যাত্রাপথ পর্ব ২১
মাশফিত্রা মিমুই
বিয়ের দিন প্রায় নিকটে। এরই মধ্যে চুপিচুপি একদিন শাহ বাড়ির বউরা এসে আংটি পরিয়ে দিয়ে গিয়েছে মিছরির হাতে। ফর্সা, স্বাস্থ্যবান হাতে সেই সোনার আংটিটা যেন দ্যুতি ছড়াচ্ছে। জানান দিচ্ছে, মেয়েটি যে এখন অন্য কারো নামের সাথে বন্দি। আর মাত্র দিন কয়েকের অপেক্ষা শুধু।
বিয়ের কার্ড ছাপানো প্রায় শেষ। গ্ৰামবাসীসহ আত্মীয়, অনাত্মীয় সকলের নিকট চলে গিয়েছে নিমন্ত্রণ পত্র। তা নিয়েই বর্তমানে আলোচনা চলছে। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বাড়ির উঠোন কিংবা হাটেও এখন এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়টিই হয়ে গিয়েছে মুখরোচক। এত বছরের শত্রুতার কী সমাপ্তি ঘটছে? এই তবে শালিসে সবার বিরুদ্ধে গিয়ে শত্রু পক্ষের মেয়েকে নাজির শাহর রক্ষা করার কারণ?
দুই হাতে লুঙ্গি উঁচিয়ে দোকান পার থেকে ফিরছিল মাসুম। তখনি পেছন থেকে বিদ্রুপের সহিত ডাক এলো,“আরে শালাবাবু যে! আসসালামু আলাইকুম।”
কণ্ঠস্বরের মালিক যে কে তা পেছনে না দেখেও সহসা চিনে ফেলল মাসুম। মেজাজ কদিন ধরে খুব খারাপ তার। বাড়ির সবার সাথেই কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। এর মধ্যে এই আপদটার সাথে আর ঝামেলায় জড়াতে চাইলো না। তাই পূর্বের মতো হাঁটতে লাগলো। পুনরায় পেছন থেকে ডাক এলো,“কী রে, দুলাভাইরে উপেক্ষা কইরা চইলা যাস! শিক্ষা- দিক্ষা নাই নাকি?”
ঘাড় চুলকে থেমে দাঁড়ালো মাসুম। চোয়াল শক্ত করে পিছু ঘুরে রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চালিয়ে বললো, “হারামজাদা, দুলাভাই কেডা?”
“ক্যান? আমি।” নাজিরের অধরে হাসি।
“কেমনে?”
“তিনদিন পর তোর বোইনের লগে বিয়া না?”
“এহনো বিয়া হয় নাই, আগে হোক।”
“তা সময় মতন হইয়া যাইবো। তুই চাপ নেইস না।”
“মিছরি আমার ছুডো বোইন। বিয়া হইলেও আমি তোর শালা হমু না, সম্বন্ধি হমু। তাই সম্মান আমি না, তুই দিবি হারামখোর।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
হাসি মিলিয়ে গেলো নাজিরের অধর থেকে। কথাটা মোটেও পছন্দ হলো না। বললো,“আমি মানি না।”
“তোর মানা না মানায় কিছু আইয়ে যায় না। নির্লজ্জ ব্যাডা। তোর মতো দামড়ার লগে আমার ছুডো বোইনরে মানায়? কেমনে বিয়া করতে রাজি হইলি? আমার দাদাজানরে পটাইলি কেমনে? জানোয়ার।”
“তুই জানোয়ার। নাজিরের এত সময় আছে তগো মতো হাবাইত্তাগো পটানোর? পটাইছে তো তোর দাদায়। দুই সপ্তাহ আমার পিছন ঘুরঘুর করছে শুধুমাত্র তোর বোইনরে বিয়ার লাইগা। হুনছি, মাইয়া নাকি কেউ পছন্দ করে না? একবার দেইখাই ফিরা যায়? আমার আবার দয়ার শরীর। তাই রাজি হইয়া গেছি।”
“তুই? তাও আবার দয়া? সর হারামজাদা। দরকার পড়লে পঙ্গুর লগে বিয়া দিমু তবুও তোর লগে আমার বোইনের বিয়া দিমু না।”
