Remedy part 16
মীরা রায়াদ
ঘড়িতে সময় সকাল ৯ টা। ঝুম এখনো ঘুমে বিভোর। শাইয়ান তার পাশে শুয়ে এক হাত মাথার নিচে রেখে কাত হয়ে তাকে দেখছে। ঝুম জ্ঞান হারিয়েছে বুঝেই তখন শাইয়ান থেমে গিয়ে ছিল। ভীষণ ভয়ও পেয়ে ছিল সে। অমানুষের মতো মেয়েটার ওপর নিজেকে চাপিয়ে দিয়ে ছিল ভেবেই এখন তার খারাপ লাগছে। ঝুম জ্ঞান হারানোর পর শাইয়ান ব্যতিব্যস্ত হয়ে তার জ্ঞান ফিরিয়ে ছিল। জ্ঞান ফেরার পর থেকে গুনগুনিয়ে কেঁদেছে মেয়েটা। শাইয়ান কোনো রকম ফ্রেশ করিয়ে ওষুধ দিয়ে ছিল। তারপর থেকে সে ঘুম। কিন্তু শাইয়ানের আর ঘুম হলো না। কি করেছে এটা ভেবে ভেবে সে অনুতপ্তায় ভুগেছে। ঝুম কিভাবে প্রতিক্রিয়া করবে কে জানে?
আহির ভোর হতেই বেরিয়ে পড়েছে। সে চেয়েছিল ড্রাইভ করে যাবে কিন্তু শাইয়ান দিলো না। ছেলেটার মন ঠিক নেই জানে সে। তাছাড়া আহির ভোরে ঘুম থেকে উঠে টলতে থাকে। এই অবস্থায় ড্রাইভ করা ঠিক হবে না ভেবে সে আগে থেকেই ওকে ড্রাইভ করে নিয়ে যাওয়ার জন্য লোকের ব্যবস্থা করে রেখে ছিল। আহির প্রথমে বারণ করলেও পরে ঠিক মেনে নিয়েছে। সত্যি বলতে তার ঘুম পাচ্ছে। এই অবস্থায় ড্রাইভ করলে নির্ঘাত কিছু একটা হয়ে যাবে। যাওয়ার আগে ঝুমের সাথে দেখা হলো না তার। শাইয়ানে বলল ঝুমের শরীর বিশেষ ভালো না। কাল রাতে বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাধিয়েছে। রাতে ঘুমাতে পারেনি একদম। ভোরের দিকে একটু চোখ বুজেছে। এখন না ডাকাই উত্তম। দারুন ভাবে মিথ্যাটা বলে সে একটুও অনুতপ্ত হলো না। আহির অবশ্য বিশ্বাস করলো কি না সেই বলতে পারবে। বেরিয়ে যাওয়ার আগে শাইয়ানকে হুমকি দিয়ে গেলো, ঝুমকে কষ্ট দিলে সে এসে তার বোনকে করাচি নিয়ে যাবে। শাইয়ান বিশেষ পাত্তা দিল না তার কথায়। একবার যখন তার বউ তার হাতে এসেছে, এখন আর ছাড়াছাড়ি নেই কোনো।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ঝুমের যখন ঘুম ভাঙ্গলো তখন দুপুর ৩ টা। চোখ খুলে ওভাবে পরে রইলো কতক্ষন। তারপর আস্তে ধীরে উঠে বসলো। রাতের মতো খুব ব্যাথা না থাকলেও এখনো অল্প ব্যাথা রয়েছে। ভালো ভাবে ঘরটা দেখে নিলো সে। শাইয়ানকে কোথাও দেখা গেলো না। বেড ছেড়ে নামতে গেলে লক্ষ্য করলো শরীরে তার শাইয়ানের একটি টি শার্ট। ছোট্ট শরীরে যা বিশাল বড় লাগছে। আস্তে করে এক পা এক পা ফেলে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এলো। পরেছে হালকা গোলাপী রঙের গোল জামা। লম্বা চুলগুলো একদম ভিজে। চুল মুছতে মুছতে ঘরে লাগোয়া আয়নার সামনে এসে দাড়ালো। গলার আশেপাশে ছোপছোপ দাগ। মেজাজ খারাপ হয়ে আছে ঝুমের। শাইয়ান এলো হাতে খাবারের প্লেট নিয়ে। সে বিরিয়ানি এনেছে। মুহূর্তে পুরো ঘর ঘ্রাণে ভোরে গেলো।
