্যাড়া চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আপনাদের কি আলাদা করে দাওয়াত দিয়ে বিদায় করতে হবে, নাকি এমনিতেই যাবেন?
চলে গেল ওরাও। অবশেষে চারপাশে কেউ নেই। নিরিবিলি রাস্তার বারিশ আবার ঝিলমিলের মায়াবী মুখটার দিকে তাকাল। কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খাওয়ার জন্য ঝুঁকে আসতেই ঝিলমিল ঝটকা মেরে মাথা পেছনে সরিয়ে নিল।
— ছোবেন না আমাকে! কী ভেবেছেন আপনি, সব ভুলে গেছি? আপনি ম রে গেছেন ভেবে আমি পাগলের মতো করেছি, চোখের সামনে অন্ধকার দেখছিলাম, মনে হচ্ছিল নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মরেই যাব! আর আপনি… আপনি তখন বন্ধুদের সাথে ম”দ খেয়ে বারবিকিউ পার্টি করছিলেন! আপনি জানেন তখন আমার কেমন লেগেছিল, যখন তাহসিন আঙ্কেল এসে বলল আপনিও ওই ক্র্যাশ হওয়া প্লেনে ছিলেন! বুঝবেন কীভাবে? সে হৃদয় আছে আপনার?
ইচ্ছে করে কাঁদিয়েছেন না আমাকে? ইচ্ছে করে ছটফট করিয়েছেন না? ঠিক আছে… আপনিও একদিন এভাবে কাঁদবেন! যেদিন আমি থাকব না, সেদিন বুঝবেন কী যন্ত্রণা! আমার চেয়েও হাজার গুন বেশি কাঁদবেন সেদিন!
বলতে বলতে ঝিলমিলের চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়তে লাগল। জ্বরে পুড়তে থাকা মেয়েটার শরীরটা কান্নার তোড়ে কাঁপছে। বারিশ তাকে আর একটা শব্দও বলতে দিল না। দুই হাতে ঝিলমিলের নরম গাল দুটো শক্ত করে ধরে, নিজের কপালটা ঠেকিয়ে দিল স্ত্রীর কপালে। সামনাসামনি দুটি নিঃশ্বাস এক হয়ে গেল। ফিসফিস করে উঠল,
— বলতে বলতে বেশি বলে ফেলো না! থাকবে না মানে? মেরে ফেলব সেকেন্ড টাইম এমন কথা শুনলে!
ঝিলমিল আর কিছু বলতে পারল না, শুধু কাঁদতে লাগল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। বারিশ ওর চোখের পানিটা বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে আলতো করে মুছে দিয়ে আরও নরম বলতে শুরু করল,
— আমি সত্যি ভাবিনি যে তুমি এতটা ভেঙে পড়বে, সিয়েনা। আমার কোনো ধারণাই ছিল না যে আমি না থাকলে কেউ এতটা অসহায় হয়ে পড়তে পারে। সেদিন রাতে যখন দেখলাম বৃষ্টিতে ভিজে একটা ছোট্ট মেয়ে আমার মতো একজন মানুষের জন্য হাউমাউ করে কাঁদছে… ট্রাস্ট মি জান… মনে হয়েছিল আমি দুনিয়ার সবচেয়ে ভাগ্যবান পুরুষ! মনে হচ্ছিল, এই ছারপোকার মতো জীবনে সত্যি আমার বলতে কেউ একজন আছে, যে আমাকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।
ঝিলমিল কান্নামাখা চোখে ওর দিকে চেয়ে অভিমানী গলায় ফিসফিস করল,
— আমি কাঁদলে খুব ভালো লাগে আপনার, তাই না? খুব আনন্দ হয়?
— হ্যাঁ, ভীষণ ভালো লাগে। তোমার চোখে আমার জন্য কান্না দেখলে আমার শান্তি লাগে। আমার হাতে চ”ড় খেয়ে কাঁদলে ভালো লাগে। আমাকে হারানোর ভয়ে কাঁদলে ভালো লাগে। আমার দেওয়া ভালোবাসার য”ন্ত্রণায় কাঁদলে ভালো লাগে। আমার বুকের নিচে আকুল হয়ে নিস্তার চাওয়ার আর্তনাদে কাঁদলে আমার ভালো লাগে। এই যন্ত্রণা, এই ছটফটানি… এগুলোই আমাকে বিশ্বাস করায় তুমি শুধুই আমার! কাঁদো তুমি, যত পারো কাঁদো… তোমার এই যন্ত্রণাই আমার কাছে দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য!
ঝিলমিল ভেজা চোখে তাকিয়ে রইল। কথা গুলো ভালোবাসা হিসেবে নেবে নাকি ভয় পাবে বুঝতে পারছে না সে। বলল,
— আর কখনো মিথ্যে বলবেন না।
— বলব না।
— মদ খাবেন না।
— তুমি থাকলে খাওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।
— সিগারেটটাও ছাড়তে হবে।
— তোমার ঠোঁট পেলে ওটার দরকার নেই।
— অন্য কোনো মেয়ের দিকে তাকাবেন না।
— তাকানোর সময় নেই।
— আমার কাছে কিছু গোপন করবেন না।
— করব না।
— আমাকে একা ফেলে কোথাও যাবেন বা।
— বেঁচে থাকতে যাব না।
— ভালোবাসেন?
— না…
— তাহলে?
বারিশ বলল,
শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৩৩
— ভালোবাসা দিয়ে কাউকে আটকে রাখা যায় না। ভালোবাসা শেষ হয়ে যায়, বদলে যায়। আমি তোমাকে বন্দি রাখতে চাই, গ্রাস করতে চাই, নিজের করে ধ্বংস করতে চাই। তোমাকে আমার এমন রোগ বানাতে চাই, যার কোনো চিকিৎসা নাই।