“তুই তো বহুত খারাপ! একেবারে আমার বাপের মিহি নজর দেস! তুই দেওয়া না দেওয়ার কেডা? তোর বোইন এই নাজির শাহর ঘরেই আইবো। তাই সম্মান দিয়া কথা কইবি। যাইগা, অনেক কাম পইড়া রইছে।”
ব্যস্ততা দেখিয়ে নাজির চলে গেলো উল্টো পথে। রাগে শরীর কাঁপছে মাসুমের।
আষাঢ়ের বিদায় নেওয়ার পালা। প্রকৃতি থেকে শুরু করে বাড়িঘর পর্যন্ত নতুন রূপে সেজে উঠেছে। চারিদিকে কেমন এক উৎসব উৎসব আমেজ। আকাশ জুড়ে দ্যুতি ছড়াচ্ছে রূপোর থালার মতো পূর্ণ একটি চাঁদ। ঠিক এমনই এক জোৎস্নামাখা রাতেই ফাহমিদার বিয়ে হয়েছিল। দিন গড়িয়ে, মাস গড়িয়ে এমন দিনেই আবার শুরু হয়ে গিয়েছে মিছরির বিয়ের আয়োজনও। ফাহমিদা আর পলি তার দুই হাত ভরে মেহেদী পরিয়ে পায়ের কাছটায় যেতে উদ্যত হতেই জেসমিন বাঁধা দিলো,“পায়ে মেন্দী দিও না। বিয়ার দিন আলতা পরামু। ফর্সা পায়ে সুন্দর লাগবো।”
ভাবির কথায় তারা থামলো। ফাহমিদা এসেছে আজ সকালে। মাহবুব বিদ্যালয় থেকে ছুটি পায়নি। তাই সে আসবে একেবারে গায়ে হলুদের দিন। যার কারণে বাপের বাড়ি পর্যন্ত ভাসুরের ছেলেই তাকে পৌঁছে দিয়ে গেছে। মিছরির নানাবাড়ি থেকে শুধু বড়ো মামা আর তার পরিবার ব্যতীত বাকি সকলেই এসেছে। তবে এবারের বিয়েতে বাড়ির ছেলেদের মধ্যে তেমন একটা হইচই, আনন্দ দেখা যাচ্ছে না। মাসুম ব্যতীত বাকি সবাই মনে মনে এই বিয়ে না মেনে নিলেও দাদার ভয়ে মুখে টু শব্দটি করছে না।
পলি কনুই দিয়ে গুঁতা মারলো ছোটো ননদের বাহুতে। দুষ্টু হেসে বললো,“আর মাত্র দুইদিন। তারপর আমগো রসগোল্লা জামাইর বাড়ি চইল্যা যাইবো। কেমনে সংসার করবা, মিছরি?”
মিছরি নীরবে শুনছে। হাঁসফাঁস করছে ভেতরটা। ইচ্ছে করছে হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে। কত করে বাবা-মাকে বললো, বিয়ে সে করবে না। তবুও বাবা তার কথা শুনলো না। এমনকি দাদীও না। উল্টে দিলো জ্ঞান। শুনিয়ে দিলো বিয়ের তাৎপর্য। ফাহমিদা বোনের অবস্থা বুঝলো। এই সময়টা তো সেও পার করে এসেছে! তবে আশ্বাস দিতে পারে না। নাজির শাহকে সে চেনে। যদিও তার সাথে কখনো কথা পর্যন্ত বলেনি তবুও ভাইদের মুখে শুনেছে, লোকটা আস্ত শয়তান। ছোট্ট মিছরি কী ওই লোকের সাথে সুখী হতে পারবে কখনো? শত্রুতা ভুলে আদৌ কী ভালোবাসতে পারবে? তার বুদ্ধিমান দাদা যে কেন এমন একটা সিদ্ধান্ত নিলো! অথচ পারভেজ ঘটিত কাহিনীর জন্য তিনিই কিনা দ্রুত বিয়ে দিয়েছিলেন ফাহমিদার।
স্থানটি ফাঁকা হতেই সে নিচু স্বরে বললো,“মন খারাপ করিস না, মিছরি। কার ভাগ্যে কী আছে একমাত্র আল্লাহ ভালো জানেন। দোয়া করি, তুই অনেক সুখী হবি। নাজির শাহ স্বামী হিসাবে কেমন হইবো তা আমি জানি না। তবে নিজের অধিকার, সুখ নিজেই আদায় কইরা নিবি। কহনো কোনো ছাড় দিবি না। বুঝছোস?”