ঝুম দেখেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখলো না। শাইয়ান এগিয়ে এসে প্লেট টেবিলের ওপর রেখে ঝুমের থেকে তোয়ালেটা নিয়ে ঝুমের চুল মুছতে লাগলো। ঝুম কথা বলল না একদম। ফুলে আছে। চোখমুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে এখন শাইয়ান কিছু বললেই ফেটে পরবে তার ওপর। তাই শাইয়ান নিজেও কিছু বলল না। চুল মুছে টেনে বিছানায় বসালো ঝুমকে। তারপর নিজ হাতে তুলে খাবার খাওয়ালো। ঝুম ভদ্র মেয়ের মতো খেয়েছে। তার খুব ক্ষুধা পেয়ে ছিল। তাই টালবাহানা করলো না। একই প্লেটে দুজন খেয়ে নিল। খাওয়া শেষে শাইয়ান ঝুমকে রেখে প্লেট নিয়ে ঘরের বাইরে চলে গেলো। ঝুম তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে আবার শুয়ে পরল। বাজে লোক একটা। একেতো অন্যায় করেছে আবার ভাব দেখাচ্ছে এখন। অসভ্য, অসভ্য। বিরবিরিয়ে শাইয়ানকে আপন মনে ধুয়ে দিচ্ছ সে। ঠিক তখন অনুভব করলো তার পাশে শুয়ে পরেছে শাইয়ান। সে খুব সাবধানে ঝুমকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে বলল –
” সরি বলবো না এবার। তবে আমি আপনাকে এতোটা কষ্ট দিতে চাইনি বউ। আর রাগ করে না। আসেন আদর করে দিই।”
ঝুম রাগ রাগ চোখে ফিরে তাকালো। দুহাতে ঠেলে সরিয়ে দিতে দিতে বলল –
” ছাড়ুন অসভ্য লোক। আমি কিছু ভুলিনি। পাষাণ। কেউ কিভাবে এতো নিষ্ঠুর হয়? কতো করে বললাম তাও…. ছিঃ!”
শাইয়ান মুখটা করুন করে ঝুমকে নিজের দিকে আরও টেনে বলল –
” ছিঃ বলছেন কেন? আমার অধিকার ছিল। আর তাছাড়া দোষ কি শুধু একা আমার? আপনার নেই?”
ঝুম অবাক হয়ে গেলো ওর কথায়। তার দোষটা কি?
” আমি করেছি কি?”
” আপনিই তো সব করেছেন। আপনাকে দেখলে নিজের ওপর কন্ট্রোল থাকে না।”
মেজাজ খারাপ হলো ঝুমের। বেশরম লোক। কথার কি শ্রী।
” দূরে থাকুন আপনি আমার থেকে।
শাইয়ান দূরে গেল না বরং আরো কাছে এগিয়ে বলল –
” যখন বউ ছিলেন না তখনই পারলাম না দূরে থাকতে আর এখন তো অসম্ভব। কতো কিছু করে বউ করেছি আপনাকে জানেন? প্রথম দর্শনেই আমাকে হসপিটালে পাঠিয়ে ছিলেন। কতো সহ্য করেছি তা একমাত্র আমি জানি। এতো কিছুর পর যখন আপনাকে পেলাম তখন নিজের ওপর কি করে নিয়ন্ত্রণ রাখি বলুন?”
