Remedy part 2
মীরা রায়াদ
” আমার মা বাবা বেঁচে নেই।”
এই একটি বাক্য যথেষ্ট ছিল মেহেরুন্নেসা নামের কঠিন ব্যক্তিত্বের মহিলাটির কুঁচকে যাওয়া কপাল শিথিল করতে। খুব মনযোগ দিয়ে পাতলা ফিনফিনে শরীরের মেয়েটিকে কয়েকবার দেখে নিয়ে দৃষ্টি অনড় ঝুমের ওপর রেখে ঈশালকে উদ্দেশ্য করে
বলল –
” ঈশাল আপনার বন্ধুকে আপনার ঘরে নিয়ে যান। আজ থেকে তিনি আপনার সাথেই থাকবে। বিয়ের বাড়ি অনেক গেস্ট আসবে, এতো মানুষের মধ্যে একা অন্যরুমে তিনি কমফোর্ট নাও হতে পারেন। আর হ্যাঁ, দ্রুত ফ্রেশ হয়ে ওনাকে নিয়ে খেতে আসুন।”
এতক্ষন ঝুমের দৃষ্টি মেজেতে থাকলেও এবার চোখ তুলে সরাসরি মেহেরুন্নেসার পানে তাকালো। ভদ্রমহিলা ঠিক তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। ঝুম লক্ষ্য করলো কিছুক্ষন আগের দৃষ্টি আর এখনকার দৃষ্টির মাঝে বিস্তার ফারাক। যেন ঐ চোখ কিছু বলতে চায় ঝুমকে। অপার মায়া নিয়ে তাকিয়ে আছে। যতোই উপরে উপরে চোটপাট করুক না কেন মনটা যে তার ভীষণ মায়া দিয়ে গড়া তা বুঝতে কষ্ট হলো না।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ঈশাল খুশি মনে ঝুমকে নিয়ে তার রুমের দিকে পা বাড়ালো। যেতে যেতে শুনতে পেলো মেহেরুন্নেসা তাদের লাগেজ উপরে পাঠানোর ব্যবস্থা করছেন। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে একবার নিচে তাকিয়ে মেহেরুন্নেসাকে দেখে নিলো। ভদ্রমহিলা অসম্ভব লম্বা গড়নের। মানুমানিক ৫’-৭” উচ্চতার সুস্বাস্থ্যের অধিকারি কঠিন ধাঁচের নারী। পুরো শরীর জুড়ে যার আভিজাত্যের ছোঁয়া। আমাদের দেশে এই উচ্চতার পুরুষ পাওয়া গেলেও হাতে গোনা কয়েকজন নারী পাওয়া যায়, যারা উচ্চতার লম্বা হয়। অথচ এখানে প্রায় সকলের উচ্চতাই এমন। ঈশালও মোটামুটি ৫’-৫” উচ্চতার তো হবেই। তাছাড়া তার মাও উচ্চতায় লম্বা। সেখানে ঝুম নিতান্তই বেঁটে সাইজের। মাত্র ৫’-১”। বাংলাদেশে নিজেকে ওতোটা খাটো না লাগলেও এখানে নিজেকে খাটোই মনে হচ্ছে।
ফ্রেশ হয়ে মোটামুটি খেয়ে ঈশালের সাথে আবার তার রুমে ফিরে সেই যে ঘুম দিলো, এক ঘুমে ৯ টা বেজে গেছে। তাদের খেতে নিচে ডাকা হয়েছে। গতরাতে ঈশালের মা আর বড় চাচিকে ছাড়া আর কারো সাথে দেখা হয়নি। যদিও ঈশাল গতরাতেই তাকে অনেক কিছু বুঝিয়ে দিয়েছে। এই যেমন তার বড় চাচি আম্মা যতোই রাগ দেখান না কেন, মনটা তার খুব ভালো। কথা কম বলেন, একটু শাসন করেন, কিন্তু সবাইকে খুব ভালোবাসেন। আর তার মা হলো মমতাময়ী। এই বাসায় একমাত্র তার মা হলো খুব সহজ সরল মনের। ছোট চাচি আম্মা খুব মিশুক। প্রচুর কথা বলে তার মতো। বন্ধুর মতো মিশে যায় তাদের সাথে। তাদের বাসায় সকালের নাস্তা সবাই একসাথেই করে। তারপর যে যার মতো কাজে বা স্কুল, ভার্সিটিতে চলে যায়। সব থেকে ইন্টারেস্টিং যে বিষয়টা লেগেছে ঝুমের কাছে তা হলো বড় চাচি আম্মার বিষয়টা। কেন জানি না ঝুমের নিকট মেহেরুন্নেসাকে রহস্যময়ী লাগে। তার ব্যাপারে জানতে ইচ্ছা করে। সেই ইচ্ছা থেকেই গতরাতে মেহেরুন্নেসা ব্যাপারে প্রশ্ন করেছিল। তখন মেয়েটি বলল –
