Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৯৯ (৩)

দাহশয্যা পর্ব ৯৯ (৩)

দাহশয্যা পর্ব ৯৯ (৩)
Raiha Zubair Ripti

এজওয়ান পকেট থেকে ফোন বের করে কাউকে গাড়ি পাঠাতে বললো। মিনিট দশেকের মধ্যে একটা কালো রঙের গাড়ি চলে আসলো। ড্রাইভারের দরজা খুলে একজন লোক বেরিয়ে এল। কালো থ্রি-পিস স্যুট, সাদা শার্ট, কালো টাই,হাতে গ্লাভস। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। গাড়ির দরজা বন্ধ করে দ্রুত এজওয়ানের সামনে এসে মাথা নত করল। এজওয়ান গাড়ির চাবিটা হাতে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
” ট্যাক্সি নিয়ে চলে যাও তুমি অ্যালেক্স। টাকা আছে তো যাওয়ার? ”
” জি স্যার আছে। ”
” ওকে গুড। নাউ গো। ”
অ্যালেক্স চলে গেল। এজওয়ান মাহির দিকে তাকালো। একটু দূরেই বসে আছে। সে চেঁচিয়ে ডাকলো,

” হেই তরিকুলের বেটি শ্বাস নেওয়া হয়ে গেলে, কাম। শপিংমল থেকে আমাকে কিন্তু ল্যাবে যেতে হবে। ”
মাহি উঠে দাঁড়ালো। এগিয়ে এসে গাড়ির ভিতরে বসতেই এজওয়ান ও উঠে বসলো। মাহি জিজ্ঞেস করলো,
” ঐ গুন্ডা গুলো কে ছিল? ”
” চিনি না। ” খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললো এজওয়ান। তারপর গাড়ি স্টার্ট দিলো। শপিংমলে ঢুকেই মাহির চোখ চকচক করে উঠল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজনের হাতে একের পর এক শপিং ব্যাগ জমতে লাগল। মাহির জন্য কালো রঙের একটা লম্বা ওয়েস্টার্ন ড্রেস নেওয়া হলো। মসৃণ কাপড়ের ওপর সূক্ষ্ম নকশা। সঙ্গে মানানসই পেন্সিল হিল।
এজওয়ানও নিজের জন্য বেছে নিল কালো স্যুট। গাঢ় ধূসর শার্ট। কালো টাই। একজোড়া পালিশ করা ফরমাল জুতো।তারপর ঘড়ি, সানগ্লাস, পারফিউম একটার পর একটা।
কেনাকাটা করে তারা একটা রেস্টুরেন্টে বসে দুপুরের খাবার খেলো। খাবার খাওয়া শেষে মাহিকে গাড়ির চাবি দিয়ে বলল বাসায় চলে যেতে সে রাতে আসবে।
মাহি সম্মতি জানিয়ে চলে গেল এজওয়ানের গাড়ি নিয়ে। এজওয়ান ফোন করে আবার কাউকে গাড়ি নিয়ে আসতে বললো। কিছুক্ষণ পর কালো একটা গাড়ি এসে থামলো তার সামনে। এজওয়ান উঠে বসে বললো,

” প্যালেসে যাও। ”
গাড়ি ছুটে চলল। শহরের ব্যস্ততা পেছনে পড়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে রাস্তা ফাঁকা হতে লাগল। শেষ পর্যন্ত বিশাল লোহার গেটের সামনে এসে গাড়ি থামল। গেট খুলে গেল। দুই পাশে সারিবদ্ধ সশস্ত্র প্রহরী। কালো পোশাক। কানে যোগাযোগের যন্ত্র। চোখে কঠোরতা। গাড়ি ভেতরে ঢুকতেই একের পর এক গার্ড মাথা নত করল। এজওয়ান ভেতরে ঢুকে সর্বপ্রথম পাডার সাথে দেখা করলো। তাকে পেট ভরে চোখের সামনে বসিয়ে খাবার খাইয়ে পকেট থেকে পেনড্রাইভ টা বের করলো। সেটা ল্যাপটপের সাথে কানেক্টে করে কিছুক্ষণ দেখার পর রাগে ফেটে পড়ার বদলে আকস্মিক সে হেঁসে ফেললো। বোকা নারী মাহি। ভেবেছিল এজওয়ান বুঝবে না!
মাহি পেনড্রাইভ টা চেঞ্জ করে দিয়েছে! এজওয়ান ল্যাপটপ থেকে পেনড্রাইভ টা খুলে বাহিরে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
” আমার অনুমতি ছাড়া ঐ এপ্স পৃথিবীর কেউ চালাতে পারবে না। যতই থাকুক তার কাছে আমার এপ্সের ব্যাকআপ,আর্কিটেকচার। তুমি বড়জোড় এপ্সটাকে শুধু চোখে দেখতে পারবে। কিন্তু তার সকল কার্যক্রম সচল হবে কেবল আমার কথাতে। যাও আজকের দিন তোমার। ঈদ মানালো। ”

সিডনির অন্য প্রান্তে অন্ধকার নেমে এসেছে। সমুদ্রের কাছাকাছি পুরোনো একটি শিল্পকারখানা। বাইরে থেকে পরিত্যক্ত মনে হলেও জায়গাটার ভেতরে ঢুকলে বোঝা যায়, এটি কোনো সাধারণ গুদাম নয়।
প্রবেশপথে সশস্ত্র পাহারা। ছাদের ওপর নজরদারি। ভেতরে অন্ধকার কাচের ঘর। আর সেই ঘরের মাঝখানে বসে আছে একজন মানুষ। ভিক্টর ক্যালাহান। অস্ট্রেলিয়ার অপরাধজগতের এমন এক নাম, যার সঙ্গে ব্যবসা করার আগে বহুবার মানুষ নিজের মৃত্যুর সম্ভাবনাটাও হিসাব করে নেয়।
কিন্তু আজ ভিক্টরের মুখে অস্বস্তি। তার সামনে রাখা ফাইলের ওপর একটা ছবি। ছবির নিচে একটি নাম, The Shadow MONSTER.

