Home Remedy Remedy part 15

Remedy part 15

Remedy part 15
মীরা রায়াদ

সেদিন কথা বলার পর শাইয়ানের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। যদিও সে বলেছিল নেটওয়ার্ক ইস্যু হতে পরে কিন্তু ঝুমের মন মানছে না। যখন থেকে মেয়েটা শুনেছে কাশ্মীরের কথা তখন থেকে ভয়ে আতকে থাকে। সারাক্ষণ দোয়া পড়তে থাকে। আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালার নিকট শাইয়ানের সুস্থতা কামনা করে। মেহেরুন্নেসা যতবার মেয়েটাকে শাইয়ানের জন্য ছটফট করতে দেখে ততবার তার ভালো লাগায় মন ছুঁয়ে যায়।
গতমাসের ২৯ তারিখে সারা এক কন্যা সন্তানের মা হয়েছে। বাড়ি জুড়ে খুশির বন্যা। ঝুম হাপুস নয়নে তাকিয়ে থাকে বাচ্চাটির দিকে। সারা ও তার মেয়েকে বাসায় আনার পর থেকে ঝুম বাচ্চাটার কাছে বসে কি যে এতো দেখে সে নিজেও জানে না। বারকয়েক প্রশ্ন করলো বাচ্চাটা নড়ে না কেন? শব্দ করে না কেন? মেহেরুন্নেসা তখন হেসে উত্তর দিয়েছিল –

” প্রথম ২/৩ মাস বাচ্চারা শুধু ঘুমায়। আসতে আসতে ওরা হাত – পা নাড়ায়।”
ঝুম বুঝে ছিল কিনা সেই জানে। কিন্তু শাইয়ানকে এই সুখবর দেয়ার জন্য বড্ড উতলা ছিল সে। অথচ শাইয়ানের কোনো খোঁজ নেই। এমন পরিত্যক্ত এলাকায় সে আছে, যেখানে বিদ্যুৎ পাওয়া সোনার হরিণের মতো। দিন যায় রাত যায় শাইয়ানের সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে কেঁদে রাত কাটায় ঝুম। ঝুমের মন খারাপ দেখে আহির ঈশালকে এবাড়ি এসে কিছু দিন থেকে যেতে বলল। সত্যি বলতে তার এখন খারাপ লাগছে ঝুমের জন্য। কিন্তু শাইয়ানকেও দোষ দেয়া যায় না। সে পারলে ঠিকই যোগাযোগ করতো। আহিরের বুদ্ধি কাজে দিলো। ঝুম ওকে পেয়ে দীর্ঘদিন পর কিছুটা ভালো সময় কাটালো। সকলের সাথে গল্প করলো, আড্ডা দিলো। সেদিন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছিল। বাড়ির তিন মেয়ে আর বউ মিলে ঈশালের ঘরে গল্প করছিল। দরজা বন্ধ করে চার জন গল্পের জমজমাট আসর বসিয়েছে। মিশাল দারুন গান গাইতে পারে। তার গানের গলা অসাধারণ। কিন্তু পরিবার থেকে গান গাওয়ার অনুমতি নেই। সে বিশেষ আগ্রহ ও দেখায় না। মাঝে মধ্যে বন্ধুদের আসরে কখনো কখনো গাওয়া হয়। সারা যখন বলল মিশাল গাইতে পারে তখন থেকে ঝুম আপদার করে বসলো গান শুনবে। মিশাল ও বলল, সে গাইতে পারে কিন্তু এরপর ঝুমকে নাচতে হবে। ঝুম না না করলেও তার কথা বিশেষ আমলে নিল না কেউ। মিশাল তার জাদুকারী গলায় দারুন একটা পাকিস্তানি গান গাইলো।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“যো তু নাহি তো অ্যায়সা ম্যায় চেহরা
কে জিসকি খু্বসুরতি মান্দ্ পাড়ি হো
অ্যায়সা ম্যায় দারিয়া, জো বেহ্‌না না চাহে
যো তু নাহি তো অ্যায়সা ম্যায় চেহ্রা
কে জিসকি খু্বসুরতি মান্দ্ পাড়ি হো
অ্যায়সা ম্যায় দারিয়া, জো বেহ্‌না না চাহে”