ঝুম অবাক হয়ে শুনল। তার চোখে প্রশ্ন। শাইয়ান হেসে বলল –
” যে দিন বৃষ্টিতে ভিজছিলেন ছাদে, ওখানে আমি ছিলাম। প্রথম দেখায় বুকে ব্যাথা তুলে দিলেন মেয়ে। সেই ব্যাথা কাল রাতে আপনাকে পাওয়ার পর কমলো।”
ঝুম লজ্জা পেলো। চোখ নামিয়ে আরো একটু কাছ ঘেঁষে গেল শাইয়ানের। শাইয়ান আল্লাদে আঁকড়ে নিল।
” সেদিনের পর আমি নিজেকে খুঁজে পাইনি আরীবা। আপনাকে পাওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত ভেবে গেছি, কিভাবে কি করবো? পাশে ছিলেন কিন্তু ছুতে পারিনি। এই কষ্ট কেমন জানেন? বুকের ভিতর জ্বলতো খুব কিন্তু জড়িয়ে ধরতে পারতাম না। বিয়েটা আপনার ইচ্ছাতে না করলেও আমার আফসোস নেই। আমি আপনাকে চেয়ে ছিলাম। শুধু হাসিল করতে না, সারাজীবনের জন্য। আপনি বুঝেননি আমায়। দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছি আপনি নিজে থেকে আসবেন এই ভেবে কিন্তু আসেননি। এরপরও কিভাবে আমি ভালো ছেলে হয়ে থাকি আপনি বলুন? আপনাকে কাছে পাওয়ার ইচ্ছা আমার রক্তে রক্তে ছুটতো।”
ঝুম লজ্জায় আর তাকাতে পারলো না। বেশরম লোকটার কি একটুও লজ্জা করছে না? কি সব অসভ্য কথা বলে যাচ্ছে।
” চুপ করুন ডক্টর।”
শাইয়ান হেসে ফেলল শব্দ করে। ঝুম তার হাসির শব্দে আরো গুটিয়ে গেল। মিনমিন করে বলল –
” আপনি আমাকে ব্যাথা দিয়েছেন।”
” সরি। নেক্সট টাইম দিবো না।”
মুখে বললেও শাইয়ান জানে সে কথা রাখবে না। মেয়েটাকে কাছে পেলে সে অন্য এক মানুষ হয়ে যায়। জ্ঞান – বুদ্ধি কাজ করে না। পিষে ফেলতে ইচ্ছা করে। অথচ বউ তার নাজুক পাখি। একটুতে নেতিয়ে পরে। দুর্বলতা কাটে না। মনে মনে ভেবে নিল কিছু টেস্ট করিয়ে নিবে একবার।
” ডক্টর।”
শাইয়ানের ধ্যান ভাঙলো।
” হুম।”
” কাল বলছিলাম কিছু বলতে চাই আপনাকে।”
” হ্যাঁ।”
” এখন বলি?”
ঝুম তার চোখের দিকে তাকিয়ে। শাইয়ান ঝুমের অস্থিরতা বুঝলো। মাথায় হাত বুলিয়ে আশ্বাস দিয়ে বলল –
” ইচ্ছা না করলে দরকার নেই। আমার কিছু জানার দরকার নেই। আপনি আমার কাছে আছেন এটাই যথেষ্ট। ডোন্ট প্যানিক।”
” কিন্তু আমি বলতে চাই ডক্টর।”
” আচ্ছা শুনবো। আপনি শান্ত হন। আমি সাথে আছি।”
ঝুম অনেকক্ষন শাইয়ানের বুকে চুপটি করে শুয়ে রইলো। কথাগুলো সাজিয়ে বলতে লাগলো তার জীবনের বিভীষিকাময় অতীত।
” আম্মার পরিবার ভীষণ প্রভাবশালী ছিল। কিন্তু বাবার পরিবার নিম্ন মধ্যবিত্ত ছিল। তাছাড়া বাবার পরিবারকে নানাভাইয়ের খুন একটা পছন্দ ছিল না। তাই বাবাকে নানাভাই মেনে নেয় নিই। পরবর্তীতে বাবা আম্মাকে নিয়ে পালিয়ে বিয়ে করেন। আম্মা একমাত্র আদরের মেয়ে ছিল। নানাভাই, মামারা খুব ভালবাসতো আম্মাকে। সেই মানুষ যখন তাদের সমাজে অপমানিত করে, তাদের অপছন্দের মানুষকে বিয়ে করে তখন তারা মেনে নিতে পারেনি। নানাভাই, মামারা আম্মার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আব্বা