কেউ জানে না তার আসল নাম কী। কেউ জানে না সে কোন দেশের। কেউ জানে না তার বয়স। এমনকি তার মুখও খুব কম মানুষ দেখেছে।
গত এক মাসে ভিক্টরের তিনটি অস্ত্রের চালান উধাও হয়েছে।
দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অদৃশ্যভাবে খালি হয়ে গেছে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর তার সংগঠনের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য নিখোঁজ। ভিক্টর বুঝতে পারেনি কার সঙ্গে তার শত্রুতা হয়েছে। আজ জানতে পারবে। কারণ সে ভুল করে এমন একটি জিনিস নিজের হাতে তুলে নিয়েছিল, যেটা তার হাতে থাকার কথা ছিল না। একটি ডেটা-ড্রাইভ।
সেখানে ছিল এমন কিছু তথ্য, যা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অপরাধচক্রকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করে দিতে পারে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে ছিল মনস্টারের পরিচয়ের একটি অংশ। ভিক্টর ভেবেছিল, তথ্যটা দিয়ে সে মনস্টারকে ব্ল্যাকমেইল করবে।

কিন্তু সে জানে না,মনস্টার ব্ল্যাকমেইল বোঝে না। সে বোঝে শুধু নির্মূল করা।
রাত প্রায় বারোটা। হঠাৎ বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।একটা নয়। পরপর কয়েকটা গাড়ি। ভিক্টরের লোকেরা অস্ত্র হাতে দরজার দিকে ছুটে গেল। কালো রঙের বিশাল এসইউভিগুলো এসে একে একে থামল। সবশেষে থামল একটি দীর্ঘ, কালো আর্মার্ড গাড়ি। দরজা খুলল। প্রথমে দুজন দেহরক্ষী নামল। তাদের পর আরও কয়েকজন।সবশেষে নামল মনস্টার। কালো রঙের লম্বা কোট তার হাঁটু পর্যন্ত নেমে এসেছে। ভেতরে সম্পূর্ণ কালো পোশাক।
হাতে কালো চামড়ার গ্লাভস। পায়ে ভারী কালো বুট। গলায় কালো স্কার্ফ। মুখের নিচের অংশ ঢাকা কালো মাস্কে। চোখের ওপর কালো ট্যাকটিক্যাল চশমা। মাথায় কালো হুড।চেহারার কোনো অংশই পরিষ্কার দেখা যায় না। তার চারপাশে থাকা গার্ডদের পোশাকও একই রকম কালো। মনস্টার ধীর পায়ে গুদামের ভেতর ঢুকল। তার আগমনেই যেন ঘরের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি কমে গেল। ভিক্টর উঠে দাঁড়াল।

“ কে তুমি?”
লোকটা টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। ভিক্টরের চোখ তার পোশাকের ওপর দিয়ে বারবার ঘুরে গেল। তারপর মনস্টার ধীরে ধীরে গ্লাভস পরা হাতটা তুলল। তারপর ফিসফিস করে বলল,
” দ্য শ্যাডো মনস্টার। হ্যাভ ইউ হিয়ার্ড দিস নেইম? ”
ভিক্টর চমকে উঠলো। মনস্টার খোদ তার সামনে এসেছে! সে ভাবতে পারে নি এটা। যাকে কেউ আজ অব্দি দেখে নি।
” দ্য শ্যাডো মনস্টার! ”
” ইয়েস। ডু ইউ ওয়ান্ট টু সি মি? ”

ভিক্টর উপর নিচ মাথা ঝাকালো। অর্থাৎ সে দেখতে চায় মনস্টার কে। মনস্টার হাতের ইশারায় সবাইকে বাহিরে চলে যেতে বললো। সবাই মাথা নত করে দরজাটা বাহির থেকে লাগিয়ে দিয়ে চলে গেল। মনস্টার এক পা এগিয়ে এল ভিক্টরের দিকে। ধীরে ধীরে নিজের গগলস খুললো। কিন্তু মুখের মাস্ক তখনও অটুট। মনস্টার বলল,
” নট এভরিওয়ান ক্যান সি মি। অনলি দোজ আই চুজ টু শো মাইসেল্ফ টু ক্যান সি মি। ইউ আর ওয়ান অব দেম, ভিক্টর। ”
ভিক্টর হেঁসে উঠলো। সে চায় মনস্টার তার ফেইস উন্মুক্ত করুক। চারিদিকে সে ক্যামেরা ফিট করে রেখেছে। পুরো পৃথিবীর সামনে এবার মনস্টারের আসল পরিচয় প্রকাশ করে দিবে। মনস্টার এবার গলার কালো স্কার্ফটা একটু আলগা করল। চোখের ওপরের কালো চশমা খুলে ফেলল। হুডটাও সরিয়ে দিল। তারপর মাস্কের ওপর হাত রাখল।
মুখটা এবার পুরোপুরি প্রকাশ পেল। ভিক্টরের চোখ বিস্ফারিত। মুখ থেকে সমস্ত রক্ত যেন সরে গেল। তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল। সে এক পা পিছিয়ে গেল। মুখ থেকে অস্ফুট শব্দ বের হলো,

“তুমি!”
মনস্টার ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে রইল। ঠোঁটে ধীরে ধীরে হাসি ফুটল।
” ইউ আর শকড্, আরেন্ট ইউ? ইউ নেভার ইম্যাজিন্ড দ্যাট আই ওয়াজ দ্য শ্যাডো মনস্টার? ”
ভিক্টর যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না।
“কিন্তু… তুমি তো…”
” হুঁশশ, বি কোয়ায়েট। ”
মনস্টার তার কথা শেষ করে দিল। তারপর আরও এক পা এগিয়ে গেল। ভিক্টরের চোখে এবার স্পষ্ট আতঙ্ক।
“আমি জানতাম না তুমি…”
মনস্টার টেবিলের ওপর পড়ে থাকা সেই ডেটা-ড্রাইভটার দিকে তাকাল।
“জানার কথাও না। তবে তুই এমন একটা জিনিস চুরি করেছিস, যেটা চুরি করার পর বেঁচে থাকার কোনো রাস্তা থাকে না। তারপর তোকে বাঁচিয়ে রেখেছি। কারন আমি দেখতে চেয়েছি তুই কতদূর যেতে পারিস। এখন দেখা শেষ। তাই আমি নিজ থেকেই তোর সাথে দেখা করতে এসেছি। ”
ভিক্টর মরিয়া হয়ে বলল,

