লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৩৭
Fatima Fariyal
ঢাকার আসন–৩ একসময় আয়ান রাজা মীর এর অবিসংবাদিত সাম্রাজ্য ছিল। রাজধানীর রাজনৈতিক দাবার বোর্ডে সে ছিল নিপুণ চতুরঙ্গ-চালক; ক্ষমতার গতি-প্রকৃতি তার হাতের ইশারায় দিক পরিবর্তন করত। ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে আমলাতন্ত্র, প্রশাসন, পেশাজীবী সংগঠন, প্রতিটি স্তরেই তার আধিপত্য স্থায়ীভাবে প্রোথিত ছিল। তার প্রজ্ঞা, কৌশল, দাপট সব মিলিয়ে তাকে জনতার কাছে রাজা উপাধি এনে দিয়েছিল। কিন্তু তার উত্তরসূরি তিন পুত্রের মধ্যে এ রাজনীতির আগুন সমানভাবে জ্বলেনি। বড় ছেলে সালমান মীর, খুবই শান্ত স্বভাবের, নিভৃতচারী চরিত্রের; ক্ষমতার মঞ্চে তার বিন্দুমাত্র আসক্তি ছিল না। অথচ মধ্যম পুত্র আমজাদ মীর ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। ছাত্র রাজনীতির মাঠে তার উত্থান ছিল বজ্রপাত-সদৃশ, সুদর্শন ও তেজস্বী যুবা হিসেবে সে দ্রুতই হয়ে ওঠে ছাত্রদলের সভাপতি। পরবর্তীতে তাকে জাতীয় পর্যায়ে উপদেষ্টা, এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চেয়ারের একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে দীর্ঘ এগারো বছর দেখা যায়। কিন্তু কনিষ্ঠ পুত্র আসফাক মীর, সে ছিল রাজনীতির মাঠে অনভিজ্ঞ, অদক্ষ। আয়ান রাজার অসন্তোষও তাই তাকে কেন্দ্র করেই ঘনীভূত ছিল।
এই তিনজনের বাইরে ছিল আহাদ রাজা মীর। একমাত্র আহাদকেই তিনি নিজের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি মনে করতেন। তার চোখের দৃষ্টিতে আহাদ ছিল রাজনৈতিক অগ্নিচিহ্ন, এমন তরুণ যার ভিতর প্রবল দহন রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই তিনি আহাদকে কৌশলে, কঠোরতায়, আদর্শে, দৃঢ়তায় গড়ে তুলেছেন; যেন এক ধাতব মনোবলসম্পন্ন উত্তরাধিকারী। সেখান থেকেই তিনি তাকে নিজের ‘রাজা’ উপাধি দেন আহাদ রাজা মীর, রাজনীতির রাজা হিসেবে স্বীকৃতি। ২১ বছর বয়সেই আহাদ রাজাকে তিনি পরীক্ষার আগুনে নিক্ষেপ করেন, বিভিন্ন দায়িত্ব, কঠিন পরিস্থিতি তার কাঁধে তুলে দিতেন আর আহাদ প্রত্যেক পরীক্ষায় বিস্ময়কর সফলতা দেখিয়ে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করে। ২৬ বছর বয়সে সে ছাত্র সংগঠনের সর্বোচ্চ পদে বিজয়ী হয়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তার খ্যাতি এবং আয়ান রাজার গর্ব।
কিন্তু সেই গর্বের মূল স্তম্ভ। সেই রাজনৈতিক মহাবট, আয়ান রাজা মীর, দুই বছর আগে হঠাৎই বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়। এক মঞ্চে গুলিবিদ্ধ হয়ে পতিত হন আহাদের চোখের সামনে। আহাদের শুভ্র পাঞ্জাবি মুহূর্তে র’ক্তর’ঞ্জিত হয়ে ওঠে। সে প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল তাকে বাঁচাতে, কিন্তু মৃ’ত্যু যার গন্তব্য ঠিক করে দেয়, তাকে আর আটকে রাখা যায় না। মৃ’ত্যু’র আগমুহূর্তে তার দাদুর কাঁপা গলায় বলা সেই কথাগুলো আজও আগুনের মতো জ্বলে তার বুকের ভেতর,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“বিশ্বাসঘা..তক…. আমার সাথে বিশ্বাসআঘাতকতা হয়েছে দাদু ভাই। ওদের ছাড়বে না, কা.. উকে ছাড়বে না!”