” বড় চাচি আম্মার যখন 14 বছর বয়স তখন তাদের পুরো পরিবার পাকিস্তান চলে এসেছিল। তখন থেকেই তিনি পাকিস্তানে থাকেন। সে কিন্তু বাংলা বলতে পারেন, তবে আমরা কখনো তার মুখে বাংলা শুনিনি। শুনেছি বড় চাচাজানের সাথে বিয়ে হওয়ার পর আমাদের পারিবারিক ব্যবসায় লস হয়। যার কারণে দাদাজান হার্ট এ্যাটাক করে বসেন। পুরো পরিবার তখন রাস্তায় বসে যেতো যদি না তখন বড় চাচি আম্মা ব্যবসায় হাত না লাগত। একা হাতে পুরো ব্যবসা আবার নতুন করে দাড় করিয়েছেন।তখন বড় ভাইজান খুব ছোট। এই কারণে বড় ভাইজান তার আম্মিকে ঠিক করে কাছে পাননি।”
” উনি একা কেন? বাড়ির পুরুষেরা কোথায় ছিল?”
” আমার বড় চাচাজান তখন মিলিটারিতে ছিলেন। চাইলেও উনি আসতে পারতেন না। আর আমার আব্বি তখন প্রবাসে ছিলেন। ভালো কোম্পানির হয়ে জব করতেন। অবশ্য তার কয়েক বছর পরই চলে আসেন পাকিস্তান। আর ছোট চাচাজান কখনোই এসব ব্যবসা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। তাই তাকে বলেও কাজ হয়নি। আমার আম্মি এমনিতেও নরম মনের মানুষ তাকে দিয়ে ব্যবসা হতো না। আর ছোট চাচি আম্মা তখন সন্তান হারানোর শোক সামলে উঠে যে ব্যবসায় মন দিবে এটা ভাবা নিছক বোকামি।”
” মানে?”
” ছোট ভাইজানের পর ছোট চাচি আম্মার এক মেয়ে হয়েছিল। যে জন্মের সময় কিছু কমপ্লিকেশনসের কারণে দুনিয়ার আলো দেখতে পারেনি। ডাক্তার বলে ছিলেন চাচি আম্মা আর কখনো মা হতে পারবে না। কিন্তু আল্লাহ মিয়ার বেহেরবানিতে ছোট ভাইজানের জন্মের ১৩ বছর পর আমাদের ছোট্ট আয়ান দুনিয়াতে আসে।”
” ওহ্। তাহলে তো বলতেই হয় তোমার বড় চাচি আম্মা তোমাদের জন্য অনেক কিছু করেছেন।”
” হ্যাঁ, তা অবশ্যই। তখন সে না থাকলে আমরা হয়তো আজ রাস্তায় থাকতাম বা যে সুন্দর জীবন আমরা উপভোগ করছি সেটা আমরা কখনো পেতাম না। এই কারণে আমরা সকলে বড় চাচি আম্মাকে খুব সন্মান ও মান্য করি। আমাদের এই মাথার ছাদ আর সখ পূরণের জন্য সে অনেক স্যাক্রিফাইস করেছে। তার সাথে সাথে বড় ভাইজানও নিজের শখ – আল্লাদ, মায়ের ভালোবাসা সব ত্যাগ দিয়েছেন। বড় চাচাজান তো কাছে ছিলেন না। আর যতোই অন্য কেউ ভালবাসুক না কেন মায়ের জায়গা কেউ নিতে পারে না আর মায়ের মতো কেউ ভালবাসতেও পারেন না। এরপর থেকেই নাকি ভাইজান চুপচাপ গম্ভীর হয়ে যান।”
তৈরি হতে হতে গতরাতের কথা গুলো ভাবছিল ঝুম। না জেনে মানুষটাকে কত কঠিনই না ভেবেছিল সে। আর এখন? মন ভরে সন্মান আসছে তার জন্য।
বেডে বসে তারই দিকে ঈশাল একনজরে তাকিয়ে আছে। ভাবছে কাল খোপা করা থাকায় বুঝতে পারেনি মেয়েটার চুল এত্তো লম্বা। একদম হাঁটু ছেড়ে অনেকটা নিচে। মাশাআল্লাহ, কি সুন্দর। গতকালের মতো আজও মুখে কোনো প্রসাধনী নেই। হালকা গোলাপি রঙের খুব সাধাসিধা একটি শাড়ি পরনে। ভিজে চুল গুলো দুহাতের সাহায্যে আবার খোপা করে নিচ্ছে।
” এবার যাওয়া যাক?”
