Home ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৬৬

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৬৬

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৬৬
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই

“তোর পিরিতের ঢেউ কি এখুনি উথলে পড়ছিলো?”
আবির্ভাবের এর কথায় বাঁকা চোখে তাকালো শুদ্ধ।
“কি বলতে চাস?”
“বলতে চাচ্ছি, এই জড়াজড়ি হাত ধরাধরির ব্যাপারগুলো পার্সোনালী করা যেত না? এত উত্তেজনা কিসের? চারদিন পর তো বিয়েই হয়ে যাবে।”
আবির্ভাবের কথায় শুদ্ধর কপালে ভাজ মিলিয়ে গেল। ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে জবাব দিলো,
“লুকিয়ে কেনো করবো? আমি কি চোর নাকি? যাকে এতো বছর ধরে ভালোবাসি, এতো ভালোবাসি, এতো চাই, তাকে অবশেষে আমি এতো অপেক্ষার পর নিজের করে পেতে চলেছি, সেখানে হাত ধরা কি অন্যায়?”
আবির্ভাব বিরক্ত হলো। দাঁত কটমট করে বললো,

“কত সহজে বলে ফেললি, এত বছরের অপেক্ষার পর অবশেষে নিজের করে পেতে চলেছিস। কিন্তু এটা একবারও ভাবিস না, তুই নিজে পূর্ণ হতে অন্য একজনকে নিঃস্ব করে দিচ্ছিস, কেড়ে নিচ্ছিস তার জীবনের সম্বল। মায়া হয় না তোর?”
আবির্ভাবের কথায় দমে গেলো শুদ্ধ। প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বাইকে চড়ে বসলো। আবির্ভাব গ্যারেজের সামনে দাঁড়িয়ে আশেপাশে নজর ঘুরালো, কিন্তু কাঙ্খিত ব্যক্তির কোন হদিশ পেলো না। পাশ থেকে সাদাফ বললো,
“প্রণয় কোথায়? ওর বাইকটাও তো নেই।”
আবির্ভাব ও সাদাফের কথার জবাব দিলো না। দ্রুত বাইকে বসে হেলমেট পড়ে নিল। ৩ জন একবার একে অপরের দিকে তাকিয়ে শিকদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো।
বাইকের স্পিডোমিটারে সর্বোচ্চ গতি টেনে ওরা ৩ জন প্রণয় খুঁজতে লাগলো। কিন্তু যতদূর অবধি চোখ যায়, প্রণয় কোথাও নেই। নেই তার কোনো নাম ও নিশান।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

চোখের নিমিষেই বাইকগুলো ছুটে গেলো গ্রাম ছাড়িয়ে বহু দূরে, পিচঢালা মসৃণ রাস্তার দুই পাশে ঘন নিগূঢ় জঙ্গল। সন্ধ্যা মিশেছে রাতের আঁধারে। তমসাছন্ন নিকষ অন্ধকার গিলে নিচ্ছে পৃথিবী। মাথার উপর মস্ত তারা ভরা আকাশ, বনের ভেতর হইতে বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর গর্জন শোনা যাচ্ছে।
শুদ্ধ বাইক রাইড করে অনেক দূর চলে আসার পর হুট করেই মাঝ পথে সজোরে ব্রেক কষলো। সাথে সাথে আরো দুটো বাইক এসে তার দুই পাশে থামলো। পাশ থেকে শোনা গেলো আবির্ভাবের ব্যস্ত কণ্ঠ,
“কি রে, এই বনের মাঝখানে থামলি কেনো? আশপাশ থেকে বন্যপ্রাণীর ডাক শোনা যাচ্ছে।”
শুদ্ধ ঘাড়ে হাত দিয়ে দুই পাশে ঘাড় বাকালো। কিয়ৎক্ষণ নিশ্চুপ থাকার পর গম্ভীর আওয়াজে বললো,
“ফলো মি।”

বলে বাইক স্টার্ট দিয়ে জঙ্গলের মধ্যেকার একটা কাঁচা মাটির রাস্তায় ঢুকে পড়লো। সাদাফ ও আবির্ভাব একটু অবাক হলো। আশেপাশটা কেমন গা-ছমছমে, নির্জন অন্ধকারে তোরে কিছুই ভালোমতো দেখা যায় না। সময় অনুমানিক রাত ৮টা। তবে ওরা বেশি ভাবলো না, শুদ্ধর পিছু নিলো।
শিকদার বাড়িতে হৈ হৈ রৈ রৈ ভাব। হাসি, আনন্দ আর চিৎকার-চেঁচামেচিতে জমে উঠছে পরিবেশ। কর্তা-গিন্নিরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন ইনভাইটকৃত গেস্টদের পুনরায় আরেকটি বিয়ের জন্য নিমন্ত্রণ করতে।
অনুস্রী বেগম, তনুস্রী বেগম, অনন্যা বেগম, অর্থি বেগমসহ বাড়ির গিন্নিরা বর-বউ সহ বিয়েতে আসা অতিথিদের জন্য কি কি শপিং করবেন, কি কি উপহার দিবেন, তার সব কিছুর বিস্তৃত লিস্ট বানাচ্ছেন। বাড়ির ছেলেরা ক্যাটারার্স, ডেকোরেটরস সবাইকে ফোন করে জানিয়ে দিচ্ছে—কাল থেকেই বাড়ি সাজানোর কাজ শুরু করে দেওয়ার জন্য। কারণ দফায়-দফায় অনুষ্ঠান হবে, কিছুই বাধ যাবে না।

নিমন্ত্রিত থাকবেন দেশ-বিদেশের অনেক গণ্যমান্য অতিথি। শুদ্ধর সহকর্মী ডাক্তার সাদাফের রিসার্চ টিম মেম্বার, সাংবাদিক, নিউজ প্রেজেন্টারসহ আরো অনেক মিডিয়াকর্মী আসবে। ইন্টারন্যাশনালি নিউজ ছাপা হবে। সেখানে শিকদার ফ্যামিলি নিজেদের সর্বোচ্চটা দিতে চায়।
বাড়ির মেয়ে-বউরা নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত। সবার মধ্যেই আলাদা একটা চাপা উত্তেজনা। রঙে রঙে ভরে উঠেছে শিকদার বাড়ির সকল অংশ।
তবে এতো হৈ হুল্লোড়, এতো আনন্দ—সবকিছুই কেমন বিষাক্ত লাগছে একজনের নিকট। সে নির্জীব, সবকিছু থেকে দূরে, একাকী ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে আছে। জীবনে এতো এতো চোখের পানি ফেলেছে যে এখন আর কান্না আসে না। কাঁদতে গেলেও একঘেয়ে লাগে। নিজের জীবনটাই নিজের কাছে বোঝা মনে হয়।
প্রিয়তা কনুইয়ের উপর ভর দিয়ে মাথায় হেলিয়ে দিয়েছে, কনুইতে গাল ঠেকিয়ে বসে আছে উত্তরের জানালার সামনে। তার অশ্রুভেজা, জলজ্বলে নীলাভ চোখ দুটো তারা ভরা আকাশের পানে নিবদ্ধ। আজ আকাশে চাঁদের দেখা নেই, হয়তো অমাবস্যা।

নির্জন অন্ধকারে একা একা বসে থাকতে বেশ ভালো লাগছে প্রিয়তার। এখন আর কেনো জানি অন্ধকারে ও ভয়-ডর লাগে না মেয়েটার। মাথা হেলিয়ে রাখার দরুন নীলাভ চোখের কার্নিশ উপচে পড়া অবাধ্য অশ্রু নাক পেরিয়ে টপ টপ করে জানালায় পড়ছে। মুখে কোনো ব্যথাতুর শব্দ নেই, অতএব নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে।
অনেক তো হলো, মাত্র ছয় বছরে হাপিয়ে গেছে প্রিয়তা। এখন আর কারো প্রতি রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা কিছুই আসছে না। এখন আর কাউকে দোষারোপ করে বলতে ইচ্ছে করছে না—”ওমুক, তুমি সবকিছুর জন্য দায়ী। তোমার জন্য আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে গেছে।”