সেদিন আহাদ ছিল স্তব্ধ, অচল, বরফের মূর্তির ন্যায় জমে ছিল। কিন্তু আজ দুই বছর পর তার ভেতরের বরফ ভেঙে জেগে উঠেছে দহনশিখা। আজ সে পেয়েছে সেই বিশ্বাসঘাতককে তার দাদুর প্রাণনাশের মূল সূত্রধর, আয়ান রাজার ডানহাত হিসেবে পরিচিত মিজান নামের লোকটাকে। বহুদিন পলাতক থাকার পর অবশেষে তাকে আইন-শক্তির প্রভাব খাটিয়ে টেনে আনে আহাদ রাজা। ডেমো ঘরের দ্বিতীয় কক্ষের অগ্নিকুণ্ডের উপর উল্টো করে ঝুলছে মিজান নামের মধ্য বয়সী লোকটা। আগুনের কুণ্ডলী ভ’য়া’বহ’ভাবে তছনছ করে দিচ্ছে চারপাশের বায়ু। পাশে দাঁড়িয়ে আছে আহাদের ত্রয়ী, শাহীন, নাদিম আর শাওন। আহাদ রাজার চোখ সামনের আগ্নি শিখার মতই জ্বলছে। তার শিরা-উপশিরায় উত্তাল প্রতিশোধ। কোমর থেকে পি’স্ত’ল বের করা মাত্রই মিজানের চোখে ভয়ের ঘূর্ণিঝড় নেমে আসে। সে জানে আজ আর তার বেঁচে থাকার জন্য কোন অযুহাতেই কাজ হবে না। তবুও মুখ দিয়ে গুগিয়ে গুগিয়ে কিছু একটা বলার চেষ্টা করল। আহাদ নাদিমের দিকে ইশারা করল। সে তার মুখের টেপ খুলতেই সে হাঁপাতে হাঁপাতে আকুতি জানায়,
“আমারে ছাইড়া দেন, এবারের মত ছাইড়া দেন। আমার প্রান ভিক্ষা দেন, আমি তো আপনাদের সব সত্যিই বইলা দিছি। আমারে মাইরেন না, ছাইড়া দেন।”
আহাদের মুখের পেশি শক্ত হয়ে ওঠে। পি’স্ত’ল দিয়ে কপালে কয়েকবার ঘঁষে নিলো। ঠান্ডা, ভয়হীন কণ্ঠে প্রশ্ন করে,
“ছেড়ে দিবো? তোকে ছেড়ে দিব?”
মধ্য বয়সী মিজান ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়ালো। আহাদ বিকট শব্দ করে হৃদকাঁপানো হাসি দিল।। কি ভয়ানক হাসি তার, যে কারোর শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যেতে পারে সেই হাসির রেশ শুনলে। অতঃপর মূহুর্তেই চাহনি তীক্ষ্ণ করে হিমশীতল গলায় বলে উঠল,
“ঠিক আছে। এত করে যখন বলছিস, তোকে ছেড়েই দেই। তোর জানের কি মায়া.. আমারও মায়া হচ্ছে তোর জন্য। কি বলতো? আমার মনটা আবার হাওয়াই মিঠাইয়ের মত। অল্পতেই গলে যায়।”