ধ্যান ভাঙলো ঈশালের।
” হ্যাঁ হ্যাঁ, চলো।”
নিচে নামতে নামতে দেখতে পেল কাল রাতেও যে ডাইনিং টেবিলটি ফাঁকা ছিল তা আজ পরিপূর্ণ। ঈশাল একটি চেয়ার টেনে ঝুমকে বসিয়ে পাশের চেয়ারটি টেনে সে নিজে বসতে বসতে বলল –
” সালাম আলাইকুম এভরিওন।”
” ওয়ালাইকুমুস সালাম ঈশাল। কেমন আছেন আপনি? ট্যুর কেমন ছিল? রাগ কমেছে এখন আপনার?”
ঈশাল মৃদুঃ মাথা নেড়ে বলল –
” আলহামদুলিল্লাহ দাদাজান, ভালো আছি। ট্যুর খুব ভালো ছিল কিন্তু আমি আপনাদের সবাইকে খুব খুব মিস করেছি।”
প্রতিউত্তরে সবাই মৃদু হেসে উঠলো।
” আপনি বুঝি ঈশালের বন্ধু? বাহ্, ভারী মিষ্টি দেখতে তো আপনাকে। মেহেরুন ঠিকই বলেছিল, পুরো মায়ার রাজ্য।”
একপলক মেহেরুন্নেসার পানে চোখ তুলে তাকালো ঝুম। যে বর্তমানে খাওয়ায় ব্যস্ত। দৃষ্টি তার থেকে সরিয়ে এবার ঈশালের দাদীর পানে দিলো ঝুম।
” আসসালামু আলাইকুম। আরীবা ঝুম আমার নাম।”
” মাশাআল্লাহ। খুব মিষ্টি নাম। শুনলাম আপনি নাকি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন বিয়েতে?”
আড় চোখে ঈশালকে দেখে, হালকা মাথা নাড়িয়ে ছোট করে উত্তর দিলো –
” জ্বি।”
” বেশ! বন্ধুর বিয়েতে খুব মজা করুন। কোনো সমস্যা হলে আমাদের জানাতে সংকোচ করবেন না।”
” আচ্ছা।”
” জানেন দাদিজান ঝুমঝুমি করাচি আরও একটি কাজে এসেছে।”
ঈশালের কথায় এবার সবাই প্রশ্ন নিয়ে তাকালো। এতক্ষন ধরে খেতে ব্যস্ত মেহেরুন্নেসাও এবার চোখ তুলে তাকিয়েছে।
” ঝুমঝুমির বাংলাদেশে কাপড়ের ব্যবসা। ওর নিজের শপ আছে। তাছাড়া পেজ ও আছে একটা। তার জন্য ও পাকিস্তানি ড্রেস এক্সপোর্ট করতে চাইছিল। আমি বললাম, যেহেতু আমার বিয়েতে আসতেই হবে এখানে এসে দেখে বুঝে কিনে নিও। আমরা সবাইতো আছিই। কি বলো তোমরা ঠিক করেছি না?”
