যাত্রাপথ পর্ব ৫০
মাশফিত্রা মিমুই
মদ্যপ হয়ে বিছানা, মেঝেতে ঝিমুচ্ছে আমিরুল শাহ আর সিরাজ উল্লাহ। ছেলেরা আজ আর বাড়ি ফিরবে না। ফরিদা লেপের নিচে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছেন। এই শীতের রাতে মশার কামড় খেয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ আছে? ভাই আর ভাইপোর উপর তাঁর অগাধ বিশ্বাস।
চেঁচাতে চেঁচাতে একসময় গলার আওয়াজ ক্ষীণ হয়ে এলো মিছরির। বুক থেকে আঁচল কেড়ে নিয়ে তার চুলের মুঠি শক্ত করে টেনে ধরেছে সোহেল। পৈশাচিক হেসে মুখ দিয়ে বিশ্রী সব গালি বের করে বললো, “খালি তোরে সুন্দর কওয়ায় তোর জামাই আমারে সবার সামনে থাপ্পড় মারছিল। আইজ তো আমি তোরে ছুঁইতাছি, ইচ্ছামতো ভোগও করমু। এইবার কী করবো সে? কেডায় বাঁচাইবো তোরে? ডাক ওই কুত্তার বাচ্চারে।”
শক্তিশালী হাতের বাঁধন থেকে ছাড়া পাওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করছে মেয়েটা। কিন্তু পারছে না। বিড়বিড় করে ডাকছে,“আল্লাহ, এমন লজ্জা দিও না। সাহায্য করো। তাকে পাঠিয়ে দাও, আল্লাহ। আমার অপরাধটা কী? কেন আমার সঙ্গেই এমন হয়?”
সোহেল তার গাল দুটো শক্ত করে চেপে ধরলো। বিশ্রী ঠোঁট জোড়া এগিয়ে নিতে লাগলো মেয়েলি কোমল ঠোঁটের নিকটে। ঘৃণায় রি রি করে উঠলো মিছরির সারা দেহ। উপায়ান্তর না পেয়ে একদলা থুথু ছুঁড়ে দিলো সে অমানুষটার মুখে। সোহেল অপ্রস্তুত হলো। হাত আলগা হতেই আঙুলের বড়ো বড়ো নখ এবার তার চোখে ঢুকিয়ে দিলো মিছরি। ব্যথায় চোখমুখ কুঁচকে নিলো সোহেল। কুৎসিত এক গালি দিয়ে ছুঁড়ে মারলো মেয়েটিকে দূরে। শক্ত হাতের ধাক্কায় মেঝেতে গিয়ে ছিটকে পড়ল মিছরি। খাটের কোণায় বাড়ি খেয়ে কপালের একাংশ কেটে ফিনকি দিয়ে বের হতে লাগলো রক্ত। ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলো সে। চোখ দিয়ে ঝর্ণার মতো অঝোর ধারায় গড়িয়ে পড়তে লাগলো অশ্রু। ঠিক তখনি তার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো খাটের নিচে, ধারালো রামদায়ের উপর। মুহূর্তেই যেন বুকের ভেতর আশার আলো ফোটে উঠলো তার।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
সোহেলের চোখের পাতলা পর্দায় আঁচড় লেগেছে, যা দেখছে সব ঝাপসা। তবুও সে হার মানলো না। বাবা বলে, সুযোগ বারবার আসে না। তাই সু্যোগ হাতছাড়া না করে কাজে লাগানোই বুদ্ধিমানের কাজ।তার উপর এই দুর্বল মেয়েটির সামনে হারা মানার তো প্রশ্নই ওঠে না। তাই সে এগিয়ে যেতে লাগলো মেয়েটির দিকে।
মিছরি ভয়ে জমে ওঠে। এবার আর ওই নরপিশাচের হাত থেকে নিস্তার নেই। হয় নিজের সম্মান বিসর্জন দিয়ে মরতে হবে, নয়তো সামনের ওই নরপিশাচকে মারতে হবে। মনকে শক্ত করে কোনো কিছু না ভেবেই সে আনাড়ি, নরম হাতে তুলে নিলো রামদা।
সোহেল কাছাকাছি এগিয়ে আসতেই হারিকেনের মৃদু আলোয় চোখ বন্ধ করে দেহের সর্বশক্তি দিয়ে বসিয়ে দিলো কোপ। সঙ্গে সঙ্গে আর্তনাদ ভেসে এলো, চোখ খুলে তাকালো মিছরি। তাজা রক্ত দেখে দেহখানা কেঁপে উঠলো। হঠাৎ দুর্বল মেয়েটির বুকে কোথা থেকে যেন দমকা হাওয়ার মতো ছুটে এসে ভর করল অগাধ সাহস। তেজ নিয়ে পরপর আরো দুটো কোপ বসিয়ে দিলো লোকটার পেটে, হাতে। রামদাটা বেশ ধারালো, প্রথম কোপেই বাহুতে গভীর ক্ষত তৈরি হয়ে গিয়েছে। গত সপ্তাহেই নাজির এতে ধার দিয়েছিল।
ভারিক্কি দেহখানা নিয়ে সোহেল লুটিয়ে পড়ল নিচে। কালো মাটির প্রলেপটা মুহূর্তেই রক্তে ভিজে উঠলো। তা দেখে মিছরির সমস্ত সাহস কোথায় যেন আবারো পালিয়ে গেলো। হঠাৎ তেজদীপ্ত মেয়েটি খাটে হেলান দিয়ে বসে পড়ল। মাথা ঘুরাচ্ছে। হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠলো সে। সোহেল ঘ্যারঘ্যার করছে, প্রাণটা এখনো ঘাপটি মেরে আছে দেহে।
হাট থেকে ঘুরে সমবয়সীদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে বড়ো ভাইয়ের মাছের প্রজেক্টে এসে দাঁড়ালো নওশাদ। টর্চ হাতে মিল্টন ঝিমুচ্ছে। নাজির উঠে দাঁড়ালো। প্রশ্ন করল,“বাড়িত গেছিলি?”