এখন আর ইচ্ছে করে না কারো দিকে আঙুল তুলতে। মন নিজের অজান্তে নিজের অদৃষ্টকে মেনে নিচ্ছে।
সে এখন ধীরে ধীরে মেনে নিচ্ছে সব দোষ তার নসিবের। জীবনের শুরুতে একজন ভুল মানুষকে ভালোবেসে থমকে গিয়েছে। খুব বাজেভাবে সেই মানুষটার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
আসলেও কি সবকিছুর জন্য দায়ী সেই মানুষটাকে করা যায়? প্রিয়তা অনেক ভেবে চিন্তে দেখলো—ঐ মানুষটাকে দুষারোপ করা কখনোই যুক্তিযুক্ত নয়। ঐ মানুষটার কাছে সে চিরন্তন কৃতজ্ঞ, ঋণের কোনো শেষ নেই। নিজের গায়ের চামড়া খুলে জুতা বানিয়ে পরালে ও ঐ মানুষটার ঋণ শোধ হওয়ার নয়। সেখানে সে ওই মানুষটাকে অকারণে দোষ দিয়ে গেছে প্রতিনিয়ত।

সত্যি তো, ঐ মানুষটার দোষ কোথায়? মনের উপর তো কারো জোর চলে না। সে তো কখনোই বলেনি—”প্রিয়তা, আমি তোকে ভালোবাসি।” সে কখনোই কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
তার নিঃস্বার্থ স্নেহ, নিখাদ মায়া, আর অফুরন্ত ভালোবাসার ভুল ব্যাখ্যা করেছে প্রিয়তা। মানুষটার কাছ থেকে ভালোবাসা, সুযোগ-সুবিধা পেতে পেতে পাওয়াটা তার একসময় চাহিদাতে পরিণত হয়ে গেছিল। সে কখনোই উল্টো দিকের মানুষটার অনুভূতিকে সম্মান করেনি। সে কখনো বুঝতেই চায়নি—ঐ মানুষটা যা দিচ্ছে, সব মায়ার খাতিরে দিচ্ছে। এর বেশি কিছু নয়।

প্রিয়তার নিজের করা কর্মকাণ্ডের জন্য প্রিয়তার আজ নিজের কাছেই নিজেকে ছোট মনে হচ্ছে। কথা বলে কিছু মানুষের প্রচণ্ড সুবিধাবাদী। তারা খেতে পেলে শুতে চায়। প্রিয়তারও নিজেকে তাই মনে হচ্ছে।
নিজের চাহিদা পূরণ হয়নি বলে কতটা খারাপ ব্যবহার করেছে সে ঐ মানুষটার সাথে। কত আজেবাজে কথা শুনিয়েছে। প্রিয়তার আজ, এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আর এক কণা ও সন্দেহ নেই—ঐ মানুষটা কখনোই তাকে ভালোবাসেনি, বা ঐ নজরেই দেখেনি। বোন ভেবেছে হয়তো।

আর সে কিনা? আর যাই হোক, মানুষটা যদি কখনো তাকে এক মুহূর্তের জন্যও নিজের করে চাইতো, তাহলে আজ কখনোই অমন নিশ্চুপ থাকতে পারতো না। যদি একটু ও ভালোবাসতো, তাহলে আজ যখন সবাই বিয়ের কথা বলছিলো, তখন অতোটা নিশ্চিন্ত থাকতে পারতো না। তার বিয়ের মিষ্টি মুখে তুলতে পারতো না!
কিন্তু পরিশেষে আজ মানুষটা প্রমাণ করে দিলো—সে প্রিয়তার ভালো চায়, কিন্তু ভালোবাসে না।
সে দিনের পর দিন প্রহেলিকা কতই না গালমন্দ করেছে, কত ভুল বুঝেছে! একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের সংসার ভেঙে যাওয়ার কামনা করেছে, অন্যের স্বামীকে নিজের করে পাওয়ার স্বপ্ন বুনেছে। ভালোবাসা, বিবেক-বুদ্ধি খুইয়ে অন্ধ হয়ে গেছিল।

প্রিয়তার দম আটকে আসে এসব ভেবে। সে আজ বিয়েতে বাধা দেয়নি, কারণ সে কেবল আসল সত্যিটা জানতে চেয়েছিলো, দেখতে চেয়েছিলো ঐ মানুষটার প্রতিক্রিয়া। কিন্তু মানুষটা তাকে বরাবরের ন্যায় এবারও নিরাশ করলো। প্রতিবাদ করা তো দূরের কথা, কত খুশি হলো।
তাহলে এখন প্রিয়তার কি করা উচিত?
প্রিয়তার ভাবনার মধ্যেই পিছন থেকে পরিচিত নারী কণ্ঠে ডাক ভেসে এলো। সাথে সাথেই ঝলসে উঠলো কক্ষের বাতি। প্রিয়তা তড়িৎ গতিতে দুই হাতে চোখ মুছল। পিছন ফিরে দেখলো পরিণীতা দাঁড়িয়ে আছে—
“আপু, তুমি!”

পরিণীতা এগিয়ে এলো প্রিয়তার কাছে। বোনের দুই হাত চেপে ধরে নীল চোখের গভীরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। প্রিয়তা অপ্রস্তুত বোধ করল, যথাসাধ্য নিজের অশ্রু লুকানোর চেষ্টা করলো। পরিণীতার পেছন পেছন কক্ষে প্রবেশ করলো ইনায়া ও থিরা।
পরিণীতা বোনের দুই গাল ধরে আদুরে কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো—
“কী হয়েছে আমার বোনের?”
প্রিয়তা জবাব না দিয়ে চুপ করে রইলো।
প্রিয়তার চোখ-মুখের অবস্থা দেখে পরিণীতার ঠিক লাগছে না। তাই ভনিতা ছাড়াই প্রশ্ন ছুড়ে দিল—
“তুই কী এই বিয়েতে সত্যি রাজি? বোন, তুই কি স্বেচ্ছায় শুদ্ধ ভাইকে বিয়ে করতে চাস?”
প্রিয়তা চমকে তাকালো পরিণীতার পানে। পরিণীতা আগের থেকে ও অনেক অনেক গুণ বেশি সুন্দরী হয়ে গেছে। সর্বাঙ্গে লেপ্টে আছে ভালোবাসার প্রলেপ। স্বামী সোহাগের নিটল চিহ্ন ফর্সা শরীরের আনাচে কানাচে উকি দিচ্ছে। স্বামীর ভালোবাসায় নীরির সৌন্দর্য প্রস্ফুটিত হয়।

তার জলন্ত দুটো উদাহরণ প্রিয়তার চোখের সামনে।
প্রিয়তা পরিণীতার কথার জবাব দিলো না। আকুল নয়নে চেয়ে রইলো পরিণীতা ও ইনায়ার পানে। সত্যি বলতে, ওদের এত সুখ দেখে বড্ড হিংসে হলো প্রিয়তার মনে। তার জীবনে ও কী এমন সুখ আসতে পারতো না?
“কিছু বলছিস না কেনো, বোন?”
পুনরায় পরিণীতার ডাকে ঘোর কাটলো প্রিয়তার। প্রিয়তা দৃষ্টি নামিয়ে হাসার চেষ্টা করলো। ম্লান কণ্ঠে বললো—
“অবশ্যই রাজি আপু। রাজি কেনো হবো না? শুদ্ধ ভাইয়ের মতো মানুষকে কোন মেয়ে না বিয়ে করতে চাইবে? উনার মতো স্বামী তো মেয়েদের কল্পনা।”
পরিণীতা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো প্রিয়তার পানে। নিরেট কণ্ঠে বললো—