“ বিশ্বাস করো আমি কাউকে কিছু বলিনি!”
মনস্টার মৃদু হাসল।
“সমস্যা সেটা নয়। সমস্যা হলো, তুই আমার মুখ দেখে ফেলেছিস। আর আমার ফেস যখন দেখেই ফেলছিস তখন তোকে বাঁচিয়ে রাখি কী করে? আমার ফেস দেখা মানে নিজের মৃত্যু কে সামনে থেকে দেখা। ”
ভিক্টর কিছু বলার আগেই ঘরের বাতি নিভে গেল। মনস্টার এগিয়ে এলো। কোমরের পেছন থেকে ধারালো একটা ছুরি বের করে সোজা গলার ভিতর চালিয়ে দিলো ভিক্টরের।
অন্ধকারের মধ্যে একবার শব্দ হলো গোঙানির। তারপর ফিনকি তুলে র’ক্ত গড়াতে লাগলো।
তারপর সব শান্ত। কয়েক সেকেন্ড পর আলো জ্বলে উঠল।
ভিক্টর আর নড়ছে না। মনস্টার নিজের কালো গ্লাভসটা খুলে ফেলল। নতুন একটা গ্লাভস পরল। তারপর টেবিল থেকে ডেটা-ড্রাইভটা তুলে নিল।

“ ভেতরে এসো। আর সব পরিষ্কার করো।”
পেছন থেকে একজন গার্ড মাথা নত করল।
“জি।”
মনস্টার আবার মুখ ঢেকে নিল। হুড মাথায় তুলল। কালো চশমা চোখে পরল। তারপর দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে থামল। তারপর পকেট থেকে গান বের করে যেখানে যেখানে ক্যামেরা লাগানো ছিলো সেখা সেখানে গুলি ছুঁড়ে দিয়ে নষ্ট করে দিলো। তারপর গানটা পকেটে ভরে গাড়িতে উঠে বসলো। গাড়ি চলতে শুরু করলো। হুট করে ফোনে একটা নোটিফিকেশন আসতেই মনস্টার ফোনটা বের করলো। স্কিনে ভেসে উঠলো এক রমণীর মুখচ্ছবি। রমণী টা বাড়ির বাগানের দোলনায় বসে আছে। বারবার এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। তারপর একসময় হতাশ হয়ে চলে গেল ভেতরে। মনস্টার রিমোটের মাধ্যমে বাটন টিপে ড্রোন টা সরিয়ে নিলো। তারপর মনস্টার কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। স্ক্রিনে তখনও সেই রমণীর ছবি।
বাড়ির বাগানের দোলনাটা ধীরে ধীরে দুলছে। অথচ দোলনায় আর কেউ নেই। কিছুক্ষণ আগে যে নারী সেখানে বসে বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিল, সে এখন ঘরের ভেতরে চলে গেছে। মনস্টারের ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল। সে ফোনের স্ক্রিন বন্ধ করে দিল। বলল,

“ফুলের দোকানে যাও।”
সামনের সিটে বসে থাকা লোকটি সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকাল।
“জি, স্যার।”
“ অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে দামী সুন্দর ফুলের একটা বড় তোড়া। আর একটা ডায়মন্ড রিং লাগবে আমার।”
লোকটি একটু থমকালেও কোনো প্রশ্ন করল না। একটু পরেই গাড়ির গতি বাড়ল। শহরের আলো একটার পর একটা পেছনে পড়ে রইল। মনস্টার পেছনের সিটে নিশ্চুপ বসে রইল। তার কালো গ্লাভস পরা আঙুলে তখনও ভিক্টরের ডেটা-ড্রাইভটা ধরা।

কিছু মানুষকে সে মৃত্যু উপহার দেয়। আর কিছু মানুষকে দেয় ফুল। কিন্তু দুটোর পেছনেই তার উদ্দেশ্য প্রায় একই।
প্রায় এক ঘণ্টা পর গাড়ি থামল শহরের অভিজাত এক ফুলের দোকানের সামনে। মনস্টার তার পরনের গ্লাভস,হুড,মাস্ক, গগল, ওভার কোট সব খুলে ফেললো। পড়নে তখন রইলো কালো স্যুট ব্যুট। সে নেমে গেল গাড়ি থেকে। তারপর ভেতরে ঢুকে দোকানের সবচেয়ে দামী ফুলগুলো বেছে নিল। লাল লিলি, লাল গোলাপ আর কয়েকটি অচেনা বিদেশি ফুল দিয়ে তৈরি হলো বিশাল একটি তোড়া।
তারপর পাশের অভিজাত জুয়েলারির দোকান থেকে নেওয়া হলো একটি দামী ডায়মন্ড রিং। যেটা শুধু এই বাজারে না পুরো অস্ট্রেলিয়ায় এক পিসই ছিলো। ছোট্ট কালো বাক্সের ভেতরে রাখা রিংটির মাঝখানে বসানো স্বচ্ছ হীরেটা আলোয় ঝিলিক দিচ্ছিল। দুটো জিনিসই একটি কালো রঙের বাক্সে রাখা হলো। তারপর বাক্সটির সঙ্গে দেওয়া হলো একটি কার্ড।
মনস্টার নিজ হাতে কলম তুলে নিল। কয়েক মুহূর্ত নীরবে তাকিয়ে থেকে কার্ডের ওপর কিছু একটা লিখে কলমটা টেবিলের ওপর রেখে দিল।
তারপর বাক্সটা বন্ধ করে বলল,

“ পাঠিয়ে দাও সেখানে। ”
লোকটি মাথা নত করল। “জি স্যার।”
মনস্টার আর কিছু বলল না। তার গাড়ি ধীরে ধীরে ফুলের দোকানের সামনে থেকে সরে গেল।
কলিংবেলের আওয়াজ শুনে মাহি নিচে আসলো। ভেবেছিল এজওয়ান এসেছে। তবে দরজা খুলে কাউকে দেখতে পেলো না। ভাবলো হয়তো বাচ্চা ছেলেপেলের কাজ। সেজন্য সে দরজা বন্ধ করতে গিয়ে নিচে তাকাতেই দেখলো সেখানে বিশাল আকারের একটা সাদা ফুলের তোড়া আর তার মাঝে একটা কালো বক্স। মাহি আশেপাশে তাকিয়ে তোড়াটা হাতে নিলো। বক্সটা খুলে দেখলো তাতে সুন্দর একটি ডায়মন্ড রিং। তার নিচেই একটা কার্ড। তাতে লেখা,
“For my beautiful obsession.
Wear the ring. Keep the flowers.
And remember..
you were mine long before you knew my name.”
~ your unhealthy love