ভেবেছিল কিছু দিন গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আম্মা জানতো নানাভাই মেনে নিবেন না। বাবা আম্মাকে নিয়ে তাদের বাড়ি এলো। আমার আম্মার গায়ের রং কালো ছিল। দাদী, ফুপির চোখের কাটা হয়ে উঠল শুরুতেই। কিন্তু মুখ বুঝে রইলো। সোনার ডিম পাড়া হাঁস কি না! শুরুতে সবাই উপরে উপরে ভালো সেজে থাকলেও যতো দিন যেতে লাগলো সবার আসল রূপ ততো বেরিয়ে এলো। আম্মা বুঝতে পরলো বাবা তাকে সম্পত্তির জন্য ভালোবাসার জালে ফাঁসিয়ে বিয়ে করেছে। কিন্তু ততদিনে যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। নানাভাই আম্মাকে তেজ্য করলো। শুরু হলো আম্মার ওপর দ্বিগুণ অত্যাচার।
আগে দাদী আর ফুপির অত্যাচার ছিল তাতে যোগ দিলো বাবাও। কয়েক মাস যেতে না যেতেই আম্মা বুঝতে পারল নতুন অথিতির আগমন। খবর পেয়ে দাদী চোখ মুখ কুঁচকে বলল, তার ছেলে নাতি চাই। আম্মা আতঙ্কে পরে গেলো। দোয়া করতে থাকলো রবের কাছে যেন যে আসে সে সুস্থ এক জীবন পায়। সবার আশায় ভাটা ফেলে, আম্মার জীবনের কাল হয়ে জন্ম নিলাম আমি। শুরু হলো আম্মার জীবনের নরক যন্ত্রণা। আব্বা ততো দিনে আম্মার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। আমার জন্মের আগে যাও বাড়ি আসতো, কিন্তু আমার জন্মের সংবাদ পেয়ে তাও বন্ধ করে দিলেন। ছোটো থেকে দাদীর খোটা শুনে বড় হয়েছি। আম্মাকে দেখতাম দাসীর মতো দিনরাত খাটতে। তাও কারো মন পেতো না। রাত হলে আম্মার চোখের পানি বাঁধ মানতো না। সবটাই দেখেছি। মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়ে নিজেকে পাপী মনে হতো। চাচাতো – ফুপাতো বোনদের সবাই যেখানে যত্ন করতো, সেখানে আমাকে সবাই দূরদূর করে তাড়িয়ে দিতো। কটূ কথা বলে ছোট করত। বাবা বাড়িতে এলে এমন দিন ছিল না যেদিন আম্মার গায়ে হাত না তুলতো। আম্মা নীরবে কাদত। ছোটো ছিলাম কিন্তু ততদিনে বুঝতে শিখে ছিলাম সবটাই।
আম্মার জীবনটা নষ্ট করে ওদের শান্তি হয়নি বলে আমার জীবনটা অন্ধকারে ডুবানোর ব্যবস্থা করলো। বাবার একটা বোন। শশুরবাড়ির থেকে বাপের বাড়িতেই বেশি থাকতো। বুঝ হওয়ার পর থেকে দেখেছি দাদীর সাথে মিলে আম্মাকে বিভিন্ন ভাবে অত্যাচার করতে। ফুপির বড় ছেলে নয়ন ভাই তখন ১৮ বছরের তাগড়া যুবক। দেশের বাইরে পরতে যাবে বলে ফুপি জোর করে তার সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দেয়। ১২ বছরের বাচ্চা মেয়ে ছিলাম আমি। বুঝতে শিখিনি কিছুই। বিয়ে কি, সংসার কি জানতাম না। আমার পুরো দুনিয়া জুড়ে ছিল আমার আম্মা। এই বিয়েতে আম্মার মত ছিল না। বিরোধিতা করায় বাবা আম্মাকে খুব মারল। দাদী, ফুপি হাত – পা বেঁধে মারল আমায়। বলল, বিয়ে না করলে আম্মাকে মেরে ফেলবে তারা।