মন্ত্রমুগ্ধের মতো সবাই তার গান শুনতে লাগলো। ঝুমের হঠাৎ শাইয়ানের কথা ভীষণ মনে পরছে। গানটায় এতো বেদনা কেনো সে জানে না। কিন্তু তার খুব কান্না পাচ্ছে।
মিশালের গান শেষ হতেই ঈশাল ব্যস্ত হয়ে উঠল ঝুমের নাচ দেখার জন্য। ঝুম নাচতে পারে। খুব সুন্দর করে নাচে। ছোটো থেকে তার নাচতে ভালো লাগে। একা একা চেষ্টাও করতো। কিন্তু তারপর সব থেমে যায়। কিছু মানুষের কটূ কথার জন্য ছেড়ে দেয়। যেহেতু সে নাচতে ভালবাসে তাই আর বারণ করলো না। দীর্ঘ প্রায় ৯ বছর পর সে আবারও নাচের জন্য নিজেকে তৈরি করলো। কোমরে শাড়ির আঁচল গুঁজে উঠে দাড়ালো। বাইরে এখন মুষলধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। জানালার পর্দা সব টেনে দেয়া। ঘর আবছায়া আলোতে আলোকিত। ঈশাল ফোন নিয়ে ছুটে ঝুম যেখানে দাড়ানো তার ঠিক বিপরীত পাশে গিয়ে দাড়ায়, পুরোটা ভিডিও করবে বলে। ঝুম নাচলো, বহুদিন পর মন দিয়ে নাচলো। ঈশাল পুরোটা ফোনে ধারণ করে নিল। তারপর দুষ্টু হেসে শাইয়ানকে পাঠিয়ে দিলো। এই ভিডিও দেখার পর শাইয়ানের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে ভেবেই তার মজা লাগছে।

শাইয়ান ভিডিওটি দেখলো আরো দুসপ্তাহ পর। কুপওয়ারা থেকে বেশ কিছুটা দূরে এক শহরে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে গিয়ে সে ডেটা কানেক্ট করে। ঈশালের আগে থেকে ভিডিও পাঠিয়ে দেয়ার দরুন ইন্টারনেট কানেকশনের সাথে সাথে নোটিফিকেশন আসে। কৌতুলি শাইয়ান ভিডিও তে ক্লিক করে হ্যাং হয়ে যায়। নিশ্বাস বন্ধ করে পুরোটা দেখে সে। ছোট হোটেল রুমের সিঙ্গেল বেডে ফোন সমেত বুকে হাত দিয়ে শুয়ে পড়ে। ডানহাত তখনো বুকে চেপে ধরে বামহাত দিয়ে ঝুমের নাম্বারে কল দিলো। এইমেয়ের আজ কিছু একটা করতেই হবে। নিজে দূরে দূরে থাকে ভালো কথা, কিন্তু তাকে এতো পড়াচ্ছে কেন?

” হ্যালো, ডক্টর। কেমন আছেন আপনি? কোনো খোঁজ নেই কেন? কথা বলুন ডক্টর। জানেন কতো চিন্তা হচ্ছিল? আপনার সাথে কতবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছি পারিনি। কি হয়েছিল? কোথায় ছিলেন আপনি? কথা বলছেন না কেন? হ্যালো… হ্যালো। ডক্টর শুনতে পাচ্ছেন আমার কথা? হ্যালো।”
” আরীবা।”
এতক্ষনের অস্থির ঝুম শান্ত হয়ে গেলো। বুকে হাত দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। তার বুক কাপছিল চিন্তায়।
” হুম।”
শাইয়ান কোনো তারা না দেখিয়ে মিহি কন্ঠে বলল –
” আপনি কি আমাকে মেরে ফেলতে চান?”
ঝুম ভড়কে গেলো। সে মারতে চাইবে কেন শাইয়ানকে? লোকটা কি জানে তাকে ছাড়া ঝুম পাগল হয়ে যায়? জানলে হয়তো কখনো এভাবে বলতো না।