“হ্যাঁ, খেয়ে এসেছি। তুমি এখন যাও, ভাবি বাড়িতে একা। আমি না হয় মিল্টনের সঙ্গে রাত জেগে পাহারা দেবো।” মুড়ি, চানাচুরের প্যাকেট মিল্টনের দিকে এগিয়ে দিলো নওশাদ। নাজির থাকতে থাকতেই কিছুক্ষণ আগে ভাত খেয়ে এসেছে ছেলেটা। তাই সেগুলো পাশে রেখে দিলো।
নাজির বললো,“তোর লাইগাই এতক্ষণ ধইরা অপেক্ষা করতাছিলাম। লেপ ভালা কইরা মুড়ি দিয়া লইস। ঠান্ডা লাগলে সমস্যা। দুইদিন পর এমনিতেও পুসকনি খালি করমু।”
“আসার পথে সোহেলকে দেখলাম আমাদের বাড়ির দিকে যাচ্ছে। তার বাপও তো এখনো যায়নি মনে হয়।”
নাজিরের ললাটে সন্দেহের ভাঁজ পড়ল। আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করল না। যেতে যেতে বললো,“এতক্ষণ পর আইয়া খবর দেওয়ার সময় হইছে, বদমাইশ? আমি গেলাম।”
“আমিও আসবো?”
“না।”
ভাইয়ের অদৃশ্য হওয়া পর্যন্ত নওশাদ তার যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইল। গিয়ে বসলো মাচায়। রেডিও শুনতে শুনতে মিল্টন বললো,“ওই শালারে আমগো ভাইজানে মারছিল একবার, গেরামে পা রাখতে নিষেধ কইরা দিছিলো। হেরপরেও আবার আইছে! আমার সামনে পড়লে মোখলেছরে লইয়া দিতাম দুই ঘা।”
নওশাদ চমকায়,“কেন মেরেছিল?”
“আমগো ভাবির মিহি কুনজর দিছিলো। কত্ত বড়ো সাহস!”
নওশাদের মনটা কু ডেকে ওঠে। এদের জাত, স্বভাব তো ভালো নয়। যাবে কী ভাইয়ের পিছুপিছু? একবার উঠতে চায়, আরেকবার থম মেরে বসে থাকে। মন, মস্তিষ্কের সঙ্গে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগে শেষমেশ উঠে দাঁড়ায়। যদি অতীত পুনরাবৃত্তি হয়? ভাইয়ের একার পক্ষে তো সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। সে আর কাউকে বিশ্বাসও করে না। মিল্টনের কাঁধে হাত রেখে বললো,“তুই বরং এখানে থাক, মিল্টন। আমার একটু বাড়ি যাওয়া প্রয়োজন। যাওয়ার পথে লতিফকে তোর কাছে এসে বসতে বলে দেবো না হয়।”
মিল্টন সন্দেহ নিয়ে একপলক তাকালো। পরক্ষণেই মাথা নাড়ালো। নাজিরের ভাই বলেই নওশাদকে সে যা একটু সম্মান করে।
নাজিরের হাঁটার গতি তীব্র। তবে আজ যেন একটু বেশিই জোরে চলছে। যার ফলে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছতে খুব একটা সময় লাগলো না। কুয়াশার জন্য তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। উঠোনের বাতিটাও নেভানো। চারিদিকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। অদূরে কোনো এক গাছের ডালে পেঁচা ডাকছে। নাজিরের দেহ খানিকটা কেঁপে ওঠে। আজ আর চেঁচিয়ে ডাকে না। ধীরে পা ফেলে ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। নিজের কাছেই নিজের দেহটা ভারী লাগছে। মনে মনে প্রার্থনা করছে, “কোনো অঘটন যাতে না ঘটে, আল্লাহ। আর কোনো দুঃখ আমি নিতে পারমু না।” ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে দরজায় কড়া নেড়ে সে চাপা স্বরে ডাকে,“তাল মিছরি! বউ! দরজা খোলো।”
সঙ্গে সঙ্গে কেউ সাড়া দিলো না। ক্লান্ত স্বরে পুনরায় নাজির ডাকলো। এবার আর তাকে নিরাশ হতে হলো না। ঝড়ের গতিতে খুলে গেলো আপেক্ষিক দ্বার, কিছু বুঝে উঠার পূর্বেই তার বুকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল মিছরি। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদলো। নাজিরের সমস্ত ক্লান্তি দূর হলো, ভার হালকা হলো। বুকের উপর থেকে মেয়েটিকে সরিয়ে মুখের দিকে তাকাতেই ভীষণ অবাক হলো। কপালের গভীর ক্ষতে রক্ত জমাট বেঁধেছে। উদ্ভ্রান্তের মতো ক্ষতস্থানে হাত ছোঁয়ায় নাজির,“তোমার কপালে কী হইছে? কাটছে কেমনে? সব ঠিক আছে? আইতে কী খুব দেরি কইরা ফেলাইছি?”
মিছরি বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কেঁদে দিলো। পুরুষালি বুকে অজস্র কিল ঘুষি মেরে বললো,“হ্যাঁ, দেরি করে ফেলেছেন, খুব দেরি করে ফেলেছেন। আমি মরে গেলে, আমার ইজ্জত লুট হয়ে গেলেই না হয় আসতেন।”
নাজির তার হাত দুটো আঁকড়ে ধরে বললো,“কী হইছে? কও আমারে।”
মিছরি নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো। সামনে থেকে সরে দূরে গিয়ে দাঁড়ালো। নাজির কৌতূহল নিয়ে ঘরে ঢুকতেই চমকে গেলো। মেঝেতে পড়ে থাকা রক্তাক্ত সোহেলকে দেখে ফাঁক হয়ে গেলো তার ঠোঁট জোড়া। ধ্যান ভাঙলো দরজার খিল আটকানোর শব্দে। খিল আটকে মিছরি গিয়ে বিছানায় বসে পড়ল। ওখানেই পড়ে আছে নাজিরের শখের রামদা। যা সে নিজের নিরাপত্তার জন্য বানিয়ে রেখেছিল।
নিস্তেজ সোহেলের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা কিশোরীর দিকে তাকায় নাজির। কি নিষ্পাপ মুখখানা! নাজির ধমক দিলেই ভয়ে মিইয়ে যায়, অভিমান করে মুখ ফুলিয়ে রাখে। আবার সুন্দর করে কথা বললে, কাছে টানলেই সব ভুলে গিয়ে হয়ে ওঠে আহ্লাদি, বোঝদার। এই মেয়েই কী এই কাজটা করেছে? কিন্তু কীভাবে? এগিয়ে গিয়ে তার পাশে বসে। আন্দাজে ঢিল ছোঁড়ে,“মইরা গেছে?”