“মেয়েদের কল্পনা হতে পারে, কিন্তু আমার বোনের কল্পনা নয়।”
প্রিয়তা পুনরায় ম্লান হাসলো।
পরিণীতা উদ্ভিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো—
“সত্যি বল বোন, তুই কারো উপর অভিমান করে এতো বড় সিদ্ধান্ত নেসনি তো? ভালো মতো ভেবে নে। বোন, বিয়ে মানুষের জীবনে বার বার হয় না। এই ব্যাপারটা এক-দুই দিনের নয়, সারাজীবনের। একবার বিয়ে হলে তুই আমৃত্যু অন্য কারো সাথে জড়িয়ে যাবি, আর ফিরতে পারবি না। জানিস?”
“তাহলে তুই সত্যি রাজি?” পাশ থেকে প্রশ্ন ছুঁড়লো ইনায়া।

“হ্যাঁ।”
“ভেবে বলছিস?”
“হ্যাঁ।”
পরিণীতা প্রিয়তার হাত আরো শক্ত করে চেপে ধরলো। সুস্পষ্ট কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়লো—
“আমার ভাইকে ভুলে গেছিস? আর চাস না আমার ভাইকে নিজের জীবনে, এতো এগিয়ে গেছিস?”
তাচ্ছিল্য হাসলো প্রিয়তা।
“কি যায় আসে, আপু? তোমার ভাই তো ৬ বছর আগেই নিজের জীবনে এগিয়ে গেছে।”
প্রিয়তার কণ্ঠে চাপা যন্ত্রণা।
প্রিয়তার জবাবে থমকে যায় পরী ও ইনায়া। তাদের দৃষ্টিতে ফুটে উঠে অপার অসহায়ত্ত্ব। যা বুঝার তা বুঝে গেছে তারা।
“তাহলে তুই এখনো আমার ভাইকে ভালোবাসিস?”
“জানিনা।”

“শুদ্ধ ভাইকে কেনো বিয়ে করতে চাচ্ছিস?”
নিশ্চুপ রয় প্রিয়তা।
পরিণীতা পুনরায় প্রশ্ন করলো—
“কিচ্ছু লুকাবি না, বল আমায়।”
“তোমার ভাইকে ভালোবাসি আপু। তাকে ভুলে যাওয়ার সাধ্য আমার এই ছোট্ট জীবনে হবে না। কিন্তু এটা ও সত্যি, সে আমায় ভালোবাসে না। আমার এই অনুভূতির কোনো মূল্য নেই তার কাছে। তাহলে আমি নিজের জীবনটা কেনো নষ্ট করবো, আপু, বলতে পারো? সে তো দিব্বি আছে। তার বউ আছে, সংসার আছে, হয়তো বাচ্চা-কাচ্চা ও হবে। তাহলে আমি কেনো থেমে থাকবো? আমারো সংসার চাই, আমারো স্বামী চাই, আমারো সন্তান চাই।”
প্রিয়তার কথায় আশ্চর্যের শীর্ষে পৌঁছে গেলো পরিণীতা। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো প্রিয়তার দিকে।
“এই আহাম্মক মেয়েটা কিছু না জেনে শুনে কিভাবে আমার ভাইয়ের নামে দোষ চাপাচ্ছে! আর আমি কিছুই বলতে পারছি না।”

পরিণীতা নিজেকে সামলে বললো—
“জেদের বশে নেওয়া সিদ্ধান্ত কোনো সময় সঠিক হয় না, বোন। আরেকবার ভাব।”
প্রিয়তা নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থেকে স্পষ্ট কণ্ঠে বললো—
“আর কিচ্ছু ভাবাভাবির নেই আপু। অনেক তো ভাবলাম। আর কতো? তবুও একটা শেষ সুযোগ দেই তোমার ভাইয়ের হাতে। সময় মাত্র ৪ দিন। যদি সে এই সময়ের মধ্যে একবারও আমাকে বলে—সে আমাকে চায়, আমাকে ভালোবাসে—তাহলে সব কিছু ছেড়ে হলেও আমি তার হবো। আর যদি সে এভাবেই চুপ থাকে, তাহলে যা হওয়ার তাই হবে। তাছাড়া তোমার ভাই আমকে ভালোবাসেন না, আপু। তাই প্রথমটা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।”
পরিণীতা তাচ্ছিল্য হাসলো। মনে মনে বললো—

“আমার ভাইয়ের ভালোবাসা পরিমাপ করার সাধ্য তোর নেই। আর ওই ক্ষমতা কোনদিনও তোর হবে না, রে বোন। সারা জীবন আমার ভাইয়ের আশেপাশে ঘুরলি, কিন্তু তাকে চিনতে পারলি না। তোকে যদি আমার ভাইয়ের কলিজাটা কেটে দেখাতে পারতাম, তাহলে ও হয়তো তুই বুঝতে পারতি না—আমার ভাইয়ের ভালোবাসা তোর জন্য ঠিক কতটা উন্মাদনায় পরিপূর্ণ! আমার পাগল ভাইটা তোকে কতো ভালোবাসে!
আমার ভাইয়ের ভালোবাসার নিকট তোর এই ভালোবাসা প্রচণ্ড ফ্যাকাসে, রে বোন।
আমার ভাইয়ের বুকের চাপা যন্ত্রণার নিকট তোর এই যন্ত্রণার কোনো অস্তিত্বই নেই।
আমার ভাইটা মরে যাবে শুধু তোকে ভালোবেসে, শুধু তোর অভাবে, শুধু তোর অভাবে। কিন্তু সেদিনও তুই জানতে পারবি না—আমার ভাই তোকে কতোটা ভালোবেসেছিলো। তুই বড্ড বোকা, রে বোন, বড্ড বোকা। জীবনে মানুষ চিনতে পারলি না, ভালোবাসা চিনতে পারলি না।”

প্রিয়তা দুই হাতে চোখ মুছলো। মন কঠোর করে নিজেকে বুঝালো। পরিণীতার উদ্দেশ্যে বললো—
“অন্যের স্বামীকে নিয়ে অনেক তো কল্পনায় সংসার হলো, আপু। এবার বোধ হয় আমার বাস্তবে ফেরা উচিত। তোমার ভাইয়ার তাই চাওয়া। আমার বিয়েতে উনি নাকি ভীষণ খুশি। তাহলে আমি কেনো হবো না, আপু? সবার বিয়ে হচ্ছে, সংসার হচ্ছে। আমার কেনো হবে না, আপু?”
পরিণীতা মলিন হাসলো। প্রিয়তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো—
“দুয়া করি তুই অনেক সুখী হও। তোর নিজের সংসার হোক। তোর অনেক ভালো হোক। আমার নিষ্ঠুর, খারাপ, অপরাধী ভাইটাকে মনে রাখিস না তুই। আমার ভাই তোকে অনেক দুঃখ দিয়েছে, তাই না? অনেক কাঁদিয়েছে। খুব নিকৃষ্ট সে। পারলে তাকে ক্ষমা করে দিস। আর হ্যাঁ, দুয়া করিস যেনো তারাতারি মরে যায়।”
বলে মুচকি হেসে চলে গেলো পরিণীতা।

প্রিয়তা দেখার আগেই পিছন ঘুরে চোখের পানি মুছে নিলো। ভাইয়ের কলিজার আগুনে ঝলসে যাচ্ছে। সে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকালে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
প্রিয়তা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। অতঃপর নিস্তেজ পায়ে এগিয়ে গিয়ে বারান্দার মেঝেতে ধপ করে বসে পড়লো। সর্বাঙ্গ পুড়ে যাচ্ছে বিচ্ছেদের তীব্র বিষে।
প্রিয়তা কাঁপা হাতে নিজের ফোনের গ্যালারি ওপেন করলো। কাঁপা হাতে ফোনটা ধরলো মুখের কাছে। টলোমলো চোখে তাকিয়ে রইলো স্ক্রিনে। বুক ভেঙে আবার কান্না আসছে তার।
প্রিয়তা কান্না আটকাতে দুই হাতে মুখ চেপে ধরলো। অস্পষ্ট ভাঙা কণ্ঠে বললো—
“এমন জীবন আল্লাহ আমার শত্রুকেও না দিক, প্রণয় ভাই।”