মাহি ভাবলো এটা এজওয়ান পাঠিয়েছে। সেজন্য তোড়া টা সাথে নিয়ে দরজা আটকে ভিতরে চলে আসলো। রুমে ঢুকে ফুল গুনে দেখলো তাতে ৩৮০ টা ভিন্ন ভিন্ন জাতের ফুল আছে। মাহি মুচকি হেসে এজওয়ান কে পাগল বলে ওয়াশরুমে গেলো গোসল করতে।
সন্ধ্যার অনেকটা পর এজওয়ান বাড়ি ফিরলো। দেখলো মাহি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তার চুল গুলো শুকাচ্ছে। চুল গুলো আগের তুলনায় বড় হয়েছে। কারন এজওয়ান নিজের থেকেও মাহির চুলের যত্ন নেয়। কারন তার লং হেয়ার ভীষণ পছন্দ। সেজন্য মাহিকে কাটতেও দেয় না চুল। মাহি গুন গুন করে গান গাইছে..
“ Baby I don’t need dollar bills to have fun tonight, I don’t need no money… ”
এজওয়ান গায়ের জ্যাকেট টে খুলে বিছানায় ফেলে দিয়ে মাহির দিকে এগিয়ে এসে মাহির হাত থেকে হেয়ার ড্রায়ার টা নিজ হাতে নিয়ে তার চুল শুকাতে শুকাতে বলল,

” Because You worth more than diamond More than gold.”
আকস্মিক এজওয়ান কে দেখে মাহি চমকে উঠলো। ঘুরে বলল,
” কখন আসলেন আপনি?”
” কেবলই আসলাম। ”
মাহি মাথা নত করে বলল,
” ধন্যবাদ।”
এজওয়ান কপাল কুঁচকে বলল, ” ফর হোয়াই?”
মাহি পাশে টেবিলের উপরে থাকা ফুলের তোড়া আর রিংটা দেখিয়ে বলল,
” ফর দ্যিস। ”

এজওয়ান এগিয়ে গেলো। ফুলের তোড়া আর রিংটা হাতে তুলে নিয়ে বলল,
” আমার জন্য এনেছো নাকি? বাহ! সুয়ামির প্রতি এত প্রেম যে আজ! আজ কী আমাদের বিবাহবার্ষিকী? ” এজওয়ান ফোনে তারিখ দেখে বলল, ” না,আজ তো বিবাহবার্ষিকী না। তাহলে? আর রিং দেখে তো মনে হচ্ছে এটা মেয়েদের রিং। আমার হাতে তো মানাবে না। ”
মাহিও এগিয়ে আসলো। এজওয়ানের বাহুতে চিমটি কেটে বলল,
” একদম ঢং করবেন না বলে রাখলাম। আপনি নিজেই তো পাঠিয়েছেন আমার জন্য। এখন ভাব করছেন। বললেই হয় আপনিও আমার তরফ থেকে এসব চান। নেক্সট টাইম আমি দিব প্যারা নিয়েন না। জাস্ট চিল। ফুল আর রিংই তো। ”
এজওয়ান এতক্ষণ খোশমেজাজে থাকলেও এখন সিরিয়াস হলো।
” আমি কখন দিলাম এটা তোমায়?”
” কেন সন্ধ্যার আগ দিয়ে। দরজার বাহিরে রেখেছিলেন। ”
” তোমাকে কিছু দেওয়ার হলে আমি এত রংঢং করে কেন দিতে যাব? সরাসরি তো তোমার হাতেই দিব। ”
মাহি বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,

” আহা নাটক বন্ধ করুন তো। একবার আমার জন্মদিনেও তো এমন নাটক করেছিলেন। ভুলে গেছি নাকি আমি? আপনি ছাড়া এসব পাগলামি কে করে আমার জন্য শুনি? ”
মাহি চলে গেল। এজওয়ান ফুল আর আংটির দিকে তাকিয়ে রইলো। শালার কে পাঠালো এসব? ভুল ঠিকানায় কেউ পাঠিয়ে দেয় নি তো? রিংটা তুলে দেখলো। অনেক দামী মনে হচ্ছে।
এজওয়ান রিং এর ছবিটা তুলে অনলাইনে সার্চ দিতেই চমকে উঠলে। এই রিংটার দাম ৩৮০ কোটি টাকা। ডায়মন্ডের নাম Blue Moon of Josephine। এজওয়ান তার এপ্স নিলামে তুলে বিক্রি করলেও বোধহয় এত টাকা পাওয়া যাবে না!

হায় খালিদ সেখানে এত দামী রিং তার বাসায় কে পাঠালো! পাশে থাকা কার্ড টা তুলে নিলো। সেখানে থাকা লেখা গুলো পড়ে এজওয়ানের মাথা রাগে ফেটে যেতে লাগলো। কোন জোচ্চর, লুইচ্চা তার বউকে এসব পাঠালো! তরিকুলের বেটি কি তাকে রেখে কোনো পরপুরুষের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে!
বিশ্বাস নেই তো। জড়াতেও পারে এজওয়ানের থেকে বেটার অপশন পেলে। কোন গোলামের পুত তার সংসারে নজর দিলো! কিড়মিড় করতে লাগলো শরীর টা। আংটিটা সে বেচে দিবে। সেই টাকা দিয়ে মাহিকে নিয়ে হানিমুনে যাবে। তারপর খুঁজবে কোন শালার ব্যাটা পাঠিয়েছে। ঠ্যাং ভেঙে গাছে উল্টো করে ঝুলিয়ে পাছার ছাল তুলবে।