“আমি এই বিয়ে করবো না, আপা।”
“এইসব কইতে নাই। আমিও তো করতে চাই না। কিন্তু হুনছে কেউ? তবে আমি ভালো আছি। তোর দুলাভাই খুব ভালো মানুষ।”
সেকথা মিছরির শ্রবণালী পর্যন্ত পৌঁছায় না। সে নাক টানে। চোখে জমে অশ্রু। বহুদিন আগে সেই যে শালিসে নাজিরকে একপলক দেখেছিল। তারপর আর দেখা হয়নি দুজনার। না হওয়ার অবশ্য কারণ আছে, সে তো বাড়ি থেকেই বের হয়না। মাঝরাত পর্যন্ত মেহেদী পর্ব চললো। তারপর অনুষ্ঠান, গল্প গুজব শেষে সবাই ঘরে চলে গেলো ঘুমাতে।
নানা কায়সার ইসলাম এবং নানী সেলিনা সবে শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আচমকা দরজায় টোকা পড়ল। বৃদ্ধ লুঙ্গিতে গিঁট দিতে দিতে দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। নাতিকে দেখে কিছুটা অবাক হলেন বোধহয়। জিজ্ঞেস করলেন,
“এত রাইতে তুই?”
“ভিতরে আসমু?”
“আয়।”
জায়গা দিতে দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়ালেন তিনি। মাসুম প্রবেশ করল ভেতরে। খাটে বসলো, ঠিক নানীর সামনে। সেলিনা তাকে দেখে হাসলেন,“ঘুম আইয়ে না, ভাইয়ে? বোইনে শ্বশুরবাড়ি যাইবো গা দেইখা খারাপ লাগতাছে?”
তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলো না মাসুম। তাড়াহুড়াও করল না। মেয়ের ঘরের নাতিদের মধ্যে সবচেয়ে রগচটা, মুখের উপর কথা বলে দেওয়া ছেলেটাই হচ্ছে মাসুম। অথচ আজ তার মুখভঙ্গি দেখে ললাটে ভাঁজ পড়ল কায়সার ইসলামের। পাশে বসে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হইছে, নানা?”
“মিছরির বিয়াডা কোনোভাবে আটকান যায় না, নানা? কেউ আমার কথা হুনে না। দাদাজান ক্যান এমন করতাছে? নাজিররে আমি সহ্য করতে পারি না। মিছরি আমগো কত আদরের, কও তো? ওর লগে ওই পোলা কী যায়? তুমি একবার সবার লগে কথা কও, নানা। প্রয়োজন পড়লে আরিফের লগে বিয়া দিয়া দেও, তবুও নাজির শাহ না।”
“তুই কী ভাবছোস, আমি কই নাই? তোর বাপ, দাদা সবার লগে কথা কইছি কিন্তু লাভ হয় নাই। তোর বাপ কইলো, তার আব্বায় নাকি বুইঝাই সিদ্ধান্ত নিছে। আর তোর দাদায় কইলো, এর পিছনে পারিবারিক কারণ আছে। নাতিনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তার বেশি। হেরপরে আর আমি কী কমু? দেহোস না, তোর বড়ো মামায় আইয়ে নাই। ক্যান আইয়ে নাই? সেই সাত বছর বয়স থাইকা মাইয়া আমগো কাছে রইছে। অথচ আমগোই এহন কুনো দাম নাই।”
মাসুমের শেষ আশার আলোটাও ধপ করে নিভে গেলো। নানা আরো অনেক অভিযোগ করলেন। সে শুধু মেঝের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে চুপচাপ শুনলো।
শাহ বাড়িতে বহু বছর পর সমস্ত আত্মীয়-স্বজন এসে ভিড় জমিয়েছে। শেষ এই বাড়িতে ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছিল সামিউলের। তাও প্রায় এগারো, বারো বছর পূর্বে। নওশাদেরটা তো কোনোমতে দেওয়া হয়েছে শুধু। মাটির বাড়িঘর নতুন করে কালো মাটির প্রলেপ দিয়ে লেপা হয়েছে। উঠোন লেপা হয়েছে গোবর দিয়ে। আমিরুল শাহও সেই সুযোগে রং করিয়েছেন বাড়িতে।