২ তলার একটা কক্ষ থেকে সশব্দে আত্মচিৎকারের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে কারো করুণ কণ্ঠের আহাজারি—
“আমি তোমার পায়ে পড়ি মামি, তুমি প্লিজ আমার সাথে এমনটা কোরো না, আমি মরে যাবো গো। তুমি তো জানো, বলো আমি শুদ্ধ ভাইকে কতটা ভালোবাসি সেই ছোট্টবেলা থেকে। আমাকে এভাবে প্রাণে মেরো না মামি।”
বলতে বলতে সশব্দে কান্নায় ভেঙে পড়লো তুহিনা। ফ্লোরে লুঠিয়ে পড়ে দুই হাতে ঝাঁপটে ধরলো মেহজাবিন চৌধুরীর পা।
মেহজাবিন চৌধুরীর মুখ দেখে মনে হচ্ছে তিনি প্রচণ্ড বিরক্ত, কারণ এই ঢঙি মেয়েকে উনার কোনো কালেই পছন্দ নয়, আর ছেলের বউ হিসেবে তো উনি দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেন না। মেহজাবিন চৌধুরী ঝটকা মেরে নিজের পা সরিয়ে নিলেন, কঠোর কণ্ঠে বললেন—

“দেখো তুহিনা, আমার ছেলের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। সে কখনোই তোমাকে ভালোবাসে নি, এমনকি সে তোমার নামটা পর্যন্ত শুনতে চায় না। তাই এসব করে শুধু শুধু এখন সিন ক্রিয়েট করো না।”
মেহজাবিন চৌধুরীর দাম্ভিক কণ্ঠস্বরে বলা কথাগুলোতে মনে বিষণ আঘাত পেলো তুহিনা। নিজের দিকে আঙুল তাক করে বললো—
“সিরিয়াসলি মামি, তুমার মনে হচ্ছে আমি সিন ক্রিয়েট করছি? তুমি আমার সাথে এতো নিষ্ঠুরতা কিভাবে দেখাতে পারো মামি! তুমি জানো না আমি শুদ্ধ ভাইকে কতটা ভালোবাসি। আমি এতটুকু ছিলাম মামি, যখন থেকে আমি শুধুই সুদ্ধো ভাইয়ের বউ হওয়ার সপ্নো দেখতেছি।”

“তো সপ্নো দেখলেই হলো! আমার ছেলে তোমাকে পছন্দ করে না, বুঝতে পারছো? তুমি পছন্দ করে না। আমার ছেলে আমার ভাইয়ের মেয়েকে পছন্দ করে। তাই আমার ছেলের যাকে পছন্দ, সেই হবে আমার বউমা।”
তুহিনা তাচ্ছিল্য করে বললো—
“তাহলে এই ব্যাপার! তুমি আসলে তুমার ভাইয়ের মেয়েকে নিজের ছেলের বউ করতে চাও, তাই আমার কষ্টটা তুমার চোখে পড়ছে না। আমার যন্ত্রণাগুলো তুমার কাছে সিন ক্রিয়েট মনে হচ্ছে মম। তাহলে ঠিকই বলেছেন, তুমি আসলে আমাদের পছন্দ করো না। তাই শুদ্ধ ভাইয়ের কানে সব সময় বিষ ঢালো আমার নামে। তাই নিজের ভাইয়ের মেয়েকে আমাদের বাড়িতে ঢুকিয়ে নিজের দল ভারি করতে যাচ্ছ।”
“তুহিনা!”—বলে চিৎকার দিয়ে উঠলেন মেহজাবিন চৌধুরী।

“গলার জোর দেখালেই তো আর সত্যিটা মিথ্যে হয়ে যাবে না মামি। আমি আগে বিশ্বাস করতাম না, কিন্তু এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছি তুমি নিজের ভাইয়ের মেয়েকে বউ বানাবে বলে এতো কিছু করলে। ওকে ফাইন, আমি ও দেখবো—আমি থাকতে কোন মেয়েকে আমার শুদ্ধের গলা ঝুলাও! শুদ্ধ শুধুই আমার বিয়ে করলে শুধু আমাকেই করবে।”
তুহিনার উদ্ধত্তে মেজাজ হারালেন মেহজাবিন চৌধুরীর। তিনি কঠোর কণ্ঠে বললেন—
“তুমি এখানে থেকে যাও তো মেয়ে, আমার ছেলের বিয়ে তোমার সাথে কখনোই হবে না।”
এক কথা কানে যেতেই হিংস্র হয়ে উঠলো তুহিনা। মেহজাবিন চৌধুরীর দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে বললো—

“ঠিক আছে, আমি ও দেখবো শুদ্ধ কিভাবে অন্য কারো হয়! শুদ্ধকে নিজের করে পেতে প্রয়োজনে লাশ ফেলবে এই তুহিনা, তবু ও শুদ্ধকে নিজের করেই ছাড়বে। মানে… মানে, সোজা পথে যেটা পাওয়া যায় না, সেটা বাঁকা পথে কিভাবে আদায় করে নিতে তা খুব ভালো করে জানে এই তুহিনা চৌধুরী। কাজটা আপনি মোটেও ঠিক করলেন না, ওকে মাই ডিয়ার মামি। অপেক্ষা করুন গুড নিউজের জন্য।”
বলে বাঁকা হেসে চলে গেলো তুহিনা।

তার মাথায় কি চলছে, তা আল্লাহ ব্যতিত অন্য কারো জানা দুঃসাধ্য। চোখ-মুখ হিংস্রতায় ছেয়ে গেছে তুহিনার। মেহজাবিন চৌধুরী চিন্তায় পড়ে গেলেন, কারণ এই মেয়েকে উনার মোটেও বিশ্বাস নেই। সত্যি যদি কারো কোনো ক্ষতি করে দেয়, তাহলে ভাইদের কাছে মুখ দেখাতে পারবেন না তিনি। “যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার শুদ্ধের বিয়েটা দিয়ে দিতে হবে।”
জঙ্গলের পাশ দিয়ে কলকল শব্দে বয়ে চলেছে ইচ্ছে মতি নদী। মেঘলা আকাশ, রাত হয়তো এখনো বেশি নয়। নদীর পাড়ের স্নিগ্ধ শীতল হাওয়ায় ঘোর লেগে যায় চোখে, নিঃশব্দ একাকীত্ব, আর বুকের গভীরে ধমিয়ে রাখা ধিকি ধিকি যন্ত্রণার আগুন—সব মিলে ভেঙে চুরে গুঁড়িয়ে দেয় এক জীবনের অস্তিত্ব। শক্ত মুখোশের আড়ালের দুর্বল মানুষটাকে টেনে টেনে হিঁচড়ে বার করে বাহিরে।

প্রণয় নদীর পাড়ের ভেজা বালিতে শুয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেঘলা আকাশের পানে। মাঝে মাঝে তীব্র বিদ্যুতের ঝলকানি দেখা যাচ্ছে, তবে নিঃশব্দে। প্রণয়ের পাশের বালিতে পড়ে আছে অনেক গুলো ওয়াইনের বোতল, সিগারেটের প্যাকেট—তবে সে গুলোর একটাও ছুঁয়ে দেখেনি প্রণয়। কারণ এসব আর আজকাল তার উপর বিশেষ কোন প্রভাব ফেলতে পারে না, ধমিয়ে রাখতে পারে না বুকের জ্বালা।