উল্টো লটকে থাকা মিজান শুষ্ক ঢোক গিলল। আহাদ রাজা কি সত্যিই তাকে ছেড়ে দেবে? এত সহজে মেনে নিল কি করে? সে আয়ান রাজা মীরের সাথে গাদ্দারী করেছে। সেখানে আহাদ রাজা তার নাতি হয়ে তাকে কি করে ছেড়ে দিবে? সে তো ভালো করেই চিনে আহাদ রাজাকে! আবারও ঢোক গিললো সে। হঠাৎ কিছু বুঝে উঠার আগেই আহাদ ইশারা করতেই নাদিম তার বাধঁন খুলে দিলো, সাথে সাথে ধপ করে পড়ল দহনকুন্ডলির ভিতর। একটা ভ’য়ং’কর আ’র্তনা’দ ছড়িয়ে পরলো ডেমো ঘরে। তবে তার সেই চিৎকার সাউন্ড প্রুফ দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা লেগে আবার ফিরে এলো। নাদিম মাঝে মাঝে টেনে তোলে, আবার ছেড়ে দেয়। এভাবে মৃ’ত্যু’র এক বিকট, অমানবিক খেলা শুরু হয়। ভীষন ভ’য়ং’কর খেলা। আহাদ রাজা সচরাচর এমন নি’ষ্ঠু’র’তায় নামে না; কিন্তু যখন এই খেলায় নামে, তখন ভ’য়ংকর ভাবে মেতে উঠে।
অবশেষে অর্ধ-জ্ঞান অবস্থায় মিজানকে বরফঘরে নেওয়া হয়। আহাদ রাজা পি’স্ত’লটা থুতনিতে ঠেকিয়ে এক পা তুলে তার মুখের সামনে ঝুঁকে কিছুক্ষণ পরখ করলো তার দাদুর বি’শ্ব’স্ত খুনিকে। তার জ্ঞান ফিরে আসতেই সে দেখে আহাদ রাজা তার মুখের সামনে দাঁড়িয়ে, চাহনি তীক্ষ্ণ, ভ’য়ান’ক। কিন্তু তার চোখে আতঙ্ক, মুখ ফুঁটিয়ে কিছু একটা বলার চেষ্টা করলো। কিন্তু সে ব্যার্থ হলো, শেষ কথাটা আর তার বলা হলো না। সাথে সাথে তার মুখের ভিতর পি’স্ত’ল ঢুকিয়ে পরপর দুইটা গুলি করল। তার জীবনাবসান। পাশেই দাঁড়িয়ে তার এই নিষ্ঠুর খেলা উপভোগ করল তার তিন ত্রয়ী। আহাদ আবারও নাকটা ঘঁষে নিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
“এটাকে লাল রঙের প্যাকেট করে তালুকদারের ঠিকানায় পাঠিয়ে দে। মৃ’ত্যু’র আগের ওর ওই ভীতু রুপটা আমি দেখতে চাই।”
নাদিম এক আঙুলের সাহায্যে কিন্চিৎ কপাল চুলকে নিল,
“ভাই, তাহলে তো তালুকদার আগে থেকেই গা ঢাকা দিবে। ওর কাছে সরাসরি উপহারটা নিয়ে গেলে কেমন হয়?”
আহাদ ঠোঁট কামড়ে বলল,
“হুমমম, আইডিয়াটা মন্দ না। ঠিক আছে, তাহলে সেই ব্যাবস্থাই কর। আর ওর চ্যালাটাকেও একই ভাবে প্যাকেট কর। এতোগুলো মানুষ যাব.. একটা প্যাকেট নিয়ে গেলে মন্ধ দেখায়!”
শাওন হাতা গুটাতে গুটাতে বলল, “ঠিক আছে ভাই!”
শাহীন পাশ থেকে জিজ্ঞেস করল,
“মাতব্বরের ব্যাবস্থা কখন করবেন ভাই? ওই শালায় ও বহুত বাড়া বাড়ছে!”