স্টিলের আলমারির সামনে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সোনার গয়না বের করে খাটে সাজিয়ে রাখলেন ফরিদা। স্বামীর উদ্দেশ্যে বললেন,“এইগুলা সব আমার পারভেজের বউয়ের লাইগা উডাইয়া রাখছিলাম। এহন কী করি, কন তো? বড়ো বউরে তো বিয়ার সময়ই সব বুঝাইয়া দিছিলাম। কাইল আবার নাজিরের বিয়া। যত দায় সব আমার।”
আমিরুল শাহ বিছানায় আরাম করে বসে থুথুর সাহায্যে টাকা গুনছেন। বিয়ের সমস্ত খরচ সত্যি সত্যি তাদের দুই ভাইকেই বহন করতে হচ্ছে। নাজিরটা ভারি ফাজিল। ঠিক নিজের ভাগটা বুঝে নিচ্ছে। নাও করতে পারেননি। শত্রু বাড়ির সামনে লজ্জায় মাথা কাটা পড়বে বলে। ব্যস্ত কণ্ঠে বললেন,“কী আর করবা? যা আছে সব দিয়া দেও। পা থাইক্যা মাথা পর্যন্ত স্বর্ণ দিয়া মুড়াইয়া কাশেমের মাইয়া ঘরে তুলমু। পুরা গেরামবাসী যাতে মনে রাখে এই বিয়া।”
“সব দিয়া দিমু? কী কন এইগুলা?” মুখ ভার হলো ফরিদার।
“লোভ করিস না, বেডি। একেবারে দিয়া দিতে কই নাই। সবাইরে দেখাইয়া বিয়া আর বউ ভাত পর্যন্ত দে, পরুক। অনুষ্ঠান শেষ হইলে আবার নিয়া নিবি। কেউ জানবো না। আর নাজিরে তো তোমার কথাই একমাত্র হুনে।”
বুদ্ধিটা খারাপ নয়। স্বামী মানুষটা যেমনই হোক খারাপ বুদ্ধিতে সবার আগে। গয়না নিয়ে মেয়ে আয়েশার ঘরে চলে গেলেন তিনি। মেয়েটা গতকাল রাতেই স্বামী, সন্তান নিয়ে বাপের বাড়িতে এসেছে। তাও অনেক দিন পর। একান্নবর্তী সংসারে বিয়ে হওয়ায়, চারজন সন্তান থাকায় এ মুখো সহজে হতে পারে না। অনুষ্ঠান এলেই দেখা হয় সকলের সাথে।
হলুদের জন্য বাড়িতে প্যান্ডেল করা হচ্ছে। নাজির এতে ত্যাক্ত বিরক্ত। চেঁচিয়ে গোষ্ঠী উদ্ধার করছে নাজমুল আর পারভেজের।
“গোলামের পুত, নিষেধ করছি না এইসব করতে? আমি কী এহন মাইয়াগো লাহান মুখে হলুদ লাগাইয়া বইয়া থাকমু?”
“ষাঁড়ের মতো চিল্লাস ক্যান? তুই কোন নবাবজাদা যে হলুদ মাখবি না? মাখতেই হইবো। আমিও মাখছি।”
ভ্রু বাঁকিয়ে পিছু ফিরে তাকালো নাজির। সামিউলকে দেখে কুঁচকে নিলো মুখখানা। বললো,“তোমার লগে আমার জোড়া? আমি হলুদ মাখমু না।”
“তাইলে কী করবি?”
“বিয়া করমু। কাইল যামু, কবুল কইয়া বউ লইয়া বাড়ি আইয়া ঘুম দিমু। অনেকদিন ভালা কইরা ঘুম হয় না।”
“নির্লজ্জ।”
“নির্লজ্জের কী আছে? তুমি বুঝি বিয়ার পর থাইক্যা ঘুমাও না?”
“হাইনজা বেলা বাড়িত থাকবি কইয়া দিলাম। যা অনুষ্ঠান আছে সব পালন করবি। তোর হলুদ শেষে পোলাপাইন মাইয়াগো বাড়ি যাইবো মাইয়ারে হলুদ মাখাইতো।”
“এইসব নিয়ম আমি মানি না। বিয়াত খরচ যত কম ততই শান্তি। মসজিদে চলো, হুজুররে দিয়া ধর্মীয় মতে বিয়া পড়াইয়া দেও। এত নাটক ফাটক আমারে দিয়া হইবো না।”
“এইগুলা সামাজিক রীতি। দেখ নাজির, মাথা খারাপ করিস না। অবাধ্য হইলে চটকানা দিমু।”
“দেও দেহি, তোমার কত সাহস।” গাল এগিয়ে দিয়ে কটাক্ষের সুরে বললো নাজির। সামিউল সত্যি সত্যিই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে এগিয়ে যেতে লাগলো তার দিকে। এ অবশ্য নাজিরের মতোই ত্যাড়া, ঘাউড়া। সত্যি সত্যি মেরে দিতে পারে। তখন আবার বাকিদের সামনে মুখ দেখানোর মতো অবস্থায় থাকবে না সে। তাই সরে গিয়ে বললো,“ব্যস্ত আছি। তোমার লগে পরে কথা হইবো।”
“ক্যান? ডরাইছোস?”