“জানি না।”
“মারছো ক্যান?”
“ইচ্ছে করে মারিনি, ছলনা করে ঘরে ঢুকে গেলো। কে ঢুকিয়েছে জানেন? বড়ো চাচী ঢুকিয়েছে। ঢুকেই নোংরা নোংরা কথা বলছিল, শাড়ির আঁচল টেনে শরীর থেকে ফেলে দিলো, আমায় খুব বাজেভাবে স্পর্শ করতে চেয়েছিল, ছুঁড়ে ফেলেছে নিচে। এই যে দেখুন, কপালের কী অবস্থা! তখনি এই খাটের নিচে রামদা দেখতে পেয়ে…
“কোপ বসাইছো?”
“হ্যাঁ, এছাড়া উপায় ছিল না। আমি ওকে না মারলে ও আমার সর্বস্ব কেড়ে নিতো। হয়তো মেরেও ফেলতো। আপনার সামনে দাঁড়াতাম কীভাবে?”
নাজির ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,“কী কইলা? আবার কও।”
“আমি ওকে না মারলে ও আমার সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে আমাকেই মেরে ফেলতো। নিজেকে বাঁচানোর জন্য করেছি। ইজ্জতের থেকে নিশ্চয়ই ওর জীবনের মূল্য বেশি নয়?”
নাজির ওই নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ। তারপর কিছু একটা ভেবে আচমকাই গা দুলিয়ে শব্দ করে হেসে ফেলল। দুদিকে মাথা নাড়িয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো বললো,“ঠিক বউ, একদম ঠিক। কেউ মারতে আইলে তারেই মাইরা দেওয়া উচিত। ভয় তো বলদ আর দুর্বলরা পায়।”
মিছরি মাথা তুলে তাকালো। লোকটা হাসছে! অথচ এভাবে কখনো তাকে হাসতে দেখেনি সে। নাজির শক্ত করে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরলো। একসময় ছেড়ে দিয়ে গভীর চুমু খেলো অধরে। কপালে কপাল ঠেকিয়ে বললো, “জিতছি আমি! আমার মা যেইডা করতে পারে নাই আমার বউ সেইডা কইরা দেখাইছে। এইডাই তো আমার জিত, জিতের শুরু।”
মিছরি হা করে তাকিয়ে রইল। নাজির তাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। কপালের ক্ষত পরিষ্কার করে সেখানে লাগিয়ে দিলো ব্যান্ডেজ। তারপর রক্তাক্ত রামদা হাতে তুলে নিয়ে পড়ে থাকা সোহেলের কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে হাত রাখলো নাকের কাছে। শ্বাস এখনো চলছে। কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,“তোর তো কৈ মাছের জান রে, সোহেইল্লা! দেখলি তো, লোভ ভালা না। আইজ যদি লোভ না করতি তাইলে কী এই অবস্থা হইতো? কী আর করার? বাপের পথে হাঁটতে চাইছিলি। কিন্তু ভুইলা গেছিলি, সময় আর মানুষ যে বদলাইছে। এহন মর।”
আবছা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বাঁচার আকুতিতে হাত বাড়িয়ে দিলো সোহেল। নাজিরের ভীষণ আনন্দ হলো। সঙ্গে সঙ্গে রামদা ঢুকিয়ে দিলো তার গলায়। সোহেল এবার আর চিৎকার করার সুযোগ পেলো না। জবাই দেওয়া গরুর মতো ছটফট করতে লাগলো। কিছুক্ষণ পরেই সব শেষ, শান্ত। মিছরি পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেদিকে। নাজির উঠে দাঁড়ালো। বললো,“কাম কহনো অর্ধেক কইরা ফালাইয়া রাখতে নাই, তাল মিছরি। বিপদ হইবো।”
“এখন কী হবে? একটু পরে সবাই জেনে যাবে। সবাই জেনে যাবে, আমি কাউকে খুন করেছি! আমি কিন্তু জেলে যাবো না, আমি আপনাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না।” ডুকরে কেঁদে উঠলো মিছরি।
লুঙ্গি কাছা দিয়ে হাতের রক্ত পরনের শার্টে মুছলো নাজির। দরজা খুলতে খুলতে বললো,“তোমার সোয়ামি থাকতে চিন্তা কীয়ের? আমি থাকতে কেউ তোমারে কোত্থাও লইয়া যাইতে পারবো না। এই খুন তুমি না, আমি করছি। তুমি তো শুধু নিজেরে রক্ষা করছো।”
নাজির ঘর থেকে বেরিয়ে চাচার দালানের দিকে উঁকি মারলো। একবার পার পেয়ে যাওয়ায় আবার একই পথ অবলম্বন করেছে বোকার দল। আজকের ঘটনায় নাজিরের সাহস, বুদ্ধি বেড়ে গিয়েছে। গোয়াল ঘরের চাল থেকে সে নিয়ে এলো তিনটা বস্তা আর নীল পলিথিন। ঘরের দিকে কয়েক পা যেতেই দেখতে পেলো সবে ভেতরে ঢোকা নওশাদকে। হাঁপাচ্ছে সে। দম না ফেলেই হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল,“ভাবি ঠিক আছে? মাত্র মিল্টনের থেকে সবটা শুনলাম। আগে জানলে সঙ্গে সঙ্গে তোমায় জানাতাম।”
নাজির উত্তর দিলো না। চুপচাপ ঘরে চলে গেলো। স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বললো,“ঘোমটা টানো, তোমার দেওর আইছে।”
মিছরি ঘোমটা টেনে আড়ষ্ট হয়ে বসে রইল। নওশাদ কিছু না ভেবেই ভাইয়ের পিছুপিছু ঘরে প্রবেশ করল। সামনের দৃশ্য দেখে মাথায় চক্কর দিয়ে উঠলো। রক্ত দিয়ে এখন আরো মাখামাখি হয়ে গিয়েছে চারপাশ। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়ালো সে। অতিকষ্টে ডাকলো,“ভাই!”