মেহরিন পরের দিন সকালে উকিল নিয়ে জেলে গেলে ইন্সপেক্টরের মুখে শুনতে পারে যে ইমনের নাকি জামিন হয়ে গেছে। মেহরিন চমকায়। জিজ্ঞেস করে,
” কে করিয়েছে জামিন? ”
ইন্সপেক্টর বলল, ” এক মহিলা এসে করিয়ে নিয়ে গেছে। ”
মেহরিন ফোনটা বের করে ইমনকে ফোন করলো। ফোন ঢুকছে না। ইমন ভাই জামিন পেয়েছে,কেউ এসে তাকে জামিন করিয়েছে আর ইমন সেটা তাকে জানাবে না! এ তো অসম্ভব।
সে আবার চেষ্টা করলো। ফোনে কল এবার ঢুকলো না।
” মহিলার নাম জানেন কে করিয়েছে জামিন?”
ইন্সপেক্টর তাড়াহুড়ো করে বলল,” না জানি না। আমাকে বের হতে হবে। আপনারা আসুন। ”
উকিল সাহেব চলে গেলেন। মেহরিনও বেরিয়ে আসলো। ইতি বেগম কে ফোন করে বলল ইমনের জামিন হয়ে গেছে। কেউ এসে করিয়ে নিয়ে গেছে।
ক্লান্ত দেহ নিয়ে নিবাসে আসলো। কিছুদিনের মধ্যে ক্লাস শুরু হবে। পুরোদমে তাকে পড়াশোনাতে ফোকাস করতে হবে।

মেহরিন রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে জানালার নিকট দাঁড়াতেই দেখতে পেলো সোলেমান ব্যস্ত ভঙ্গিতে হেঁটে আসছে। তাকে দেখেই এনা দৌড়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কিছু বলল। সোলেমান কপালে স্লাইড করতে করতে কি একটা যেন বলে পাশ কাটিয়ে চলে আসলো।
মেহরিন মাথায় কাপড় টেনে নিচে আসলো। চোখাচোখি হলো দুজনের। সোলেমান উপরে চলে গেল। মেহরিন এসে খাবার টেবিলে বসে রফিক কে খাবার দিতে বলল। রফিক নেই,বাজারে গিয়েছে। অগ্যতা মেহরিন নিজেই রান্না ঘরে গেল। পিছুপিছু এনাও আসলো। রান্না ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
” এক মগ কফি দিও তো মেহরিন। ”
মেহরিন কফি বানিয়ে টেবিলের উপর রাখলো। এনা মেহরিনের দিকে একবার তাকালো। মেহরিন মাথা নত রেখে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে খাবার খাচ্ছে। এনা কফির মগে চুমুক বসালো। তারপর কফির মগটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো ফ্লোরে। মেহরিন একবার সেদিকে তাকালো। এনা উঠে চলে যেতে নিলে মেহরিন বলে উঠলো,

” জায়গাটা পরিষ্কার করে যান। ”
এনা পিছু ফিরে তাকালো। এগিয়ে এসে বলল,
” কী বললে তুমি? আরেকবার বলো। ”
” যথেষ্ট সাউন্ডে বলেছি। না শুনে থাকলে হয়তো কানে সমস্যা আপনার। কোনো ব্যপার না। আবার বলছি তাহলে। জায়গাটা পরিষ্কার করে তারপর যেখানে খুশি সেখানে যান।”
এনা রেগেমেগে এবার মেহরিনের সামনে থেকে ভাতের প্লেট টা ছুঁড়ে ফেলে দিলো ফ্লোরে। মেহরিনের রাগের মাত্রা এবার আকাশ ছুঁই ছুঁই হলো। তার সামনে থেকে আজ পর্যন্ত কেউ ভাতের থাল সরিয়ে দেখায় নি। সেখানে এই মেয়ে তার ভাতের থাল ফেলে দিলো! মেহরিন বসা থেকে উঠে সাথে সাথে এনার গালে চড় বসিয়ে দিলো। এনা অবাকের চরম পর্যায়ে। তার শরীরে আজ পর্যন্ত কেউ হাত তুলে নি। সেখানে এই দু টাকার মেয়ে হাত তুললো। সে ভয়ংকর রেগে গেলো।

” ব্লাডি বিচ তোমাকে তো আমি…” কথাটা বলতে বলতে মেহরিনের গলা চেপে ধরার জন্য উদ্যোত হলে পেছন থেকে সোলেমান বলে উঠলো,
” কী হচ্ছে কী এখানে? ”
এনা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, ” তোমার স্ত্রীর এত বড় সাহস আমাকে চড় মারে। দু টাকার মেয়ে একটা। নেই কোনো ক্লাস। অসভ্য বেয়াদব মেয়ে। ”
কথা গুলো বেশ উচ্চস্বরে বললো মেহরিনের দিকে তাকিয়ে অপমানসূচক ভাবে। সোলেমান এগিয়ে আসলো। ফ্লোরে পড়ে থাকা ভাঙা প্লেট আর মগের দিকে একবার তাকিয়ে ফের মেহরিনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
” কে ভেঙেছে এসব?”
” উনি। ”
সোলেমান তাকালো এবার এনার দিকে। ” হোয়াই?”
” তোমার স্ত্রী ভীষণ জঘন্য ভাবে কফি বানিয়েছিল। হাত ফস্কে মগটা পড়ে যাওয়ায় সে আমাকে যা নয় তাই বলেছিল। আমাকে জায়গাটা পরিষ্কার করতে বললে আমি মানা করলে আমাকে চড় মারে। ”
” প্লেট ভাঙলো কী করে তবে?”