“তোমার মতো ফটকারে নাজির শাহ ডরায় না।”
“আমি ফটকা?”
“কোনো সন্দেহ?”
“দাঁড়া হারামজাদা।”
নাজির দাঁড়ালো না। লুঙ্গি দুই হাতে শক্ত করে ধরে দৌড়ালো। সামিউলও কম যায় না। আজ যেন একে ধরেই ছাড়বে।
স্ত্রীকে নিয়ে নওশাদ বাড়ি এলো দুপুরের দিকে। ছুটতে ছুটতে তাদেরকে দেখেও তেমন একটা প্রতিক্রিয়া করল না নাজির। একসময় হাঁটু ধরে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগলো। সামিউলও আর কিছু বললো না। চাচাতো ভাই, দুলাভাই আর তাদের মামাতো ভাইয়েরা মিলে কাজে ব্যস্ত। আয়েশার স্বামী বদরুল হাতে ক্যামেরা আর ফ্রেম নিয়ে ঘুরছে। হলুদ সন্ধ্যার ছবি তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কাপড়ের ব্যাগগুলো বারান্দায় রেখে হাস্যোজ্জ্বল মুখে তাদের দিকে তাকালো নওশাদ। বড়ো ভাইকে ডাকলো,“ভাই, এসে পড়েছি।”
নাজির অদ্ভুত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো। বিয়ের পর থেকে ছোটো ভাইয়ের সঙ্গে তেমন একটা কথাবার্তা হয় না। আগে সপ্তাহে একটা হলেও চিঠি না পাঠালে হতো না অথচ গত দুই মাসে একটা চিঠিও সে নিজ থেকে পাঠায়নি। এমনকি নওশাদের তরফ থেকে চিঠি এলেও দেয়নি উত্তর। ত্যাছড়া স্বরে বললো,“ভালা করছোস। আয়, কোলে লই।”
মিল্টন ফিক করে হেসে দিলো। নাজিরের বিয়েতে সবচেয়ে খুশি এবং ব্যস্ত মানুষ সে-ই। পাত্রী পছন্দ না হলেও তার ভাইজান যে বিয়ে করছে এতেই সে সন্তুষ্ট। তার হাসিতে লজ্জাই পেলো বোধহয় নওশাদ। ফের একবার অপরাধবোধে জর্জরিত হলো মন। অজান্তেই যে কত বড়ো একটা আঘাত পিতা সমতুল্য বড়ো ভাইকে সে দিয়েছে তা কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারছে। লিলি বিরক্ত হলো। মুখ বাঁকিয়ে ভিটের দিকে হাঁটা ধরলো। প্রথম এসে পুরোনো মাটির ঘরে থাকায় চিনতে অসুবিধা হলো না।মেয়েটার মুখভঙ্গি নাজিরের দৃষ্টি এড়ায়নি। তাই শক্ত কণ্ঠে বললো,“নওশাদ! তোর বউরে ওইখানেই দাঁড়াইতে ক। এক পা আগাইলে তোর ঠ্যাং আমি ভাইঙা দিমু।”
আচমকা আচরণের বদল হওয়ায় সকলের দৃষ্টিই এসে স্থির হলো নাজিরের দিকে। নওশাদ অবাক হলো বেশ। লিলি পথিমধ্যে থেমে দাঁড়ালো। ভ্রু কুঁচকে তাকালো পেছনে। নাজির দু কদম এগিয়ে হাত দুটো পেছনে রেখে বললো,“শিক্ষিত মাইয়া মানুষ অথচ আদব-কায়দা নাই ক্যান? বাপ-মা সালাম দিতে শিখায় নাই? তা না শিখাইলে না শিখাক, মুখ ব্যাকাইছো ক্যান?”