প্রণয় এখন হাড়ে হাড়ে পার্থক্য বুঝে উপলব্ধি করতে পারে—নিজের জিনিসটা নিজের থেকে দূরে রাখা আর তাকে অন্যের নামে দলিল করে দেওয়ার মধ্যে কতটা পার্থক্য। বছরের পর বছর ধরে নিজের বুকের খাঁচায় আগলে পেলে পুষে বড়ো করা পাখিটা যখন অন্য কেউ নিয়ে যাবে, তার উপর নিজের পৌরুষের অধিকার ফলাবে—তখনো কি প্রণয়কে এই দুনিয়ার বাতাসে নিশ্বাস ফেলতে হবে? নিজের চোখে কি দেখতে হবে তার প্রাণের শরীরে করা অন্যের চিহ্ন?
প্রণয়ের রুহ অব্দি কেঁপে উঠল এসব ভাবনায়। মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে এলো, হাত পা কাঁপতে লাগলো অনবরত। সে একদম এসব ভাবতে চায় না।

তবে নিজের যাই হয়ে যাক, এতটা এগিয়ে আসার পর আর কিছুতেই পিছিয়ে যেতে পারবে না প্রণয়। আবেগের বসে নেওয়া একটা ভুল সিদ্ধান্ত এখন সব কিছু উলটো পালটো করে দেবে। এতো ধৈর্যের ফল হিসেবে মিলবে কেবল শূন্যতা আর হাহাকার। ওই লাশের ভার অনেক—ওই লাশ প্রণয় কিছুতেই কাঁধে নিতে পারবে না। এর থেকে নিজের লাশ হয় সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে চলে যাওয়া তার জন্য অনেক সুখের।
প্রণয় বুক ভরে লম্বা শ্বাস টেনে নেওয়ার চেষ্টা করল। ফুরফুরে শীতল বাতাস হৃৎপিণ্ড ছুঁয়ে ও গেলেও তবে তা স্বস্তি দিতে পারলো না হৃদপিন্ডে। প্রণয়ের দম বন্ধ হয়ে আসছে, এই সময় প্রিয়তার কোমল স্পর্শ পাওয়ার সাঙ্ঘাতিক ক্রেভিং হচ্ছে। মোমের মতো শরীরটা বুকে ঝাঁপটে ধরে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে কিছুক্ষণ। উষ্ণ ঠোঁটের গরম ভাব গায়ে মেখে সুখের অতলে হারিয়ে যেতে মন চাচ্ছে।

সুখ পাখিটার কোলে মাথা রেখে চিৎকার দিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে—
“আমাকে ছেড়ে যাস না জান, আমি একদম নিঃস্ব হয়ে যাব, মরে যাব, বাঁচতে পারবো না। আমি সইতে পারবো না তোকে অন্যের সাথে। তুই তো আমার, শুধুই আমার। এই বুকে মাথা রেখে কতো শতবার বলেছিলি তুই আমার। তাহলে আজ কেনো তুই অন্যের হবি? কেন আমার বুকের খাঁচা ভেঙ্গে উড়ে যাবে পাখি? আমাকে জীবিত রেখে এত বড় শাস্তি দিস না।”
কিন্তু আফসোস, এই ব্যর্থ প্রেমিকের নীরব আর্তনাদগুলো হয়তো কোনোদিনও শুনতে পাবে না পাখি, পাবে না শুনতে।
আঁধারি রাতের বুক চিরে হঠাৎ তীক্ষ্ণ আলোর ছটা এসে পতিত হলো প্রণয়ের চোখে মুখে। এতে মাত্রাতিরিক্ত বিরক্ত হলো প্রণয়, তবে তা মুখে প্রকাশ করলো না। বাইক থেকে নেমে দ্রুত ছুটে আসলো আবির্ভাব। প্রিয় বন্ধুকে বালির উপর এভাবে শুয়ে থাকতে ঘাবড়ে গেলো। লাফিয়ে এসে বসে পড়লো প্রণয়ের পাশে, পাগলের মতো প্রণয়ের দুই বাহু ধরে ঝাঁকা ঝাঁকি শুরু করে দিলো, বা হাতের পালস চেপে ধরে পরীক্ষা করতে লাগলো বেঁচে আছে কিনা।

ওর এসব পাগলামো দেখে বিরক্তিতে মুখ বিকৃত করলো প্রণয়। ওর হাত ছাড়িয়ে বললো—
“এতো সুখ আমার কপালে নেই ভাই, এতো সহজে মরবো না।”
অন্ধকারে বন্ধুর গমগমে কণ্ঠ শুনতে পেয়ে স্থির হয়ে যায় আবির্ভাব। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিজেও শরীর ছেড়ে দেয় বালির উপর। এতক্ষণ মনে হচ্ছিলো তার আত্মাটা বোধ হয় কেউ চিপে বের করে নিচ্ছে। আবির্ভাব কিছু বলবে তার পূর্বেই প্রণয়ের শার্টের কলার চেপে ধরে শুদ্ধ, গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে টেনে তুলে প্রণয়ের নাক বরাবর ঘুষি মেরে দেয়।
এই দৃশ্য দেখে চোখ বড়ো বড়ো করে ফেলে আবির্ভাব ও সাদাফ। শুদ্ধকে টেনে সরানোর চেষ্টা করতে করতে আবির্ভাব চিৎকার দিয়ে বলে—

“কি করছিস! ছাড় ওকে, পাগল হয়ে গেছিস?”
তবে আবির্ভাবের কথায় কর্ণপাত করলো না শুদ্ধ। ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলো নিজের থেকে, প্রণয়ের কলার টেনে ধরে সজোরে আবারো নাক বরাবর পাঞ্চ বসালো। গর্জে উঠে বললো—
“খুব কষ্ট হচ্ছে তোর, তাই না? আয় তোকে তোর সব কষ্ট থেকে মুক্তি দিতে দেই, মেরে ফেলি তোকে!”
শুদ্ধর উক্ত বাক্যে কেঁপে উঠলো সাদাফ ও আবির্ভাব। আঘাতের তীব্রতায় দুই কদম পিছিয়ে গেলো প্রণয়। শার্টের হাতায় নাক মুছে তাকালো শুদ্ধের দিকে। অন্ধকারে বোঝা না গেলেও প্রণয় বেশ বুঝতে পারছে শুদ্ধ প্রচণ্ড রেগে আছে।
শুদ্ধ রাগ সংবরণ করতে পারলো না। ধপাধপ পা ফেলে এগিয়ে এসে পুনরায় কয়েক ঘা বসিয়ে দিলো। রাগে দাঁত কিড়মিড় করে চেঁচিয়ে বললো—

“আমার সুখ তোর কোনো কালেই সই হয় না, জানি আমি! তাই এমন সময় টেনশন দিচ্ছিস। তুই আমার ভালো দেখতে পারিস না। যাতে আমি বিয়েটা না করতে পারি তাই এসব করছিস। ওকে ফাইন, একবার বল আমি বিয়েটা না করলে তুই খুশি হবি?
তাক তর তোর বলা লাগবে না, আমি এখুনি বিয়েটা ভেঙে দিচ্ছি। তার পরেরটা তুই সামলাস।”
প্রণয় এবারো ওর কোন কথার ও জবাব দিলো না। তার দেহ ও মনে বিন্দুমাত্র শক্তি নেই কোনো প্রশ্নের জবাব দেওয়ার। প্রণয় শুদ্ধর হাতের মুঠো থেকে নিজের শার্টের কলার ছাড়িয়ে নিলো।
শুদ্ধ যা বুঝার বুঝে গেছে। সে দ্রুত ফোন বের করে মেহজাবিন চৌধুরীর নাম্বার ডায়াল করলো। ২ বার রিং হওয়ার সাথে সাথেই ফোন ধরলেন মেহজাবিন চৌধুরী। ওপাশ থেকে ব্যস্ত কণ্ঠে বললেন—