ছোটো ছিলাম তো? ভয় পেয়ে গেলাম আম্মাকে হারানোর। ভয় পেয়ে রাজি হয়ে গেলাম। মারের চোটে ভীষণ জ্বর এলো গায়ে। সেই অবস্থায় কাপতে কাপতে জীবনের প্রথমবার কবুল বললাম। বিয়ের পর ওরা চাইলো নয়ন ভাইয়ের সাথে এক ঘরে রাখতে। কিন্তু আম্মা নিজের জীবন বাজি রেখে সেদিন ঢাল হয়ে রইলো আমার। দরজা বন্ধ করে আমাকে নিয়ে পরে রইল ঘরের মধ্যে। মা – মেয়ে সারারাত জ্বরে পুড়েছি। ওরা চেঁচালো, আম্মাকে বাঁজে ভাষায় গালি দিলো। কিন্তু আম্মা আমাকে সেদিন এক মুহূর্তের জন্য ও ছাড়লো না। পরের দিনও আম্মা আমাকে নিয়ে ঘর থেকে বের হলো না। জ্বরে, ক্ষুধায় কাতরাতে কাতরাতে যখন আম্মাকে বললাম –
” আম্মা ক্ষুধা পেয়েছে, ভাত খাবো।”
আম্মা সেদিন আমায় বুকে জড়িয়ে হুহু করে কেঁদে বসিয়ে ছিল। আমি বুঝেছিলাম আম্মার কষ্ট, তাই আর খেতে চাইনি। নয়ন ভাই সেদিন বিকেলে দেশের বাইরে পাড়ি জমালে আম্মা আমাকে নিয়ে ঘর ছেড়ে বের হয়। তারপর আম্মার সাথে আমার ২ দিন দেখা হয়নি। কি হয়ে ছিল জানি না, কিন্তু যখন আম্মাকে কাছে পেলাম আম্মার সারা শরীরে অনেক অনেক দাগ ছিল। চোখের নিচে কালি পড়ে ছিল। আমি আম্মাকে দেখে বুঝে ছিলাম আম্মার সাথে খুব খারাপ কিছু হয়েছে। তখন না জানলেও পরে জেনে ছিলাম, আমার বাবা নামের পশুটা আমার আম্মাকে অন্য পুরুষের হাতে তুলে দিয়ে ছিল। আমাকে বাঁচানোর অপরাধে আমার আম্মা ধর্ষনের শিকার হয়ে ছিল। কতটা অমানুষ হলে কেউ নিজের স্ত্রীকে শাস্তি দিতে অন্য পুরুষের হাতে তুলে দেয় বুঝতে পারছেন ডক্টর? আমার আম্মা সেদিনের পর হাসতে ভুলে গেল। আমি বুঝে ছিলাম আমি ওদের কথা না শুনলে আম্মাকে আরো শাস্তি দিবে। তাই ওরা যা বলতো শুনতাম। ওই বয়স থেকে আমাকে শাড়ি পড়তে বাধ্য করা হলো, আমি মেনে নিলাম। আমার আম্মা আমাকে নাচ শিখালো তাও ছেড়ে দিলাম। দিন রাত ওদের কাজ করে দিতাম।
বাড়ির বউ বাড়ির বউ বলে এক একটা জিনিস চাপিয়ে দিত জানেন? ভুল হলেই মারতো, শাস্তি দিতো। অন্ধকার ঘরে আটকে রাখতো, খেতে দিতো না। অনেকবার তো গরম খুন্তির ছেঁকাও দিয়েছে। আম্মা নিজেকে বাঁচাতে না পারলেও আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করতো। মা পাখির মতো বুকের সাথে আগলে রাখতো। আব্বা ঐদিনের পর বাড়িতে আসা একদম বন্ধ করে দেয়। আমি একটু স্বস্তি পাই এই ভেবে যে আম্মাকে কেউ অমানুষের মতো মারবে না। আস্তে ধীরে বড় হতে লাগলাম আর ওদের নিয়মের অত্যাচার বাড়তে লাগলো। সেবার এইচ.এস.সি পরীক্ষার পর ফুপি এলো কিছু কাগজ নিয়ে। শুনতে পেলাম আমার আর নয়ন ভাইয়ের ডিভোর্স পেপার। বিদেশে গিয়ে বড় লোক বাবার মেয়ের প্রেমে পড়েছে শুনে ফুপি ডিভোর্স পেপার তৈরি করলো। বড়লোক বাবার মেয়ে যা পাবে তা তো সব তার ছেলেরই হবে। আম্মা দ্বিরুক্তি করলো না। আমাকে বলল, সিগনেচার করে দিতে। আম্মার ওপর আমার ভরসা ছিল তাই প্রশ্ন না করে করে দিলাম। আমার মাঝে কোনো অনুভূতি ছিল না।
আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। এখন আর কেউ আমার ওপর বাড়ির বউয়ের নিয়ম চাপিয়ে দিবে না। দাদী, ফুপির মার খেতে হবে না। আম্মাও যেন হাপ ছেড়ে বাঁচে। কিন্তু তখনো যে আরও ঝড় আমাদের অপেক্ষা করছিল জানতাম না। সেদিন রাতে আম্মা আমাকে নিজ হাতে খাইয়ে দিল। পরীক্ষার রেজাল্ট তখনো দেয়নি, সবে পরীক্ষা শেষ। বহুদিন পর আম্মা অনেক কথা বলল। সামনে কোথায় পড়বো, কোন বিষয়ে পড়বো? এসব নিয়ে আমাদের অনেক কথা হলো। আমি আম্মাকে জড়িয়ে ঘুমালাম। আম্মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। ঘুম ভাঙ্গলো আম্মার ডাকে। বলল ফ্রেশ হয়ে আসতে। আম্মার কথা মতো ফ্রেস হয়ে বাইরে এসে দেখি বসার ঘরে আব্বার সাথে নতুন এক মহিলা আর দুটো বাচ্চা।
বড় একটা মেয়ে আর ছোট একটা ছেলে। মেয়েটার বয়স আনুমানিক ১৩/১৪ হবে আর ছেলেটার ৯/১০। আমি স্থির তাকিয়ে দেখলাম। বুঝতে সমস্যা হলো না এরা কারা। তাকালাম আম্মার দিকে। সে নির্বিকার। কাছে গিয়ে আম্মার আঁচল ধরে দাঁড়ালাম। আম্মা আমাকে দেখে হাসলো। কি নির্মল সেই হাসি। আমার আম্মা হাসলে এত্তো বেশি সুন্দর লাগে ডক্টর। অনেকগুলো বছর পর আমি আমার আম্মাকে হাসতে দেখলাম, আর সেটিই তার শেষ হাসি ছিল। সেদিন আম্মার বুকে মুখ গুজে শুয়ে ছিলাম। আম্মা বলল –
” আরীবা আম্মা আমার। পৃথিবীতে নিজেকে ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করবে না। সবাই তোমার সুযোগ নিতে চাইবে। প্রয়োজনে ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেলে দিবে। নরম মানুষ কাদার মতো হয়। চালাক মানুষরা নরমদের কষ্ট দিয়ে বোকা বানায়। আমার আম্মা কখনো বোকা হবে না। নিজেকে সামলে রাখবে। দুনিয়ার খারাপ মানুষ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবে। মনে থাকবে? আলমারিতে একটা ব্যাগ আছে। ব্যাগে একটা ফোন, কিছু টাকা, আর প্রয়োজনীয় কাগজ আছে। রেজাল্ট দেয়া পর্যন্ত এই বাড়িতে মুখ বুঝে থেকে যাবে। আর হ্যাঁ, অবশ্যই নিজের খেয়াল রাখবে। ঘুমাবে যখন দরজা ভালো করে আটকে নিবে। কাউকে বিশ্বাস করবে না, কাউকে না। এই বাড়ির কাউকে তো অবশ্যই না। রেজাল্ট যে দিন দিবে সে দিন ওই ফোন নিয়ে যাবে। ব্যাগে একটা নাম্বার আর ঠিকানা আছে। ওই ফোন থেকে কল করবে। বাকিটা সে বুঝিয়ে দিবে। আম্মার ওপর বিশ্বাস রাখবে। আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালা তোমার ভালো করুক।”
অবুঝ আমি তখন বুঝতে পারেনি আমার আম্মা আমাকে সুরক্ষিত করতে কতগুলো বছর ধরে নিজেকে শেষ করে গেছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে আম্মাকে একই ভাবে পাই। ঘড়িতে তখন সকাল ৯ টা। আমার আম্মা খুব ভোরে উঠে নামাজ পরে বাড়ির কাজ করে। কিন্তু সেদিন ওঠেনি। সারাজীবনের মতো এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় আমাকে একা করে চলে যায়। আমি কাদিনি