লিলি ভড়কে গেলো। একপলক নওশাদের দিকে তাকালো। নওশাদের দৃষ্টি তার দিকেই স্থির। দৃঢ় কণ্ঠে বললো,
“কখন বাঁকিয়েছি?”
“এইমাত্র ব্যাকাইছো। আমগো দিকে তাকাইয়া চোখমুখ দজ্জাল মহিলা গো মতো কইরা ব্যাকাইছো।”
“ভাষা ঠিক করুন। একদম মিথ্যা বলবেন না।”
“আমি মিথ্যা কইছি? আমার ভাষায় ভুল ধরো? ওরে আমার শুদ্ধমারানি রে! আমি আর পাঁচটা নরম শরম ভাসুরের লাহান না। আমি মানুষটা সোজা। তোমার চোখ, মুখ ব্যাকানি তোমার জামাইরে দেহাইবা, আমগো না। শুধুমাত্র ছুডো ভাইয়ের বউ বইল্যা বেশি কিছু কইলাম না।”
লিলির ভীষণ রাগ হলো। দাঁতে দাঁত পিষে স্বামীর উদ্দেশ্যে বললো,“তোমার বউকে অপমান করছে আর তুমি চুপ করে শুনছো?”
“তো ওয় কী কইবো? সাহস আছে? মুখ ভাইঙা দিমু না আমি? পলাইয়া বিয়া করার আগে খবর নেও নাই তোমার জামাইয়ের যে বড়ো ভাই আছে? খবর না নিয়া বিয়া করছো ক্যান? চোখ কালা, মুখ কালা কারে দেহাও? সংসার করতে হইলে আচরণ ভালা মাইয়াগো মতো করো। এতদিন হইয়া গেলো অথচ বউরে আদব-কায়দা শিখাইতে পারোস নাই?” শেষের কথাটা ছোটো ভাইয়ের উদ্দেশ্যেই বললো সে।
নওশাদেরও স্ত্রীর প্রতি বিরক্তি বাড়লো। আসার পথে কতবার করে বলে দিয়েছে, কারো সঙ্গে অহংকার নিয়ে কথা বলবে না। আর মুখের অভিব্যক্তিও নরম, শীতল রাখবে। অথচ মেয়েটা শুনলো না। বিকৃতি করল তো করল তাও কিনা নাজিরের সামনেই? অহংকারী মানুষ আবার নাজির সহ্য করতে পারে না। মিনমিনে স্বরে নওশাদ বললো,“বয়স কম তাই ভুল করে ফেলেছে, ভাই। তাছাড়া অনেক দূর থেকে এসেছি তো!”
“বয়স কম কিন্তু আগেই পাইকা গেছে। যাই হোক, মাফ চাইতে ক।”
“মাফ কেন চাইবো? মগের মুল্লুক নাকি?” লিলির কণ্ঠে তেজ।
নাজিরও তার স্বরেই ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বললো,“আমি রাগলে কী হইবো জানোস তো? অকারণে এমন তেজ আমার সামনে চলবো না। নিজেরটা খাই। আর কহন, কেমনে, কারে সালাম দিতে হইবো তাও বউরে শিখাইয়া দেইস।”
নওশাদ স্ত্রীর উদ্দেশ্যে কঠিন গলায় বললো,“মাফ চাও ভাইয়ের কাছে।”
“চাইবো না।”
“অন্যায় যখন করেছো, মাফও চাইতে হবে।”
“আমি কিন্তু চলে যাবো বলে দিচ্ছি।”
নওশাদ থেমে গেলো। নাজির বিদ্রুপ করে বললো, “কী রে, হাওয়া ফুস? বউ এহনি কথা হুনে না তাইলে আগে পরে যে কী করে আল্লাহ জানে। যা, ঘরে যা। কপালে বহুত দুর্ভোগ লেখা আছে। যেইদিন দেখবি হেইদিন বুঝবি, ভাইয়ের কথা না হুনার ফল।”
আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে নওশাদ চলে গেলো ঘরে। লিলির উপর রাগটা বাড়লো। মেয়েটা সত্যিই অবাধ্য। অথচ বিয়ের আগে কত সাদাসিধেই না ছিল! আসলেই ছিল নাকি সবই অভিনয়? এই দুই মাসেই জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খেলো।
দিনের আলো ফুরিয়ে সন্ধ্যা গ্ৰাস করল ধরিত্রীকে। মুমিনুল শাহর দালানের পাশে বিশাল এক ফাঁকা স্থান। ওখানেই গায়ে হলুদের জন্য তৈরি করা হয়েছে মঞ্চ। ফরিদা হলুদ বেটেছেন। সামিউল, পারভেজ, নাজমুল জোর করে টেনে এনে নাজিরকে বসালো সেখানে। নাজির বিড়বিড় করে বকছে সবকটাকে। বিয়ের নামে এতসব রং তামাশা তার ভালো লাগছে না। এদিক থেকে নওশাদকে ভীষণ হিংসে হচ্ছে। ব্যাটা পালিয়ে বিয়ে করে ঠিক এসব অত্যাচারের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছে। আগে জানলে মিছরিটাকে পটিয়ে ভাগিয়ে আনা যেত।
ফরিদা এসে সর্বপ্রথম গালে হলুদ মাখিয়ে অনুষ্ঠান পর্ব শুরু করলেন। বদরুল ক্যামেরা তাক করে বললো,“শ্লা, হাসো দেহি!”