আহাদ রাজার দৃষ্টিতে তখন অগ্নিশিখা, সে কঠোর গলায় বলল,
“মাতব্বরের ব্যাবস্থা পরে করব শাহীন! আগে তালুকদারকে ডেমোটা দেখাই। দাদুর প্রতিটা র’ক্ত’কনার মুল্য ওকে দিতে হবে। তার মুখোশের আড়ালের বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিটি বিন্দুর হিসাব আমি আজই নেব এবং নিজের হাতে নেব।”
সোলায়মান তালুকদার, আয়ান রাজার চিরশত্রু। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় তিনি বারবার জঘন্য কলাকৌশল প্রয়োগ করে আয়ান রাজাকে হারাতে চেয়েছেন, কিন্তু পারেননি কখনোই। শেষবার তিনি টাকার লোভ আর প্রাণভয়ের বিনিময়ে ক্রয় করেন মিজানকে। সেদিন মিজানের প্ররোচনায় আয়ান রাজা ভোট প্রচারের মঞ্চে যান, আর সেই সুযোগে তালুকদার তার আজীবন প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরিয়ে দেয় রাজপথ থেকে।
আহাদ রাজার মুখ ঠিক যেন পালিশ করা শক্ত শালকাঠ, অনমনীয়, প্রবল কঠোরতায় টানটান। তার চোয়ালের পেশিতে ক্রুদ্ধ শিরা থরথর করছে। কিছুক্ষণ আগেই র’ক্তা’ক্ত প্রতিশোধের প্রথম অধ্যায় সে শেষ করেছে। ধা’ত’ব পি’স্ত’ল’টি সে পুনরায় কোমরে গুঁজে নিলো, দু’দিকে ঘাড়টা কড়মড় শব্দে বাঁকিয়ে যেন নিজের ভেতরের উত্তাপ সামলে নিল। ঠিক তখনই ভারি দরজা খোলার শব্দ হলো। ভেতরে প্রবেশ করলেন আমজাদ মীর আর আসফাক মীর। দু’জনেরই উপস্থিতি ঘরের পরিবেশকে আরও তীক্ষ্ণ, আরও হিং’স্র করে তুলল। আমজাদ মীর কঠোর দৃষ্টি ঘুড়িয়ে চারদিকে পর্যবেক্ষণ করে নিলেন। নিজের ছেলের দিকে চোখ পড়তেই দেখলেন, র’ক্তি’ম চোখ, শিরা ফুলে ওঠা বাহু, বুকের গভীরে দহন সব দেখে তিনি আকস্মিক এক সংক্ষিপ্ত হাসি দিলেন।
“ফিনিশড!”
আহাদের মুখে বলা এই একটা শব্দে যেন দুই ভাই তৃপ্তি পেলেন। আজ তাদের বাবার খু’নে’র প্রতিশোধের আগুন তাদেরও শিরায় শিরায় বহমান। এমন সময় নাদিম ছুটে এসে সম্মানসূচক ভঙ্গিতে জানায়,
“উপহার রেডি ভাই!”
আহাদের মুখাবয়বে তৎক্ষণাৎ পরিবর্তন এল। এক ভ’য়ান’ক শীতলতা নেমে এলো মুখে, যা আরও ভ’য়ংক’র, আরও প্রাণঘাতী। আমজাদ মীর একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আহাদের দিকে। অতঃপর কণ্ঠে প্রজ্বলিত ক্ষোভ আর প্রতিশোধের দহন নিয়ে বললেন,
“এখনও দাঁড়িয়ে কী ভাবছো? ওই শয়তান তালুকদারের ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত আমার র’ক্ত ঠান্ডা হবে না। আমি-ও যাব তোমাদের সাথে।”
আহাদের দৃষ্টি ঘুড়ে গেলো বাবার দিকে। শীতল, গুরুগম্ভীর স্বরে বলল,
“তোমার শরীর ঠিক নাই, যেতে হবে না। আমি আর চাচু সামলে নিব। ওখানপ গিয়ে তোমার কোন কাজ নাই।”
আসফাকও দ্রুত যুক্ত হলো,
“হ্যাঁ ভাইজান… আহাদ ঠিকই বলছে। তোমার যাওয়ার প্রয়োজন নাই। তুমি বরং বাসায়ই থাকো।”
তাদের কথা শেষ হতেই আমজাদ মীরের মুখে লালচে ক্রোধের দাগ গাঢ় হয়ে উঠল। তিনি যেন অপমানিত বোধ করলেন। নিজের ছেলে আর ভাই তাকে দুর্বল ঘোষণা করেছে? গলার স্বর মুহূর্তেই রু’ক্ষ, বজ্রধ্বনির মতো হয়ে উঠল,
“আমারে কি তোরা বুড়ো ভাবছিস? আমি এখনও এক হাতে একশ জনকে মাটিতে গুজে দিতে পারি! সব কিছুতেই তোদের ঠুনকো কথাবার্তা… আমার সহ্য হয় না! আমি কোন কাপুরুষ নই, যে ঘরে বউয়ের আঁচলের তলায় বসে থাকবো!”