“আগে জানোয়ারটায় নিজে ঘটাইছিল, আইজ পাঠাইছে পোলারে। ভাগ্যিস খাটের তলায় রামদা রাইখা দিছিলাম!”
ভাবির দিকে একপলক ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দৌড়ে বাইরে চলে গেলো নওশাদ। গড়গড় করে সব উগড়ে দিলো ভেতর থেকে। নাজির বাইরে এসে চাপা স্বরে ধমক দিয়ে বললো,“সবাইরে জাগাইতে চাস? ভিতরে আয় তাড়াতাড়ি। গুম করতে হইবো।”
কলপাড় থেকে কুলি করে ঘরে এলো নওশাদ। নাজির স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বললো,“পাশের ঘরে গিয়া কাপড় বদলাইয়া নেও। রক্ত লাইগা আছে।”
“গোসল করতে হবে। গা ঘিন ঘিন করছে।”
“পরে কইরো, শব্দ হইলে সবাই জাইগা যাইবো।”
বাধ্য মেয়ের মতো তাই করল মিছরি। সে চলে যেতেই সোহেলের দেহের সব পোশাক খুলে আলাদা একটা পলিথিনে ভরলো নাজির। তারপর দুই ভাই মিলে লাশটা নীল পলিথিনে ভালো মতো প্যাঁচিয়ে পরপর তিনটা বস্তায় ভরলো। পাছে রক্ত বের হলে? নওশাদ বললো,“চলো একেবারে নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে আসি। কেউ জানবে না। হাঁটলে ওদের পথেই হাঁটি।”
“তাই করমু, নৌকা তো ঘাটে বান্ধাই আছে। তার আগে ঘর পরিষ্কার করতে হইবো। এই বস্তা পুরাইন্না ভিটের পিছনে রাইখা আসি চল।”
নওশাদ মাথা নাড়ালো। দুজনে মিলে শব্দহীন কদম ফেলে পেছনের দিকে রেখে এলো লাশসহ বস্তাটা। তারপর রামদা নওশাদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো, “পুসকনি থাইক্যা ভালা কইরা ধুইয়া আন। যাতে বুঝা না যায়।”
“আর ঘরের রক্ত? পাকা মেঝে হলে না হয় মোছা যেতো। কিন্তু এটা তো মাটির।”
“কলিমের মায় চালতা গাছের নিচে কালা মাটি রাইখা দিছে। আমি প্রলেপ দিতাছি।”
নওশাদ চলে গেলো পুকুর পাড়ের দিকে। নাজির লুঙ্গি কাছা দিয়ে কাঁদা মাটি এনে দ্রুত সারা ঘরে প্রলেপ লাগিয়ে হাঁপ ছাড়লো। বিছানার চাদর আর পরনের শার্ট বদলে পলিথিনের মধ্যে সোহেলের রক্তাক্ত পোশাকের সাথে রাখলো। এমনকি মিছরি বের হওয়ার পর তারটাও। হঠাৎ ভেতর থেকে আওয়াজ ভেসে এলো,“কেডা বাহিরে? সোহেল?”
ফরিদার আওয়াজ। নাজির দ্রুত দরজায় শিকল টানলো। নওশাদ চলে এলো। জিজ্ঞেস করল,“ভাই, এইবার?”
“তুই পিছনের অন্ধকারে গিয়া লুকাইয়া পড়। আইজ রাইতে তুই বাড়ি ফিরোস নাই, আমার জায়গায় পুসকনি পাহারা দিছিলি। মনে থাকবো?”
নওশাদ মাথা নাড়ায়। পকেট থেকে ঘরের চাবি বের করে ভাইয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে,“ভাবিকে নিয়ে আজ রাতটা তুমি আমার ঘরেই থাকো।”
“তুই গিয়া দাঁড়াইয়া থাক শুধু। মাতবরি করিস না।”
নওশাদ চলে গেলো। নাজির দ্রুত গিয়ে ঘরের তালা খুলে মিছরিকে ঢুকিয়ে দিলো ভেতরে। ফিসফিস করে বললো,“স্বাভাবিক হও, যেন কিছুই হয় নাই।”
মিছরি স্বাভাবিক হতে পারে না। শরীর অনবরত কাঁপছে। বিশেষ করে ওই মহিলার প্রতি ঘৃণা হচ্ছে। ফরিদা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। উঠোনের আলো জ্বালিয়ে গ্ৰিল ধরে বাইরে তাকাতেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন। তাকে দেখে নাজির বললো,“এহনো ঘুমান নাই? মাত্র বাত্তি দিলেন? কানাওলায় ধরছে নাকি?”
বেশ কতক্ষণ তিনি কথা বলতে পারলেন না। স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন নতুন ভিটের দিকে। ঘর ঠিক করে দেখা যায় না। নাজির তাঁর দেখাদেখি একবার তাকায় সেদিকে। বলে,“বউ ঘুমায়।”
“তুই না বলে আইবি না?”
“আর কইয়েন না। নওশাদ গিয়া কইলো, ভাই তুমি বাড়িত যাও। খাইয়া ঘুমাও গা,ভাবি একলা ডরাইবো।আমি আর মিল্টনে তো আছি। তাই আইয়া পড়লাম। এই যে মাত্র আইয়া খাইয়া-দাইয়া হাঁটাহাঁটি করতাছি।”
কথা বলার বা চলার শক্তি পান না মহিলা। মনে হয় অবশ হয়ে আসছে সব। নাজির ভেতরে ভেতরে খুব আনন্দিত হলো। তবে বাইরে গম্ভীর থেকে জিজ্ঞেস করল,“সোহেল কইয়া ডাকলেন মনে হইলো? ওই হারামজাদায় বাড়িত ঢুকছিল? নওশাদ কইলো, একবার নাকি মেইন সড়ক ধইরা যাইতে দেখছে।”
“কই যাইতে দেখছে? কহন?”