“একদম ঠিক করেছেন আপনি।”
দাদাজানের কথায় সবাই সায় জানিয়ে খাওয়ায় মন দিল।
খাওয়া শেষে ধীরে ধীরে বাসার সকলের সাথে পরিচিত হল ঝুম। যতটা ভয় সে পেয়েছিল তেমন কিছু তার সাথে হয়নি। বরং ভালই লেগেছে।
করাচি আসার প্রায় ৫ দিন কেটে গেছে। কতশত ব্যস্ততা আর অনেক অনেক স্মৃতির মাঝে দিন গুলো তার বেশ গেলো। এই বাড়ির মানুষ গুলো ভীষণ অমায়িক। ঈশালের সাহায্যে তার কেনা কাটা খুব সহজভাবে শেষ হয়েছে। এরই মধ্যে সে একবার বলেছিল বাংলাদেশে ব্যাক করার কথা, তাই নিয়ে মেয়েটা যে কি রাগটাই না করলো। বিয়ে শেষ না করে কোনো ভাবে যাওয়া যাবে না। কতো করে যে বুঝালো বাংলাদেশে যাওয়া খুব জরুরী। বিয়ের এখনো ১৩ দিন বাকি, এতোগুলো দিন অনেকটা সময়। জিনিস গুলো যতো তাড়াতাড়ি নিয়ে যাওয়া যায় ততো ভালো। কিন্তু কেউ তার কথা শুনল না। উল্টো বড় আণ্টি নিজ দায়িত্বে পার্সেল বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। কোথাও না কোথাও এতো ভালোবাসা আর এমন মিষ্টি একটা পরিবার ছেড়ে ঝুমের মনও যেতে চাইছিল না। খুব অল্প সময়ে সবাই তাকে যেভাবে আপন করে নিল, এভাবে তার পরিবারও কখনো তাকে ভালোবাসেনি। এই বাড়ির প্রতিটি মানুষ সুন্দর মনের। বিশেষ করে মেহেরুন্নেসা। না জানি কেন, ঝুমের প্রতি তার আলাদা এক টান কাজ করে। সে কখনো বুঝতে দেয় না বা বলে না কিন্তু ঝুম বুঝতে পারে। সে তাকে ভালোবাসে, যত্ন নেয়, তার প্রতি না বলা এক অধিকারবোধ দেখায়। মূলত ঈশাল আর মেহেরুন্নেসার জন্য সে চাইলেও বাংলাদেশে যেতে পারেনি। এখানে সবাই তাকে ভালোবাসে যত্ন নেয় কিন্তু ঈশাল আর মেহেরুন্নেসা তার প্রতি একটু বেশিই ভালোবাসা জাহির করে। ঝুমও মেহেরুন্নেসার মাঝে মায়ের ভালোবাসা খুঁজে পায়। ঈশাল তার থেকে ২ বছরের ছোট হয়েও এমন ভাবে তাকে আগলে রাখে তখন ঝুমের মনে হয় ঈশাল তার বড় বোন।
ঈশালের বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। তার আত্মীয়রা দূরদূরান্ত থেকে আসা শুরু করেছেন। সকলের মাঝে ঝুম খুব অসস্তিতে পরে যায়। যদিও এখনো একের আশা বাকি গুটিকয়েক মানুষ এসেছে তাও এতো মানুষের মাঝে নিজেকে অসহায় লাগে। তাইতো বেশির ভাগ সময় ঈশালের পাশে পাশে থাকে। যদি সে ব্যস্ত থাকে তাহলে মেহেরুন্নেসার পিছে পিছে ঘুরঘুর করে। যার দরুন তার অনেক কিছু শেখা হচ্ছে। ব্যবসার ব্যাপারে তার থেকে মেহেরুন্নেসার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। আজকাল ঈশালের থেকেও মেহেরুন্নেসার কাছাকাছি তাকে বেশি পাওয়া যায়। মেহেরুন্নেসা ও তাকে আস্কারা দেয়। মুখে কিছু না বললেও তার সঙ্গ যে সে উপভোগ করে সেটা তার মুখভঙ্গিতে স্পষ্ট ফুটে ওঠে। খুঁটি নাটি সেও ঝুমকে পয়েন্ট পয়েন্ট করে বুঝিয়ে দেয়। যেন মা তার মেয়েকে বিয়ের আগে সংসারের খুঁটিনাটি শিখিয়ে দিচ্ছে।
সে দিনের কথা,
ঈশালের রুমে সারা, ঈশাল, মিশাল আর ঝুম বসে আড্ডা দিচ্ছিল। হঠাৎ মিশাল বলল –
” ঝুম আপি, আপনি সবসময় এমন হালকা রঙের শাড়ি পরেন কেন?”