“এখন কেনো ফোন করছো মাই সান? ব্যস্ত আছি।”
শুদ্ধ কোনো রকম ভনিতা ছাড়াই বললো—
“আমি এই বিয়েটা করতে পারবো….”
কথা শেষ করার পূর্বেই তার হাত থেকে ফোন কেড়ে নিলো কেউ। শুদ্ধ পাশ ফিরে তাকানোর আগেই ফোনটা মাতলা নদীর অতল গহ্বরপ ছুঁড়ে মারলো প্রণয়। শুদ্ধ কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। প্রণয় শার্টের হাতা গুটিয়ে এসে আচমকাই মারতে শুরু করলো শুদ্ধকে।
এই দৃশ্যে আরো বেশি হতবম্ব হয়ে গেলো সাদাফ ও আবির্ভাব। প্রায় মিনিট দশেক শুদ্ধকে তুলো ধুনা করলো প্রণয়। আচ্ছা মতো পিটিয়ে রাগান্বিত কন্ঠে হিসহিসিয়ে বলল—

“চুপচাপ বিয়ের আসরে বসবি আর বিনা বাক্যে বিয়ে করবি। এই বিয়েটা আমার জন্য খুব দরকার। আমাকে তোর দয়া দেখাতে হবে না, আবার শিকদার প্রণয় কারো দয়ায় বাঁচে না।
তোকে আমি আমার ভালোবাসা আজীবন হেফাজতের ভার দিয়েছি, কারণ আমি তোর মধ্যে সেই যোগ্যতা দেখেছি। আর এই কথার যদি হেরফের হয়, তাহলে ঠাস ঠাস করে দুটো বুলেট বুকে আর দুটো বুলেট তোর কপালে ঠুকে দেবো। তোর এই জীবনটাই শুধু আমার জানের দেখারবাল করার জন্য।”
বলে শুদ্ধকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে চলে গেলো প্রণয়।
আহম্মকের মতো তাকিয়ে রইলো সাদাফ ও আবির্ভাব। এরা দুজন যে কি চায় আর কী চায় না, সেটাই তাদের মাথার উপর দিয়ে গেলো।
শুদ্ধ বালিতে শরীর এলিয়ে দিয়ে তৃপ্ত কণ্ঠে আওড়ালো—

“তোর ঋণ আমার এ জীবনে ও শোধ হবে না প্রণয়। তোর যন্ত্রণাটা আমি উপলব্ধি করতে পারি, কিন্তু এখানে আমারো কিছু করার নেই। আমি ও চাই তুই ভালো থাক, কিন্তু আমার সুইটহার্টকে ছাড়া তোর দেওয়া এই ভিক্ষাটুকু আমার খুব প্রয়োজন।”
প্রেরণা, উষা, প্রিয়তা, ওরণ্য, সমুদ্র—
“তোমাদের হলো আর কতক্ষণ লাগবে? এর পর তো দেরি হয়ে যাবে বাচ্চা।”
বলে ড্রইং রুমে দাঁড়িয়ে হাঁক ছাড়লেন মেহজাবিন চৌধুরী।
সকল ১০ টা বাজতে চল্লো, কিন্তু এখনো এই বাড়ির ছেলে-মেয়েগুলোর সাজগোজ শেষ হলো না। শপিং মলে যাবে তার জন্য এতো সাজার কি প্রয়োজন, সেটাই বুঝেন না মেহজাবিন চৌধুরী।
“কই হলো তোমাদের?”

“এতো তাড়াদিচ্ছো কেনো ফুপ্পি? আসবে ধীরে সুস্থে।”
সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে কথাটা বললো প্রেম। সে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের লোকদের কাজের ইন্সট্রাকশন দিচ্ছে। আজ সকাল হওয়ার সাথে সাথেই ঢাকার সব থেকে বড়ো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এজেন্সির অনারসহ প্রায় ৫০ জন লোক এসছে শিকদার বাড়িতে। তারা প্রতিটা ইভেন্টের জন্য আলাদা আলাদা থিমে ডেকোরেশন করবে।
মেহজাবিন চৌধুরী দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন,
“বাবা, তুই বুঝতে পারছিস না দুদুটো বিয়ে, কতো কতো অনুষ্ঠান, কতো আত্মীয়স্বজন, মেহমান, বাড়ির সদস্য—সবার জন্য শপিং করতে হবে, তা ও আজকের মধ্যেই। কতো সময় লাগবে বুঝতে পারছিস? এমনিতেই বাড়িতে প্রায় অর্ধেক মেহমান এসে পড়েছেন।”

“হুম, বুঝলাম ফুপ্পি। কিন্তু তুমি যাদেরকে নিয়ে শপিং এ যাচ্ছো তারা এক একটা লেজ ছাড়া বাঁদর, অবস্থা একদম খারাপ করে দেবে তোমার।”
মেহজাবিন চৌধুরী হাসলেন।
“ওরাই তো আমাদের খুশির কারণ বাবা। ওদের দুষ্টুমি তো আমাদের মানসিক স্বস্তি। কিন্তু তুই এখনো রেডি হসনি কেনো? তুই যাবি না?”
“সবাই চলে গেলে এদিকটা কে দেখবে ফুপ্পি? ভুলে গেলে কাল মেহেন্দি। আজ সবাই মিলে শপিং এ চলে গেলে বাসার পেন্ডিং কাজগুলো করবে কে? থিম অনুযায়ী ডেকোরেশন কিভাবে হবে? আরে ওদিকটায় ফুল বেশি করে লাগাও।”
বলে ডেকোরেটর ছেলেটাকে তাড়া দিলো প্রেম।
কথা বলতে বলতে ওরণ্য কাঁধে করে বিশাল একটা সাউন্ড বক্স এনে রাখলো প্রেমের পায়ের কাছে। সাউন্ড বক্সের ভাড়ে হাঁপিয়ে উঠছে ছেলেটা।

ওরণ্যকে দেখে প্রেম নাক কুচকে বললো,
“তোকে দিয়ে কি একটাও কাজ হবে না ওরণ্য? তোকে বলেছি ৬ টা থেকে ৮ টা সাউন্ড বক্স নিয়ে আসতে, আর তুই মুটে একটা এনেই হাঁপিয়ে গেছিস।”
ওরণ্য বুকে হাত দিয়ে ঝুঁকে নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো,
“বাবাহ, কি ভারি ছোড়দা একটা, তুলে দেখো দম লটকে যাবে।”
“সব যদি আমি করবো তাহলে তুই কি করবি? বোনের বিয়েতে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াবি?”
“উঁহু, ওটি একদম হবে না। আমাদের বোনের বিয়ে—ভাই হিসেবে আমাদের সর্বোচ্চটা দিতে হবে।”
বলে আরেকটা সাউন্ড বক্স এনে রাখলো পৃথম। পড়পড় সমুদ্র আর রাজও নিয়ে এলো একটা একটা।
পৃথম কিছু ছেলেদের ডাকলো। আদেশ দিয়ে বললো,

“এগুলো সুন্দর করে ছাদের কর্নারে রাখবে, এমন ভাবে রাখবে যেনো স্টেজ বাঁধার পর আর এগুলো দেখা যায় না।”
“জি মেজো ভাইয়া।”
বলে ছেলেগুলো চলে গেলো সাউন্ড বক্স নিয়ে।
ওরণ্য ভাইদের অবস্থা দেখে বাঁকা হেসে বললো,
“এখনই কাল ঘাম ছুটছে ভ্রাদার, এখনো তো কিছু হলই না।”
সমুদ্র শিরিতে বসে পড়ে বললো,
“সকাল থেকে গাধার মতো খেটেছি, এখন আর পারবো না।”
ওরণ্য পুনরায় বললো,
“বসে পড়ে লাভ নেই বেরাদার। উঠে পড়ো, যাও, গিয়ে ক্যাটারার্সদের নিয়ে আসো। ওরা ফোন করেছিল স্টেশনে চলে এসছে, দুপুর হতে চল্লো। বাসা ভর্তি মানুষ আরো আসছে, সবার খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।”
“ধুর।”
বলে মুখ বাঁকিয়ে চলে গেলো সমুদ্র। ওদের আর আরাম করার ফুসরত রইলো না। রাজ, প্রেম, পৃথম বাহিরে চলে গেলো।
“হায় হায় পার্টনার, তুমি এখনো কুদ্দুস আলী হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছো। সবাই এলো, বলে এবার কিন্তু সবাই তোমাকে ফেলে চলে যাবে পার্টনার।”