“এশার আজানের পর ওয় খাইতে আইছিল। খাওয়া শেষে হাটে ঘুরাঘুরি কইরা ফেরার পথে দেখছে। না করার পরেও আবার আইলো? ডাকার পরেও নাকি সাড়া দেয় নাই।”
ফরিদার বিশ্বাস হয় না সেকথা। নাজির বুঝতে পারে। জিজ্ঞেস করে,“চাচায় কই?”
“ঘরে।”
“ঘুমাইছে? দরজা খুলেন, দরকার আছে।”
ফরিদা আঁতকে উঠলেন। ভেতরে তাঁর ভাই স্বামীর সাথে মাতাল হয়ে পড়ে আছে। নাজির তা জানলে, দেখলে সমস্যা। তার মধ্যে সোহেলটা কোথায় গেলো আচানক? কী হচ্ছে এসব? শীতে কাঁপতে কাঁপতে এলোমেলো হেঁটে ভেতরে চলে গেলেন তিনি। নাজির এগিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে ডাকলো,“নওশাদ!”
নওশাদ বেরিয়ে এলো। বললো,“দ্রুত লাশ সরাতে হবে, ভাই। মিল্টনকে ডেকে আনবো? ও তোমার বিশ্বস্ত। তুমি বরং ভাবির কাছে থাকো। বয়স অল্প, অজান্তে কী করে ফেলেছে! মনে হয় না মানসিক অবস্থা ঠিক আছে।”
“মাথা খারাপ? যতই বিশ্বস্ত হোক, এইসবের মাঝে ওরে জড়ানো যাইবো না। লাশ সরাইবো অন্য কেউ। তুই আমগো ঘরে গিয়া ভিতর থাইক্যা খিল আঁট। আমি তোর ঘরে বাইরে থাইক্যা তালা দিতাছি। তোর ভাবি ভিতরে থাকুক। এইটুকু কষ্ট তো সহ্য করতেই হইবো।”
“অন্য কেউ মানে? কে?”
নাজির হাসলো। বস্তা টেনে ফটকের বাম পাশের ঘন ঘাসের উপরে রাখলো। তারপর লাইট নিয়ে চলে গেলো কোথাও। নওশাদ কৌতূহল ভেতরে দমিয়ে রেখে কথামতো ভাইয়ের সদ্য লেপা ফাঁকা ঘরে গিয়ে খিল দিলো।
গভীর রাতে গ্ৰামের রাস্তা ভূতুড়ে পল্লীর মতো লাগছে। আলো ধরার পরেও খালি চোখে দূরের কিছু দেখা যাচ্ছে না। চারিদিক কুয়াশায় ঢাকা। বাইরে কী হচ্ছে, না হচ্ছে তাতে যেন কারো কিছু যায় আসে না। সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
হাড় কাঁপানো শীতের মধ্যেও নাজির শান্ত, স্থির। অনাদরে তার গলায় ঝুলছে একটা মোলায়েম চাদর। মাস্টার বাড়ির সামনে এসে সে দাঁড়ালো। ফটকের দরজা ভেতর থেকে তালাবদ্ধ। সে সোজা হেঁটে চলে গেলো পেছনের দিকে। এদিকে প্রাচীর নেই, শুধু লম্বা বিশাল দালানের দেয়াল। প্রত্যেকটা ঘরের জানালাও এখানে সাড়ি সাড়ি। কান পাততেই নাক ডাকার শব্দ শোনা গেলো। কোনটা কার ঘরের জানালা না চিনলেও ডান পাশের শেষের দিকেরটা যে মরহুম আকবর মিয়ার ঘরের জানালা তা আর বুঝতে বাকি থাকে না নাজিরের। এর পাশেরটা নজরুল আলমের হলে ওপাশেরটা নিশ্চয়ই কাশেম আলীর। নাজির বেশ কিছুক্ষণ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থেকে কিছু একটা ভাবতে লাগলো।
কাকে ডাকা উচিত তার? তালেব নাকি মাসুম? এই বাড়ির বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে গায়ে গতরে জোর বেশি সুজনের। মাসুম, রুহুল চঞ্চল প্রতিবাদী ছেলে। তবে তালেব এদের মধ্যে সবচেয়ে চতুর। কথা কম বললেও ভেবে বলে, উপস্থিত বুদ্ধি তুখোড়। তবে চাচাতো ভাইদের কোনো ভরসা নেই। নাজির তাদের বিশ্বাস করে না। নিজের ভাইরাই তো হুট করে শত্রু হয়ে যায়। তবে কী মাসুমকে ডাকা উচিত? সে বোন অন্ত প্রাণ। নাজির খুব ভালো করেই জানে। পরমুহূর্তে মাথা নাড়ায় নাজির, অতি চঞ্চলদের জন্য এসব নয়। তো কী তালেবকে ডাকবে?