কথাটা যেন নাজিরের ভেতরে জ্বালা ধরিয়ে দিলো। পাঁশুটে মুখে বললো,“আমনে মিয়া আসলেই একটা বদ। একেবারে নামের লাহান। যেয় আমনের নাম বদরুল রাখছে তারে এক কেজি কুঁড়া উপহার দিমু।”
বদরুল রাগলেন না। শালাদের মধ্যে একমাত্র নাজিরের সাথেই বেশ জমে তার। যদিও লোকটা তেমন একটা সুবিধার নয় তবুও। একেক সময়ে পরপর তিনটা ছবি তুলে ক্ষান্ত হলেন তিনি। বউয়েরও তো আবার তুলতে হবে! বিয়ের তো এখনো বাকি! রিল শেষ হলে আছে মহাঝামেলা। রাজধানী ছাড়া ভালোটা পাওয়া যায় না।
মর্জিনা সুযোগ বুঝে নাজিরের সারা মুখে এক খাবলা হলুদ মাখিয়ে হাসলেন। কিছুটা দাঁতেও লেগে গেলো। থুথু ফেলল নাজির। চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,“বয়স তো কম হয় নাই। এবার ভালা হইয়া যান, চাচী। একটু শান্তি দেন। নিজের বিয়াত তো আমারে দাওয়াত দেন নাই অথচ শরমের মাথা খাইয়া আমার বিয়াত আইয়া পড়ছেন।”
“তুই তহন দুনিয়াত আছিলি রে, হারামজাদা?”
“তাই বইল্যা বিয়া বইবেন? অপেক্ষাও তো করতে পারতেন।”
“হ, তোর লাইগা কুমারী হইয়া বইয়া থাকতাম।”
“তা থাকবেন ক্যান? আমার চাচারে দেইখাই তো আমনের জিহ্বার লোল পড়তাছিল।”
“যেই না এক চাচা! তোর চাচায় আমার রূপ দেইখা আমার বাপের পিছন ছাড়ে নাই। পরে তোর দাদার আবদারে আমার বাপের মন গলছিলো।”
“অ্যাহ, চাপা।”
“নতুন জামাই বইল্যা তোরে কিছু কইলাম না।”
ঝগড়ার মধ্য দিয়েই তার গায়ে হলুদ শেষ হলো। সেই হলুদ নিয়ে বাকিরা রওনা দিলো কনের বাড়ির উদ্দেশ্যে। এই প্রথম বাড়ির কোনো অনুষ্ঠানে সরলার পরিবারকে আমন্ত্রণ করা হলো না। এই বিষয়ে অন্যান্য দুই কন্যাও কিছু বললো না। পিতার রাগ আর জবান সম্পর্কে তারা অবগত। বৃদ্ধ একবার যা বলেন তাই করেন। বরং কেউ তাঁর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গেলে তাকেই না আবার একই শাস্তি দিয়ে দেয়, কে জানে?