” এমন কেন বলছেন ডক্টর? আমি কি কিছু করেছি?”
ঝুমের কন্ঠস্বর ভীষণ অসহায় লাগলো। শাইয়ান নীরবে হাসলো।
” শুনুন মেয়ে। এবার আমি ফিরলে আপনাকে নিজের কাছে নিয়ে আসব। কোনরূপ না শুনবো না। ক্যাম্পে আসতে না হলে এবারই সাথে করে নিয়ে আসতাম। জোর করে হলেও আনতাম। আপনার বিরহে দিন দিন আমি উন্মাদ হয়ে যাচ্ছি তা কি আপনার চোখে পড়ে না? যতক্ষন আপনাকে বুকে নিয়ে পিষে ফেলতে না পারছি ততক্ষন শান্তি পাচ্ছি না।”
” ছিঃ।”
ঝুম ভারী লজ্জা পেলো। এসব কেমন কথা বলছে লোকটা? কি হয়েছে? এমন কেনো করছে?

” কি হয়েছে ডক্টর?”
” আপনাকে খুব মনে পড়ছে বউ।”
‘ বউ ‘! আহা। ঝুম চোখ বন্ধ করে অনুভব করলো তার জন্য শাইয়ানের ব্যাকুলতা।
” ফিরবেন কবে ডক্টর?”
” কেনো মিস করছেন আমাকে?”
শাইয়ানের কন্ঠে দুষ্টুমি। ঝুম বুঝলো অথচ সে সহজ উত্তর দিলো।
” হুম।”
শাইয়ান অবাক হলো ঝুমের স্বীকারোক্তিতে। ভালোও লাগলো তার। ঝুম যে তার সাথে আস্তে ধীরে সহজ হচ্ছে এটা ভেবে ভালো লাগছে।
” আর কিছু দিন অপেক্ষা করুন মেরিজান। এখানে আর কয়েকটা দিন থাকতে হবে। তারপরই আপনাকে নিজের কাছে নিয়ে আসবো। আমার যে আর আপনাকে ছাড়া একা ভালো লাগছে না।”
ঝুম লাজুক হাসলো। নিজেকে সদ্য প্রেমে পড়া কিশোরী লাগছে। অথচ সে ২৫ বছরের পূর্ণাঙ্গ নারী। সেদিন তারা দীর্ঘক্ষণ কথা বলল। তাদের বিয়ের এতগুলো মাসে সেদিন প্রথম তারা সময়ের চিন্তা না করে একে অন্যকে ভালোবেসে প্রেমালাপ করলো। ঝুম তখনো জানতো না তার জীবনে কি ঝড়টাই না আসতে যাচ্ছে।