সেজে গুজে মাঞ্জা মেরে শিড়ি বেয়ে নামতে নামতে কথাগুলো বললো তন্ময়।
ভাইয়ের কথায় লাফিয়ে উঠলো ওরণ্য। তন্ময়ের কথার জবাব না দিয়েই দৌড়ালো নিজের ঘরের দিকে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রেডি হয়ে নিচে নামলেন অনুস্রী বেগম, তনুস্রী বেগম, অনন্যা বেগম, অর্থী বেগম, পূর্ণতা, উষা দেবী, প্রেরণা, পরি, শ্বেতা, থিরা, থরি, তন্ময়, ওরণ্য, রাদিফ, সাদিফ, অভ্র, সুভ্র, সুভ্রতা, দীপ্তি, সহ আরো কিছু আত্মীয় সকলে।
মেহজাবিন চৌধুরী সকলকে দেখে খুশি হলেন। উনি সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“বাহ, সকলে এসে পড়েছো, কিন্তু আমার বউমা কোথায়?”
“ও আসছে ফুপ্পি।”
“আচ্ছা, কিন্তু বাড়ির পুরুষরা কোথায়? আমরা কি শুধু মেয়েরা যাবো নাকি?”
পাশ থেকে তন্ময় বলে উঠলো,

“আমি তো আছি ফুপ্পি। আমি নিয়ে যাবো তোমাদের। আমি তন্ময় শিকদার, একাই ১০০।”
মেহজাবিন চৌধুরী হেসে তন্ময়ের গাল টেনে দিয়ে বললেন,
“বাহ, আমার আব্বা তো সব দায়িত্ব নিতে শিখে গেছে।”
ওরণ্য পাশ থেকে মুখ কালো করে বললো,
“আমি ও আছি কিন্তু।”
অনুস্রী বেগম কিছু বলবেন, তার পূর্বেই শিড়ি বেয়ে নেমে আসলো প্রিয়তা। হালকা গোলাপী রঙের থ্রি পিসে কি যে মারাত্মক লাগছে মেয়েটাকে! মেয়েটার এতই রূপবতী যে যেকোনো রূপে, যেকোনো রঙে থাকে মারাত্মক আকর্ষণীয় লাগে।
মুগ্ধ হলেন মেহজাবিন চৌধুরী। উনি সব সময় স্বপ্ন দেখতেন উনার রাজপুত্রের মতো ছেলের পাশে ওরকম মানানসই বউমা আনবেন—যে দেখবে, সে শুধু দেখতেই থাকবে।

প্রিয়তা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো পরির পাশে।
দেখতে দেখতে কিছুক্ষণের মধ্যেই ড্রইং রুমে এসে হাজির হলো প্রণয়, শুদ্ধ, সাদাফ, আবির্ভাব রাজ।
ওদেরকে দেখে বিষণ খুশি হলেন অনুস্রী বেগম। নিশ্চিন্ত কণ্ঠে বললেন,
“যাক, বাবা তোরা গেলে আর কোনো চিন্তা নেই।”

ওরা ৪ জন বিষণ স্বাভাবিক, তবে বর ছাড়া—বিয়ের সকল আয়োজনের ৭০% নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে প্রণয়, আবির্ভাব, পৃথম, রাজ, প্রেম, ওরণ্য, সমুদ্র। বাকি ৩০% চার কর্তার কাঁধে। এই বিয়েতে কোনো ত্রুটি থাকবে না।
তবে প্রণয়ের উপস্থিতি এখানে মোটেও আশা করে নি প্রিয়তা।
“আমাকে ভালোবাসেন না মানলাম প্রণয় ভাই, কিন্তু এভাবে মানসিক যন্ত্রণা দেবেন না? এই বিয়েতে আপনি জড়াবেন না প্রণয়ের ভাই, আমি এটা সইতে পারবো না।”
চোখ টলমল করছে প্রিয়তার। সে সত্যি বাস্তবতা মেনে নিতে চায়। সে চায় না প্রণয়ের প্রতি দুর্বলতা দেখতে। সে তার সকল কলঙ্কিত ভালোবাসা নিজের মধ্যে চেপে রাখতে চায়, কিন্তু এই পুরুষ যখনই সামনে আসে তখন সব গুলিয়ে যায়, প্রিয়তার সকল হিসেবে ভুল হয়ে যায়।

প্রণয় সকলের উদ্দেশে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“আপনারা আসুন, আমি গাড়ি বের করছি।”
বলে চলে গেলো প্রণয়। পিছু পিছু রাজ আর আবির্ভাব ও গেলো।
শিকদার বাড়ির মেন গেটের বাহিরে সারিয়ালে দাঁড়িয়ে আছে গুটা ১০ এক প্রাইভেট কার। রাজ দাঁড়িয়ে একে একে সবাইকে গাড়িতে ঢুকাচ্ছে। এতো জনগণ হয়েছে যে ১০ টা গাড়িতে ও মনে হয় না ধরবে কিন্তু অরণ্য সিকদার আছেনা ঠেসে ঠুসে সব ফিট করে দেবে।
মেহজাবিন চৌধুরী শ্বেতাকে চোখের ইশারায় কিছু বুঝালেন। সাথে সাথেই চওড়া হাসলো শ্বেতা। ছুটে গিয়ে দাঁড়ালো প্রিয়তার পাশে।
প্রিয়তার পাশে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলো,
“তুমি কোনটাতে যাবে ভাবী?”

প্রিয়তা সকলের গাদাগাদি অবস্থা দেখে চোখ বড়ো বড়ো করে ফেললো, নাক কুচকে বললো,
“এতো গাদাগাদির মধ্যে তো আমি কখনোই যেতে পারবো না। ইম্পসিবল! দরকার হলে আমি যাবোই না, তাও এতো লম্বা রাস্তা আমি এতো মানুষের ধাক্কা খেতে পারবো না।”
শ্বেতা বাঁকা হেসে প্রিয়তার হাত চেপে ধরে বললো,
“ওকে, চলো।”
“কোথায়?”
শ্বেতা বাঁকা হেসে বললো,
“আমার একটামাত্র সুন্দরী ভাবীকে কি আমি মানুষের ধাক্কা খাওয়াতে পারি?”
প্রিয়তা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে প্রথম কালো গাড়িটার সামনে এনে ধর করালো শ্বেতা। মেন ডোর খুলে দিয়ে বললো,
“যাও।”
প্রিয়তা ভিতরে তাকিয়ে দেখলো, গাড়ির ব্যাক শীট পুরো ফাঁকা। আবারো চোখ বড়ো বড়ো করে প্রশ্ন ছুঁড়লো প্রিয়তা,
“এটা খালি কেনো? এখানে আসবে না সবাই?”
“না, একটা স্পেশাল মানুষদের জন্য।”
“আচ্ছা।”

“হুম, বসে পড়ো। এখানে গাদাগাদি হবে না, তুমি ফ্রিলি যেতে পারবে।”
প্রিয়তা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পিছনের সিটে উঠে বসলো।
গাড়িতে বসে সামনে তাকাতেই ছলাত করে উঠলো প্রিয়তার প্রাণ। গাড়ির ফ্রন্ট মিররে চোখ পড়তেই এক জোড়া রক্তিম বাদামী বর্ণের চোখের সাথে সাথে চোখা চোখি হয়ে গেলো কিছু বুঝে ওঠার আগেই। সহসা নিঃশ্বাস আটকে আসে প্রিয়তার। ড্রাইভিং শীটে বসে আছে প্রণয়, পাশের সিটে আবির্ভাব।
প্রণয় চোখ সরায় না, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেই মাতলা চোখ দুটির দিকে। তবে সেই চোখে হয়তো কিছু একটা ছিল, যা বেশি সময় দেখতে পারলো না প্রিয়তা। আপনা আপনি দৃষ্টি নত হয়ে গেল।
এখানে থাকা সম্ভব নয় বোধ করে গাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে ধরলেই বেঁধে যায় আরেক বিপত্তি। কারো শক্তপোক্ত বুকের সাথে ধড়াম করে বাড়ি খেয়ে বসে।
এহেন অপ্রত্যাশিত কান্ডে আহম্মক বনে যায় প্রিয়তা। বোকার মতো তাকিয়ে থাকে শুদ্ধের মুখের দিকে। শুদ্ধ বুক ঢলতে ঢলতে বসে পড়লো প্রিয়তার পাশ ঘেঁষে।
ব্যথায় চোখ বন্ধ করে বললো,