নাজির বুদ্ধিমান পুরুষ। তার মস্তিষ্ক কাজ করে দ্রুত। সে চাইলেই নওশাদকে নিয়ে রাতের আঁধারে লোক চক্ষুর আড়ালে সোহেলকে গুম করে দিতে পারে। এটা তার জন্য বড়ো কোনো বিষয় নয়। তবুও সে ঝুঁকি নিয়ে এতদূর এসেছে। এমনি এমনি এসেছে নাকি? ভুল করেছে তার স্ত্রী, তাও আবার কাকে মেরেছে? সিরাজ উল্লাহর ছেলেকে। যার সাথে রয়েছে তার দুই চাচা আর চেয়ারম্যান। কাল যখন ছেলেকে লোকটা খুঁজে পাবে না তখন প্রথম সন্দেহের তীর তো তাদের দিকেই আসবে। এত এত শত্রুর মাঝে নাজিরের একার পক্ষে এসব সামাল দেওয়া সম্ভব? নিজেদের সুরক্ষার জন্যই এতদূর সে এসেছে। তারা নাজিরকে ঘৃণা বা অপছন্দ করুক, নিজেদের মেয়েকে তো আর করতে পারবে না। এর মাধ্যমে সিরাজ উল্লাহর সঙ্গে এদের গোপন এক শত্রুতাও তৈরি হয়ে যাবে। এতে তো নাজিরেরই লাভ।
নাজির চতুরতার সহিত শব্দহীন হাসে। টোপ হিসেবে বেছে নেয় শ্বশুর কাশেম আলীর জানালা। ভাই- বোনের সম্পর্ক এক সময় না একসময় বদলায় কিন্তু বাপ-মেয়ের সম্পর্ক মৃত্যু ছাড়া কখনো বদলাতে পারে না। কাশেম আলী শক্তিশালী, তেজিয়ান, অহংকারী লোক। কিন্তু মেয়ের বেলায় দুর্বল, মেয়ের জন্য সব করতে পারে। শালিস সভায় তাঁর চোখে অশ্রু দেখেই বুঝে গিয়েছিল নাজির। বুড়োর মৃত্যুর পরে বেশ কয়েকবারের সাক্ষাতেও বুঝতে পেরেছিল।
একাধারে কয়েকবার টোকা পড়তেই ভেতর থেকে ভেসে এলো ঘুমঘুম স্বর,“কেডা রে!”
নাজির ফিসফিস করে বললো,“শ্বশুর আব্বা, আমি!”
পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে কাশেম আলীর কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলো। বিছানায় থম মেরে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। তারপর বিছানা থেকে নেমে লুঙ্গিতে গিঁট বেঁধে দোয়া দরুদ পাঠ করে জানালার দিকে এগোলেন। ঠিক শুনেছেন তিনি? এটা আবার নিশীর ডাক নয় তো? রাতবিরাতে শুনশান ধরণী জুড়ে ঘুরে বেড়ায় এরা! বুকে সাহস সঞ্চয় করেই সেগুন কাঠের তৈরি জানালার কপাট খুলে দিলেন তিনি। অন্ধকারে বেশ কিছুক্ষণ গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। নাজির কিছু সময়ের জন্য নিজের মুখের দিকে আলো ধরে চেহারা স্পষ্ট করতেই ভদ্রলোক আশ্চর্যান্বিত কণ্ঠে বললেন,“তুই! তুই হাছাই নাজির তো!”
“আস্তে কথা কন, দেয়ালেরও কান আছে। আমার শাশুড়ি কী ঘুমায়?”
“হ, কী ব্যাপার? আমার মিছরি ঠিক আছে?”
“না।”
ভদ্রলোক জানালার গ্ৰিলে কপাল ঠেকালেন। নাজির বললো,“বাহিরে আইয়েন। কেউ যাতে টের না পায়।”
“কী হইছে? ক আমারে।”
“না আইলে কমু কেমনে? তাড়াতাড়ি আইয়েন, ভোর হইলে সমস্যা। পিছনের দরজা নাই?”
“দাঁড়া।”
বিছানায় ঘুমন্ত স্ত্রীর দিকে একপলক তাকিয়ে গায়ে ফতুয়া জড়িয়ে ঘর থেকে বের হলেন কাশেম আলী। খুব সাবধানে পা ফেলে সোজা এসে দাঁড়ালেন মায়ের ঘরের সামনে। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে এই ঘরে সুজাতা, সিফাতকে নিয়েই মা থাকেন। দরজা এখন আর আটকান না, চাপানো থাকে। দালানের মূল ফটক লাগানো। তিনি চুপচাপ পেছনের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। বাইরে থেকে দিলেন তালা। নাজিরের কাছাকাছি এসে একনাগাড়ে শুরু করলেন প্রশ্ন,“কী হইছে আমার মিছরির? হেঁয়ালি করিস না, নাজির। এত রাইতে তুই আমার কাছে আওয়ার মানুষ না। কিছু একটা হইছে নিশ্চিত।”
নাজির রাস্তা ধরে হাঁটা ধরলো। বললো,“জাইনা বুইঝা কুমির ভরা খালে মাইয়া ছাইড়া দিছেন। তুইল্যা দিছেন এমন একজনের হাতে যেয় নিজেই কুমিরের লগে লড়াই কইরা কোনোমতে বাঁইচা আছে। চাইলে অনেক কিছুই হইতে পারতো, কিন্তু হয় নাই। আল্লাহ রক্ষা করছে। এহন শ্বশুর, জামাই মিল্যা গিয়া জঞ্জাল সাফ করি আইয়েন। যাতে ভবিষ্যতেও কিছু না হয়।”
কাশেম আলীর শরীর ভেতর থেকে কেঁপে ওঠে। ঠান্ডা নাকি অজানা শঙ্কায় বুঝা যায় না। বুঝতে পারেন, এই ছেলে উত্তর দেবে না। তাই অস্থির, চিন্তিত মন নিয়েই পিছুপিছু বাধ্য হয়ে হাঁটতে থাকেন। শাহ বাড়ির সামনে এসে নাজির থামে। ইশারায় সাবধান আর চুপ থাকার নির্দেশ দিয়ে টর্চটা শ্বশুরের হাতে ধরিয়ে বস্তা তুলে নেয় কাঁধে। জীবনে অনেক খেটেছে সে, কাঁধে তুলেছে মণ মণ ভারী বস্তা। তাই এই বস্তাটা তুলতেও তেমন একটা কষ্ট হলো না। তার উপর আবার আনন্দ যেন ধরছে না ছেলের। এবার মহাসড়কের পথ ছেড়ে সে বেছে নিলো নিচু সবজি বা ধান চাষের জমি। কিছু কিছু জায়গায় পানি শুকিয়ে এখন কাঁদা। কাশেম আলীর কণ্ঠ ঠান্ডায় জমে গিয়েছে। জিজ্ঞেস করলেন, “কীয়ের বস্তা এইডা? কী আছে এতে? কী করতে চাইতাছোস? আমার কিন্তু মাথা খারাপ হইয়া যাইতাছে, নাজির।”
“ধৈর্য ধরেন।”
ঘাটে নৌকা বাঁধা। চিলাই নদীতে বিশাল স্রোত। ভালো করে তাকালে অদূরে দেখা যায় লঞ্চের বিশাল বাঁশের আগায় ঝুলন্ত হারিকেনের আলো। নাজির বস্তা কাঁধে নিয়েই বললো,“নৌকায় উইঠা নোঙর ফালান।”
“ক্যান?”