মিশালের প্রশ্নে সবার দৃষ্টি তখন ঝুমের ওপর। সারা আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করলো –
” তাই তো। তাছাড়া যেখানে আমাদের আম্মিরা সালোয়ার সুট পরে সেখানে আপনি সবসময় শাড়ি কিভাবে ক্যারি করেন? আম্মি তো বলল আপনাদের দেশে নাকি এখন শাড়ি পরার তেমন রেওয়াজ নেই।”
” হুম ঠিক বলেছে বড় আণ্টি। আমাদের দেশে আগে মেয়েরা শাড়ি পরলেও এখন সবাই সালোয়ার সুট কিংবা ওয়েষ্টার্ন পরে। আসলে আমি অনেক ছোট থেকে শাড়ি পরি। উমমম…আমার যখন ১৩ বছর বয়স তখন থেকে। আর হালকা রং গুলোতে আমি শান্তি পাই তাই এসব রং ব্যবহার করি।”
হালকা হেসে নম্রভাবে উত্তর দিলো ঝুম। কেউ লক্ষ্য না করলেও ঈশাল ঠিকই বুঝতে পারল এই বিষয়ে প্রশ্ন করার পর থেকে ঝুম কেমন চুপসে গেছে। মাঝে মাঝে মেয়েটাকে ওর রহস্যময়ী মনে হয়। নিজের ব্যাপারে কোনো কিছু খুলে বলতে চায় না। ঈশাল বুঝতে পারে কোনো ব্যাপারতো আছেই যার জন্য ঝুম সবসময় এভাবে নিজেকে গুটিয়ে রাখে। তাও ও ঝুমকে ফোর্স করে না। ওর বিশ্বাস একদিন ঠিক ও বলবে, সেই সময়ের অপেক্ষা শুধু।
ওদের আড্ডার মাঝে হঠাৎ মেঘের গর্জন কানে আসলো। মুহূর্তে মিশাল আর ঈশাল হইহই করে বৃষ্টিতে ভিজতে যাওয়ার কথা বলে বসলো। সারা ৭ মাসের ভরা পেট নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে পারবে না বলে সে তার রুমে রেস্ট করতে চলে গেলো। দুবোন ঠিক করলো তারা আজ খুব করে সেজে বৃষ্টিতে ভিজবে। বিয়ের আগে এটাই তাদের শেষ বৃষ্টিতে ভেজা বলে কথা। আবার কবে এমন সুযোগ হবে বলা যায় না। ঝুম বেডের ওপর আরাম করে বসে গালে হাত দিয়ে তাদের দুজনকে দেখছে। মিশাল ছুটলো তার রুমে তৈরি হতে। ঈশাল নিজের জন্য সুন্দর একটি ড্রেস বের করে ঝুমের পানে চাইলো। তারপর কোনো কথা না বলে ঝুমের লাগেজ ঘেঁটে খুবই সাদা মাটা মেরুন রঙ্গা একটি শাড়ি বের করে তার হাতে ধরিয়ে ইশারায় বুঝালো পরে নিতে। অতঃপর নিজে চলে গেলো ওয়াশরুমে চেঞ্জ করতে। ঝুম কিছুক্ষন শাড়িটির দিকে তাকিয়ে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। শাড়িটা তার এসিস্ট্যান্ট আসার সময় হয়তো দিয়েছিল, নাহলে এমন রংচঙ্গা শাড়ি ও পরে না বহু বছর হলো। তার ভাবনার মাঝে ঈশাল ওয়াশরুম থেকে চেঞ্জ করে বের হয়ে
বলল –
” দেখতো ঝুমঝুমি কেমন লাগছে আমাকে?”