” তোমার স্ত্রী চড় মারায় আমি ছিটকে টেবিলের উপর পড়ে গেলে তখন প্লেট টা পড়ে যায়। ”
সোলেমান বুকে হাত গুঁজে বলল, ” ওয়াও নাইস! ইন্টারেস্টিং তো! মেহরিন তোমার মতো জিরাফ কে একটা চড় মেরেই টলিয়ে দিলো! অ্যাম প্রাউড অব ইউ মেহরিন। শো মি দ্যাট এগেইন। কুইক। কী হলো?”
মেহরিন তাকালো। সোলেমান বলল,” তাকিয়ে থাকতে বলেছি? করতে বলেছি। যাও আমার সামনে চড় মারো। ”
এনা নিজেও এবার চমকে থতমত খেয়ে গেলে। অবাকের সহিত বলল,
” আমাকে মারতে বলছো তুমি ওকে? হ্যাভ ইউ লস্ট ইয়োর মাইন্ড? ”
” মেহরিন যাও। ” ধমকে বলে উঠলো সোলেমান। মেহরিনের রাগ এখনো কমে নি। ইচ্ছে করছে এনাকে আরো কটা চড় মারতে। কিন্তু নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে এগিয়ে পাশ কেটে চলে যেতে নিলো। এনা ভাবলো মেহরিন সত্যি সত্যি তাকে মারতে আসছে। সেজন্য সে আঙুল তুলে উচ্চস্বরে মেহরিন কে শাসালে সোলেমান এনার চুলের মুঠি ধরে মেহরিনের পায়ের কাছে ছুঁড়ে ফেলে বলে…

“ এই বান্দির মেয়ে, তোর সাহস হয় কি করে আমারই সামনে আমারই বউয়ের চোখে চোখ রেখে উচু গলায় কথা বলার? আমার বউয়ের সাথে চোখে চোখ রেখে,উঁচু গলায় দ্বিতীয়বার কথা বলে দেখ। চোখের সাথে সাথে গলার রগ,কণ্ঠনালী তিনটাই টেনে ছিঁড়ে নিয়ে আসবো..বাজারি। মেহরিন মারো এনাকে। ”
মেহরিন মারলো না। চলে গেল।
ইমনের প্রকৃতপক্ষে কোনো জামিন হয়নি। যে আশায় এতক্ষণ বুকের ভেতর ক্ষীণ একটা আলো জ্বলছিল, মেহরিন আসবে। তাকে জামিন করাবে। সেটাও নিভে গেল যখন কারারক্ষী এসে সংক্ষিপ্ত স্বরে সেদিন রাতে জানিয়ে দিল,
“চলো।”
ইমন অবাক হয়ে তাকাল।
“কোথায়?”

কোনো উত্তর এল না। হাতের শিকলটা আরেকটু শক্ত করে ধরল প্রহরী। ইমনকে জেলের ভেতরের করিডোর পেরিয়ে বাইরে নিয়ে আসা হলো। ইমনের বুকের ভেতর অস্বস্তিটা ধীরে ধীরে ভারী হতে লাগল।
জেলগাড়ির ভেতরে তাকে বসিয়ে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলো। গাড়ি চলতে শুরু করতেই সে জানালার ছোট্ট ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাল। শহরটা পিছিয়ে যাচ্ছিল। পরিচিত রাস্তাগুলো একে একে অচেনা হয়ে উঠছিল। কিছুক্ষণ পর ইমন খেয়াল করল, গাড়ির পথটা অস্বাভাবিক। ইমন ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
সামনের দুই পুলিশ সদস্যের কথোপকথনের কিছু অংশ তার কানে এল।
“আর কতদূর?”
“আর বেশি দূরে না গন্তব্য।”

বাকিটা স্পষ্ট শুনতে পেল না। কিন্তু ওই অসম্পূর্ণ বাক্যটাই যথেষ্ট ছিল। ইমনের মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল স্রোত নেমে গেল।তার সঙ্গে খারাপ কিছু ঘটতে চলেছে। হঠাৎ গাড়িটা একটা বাঁক নিতেই ইমন জানালার দিকে তাকাল। দরজার লকটা তার চোখে পড়ল। কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে সেটার দিকে তাকিয়ে রইল সে।
তারপর সিদ্ধান্ত নিল। গাড়ির গতি কিছুটা কমতেই ইমন হঠাৎ সমস্ত শক্তি দিয়ে দরজার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুহূর্তের অসতর্কতায় দরজা খানিকটা খুলে যেতেই সে শরীরটা বাইরে ছুড়ে দিল। পিচের ওপর গড়িয়ে পড়ল সে।পেছন থেকে চিৎকার ভেসে এল,

“এই! ধরো ওকে! পালাতে দিও না! গুলি কোরো না! জীবিত চাই!”
শেষ কথাটা ইমনের কানে স্পষ্ট পৌঁছাল। জীবিত চাই।
কেন? তাকে মেরে ফেলতে চাইলে তো গুলি করাই সহজ ছিল। তাহলে তাকে জীবিত কেন দরকার? প্রশ্নটা তার আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে দিল। ইমন আর পেছনে তাকাল না। হাঁটুতে তীব্র ব্যথা। কনুই ছড়ে রক্ত বেরিয়ে এসেছে। তবু সে দৌড়াতে লাগল। পেছনে পুলিশের বুটের শব্দ। ইমন আরও জোরে দৌড়াল।
রাস্তা ছেড়ে সে ঢুকে পড়ল সরু এক গলিতে। তারপর আরেকটা। অন্ধকার ক্রমশ ঘন হয়ে আসছিল। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে, বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু থামলে চলবে না। পেছনের শব্দগুলোও যেন কাছে চলে আসছে।
হঠাৎ সামনে একটা পুরোনো পরিত্যক্ত ভবনের মতো স্থাপনা চোখে পড়ল। চারপাশে উঁচু দেয়াল, ভেতরে গাছপালা আর ঝোপঝাড়ে ঢাকা। বাইরে থেকে দেখলে জায়গাটাকে নিরাপদ আশ্রয় বলার কোনো কারণ নেই।
তবু ইমনের কাছে এ মুহূর্তে সেটাই পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা মনে হলো। সে দেয়ালের আড়ালে ঢুকে পড়ল। দম বন্ধ করে বসে রইল। কয়েক সেকেন্ড পর পুলিশের ছুটে যাওয়ার শব্দ শোনা গেল। তারপর ধীরে ধীরে সব নিস্তব্ধ। ইমন চোখ বন্ধ করল। তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। ঠিক তখনই অন্ধকারের ভেতর থেকে একটি শান্ত কণ্ঠ ভেসে এল,