আহাদ গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বাবার দিকে। তার বাবার ফর্শা মুখটা র’ক্তি’ম বর্নধারন করেছে। সে জানে, তার বাবা যা বলছেন তা সত্যি। আমজাদ মীর এখনও একখণ্ড আগ্নেয়গিরি, বিস্ফোরিত হতে মাত্র কয়েক মুহূর্ত লাগে। আহাদ আর কিছু বলল না। নিজের শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে গটগট করে বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে। আমজাদ মীরও কম না! সে রাগে ফুঁসছে, হঠাৎ পাশের ভারি লোহার চেয়ারটাকে এক লাথি মেরে বেড়িয়ে গেলেন। পিছনে রয়ে যায় আসফাক মীর, হতভম্ব, বিমূঢ় হয়ে। প্রতিবারের মতো বাবা ছেলের এই রেষারেষির মাঝখানে সে হয়ে থাকে চ্যাপ্টা তক্তার মতো। সে উল্টে পরে থাকা চেয়ারটা সোজা করে, ডেমো ঘরের মাঝখানে বসে। এমন যেন, তার এখানে থাকাটাই শ্রেয়।
তখন প্রায় সন্ধা ঘনিয়ে এসেছে। মীর হাউজের ধূসর দেয়ালে এক অদ্ভুত গা ছমছমে ছাঁয়া তৈরি করেছে। গেটের সামনে এসে থামলেন আমজাদ মীর, আর তার পাশে পাথরের মতো শক্ত চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আহাদ রাজা। সদ্য সমাপ্ত নি’ষ্ঠু’র অধ্যায়ের পরও আহাদের চোখে এক বিন্দু ক্লান্তি নেই বরং প্রতিশোধের শিখাগুলো এখন আরও উজ্জ্বল। ঠিক তখনই তাদের পিছু পিছু এসেই দাঁড়ালেন আসফাক মীর। বাবা ছেলের এই রেষারেষি সামলাতে হলেও তাকে সাথে যেতেই হবে। এমন সময় মীর হাউজের গেট পেরিয়ে ঢুকতে দেখা গেলো ঈশানী আর তানভীরকে। কাছাকাছি আসতেই ঈশানী বিনয়ের সাথে সালাম জানালো আমজাদ মীরকে,
“আসসালামু আলাইকুম।”
“ওয়াআলাইকুম’স আসসালাম।”
আমজাদ মীরের কঠোর মুখ নরম হলো কিছুটা। সালামের উত্তর নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মাহির গালে আঙুল ছুঁয়ে একটু আদরের ভঙ্গি করলেন। তানভীরের দিকে একবার তাকিয়ে ঈশানীকে প্রশ্ন করলেন,
“রিদি মাকে দেখতে এসেছো?”
ঈশানী মাথা নিচু করে জবাব দিল, “জ্বি, আঙ্কেল।”
“ভালোই করেছো। মেয়েটার শরীর আর মন দুটোই খারাপ। তোমাদের দেখলে ওর মন কিছুটা হালকা হতে পারে। ভিতরেই আছে, যাও ওর কাছে।”
“জ্বি আচ্ছা।”
ঈশানী শান্ত ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে আহাদ আর আসফাকের দিকে একঝলক তাকিয়ে মাহির হাত ধরে ভিতরের দিকে চলে গেল। ঈশানী ভিতরে চলে যেতেই তানভীর এগিয়ে এল আহাদের দিকে। বরাবরের মতোই পরিচিত চঞ্চল-হাসিখুশি স্বভাব নিয়ে সে হঠাৎ কোলাকুলি করতে চাইলো। কিন্তু আহাদ যেন সাপ দেখে পিছিয়ে যায়, সেইভাবে এক ধাপ পিছিয়ে গেল। তার এই অযথা গায় পরা মানুষ পছন্দ না। তানভীরও মুহূর্তেই বিষয়টা টের পেলো। নিজেকে সামলে নিয়ে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল,
“দুলাভাই, আপনারা কি কোন মিশনে যাচ্ছেন নাকি?”
আহাদ চোখ তুলে এমনভাবে তাকালো যেন কথাটাই তার কাছে বোকামি। পাশ থেকে আসফাক গম্ভীর গলায় বলল,
“দেখতেই যখন পাচ্ছো। তাহলে প্রশ্নটা করার দরকার কী?”