মিছরির বিয়েতে আয়োজনের কোনো কমতি রাখেনি বাপ, দাদা। বরং এটাই যেন এখন পর্যন্ত মাস্টার বাড়ির সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ বিবাহ। তবুও ভেতরে ভেতরে অনেকেই অসন্তুষ্ট। সুজাতা চারিদিকে দৌড়ে বেড়াচ্ছে খুশিতে। তার খুশির কারণ প্রিয় ফুফুর বিয়ে নয়। বরং খুশির কারণ বিয়ে হলেও ফুফু আর দূরে কোথাও যাচ্ছে না। এক গ্ৰামেই থাকবে। যখন তখন চাইলেই তাকে দেখা যাবে, খেলা যাবে।
বাজনা বাজাতে বাজাতে শাহ বাড়ি থেকে বরযাত্রী এলো হলুদ নিয়ে। চারিদিকে উৎসবমুখর পরিবেশ। পুরো গ্ৰামে লেগে গেলো হইচই। নারীরা এসে হলুদ লাগালো মিছরিকে। ছেলেগুলো সবকটা বাদর। এসে এমন লাফালাফি করল! সুজন, রুহুল, তালেব, মাসুম একপাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ শুধু ঠোঁট কামড়ে দেখে গেলো তা। তাদের এই নীরবতায় যেন আরো প্রশ্রয় পেলো সবকটা। ইচ্ছে মতো হইচই করে অনেক রাতে ফিরে গেলো বাড়ি।
মায়ের নিষেধাজ্ঞার পরেও ওই রাতের বেলাতেই গোসল সেরে ঘরে এসে খিল দিয়েছে মিছরি। নিস্তব্ধ নিশীথে বসে রইল জানালার ধারে। ধীরে ধীরে বাইরে বিদ্যমান সমস্ত কোলাহল থেমে গেলো। শুধু রইল ঝিঁঝিঁ পোকার গান। মিছরির চোখের পাতায় ঘুম আসছে না। আংশিক পরিচিত এক পুরুষকে বিয়ে করে অপরিচিত এক সংসারে যেতে হবে ভেবেই কান্না পাচ্ছে। রাত গভীর হতেই দরজায় টোকা পড়ল। ধক করে উঠলো তার বুক। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কান পাততেই শুনতে পেলো পরিচিত কণ্ঠস্বর,“মিছরি! ঘুমাইয়া গেছোস?”
সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে দিতেই ভেতরে প্রবেশ করল মাসুম। দরজা আটকে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললো, “ঘুমাস নাই?”
“না।”
“হাছা কইরা ক, এই বিয়াত তুই রাজি?”
অসময়ে অহেতুক প্রশ্নে ঠোঁট উল্টালো মেয়েটি। নাক টানলো। মাসুম যেন উত্তর পেয়ে গেলো। বললো,“চল তাইলে।”
“কোথায়?”
“বরিশাল। কাইল বিয়া। বাড়ি ভর্তি মানুষ ঘিচঘিচ করবো। তহন আর কিছু করার থাকবো না। আমি সবাইরে বুঝাইছি কিন্তু কেউ বুঝে নাই। এহন পলাইয়া যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নাই। ব্যাগ গোছা। আমি খোঁজ নিছি। একটু পর একটা ট্রেন আছে। ওইডায় কইরা একেবারে সদরঘাট যামু। হেরপর লঞ্চে কইরা বড়ো মামার বাড়িত নিয়া দিয়া আইমু তোরে।”
যাত্রাপথ পর্ব ২০
“দাদাজানের মানসম্মান নষ্ট হবে। তাই মা কিছু করতে নিষেধ করেছে।”
“তাগো সম্মানের গুষ্টি কিলাই। যারা নিজেগো মাইয়ারে স্বার্থসিদ্ধির লাইগা ব্যবহার করতে চায় তাগো সম্মান রক্ষার দায় আমগো না। হেগো দায়িত্ব না থাকতে পারে কিন্তু বড়ো ভাই হিসেবে আমার দায়িত্ব আছে। ব্যাগ গোছা। আর এই শাড়ি বদলা। উষ্টা খাইয়া পড়লে মাইর খাবি। আমি বাইরে আছি, তাড়াতাড়ি আয়।”
“কেউ দেখে ফেললে?”
“কেউ দেখবো না। সবাই ঘুমাইতাছে।”
মিছরি মাথা নাড়ালো। নিভে যাওয়া আশার আলো ধপ করে জ্বলে উঠলো। দরজা আটকে দ্রুত পোশাক বদলে সবকিছু গুছিয়ে নিলো সে। পৃথিবীর আর কেউ তাকে না বুঝলেও ছোটো ভাই যে বুঝবে তা সে জানতো।