“এভাবে দৌড়ালে তো হাঁটুর পুরোনো চোটটা আরও খারাপ হয়ে যাবে।”
ইমন যেন পাথর হয়ে গেল। ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।আবছা আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
” ক…কে?”
নারী টি তার সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
” আমি ডক্টর আঁখি। ভুলে গেছেন?”
ইমন চমকালো। মনে করার চেষ্টা করলো। মনে পড়লো সেই পাকিস্তানি ডক্টর এটা।
” আপনি এখানে যে?”
” একটু হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। হঠাৎ আপনাকে দৌড়াতে দেখে আপনার পিছু নিয়েছিলাম। তা ওভাবে দৌড়াচ্ছিলেন কেনো?”
ইমন দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। উত্তর দিলো না। সে বসে পরলো মাটিতে। শরীর টা যন্ত্রনার সাথে সাথে ক্ষুধার তাড়নায় তড়পাচ্ছে। সহ্য করতে না পেরে আখির দিকে তাকিয়ে বলল,

” পানি আছে? খুব তেষ্টা পেয়েছে। ”
আখির কাছে কোনো পানি নেই। তারপরও সে বলল,” হু আছে। আপনি একটু বসুন আমি আসছি। ”
আখি দৌড়ে একটি দোকানে এসে পানি আর রুটি বিস্কুট কিনলো। ফার্মেসী থেকে তুলো,ব্যান্ডেজ আর স্যাভলনের একটা শিশি কিনলো। তারপর ইমনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
” নিন। ”
ইমন রুটি বিস্কুট দেখে বলল, ” আমি তো শুধু পানি চেয়েছিলাম। ”
” কিন্তু আপনার চেহারা তো বললো তেষ্টার সাথে সাথে ক্ষুধাও লেগেছে। খেয়ে নিন ইমন সাহেব। ”
ইমন সত্যি সত্যি খেলো। লড়তে হলে শরীর ঠিক রাখতে হবে। আখি তার পাশে বসে বলল,
” কোথায় কোথায় কেটেছে দেখি তো। ”
ইমন পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখলো আঁখির কোলে তুলো,ব্যান্ডেজ আর স্যাভলনের শিশি।

” এসব কী সাথে নিয়ে ঘুরেন নাকি?”
” না। কিনে এনেছি। দেখান দেখি। ”
ইমন হাত দেখালো। আখি ব্যান্ডেজ করে দিলো। তারপর হাঁটুর কথা বললে ইমন বলল, ” ওটা আমি করছি। ”
ইমন হাঁটু তেও ব্যান্ডেজ বেঁধে নিলো। আখি নীরব চোখে চেয়ে দেখলো। শীতল বাতাস বয়ে গেলে ধরনীর বুকে। আনমনে জিজ্ঞেস করলো,
” ইমন সাহেব আপনি কি বিবাহিত? ”
ইমন পানির বোতলের দিকে চেয়ে বলল,
” না। ”
” কাউকে ভালোবাসেন?”
” হ্যাঁ। ”
” বিয়ে করছেন তাকে শীগ্রই? ”
ইমন দীর্ঘ এক শ্বাস ফেললো। ” তাকে বিয়ে করাটা অসম্ভব।”

” কেনো? ”
” কারন সে অন্য কারো। ”
” ওহ আচ্ছা! এক তরফা ভালোবাসা তবে?”
ইমন স্মিত হাসলো, ” হু আমার দীর্ঘ ১৩ বছরের ভালোবাসা এক তরফাই রয়ে গেলো। প্রকাশ করার আগেই সে চিরতরে অন্য কারো হয়ে গেল। ”
” তো তাকে এখনো ভালোবাসার কি মানে? তাকে তো পাবেন না।”
” পাওয়ার নামকেই যে সবসময় ভালোবাসা বলতে হবে এটা কোথায় লেখা আছে মিস আঁখি? সে আমার হোক বা না হোক। আমি সবসময় তাকে ভালোবেসে যাব। ”

“ কিন্তু সে তো আর এখন আপনার নেই। সে অন্য কারো হৃদপিণ্ড। ”
“ আর আমার হৃৎপিণ্ড সে।”
“ ভুলছেন না কেন তাকে। ”
“ হৃৎপিণ্ড ছাড়া মানুষ বাঁচে? ”
“ হৃৎপিণ্ড অকেজো হয়ে গেলে বদলে ফেলতে হয়।
“ তাহলে তো শ্বাস আঁটকে মরতে হবে আমায়। আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসও তার নামে। ”
“ এত উন্মাদনা! এত! আর কত কাল? ”
“ যতকাল বাঁচবো ততকাল। ”
“ আর কাউকে আসতে দিবেন না জীবনে? ”
“ আমার জীবনে ঢোকার জন্য যে দরজা প্রয়োজন সেটা ১৩ বছর আগেই বন্ধ হয়ে কবরে পরিনত হয়ে গেছে। ”
“ তাহলে বাকিটা জীবন এভাবেই একাই নিঃসঙ্গে কাটাবেন? ”

“ বোধহয়। তবে আমার বিশ্বাস সে আমার হবে। আমার আল্লাহ আমাকে এতটাও দুঃখে কষ্টে মারবে না। আমার মোনাজাত গুলো বিফলে যাবে না। মৃ’ত্যুর আগ অব্দি তাকে আমি রবের নিকট চেয়ে যাব। দোয়া ক্যান চেঞ্জ তকদির। আই বিলিভ দ্যিস লাইন। সে আমার হবেই।
” সে বিবাহিত। আপনি চাইছেন সে তার স্বামী সংসার ফেলে আপনার কাছে আসবে? সে তো জানেও না আপনি তাকে ভালোবাসেন। তাহলে? ”
” সে যদি সেখানে সুখী থাকতো তাহলে চাওয়া ছেড়ে দিতাম। কিন্তু মন বলছে সে সেখানে সুখী না। ”
” মাতলাব?”
” মাতলাব হামে ইন্তেজার কাবুল হ্যায়। ও যেসে ভি হো, যাহা ভি হো,ব্যাস, ও মুঝে কাভি মিল যায়ে।”
” কে সে? নাম বলা যাবে?”
ইমন বললো না নাম। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ” অনেক রাত হয়েছে বাড়ি যান। ”

” ওর আপ? আপকো তো পুলিশ খুঁজছে। ”
” চিন্তা করবেন না। আমি সাবধানে থাকবো। আপনি বাসায় যান। ”
ইমন চলে গেলো। আখি চেয়েই রইলো তার যাওয়ার পানে। তারপর শুনতে পেলো ইমন গলা ছেড়ে গাইছে..
~আমি কাউকে বলিনি সে নাম,
কেউ জানেনা, না জানে আড়াল।
জানে কান্নার রঙ,জানে জোছনার ছায়া…