তানভীরের মুখ উজ্জল হয়ে উঠল উত্তেজনায়, সে কন্ঠে খই ফুঁটিয়ে বলল,
“আমিও যাবো দুলাভাই! আপনাদের সাথে আমাকেও নিয়ে চলেন। আমার মিশনে যাওয়ার অনেক দিনের ইচ্ছা। আমি কিন্তু অনেক সাহসী, আমাকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। এক চপাটে সব কাত হয়ে যাবে।”
আহাদ ক্রুর হাসলো। ধীরেধীরে পিছন থেকে কোমরে গুজা পি’স্তল’টা বের করল। আহাদ দু’বার কপাল ঘষে পি’স্ত’লটা হাতে ঘুরাতে লাগল। তানভীর হা করে তাকিয়ে রইল। জীবনে এই প্রথম সে সত্যিকারের অ’স্ত্র দেখছে এতো কাছে থেকে। আহাদ খিঁচানো ঠোঁটে ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলল,
“এতই যখন শখ, তাহলে চল শালাবাবু, আজ তোমাকে দিয়েই মিশন শুরু করি।”
তানভীর একটা শুষ্ক ঢোক গিলে নিলো। মুখে কৃতিম হাসি টেনে কোনোমতে বলে উঠলো,
“আরে না.. না… আমি তো মজা করছিলাম! আমি যাই হ্যাঁ? রিদিকে দেখে আসি!”
বলেই সে এমনভাবে দৌড়ে ভিতরে ঢুকল যেন পিছনে শ্বাপদ দৌড়াচ্ছে। আহাদ হালকা হেসে ঠোঁট বাঁকাল, তার কণ্ঠে উপহাস,
“এই কলিজা নিয়ে মিশনে নামতে চায়! ছ্যাহ… কাপুরুষ!”
মীর হাউজের হলঘরে একটু চাপা উত্তেজনায় ভরা। সোফার সারিতে পাশাপাশি বসে আছে ঈশানী আর রিদিতা, আর তার কোলে আধশোয়া হয়ে আছে মাহি। পাশের সোফায় গুটিসুটি মেরে বসেছে আহিয়া আর আদিবা; দুজনের মুখেই উদ্বেগের ছাঁপ রিদিতার জন্য।হালিমা বেগম এতক্ষণ এখানেই ছিলেন এখন উঠে রান্নাঘরের দিকে গেলেন। রিদিতার জ্বর গতকালের চেয়ে অনেকটাই কমেছে, মুখমণ্ডলে আর আগের মতো লালচে ভাব নেই, কিন্তু সর্দি আর ঠাণ্ডার রেশ এখনও অনেকটাই আছে। গলা বসে যাওয়াতে কথার ধরনও পাল্টে গেছে অনেকটা। রিদি মাহির চুলে আঙুল বুলাতে বুলাতে ঈশানী জিজ্ঞেস করল,
“আব্বু আম্মু চলে গেছে? আসলো না যে?”
ঈশানী মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ, বাসা-বাড়ি ফাঁকা রেখে আর কতদিন থাকবে বল? তাছাড়া রাইসার পড়াও আছে। তাই চলে গেছে। কিন্তু আব্বু বলেছে আবার আসবে তোকে দেখতে।”
রিদি একটু নাক টানল। অতঃপর পাশের তানভীরের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে মুখটা কুঁচকে বলল,
“তাহলে এই লেজকাটা বান্দরটাকে রেখে গেলো কেন? ওরে নেয় নাই কেন? আর এখানেই আনলা কেন ওরে?”
ঈশানী আড় চোখে তাকালো তানভীরের দিকে, শান্ত কন্ঠে বলল,
“ও কিসের জানি একটা কোর্স শুরু করছে এখানে। ছয় মাস লাগবে শেষ হতে। তাই যায় নাই।”
রিদির বিরক্তি কিছুতেই স্তিমিত হলো না। তানভীরের দিকে তাকানো মাত্রই তার সারা শরীরের রাগ যেন সক্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ তানভীরের সেই গা ছাড়া, ঢিলেঢালা আচরণ রিদির একদম সহ্য হয় না। আর তানভীরও সেটা বেশ বুঝতে পেরেছে। সে ইচ্ছা করেই একটু রিদিকে জ্বালাতে চাইল, ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? চোখ দিয়ে গিলে খাবি নাকি? কোথায় তোর শশুড় বাড়ি আসলাম, ভাইয়ের জন্য মুরগি টুরগি জবা দিবি, পোলাও-কোরমা রান্না করবি, তা না করে সোফার উপর পা তুলে বসে আছিস!”