সকালবেলা সবাই নাস্তা করে যে যার কাজে বেরিয়ে পরলো। বাড়িতে তখন ঝুম, বাড়ির মেজবৌ আর ছোটবৌ ছিল। তিনজন কান্নাঘরে কাজ করছিল আর গল্প করছিল। গল্পের ফাঁকে অসতর্কতায় সবজি কাটারত অবস্থায় ঝুম নিজের হাত কেটে ফেলল। ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়তে দেখেই তার মাথা ঘুরে গেল। আহিরের মা না ধরলে এতক্ষনে পরে আরো এক বিপদ ডেকে আনতো। হাতে ব্যান্ডেজ করে দেয়ার পর ঝুম বসার ঘরে টিভি ছেড়ে বসলো। আজ তার মনটা বিশেষ ভালো নেই। সেদিনের পর আবারো শাইয়ানের খোঁজ নেই। যদিও শাইয়ান বলেছিল ওখানে নেটওয়ার্ক সমস্যা, তাই চিন্তা না করতে। সে ফিরে কল দিবে। তাও ঝুমের চিন্তা হয়। কবে ফিরবে সেই অপেক্ষা করে। আবার আজ ভোরে পঁচা একটা স্বপ্নও দেখেছে। কি দেখেছে স্পষ্ট মনে নেই। শুধু মনে আছে, অনেক রক্ত দেখেছে। প্রচুর রক্ত। সে দুহাতে রক্ত মেখে কাদছিল। এমন স্বপ্ন দেখার পর সে আর ঘুমাতে পারেনি। এখন আবার সত্যি সত্যি হাত কেটে রক্ত মেখে বসে আছে। বিরক্ত লাগছে তার। একেরপর এক টিভির চ্যানেল বদলাতে বদলাতে কিছু একটা দেখে তার হাত থেমে গেলো। সে বিশেষ উর্দু পড়তে পারে না, কিন্তু এখন ভালই বুঝতে পারে। টিভিতে বড়বড় হেডলাইনে উর্দুর সাথে ইংলিশে স্পষ্ট লেখা, কুপওয়ারা আর্মি ক্যাম্পে জঙ্গি হামলায় ডক্টর, সেনা ছাড়াও বেশ কিছু সাধারণ জনগণ নিহত ও আহত।

কুপওয়ারা? শাইয়ান ওখানে ক্যাম্পে গেছে না? শব্দ করে কেঁদে উঠলো ঝুম। ঝুমের কান্নার শব্দে ঈশালের মা আর আহিরের মা ছুটে আসলো। ঝুম তখন মেঝেতে বসে আকুল হয়ে কাদঁছে। মনে হচ্ছে তার কলিজা ছিঁড়ে ফেলেছে কেউ। ঈশালের মা বারকয়েক জিজ্ঞাসা করলো কি হয়েছে? কিন্তু ঝুম উত্তর দেয়ার অবস্থায় নেই। এর মাঝে আহিরের মা ও কেঁদে ফেলল। ঈশালের মা ঝুমকে ছেড়ে তার কাছে গেলে সে হাতের ইশারায় টিভিতে চলা নিউজ দেখলো। ঈশালের মা ভালো করে দেখে নিয়ে কেঁদে দিলেন। আল্লাহ্ তাদের এ কোন বিপদে ফেললেন। কাদতে কাদতে মেঝেতে বসে কান্নারত ঝুমকে দেখলো। মেয়েটার তো কিছু দিন হলো বিয়ে হয়েছে। স্বামীর সাথে সংসারটাও করতে পারেনি ঠিক করে। আল্লাহ্ শাইয়ানকে যেন সুস্থ রাখে এই প্রার্থনা করলেন তিনি। এরই মাঝে আহির বাড়ির মূল দরজা দিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করলো। সে মূলত একটা ফাইল নিতে এসেছে। অফিসে বসে তার মনে পড়েছে, সেটা বাড়িতে রয়ে গেছে। তাই নিতে এলো। কিন্তু বাড়ি এসে সবার কান্না দেখে চিন্তায় পরে গেলো। ছুটে এসে ঝুমের পাগলের মতো কান্না দেখে ভয় পেল। কি হয়েছে প্রশ্ন করার আগে সে নিজেই নিউজটা দেখে ফেলল। কলিজায় কামড় দিলো যেন কেউ। গতবার ক্যাম্পে গিয়ে শাইয়ানের গায়ে গুলি লেগেছিল। এবার বেঁচে ফিরবে তো? সে দ্রুত মা চাচীকে শান্ত করলো। পরপর ঝুমের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলল –

” ভাবি। ভাবি তাকান আমার দিকে। কিছু হয়নি। শান্ত হোন ভাবি। শাইয়ান যদি জানতে পারে আপনি এভাবে কাদছেন, তাহলে কিন্তু বকবে খুব। প্লীজ কান্না থামান। আর হাতে কি হয়েছে? আপনি কি চাচ্ছেন নিজের সাথে সাথে আমাকেও বকা শুনাতে? ভাবি এভাবে কাদবেন না। শাইয়ান একদম ভালো আছে দেখবেন।”
ঝুম চোখ তুলে তাকালো আহিরের দিকে। তার চোখ ভর্তি পানি। মেয়েটা ভীষণ ভয় পেয়েছে। তার জীবনেই কেন এতো কষ্ট? কেন সব সময় আল্লাহ্ তার থেকেই সব প্রিয় জিনিস কেড়ে নেয়? শাইয়ানের কিছু হলে সে কি করবে তখন? কি নিয়ে বাঁচবে? কে তাকে ভালবাসবে, যত্ন নিবে?
” ভাইয়া। আমাকে একটু নিয়ে যাবেন ওনার কাছে?”
কান্নার দরুন ঝুম ঠিক করে কথা বলতে পারছে না। তার নিশ্বাস আটকে আসছে। সেও কি মরে যাবে? যাক। তাহলেই তো ভালো।

” ভাবি অবুঝ হবেন না। শান্ত হোন। আগে জানি পুরোটা কি হয়েছে তারপর না হয় যাবো।”
” প্লীজ ভাইয়া। এটাই শেষ, আপনাকে আর বিরক্ত করব না। আপনি যা বলবেন শুনবো। আপনি বললে আপনার সব কাজ করে দিবো। আমাকে বোকা বানিয়ে মজা পেলে তাও কিছু বলবো না। আপনাকে আর কখনো বখাটে বলব না। ভাইয়া আমাকে একটু নিয়ে যাবেন ওনার কাছে? একবার শুধু প্লীজ। আমি আপনার পায়ে পড়ছি।”
বলতে বলতে সত্যিই ঝুম আহিরের পা ছুতে নেয়, কিন্তু আহির দ্রুততার সাথে সরে যায়। সে অবাক হচ্ছে ঝুমকে দেখে। মেয়েটা শাইয়ানকে এত ভালোবাসলো কবে? কি করুন ভাবে একবার নিয়ে যাওয়ার জন্য ভিক্ষা চাইছে। ঈশালের মা আর আহিরের মা নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। মেয়েটার কান্নায় তাদের মন কাদঁছে। কি হবে যদি শাইয়ানের কিছু হয়?

” আম্মা আমি ভাবিকে নিয়ে শাইয়ানের সিএমএইচ এ যাচ্ছি। ওখানে গিয়ে আগে খোঁজ নিয়ে দেখি। কাশ্মীরের দিকে এখন যাওয়া নিরাপদ না। বড় চাচী আম্মা এলে ওনাকে জানাবেন। আর আপনারা চিন্তা করবেন না আমি যোগাযোগ করব আপনাদের সাথে।”
তারপর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে যেমন অবস্থায় ছিল সেভাবেই বেরিয়ে পড়ল নিজস্ব গাড়ি নিয়ে। শাইয়ান বর্তমানে সিএমএইচ মুলতানে কর্মরত আছে। ওখান থেকেই ক্যাম্পে গিয়েছিল। এটি পাঞ্জাবের মুলতান শহরে অবস্থিত। করাচি থেকে যেতে প্রায় ১৪/১৫ ঘণ্টা সময় লাগে। আহির, ঝুম বর্তমানে সেদিকেই রওনা হয়েছে। পুরোটা রাস্তা ঝুম কেঁদেছে। কাদতে কাদতে মাঝে ৩ বার বমি করে জ্ঞানও হারিয়েছে। আহির ভীষণ অসহায় হয়ে পড়েছিল তখন। ঝুমের মতো স্ট্রং মেয়ে যে এভাবে ভেঙে পড়বে তার ধারণা ছিল না। শাইয়ান টা এ কি করলো? আজ শাইয়ানের কিছু হলে মেয়েটাকে বাঁচানো যাবে না বেশ বুঝতে পরলো আহির। যেখানে পৌঁছাতে ১৪/১৫ ঘণ্টা লাগে সেখানে তাদের ২০ ঘণ্টা লাগলো ঝুমের অসুস্থতার কারণে।