“যা কইছি তা করেন, পরে কইতাছি।”
কাশেম আলী এগিয়ে গেলেন। কাঠ থেকে দড়ি খুলে নোঙর ফেললেন পানিতে। বৈঠা ঠেকিয়ে দাঁড়াতেই নাজির উঠে পড়ল নৌকায়। বস্তা রাখলো মাঝখানে। বললো,“আমগো একেবারে মাঝ নদীতে যাইতে হইবো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফজরের আজান দিবো। তার আগেই কাম শেষ করতে হইবো।”
কাশেম আলী বৈঠা চালাতে লাগলেন। দূর থেকে ভেসে আসছে মাঝিদের খালি কণ্ঠের গান। কি সুন্দর সেই সুর! মিছরির সঙ্গে তার নৌকা ভ্রমণ করা হয়নি। মনে মনে ভেবে নিলো, একদিন সবাই ঘুমিয়ে গেলে চুপিচুপি সে স্ত্রীকে নিয়ে নৌকা ভ্রমণে যাবে। ভাবতেই অধরে মুচকি হাসির দেখা মিললো। শ্বশুরমশাইয়ের কৌতূহলী চোখের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই গাম্ভীর্য এঁটে বললো,“সাড়ে একুশ বছর আগে এক রাইতের মধ্যেই দশ গেরামে একটা খবর ছড়াইয়া গেছিলো। মনে আছে আমনের?”
“কোন খবর?”
“সুবহান আলী শাহর বউ পরপুরুষের লগে পলাইয়া গেছে।”
“কার মনে নাই? হঠাৎ এই কথা?”
“বুইড়া আমনেরে কয় নাই তাইলে!”
“কী কইবো? হেঁয়ালি করিস না, বাপ।”
“সেইদিন আমার আম্মা পলায় নাই। কারো লগেই পলায় নাই।”
“কিহ!”
“সিরাজ উল্লাহরে চিনেন? আমিরুল শাহর শালা?”
“হ, প্রায়ই তো দেহা যায়।”
“সেইদিন রাইতে এই পিশাচ আমার আম্মার ইজ্জত লুটতে গিয়া ভয়ংকরভাবে আম্মারে খুন করছিল। আর তারে মদদ দিছে কেডায় জানেন? আমার আপন দুই চাচা, চেয়ারম্যান, আর এত বছর মায়ের আসনে সম্মানের সহিত বসাইয়া রাখা আমার বড়ো চাচী। আব্বায় দেইখা ফেলায় হেরাই আব্বার ওই অবস্থা করছিল।”
কাশেম আলী অবাক হন, জমে যান ঠান্ডায়। বৈঠা হাত থেকে পিছলে যেতে চায়। তবুও অতি কষ্টে শক্ত করে ধরে রাখেন। নাজির বললো,“আমি আর আমার ভাই এই শত্রু, খুনিগো মাঝেই বড়ো হইছি। আমগো মন্ত্রের মতো মুখস্থ করানো হইছে, আমগো মা চরিত্রহীন মহিলা। দাদার খুনি মাস্টর বাড়ির বুইড়া আর তার পোলারা। বিশ্বাস না কইরাও তো উপায় আছিলো না। কিন্তু একদিন আমার চোখের সামনের কালা পর্দা সইরা গেলো। বুইড়ার প্ররোচনায় আমি সত্য উন্মোচনের পথে নামলাম। জানতে পারলাম ভয়ানক সব সত্য। আমার সব বিশ্বাস সেইদিনই শেষ। আমি বুঝলাম, আপন মানুষেরাই মানুষের শত্রু। পররা তো শুধুই মজা লয়।” কথায় বিরতি টানলো সে। ধীর স্থির ভাবে পুনরায় বললো,
“এতগুলা বছর পর আবার তারা অতীত পুনরাবৃত্তি করতে চাইলো। সাড়ে একুশ বছর আগে যেমনে আমার মায়রে শেষ করল, ঠিক সাড়ে একুশ বছর পর একই পথ বাইছা নিলো। তবে এবার শিকার বানাইলো আমার বউডারে। যে কোনো প্যাঁচগোছ বোঝে না।”
বাকরুদ্ধ হয়ে বসে থাকেন কাশেম আলী। চোখের কোণে অশ্রু জমেছে বোধহয়। নাজির খেয়াল করে না তা। তবুও অতি কষ্টে বললেন,“নাজির, আমার মিছরি!”