” মাশাআল্লাহ। হুরপরী লাগছে তোমাকে।”
কিছুটা লজ্জা পেয়ে ঈশাল
বলল –
” যাহ্, বেশি বেশি বলছো তুমি। এবার যাও তুমি শাড়িটা পরে আসো। জলদি ওঠো।
একপ্রকার ঠেলে ঝুমকে ওয়াশরুমে পাঠালো। ও জানে তা নাহলে মেয়েটা নিজে থেকে উঠবে না। বড্ড উদাসীন নিজেকে নিয়ে। নিজের প্রতি তাঁর বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। অথচ এই অল্প সময়ে কেমন মায়ায় বেঁধে ফেলেছে তাদের।
দীর্ঘ প্রায় ১৫ মিনিট পর ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দে ঈশাল পিছন ফিরে চাইলো। এতক্ষন সে সাজতে ব্যস্ত ছিল। সাজতে তার খুব ভালো লাগে। মিশাল আবার তার থেকেও বেশি সাজতে পছন্দ করে। পিছু ফিরে এক নতুন ঝুমঝুমিকে দেখে সে বিস্ময়ে হতভাগ। এই রংটাতে কি দারুন মানিয়েছে মেয়েটাকে। অথচ সবসময় কিসব রং পরে থাকে যেন স্বামী মারা গেছে, যত্তসব।
ঝুম ইতস্ততবোধ করছিলো। অনেক বছর হলো এসব রং শরীরে জড়ায় না। যদিও সে শাড়ি পরায় পটু। ৫/৭ মিনিটে শাড়ি পরতে পারে, তাও আজ খুব মন চাইলো যত্ন করে সুন্দর করে শাড়িটি পড়তে।
” মাশাআল্লাহ, ঝুমঝুমি কি মিষ্টি লাগছে তোমায়। আল্লাহ্ মালিক আমিতো আবার ফিদা হয়ে গেলাম তোমায় দেখে। বিশ্বাস করো ছেলে হলে তুলে বিয়ে করে নিতাম, তাও ছাড় দিতাম না তোমায়।”
ঝুমের কাদে হালকা ধাক্কা দিয়ে ঠাট্টা করে বলল ঈশাল। ঝুম লজ্জা পেয়ে হাসলো।
” আসো আসো তোমায় সাজিয়ে দি। লেট হলে বৃষ্টি মিস করবো।”
” না না আমি এভাবেই ঠিক আছি ঈশাল। মুখে কোনো কিছু ব্যবহার করতে পরি না আমি। খুবই সেন্সিটিভ স্কিন আমার। শেষে ফেইসে পিম্পল হয়।”
ভীষণ দুঃখী শোনালো ঝুমের কন্ঠ।
” আচ্ছা আচ্ছা কোনো ব্যাপার না। চল তাহলে যাওয়া যাক। তুমি ছাদে চলে যাও আমি মিশালকে ডেকে আনি। এই মেয়েটা সাজতে বসলে দিন দুনিয়া ভুলে যায়। পারবে তো একা?”