পর দিন ভোর 7 টায় তারা কম্বাইন্ড মিলিটারি হসপিটাল মুলতানের গেটে গিয়ে গাড়ি থামালো। ঝুম তার টলমলে শরীর নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে ছুট লাগালো হসপিটালের দিকে, কিন্তু গেটে অবস্থানরত গার্ডরা তাকে ভিতরে প্রবেশ করতে দিলো না। সে বারকয়েক অনুনয় – বিনয় করলো কিন্তু তার কথা শুনল না। না পরতে সে রাস্তায় বসেই কেঁদে ফেলল। আহির ছুটে এসে তাকে কোনো ভাবে টেনে তুলল। ঝুম শব্দ করে কেঁদে বলল –
” ভাইয়া ওনাদের বলুন আমাকে জেতে দিতে। আমি দেখতে চাই আমার ডক্টরকে। নয়তো আমি মরে যাবো ভাইয়া। ওনাদের বলুন আমাকে একটু ভিতরে যেতে দিতে।”
” ভাবি শান্ত হোন। এখানে কিছু নিয়ম আছে ভাবি। যে কেউ ঢুকতে পারবে না। অনুমতি লাগে। আপনি একটু দাঁড়ান আমি দেখছি।”

আহির ফোন বের করে শাইয়ানের কাছের এক কলিগ ডাক্তারকে কল লাগালো। তাকে সবটা বুঝিয়ে বললে, সে বলল দেখছে। ঝুম তখনো কাদঁছে। চিন্তায় তার মাথা কাজ করছে না। আর কিছুক্ষন সে এভাবে থাকলে শরীর থেকে তার রুহ বিদায় নিবে। কয়েকমুহূর্ত পর দেখা গেলো কেউ ছুটে আসছে। পরপর গেট খুলে গেলো। ঝুম চোখ তুলে দেখলো গেটের ওপাশে তার ডক্টর। সে আর কিছু না ভেবে ছুটে শাইয়ানকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলো। শাইয়ান ভয় পেয়েছে ঝুমের এভাবে কান্নায়। কি হয়েছে যে এত ভোরে ঝুম এখানে? ঝুম কিছু বলতে চাইলো হয়তো, কিন্তু পারল না। শরীরের সবটা ভয় ছেড়ে দিয়ে আবারও জ্ঞান হারালো। শাইয়ান ভয়ে দুহাতে জড়িয়ে নিলো মেয়েটাকে। তার চোখে মুখে আতঙ্ক। আহিরও ছুটে এসেছে ততক্ষনে। ঝুমকে আবারও জ্ঞান হারাতে দেখে ব্যস্ত হয়ে বলল –

” রাস্তায় ৩ বার বমি করেছে সন্ধ্যার দিকে একবার জ্ঞান হারিয়ে ছিল। কাল সকাল থেকে কেঁদেই চলছে থামাথামি নেই। কিছু করো।”
শাইয়ান ঝুমের এই অবস্থা দেখে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়েছে। অবুঝ গলায় শুধালো –
” কেন?”
আহিরের মেজাজ চড়ে গেলো। এই প্রথম তার শাইয়ানকে বিরক্ত লাগছে। রাগে কিটমিট করতে করতে বলল –
” ভালো যখন রাখতেই পারবে না তখন মেয়েটাকে বিয়ে করেছিলে কেন জোর করে? উনি তোমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল? খুব তো বলো ভালোবাসো, অথচ দায়িত্ব নেয়ার বেলা তোমার খোঁজ নেই। জানো মেয়েটা কি কি সহ্য করেছে কাল থেকে তোমার জন্য? আহাম্বক একটা। বউকে তোলো আর চিকিৎসা করাও। ডাক্তার হয়েছো কিছু তো কাজের কাজ করো।”
শাইয়ান কিছুই বলল না আহিরকে। জানে সিরিয়াস কিছু না হলে আহির কখনো এভাবে রিয়েক্ট করবে না। তাছাড়া ঝুমের পার্লস চেক করে বিশেষ ভালো ঠেকলো না। তাই কথা না বাড়িয়ে দুহাতে কোলে তুলে নিলো ঝুমকে। ফিরে এসে গার্ডদের বলল –