“ঠিক আছে এহন, ঘরে রাইখা আইছি। চিন্তা নাই। আমি বাড়িত আছিলাম না। সেই সুযোগে! কিন্তু আমনের মাইয়া মহা সাহসী। আমার মায়ের মতন দুর্বল না হইয়া রামদা দিয়া কোপ বসাইয়া দিলো পিশাচটারে। এহন আর বাঁইচা নাই, শেষ কামডা আমিই করছি। এই যে বস্তায় লাশ। সিরাজ উল্লাহর পোলা সোহেলের লাশ। সব প্রমাণ লোপাট কইরা দিছি, এহন শুধু এই লাশের পালা।”
নাজিরের ঠোঁটে ফোটে উঠলো পৈশাচিক হাসি। কাশেম আলী বৈঠা ছেড়ে দিয়ে বস্তার দিকে এগিয়ে এলেন। নাজির ঝট করে সেই বৈঠা ধরে পানির নিচে ঠেকালো। শ্বশুরটা বড়ো ধরণের একটা ঝটকা খেয়েছে। পরপর তিনটা বস্তার মুখ তিনি অধৈর্য হয়ে খুললেন। লাশের বিভৎস মুখটা দেখতেই পিছিয়ে গেলেন। হাত দুটো থরথর করে কাঁপছে। বিড়বিড় করে বললেন, “আমার মাইয়া, আমার মিছরি এইডা করতে পারে না।”
“হেয়ই করছে। জিগানোর পর কইলো, নিজেরে বাঁচানোর লাইগা করছি। ইজ্জতের থাইক্যা নিশ্চয়ই ওর জীবনের মূল্য বেশি না? খাপে খাপ। এইবার না সে নাজির শাহর বউ! বস্তা থাইক্যা বাহির কইরা হ্লারপুতরে পানিতে ছুঁইড়া মারেন। আমনের মাইয়ার ইজ্জত লুটতে চাইছিল, জামিলের মতন। আইজ যদি মাইয়ায় সাহস না দেখাইতো তাইলে এর জায়গায় হয়তো তারে থাকতে হইতো।”
কাশেম আলী বাক্য হারা হয়ে গেলেন। মাথা ঘুরাচ্ছে। জামিলের নাম আর মেয়ের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। বস্তা থেকে লাশ বের করে ধাক্কা দিলেন মাঝ নদীতে। নাজির সময় নিয়ে পাড়ে ভিড়ালো নৌকা। নৌকায় আগে থেকে রাখা কেরোসিন তেল নিয়ে নিচে নেমে এলো।বস্তা, পলিথিনসহ সঙ্গে আনা সমস্ত পোশাক আশাকে ধরিয়ে দিলো আগুন। যতক্ষণ না তা ছাই হয় ততক্ষণ পর্যন্ত একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নাজির। কাশেম আলী আশ্বস্ত করে বললেন,“তুই মিছরির কাছে যা, নাজির। এইগুলা আমি সাফ করতাছি। নৌকায় একটু রক্ত লাগছে, ধুইতে হইবো। আমার মাইয়াডা একলা, অন্ধকারে ডরায়।”
নাজির পাল্টা জবাব দিলো না। কাশেম আলী নরম স্বরে বললেন,“আমার ভাল্লাগতাছে না। কী হইতাছে এইসব? ওইটুকু একটা মাইয়ার দিকেও কুনজর পড়ছে? কী অপরাধ তার?”
“অপরাধ তো আমগোও আছিলো না। তবুও এত বছর ধইরা ভোগ করতাছি।”
“হুন, নাজির। আমি কইছি না, আমার মাইয়ার সুখ আর ভালার লাইগা যা করার আমি করমু। প্রয়োজন হইলে খুন করতেও পিছপা হমু না। ওরা আমার মাইয়ার দিকে নজর দিছে! জামিলরে হেইদিন আমি খুন করতে পারি নাই, শুধু পরিবার আর সমাজের ডরে। আমার মিছরি সেই তোয়াক্কা করে নাই, ওয় দেখাইয়া দিছে। তুই চিন্তা করিস না। মিছরির বাপ কাশেম আলী মরে নাই। অনেক হইছে, অনেক সহ্য করছি। আর না।”
নাজির সন্তুষ্ট হলো। এটাই তো সে শুনতে চেয়েছিল। কাশেম আলী পুনরায় বললেন,“আইজ রাইতে আমার ঘুম আইবো না। সকাল হইলে মিছরিরে লইয়া বাড়িত আইবি?”
“নাজমুলের বিয়া আছিলো আইজ। কাইল বউ নিয়া বাড়ি ফিরবো। সকাল হইলেই হেরা সোহেলের খোঁজ করবো। তার মাঝে গেলে সন্দেহ বাড়বো। এতে ক্ষতি আমনের মাইয়ারই। বুকে পাথর চাপা দেন, কেউ যাতে টের না পায়। এমনকি আমনের পোলারাও না।”
কাশেম আলী মাথা নাড়ান। নাজির আর দাঁড়ায় না। চলে যায় বাড়ির পথে। কাশেম আলী দ্রুত নৌকাটা ভালো করে ধুয়ে বেঁধে ফেলেন ঘাটে। ছাইগুলো পানিতে ফেলে হাত-মুখ ধুয়ে বাড়িতে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়েন। নাজির এসেই ডেকে তুলে নওশাদকে। আশেপাশে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,“কাম শেষ, যা হইছে সব ভুইলা যা। একেবারে হেগো মতন চুপ থাকতে হইবো। এইখান থাইক্যা সোজা যাবি মিল্টনের কাছে। বাড়ি ফিরবি একেবারে আলো ফুটলে। যাতে কেউ সন্দেহ না করে।”
নওশাদ মাথা নাড়ায়। প্রশ্ন না করে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। নাজির গিয়ে ঘরের তালা খুলে। দেখতে পায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকা মিছরিকে। তাকে সেই রাতেই ডেকে তুলে কলপাড় নিয়ে যায় সে। কল চেপে বালতির পর বালতি পানি ভরে গোসল করিয়ে ঘরে আনে। জ্বরে মেয়ের গা পুড়ে যাচ্ছে। পোশাক বদলানোতে সাহায্য করে তারপর চলে আসে নিজেদের ঘরে।
যাত্রাপথ পর্ব ৪৯
প্রলেপ মোটামুটি শুকিয়েছে। মেঝেতে বস্তা বিছিয়ে রেখে স্ত্রীকে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে নাজির। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলে,“সব দুঃস্বপ্ন, তাল মিছরি। কিচ্ছু হয় নাই, তুমি কোনো ভুল করো নাই। আমার বউ ভুল করতেই পারে না।”
মিছরি ফুঁপিয়ে ওঠে, মিশে যায় স্বামীর দেহের সঙ্গে। নাজির তাকে আগলে নেয়। ধীরে ধীরে রাতের গভীরতা কমতে থাকে। অথচ আজকের রাতের এই ভয়াবহতা কেউ জানতে পারে না, কুয়াশার আড়ালে সব গোপন থাকে। যেমনটা ছিল তার মায়ের ক্ষেত্রে!