১০ ডিসেম্বর ২০২৩।
সুইডেনের আকাশ সেদিন অস্বাভাবিক রকম পরিষ্কার।
স্টকহোমের শীতল বাতাসে বরফের গন্ধ মিশে ছিল। রাস্তার দুপাশে সারি সারি আলো জ্বলছিল, আর দূরের ভবনগুলোর কাচে সেই আলো প্রতিফলিত হয়ে শহরটাকে আরও নীরব, আরও অভিজাত করে তুলেছিল।
একটি কালো গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল শহরের কেন্দ্রের দিকে। গাড়ির ভেতর নীরবতা। সামনের আসনে বসে থাকা এজওয়ান জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। পরনে নিখুঁত কালো স্যুট, গলায় কালো টাই। মুখে কোনো উত্তেজনা নেই। অথচ আজকের দিনটি তার জীবনের সবচেয়ে বড় দিনগুলোর একটি।
তার পাশে বসে মাহি। সেও কালো ওয়েস্টার্ন পোশাকে। দুজনকেই অসম্ভব সুন্দর লাগছে।
এজওয়ানের তৈরি AI-চালিত স্মার্ট মনিটরিং সিস্টেম মানুষের আচরণ, গতিবিধি এবং অসংখ্য তথ্য বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক কার্যকলাপ শনাক্ত করতে পারত। মানবপাচারের মতো অপরাধ থেকে শুরু করে সংগঠিত অপরাধ ও বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি সবকিছুর আগাম সংকেত শনাক্ত করার সক্ষমতা সিস্টেমটিকে বিশ্বের নজরে এনে দিয়েছিল।
গাড়িটি অবশেষে নির্দিষ্ট স্থানে এসে থামল। বাইরে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ভিড়। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একের পর এক ঝলসে উঠল। এজওয়ান গাড়ি থেকে নামল। মুহূর্তের মধ্যেই অসংখ্য ক্যামেরা তার দিকে ঘুরে গেল।
মাহিও নামল তার পরপরই। দুজন পাশাপাশি এগিয়ে গেল বিশাল ভবনটির দিকে। ভেতরে প্রবেশ করার পর বাইরের কোলাহল ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে রইল। চারপাশে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বিজ্ঞানী, গবেষক, রাষ্ট্রীয় অতিথি ও পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আনাগোনা।

একটি নির্দিষ্ট কক্ষে তাদের নিয়ে যাওয়া হলো। দেয়ালে ঝুলছিল নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসের নানা স্মারকচিত্র।
মাহির চোখ সেদিকে স্থির হয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর দৃষ্টি গেল এজওয়ানের দিকে। এজওয়ান তখন নিজের হাতে থাকা আমন্ত্রণপত্রটির দিকে তাকিয়ে ছিল।
কাগজটির ওপরে লেখা,Nobel Prize Ceremony
তার নিচে এজওয়ানের নাম। কিছুক্ষণ পর হলঘরের দরজা খুলে গেল। ভেতর থেকে ভেসে এলো মৃদু সংগীত। অতিথিরা নিজেদের আসনে বসতে শুরু করলেন। এজওয়ানও ধীর পায়ে নিজের আসনের দিকে এগিয়ে গেল। মাহি তার পাশের আসনে বসল। কিছুক্ষণ পর পুরো হল নীরব হয়ে গেল।
মঞ্চের আলো জ্বলে উঠল। ঘোষকের কণ্ঠে উচ্চারিত হলো একের পর এক নাম। তারপর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসে হাজির হলো। উপস্থাপক তাঁর হাতে ধরা কার্ডটির দিকে একবার চোখ বুলিয়ে তিনি বললেন
“Ladies and gentlemen… It is my great honor to announce this year’s Nobel laureate…Mr. Ajwan Sultan .”

পরক্ষণেই করতালির প্রচণ্ড শব্দে হলঘর মুখর হয়ে উঠল।
এজওয়ান উঠে দাঁড়াল। তার মুখে বিস্ময়ের লেশমাত্র নেই।
আজকের দিনটির জন্য সে কারও কাছে ঋণী নয় এটা সে জানে। কারণ যে জায়গায় আজ দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে তাকে কেউ তুলে দেয়নি। প্রতিটি দরজা সে নিজেই খুলেছে। প্রতিটি অসম্ভবকে নিজের হাতেই সম্ভব করেছে।
সে ধীর পায়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল। নোবেল কমিটির প্রতিনিধি তাকে স্বাগত জানালেন। করমর্দনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে তার হাতে তুলে দেওয়া হলো নোবেল পদক ও সনদ।
এজওয়ান পদকটি হাতে নিল। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একের পর এক ঝলসে উঠল। তারপর তাকে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ানোর অনুরোধ করা হলো। উপস্থাপক বললেন,
“Mr. Ajwan, the world would like to know, who do you believe is behind this extraordinary achievement?”
এজওয়ান কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য হাসি ফুটে উঠলো। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

“Who is behind my success? Me,Only me. I have never lost. Not because I was always lucky. Not because the road was easy. I simply refused to build a version of myself that could be defeated. Every idea behind this system came from me. Every risk was mine. Every decision was mine. Every sleepless night, every calculation, every door I had to break through mine.
So if you ask me who brought me here,I did. But…There is one person to whom I want to dedicate this. She didn’t build my caree. She didn’t create my success. And she certainly didn’t make me who I am. I was already all of that before she came into my life. But she became the person with whom I wanted to share the view from the top. Mahi, my wife.
Everything I achieved before you was mine. But tonight…This one is yours.”

দাহশয্যা পর্ব ৯৯ (২)

হলঘর করতালিতে ফেটে পড়ল। এজওয়ান সামান্য হাসল।তারপর মাইক্রোফোন থেকে সরে দাঁড়িয়ে পদকটি হাতে শক্ত করে ধরল। মাহির ঠোঁটের কোনেও অবশ্য হাসি ফুটে আছে। পুরো ওয়ার্ল্ডের কাছে এজওয়ান মাহিকে ডেডিকেটেড করছে। যে কোনো নারীই আনন্দে বিমোহিত হবে। মাহিও ব্যতিক্রম নয়।

দাহশয্যা পর্ব ১০০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here