রিদি রাগে ঠোঁট চাপলো। এমনিতেই মাথা ধরে আছে। তার উপর তানভীরের এমন কথায় মাথাটা ফেটে যাচ্ছে। সে কিছু বলার আগেই, পাশে বসা আহিয়া একটু তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে উঠল,
“মীর হাউজের বউয়েরা এমন পায়ের উপর পা তুলেই বসে থাকে, বেয়াই! আপনাদের ওই গাইয়া শশুরবাড়ির মতো না, যে বউকে খাটাবে। কিছু খেতে ইচ্ছে করলে কাজের লোক আছে, বলেন, এনে দিবে।”
“গাইয়া বলে অপমান করবেন না, বেয়াইন! কে বলতে পারে কার ভাগ্যে কি আছে। আজ আপনি পাঁচতলায়, কালকে বাঁশতলায়, সাথে কোনো গাইয়া জামাইও থাকতে পারে।”
আহিয়া দাঁড়িয়ে পড়ল, চোখে খানিক বিদ্যুতের ঝলক,মুখে জোড় পূর্বক হাসি টেনে বলল,
“আমার ভাগ্যের চিন্তা আপনাকে করতে হবে না। নিজের চরকায় তেল দেন, পরে চরকা না ঘুরলে মেয়ে পাবেন না!”
তানভীর ভাব নিয়ে সোজা হয়ে বসলো। মেরুন রঙের পাঞ্জাবি তার ফর্সা গায়ে ফুঁটে আছে। সে কলার ঠিক করে খুব গর্বের সাথে বলল,
“এই তানভীর আহমেদের জন্য মেয়ের মায়েরা পাগল! আপনি বলছেন মেয়ে পাব না, হাহ্!”
আহিয়া তাছিল্য করে হেসে উঠল,
“হ্যাঁ, কপালে মেয়ের মায়েরাই জুটবে। মেয়ে আর জুটবে না।”
এবার রিদি সহ আদিবা আর মাহিও শব্দ করে হেসে উঠলো। আদিবা আর মাহি তো হেসে লুটিপাটি খাচ্ছে। তানভীর মুখটা গম্ভীর হয়ে গেলো, ঈশানীর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
“ঈশানীপু, এত বড় অপমান! আমি আর থাকব না এই বাড়িতে। এখনই চলে যাব!”
বলেই নাটকীয় ভঙ্গিতে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে পরল। সবার দিকে একবার একবার করে তাকিয়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই, সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সিরিয়াস! আহাদ রাজার কালো রঙের ভ’য়ান’ক কুকুরটা, সবুজ চোখ দুটো তুলে হঠাৎ তাকাল তার দিকে। তানভীর সেই দৃষ্টি দেখেই ভড়কে গেল। নিজেকে সামলাতে না পেরে ধপাস করে পরে যায় মেঝেতে, এবার সবার হাসির শব্দ আরো বেড়ে গেলো।
আহিয়া হাসতে হাসতে হাত বাড়িয়ে বলল,
“যতই হোক বেয়াই, আপনি তো আমাদের মেহমান। সোফা থাকতে এমন মেঝেতে বসে আছেন, ভালো দেখাচ্ছে না। উঠে আসুন।”
তানভীরও সুন্দর করে হাত বাড়িয়ে দিল, কিন্তু নিজে না উঠে এক ঝটকায় আহিয়াকেও মেঝেতে এনে ফেলে দিল। হঠাৎ টান দেয়াতে আহিয়াও নিজেকে সামলাতে পারলো না। ধপ করে পরলো পাশেই, স্বাভাবিক ভাবেই। তবে সেই মূহুর্তেই একটা বজ্রধ্বনির মতো অস্বাভাবিক কন্ঠ ভেসে এলো,
“আহি!!”