“পারবো”
আবারো সেই ছোট উত্তর। মেয়েটা একটু বেশি কথা বললে কি হয়? এতো মেপে কথা বলে কেন? এত্তো মিষ্টি কণ্ঠের মালকিন হয়েও কেন যে কথা বলে না কে জানে। বিড়বিড় করতে করতে ঈশাল করিডোর পরিয়ে মিশালকে ডাকতে চলে যায়। তার যাওয়ার পানে নীরব দৃষ্টি ফেলে আস্তে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে ঝুম। তার হাঁটার তালে পায়ের নূপুর গুলো ঝুনঝুন শব্দ তুলে গান গেয়ে ওঠে। এতো দিন এই বাড়িতে আছে কিন্তু আজ প্রথম এই বাড়ির ছাদে যাচ্ছে। বৃষ্টি মুখর আবহাওয়ার সাথে নূপুরের দারুন শব্দে পরিবেশটা যেন আরো মুখরিত হয়ে উঠল। সিঁড়ি ঘরের দরজায় এসে তার পা দুটো থেমে গেল। আজ আকাশ কাদঁছে, খুব কাদঁছে। বাইরে প্রচুর বৃষ্টি। ছাদের মেজেতে বৃষ্টির বড়বড় ফোঁটা দেখে ঝুম নিজের পারিপার্শিক দুনিয়া ভুলে বসলো। ভুলে গেলো বিগত দিনে তার সাথে কি হয়েছে। ভুলে বসলো নিজেকে। সে আবার সেই ছোট্ট বাচ্চাটি হয়ে গেলো, যে তার মায়ের আদরে বড় হয়েছে। যার জীবনটা এতো কঠিন ছিল না। একপা একপা করে ঝুম ছাদের মধ্যিখানে গিয়ে দাঁড়ালো। দুহাত তুলে ওই বিশাল আকাশে নিজেকে উজাড় করে দিলো। সুখ – দুঃখ মিলে একাকার করে দিলো।
বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা ঝুম দেখলো না ছাদের অন্যপাশের চিলেকোঠায় দাঁড়িয়ে কেউ অবাক নয়নে তাকে দেখে যাচ্ছে। তার প্রতিটি ভাবভঙ্গি, চলন, পায়ের তালে নেচে ওঠা নূপুর আর ঘন লালচে লম্বা চুলের দোলন আবার মাঝে মাঝে দু হাতে হাত খোপা করার বৃথা চেষ্টা সবটাই যে কেউ সূক্ষ্ম নজরে দেখে গেলো সে জানতেও পারল না।
” ঝুমঝুমি তাড়াতাড়ি চলো বড় চাচি আম্মা চলে এসেছেন। তোমাকে ভিজতে দেখলে বকবে খুব। জলদি চলো।”
” বড় আণ্টি? এতো তাড়াতাড়ি কেন আজ? আর তোমরা এতক্ষন কোথায় ছিলে?”
” পরে শুনবে এখন জলদি চলো।”
হন্তদন্ত হয়ে মেয়েলি পাজোড়া ছাদ থেকে ছুটে নিচে নেমে গেল। তার পায়ের তালে হওয়া নূপুরের শব্দটুকু ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাওয়া ছাদের ওপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা শুধু শুনে গেল, টু শব্দটি করলো না। ওমন ভিজে শরীরে যেকোন মেয়েই পরপুরুষের সামনে অপ্রস্তুত হয়ে পরবে ভেবেই হয়তো চুপ ছিল বা অন্য কিছু। কিন্তু মেয়েটিকে? আগেতো বাড়ির করো সাথে তাকে দেখা যায়নি। নাকি গেছে, শুধু সেই কখনো দেখেনি। ঈশালের সাথে ছিল মানে ঈশালের পরিচিত কেউ?
নূপুরের রিনঝিন শব্দে সে বাইরে এসেছিল। অথচ এখন তার পা চলছে না। বড্ড হাঁসফাঁস লাগছে, শরীর টলছে। ৩১ বছরে এই প্রথম কাউকে দেখে সে থমকে গেছে। অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পাচ্ছে না সে। এ কি হলো তার? আরও একবার ছাদের দরজায় চোখ বুলিয়ে সে চিলেকোঠার সেই ছোট্ট ঘরটাতে প্রবেশ করল।
বাইরে ঝুম বৃষ্টি অথচ তার প্রচুর গরম লাগছে। হাত বাড়িয়ে এসির রিমোট নিয়ে টেম্পারেচার কমিয়ে ৯ এ নামালো। তারপরও তার হাঁসফাঁস লাগা কমছে না। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। চটজলদি বেড সাইড টেবিল থেকে গ্লাস তুলে পানি খেয়ে নিলো। নাহ্, তাও গলা ভিজছে না। কিছু না ভেবে পানির জগ তুলে পানি খাওয়া শুরু করলো। ফলস্বরূপ, গোল গলার ওভার সাইজড টি শার্টের অনেকটা পানিতে ভিজে গেল। মুহূর্তে অতিযত্নে বিল্ড করা শরীরের সাথে টি শার্টটি আঁটসাঁট হয়ে বিধে রইলো। নিঃশ্বাস নিতে পারছে না কেন? বুকে ব্যাথা করছে? হ্যাঁ, করছে হয়তো। এই যে হার্ট বিট অত্যাধিক ফাস্ট চলছে। শরীর যে তার ভীষণ খারাপ করছে তা একজন ডাক্তার হিসেবে বুঝতে তার সময় লাগলো না। ঘনঘন নিঃশ্বাস নিয়ে ফোনটা তুলে হাতে নিয়ে কল লাগল।
” আম্মাহ, উপরে আসেন প্লিজ। মরে যাচ্ছি আমি। আহিরকে বলুন গাড়ি বের করতে, হসপিটালে যেতে হবে।”
মেহেরুন্নেসা মাত্র হলরুমে প্রবেশ করেছিল। এতদিন পর ছেলে আসার সংবাদ পেয়ে আজ জলদি বাড়ি ফিরেছে। ভেবেছিল বাড়ি ফিরে আগে ছেলের কাছে যাবে কিন্তু তার মাঝেই তাকে ফোন করে বসল।
” আব্বা…আব্বা কি হয়েছে আপনার। আব্বা আপনি ঠিক আছেন? আহির, আহির, কোথায় আপনি। আমার আব্বা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কে কোথায় আছেন?”