“বিয়ের আগেই বিধবা হতে চাচ্ছো নাকি সুইটহার্ট?”
প্রিয়তার এবার চোখ আরো বড়ো বড়ো করে ফেলল। অদ্ভুত চোখে চেয়ে থাকলো শুদ্ধের দিকে।
তৎক্ষণাৎ শোনা যায় শুদ্ধের মাতাল কণ্ঠ। শুদ্ধ অধৈর্য গলায় বলল,
“এভাবে চেয়ে থেকো না সুইটহার্ট। বিয়ের মাত্র ৩ দিন বাকি, আমি এখনই চরিত্রহীন উপাধিতে ভূষিত হতে চাই না।”
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চট করে চোখ সরিয়ে নিলো প্রিয়তা। আনমনে পুনরায় তাকালো সামনে।
এখনো তাকিয়ে আছে প্রণয়,ফলে পূর্বের ন্যায়
আবারো চোখা চোখি হলো, কিন্তু ওই চোখে কোনো অনুভূতি দেখতে পেলো না প্রিয়তা। খারাপ লাগলো বিষণ।
অচেনা স্পর্শে লাফিয়ে উঠলো প্রিয়তা, বিস্মিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো পাশে।
শুদ্ধ খুব স্বাভাবিক ভাবে তার আঙুলের ভাঁজে আঙুল গুঁজে সিটে মাথা এলিয়ে দিয়েছে। প্রিয়তা ভেতর অস্বস্তিতে ভরে গেল। সে হাত ছাড়াতে গিয়ে কি যেন ভেবে থেমে গেলো।
কিছুক্ষণ পর নিজেও শুদ্ধের আঙুলের ভাঁজে আঙুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরলো। চোখ বন্ধ করেই ঠোঁট কামড়ে হাসলো শুদ্ধ।

গাড়ির স্টিয়ারিং শক্ত করে চেপে ধরলো প্রণয়।
মিনিট ২০ যুদ্ধ করার পর ফ্যামিলি সবাইকে ৯ টা গাড়িতে ঠেসে ঢুকিয়ে দিলো রাজ। নিজেও গিয়ে বসলো ড্রাইভিং শীটে।
একে একে শিকদার বাড়ি ছাড়িয়ে গেলো ১০ টা প্রাইভেট কার।
দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল হতে যায়, কিন্তু এখনো শপিং-এর ৫০% শেষ করে উঠতে পারেনি শিখদার ফ্যামিলি।
পুরো জমুনা ফিউচার পার্ক ঘেঁটে বর আর বাড়ির সদস্যদের জন্য শপিং শেষ হয়েছে, এখনো কনে আর মেহমান বাকি।
শপিং মলে সাদাফের আম্মু আনিকা সাখাওয়াত ও সাদাফের বোন সারিকা এসেছে। মহিলারা নিজেদের পছন্দমতো ছেলের বউয়ের জন্য কেনাকাটা করছেন।

মেহজাবিন চৌধুরী একের পর এক বেনারশি শাড়ি আর লেহেঙ্গা প্রিয়তার গায়ে ধরছেন, কিন্তু একটা ও উনার মনের মতো হচ্ছে না। এতে অবশ্য কোনো দ্বিমত প্রকাশ করছে না প্রিয়তা, যে যা বলছেন কাঠের পুতুলের ন্যায় শুনছে সব।
দূরে দাঁড়িয়ে এক ধ্যানে প্রিয়তার রূপে ডুবে আছে শুদ্ধ, তার জেনো এটাই কাজ।
মেহজাবিন চৌধুরী ছেলেকে ধমকে বললেন,
“ক্যাবলার মতো না দাঁড়িয়ে বউয়ের জন্য একটু শাড়ি গয়নাও তো সিলেক্ট করে দিতে পারিস, দেখছিস না হিমশিম খাচ্ছি।”
শুদ্ধ মাথা চুলকে এগিয়ে এলো, প্রিয়তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে বললো,
“আমার বউয়ের দুধে আলতা অঙ্গে শোভা পাবে যে বস্ত্র, সে বস্ত্রের আলাদা শোভার প্রয়োজন পড়বে না মম।”
মেহজাবিন চৌধুরী বিরক্ত হয়ে বললেন,

“চুপচাপ শাড়ি দেখ।”
শুদ্ধ ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো। সত্যি সত্যি প্রিয়তার জন্য শাড়ি পছন্দ করতে লাগলো আর আচানক ভাবে সবগুলো শাড়ি অত্যন্ত সুনিপুণ।
শুদ্ধ প্রিয়তাকে টেনে অন্য সেকশনে নিয়ে গেলো। নিজের হাতে পছন্দ করে কিনে দিলো মেহেদি ও গায়ে হলুদের শাড়ি, লেহেঙ্গা, রিসেপশনের জন্য একটা দারুণ পার্পেল কালারের শাড়ি চুজ করলো।
শাড়ি প্রিয়তার গায়ে ধরতেই শুদ্ধর হৃৎপিণ্ড ধক ধক করে উঠলো, তবে প্রিয়তা নির্বিকার। সে শুদ্ধর কোনো কাজেই মানা করছে না।
একে একে বিয়ের সব প্রোগ্রামের জন্য শাড়ি, লেহেঙ্গা চুজ করা হলো। প্রেরণার বিয়ের শাড়িও কেনা হলো, কিন্তু প্রিয়তার জন্য মন মতো একটা বেনারশি পাওয়া গেলো না।

শুদ্ধ, মেহজাবিন চৌধুরীসহ সকলে প্রিয়তার জন্য মানাশই বিয়ের বেনারশি খুঁজতে লাগলেন।
তার মধ্যেই হঠাৎ করে পরী একটা বেনারশি এনে প্রিয়তার গায়ে ধরলো। একদম ডার্ক মারুন কালার বেনারশি, যার দুই পাড়ে ভারি গোল্ডেন ঝরির কাজ। পুরো শাড়ীটাই কেমন অন্যরকম মাধুর্যে পরিপূর্ণ।
শাড়ীটা প্রিয়তার গায়ে ধরতেই সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো।
মেহজাবিন চৌধুরী ছুটে এসে শাড়ীটা প্রিয়তার গায়ে ভালোভাবে ধরলেন মুগ্ধ কন্ঠে বলেন ।
— মাশাল্লাহ, এই ত একদম মনের মতো লাগছে।
পরিনিতা পাশ থেকে বললো, পছন্দ হয়েছে ফুপ্পি।

— খুব, এটা কোথায় পেলি? আমরা তো দেখলাম না।
পরিনিতা হালকা হাসলো, কথার জবাব দিলো না।
অনন্যা বেগম এগিয়ে এসে মেয়ের তুঁথনিতে হাত রেখে বললেন,
— মাশাল্লাহ, আমার মেয়েটার যেন কারো নজর না লাগে।
শ্বেতা শুদ্ধকে পাশ থেকে ধাক্কা দিলো। দুষ্টু হেসে বললো,

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৬৫

— কন্ট্রোল মাই ব্রাদার, কন্ট্রোল। এভাবে তাকিয়ে থাকলে লোকে ক্যাবলা বলবে।
— আই ডেসপারেটলি নিড হার।
শ্বেতা হাসলো।
শাড়ি কেনা শেষ করে সবাই এবার এগোলো জুয়েলারি সেকশনের দিকে।

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৬৭