” শি ইজ মাই ওয়াইফ, মিসেস শাইয়ান রেহমান আনসারী। নেক্সট টাইম এভাবে হেনস্থা করতে যেন না দেখি। গট ইট?”
সে গার্ডের উত্তরের অপেক্ষা করল না। গটগট পায়ে হসপিটালের ভিতর চলে এলো। ওদেরও দোষ নেই। এটা ওদের দায়িত্ব। তাই শাইয়ান তেমন কিছু বলল না। হসপিটালে এনে ঝুমকে নিয়ে নিজের কেবিনের সাইড বেডে শুইয়ে দিলো। একজন নার্সকে ডেকে প্রয়োজনীয় চেক আপ শেষে স্যালাইন, কিছু মেডিসিন আমার নির্দেশ দিলো। শাইয়ানের হাত পা কাপছে আবার। মেয়েটাকে ভালোবেসে সে দিন দিন দুর্বল হয়ে পরছে। সামান্য একটা ইঞ্জেকশন দিতেও তার ভয় করছে। মেয়েটা এত দুর্বল কেনো? একটু কিছু হলেই ব্লাড প্রেশার কমে যায়। হার্ট বিট আসতে চলে।

এভাবে হলে তো সমস্যা। তার বাচ্চাদের দুনিয়াতে আনবে কি করে? তাছাড়া তার মতো মানুষের বউ এতো দুর্বল হৃদয়ের হলে তো হবে না। তার যে পেশা, যখন তখন কিছু একটা হয়ে যেতে পারে। এই মেয়ে সামলাবে কি করে তখন? নার্সের আনা ওষুধ গুলো ঝুমকে দিয়ে দুই ভাই এসে চেয়ারে বসলো। আহিরের মুখভঙ্গি এখনো গম্ভীর। সে এরই মাঝে বাড়িতে ফোন করে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে শাইয়ান ঠিক আছে। ঝুমের অসুস্থতার কথা সে এখনো কিছু বলেনি। যার বউ সে দেখুক। তার এসব ভালো লাগছে না। আহির ঝুমের পানে চাইলো। আজ যদি মেয়েটার কিছু হয়ে যেতো? সেতো ভেবে ছিল মেয়েটাকে এতটা পথ বাঁচিয়ে রাখা যায় কি না সন্দেহ। চোখ কুঁচকে বিরক্তিকর ভঙ্গিতে আহির চাইলো শাইয়ানের দিকে। মন চাচ্ছে কানের নিচে দুটা দিতে। কিন্তু সে পারবে না।
শাইয়ান দেখছিল আহিরকে। তাকে দেখেই বুঝতে পারছে বেশ ক্ষেপেছে। অথচ শাইয়ানকি করেছে তাইতো জানে না সে। না পারতে এবার প্রশ্ন করে
ফেলল –

” কি হয়েছে বলবে?”
” কি হয়নি তাই বলল। কুপওয়ারাতে জঙ্গি হামলা হয়েছে জানো?”
শাইয়ান মাথা নাড়ালো। সে জানে। আহির এবার দ্বিগুণ রেগে গেল।
” দেশের নিউজ চ্যানেলগুলোতে সেগুলো দেখাচ্ছে। আর তোমার বলদি বউ তাই দেখে মরতে মরতে এখন হসপিটালে। তুমি এত দায়িত্ব জ্ঞানহীন কিভাবে হয়ে পারো শাইয়ান? এখানে আছো একবার বলতে পারতে না? জানো মেয়েটার কি অবস্থা হয়ে ছিল? আমি তো ভেবেছিলাম মরে যাবে। ওনার কথা ছাড়ো না হয়। বাড়িতে প্রতিটা মানুষ কতো চিন্তা করেছে ধারণা আছে? তোমার ফোন কোথায়? আহাম্বক লোক। কতো বার করে ফোন দেয়া হয়েছে তোমাকে?”