সবার চোখ একসাথে ঘুরে গেল মূল দরজার দিকে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আদনান। চোখে উদ্বেগ, মুখে টানটান রাগ, শিরায় শিরায় দুশ্চিন্তা। সে ছুটে এসে ব্যাগটা সোফায় ছুড়ে ফেলে সোজা আহিয়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার কণ্ঠটা কেমন নরম, অথচ কাঁপা,
“তুই ঠিক আছিস? লাগেনি তো? হাতটা দেখি কোথায় লেগেছে? বেশি ব্যাথা পেয়েছিস?”
আদনানের এমন কান্ড দেখে তানভীর, ঈশানী আর রিদি একে অপরের দিকে তাকাল। আহিয়া সবার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলো এই মূহুর্তের ওজন। সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে ওড়না ঠিক করে বলল,
“আমি ঠিক আছি আদনান ভাই…”
আদনান জায়গায় বসে রইল। তানভীরও সুযোগ পেয়ে বলল,
“আরে কিছু হয় নাই ভাই! আমরা তো মজা করছিলাম।”
আদনান চোখ রাঙিয়ে তাকাল,
“ও কি তোমার বেয়ান লাগে যে মজা করছো?”
“হ্যাঁ, বেয়ানই তো লাগে।”
“জাস্ট শাট আপ!”
আদনানের মুখ আরো শক্ত হয়ে গেলো। উঠে ব্যাগ তুলে নিয়ে আহিয়ার দিকে তাকাল, আহিয়া রিদির পাশে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। এতক্ষণ দুষ্টমি করলেও, এখন যেন ভেজা বিড়াল। আদনান সেটা বুঝতে পারল। ঠাণ্ডা স্বরে বলল,
“আহি, উপরে আয়।”
আদনান পা বাড়াতেই আহিয়া বিস্মিত হয়ে বলল,
“কেনো? আ… সলে রিদি অসুস্থ, আমি ওর কাছে আছি তো, ওকে রেখে গেলে ভাইয়া বকা দিবে।”
আদনান আড় চোখে রিদির দিকে তাকালো। রিদি তখন তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। দ্রুত নজড় হটিয়ে নিল। চোখ পিটপিট করে আহিয়াকে বলল,
“কিছু হবে না, তুই যা। বুবু আছে তো।”
আদনান আবার আহিয়াকে দৃঢ় গলায় বলল,
“ওষুধ দেব, সেটা এসে নিয়ে যা।”
এই বলে সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল। আহিয়া একটু ইতস্তত করে পিছু নিল। তানভীর এবার মেঝেতেই দুই হাঁটু ভাজ করে বসল, গালে হাত রেখে বলল,
“ধলা ডাক্তার এমন করল ক্যান?”
ঈশানী রিদির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“রিদি, আমার মনে হয় আদনান মীর আহিয়াকে ভালোবাসে। দেখলি না কেমন আচরণ করল? চোখ-মুখ পুরো পাল্টে গেল!”
সত্যি বলতে রিদিও সেই দৃষ্টি দেখেছে, একটা অদ্ভুত, তীব্র উদ্বেগ। কেবল ভাইসুলভ নয়… কিছুটা বেশি। অনেক বেশি। তবুও সে এড়িয়ে গেলো। আহিয়ার সাথে কথা না বলে তো আর কিছু বলা যাচ্ছে না। সে ধীরে বলল,
“আরে নাহ! তেমন কিছু না। আদনানের কোন বোন টোন নেই তো, তাই আহিয়াকে আদিবাকে খুব ভালোবাসে।”
“তুই যতই বল রিদি! আদনান মীরের চোখের ওই দৃষ্টি, উদ্বেগ বোনের জন্য ছিল না। এটা অন্য কিছু।”
ঈশানী দৃঢ়তার সাথে বলায় রিদিও আর কোন অযুহাত দিল না। শুধু সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকা আদনান আর আহিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাবলো,
লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৩৬
আজকে আহাদ রাজা আসলে আসল সত্যিটা জিজ্ঞেস করবে। সে কি এসব বিষয়ে অবগত! আদনান কী আসলেই আহিয়াকে বোন ছাড়া অন্য চোখে দেখে। যদি তাই হয়, তাহলে ওকে বিয়ে কেনো করতে চাইল?