একদম জানেন? একটুও কাদিনি। আমার আম্মা কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়েছে বলে ভালো লাগছিল। আমি আম্মার শক্ত, ঠাণ্ডা শরীরটার সাথে লেপ্টে রইলাম। আম্মাকে গোসল করানো হলো। আমি দেখে গেলাম মানুষ রূপী অমানুষ গুলোর নাটক। যারা জীবিত থাকতে আমার আম্মার জীবনটা নরকসম বানিয়ে ছিল, তারা আজ আম্মার মৃত্যুতে কেঁদে নাটক করছে। আমার আম্মার খাটিয়া আমাকে তুলতে দেয়নি ডক্টর। কারণ আমি মেয়ে। মেয়েদের তো সেই অধিকার নেই। আমি আমার আম্মাকে শেষ বার কাছ থেকে পাইনি ডক্টর। আম্মা যাওয়ার পর বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী আমাকে মেনে নিতে পারল না। আমাকে আবার বিয়ে দেয়ার জন্য উঠে পরে লাগলো। আমি আম্মার কথা মতো চুপ করে সহ্য করলাম। আম্মার দেয়া ব্যাগে ২০ হাজার টাকা, একটা বাটন ফোন, একটা ছোট কাগজে বিথী নামের কারো ঠিকানা আর ফোন নাম্বার আর আমার নামের একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের চেক ছিল। রেজাল্টের দিন ফোন নিয়ে বের হলাম।
ভালো রেজাল্ট না হলেও যে ফেল করবো না জানতাম। হলোও তাই। আসার পথে বিথী নামের ব্যক্তিকে কল লাগালাম। তার সাথে কথা বলে বাড়িতে ফিরে জানতে পারি আমার বিয়ে। তাও দুই বাচ্চার বাবার সাথে। আমি নীরবে হাসলাম। সেদিন ভোররাতে আম্মার দেয়া ব্যাগ নিয়ে আমি বেরিয়ে পড়লাম বাড়ি থেকে অজানার পথে। বিথী আণ্টি আম্মার ছোট বেলার সব থেকে প্রিয় বান্ধবী। বিপদের দিনে আম্মা তার কাছেই সাহায্য চায়। হয়তো আগে থেকেই বুঝে ছিল কিছু। আম্মা পালিয়ে আসার সময় অনেক স্বর্ণের গয়না নিয়ে এসে ছিল। যার অধিকাংশ দাদী নিজে রেখে দিলেও আম্মা নিজের কাছেও রেখে ছিল কয়েকটা। যা আম্মা আমার ভবিষ্যতের জন্য বিক্রি করে দিয়ে আমার নামে অ্যাকাউট খুলে তাতে রাখে। আর আম্মার প্রিয় নূপুর জোড়া আমায় পরিয়ে দেয়। বাড়ি থেকে পালিয়ে আমি ঢাকা বিথী আন্টির কাছে উঠি। সেদিন আণ্টি নিজে আমাকে নিতে এসে ছিল।
Remedy part 15
কিছুদিন ওখানে থেকে কয়েক জন মেয়ের সাথে আলাদা বাসায় উঠি। শুরু হয় আমার নতুন পরীক্ষা। আম্মার স্বপ্ন পূরণ করতে ভর্তি পরীক্ষার জন্য নেমে পরি। আল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্ তায়ালা আর আম্মার দোয়ায় শ্যামলী টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বিএসসি পড়ার সুযোগ পাই। এর মাঝেও যে কতো কতো হেনস্থা হতে হয় তা শুধু আমার আল্লাহ্ আর আমি জানি। পুরুষ নামের কিছু অমানুষের করা অত্যাচার প্রতিনিয়ত সহ্য করতে হতো। পড়াতে গেলেও রক্ষা পেতাম না। শেষে না পেরে অনলাইন ব্যবসা শুরু করি। প্রথমে কষ্ট হলেও ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যায়। এখন আমি প্রতিষ্ঠিত। আম্মার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি ডক্টর।”