আহির রেগে কি বলছে সে জানে না। শুধু জানে তার অত্যধিক রাগ হচ্ছে। ঝুমের জন্য কষ্ট হচ্ছে। সে ভুল করেছে। এই ছেলের জন্য মেয়েটার মনে ভালোবাসা আনাটাই ভুল। তাই এখন ভুগছে। অসহ্য।
” শান্ত হও আহির। আমি আজ ভোর রাত ৩ টায় এসেছি এখানে। কাশ্মীর থেকে ফেরার পর হামলা হয়। আসার পথে ছোট খাটো এক্সিডেন্টের সম্মুখীন হই আমরা। সেখানেই আমার ফোনটা হারিয়ে বসেছি। আঘাত লাগায় ক্লান্ত ছিলাম। তাছাড়া অনেক রাত হওয়ায় আর ফোন করে বিরক্ত করতে চাইনি। ভেবেছিলাম ঘুম থেকে উঠে করবো কিন্তু তার আগেই এসব। ”
আহির এবার কিছুটা শান্ত হলো।
” বেশি ব্যাথা পেয়েছ?”
শাইয়ান হেঁসে ফেলল। তার ভাইটা অন্যরকম। তাকে ভীষণ ভালবাসে। এখন হয়তো সেই তালিকায় ঝুম ও জায়গা করে নিয়েছে।

” ধন্যবাদ আহির। আমার অনুপস্থিতিতে আমার বউয়ের খেয়াল রাখার জন্য।”
আহির ফিরে চাইলো ঝুমের দিকে। ওভাবেই শাইয়ানকে বলল –
” ওনাকে আমি ভাবি কম বোন বেশি মনে করি শাইয়ান। ঈশাল, মিশালের থেকেও বেশি আপন মনে করি। মেয়েটা যখন ভাইয়া ডাকে বুকে শান্তি লাগে। আদুরে মেয়েটাকে তুমি সামলাও কি করে? কি ভীষণ জেদী।”
শাইয়ান ঝুমকে এক পলক দেখে নিয়ে বলল –
” জানি।”
” হ্যাঁ, তুমি তো জানবেই। তুমি ছাড়া কে জানবে? বিয়ের বয়স দুমাসের বেশি এখনো বউ কাছে ঘেষতে দেয় না। এথেকে বোঝা যায় কতটা জেদী।”
শাইয়ান মুখ কুঁচকে খোঁচাটা হজম করে নিলো। যতই হোক এতোদূর ড্রাইভ করে তার বউকে নিয়ে এসেছে, সেতো আর অকৃতজ্ঞ হতে পারে না।
ড্রয়ার থেকে একটি চাবি বের করে আহিরের দিকে ছুঁড়ে মারল। আহির ক্যাচ ধরতে শাইয়ান বলল –

Remedy part 14

” কোয়ার্টারে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নাও। আমি খাবার পাঠানোর ব্যবস্থা করছি।( ঝুমের দিকে ফিরে ) ওনার স্যালাইন শেষ হলে আমরা আসছি।”
আহির মাথা নাড়িয়ে চাবির গোছা এক আঙ্গুলে ঘুরাতে ঘুরাতে গুনগুনিয়ে চলে গেলো। সে এখানে আগে আরো একবার এসে ছিল। তাই সবটাই চেনা। আহির চলে যেতেই শাইয়ান উঠে দরজা লাগালো। তারপরই দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে জ্ঞানহীর ঝুমকে ঘুমন্ত অবস্থায় জড়িয়ে ধরে টপাস টপাস কয়েকটা চুমু খেয়ে ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল –
” সরি বউ। আবারও সরি।

Remedy part 15 (2)