বলতে বলতে সে ছাদের দিকে ছুট লাগলো।
” আব্বা কি হয়েছে আপনার।”
বুকে হাত দিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল সে –
” আম্মা এখানে খুব ব্যাথা হচ্ছে। নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। আমি মনে হয় মরে যাচ্ছি আম্মা। এই যাত্রায় বেঁচে ফিরলে শাইয়ান রেহমান আনসারী ওনাকে ছাড়বে না বলে দিবেন। এর শাস্তি ওনাকে পেতে হবে।”
ছেলের কথার আগামাথা কিছু না বুঝলেও, ছেলের কষ্টে তার মাতৃ মন কেঁদে উঠলো। ততক্ষনে বাড়ির অন্য লোকেরাও চলে আসলো। সবাই মিলে শাইয়ানকে নিচে নামিয়ে আনে। ঝুম বৃষ্টিতে ভেজা শাড়ি বদলে ততক্ষনে করিডোরে এসে দাঁড়িয়েছে। লক্ষ্য করলো সবাই মিলে কাউকে বাইরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কি হচ্ছে না বুঝলেও মেহেরুন্নেসাকে এই প্রথম এতো বিধ্বস্ত দেখে অবাক না হয়ে পারল না।
ঈশালকে দেখা গেল চিন্তিত মুখে উপরে আসতে।
” নিচে কি হয়েছে ঈশাল? বড় আণ্টি কান্না করছিল কেন? খারাপ কিছু হয়েছে? সবাই ঠিক আছেন তো?”
” বড় ভাইজান হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাকে নিয়ে সবাই হসপিটালে গিয়েছে ঝুমঝুমি। ভাইজান নাকি আজ ভোরে বাড়ি ফিরেছে। কাউকে কিছু না জানিয়ে চিলেকোঠায় গেছিল। এতক্ষন ওখানেই তো ছিল শুনলাম। হঠাৎ কি হলো বুঝতে পারছি না। বড় ভাইজানের মতো মানুষ এভাবে অসুস্থ হয়ে পরবে এটা তো মানাই যাচ্ছে না। আচ্ছা ঝুমঝুমি তুমি তো ছাদে ছিলে কিছু জানো?”
” উনি ছাদে ছিল? আল্লাহ্, আমিতো খেয়াল করিনি কিছু। আর ছাদে যে চিলেকোঠা আছে তাও তো জানি না আমি ঈশাল।”
Remedy part 1
অনেকটা মন খারাপ করে বলল ঝুম। মেহেরুন্নেসার জন্য তার খারাপ লাগছে। তার মতো ওমন স্ট্রং মানুষকে ভেঙে পরতে দেখে কষ্ট হলো ঝুমের। সে দোয়া করল আল্লাহর নিকট লোকটাকে যেন সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেয়।
অথচ বোকা ঝুম বুঝতে পারল না, যার জন্য সে দোয়া করল সে ফিরে আসলে তাকে শেষ করে ছাড়বে।
